#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি
#পর্ব৪
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
বিষাণ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ছুরির ফলাটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে সে হয়তো কিছু একটা ভাবল, কিন্তু মুখ ফুটে কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। তৃধার বিশ্বাস হচ্ছিল না,এই লোকটা এত বড় একটা কথা শুনেও কেন কোনো রিয়্যাকশন দিচ্ছে না? কেন এখনো শান্ত হয়ে আছে? তৃধা নিজের বুকের ভেতর সবটুকু সাহস এক জোড় করে আবারও একটু চড়া গলায় বলে উঠল,
"কী হলো, চুপ করে আছেন কেন? বলুন! কবে বিয়ে করবেন?"
বিষাণ এবার চোখের পলক না ফেলে একবার তৃধার দিকে তাকাল। ওনার বাদামী চোখে এক অদ্ভুত অবহেলা। সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
"দেখছি তোর শখ দিন দিন বেড়েই চলেছে! বের হ আমার রুম থেকে!"
তৃধা শুকনো ঢোক গিলল। লোকটার ঠাণ্ডা চাহনিতে তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল, তবুও সে পিছু হটল না। সে চরের আশায় মরিয়া হয়ে জেদ ধরে বলল,
"কেন বের হবো? আগে জবাব দিন, তারপর যাব!"
বিষাণ এবার নিজের রাগ আর সামলাতে পারল না। হাতের ছুরিটা টুলের ওপর সজোরে ঠুকে দিয়ে বজ্রকণ্ঠে ধমকে উঠল,
"বের হ বলছি!"
বিষাণের সেই আকস্মিক সিংহনাদে তৃধা ভেতরে ভেতরে হালকা কেঁপে উঠল। কিন্তু তার ভেতরের মরিয়া ভাবটা কমলো না। সে দরজার চৌকাঠ আঁকড়ে ধরে আবার বলল,
"বের হবো না! বলুন কবে বিয়ে করবেন?"
তৃধা আড়চোখে বিষাণের দিকে তাকাচ্ছিল। লোকটা কি আসলেই অতটা রাগছে না? শুধু মুখে ধমকাচ্ছে কেন, হাতটা কেন চলছে না ওনার?
তৃধার ভাবনার জাল ছিন্ন করে বিষাণ এবার অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও শান্ত স্বরে বলে উঠল,
"কোনোদিনই নয়! এই জীবনে অন্তত তোকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়!"
বিষাণকে চরম রাগাতে গিয়ে হুট করে তৃধা নিজেই প্রচণ্ড রেগে গেল! *এই জীবনেও না মানে কী? এই লোকটা নিজেকে ভাবে কী?এই লোককে বিয়ে করার জন্য আমি করে যাচ্ছি?বিয়ে না করার হলে ডিরেক্ট বলে দিক, বেশি রাগ উঠলে একটা থাপ্পড় মেরে দিক,তা না করে এই জীবনেও করবে না, এটা আবার কেমন কথা!* নন্দ্রিতার শরীরের ভেতরের পুঞ্জীভূত অপমানটা যেন তৃধাকে গ্রাস করে নিল। সে বিষাণের দিকে তীব্র চোখ করে তাকিয়ে অপমানে ফেটে পড়ল,
"কেন করবেন না?”
বিষান হালকা সামনে এগিয়ে বলল,
“তোকে কেনো বলবো?
তৃধা এবার হুট করেই চেঁচিয়ে উঠলো,
“আমি কালো বলে? হ্যাঁ, এটাই তো আসল কারণ! নন্দ্রিতা তো শ্যামলা, রূপবতী বলতে যা বোঝায় তা নয়! কিন্তু আপনি তো পুরুষ মানুষ, আমি তো ভুলেও গিয়েছিলাম! আপনাদের চোখ তো সবসময় যাবে ওই ফর্সা, লম্বা, ছিপছিপে মেয়েদের ওপর! আমাদের মতো কালো মেয়েরা কি আপনাদের মতো জমিদার বংশের ছেলেদের জন্য?”
তৃধার গলার স্বর এবার অপমানে কাঁপতে লাগল। সে একনাগাড়ে বলে যেতে লাগল,
"গল্পে কখনো দেখেছেন কোনো উপন্যাসের নায়িকা কালো হয়? হয় না! তারা সবসময় ভুবনমোহিনী সুন্দরী হয়! আপনিও প্রেমে পড়বেন বিষাণ ভাই, তবে নন্দ্রিতার মতো কোনো শ্যামলা মেয়ের জন্য নয়, ওই কোনো এক ভুবনমোহিনীর রূপের মোহে পড়বেন! তাই আমি আপনাকে ঘৃণা করি! ভীষণ ঘৃণা করি!"
রাগের মাথায় তৃধা কী বলে ফেলল, সে নিজেও জানে না। তার হাত-পা কাঁপছিল, বুকটা ধকধক করছিল। বিষাণ পুরো স্তব্ধ হয়ে ওনার ধারালো চাহনি দিয়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতরের নীরবতা যেন আরও গাঢ় হলো। বিষাণ নিচু অথচ ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল,
"আমি তোকে কোনোদিন কালো বলেছি, নন্দ্রিতা?"
তৃধা তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে বিষাণের কথার পিঠে কথা ছুড়ে দিয়ে বলল,
"মুখে বলেননি, কিন্তু আপনি এটা প্রমাণ করবেন একদম শেষ দিনে! সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি! আপনি—"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই অন্ধকারের বুক চিরে এক শক্ত, ইস্পাতের মতো চড় এসে আছড়ে পড়ল তৃধার বাম গালে!
চড়ের তীব্র আঘাতে তৃধা নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ছিটকে গিয়ে দরজার কাঠের কপাটের সাথে ধাক্কা খেল। গালে এক তীব্র জ্বলুনি, আর চোখের কোণ দিয়ে না চাইতেও দু-তিন ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল।
তৃধা চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল।কিছু কি হচ্ছে?হওয়ার তো কথা! কিন্তু না... কোনো ম্যাজিক হলো না! সে ২০২৫ সালের নিজের রুমে ফিরে গেল না। সে এখনো সেই ২০০৭ সালের বিষাণ সরকারের ঘরের দরজাতেই দাঁড়িয়ে আছে।
এই চরম হতাশার তার কান্না পাচ্ছে,তবে তার মাঝেই হুট করে তৃধার মাথায় একটা নতুন বোধদয় হলো।
সে আসলে কেন এসেছে এখানে? তাও আবার এই নন্দ্রিতার শরীরে? হুট করেই উপন্যাসের সেই লাইনগুলো তার মনে পড়ে গেল,যেখানে বিষাণের বিয়ের পর নন্দ্রিতা লোকটার জন্য কত চোখের জল ফেলেছিল, কীভাবে তিলে তিলে নিজেকে শেষ করেছিল। গল্পে ওসব পড়ার সময় তৃধার তেমন খারাপ লাগেনি, কিন্তু আজ নন্দ্রিতার শরীরের ভেতরে থেকে তার কষ্টটা তৃধা নিজের হাড়মাস দিয়ে টের পাচ্ছে! এই অহংকারী লোকটা বিয়ে করে এই মেয়েটার নিষ্পাপ মনের কী করুণ অবস্থা করেছিল!
তৃধা চোখের জল এক ঝটকায় মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বিষাণের দিকে এক বুক ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
"করব না! আমি আপনাকে আর কোনোদিন বিয়ের কথা বলব না! আপনি যেমন নিজের জন্য বেটার অপশন বেছে নেবেন, আমিও তাই করব! আপনার চেয়ে হাজার গুণ ভালো একটা ছেলেকে বিয়ে করব! আর এই নন্দ্রিতার জীবনটা আমি নিজের হাতে গুছিয়ে দিয়ে যাব! আপনি আফসোস করবেন বিষাণ ভাই... হ্যাঁ, কাহিনীর শেষ দিনে আপনি নিজের ভুলের জন্য ঠিকই আফসোস করবেন!"
তৃধা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে এক ছুটে অলিন্দ পেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেল।
বিষাণ ঘরের মাঝখানে পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটু আগে কী ঘটে গেল, কেন মেয়েটা এমন অদ্ভুত আচরণ করল, আর উপন্যাসের কোন শেষ দিনের কথা বলে গেল? কিসের উপন্যাস?তার কিছুই তার ক্ষুরধার মগজে ঢুকল না। এক অজানা অস্থিরতা আর রাগে তার হাত দুটো কাঁপতে লাগল। সে তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। দেশলাই কাঠি জ্বেলে সেটা ধরিয়ে, এক গভীর টানে নিজের ভেতরের সমস্ত রাগ, হতাশা আর বিভ্রান্তি ধোঁয়ার সাথে বাতাসে মিশিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু তার চোখের সামনে তখনো নন্দ্রিতার সেই কান্নাভেজা, অভিমানী চোখ দুটোই ভাসছিল।
—
তৃধার চোখের জল আর কিছুতেই বাধা মানছিল না। বালিশে মুখ গুঁজে সে এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার বড্ড বেশি কান্না পাচ্ছিল। সে কীভাবে নিজের মা-বাবার কাছে, নিজের দোহারের বাড়িতে ফিরে যাবে? কেন তাকে এই অচেনা জায়গায় টেনে আনা হলো? এই উপন্যাসের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি মোড় তো লেখিকা আগেই লিখে রেখেছেন; তাহলে তার মতো একটা জলজ্যান্ত মেয়েকে এখানে এনে ফেলার মানে কী? তাকে কি এখানে কোনো কিছু প্রমাণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে? নাকি নন্দ্রিতার ভাগ্য বদলানোর কোনো অলৌকিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে?
নিজের বাম গালে হাত দিতেই তৃধা টের পেল জায়গাটা একদম তপ্ত হয়ে আছে। রাগে-অভিমানে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল,
*লোকটা কতটা বেয়াদব হলে একটা মেয়ের গায়ে এত জোরে হাত তুলতে পারে! একটুও কি মায়া-দয়া নেই ওনার বুকে? কালকে ওভাবে ধাক্কা দিয়ে কনুইটা ছিলে দিল, কানের লতি টেনে ধরল, আর এখন দিল এই রাক্ষুসে চড়! একবার অন্তত মানুষের মতো মায়া দেখানো উচিত ছিল ওনার!*
সে বিছানায় উঠে বসে চোখ দুটো মুছে নিল। তাকে যেভাবেই হোক নিজের সময়ে যেতেই হবে, কিন্তু তার আগে... হ্যাঁ, নন্দ্রিতার এই ছন্নছাড়া জীবনটা তাকে নিজের হাতে গুছিয়ে দিয়ে যেতে হবে। এই জেদটা এখন তার মনে জেঁকে বসেছে।
হুট করেই তৃধার মাথায় একটা প্রশ্ন খেলে গেল,উপন্যাসের মূল গল্পে নন্দ্রিতার শেষ পরিণতি আসলে কী হয়েছিল?
সে কপালে হাত দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভাবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না। আসলে গল্পের বইগুলোতে যা হয়,সাইড নায়িকাদের নিয়ে লেখিকারা বেশি পাতা খরচ করেন না। নন্দ্রিতা চরিত্রটা কেও কাহিনীর শুরুর দিকে শুধু ভিলেন বানানোর জন্য রাখা হয়েছিল, পরে হয়তো তাকে আর ওভাবে দেখানোই হয়নি। অনেক দিন আগে পড়া গল্প ওই জায়গাটা পড়া হয়েছে, তাই তৃধার মগজে আর কিছুই খোলসা হলো না। তবে তার আবছা মনে হতে লাগল, নন্দ্রিতার সাথে শেষমেশ খারাপ কিছু একটা ঘটেছিল... কিন্তু সেটা ঠিক কী, তা পুরোপুরি ভুলে গেছে সে।
শেষে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃধা বিছানায় গা এলিয়ে দিল। শুতেই টের পেল, ভাদ্র মাসের এই গুমোট গরমে তার পুরো শরীর ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে। ঘরের ওপরের কাঠের কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে সে হাঁসফাঁস করতে লাগল।
তার আরও বেশি অবাক আর কষ্ট লাগছিল এই ভেবে যে, এই বাড়ির মহিলারা চব্বিশ ঘণ্টা সুতির শাড়ি গায়ে জড়িয়ে কীভাবে এই নরক গুলজার গরমে দিব্যি ঘুরে বেড়ায়! ভাবলেই তৃধার নিজের গায়ের তাপমাত্রা আরও দশ ডিগ্রি বেড়ে যাচ্ছিল। দোহারে নিজের রুমে থাকলে এই গরমে সে সবসময় একটা পাতলা সুতির গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে থাকত। নিজের রুম হওয়ায় সেখানে কোনো পর্দা প্রথার বালাই ছিল না, বেশ শান্তিতে থাকা যেত। আর এখানে? এই গুমোট গরমেও গায়ে জড়সড় করে থ্রি-পিস পরে ঘুমাতে হচ্ছে।
গরমে আর গালের জ্বালায় ঘুমাতেও পারছিল না সে। তার ওপর একটু আগে বিষাণকে ওভাবে হড়বড় করে যা যা শুনিয়ে এসেছে, তার জন্য এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল। যেভাবে সে ওনার পুরুষত্ব আর ফর্সা মেয়ের প্রতি দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দিয়েছে, তাতে এই অহংকারী জমিদার নন্দন যে তাকে আর সহজে রেহাই দেবে না, তা বলাই বাহুল্য। পরের বার সামনে পড়লে হয়তো ওনার চোখের আগুনে তৃধা নিজেই ভস্ম হয়ে যাবে!
ভেতরে ভেতরে এক চিলতে ভয় পেলেও তৃধা নিজের মনে মনে শক্ত প্রতিজ্ঞা করল,
*যতদিন না আমি এই নন্দ্রিতার জীবনের সব জট পাকা ঝামেলা ঠিক করতে পারছি, আর নিজের বাড়ি ফেরার পথ পাচ্ছি, ততদিন আমি ভুলেও আর ওই খাড়ুস, অসুর বিষাণ সরকারের ছায়াও মাড়াবো না! ওনার সামনে যাওয়া এক্কেবারে বন্ধ!*
বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আরও তীব্র হচ্ছিল, আর তৃধা গালে হাত দিয়ে এই গল্পের বুকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নতুন লড়াইয়ের ছক কষতে লাগল।
—
পরদিন সকাল সকাল তৃধার যখন ঘুম ভাঙল, তখন ঘরের বাইরে মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছিল। আকাশ মেঘলা থাকায় বেশ একটা গুমোট ভাব। বিছানা থেকে নামার সময় হালকা বাতাসে হুট করেই তার পিঠের ওপর মেলে থাকা চুলগুলো খুলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
তৃধা নিজের চুলের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো, চুলগুলো কী ভীষণ ঘন আর লম্বা! কোমর ছাপিয়ে নিচে নেমে গেছে। আর ২০২৫ সালের তার নিজের চুলের অবস্থা? ওসব কথা না বলাই ভালো! সেখানে চুল পড়ার চোটে চিরুনি ছোঁয়ালেই মনে হতো মাথায় আর কোনো চুলই অবশিষ্ট থাকবে না। আর এদিকে নন্দ্রিতার চুলগুলো যেন রেশমি সুতোর গোছা। সে বিরক্তি নিয়ে গল্পের কথা মনে করলো,ওই ওইখানে এই কথা লিখে ছিল না! লেখিকারা সব সময় নায়িকার ভূমিকায় এত কিছু রাখে, এদের বেলায় কিছুই না!
সে নিজের দুই হাত দিয়ে টেনে টেনে মাথার সবটুকু চুল এক করে এক্কেবারে চাঁদির ওপর উঁচিয়ে একটা জম্পেশ খোঁপা করে ফেলল। খোঁপাটা বেশ উঁচুতে আর আলগা হয়ে রইল।
ঠিক তখনই আচমকা তার মাথার চুলে এক তীব্র টান অনুভব হলো। কে যেন পেছন থেকে শক্ত করে তার খোঁপাটা টেনে ধরেছে! ব্যথায় আর ভয়ে তৃধা একটা চিৎকার দিতে যাবে, অমনি পেছন থেকে এক রাশভারী প্রবীণ নারী কণ্ঠ ধমকের সুরে বলে উঠল,
"বিবির খোঁপা ঘাড়ো, বাঁদির খোঁপা কাড়ো!কতবার কইছি?"
তৃধা ধড়ফড় করে ঘুরে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক বয়োবৃদ্ধ মহিলা। পরনে চওড়া পাড়ের সুতি শাড়ি, কাঁচা-পাকা চুল আর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আভিজাত্যের ছাপ। মহিলাটি তৃধার আলগা খোঁপাটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
"মাথায় তেল না দিয়া আমনে এমন পাগলের মতো ঘুরতাছেন ক্যা? জিনে ধরা রোগীর মতো দেখা যাইতাছে! যা, নিচে যা। তর বড় চাচির ঘরে গিয়া কামে সাহায্য কর।"
তৃধা অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। বুঝতে বাকি রইল না যে ইনিই এই সরকার বাড়ির আসল চালিকাশক্তি, দাদি নাছিমা সরকার! দাদুর একমাত্র প্রতাপশালী ঘরণী।
মহিলাটির এই চুলে টান দেওয়া আর ধমকানোর ভঙ্গিটা দেখামাত্রই তৃধার বুকের ভেতরটা হু হু করে কেঁপে উঠল। তার নিজের দাদিও ঠিক এই কাজটাই করতেন! মাথায় তেল না দিলে ওভাবে বকা দিতেন, আর চুল উঁচিয়ে বাঁধলেই খপ করে টেনে ধরে প্রবাদ আওড়াতেন। চিরচেনা দাদির কথা মনে পড়তেই তৃধার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। এই অচেনা অতীতে এসে এই প্রথম তার কাউকে বড্ড আপন মনে হলো।
সে আর কোনো বাছবিচার না করে, নিজের ভেতরের সবটুকু আবেগ নিয়ে হুট করেই দাদি নাছিমা সরকারকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
নাছিমা সরকার এমন আকস্মিক কাণ্ডে চরম অবাক হয়ে গেলেন। ওনার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। তবুও তিনি তৃধাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন না, শুধু স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
তৃধা ওনাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করল, "আপনার কোমরের ব্যথাটা এখন একটু কমেছে?"
নাছিমা সরকার এবার ওনার কুঁচকে থাকা চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে নাতনির দিকে তাকালেন। কাল থেকে এই মেয়ের নানারকম পাগলামির কথা ওনার কানেও গেছে, কিন্তু ওনার শারীরিক কষ্টের খোঁজ নেওয়ার মানুষ এ বাড়িতে কমই আছে। ওনার চোখের কঠোর ভাবটা একটু নরম হলো। তিনি নিচু স্বরে বললেন,
"হ, এখন ঠিক ওই আছে। ব্যথাটা একটু কম।"
তারপর দাদি তৃধার চুলে হাত দিয়ে হালকা একটা স্নেহের টান দিয়ে শুধালেন,
"সকাল থেইকা কিছু খাস নাই?"
তৃধা বাচ্চার মতো মুখ করে মাথা দুদিকে নেড়ে জানাল,না, সে কিছুই খায়নি।
বৃদ্ধা এবার নিজের কপালে একটা মৃদু করাঘাত করে কৃত্রিম রাগের সুরে বললেন,
"আয় আমার লগে! কত বেলা হইলো, এখন ও এই মাইয়া না খাইয়া টইটই করতাছে। তর পেটে কি খিদা-তিষ্ণাও নাই?"
কথাটা শুনে তৃধার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলো, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। কিন্তু ওনার এই চড়া গলার পেছনের খাঁটি মায়াটা টের পেয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে চওড়া হাসি ফুটিয়ে সে দাদির পিছু পিছু নিচে নামতে লাগল।
—
খাওয়া শেষ করে তৃধা একটু শান্তিতে নিজের রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই সামনে এসে দাঁড়াল রিধিকা সরকার(নন্দ্রিতার বড় ভাবি)। রিধিকা বেশ চড়া গলায় হুকুমের সুরে বলল,
"আজ বাড়িতে নদী থেকে অনেক মাছ এনেছে নন্দ্রিতা! শুধু শুধু ঘরে বসে না থেকে রান্নাঘরে এসে আমাদের একটু হাত লাগা।"
তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলল। মাছ? আর তা-ও আবার কাটতে হবে? তৃধা জীবনে কোনোদিন একটা জ্যান্ত তো দূরের কথা, মরা মাছের গায়েও হাত দেয়নি! সব তো বাজার থেকেই কেটেকুটে আনা হতো।
কিন্তু এই যৌথ পরিবারের কড়া নিয়ম এড়ানোর উপায় নেই। তৃধা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রান্নাঘরে পা রাখতেই তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। এত মাছ! হালিমা বেগম আর তাহেরা খাতুন বঁটি পেতে বসে পাহাড়সম মাছ কাটছেন। হালিমা বেগম তৃধাকে দেখেই একগাল হেসে বললেন,
"নন্দ্রিতা, ভালোই হইছে তুই আইছিস। দেখ, তোর কাকা তোর লাইগা কত মাছ ধইরা আনছে!"
তৃধা মনে মনে চরম বিরক্তি নিয়ে চোখ কপালে তুলল,কাকা আমার জন্য আর কিছু পেলো না? এত এত মাছ এনেছেন কাটার জন্য! সিরিয়াসলি?
কিছু বলার সাহস না পেয়ে তৃধা তাদের পাশে একটা পিঁড়ি টেনে বসে পড়ল ঠিকই, কিন্তু কী করবে কিচ্ছু বুঝতে পারল না। হালিমা বেগম একটা মস্ত বড় রুই মাছের পেট চিরে এক বিশাল ডিমের থোকা বের করে তৃধার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
"ধর মা, এভাবে হা কইরা তাকাইয়া আছিস ক্যা? পাত্রে রাখ।"
তৃধা কাঁপাকাঁপা হাতে সেই পিচ্ছিল, থলথলে ডিমের থোকাটা ধরে একটা পাত্রে রাখল। এর পরপরই একটা বড় মাছের টুকরো তার হাতে দিতেই হাতের তালুতে কাঁচা রক্ত লেগে গেল। মাছের ওই তীব্র আঁশটে গন্ধে তার পেটের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। রিধিকা তার দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, "হাঁ কইরা দাঁড়িয়ে না থেকে এগুলো কোটা শুরু কর নন্দ্রিতা!"
তৃধার এবার সত্যি সত্যি কান্না পেয়ে গেল। সে বঁটির সামনে অসহায় হয়ে বসে রইল। তার নিজের মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হতে লাগল, কেন মা তাকে কোনোদিন রান্নাবান্নার কাজ শেখাল না? আবার ভাবল, মায়েরই বা কী দোষ, সে নিজেই তো সারাজীবন ফাঁকি দিয়ে এসেছে! এখন এই অজপাড়াগাঁয়ে এসে কার কাছে কান্নাকাটি করবে সে?
ঠিক তখনই রিধিকা তার দিকে একটা চটের বস্তা এগিয়ে দিয়ে বলল,
"এই নাও, এইগুলো ধুয়ে বড় পাত্রে ঢালো।"
তৃধা আর বস্তার ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করল না। সে বস্তার মুখটা ধরে সামনের একটা বড় গামলায় উপুড় করে ঢালতেই,,, আ!!
বস্তার ভেতর থেকে কালো কালো, সাপের মতো দেখতে কয়েকটা দীর্ঘ প্রাণী 'সুস সুস' করে হিসহিস শব্দ করে চারদিকে লাফিয়ে উঠল!
তৃধার মনে হলো সে জীবন্ত কয়েকটা কালনাগিনী সাপ দেখে ফেলেছে। এক সেকেন্ডের জন্য তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেল। সে রান্নাঘর কাঁপিয়ে এক গগনবিদারী চিৎকার দিল," সাপ! বাঁচাও!"
মাছ কাটা ফেলে হালিমা বেগম আর রিধিকা চমকে উঠে দাঁড়ানোর আগেই তৃধা কোনোদিকে না তাকিয়ে এক অন্ধ দৌড় লাগাল। রান্নাঘরের বাইরে কে দাঁড়িয়ে আছে, তা দেখার মতো সময় বা মানসিকতা তার ছিল না। সে ঝড়ের গতিতে বের হতে গিয়েই সামনে থাকা এক শক্ত, পাথরের মতো চওড়া বুকের ওপর সজোরে আছড়ে পড়ল। ধাক্কার তীব্রতায় নিজে তো টাল সামলাতে পারলই না, উল্টো সামনের সেই বিশালদেহী লোকটাকেও জড়িয়ে ধরে একসাথে মেঝেতে উল্টে পড়ে গেল!
ভয়ে আর আতঙ্কে তৃধার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে জল ঝরছে। মাটিতে পড়ে গিয়ে সে যার ওপর পড়েছে, তার চেনা সুবাস আর গায়ের শক্ত বাঁধন টের পেয়ে চোখ মেলতেই দেখল,এ তো বিষাণ ভাই! এক সাপের হাত থেকে বাঁচতে এসে সে ডিরেক্ট আরেক বিষাক্ত অসুরের কোলের ওপর ল্যান্ড করেছে!
ভয়ে আর আতঙ্কে যখনই হাতটা মুখের সামনে ভুলে ধরলো,তখনই মাছের সেই উৎকট আঁশটে গন্ধ আর সাপের ভয় একসাথে মগজে আঘাত করায় তৃধার পেটের ভেতরের সমস্ত খাবার এক লহমায় উথলে উঠল। সে মুখ সামলানোর সুযোগটুকুও পেল না।
উবববক্!
সকাল সকাল খাওয়া সমস্ত নাস্তা এক নিমেষে উগরে গিয়ে পড়ল বিষাণের ধবধবে পরিষ্কার শার্টের বুকে!
পুরো চত্বর যেন এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। শিরিন পানি নিয়ে রুমে ঢুকতেই নিতেই আতঙ্কে দাড়িয়ে পড়ল।বিষাণ মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে আছে, আর তার বুকের ওপর বসে তৃধা তখনো হাঁপাচ্ছে। তার শার্টের অবস্থা দেখে বিষাণের মুখের ভাষা যেন হারিয়ে গেছে। সে কী বলবে, কীভাবে রিয়্যাক্ট করবে, কিছুই বুঝতে পারল না। তার মনের ভেতর তখন ইচ্ছে করছিল এই মেয়েকে তুলে আছাড় মারতে, কিংবা আরেকটা কড়া চড় কষাতে!
তৃধা ভয়ে তড়িৎবেগে তার ওপর থেকে উঠে এক কোণে অপরাধীর মতো হাত জোড় করে দাঁড়াল। বিষাণ উঠে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের দিকে তাকিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠলেন,
"আমাকে ঘৃণা করিস,আবার কিছু হলেই এখানেই উঠে পরিস,আসলে সমস্যা কি? নন্দ্রিতা?"
তৃধা আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। সে এবার বাচ্চার মতো মুখ বাঁকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। বিষাণ তার রাগ ভুলে ক্ষণিকের জন্য চুপ হয়ে গেল।
তৃধা নিজের কনুই দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ভাঙা, আদো-আদো গলায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আমি... আমি ইচ্ছা করে করিনি! ওখানে... রান্নাঘরে অনেকগুলো কালো কালো সাপ ছিল! আমি ভয়ে দৌড় দিয়েছি!" বলেই সে আবার জোরে কেঁদে উঠল।
বিষাণের এবার একটু অদ্ভুত লাগল। নন্দ্রিতাকে সে ছোটবেলা থেকে চেনে; এই মেয়ে অভিমান করলেও এভাবে সবার সামনে বাচ্চার মতো চিৎকার করে কোনোদিন কাঁদেনি। মেয়েটার এই অসহায় কান্না দেখে তার ভেতরের কঠিন মনটা কেমন যেন একটু নরম হলো। সে কিছুটা চিন্তিত ও নরম সুরে শুধাল, "সাপ কোথায়? বল আমায়।"
তৃধা ভয়ে এক লাফে গিয়ে বিষাণের চওড়া পিঠের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। তার শার্টের পেছনের কাপড় একটা আঙ্গুল দিয়ে হালকা ধরে রান্নাঘরের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করল। বিষাণ তার পেছনে লুকানো তৃধার এই কাণ্ড দেখে বিরক্ত হলো।
ততক্ষণে রিধিকা রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল,
"এটা কী করলি নন্দ্রিতা? তোর কাণ্ড দেখে মাছগুলো পুরো রান্নাঘরজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে! এভাবে কেউ ভয় পেয়ে দৌড়ায়?"
বিষাণ কিছু বলার আগেই তৃধা তার পিঠের আড়াল থেকে মুখ বের করে বলল,
"কেন দৌড়াব না? ওখানে যে সাপ ছিল! ওই যে ওই ব্যাগে!"
রিধিকা আকাশ থেকে পড়ল,
"কোথায় সাপ? তোর কি মাথা খারাপ হইছে? ওইগুলো তো মাছ!"
তৃধা কান্নার চোটে কথা বলতে পারছিল না, সে হিক্কা তুলতে তুলতে বলল,
"মিথ্যে বলছেন কেন? ওগুলো তো সাপের মতো দেখতে... আবার সাপের মতো সুস সুস শব্দ করছিল!"
রিধিকা এবার কপালে হাত দিয়ে বলল,
"বাইম মাছ তো ওমন সাপের মতোই গড়াগড়ি খায় আর শব্দ করে! এটা নতুন শুনেছিস নাকি? তোর না পছন্দের মাছ!"
তৃধা কান্নার মাঝেই ঘেন্নায় আর আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, "ইইউউউ...ভুলেও না! ওই জঘন্য সাপের মতো জিনিসগুলো মাছ?!"
এতক্ষণ বিষাণের মনে একটু মায়া জাগলেও, এবার তার রাগ সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। এক তো এই মেয়ে তার গায়ে বমি করে শার্টটা নষ্ট করেছে, তার ওপর এখন একটা সাধারণ মাছ দেখে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে! রাগের মাথায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিষাণ চট করে তৃধার গালে ঠাস করে আরেকটা চড় বসিয়ে দিল!
"চুপ কর একদম! বেয়াদব মেয়ে!" তার ধমকে তৃধার কান্না আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
কিন্তু বিষাণ রেগে আরও কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তৃধার পেট আবার গুলিয়ে উঠলো, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। চড়ের ধাক্কা, তীব্র ভয়, আর ভেতরের সেই অসহ্য অস্বস্তি তার শরীর আর সায় দিল না। সে চোখ দুটো উল্টে সোজা মেঝেতে ঢলে পড়ে গেল।
"নন্দ্রিতা!এই নন্দ্রিতা!
আম্মা, নন্দ্রিতার কি হইছে!" রিধিকা চিৎকার করে উঠল। শিরিন ও চেঁচিয়ে উঠলো,
“আফা!চাচি গো দেহেন কি হইছে!
বিষাণ সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল, সে আর এক মুহূর্তও না ভেবে অবলীলায় তৃধাকে নিজের দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে লুফে নিল। তার বুকের বমি বা নোংরার কথা তখন তার মাথাতেই রইল না।
মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির দাদু, দাদি, চাচা-চাচিরা সবাই ছুটে এলেন। তৃধাকে ধরাধরি করে নন্দ্রিতার ঘরের বিছানায় শোয়ানো হলো। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া হলো, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। শেষে বড় চাচা আজহার সরকার তড়িঘড়ি করে গ্রামের ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে এলেন।
ডাক্তার তৃধার কিছু পরীক্ষা করে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"ভয়ের কিছু নাই। মেয়েটার শরীর এমনিতেই খুব দুর্বল, তার ওপর প্রচণ্ড ভয় আর গ্যাস্ট্রিকের কারণে প্রেসার লো হয়ে গেছে। একটা ইনজেকশন দিয়ে দিলাম, কিছুক্ষণ ঘুমাক। জ্ঞান ফিরলে একটু ডাবের পানি আর স্যালাইন খাইয়ে দেবেন।"
বাড়ির সবাই তখন নন্দ্রিতার ঘরের চারপাশে চিন্তিত মুখে বসে রইল। কিন্তু তৃধাকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর বিষাণ আর এক সেকেন্ডের জন্যও সেই ঘরে থাকেনি। সে নিজের ঘরে গিয়ে শার্টটা বদলে, সোজা চলে এসেছে বাড়ির পেছনের নির্জন ঘাটে।
দুপুরের কড়া রোদ মাথার ওপর, অথচ বিষাণ একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়েই যাচ্ছে। কটা সিগারেট শেষ করেছে, তার নিজেরও কোনো হিসেব নেই। তার সমস্ত রাগ এখন গিয়ে পড়েছে নিজের ওপর।
—
তৃধা ড্রয়িংরুমের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। বাড়ির সবাই মিলে বেশ মনোযোগ দিয়ে টিভিতে খবর দেখছে। ২০০৭ সালের এই সময়ে মধ্যবিত্ত বা অবস্থাপন্ন পরিবারে সোফা, টেবিল আর টিভির মতো জিনিসপত্র সবই ঘরে ঘরে চলে এসেছে। তবে টিভি বলতে এখনকার মতো স্লিম এলইডি স্ক্রিন নয়, সেই পেছনের দিকে বাক্সওয়ালা রঙিন সিআরটি টিভি! চ্যানেল বলতেও বিটিভি আর হাতেগোনা কয়েকটা স্যাটেলাইট চ্যানেল।
এই গত দুই দিন ধরে তৃধা একদম শান্ত, চুপচাপ হয়ে আছে। বেশ একটা লক্ষ্মী মেয়ের মতো ভদ্র সেজে থাকার চেষ্টা করছে সে। অবশ্য বাস্তবে সে এতটুকুও ভদ্র নয়, কিন্তু এই অচেনা জায়গায় টিকে থাকতে হলে আর বিশেষ করে ওই খাড়ুস অসুরটাকে জ্বালিয়ে মারতে হলে এইটুকু অভিনয় তো করতেই হতো! তৃধার ওই অসুস্থ হওয়ার পর বাড়ির সবাই এখন তাকে চোখে হারায়। তাকে কেউ কোনো কাজ করতে দেয় না, সারাক্ষণ বেশ আদর-যত্নে রাখা হচ্ছে। ব্যাপারটা তৃধার বেশ ভালোই লাগছে।
আর বিষাণ ভাই? সে এই দুই দিনে কতবার সামনে পড়েছে, কিন্তু তৃধা তার দিকে একপলকও তাকায়নি। মনে মনে গজগজ করেছে,
*কী বিশাল সাহস লোকটার! কথায় কথায় এত জোরে জোরে থাপ্পড় মারে! আমি উনার সাথে আর কোনোদিন একটা কথাও বলব না, ব্যস!*
মনে মনে যখন সে অসুরের গুষ্টি উদ্ধার করছিল, ঠিক তখনই স্বয়ং অসুর ড্রয়িংরুমে এসে হাজির! বিষাণ ঘরে ঢুকেই সবার আগে তৃধার দিকে তাকাল। কিন্তু তৃধা আগেই প্রতিজ্ঞা করে রেখেছে, সে চট করে মুখ ঘুরিয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন টিভির ওই বোরিং খবরই এখন দুনিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস।
বিষাণ একটা সোফায় বসল, চোখ তার সামনের দিকে। তৃধার অবশ্য এই টিভি দেখতে একটুও ভালো লাগছিল না। ২০২৫ সালের হাই-টেক দুনিয়ায় বসে যে মেয়ে ল্যাপটপ আর ফোনে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের চমৎকার সব মুভি-সিরিজ দেখে অভ্যস্ত অভ্যস্ত, তার কাছে এই খবরের চ্যানেল কোনো খেলনার চেয়ে কম নয়।
তৃধার ঠিক পাশেই সোফার ওপর একটা কুশন রাখা ছিল। বিষাণ তৃধার অবহেলা টের পেয়েও বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
"নন্দ্রিতা, আমাকে ওই বালিশটা দে তো?"
তৃধা যেন কানে শুনতেই পায়নি,এমন একটা ভাব করে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সেখানে বসা বাড়ির সবাই তৃধার এই আচরণ খেয়াল করল, তবে ওই দিনের হুলস্থুল কাহিনী হওয়ার পর থেকে তাকে আর কেউ চট করে কিছু বলে না। বিষাণের মা তাহেরা বেগম পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃধার পেছন থেকে বালিশটা টেনে নিয়ে বিষাণের দিকে এগিয়ে দিলেন। বিষাণ বালিশটা নেওয়ার সময় রাগে দাঁত কিড়মিড় করল ঠিকই, কিন্তু তৃধা তাকে পাত্তাই দিল না।
সে সোজা বড় চাচি হালিমা খাতুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বেশ চড়া গলায় আবদারের সুরে ডাকল, "চাচি!"
হালিমা বেগম টিভির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পরম আদুরে গলায় বললেন,
"হুম, বল মা! কী হইছে?"
"আমি কিছু খাব।"
"রান্নাঘরে কত কী রাইখা আসছি, পিঠা আছে, মুড়ি আছে; যা গিয়ে খা।"
তৃধা নাক কুঁচকে বলল, "ধুর! ওসব ঘরের খাবার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।"
"তাহলে কী খাবি?"
"দোকানের কিছু।"
"তো খা গিয়ে।"
তৃধা এবার এক্কেবারে নিষ্পাপ, ইনোসেন্ট একটা ফেস বানিয়ে বলল,
"কিন্তু আমার কাছে তো একটা টাকাও নেই!"
সোফায় বসে থাকা বড় চাচা আজহার সরকার নন্দ্রিতার এই মিষ্টি চাতুরি দেখে হোহো করে হেসে উঠলেন। তিনি হেসে বললেন,
"কী বলো মা? সরকার বাড়ির রাজকন্যা দোকানে যাবে আর তার হাত ফাঁকা থাকবে? এটা কখনো হয়?"
বলেই তিনি সোফা থেকে বললেন, " আমার ওই আলনা থেকে পাঞ্জাবিটা এনে দে তো,না।"
তৃধা এক ছুটে গিয়ে পাঞ্জাবিটা এনে তার হাতে দিল। আজহার সরকার পকেট থেকে একটা চকচকে **পঞ্চাশ টাকার নোট** বের করে তৃধার হাতে দিলেন। ২০০৭ সালের বাজারে পঞ্চাশ টাকা মানে কিন্তু বেশ অনেকগুলো চকলেট আর চিপস কেনা সম্ভব! পাশে বসা বিষাণ চরম বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে তৃধার দিকে তাকাল,*একটা মেয়ে কীভাবে এত সহজে সবাইকে পটিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়!* তৃধা অবশ্য তার সেই জ্বলন্ত চাউনিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টাকাটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল শিরিনকে খুঁজতে। মনে মনে সে বেশ হাসল। সে এভাবে আব্বুর পকেট থেকে কত টাকা হাতিয়েছে, আজ এই ২০০৭ সালের যুগে এসেও সেই অভ্যাসের দারুণ সদ্ব্যবহার হলো!
বাইরে বের হতেই দেখল উঠোনে শিরিন একমনে কাজ করছে। তৃধার মনটা একটু খারাপ হলো। এই এতটুকু একটা মেয়ে সারা দিন এই বিশাল বাড়ির সব কাজ সামলায়, কী অদ্ভুত নিয়ম! তৃধা হনহন করে গিয়ে শিরিনের হাত ধরে টান দিল। বাড়ির অন্য কাজের মহিলারা অবাক হয়ে তাকালেও সরকার বাড়ির মেয়ের সামনে কিছু বলার সাহস পেল না।
কাজের মাঝখান থেকে তৃধা তাকে টেনে আনতেই শিরিন খুশিতে আত্মহারা হয়ে তৃধাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "আফা! আপনে কত ভালো! আমারে বকা থেইকা বাঁচাইলেন।"
তৃধা আলতো হাসল। তারপর মাথায় ওড়নাটা একটু টেনে দিয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে পা বাড়াল। বাইরে আসতেই শিরিন খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল, "আফা, আমি একটু খেলতে যাই?"
"কোথায় খেলবি?"
"ওই যে দেহেন, পাড়ার আপুরা গোল্লাছুট খেলতাছে!"
তৃধা তাকিয়ে দেখল, মাঠের এক কোণে তার বয়সী কিছু মেয়ে ধুলো উড়িয়ে খেলছে। কৌতূহল আর একাকীত্ব কাটাতে তৃধাও শিরিনের পিছু পিছু সেই খেলার মাঠের দিকে এগিয়ে গেল।
নন্দ্রিতাকে ওভাবে মাঠের দিকে আসতে দেখে খেলারত মেয়েগুলো একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল, তাদের খেলা যেন থমকে গেল। শিরিন দৌড়ে গিয়ে এক মেয়ের হাত ধরে বলল,
"নীলা আফা, আমিও খেলমু! আমারে নিবা?"
নীলা নামের মেয়েটি শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, "আচ্ছা খেল।"
তৃধা দূর থেকে তাদের হাবভাব দেখে সহজেই আন্দাজ করে নিল যে, আসল নন্দ্রিতা হয়তো ভীষন ঘরকুনো স্বভাবের ছিল, যার কারণে পাড়ার এই সাধারণ মেয়েগুলোর কেউই তাকে পছন্দ করে না। ভেবে তার নিজের মনেই একটা হাসি পেল। মেয়েগুলো আবার খেলা শুরু করতেই তৃধা আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে নীলার সামনে গিয়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল,
"আমিও খেলব! নিবে আমাকে তোমাদের সাথে?"
কথাটা শুনে মাঠের সবকটা মেয়ে একসাথে চরম অবাক হয়ে নন্দ্রিতার দিকে তাকাল। নীলা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে, একটু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
"সরকার বাড়ির মেয়েরাও এখন বাইরে এসে ধুলো খেলে নাকি?"
তৃধা তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে উঠল। তারপর বেশ আস্থার সাথে বলল,
"আগে খেলত না হয়তো, কিন্তু আজ, এখন থেকে খেলবে!"
নীলা নন্দ্রিতার মুখের এই অকৃত্রিম হাসি আর সহজ ব্যবহার দেখে আর না করতে পারল না। সে মাথা নেড়ে বলল, "ঠিক আছে, আয়!"
তৃধা এক বুক আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে তাদের দলে ঢুকে পড়ল। তৃধার মনে পড়ছে আগের কথা গুলো,ছোট থাকতে সেও খেলেছে এভাবে,তবে যখন হালকা বড় হয়েছে সব হারিয়ে গেছে ,কেউ এখন আর বাইরে বের হয় না,বর্তমানের বাচ্চাদের ছোট বেলার স্মৃতি বলতে কি আছে?ফোনের শর্ট ভিডিও,গেমস আর কি?তারা এভাবে বাইরে গোল্লাছুট খেলে নি,তারা সাতচারা খেলে নি,আরো কত খেলা কিন্তু তারা কিছুই পায়নি,তবে এত বছর পর তৃধা যখন আবার খেলার সুযোগ পেয়ে ছাড়ল না! গ্রামীণ মুক্ত বাতাসে পাড়ার মেয়েদের সাথে খেলতে খেলতে সে একদম মেতে উঠল। খেলার মাঝখানেই সে নীলা আর বাকিদের দিকে তাকিয়ে চওড়া হেসে বলে উঠল,
"আমি কিন্তু কালকেও খেলতে আসব, বলে রাখলাম!"
তার এই ছোট্ট সহজ সরল কথায় মেয়েগুলোর ততক্ষণে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।
খেলতে খেলতে কখন যে মাগরিবের আজান দিয়ে দিয়েছে, তৃধার বুঝলোই না! সবাইকে বিদায় দিয়ে যেতে যেতে আজান শেষ,অনেকটা অন্ধকার হয়ে গেছে,গেটের ভেতরে ঢুকে তৃধার আত্মায় পানি আসলো,
বাড়ির ভেতরে ঢুকে শান্তির নিশ্বাস নিতে গিয়েও পারলো না, তৃধা।চোখে পড়ল বিষানকে!
সে দিকে পাত্তা না দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই বিষান বলে উঠে,
“দাঁড়া!
চলবে...