ফন্ট সাইজ:
থিম:
শতাব্দী পেরিয়েও তুমি

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: জুঁই আক্তার

#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি

#পর্ব6
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫 কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
সকালে খাবার টেবিলে পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। তৃধার প্লেটে খাবার সাজানো, কিন্তু সে খাচ্ছে না বললেই চলে; আপন মনে কী যেন ভেবে চলেছে। ঠিক তখনই নীরবতা ভেঙে মফিজুর সরকার সবার মাঝখানে হঠাৎ বেশ গর্বিত গলায় বলে উঠলেন,
"এখন তো আমাদের নন্দ্রিতা বেশ ভালো হিসাব করতে পারে! ও তো এক নজরে খাতার সব ভুল ধরে ফেলে!"
কথাটা শুনে তৃধা সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে দাদুর দিকে তাকিয়ে এক গাল মিষ্টি হাসি দিল। যাক, অন্তত এই বাড়িতে একজন তো তার মেধার মূল্যায়ন করতে পারল!
কিন্তু সেই সুখ বেশিক্ষণ টিকল না। বিষাণ নিজের প্লেটে খাবার মাখাতে মাখাতে এক চিলতে বাঁকা হেসে বলে উঠল, 
"সাত-পাঁচ যোগ করতেই যার দিন কাবার হয়ে যায়, তাকে হিসাবের চতুর বলছ কীভাবে দাদু? তুমি বোধহয় একটু বেশিই বানিয়ে বলছ!"
তৃধা বিষাণের কথা শুনে চরম বিরক্তি নিয়ে ভাজ ফেলে মুখ বাঁকাল। এক পা এগিয়ে চড়া গলায় প্রতিবাদ করে বলল,
 "কী বললেন? কবে আমি সাত-পাঁচ যোগ করতে পারিনি, হ্যাঁ? বলুন তো শুনি! বানিয়ে বানিয়ে কথা বলবেন না একদম!"
বিষাণ মৃদু হেসে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, "তোকে তো ছোটবেলা থেকে আমিই পড়িয়েছি, ভুলে যাস না! পড়া না পারলে আমার হাতে কম থাপ্পড় আর বকা তো খাসনি। তাই তুই কতখানি 'জ্ঞানী' আর খাতার কত হিসাব বুঝিস, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে!"
তৃধা চোখ গোল গোল করে বিষাণের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বেয়াদব আর অসৌজন্যমূলক লোক! সে চট করে দাদুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে অভিযোগের সুর এনে বলল,
“দাদু! দেখুন না উনি কী বলছেন! আপনি তো নিজে দেখেছেন আমি হিসাবের খাতা কীভাবে ঠিক করে দিলাম!"
মফিজুর সরকার না হেসে পারলেন না। তিনি বিষাণের দিকে তাকিয়ে স্নেহের গলায় বললেন, "বিষাণ, অনেক হয়েছে রে! ছোট থাকতে ওকে পড়িয়েছিলিস ঠিক আছে, কিন্তু এখন আমার নাতনি বেশ ভালোই হিসাব সামলাতে পারে। আমি নিজে প্রমাণ পেয়েছি!"
বিষাণ আর কথা না বলে চুপ করে খাচ্ছে!তৃধার মন চাইছিল অসভ্য লোকটার মুখে এক গ্লাস জল ছিটিয়ে দিতে! রাগে গজগজ করে মনে মনে বলতে লাগল,*বেয়াদব লোক একটা! নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত মনে করে!*
টেবিলে বসা ইশতিয়াকও নন্দ্রিতা আর বিষাণের এই কাণ্ড দেখে হালকা হেসে উঠল। তারপর সে তৃধার দিকে নজর ফিরিয়ে স্বাভাবিক গলায় শুধাল,
 "তা তোর তো শুনলাম এখন পরীক্ষা চলছে! আজ কীসের পরীক্ষা তোর?"
ইশতিয়াকের প্রশ্নটা শোনামাত্র তৃধার মুখের খাবার মুখে পৌঁছানোর আগেই চামচ থেকে প্লেটে খসে পড়ল! তার পুরো শরীর এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,*‘পরীক্ষা?! নন্দ্রিতা কি স্কুলে পড়ত নাকি কলেজে? কোন ক্লাসে পড়ে এই মেয়ে? কীসের পরীক্ষা চলছে এর?!’*
তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলল। সে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে।মনে মনে ভাবল, 
‘কোথায় পড়ে ও? এখন কী বলব?’
ইশতিয়াক তাকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার জিজ্ঞেস করল, 
"কী হলো তোর? কী পরীক্ষা দিয়ে এলি আজ?"
তৃধা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর বেছে নিয়ে বলল, 
"বাংলা!"
"ওহ, বাংলা! তা তোর পরীক্ষা শেষ হচ্ছে কবে?"
তৃধা আবার ঢোক গিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো করে বলল, "এই তো... সামনেই শেষ হয়ে যাবে! কেন বলুন তো?"
ইশতিয়াক তৃপ্তির হাসি হেসে বলল,
 "ভাবছিলাম, পরীক্ষাটা শেষ হলে এবার ঢাকা যাওয়ার সময় তোকেও সাথে করে নিয়ে যাব।"
তৃধা চমকে উঠে চোখ কপালে তুলল, 
"এবার? মানে আপনারা ঢাকা যাচ্ছেন নাকি?"
"হ্যাঁ, কাজের জন্য আমি আর বিষাণ যাচ্ছি।"
তৃধা পাশে বসা বিষাণের দিকে একপলক ঠাণ্ডা চোখে তাকাল। তারপর একটু কৌতুহল আর সাবধানতার সাথে জিজ্ঞেস করল, 
"ওহ! তা কবে যাচ্ছেন আপনারা?"
"আজকেই বের হচ্ছি, খাওয়া শেষ করেই।"
"ওহ, আচ্ছা!"
কথাটা শোনামাত্র তৃধার ভেতরে যেন ঈদের আনন্দ নেমে এলো! বুকের ভেতরে বাসা বেঁধে থাকা ভারী পাথরটা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। তৃধা মুখে বেশ ভদ্রতার ভাব এনে ইশতিয়াককে জিজ্ঞেস করল, "তা আপনারা আবার কবে ফিরবেন?"
ইশতিয়াক হেসে বিষাণের দিকে তাকাল, বিষাণ অবশ্য চরম বিরক্তি নিয়ে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। ইশতিয়াক বলল, "এই তো, দুই-তিন দিন পরেই চলে আসব। কেন রে, খুব মিস করবি নাকি?"
তৃধা সেই দিকে পাত্তা না দিয়ে মনে মনে বিড় বিড় করে উঠলো,যাক বাবা, এই খাড়ুস অসুর আর তার স্যাঙ্গাত অবশেষে তিন-চার দিনের জন্য বিদায় হচ্ছে! তার মানে এই বিশাল জমিদার বাড়িতে এখন সে পুরো স্বাধীন রাজা! যেদিকে ইচ্ছা ঘুরবে, যা ইচ্ছা করবে,কাউকে জবাবদিহি করতে হবে না!
তার মন তখন খুশির জোয়ারে ভাসছে। অনেক দিন পর যেন তার জীবনে আসল শান্তি ফিরে এসেছে!
খুশি সামলাতে না পেরে মনের ভেতরের উল্লাসটা সে আর আটকে রাখতে পারল না। কিন্তু ডানা মেলে ওঠা আনন্দটা মনে মনে না থেকে অসাবধানতাবশত তার মুখ দিয়ে বেশ জোরেই বের হয়ে গেল,
**"তিন দিন শান্তিতে থাকতে পারব! ইয়েস!"**
মুহূর্তের মধ্যে পুরো খাবার টেবিলে এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো!
কথাটা মুখের বাইরে বেরোতেই তৃধার হুঁশ ফিরল,বুঝলো জোরেই বলে ফেলেছে। সে থমকে গিয়ে চোখ বড় বড় করে দেখল, টেবিলের প্রতিটি মানুষ,দাদু, বড় চাচা, চাচি পর্যন্ত খাওয়া থামিয়ে একদম হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে!
পরিস্থিতি সামাল দিতে তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলে দাঁত বের করে এক চিলতে বোকা হাসি দিল। তার সেই অদ্ভুত রূপ আর সত্যি কথাটা ভেতরের আবেগে বলে ফেলার ভাব দেখে বিষাণ বাদে পুরো টেবিলের সবাই হো হো করে হেসে উঠল!
ইসতিয়াক মুখ টিপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
বাড়ির বাকিরা তৃধার এই পাগলামিতে বেশ মজাই পেল, কিন্তু বিষাণ তার দিকে এমন এক খুনে চোখে তাকাল যেন দৃষ্টি দিয়েই তাকে ভস্ম করে দেবে! দিনে দিনে এই অদ্ভুত মেয়েটার ওপর বিষাণের বিরক্তির মাত্রা যে কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকছে, তা কেবল সে নিজেই জানে!
—
তৃধা নিজের পড়ার টেবিলে চুপচাপ বসে আছে। কান্না পাচ্ছে তার,মনে মনে চরম আক্ষেপে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,‘এই ২০২৫ সাল ছেড়ে অন্য কোনো যুগে এসেও আমার শান্তি নেই? এই ‘পড়াশোনা’ নামের অত্যাচারী শব্দটা দুনিয়ার সব জায়গায় কেন ঘাড়ের ওপর চেপে বসে থাকে? কেন?! এই পড়াশোনার চক্করে পড়ে কোনো দিন শান্তিই পাব না আমি!’
কিন্তু কান্না চেপে রেখে একটা চরম কঠিন বাস্তব সত্য তাকে ভাবিয়ে তুলল,পরীক্ষার কথা তো সবাইকে ঘটা করে ‘বাংলা’ বলল, কিন্তু পরীক্ষাটা দিতে কখন যেতে হবে, তা তো সে বিন্দুমাত্র জানে না! নন্দ্রিতার রুটিন কোথায়, এডমিট কার্ড কোথায়,কি পড়ে যাবে ওখানে?কিছুই তো তার জানা নেই!
তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলে নিচে নেমে এলো। বসার ঘরে হালিমা খাতুনকে অর্থাৎ তার চাচিকে দেখতে পেয়ে তার বুকটা দড়ফড় করে উঠল, গলাটা একদম শুকিয়ে কাঠ!
কী বলবে সে এখন? এখন যদি সরাসরি গিয়ে জিজ্ঞেস করে, "চাচি, আমার পরীক্ষা কখন?",তবে তো চাচি সোজা জুতো খুলে মারতে আসবেন! ভাববেন মেয়েটার নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়েছে!
তাও তৃধা সাহস সঞ্চয় করে কাঁপা গলায় ডেকে উঠল, "চাচি..."
হালিমা খাতুন হাতের কাজ করতে করতেই বললেন, "হুম, বল!"
"বলছিলাম... আমি পরীক্ষা দিতে যাব।"
"হ্যাঁ, জানি তো! তো?"
"তো কি পড়ে যাব?
“জামা পরে যাবি!জামা ধুয়ে রাখিসনি?
“না,রেখেছি!তবে... কখন যা—"
কথাটা শেষ করার আগেই হালিমা খাতুন তাড়াহুড়া করে তৃধার হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা ধরিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, "তাড়াতাড়ি যা! তোর ভাইয়েরা বের হওয়ার আগেই এটা দিয়ে আয়!"
তৃধা অবাক হয়ে শুধাল, 
"কার চা?"
"কেন, বিষাণের!"
তৃধার এবার সত্যিই কান্নাকাটি জুড়ে দিতে ইচ্ছে করছে! কই এসে পড়েছে সে! যত চায় শান্তি, ভাগ্য তাকে তত বেশি অশান্তির খাদের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজের মনেই বিড় বিড় করলো,* তৃধা, শান্ত হ! আজ তো অসুরটা চলেই যাবে। থাক, শেষবারের মতো এক কাপ চা দিয়ে আয়, এতে আর কীই-বা মহাভারত অশুদ্ধ হবে!’*
তৃধা চরম বিরক্তি মাখানো মুখে বিষাণের ঘরের দিকে পা বাড়াল। রুমের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধ দরজায় ধাক্কা না দিয়ে বাইরে থেকেই চেঁচিয়ে উঠল,
 "আমি আসব?"
ভেতর থেকে বিষাণের গম্ভীর গলা ভেসে এলো, "কেন?"
"চাচি চা পাঠিয়েছে!"
"নিয়ে আয় ভেতরে!"
তৃধা ভাবল সব ঠিকঠাকই আছে, তাই বেশ নিশ্চিন্ত মনে ঘরে ঢুকল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বিকট চিল-চিৎকার দিয়ে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলো,
"ছিঃ ছিঃ ছিঃ!"
বিষাণ ঘরের ভেতর থেকে বিরক্তি নিয়ে বলল,
 "কারণ ছাড়া এভাবে চেঁচাস কেন রে?"
তৃধা দরজার বাইরে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রেগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলে উঠল, 
"আপনি সব সময় এমন অর্ধনগ্ন হয়ে থাকেন কেন? লজ্জা-শরমে কি পুরোই ছাড় দিয়েছেন, নাকি কোনো দিন ছিলই না?"
বিষাণ বেশ নির্বিকার গলায় জবাব দিল, 
"না, ছিল না!"
তৃধা চোখ মুখ কুঁচকে বলল, 
"আপনার বউয়ের জিনিস আমাকে কেন দেখাচ্ছেন?"
"তুই কেন দেখছিস?"
"দেখালে দেখব না?"
"না! চোখে আঙুল দিয়ে বসে থাকবি!"
তৃধা মহা বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল, 
"আমি আপনার জন্য মন থেকে একদম খাঁটি দোয়া করলাম! বিষান ভাই!আল্লাহ, আপনাকে আপনার এই অনাবৃত জিনিসপত্রসহ শুধু দেশ থেকে নয়, পুরো পৃথিবী থেকেই উঠিয়ে নিক! বলুন, আমিন!"
"হয়েছে তোর? এখন নিজের চা নিয়ে আয়, টেবিলে রেখে যা।"
"নিজের চা নিজে এসে নিয়ে যান! আমি ভেতরে যাব না!"
"বাইরে দাঁড়িয়ে ড্রামা না করে টেবিলে রেখে চলে যা! তোকে ভেতরে ধরে রাখবে না কেউ!?"
"আমি যাব না, বললাম তো!"
বিষাণ এবার ধৈর্য হারিয়ে চড়া গলায় বলে উঠল, "চুপচাপ চা-টা টেবিলে রেখে বের হয়ে যা বলছি! তোর এই নাটকের চক্করে পড়ে আমার চা যদি ঠাণ্ডা হয়, তবে যাওয়ার আগে কিন্তু টেনে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে যাব!"
তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলল। লোকটা থাপ্পড় মারলে তো মারলই, সেটা বড় সমস্যা নয়; কিন্তু তার নিজের স্বভাবচরিত্র তো ভালো নয়! মানে... অসভ্য চোখজোড়া নিয়ে ওই দিকে তাকানো টা ঠিক হবে না, কখন কী দেখে ফেলে তার কোনো ঠিক আছে?
বাইরে দাঁড়িয়েই তৃধা বিষাণকে আবার ডাকল, 
"শুনুন, নিয়ে যান তো নিজের চা!"
দুই বার ডাকার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। কোনো উপায় না দেখে তৃধা ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল।
ঘরে পা রাখতেই চোখ পড়তে তৃধার আবার ঢোক গিলার উপক্রম হলো! লোকটা এখনো শার্ট বা অন্য কিছু গায়ে জড়ায়নি, মেঝেতে বসে আছে!মেঝেময় ছড়ানো তুলি, রঙের প্যালেট আর আর্ট পেপার। খালি গায়ে মেঝেতে বসে আছে বিষাণ। মুখে কামড়ে ধরা একটা চিত্রশিল্পের সরু তুলি! রোদে পোড়া হালকা তামাটে গায়ের রঙ, একবারে সাদা ও নয় আবার শ্যামলা ও নয়!কাঁধ থেকে নেমে আসা চওড়া বুক আর সুগঠিত পেশীবহুল শরীর যেন কোনো নিখুঁত ভাস্কর্যের মতো। বুকের ওপর সুক্ষ্ম রোমের রেখা আর মেদহীন পেটের সুবিন্যস্ত গঠন লোকটার। অবিন্যস্ত কালো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে, আর চোখের গভীর চাহনিতে এক ধরনের গম্ভীর, রাশভারী আভা।
দৃশ্যটা দেখে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই তৃধার চোখ আটকে গেল সেই অনাবৃত প্রশস্ত বুকের ওপর! মুহূর্তেই সচেতন হয়ে সে চট করে আঙুল দিয়ে নিজের দু’চোখ চেপে ধরে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
*‘চোখ সামলা তৃধা, প্লিজ! এটা আরেক জনের জামাই! তোকে নিজেরটা খুঁজতে হবে, পরের মালে চোখ দিবি না একদম!’*
বিষাণ মুখ না তুলে তৃধার এমন কাণ্ড দেখে শুধাল,
 "চোখে কী হয়েছে তোর?"
তৃধা এক লহমায় হাত নামিয়ে কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল, "কই, কিছু না তো!" তারপর চোখ দুটোকে জোর করে নিচের দিকে নামিয়ে রেখে বলল,
 "কী করছেন এগুলো?"
বিষাণ আঁকা শেষ করার আগেই আর্ট পেপার আর রঙের সরঞ্জামগুলো দ্রুত একটা ব্যাগের ভেতর গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, "কিছু না!"
তৃধা হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, "চা-টা নিন!"
বিষাণ চা হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর একদম স্বাভাবিক গলায় শুধাল,
 "তোর পরীক্ষা তো মনে হয় শুরু হয়ে যাবে এখনই, এখনো ঘরে কী করছিস?"
তৃধা দ্রুত মাথা নাড়ল। এটা তো জানতে পারলো,পরীক্ষা একটু পরই, চটজলদি বলল, 
"হ্যাঁ... আমি এখনই যাচ্ছি!”
—
তৃধা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেটের কাছে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। একটা বিশাল বড় ধাক্কা খেল সে,পরীক্ষা দিতে তো বের হলো, কিন্তু পরীক্ষাটা আসলে কোথায়? স্কুলটা কোথায় অবস্থিত, কোন রাস্তায় যেতে হয়, তার কিছুই তো সে চেনে না! এখন সে কী করবে?
সেখানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই ইশতিয়াক ঘর থেকে বের হয়ে এলো। গেটের সামনে তৃধাকে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু অবাক হয়েই বলে উঠল,
"কিরে নন্দ্রিতা, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? স্কুলে যাস না কেন?"
তৃধা একটা শুকনো ঢোক গিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
"ওই... আমার সাথে আরও কয়েকজন পরীক্ষা দিতে যাবে তো, তাই ওদের জন্য দাঁড়িয়ে আছি! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
"আমি সামনে বাজারে যাচ্ছি!"
"ওহ, আচ্ছা!"
ইশতিয়াক চলে যাওয়ার পর তৃধা আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে মনে মনে শিরিনকে খুব খুঁজল, কিন্তু মেয়েটা যেন আজ হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেছে! কোথায় যে হারিয়ে গেল!
"পরীক্ষা শেষ হলে যাস!"
হঠাৎ পেছন থেকে ভারী, গম্ভীর এক পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসতেই তৃধা চমকে উঠে অবাক হয়ে পেছনে তাকাল।
বিষাণ এসে বাইরে দাঁড়াতেই তৃধা চরম বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
"কী করব তাহলে?"
বিষাণ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
 "কেন দাঁড়িয়ে আছিস এখানে?"
তৃধার বিরক্তি আরও বেড়ে গেল। আসল সত্যিটা যদি এখন এদের কাছে প্রকাশ করে, তবে কেউ এক বর্ণও বিশ্বাস করবে না! উল্টো পাগল ভেবে সত্যি সত্যি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে। সে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তি নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে চাইল।
তৃধাকে হুট করে ঘুরতে দেখে বিষাণ শুধাল, 
"কী হলো? আবার ভেতরে কোথায় যাচ্ছিস?"
"বাড়িতে যাচ্ছি!"
"কেন?"
"কারণ আছে তাই!"
"কী কারণ?"
তৃধা এক চিলতে তেতো হাসি হেসে বলল,
 "বললেও তো আপনি বিশ্বাস করবেন না!"
বিষাণ তীব্র বিরক্ত হয়ে বলল,
 "বড্ড নাটক করিস তুই ইদানিং! সর সামনে থেকে, পথ ছাড়!"
তৃধার জেদ চেপে গেল, সে সরার বদলে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, 
"এত বড় রাস্তায় আমি কেন সরব? অন্য পাশ দিয়ে যান!"
বিষাণ ঠাণ্ডা গলায় বলল, 
"ঠিক আছে, সরবি না? তাহলে গাড়ির নিচে পড়ে মরে পড়ে থাক!"
কথাটা শুনেই তৃধা দ্রুত পেছনে তাকাতেই দেখল একটা গাড়ি স্টার্ট নিয়ে এগোচ্ছে! সে এক লাফে সরে দাঁড়িয়ে কোনোমতে নিজেকে রক্ষা করল। বিষাণ গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসতে যাবে, ঠিক তখনই তৃধা একদম অসহায় মুখ করে দৌড়ে এসে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে উপচে পড়া অসহায়ত্ব!
তৃধার এই আকস্মিক কাণ্ড আর চেহারা দেখে বিষাণের হঠাৎ হাসি পেলো, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর হয়ে রইল।
অন্য কোনো উপায় না পেয়ে তৃধা শেষমেশ চরম অনুনয়ের সুর এনে ডেকে উঠল,
"বিষাণ ভাই...!"
বিষাণ না দেখার ভান করে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, "কী?"
"একটু... একটু সাহায্য করবেন?"
"কীসের সাহায্য?"
"আমার স্কুলটা ঠিক কোথায়, একটু দয়া করে দেখিয়ে দেবেন?"
কথাটা শুনে বিষাণ যেন এক মুহূর্তের জন্য কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলল! এই মেয়ে বলে কী?! সে রেগে গিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই তৃধা তড়িঘড়ি করে বানিয়ে বানিয়ে বলে উঠল,
"মানে... একটু সাথে করে দিয়ে আসবেন? আসলে ওই স্কুলের রাস্তার মোড়ে একটা বিশাল বড় হিংস্র কুকুর বসে থাকে! আমার যে কী ভীষণ ভয় লাগে একা যেতে!"
বিষাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো,এই মেয়ের নাটক দিন দিন বেড়েই চলেছে।
তৃধার মন চাইছিল এই মুহূর্তে লোকটাকে ধরে দুটো পিটুনি দিতে! কিন্তু কী আর করা, হাতে কোনো উপায় নেই। এই ধবধবে মিথ্যা কথাটা না বললে এই ইহজীবনে কেউ তাকে স্কুলে নিয়ে যাবে না। আর নন্দ্রিতার চেনা জায়গাগুলোতে যাওয়া তার জন্য এখন খুবই জরুরি। কারণ, সে সত্যি জানতে চায়, নন্দ্রিতার পরীক্ষা দেওয়ার সময়ই তৃধা এসেছে?, নাকি তার সাথে অন্য মারাত্মক কিছু ঘটেছিল? এসব রহস্যের জট খুলতে হলে নন্দ্রিতার চেনা জায়গায় গুলোতে তাকে পৌঁছাতেই হবে!
তৃধাকে নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে দেখেই বিষাণ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
"ঠিক আছে, গাড়িতে ওঠ!"
তৃধা একটা স্বস্তির ঢোক গিলে গাড়ির পেছনের সিটে উঠে বসল। বিষাণ সামনে বসে গাড়ি চালাতে লাগল। মাত্র দুটো গলি পার হয়ে একটা রাস্তা পেরোতেই গাড়িটা আবার থেমে গেল।
তৃধা অবাক আর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাল। বিষাণ আয়না দিয়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলে উঠল,
"নাম! যা... দেখ, কোনো কুকুর নেই!"
তৃধার চোখ দুটো মুহূর্তে গোল গোল হয়ে গেল! এত তাড়াতাড়ি স্কুলে চলে এসেছে সে?! সে জানালা দিয়ে ভালো করে তাকিয়ে দেখল,সামনে বিশাল এক উঠান, অনেকগুলো ক্লাসরুমের সারি। কিন্তু সমস্যা হলো, সে কোন রুমে গিয়ে বসবে? কোনটা নন্দ্রিতার ক্লাস?
তৃধা বিষাণের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, "আপনি একটু ভেতরে নিয়ে চলুন না আমাকে!"
বিষাণ চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
 "নিজে যা!"
"প্লিজ, বিষাণ ভাই! একটু নিয়ে চলুন না সাথে করে!"
"কেন? চোখে দেখছিস না ওখানে তোর কাল্পনিক কোনো কুকুর বসে নেই?"
"আপনি নিয়ে চলুন বললাম তো! একটু ভেতরের পথটা দেখান!"
বিষাণ এবার কড়া গলায় বলল,
 "গাড়ি থেকে বের হ তৃধা! তোর পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে!"
তৃধার ভেতরে ভয় ঢুকলেও সে জেদ ধরে বসে রইল, "আপনি গাড়ি থেকে না বের হলে আমিও বের হচ্ছি না!"
বিষাণ বসার সিট ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। তার সত্যি ইচ্ছা করছে এই অদ্ভুত মেয়েটাকে ধরে শক্ত একটা আছাড় মারতে! একটা মেয়ে এত ত্যাঁদোড় আর তর্কবাগীশ কী করে হতে পারে?
তৃধা বিষাণের রাগী মুখ দেখে ভয়ে আরেকটা ঢোক গিলল। তারপর একদম মাসুম আর নিরীহ এক ‘ইনোসেন্ট’ ফেস বানিয়ে নরম গলায় বলল,
"আমি তো মানসিকভাবে একটু অসুস্থ বিষাণ ভাই... এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি! একটু সাহায্য করুন না আমার... প্লিজ!"
বিষাণ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, এই মেয়ে এত শত শত নাটকের প্যাঁচ শেখে কোত্থেকে?!
তৃধা এবার করুণ সুরে আবার ডেকে উঠল, "বিষাণ ভাই...!"
বিষাণ গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
 "হয়েছে! শুনছি! নাম এবার!"
তৃধার ঠোঁটের কোণে সাথে সাথে জয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে চটপট গাড়ি থেকে বের হয়ে দাঁড়াল, বিষাণও বিরক্তি নিয়ে গাড়ি থেকে নামল।
দুটো কদম হেঁটে বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই তৃধার চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো বড় নেমপ্লেটটার ওপর,
**‘রসুল্লাবাদ পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’**!
সীমানার ভেতরে দাঁড়িয়ে বিষাণ তৃধার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ গলায় বলে উঠল, 
"যাহ, এবার নিজের ক্লাসে যাহ!"
তৃধা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। শুকনো মুখে ঢোক গিলে বলল, 
"আমি তো... ভুলে গেছি!"
বিষাণ ভ্রূ কুঁচকে শুধাল, 
"কী?!"
"আমি নিজের ক্লাস রুম কোনটা... সেটাই ভুলে গেছি!"
বিষাণ এবার দাঁত কিড়মিড় করে বলল, 
"নন্দ্রিতা! আমার সাথে একদম ফাইজলামি করবি না!"
তৃধা আকুল হয়ে বলল,
 "সত্যি ভুলে গেছি! দয়া করে বিশ্বাস করুন আমাকে!"
বিষাণ এবার নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারল না। হুট করে ধমকে উঠে বলল,
"একটা থাপ্পড় দিয়ে তোর সব কটা দাঁত এক মুহূর্তে ফেলে দেব! বেয়াদব মেয়ে একটা! যাহ বলছি এখান থেকে!"
বিষাণের সিংহমার্কা ধমক শুনে তৃধা পুরো কেঁপে উঠল! ভয়ে নিজের দুটো ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরল সে। চকিতে তার চোখ দুটো নোনা জলে ঝাপসা হয়ে এলো।
তৃধারও বুক চিরে রাগ আর অভিমান বেরিয়ে এলো। সে চোখ মুছে চড়া গলায় বলে উঠল,
"আমি মিথ্যা বলতে যাব কেন আপনার সাথে, হ্যাঁ? দরকার নেই আপনার সাহায্য! চলে যান আপনি! আমি নিজেই নিজের পথ খুঁজে বের করে নেব!"
তৃধা অভিমানী ভঙ্গিতে নাক টেনে গটগট করে চলে যেতে চাইল। কিন্তু যেতেই বিষাণ পাশ থেকে দ্রুত হাত বাড়িয়ে তার ওড়নার এক প্রান্ত চেপে ধরল! হুট করে টানের চোটে তৃধা ব্যালেন্স সামলাতে না পেরে প্রায় প্লেইন ল্যান্ডিং করার মতো পড়তে যাচ্ছিল!
তৃধা ঝটকা মেরে নিজেকে সামলে নিয়ে রাগে গজগজ করে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
 "আমার ওড়না ছাড়ুন!"
বিষাণ চরম বিরক্তি নিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, "তোর ওড়না ধরে টান মারার কোনো শখ আমার নেই! কিন্তু আমাকে একটু বুঝিয়ে বল তো,একটা মানুষ নিজের স্কুলের ক্লাসরুম কী করে ভুলে যায়?!"
তৃধা অপরাধীর মতো চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক এই থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই পেছন থেকে একটা মেয়ের প্রাণবন্ত গলা ভেসে এলো,
"কিরে নন্দ্রিতা!"
তৃধা আর বিষাণ দুজনেই একসাথে পেছনের দিকে তাকাল। একটা মেয়ে তার দিকেই হেঁটে আসছে,নীলা!ঐদিন এই মেয়ের সাথেই তৃধা খেলে ছিল!
নীলা তৃধার কাছে এসে অবাক হয়ে বলল, 
"পরীক্ষা তো শুরু হয়ে গেছে রে! তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি চল!"
নীলাকে দেখে তৃধার মুখের মেঘ কেটে মুহূর্তে রোদ উঠে এলো! অবশেষে এই গোলকধাঁধা থেকে বাঁচার একটা রাস্তা পাওয়া গেছে! তৃধা নীলার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির হাসি দিল। যাক, অন্তত ক্লাসে তো পৌঁছানো যাবে!
সে বিষাণের দিকে তাকিয়ে হালকা মুখে বলে উঠল, "আমি যাচ্ছি! আপনি এবার যেতে পারেন!"
তৃধা নীলার সাথে দৌড়ে ভেতরের দিকে চলে যেতে লাগল। কিন্তু কিছুটা দূর যাওয়ার পর, কী ভেবে সে হুট করে থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাল। দেখল, বিষাণ এখনো সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে।
না চাইলেও তৃধার বুক চিরে অবাধ্য মুখ দিয়ে কথাটা বের হয়ে এলো,
"এখানে আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ!"
তৃধা আর এক মুহূর্তও পেছনে তাকাল না, সোজা দৌড়ে স্কুলের করিডোর ধরে হারিয়ে গেল।
ওদিকে বিষাণ একা দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। মেয়েটার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। ধোঁয়ার রিং ছেড়ে একটা ধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
—
২দিন পর,,,
শোবার ঘরের এক কোণে নিথর হয়ে বসে আছে তৃধা। ওদিকে বসার ঘরের সোফায় বসে হালিমা খাতুন আর তাহেরা খাতুন,দুজন মিলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁদেই চলেছেন!
তৃধা বহু চেষ্টা করল চোখের কোণে একফোঁটা জল আনার, কিন্তু তার কিছুতেই কান্না এলো না। ব্যর্থ চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে সে মনোযোগ দিল টিভির পর্দায়। সেখানে তখন শাকিব খানের কোনো এক ধুন্ধুমার অ্যাকশন মুভি চলছে; অবশ্য ছবির নাম তৃধার জানা নেই। স্ক্রিনে দেখা গেল, গুন্ডারা শাকিব খানকে একটা ধাক্কা দিতেই তিনি হাওয়ায় ভেসে পর পর তিনবার ডিগবাজি খেয়ে ধপাস করে মাটিতে আছড়ে পড়লেন! মুখ থেকে লাল রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে!
দৃশ্যটা দেখে তৃধার নিজের মুখ চেপে ধরে হাসি আটকানোর তীব্র চেষ্টা চালাতে হলো।
ঠিক তখনই হালিমা খাতুন আঁচল দিয়ে চোখ-মুখ মুছতে মুছতে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, 
"আহারে বেচারা! কী কপাল গো... কত রক্ত পড়তাছে শরীর দিয়ে!"
তৃধা বিস্ময় নিয়ে চোখ দুটো গোল গোল করে চাচির দিকে তাকাল। মনে মনে বলল,‘হায়রে মহিলা সমাজ! সাধারণ একটা বি-গ্রেড মুভি দেখে কেঁদে-কেটে চেহারার কী ছিরি করেছে! টিভির স্ক্রিনে একটু ভুয়ো রক্ত দেখেই যদি এদের এই হাল হয়, তবে বাস্তবে যখন সত্যি সত্যি কোনো বিপদ হলে যে এরা কী করবে আল্লাহ-ই জানে!আর এই গল্প তো রক্তেরই খেলা!তখন চাচীরা কি করবে?’
নাটকীয় এই কান্নাকাটির দৃশ্য আর সহ্য হলো না তৃধার। সে হালিমা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, 
"চাচি, অনেক হয়েছে তো! আর কত কাঁদবেন একটা সামান্য সিনেমা দেখে?"
হালিমা খাতুন টিভির দিকে আঙুল উঁচিয়ে বুক চাপড়ে বললেন,
 "দেখ মা, দেখ! কীভাবে তাজা রক্ত পড়তাছে ছেলেটার মুখ দিয়ে!"
তৃধা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ঠোঁট টিপে হেসে বলে উঠল,
 "আরে চাচি, এগুলো কোনো রক্ত-ফক্ত নয়! এগুলো স্রেফ কৃত্রিম লাল রঙ!"
হালিমা খাতুন নাক টেনে অবাক হয়ে বললেন, 
"যাহ! মানুষ কি আর মুখের ভেতর রঙ ঢালে নাকি রে?"
তৃধা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, 
"আরে ধুর! রঙ না হলেও ওইগুলো টমেটো সস! তারা অভিনয়ের মাঝখানে সস মুখে পুরে অ্যাক্টিং করে, আর শট শেষ হলে চেটেপুটে খেয়ে ফেলে!"
তৃধার এমন উক্তি শুনে থমথমে কান্নার পরিবেশটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। হালিমা খাতুন আর তাহেরা খাতুন নিজেদের কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়েই ফিক করে হেসে ফেললেন।
তবে সেই হাসির স্থায়িত্ব হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তাহেরা খাতুন পর মুহূর্তেই মুখে চরম বিরক্তি ফুটিয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গজগজ করে উঠলেন, "এই সব নষ্টের মূল হলো ওই ডাইনি সাইড নায়িকাটা! সাইড নাইকার কুচক্রের কারণেই আজ মূল নায়ক-নায়িকার এমন দশা হইছে! নইলে হেগো কত সুন্দর ভালোবাসার সংসার হইতো!"
কথাটা শোনামাত্র তৃধার রগ চটে গেল! সব কিছুতেই সাইড নায়িকার দোষ দেওয়াটা কোন ধরনের মেন্টালিটি? সে তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে চড়া গলায় বলে উঠল,
 "সাইড নায়িকার কী দোষ, হ্যাঁ? যত দোষ তো সব ওই ঢং-মার্কা নায়কের! সে কেন আগেভাগে সাইড নায়িকাকে স্পষ্ট করে 'না' বলে দেয় না? প্রথমে নিজে যেয়ে আশা দেখাবে, উস্কানি দেবে, আর গল্পের শেষ দিকে এসে যখন অন্যজনকে বেছে নেবে, তখন ওরা একটু রাগ দেখালেই অমনি ওরা ভিলেন?!"
তাহেরা খাতুন মুখ বাঁকিয়ে বললেন, 
"যাই বলিস , এই অলক্ষ্মী সাইড নাইকাডা মরলে তবেই আমার কলিজায় শান্তি লাগবো!"
তৃধার রাগ এবার মাথায় চড়ে বসল। সে গা ঝাড়া দিয়ে শক্ত গলায় বলল,
 "সাইড নায়িকা কেন মরতে যাবে, শুনি?! সে-ও তো গল্পের একটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্যারেক্টার! সাইড নায়িকারা কি জন্মগতভাবেই খারাপ হয় নাকি? মাঝে মাঝে তারাও তো ভালো হতে পারে! তাদের কি নিজের একটা মন বা পছন্দ থাকতে নেই? তাদের কি ভালোবাসার অধিকার নেই?!"
তাহেরা খাতুন আর হালিমা খাতুন হাঁ করে তৃধার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা একটা সামান্য ছবির চরিত্র নিয়ে এত চটে যাচ্ছে কেন? কীসব আবোল-তাবোল বকছে!
তৃধার মেজাজ পুরো বিগড়ে গেল। সে এক ঝটকায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,আর দেখবে না এই ছাইপাশ টিভি!
সে ওখান থেকে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই তার মনের গহীনে এক বিজলীর মতো চিন্তা খেলে গেল,‘সাইড নায়িকাদের বাস্তবেও কেউ পাত্তা দেয় না। অথচ মূল গল্পে তো এই সাইড ক্যারেক্টার... অর্থাৎ নন্দ্রিতাই শেষমেশ মরে যায়!’
কথাটা কোনো চিন্তা করার আগেই তৃধার অবাধ্য মুখ দিয়ে আচমকা বিড়বিড় করে বেরিয়ে এলো। আর বলার সাথে সাথেই সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল!
কী বলল সে মাত্র?! নন্দ্রিতার পরিণতি আসলে কী?হুট করেই গল্পের ওই অংশ মাথায় আসে যেখানে নন্দ্রিতাকে মেরে ফেলা হয়! ভয়ে দেয়ালের সাথে লেগে যায় তৃধা। এই গল্পে তার পরিণতি অনেক ভয়ঙ্কর হয়!
জোরে জোরে শ্বাস নিলো সে, কিন্তু বুকের ধুকপুকানি থামছে না। নিজেকে শান্ত করার জন্য মনে মনে বলে উঠে,
 'কিচ্ছু হবে না, গল্প শুরু হওয়ার আগেই আমি বেরিয়ে যাবো এখান থেকে, ইনশাআল্লাহ!’
তৃধা মনে করতে শুরু করে, গল্পের শুরুতে কী ছিল? মনে পড়ে না... মনে পড়ে না... 
তারপর মনে পড়ল! গল্পের প্রথম অংশ শুরু হয় চুলায় পাঁচ কেজি দুধ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া দিয়ে। এখনো তেমন কিছুই হয়নি!
শান্তির নিঃশ্বাস নিতে গিয়েই হুট করে কানে আসে রান্নাঘর থেকে চিৎকার,
"চাচি গো, দুধডা পুইড়া ছাই!"
তৃধা যেন শ্বাস নিতেও ভুলে গেলো! ভয়ে কাপা ঠোঁট দুটো বিড় বিড় করে উঠলো,
“এত তাড়াতাড়ি কি করে শুরু হয়ে গেলো? এখন আমি কী করব?
চলবে ...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন