#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি
#পর্ব১৪
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
বিষান গভীর আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল তৃধার দিকে। তৃধার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে গুড়গুড় করে উঠল, সে সজোরে একটা শুকনো ঢোক গিলল!
মফিজুর সরকারও কঠোর মুখে ভ্রূ কুঁচকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই হালিমা খাতুন পাশ থেকে তৃধার হাত ধরে টেনে নিচু স্বরে ফিসফিস করে উঠলেন,
"এসব কথা মেয়েরা মুখে আনে না! চুপ কর!"
তৃধা ঝটকা মেরে হালিমার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর কিছু একটা বলতে উদ্যত হতেই মফিজুর সরকার বেশ গমগমে আর রাগী স্বরে বলে উঠলেন,
"পুরুষ মানুষ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, মহিলারা তখন মুখের ওপর কথা বলে না। এটাকে বেয়াদবি বলে!"
তৃধা নন্দ্রিতার মতো মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মেয়ে একেবারেই নয়! সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মফিজুর সরকারের চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট গলায় বলল, "আমাকে নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তাহলে আমার মতামত শুনতে আপনারা কেন থাকবেন না?"
হালিমা খাতুন এবার আরও ঘাবড়ে গিয়ে ফিসফিস করে টেনে নিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন,
"বড়দের আলোচনায় মেয়েরা এভাবে কথা বলে না! চল, ঘরে চল!"
"তাহলে কী বিষাণ ভাই একাই নিজেকে বিয়ে করবে? নাকি কোনো পাথরের সাথে উনার বিয়ে দেওয়া হবে,যে কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না?!",তৃধার তড়িৎ জবাব!
বিষাণ সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল। চোখ দুটো সামান্য ছোট করে নিঃশব্দে তৃধার নাটক দেখছে।
মফিজুর সরকারের ধৈর্য এবার সীমা ছাড়াল! তিনি কড়া গলায় গর্জে উঠলেন,
"বাড়ির মেয়েরা কোনোদিন নিজের বিয়ের বিষয়ে এভাবে তর্ক করতে আসে না! মুগ্ধের বোনের বিয়ের সাথে তোমার আর বিষাণের বিয়ের দিনক্ষণও পাকা করা হবে, এটাই আমার শেষ কথা..!"
কথাটা পুরো শেষ হওয়ার আগেই তৃধা হুট করে মুখ চেপে হু-হু করে কেঁদে উঠল! মফিজুর সরকার হতভম্ব হয়ে থামলেন, ঘরের বাকি সবাইও পরম বিস্ময়ে তৃধার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নিচে নামছিলেন দাদি নাসিমা সরকার।
তৃধা ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখ মোছার ভান করে একটু জোরেই নাক টানল।বিষান ভ্রু কুঁচকে তাকায়, বেশ ইন্টারেস্টিং কাহিনীটা!
এর মাঝেই তৃধা সোফায় গিয়ে একদম করুণ মুখে বসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে উঠল,
"ছোট বেলা থেকেই আমি অনেক একা!ছোটবেলা থেকেই তো মা-বাবাকে হারিয়ে একদম একা একা বড় হয়েছি, তাই না দাদু?! মা-বাবা বলতে তো এই সংসারে আপনারাই আমার সব..."
একটু থেমে, বুকের ভেতর উপচে পড়া হাহাকারের নাটক ফুটিয়ে তুলে সে আবার বলল,
"কিন্তু আমার নিজের মা-বাবা বেঁচে থাকলে কি এভাবে আমার অমতে জোড়াজুড়ি করে বিয়েটা চাপিয়ে দিত? দিত না! অন্তত একটা বার তো আমার মনের কথাটা জানতে চাইত, আমার মতামত নিত!"
ইশতিয়াক এতক্ষণ অবাক হয়ে সব দেখছিল। সে ভ্রূ কুঁচকে বলে উঠল,
"কিন্তু তুই নিজেই তো এতদিন বিষাণকে বিয়ে করার জন্য পাগল ছিলি! তুই চাইতি বলেই তো আমরা সবাই এতদূর উৎসাহ নিয়ে এগোচ্ছিলাম!"
তৃধা ওড়নার নিচে মুখটা একটু কুঁচকে নিল। রাগ উঠল ওই নন্দ্রিতার উপর,তার জন্যই সব ঝামেলা!গেছে তো গেছে,কি এক কথা বলে গেছে!তারপর তৃধা আবার ফুঁপিয়ে কান্নার ঢং করে বলল,
"হ্যাঁ, বলেছিলাম! তবে তখন আমি বোকা ছিলাম, বুঝতে পারিনি,ভুল বুঝেছিলাম!"
সে চোখ দুটো মুছে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আপনারা কি নিজের চোখে দেখেন না উনি কীভাবে অকারণে আমার গায়ে হাত তোলেন? বিয়ের আগেই যার এই হাল, বিয়ের পরের জীবনটার কথা একবার ভেবে দেখেছেন?"
বিষাণ সোফায় মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে তৃধার বিড়বিড়ানি শুনছিল, কিন্তু ‘গায়ে হাত তোলা’র কথা শুনতেই সোজা হয়ে বসে এক হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল!এই মেয়ের সমস্যা কি?বিয়ে করবে না ভালো কথা, গায়ে হাত তোলার কথা এখানে কেনো আনছে!
সোফায় বসা গুরুজনদের মুখগুলো থমথমে হয়ে গেল। তৃধা নিচু মুখে চোখের কোণ দিয়ে দেখল,তীর একদম সঠিক নিশানায় বিধেছে! কিন্তু তা সত্ত্বেও তার হাত-পা ভেতর থেকে থরথর করে কাঁপছিল। কাপবে নাই বা কেনো?হুট করে একটা ঝামেলা এসে পড়ে! আগে থেকে জানা থাকলে আরও ভালো করে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করে আসতাম! হুট করে কি এত নাটক সামলানো যায়?’
বিষাণ আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বসা থেকেই বাঘের মতো ধমকে উঠল,
"আমি তোকে অকারণে মারিনি!"
তৃধা মুহূর্তের মধ্যে আরও কাঁচুমাচু হয়ে ভয়ে ছোট হয়ে গেল।তাহেরা খাতুন এর বুকে যেন লুকিয়ে পড়ল,আর এমন একটা ভাব ধরলো যেন বিষাণের ধমকে তার আত্মাটা শুকিয়ে গেছে! এবার সে সত্যি সত্যি চোখ দিয়ে দু-ফোটা জল গড়িয়ে ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"দেখলেন চাচি? দেখলেন আপনারা কীভাবে আমাকে ধমকায়?! বিয়ের আগেই যদি এত রাগ আর ধমক সইতে হয়, পরে তো আমাকে মেরেই ফেলবে!”
তৃধা কাপা কাপা ঠোঁট এ বলে উঠে,
“আমার বড্ড ভয় লাগে…উনাকে দেখলে আমার বড্ড ভয় করে!"
বিষাণ তাজ্জব হয়ে গেল! এই মেয়ে কত বড় মিথ্যাবাদী আর ঝানু অভিনেত্রী! কাল রাতে ওকে পেটে ঘুষি মারল, আর আজ সবার সামনে ধোয়া তুলসী পাতা সেজে বলছে নাকি ওকে দেখলে ভয় পায়?!কত বড় মিথ্যেবাদী!
সে রাগে উন্মাদ হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল,
"তুই আমাকে ভয় পাস?! এত বড় মিথ্যা কথা তুই সবার সামনে বলছিস কেন, হ্যাঁ?! উত্তর দে আমাকে!"
ইশতিয়াক পরিস্থিতি সামলাতে বিষাণের হাতে একটা জোরে টান দিল, কিন্তু বিষাণের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে গর্জে উঠে বলল,
"কাল রাতে তুই যে কাজটা করলি, ওটা—"
বিষাণ বলতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে থেমে গেল। কারণ 'পেটে কিল খাওয়ার' কথা একটা মেয়ের বিরুদ্ধে এই বয়সে সবার সামনে বলাটা তার নিজের পৌরুষেই বাধল!এটা কি করে বলবে?
তৃধা মাথা নিচু করে রেখে বিষাণের দিকে একটা শয়তানি আর বিজয়ের হাসি ছুঁড়ে দিল। মনে মনে বলল, ‘বলুন! বলুন না সবার সামনে, একটা পুঁচকে মেয়ে আপনার পেটে কী সুন্দর ঘুষি বসিয়ে দিয়ে এসেছে!আরো দেবো,সময় বুঝে কুপ দেবো,ওয়েট করুন শুধু মিস্টার অসুর!’
বিষাণ রাগে রি রি করতে থাকা সত্ত্বেও চুপ হয়ে যেতেই, তৃধা চোখ মুছে আবার সেই মাসুম আর নিষ্পাপ চেহারা বানিয়ে বলল,
"বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তখন আপনারা কী করবেন? সারাজীবন আফসোস করবেন, তাই তো? আমি চাই না আমার জন্য আপনারা তিল তিল করে আফসোস করেন। কারণ ছোটবেলা থেকে কোল-পিঠে করে তো আপনারাই আমাকে বড় করেছেন। আপনাদের চোখের জল আমি কীভাবে সইব বলুন?"
বিষান কিছু বলার আগেই তৃধা আবার বলে উঠল,
আর উনি কি এসব বুঝবে? কারো কথা কি উনি জীবনে শুনেছে?যে বিয়ের পর শুনবে!শেষে আপনারা কষ্ট পাবেন দাদু!আমার আর কি হবে? এখন যেভাবে আছি সেভাবেই থাকতে হবে,-”একা!”
বিষাণ মুখ খিঁচিয়ে তাকিয়ে রইল। তাকে কেন্দ্র করে এত বড় মহাভারত ঘটে যাচ্ছে, আর সবাই এমনভাবে তৃধার নাটক শুনছে যেন বিষাণ এখানে সশরীরে উপস্থিতই নেই!
হালিমা খাতুন সস্নেহে তৃধার কাঁধে হাত রাখলেন। তৃধা ভেজা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি বিয়ে করব!"
কথাটা শুনে বিষাণসহ ঘরের সবাই আবার আকাশ থেকে পড়ল! এই মেয়ে না মাত্রই কান্না জুড়ল যে সে বিয়ে করবে না?!
আকবর সরকার কপালে ভাঁজ ফেলে শুধালেন, "মানে? কী বলতে চাইছিস তুই?"
একটু ভয় পাওয়ার ভান করে বলল,
"মানে হলো... এই বিষাণ ভাই বাদে, এই দুনিয়ার যেকোনো পুরুষ মানুষকে আপনারা এনে দেবেন, আমি চোখ বন্ধ করে তাকেই বিয়ে করে নেব! সে যদি একটা পাগলও হয়, তাও আমার চলবে! কিন্তু এই লোকটাকে না!"
তৃধার চোখ মুছে বলে উঠে,
“আমার উনাকে অনেক ভয় লাগে!”
বিষান এর বিশ্বাস হচ্ছে না!সে কি স্বপ্ন দেখছে?একটা মেয়ে এত নাটক কি করে?এটা কি আদৌ সম্ভব?
নাসিমা সরকার এতক্ষণ ধরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত হয়ে নাতনির সব কাণ্ড দেখছিলেন। তিনি ধীর পায়ে তৃধার সামনে এসে দাঁড়াতেই, তৃধা এক লাফে উঠে গিয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
তারপর অত্যন্ত মিনমিনিয়ে আকুতি করে বলল, "আমার নিজের আব্বা-আম্মা বেঁচে থাকলে নিশ্চিত আমাকে এমন রাগী আর বদমেজাজি লোকের হাতে তুলে দিতেন না! আমি জানি তারা আমার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনোদিন এমন কাজ করতেন না..."
তৃধা এবার দাদির কোল থেকে মুখ সরিয়ে উপস্থিত সবার দিকে করুণ চোখে তাকাল। তারপর চোখ জোড়া মুছে অনুশোচনার সুরে বলল,
"আমি জানি আজ আমি বড়দের সামনে অনেক বেয়াদবি আর অসভ্যতা করে ফেলেছি! কিন্তু দাদু, আমি যদি সত্যি কোনো খারাপ ব্যবহার করে থাকি, তবে আমাকে নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। আমি ইচ্ছে করে কিচ্ছু করিনি,বিশ্বাস করুন! আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন, আমি তাতেই রাজি,দাদু। আপনারা যেখানে বলবেন, আমি সেখানেই হাসিমুখে বিয়ে করে চলে যাব।হোক বিষান ভাই কিংবা,অন্য কেউ!আমার আগের সব কথা আপনারা ভুলে যান... নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে, তাই আমি আবেগে পড়ে এত কিছু বলে ফেলেছিলাম! আপনি ওইসব বাদ দিন দাদু, আমি আর কিচ্ছু বলব না..."
কথাগুলো শেষ করে তৃধা দাদির পেছনে গিয়ে এমনভাবে দাঁড়াল, যেন সে এক পরম অত্যাচারিত নিষ্পাপ হরিণী!
আর বিষাণ? সোফায় বসে বিষাণের মুখের এক্সপ্রেশন তখন দেখার মতো! তার ইচ্ছা করছে এখনই গিয়ে মেয়েটার ঘাড়টা এক মোচড়ে ভেঙে দিতে!এত নাটক কীভাবে করা যায়?দুনিয়া এত ধ্বংস কবে হলো?
তৃধা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। চট করে ঘুরে এক দৌড়ে নিজের রুমে ছুটে পালিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই মফিজুর সরকার গম্ভীর গলায় হাঁক দিলেন,
"দাঁড়াও!"
তৃধার পা দুটো যেন মেঝেতে জমে গেল! সে চুপচাপ থমকে দাঁড়াল, কিন্তু ভয়ে পেছনে ফিরল না।
দাদু একটা শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তাহলে সামনের রাহমিয়ার(মুগ্ধের বোন)বিয়েতে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে থেকো!"
তৃধার বুকের ভেতরটা দপ করে উঠল। ‘ লোকটা কি শেষ পর্যন্ত আমাকে এই অসুরের সাথেই গছিয়ে দেবে নাকি?!’
মফিজুর সরকার এবার খানিকটা জোরেই ডেকে উঠলেন,
"আর এদিকে আয় তুই!"
তৃধা না চাইতেও শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল। এখন আবার দাদু কী করতে যাচ্ছেন?! সে একরাশ অসহায়ত্ব মাখা চেহারা বানিয়ে দাদুর সামনে এসে দাঁড়াল।
দাদু সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তৃধার দিকে কৃত্রিম রাগী চোখে তাকিয়ে বললেন,
"তা... কেমন ছেলে বিয়ে করবি, সেটা না বলে পালাস কেন?"
তৃধা মহাবিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল,
"কী...?"
দাদু এবার হালকা হেসে বললেন,
"এখনো বুঝিসনি? ঠিক আছে, তা-ই যদি হয়, তবে কোনো বুড়ো লোকের সাথেই তোর বিয়ে দিয়ে দেব!"
তৃধা আতঙ্কে হাত-পা নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল,
"না, দাদু! না!"
"তাহলে এত রাগ করে চলে যাচ্ছিলি কেন, হ্যাঁ?"
তৃধা আশা-নিরাশার দোলাচলে কাঁপা গলায় শুধাল,
"তার মানে... তাহলে কি এই বিয়েটা ক্যানসেল?!"
মফিজুর সরকার তার সামনে এসে স্নেহভরে হেসে তৃধার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
"হ্যাঁ, ক্যানসেল!"
"যাক বাঁচা গেল! তাহলে এই অসুরকে আমার বিয়ে করতে হচ্ছে না!",তৃধার মুখ থেকে কথাটা ফস্কে বেরিয়ে গেল।
দাদু এবার কিছুটা রাগের ভান করে নাতনির দিকে তাকাতেই তৃধা খিলখিল করে হেসে ফেলল। তারপর কান ধরে মিষ্টি গলায় বলল,
"সরি দাদু, মানে... সরি বিষাণ ভাই!"
তৃধা খুশিতে একপ্রকার লাফিয়ে উঠে বলল,
"থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, দাদু!"
মফিজুর সরকার হেসে নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধালেন,
"তা আমার নন্দ্রিতা মায়ের কেমন বর পছন্দ, শুনি?"
তৃধা এবার একদম বিজয়ের আনন্দে ডগমগ হয়ে সোফায় সবার মাঝখানে এসে গুছিয়ে বসল।
এদিকে বিষাণ হা করে তাকিয়ে আছে! সে কি আদৌ এই বাড়ির একজন সদস্য নাকি পথচলতি কোনো অচেনা লোক?! বাড়ির কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, বিয়েতে তার আদৌ মত আছে কি না,সেটা পর্যন্ত কেউ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করল না!এই দিকে এই মেয়ের বরের চৌদ্দগুষ্ট উদ্ধার করে ফেলছে!
তৃধা এবার একটু লাজুক হাসির অভিনয় করে, কানের পাশ থেকে চুলগুলো পেছনে গুঁজে বলতে শুরু করল,
"বেশি কিছু না দাদু! ছেলেটাকে হ্যান্ডসাম হতে হবে, বড় বিজনেসম্যান হতে হবে, মনটা ভালো হতে হবে... আর সবথেকে বড় কথা হলো, সে যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঝুটঝামেলায় না থাকে!"
শেষ কথাটি বলেই তৃধা আড়চোখে বিষাণের দিকে একটা তীক্ষ্ণ ও ইঙ্গিতপূর্ণ নজর হানল, তারপরই মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ইশতিয়াক অবশ্য রাজনীতির সাথে যুক্ত, তাই সে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
"কীরে নন্দ্রিতা! তুই কি আমাকে অপমান করলি?!"
তৃধা একদম নির্দোষ ও না বোঝার ভান করে বলল,
"বা রে! আমি কাউকে অপমান করতে যাব কেন? আমি শুধু বললাম যে, আমি কম বয়সে জামাই হারিয়ে অকালে বিধবা হতে চাই না! তাই তো বললাম যে, রাজনীতি করা ছেলেদেরকে আমি বিয়ে করব না!"
কথা শুনে দাদু সহ সবাই হেসেই আকুল,
"ঠিক আছে, ঠিক আছে! আমার নন্দ্রিতা মায়ের জন্য একদম শান্ত-শিষ্ট ভালো ছেলেই খুঁজে বের করব!"
তৃধা এবার লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে বসলো। তাহেরা খাতুন আর হালিমা খাতুন হেঁসে এটা-ওটা জানতে চাইছে।
তৃধা মিটিমিটি হেসে বিষাণের দিকে তাকাল। বিষাণের বিরক্তি আর রাগে তখন মাথার রগ ফেটে যাওয়ার উপক্রম! প্রথমত তাকে কাঁচা ঘুম থেকে তুলে আনা হয়েছে, দ্বিতীয়ত এখানে এনে এত বড় একটা নাটকের নীরব দর্শক বানিয়ে রাখা হয়েছে! তাকে নিয়ে একের পর এক তোপ দাগা হলো, অথচ সে একটা কথা পর্যন্ত বলতে পারল না!
রাগে রি রি করলো তার শরীর,বিষাণ আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সোজা নিজের রুমের দিকে হেঁটে চলে গেল।
বিষাণের এই হাঁড়িপানা মুখ করে প্রস্থান দেখে তৃধার মনটা আনন্দে একশো গুণ ভালো হয়ে গেল!
—
বিষাণ আজ বেশ দেরি করেই রুম থেকে বের হলো। মাত্র ঘুম ভেঙেছে, হাতে টুথব্রাশটা নিয়ে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে হাঁটছে সে। কিন্তু রুম থেকে বের হতেই কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল,বাড়িতে প্রচুর মেহমান এসেছে আজ। মুগ্ধর বোনের বিয়ে উপলক্ষে কেনাকাটা থেকে শুরু করে আনুসঙ্গিক নানা আয়োজনের কথা বলতে আত্মীয়স্বজনদের এই আনাগোনা।
তবে মনে মনে একটা খটকা লাগল বিষাণের,বাচ্চাকাচ্চাগুলো কই? অন্যবার এরা এমন চিল্লাচিল্লি করে মাথা গরম করে যে, একবার বিষাণ এদের এমন ধমক দিয়েছিল যে দুটোর গায়ে জ্বর চলে এসেছিল! বাকিগুলো তো ভয়ে সামনেই আসত না। বিষাণ ঠোঁটের কোণে একটু বাঁকা হাসল,যাক, এই বিচ্ছুগুলোকে যে এবার আনেনি, তা একদিক থেকে ভালোই হয়েছে!
সে সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নিচে নামতেই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা মহিলাদের সালাম দিল। তারপর কুশল শুধাল, "কেমন আছেন আপনারা?"
বসে থাকা দুই মহিলা একসাথেই হেসে উঠলেন, "আছি তো ভালোই, বাবা। তুমি ভালো আছ তো?"
"ভালোই আছি, ফুফু! তা রাফিনরা আসেনি?"
"এসেছে তো!"
বিষাণ হালকা অবাক হয়ে বলল,
"ওহ! কোথায় ওরা?"
"ঐ যে, ওরা নন্দ্রিতার সাথে বাইরে গিয়ে কিসের যেন নাচা-নাচির প্র্যাকটিস করছে!"
বিষাণ শুনে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, তবে আর কিছু বাড়াল না। কথা শেষ করে হেঁটে চলে যেতে নিতেই তার বড় ফুফু জাবেদা বেগম পেছন থেকে বলে উঠলেন,
"তুই আর নন্দ্রিতা কিন্তু এক সপ্তাহ আগেই চলে আসিস, বুঝলি?"
কথাটা শেষ হতে না হতেই পেছনে বসে থাকা ছোট ফুফু রত্না বেগম তড়িঘড়ি করে জাবেদার হাতটা চেপে ধরলেন। সূক্ষ্ম এই কাণ্ডটা বিষাণের শ্যেনদৃষ্টি এড়ালো না! সে চোখ সরাল না, বরং স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মুখের বাঁকা হাসিটা যেন আরও খানিকটা চওড়া হয়ে উঠল।
রত্না বেগম অসস্তিতে হাতটা ছেড়ে দিতেই জাবেদা বেগম মাথা নিচু করে চট করে কথা ঘুরিয়ে বললেন, "ইয়ে... থাক, তুই একাই আসিস। নন্দ্রিতাকে বড় ভাই-ই গিয়ে দিয়ে আসবে!"
বিষাণ ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখেই বলে উঠল, "আমি থাকতে চাচা কেন অহেতুক কষ্ট করতে যাবেন? আমি নিজেই ওকে নিয়ে যাব!"
সামনে থাকা দুজনেই অস্বস্তির হাসি হাসল। বিষাণ মুখে আবার টুথব্রাশ পুরে ভেতরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবল,এই কারণেই মহিলাদেরকে তার একদম সহ্য হয় না! মুখে এক, আর পেটে আরেক জিলিপির প্যাঁচ! তবে এসব নিয়ে তার অবশ্য বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এরা এদের মতো প্যানপ্যান করুক!
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পেছনে যেতেই তার কানে এলো একঝাঁক বাচ্চার হইচই আর হাসির শব্দ। আরেকটু সামনে এগোতেই কারো চড়া ও সুর তোলা গলার গান কানে বাজল,
"আ রে প্রীতম পেয়ারে...
বন্দুক মে না তো গোলি মেরে...
আ রে প্রীতম পেয়ারে!
সব আগ তো মেরে কুর্তি মে রে...
জ্বরা হুক্কা উঠা, জ্বরা চিল্লাম জ্বালা!
পল্লু কে নিচে ছুপা কে রাখা হ্যায়...
উঠা দু তো হাঙ্গামা হো!
পল্লু কে নিচে দাবা কে রাখা হ্যায়...
উঠা দু তো হাঙ্গামা হো!"
বিষাণ সামনে গিয়ে যা দেখল, তাতে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! চারপাশে বাচ্চাগুলো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর মাঝখানে তৃধা উরাধুরা নাচের তাণ্ডব চালাচ্ছে! তার সেই অদ্ভুত নাচ দেখে বাচ্চারা খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ছে, আর সাথে তৃধাও গলা ছেড়ে হাসছে।
দৃশ্যটা দেখে না চাইতেও বিষাণের মুখের হাসিটা আরও একটু ছড়িয়ে গেল। তবে ভ্রু কুঁচকে ভাবলো,এটা কেমন গান?আগে তো সে শুনেনি!তৃধা পা ঘুরিয়ে গানের পরের লাইনটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই বিষাণ পেছনে এসে দাঁড়াল।
তৃধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চার দল বিষাণের ঐ যমদূত মার্কা চেহারা দেখেই এক চিৎকারে ভোঁ-দৌড় দিল বাড়ির দিকে! তৃধা নাচের তালে ঘোরা থামিয়ে ভয়ের চোটে পেছনে না তাকিয়েই ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,ভাবলো পিছে হয়তো কোনো কুকুর এসেছে!তারপর ভয়ে চুপ করে সোজা থমকে গেল।
বিষাণ মুখ থেকে কুলকুচি করে জল ফেলে ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
"থামলি কেন? নাচ তো বেশ ভালোই হচ্ছিল!"
কথাটা শোনামাত্র তৃধার অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম! সে পেছনে এক নজর তাকানোরও সাহস পেল না। তবে এখন যদি বাচ্চাগুলোর সামনে দৌড়ে পালায়, তবে ইজ্জত বলতে দুনিয়ায় আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না! সে সোজা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বিষাণও ভারী পা ফেলে তার ঠিক পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। তৃধা বুঝতে পেরে নিজের হাঁটার গতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল।
বিষাণ বিরক্ত হয়ে একটু কড়া গলায় শুধাল,
“ দাঁড়া!"
তৃধা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না! মান-সম্মানের মায়াকাড় ছেড়ে এবার সোজা এক দৌড়ে পালিয়ে ছুটল! দৌড়াতে দৌড়াতে মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
‘ইজ্জত যায় যাক, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! ওই যমের হাতে ধরা পড়া যাবে না!’
বিষাণ পেছনে দাঁড়িয়ে তৃধার এমন পাগলামি আর হাঁসজারুর মতো দৌড় দেখে না চাইতেও হাসলো!
তারপর বিড় বিড় করলো,
নিজের মতোই নিজের গ্যাং বানিয়েছে! বলদ একটা!
—
তৃধার মনে এক ফোঁটাও শান্তি নেই! সারা বাড়িতে এখন বিয়ের তোড়জোড় চলছে, সবাই ঘুরে ঘুরে কথা বলছে। মুগ্ধ ভাইয়ের বোনের বিয়ে,সেখানে বাড়ির সবাইকে যেতেই হবে।
হাঁটতে হাঁটতে তৃধার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। গল্পের এত কিছু বদলে দেওয়ার পর ও, কিন্তু মূল জটিলতাগুলো বদলাচ্ছে না কেন? গল্পে তো এই বিয়ের অংশে তেমন বিস্তারিত কিছু লেখা ছিল না, আসল ঝড় তো এখনো আসাই বাকি! এত নাটক, এত চেষ্টা,সবকিছুর পর কি সত্যি শেষ পর্যন্ত গল্পটা আগের সেই অন্ধকার পথেই হাঁটবে? কোনো কিছুই পুরোপুরি বদলাচ্ছে না কেন? সে কবে সব ঠিক করে নিজের চেনা জগতে, নিজের আসল বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে?
টেনশনের একশেষ সহ্য করতে না পেরে তৃধা তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাড়ির এই প্যানপ্যানানি আর থমথমে পরিবেশের চেয়ে স্কুলে যাওয়া হাজার গুণে ভালো! অন্তত সেখানে ওই অদ্ভুত আর চঞ্চল মেয়েটা আছে। কী যেন নাম মেয়েটার? হ্যাঁ, আবু! ওর সাথে কিছুক্ষণ পাগলামি করলেও তো মাথাটা একটু হালকা হবে।
রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার পথেই তৃধার চোখ গেল সামনের দিকে। হঠাৎই সে দেখে ফেলল সেই অপরিচিত ছেলেটিকে,যার সাথে অনেকদিন আগে দেখা হয়েছিল! ছেলেটাকে দেখা মাত্রই তৃধা না দেখার ভান করে একপ্রকার হনহন করে পা চালিয়ে সোজা স্কুলের দিকে চলে এলো!কে জানি কেনো এখানে দাঁড়িয়ে থাকে!
স্কুলের গেট পার হয়ে ভেতরে পা রাখতেই আবু দূর থেকে তৃধাকে দেখে একপ্রকার দৌড়ে এলো। তৃধা মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, আবু চরম খুশির ঠেলায় লাফাতে লাফাতে চেঁচিয়ে উঠলো!
তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে অতি আনন্দে বলে উঠল,
"নন্দ্রিতাহহ! তোর লাইগা একটা চিঠি আইছে!”
তৃধার অবাক হয়ে তাকায়,
“মানে?কিসের চিঠি?
চলবে....