ফন্ট সাইজ:
থিম:
শতাব্দী পেরিয়েও তুমি

১৫তম পর্ব

লেখক: জুঁই আক্তার

#শতাব্দী_পেরিয়েও_তুমি

#পর্ব১৫
#লেখিকা_জুঁই_আক্তার
(🚫🚫Trigger alert: প্রাপ্ত মন-মস্তকের জন্য🚫🚫)
(🚫🚫কপি করা নিষিদ্ধ 🚫🚫)
তৃধা চোখ জোড়া বড় বড় করে অবাক হয়ে তাকাল,
"মানে কী?! কিসের চিঠি?"
আবু একগাল হেসে মাথা নেড়ে বলল,
 "হ! চিঠি!"
"আরে ভাই, কিসের চিঠি খুলে বলবি তো?"
আবু এবার চোখ টিপে বাঁকা হাসি দিল,
 "আরে! বুঝিস নাই এখনো?"
তৃধা আবুর আরও একটু কাছে ঘেঁষে গেল। তারপর বেশ কৌতূহল নিয়ে তার কানে কানে ফিসফিস করে শুধাল, 
"কোনো ছেলে দিছে নাকি?"
আবু খুশিতে হেসেই একপ্রকার মাথা নাড়ল। কথাটা শুনতেই তৃধার মুখেও একটা শয়তানি হাসি ফুটে উঠল! দুজনে কী ভেবে যেন হঠাৎ একসাথেই খিলখিল করে হেসে উঠল।
তৃধা অতি আগ্রহে চিঠিটা হাত বাড়িয়ে আবুর কাছ থেকে নিয়ে স্কুলের বারান্দায় পা দুলিয়ে বসল, তার সাথে আবুও বেশ জাঁকিয়ে বসল। মনের ভেতরে তৃধার তখন আনন্দের ফানুস উড়ছে! আর আনন্দ হবেই না বা কেন?? জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে একটা আস্ত চিঠি পাঠিয়েছে! এই ২০২৫ সালের ডিজিটাল যুগে তো কেউ কাউকে ভুল করেও প্রেমপত্র লেখে না। আজকাল তো ফোনেই ভালোবাসার শুভসূচনা, আর ফোনেই এক ক্লিকে ব্রেকআপ হয়ে সব শেষ! কিন্তু হাতে লেখা চিঠির এই আমেজটাই একদম আলাদা!
ভাবতেই তৃধার নিজের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে লাগল। সে চিঠির ভাঁজ খুলতে খুলতে আবুর দিকে তাকিয়ে শুধাল, 
"তা... দিয়েছেটা কে বল তো?"
"আরে আমগো বাড়ির সামনে থাকে না আশিক ভাই? ঐ যে লম্বা কইরা, হেয় দিছে!"
তৃধা মুখটা হালকা ওপরের দিকে তুলে একটু ভেবে বলল, "আমি তো চিনি না!"
"ঐ যে একদিন যাওয়ার পথে তুই যারে বক ছিলি! ভুলে গেলি নাকি?"
"হুম! ভুলেই তো গেছি!"
"আচ্ছা সমস্যা নাই, সামনেরবার সামনে আইলে এক নজর দেখাইয়া দিমুনি!"
তৃধা মনে একরাশ কাব্যিক আশা নিয়ে মুচকি হেসে চিঠিটা খুলল। চিঠিটা খুব বড় সাইজের কোনো কাগজ নয়। সে ভেবেছিল ভেতরে কত শত ভালোবাসার গভীর অনুভূতির কথা লেখা থাকবে, কত সুশীল কাব্যিক লাইন থাকবে! কিন্তু চিঠিটার ওপর প্রথম নজর পড়তেই তৃধার মুখের সব মেকি হাসি নিমেষে উবে গেল!
চিঠির একদম শুরুতে বড় বড় অক্ষরে লেখা,
"আমার কলিজা নন্দ্রিতা!"
তৃধা শুকনো একটা ঢোক গিলল। কী আজব ভাই! আমি তো চিঠিটা এখনো এক্সেপ্টই করলাম না, আর উনি এখনই আমাকে 'কলিজা' বানিয়ে বসে আছেন?! প্রেমের আগেই এত আবেগ?
তৃধা বিরক্তি নিয়ে মনকে সান্ত্বনা দিল, ‘আচ্ছা ধুর, ওটা না হয় বাদই দিলাম! দেখি ভেতরে কী লিখেছে...’
চোখ একটু নিচে নামাতেই পরের লাইনগুলো দেখে তৃধার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! সেখানে গদ্য-পদ্যের এক অদ্ভুত ককটেল বানিয়ে লেখা,
"পান্তা ভাতে কাঁচা মরিচ,
গরম ভাতে ঘি,
তোমার লগে করমু প্রেম,
বাপ-মায়ের কী?!"
"আই লাভ ইউ কলিজা!"
তৃধা মুহূর্তের মধ্যে কথা বলার সমস্ত ভাষা হারিয়ে ফেলল! ভাইরে ভাই, এটা আবার কেমন ধাঁচের চিঠি?! প্রেম করবে করবে ভালো কথা, তা আবার বাপ-মাকে টেনে এনে ‘বাপ-মায়ের কী’ বলা কোন ধরনের রোমান্স?! আর কথায় কথায় এই 'কলিজা-কলিজা' ডাকের রহস্যটাই বা কী?!
চিঠির নিচে আবার পরম দরদ দিয়ে লেখা,
"নন্দ্রিতা, ঐ দেখো সামনের রাস্তা বন্ধ!
ঠিক এমন ভাবে আমিও তোমার প্রেমেতে অন্ধ!"
তারও একটু নিচে আবার অতি-আবেগে লেখা,
"আই লাভ ইউ সো সো মাচ, আমার সুন্দর কলিজা!
আই মিস ইউ! আই কিস..."
তৃধা আর ভুল করেও পরের শব্দটুকু পড়ার সাহস পেল না! পড়ার রুচি এক নিমেষে ষোলআনা শেষ হয়ে গেছে তার!
একরাশ চরম বিরক্তিতে কাগজটা ধুপধাপ ভাঁজ করতেই পেছনের পাতায় লেখাটা চোখে পড়ল,
"ইতি,
তোমার কলিজার ভালোবাসা!"
তৃধার এখন রাগে, দুঃখে নাকি চরম আফসোসে কান্না পাবে সে ভেবে পাচ্ছে না! ‘হে আল্লাহ! এটা কী ছিল?! একেই কি সমাজ চিঠি বলে আখ্যা দেয়?! আমি যে কত চিঠি পরীক্ষার হলে দিয়েছি,সেটা?ওই গুলো তাহলে কি?ছোট থেকে স্কুলে কি শিখেছি?থাক কিছু বললাম না,ছোট বেলা এটাই আমার আবেগ ছিল।তবে এই ছেলে খেয়ে দিলো ওটা!’তৃধা আর সময় নষ্ট করল না! চলে গেলো ক্লাসে,সাথে আবু ও দৌড়ে যায়।
—
তৃধা দুপুরের খাবার নিয়ে টেবিলে বসেছে। জীবনে শান্তির বড্ড অভাব! তার ওপর এই প্রচণ্ড গরমের কারণে শরীরেও একফোঁটা শান্তি নেই।
এখন এত গরমে গোসল করে লাভ কী, বলুন তো? গোসল করে উঠে গামছা দিয়ে গা মুছতে মুছতেই ঘামে আরেকবার গোসল হয়ে যায়! তার ওপর এই ভারী ভারী ওড়না, সালোয়ার, কামিজ,এগুলো পরে কি এই তীব্র গরমে বেঁচে থাকা সম্ভব?! একদম না!
খেতে খেতে তৃধার সত্যি সত্যি কান্না পেয়ে গেল। নিজের আসল বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে কী সুন্দর একটা ঢোলাঢালা গেঞ্জি পরে ফ্যানের নিচে আরামে শুয়ে থাকত! আর এখানে এসে কত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে!
তৃধা নাড়াচাড়া করতে করতে মনে মনে মা-বাবাকে ডেকে উঠল,
‘আব্বু! তুমি কি এখনো বোঝোনি তোমার মেয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে, নাকি ভুলেই গেছ যে তোমার একটা মেয়েও ছিল?! কী হলো তোমাদের, তোমরা কোথায় হারিয়ে গেলে?! এই গরমে আমি যে আর বাঁচছি না!’
তার ওপর এই বাড়ির মানুষদের কাণ্ড দেখে তৃধার মাথা আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে! এই কড়া গরমেও বাড়ির মহিলারা একদম নিখুঁতভাবে শাড়ি পেঁচিয়ে সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে! সিরিয়াসলি?! সবথেকে বড় কথা হলো, এরা তো চাইলে আরামে সালোয়ার-কামিজও পরতে পারে, অন্তত শাড়ির চেয়ে সেটা হাজার গুণে আরামদায়ক আর হালকা! কিন্তু না! এরা শাড়ি পরেই রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সংসারের সব কাজ অনায়াসে করে ফেলছে!
তৃধা ভাবল, আমি যদি শাড়ি পরে দুই কদম হাঁটি, তবে কমপক্ষে তিনবার আছাড় খেয়ে পড়ব! শাড়ি পড়ে কাজ তো দূরের কথা, আমি ঠিকঠাক হাঁটতেই পারি না! আর এই নারীরা প্রতিদিন শাড়ি পরে কাজ করছে... আল্লাহ এদের সহ্যশক্তি আর ধৈর্য কতটা দিয়েছেন!’
তারপরই হুট করে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মনে মনে বলল, ভাগ্যিস এই যুগে আমাকে সত্যি সত্যি জন্ম নিতে হয়নি!
কথাটা ভাবতেই তৃধার মনে পড়ল,আরে! সে তো বাস্তব জীবনে ২০০৭ সালেই জন্মগ্রহণ করেছে! এতসব ঝামেলা আর অনাহুত ঘটনার চক্করে পড়ে সে তো নিজের জন্মসালটাই ভুলতে বসেছিল! কিন্তু এই গল্পে তো এখন ২০০৭ সালই চলছে! তার মানে, যে সালে তার আসল জন্ম হয়েছিল, ঠিক সেই সালেই কি তবে গল্পে তৃধার মৃত্যু হবে?!
ভাবা যায়?! কী সুন্দর কাব্যিক মিল! ওয়াও, তৃধার এখন খুশিতে ডিস্কো ড্যান্স দিতে ইচ্ছা করছে! এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।দুশ্চিন্তার মিশেলে তৃধার হাতের খাবারগুলো আর পেটে যেতে চাইল না।এক তো বাড়ি যাওয়ার টেনশন আরেক হলো এই গরম!আর কারেন্ট?এই সালার নাম শুনলেই মেজাজ গরম হয়ে যায়, কারেন্ট ওয়ালারা কেন বুঝতে পারছেন এটা গল্প, এখানে অন্তত নিজের মান সম্মানটা রাখুক ,কারেন্ট না নেক! না সেটা কেনো করবে ভাইরা?ভাইরা সব জায়গাতে একই রকম! গল্পের দুনিয়া হোক,কিংবা বাস্তব দুনিয়া সব জায়গাতেই হারামজাদা, তৃধার মেজাজ আরো গরম হচ্ছে,ঠিক তখনই সে খেয়াল করল তাহেরা খাতুন হাতে একটা বিশাল প্লাস্টিকের ঝুড়িতে একঝাঁক জামাকাপড় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তৃধা খাবারের হাত ধুয়ে ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
"চাচি! এতগুলো কাপড় নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?"
তাহেরা খাতুন থামলেন, ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"বিষাণের কাপড় রে মা! এগুলো কবে যে টেনে একপাশে ফেলে রেখে দিয়েছে! দুদিন পর পর নতুন নতুন জামা কিনে এনে রুমে স্তূপ করে রাখে। আমি না ফেললে ওগুলো ও ছুয়েও দেখবে না, তাই ফেলে দিতে যাচ্ছি!"
তৃধা ডাইনিং টেবিল থেকে এক লাফে উঠে দৌড়ে তাহেরা খাতুনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল,
"বলুন বলুন, এগুলো কোথায় ফেলতে হবে? আমি দিয়ে আসছি!"
তাহেরা খাতুন হেসে ফেলে বললেন,
 "আরে লাগবে না মা, তুই গিয়া বোস!"
"আহা দিন না! আমি নিয়ে যাচ্ছি!",তৃধা প্রায় একপ্রকার জোর করেই উনার হাত থেকে কাপড়ের ঝুড়িটা নিজের হাতে ছিনিয়ে নিল।
তাহেরা খাতুন ওর উৎসাহ দেখে বললেন, 
"আচ্ছা যা, গেটের বাইরে রেখে দিয়ে আয়। পরে মানুষ আসলে দিয়ে দিব!"
"ঠিক আছে!"
তাহেরা খাতুন রান্নাঘরের দিকে যেতেই তৃধার দুটো চোখ চকচক করে উঠল! সে ঝুড়ির ভেতরে উঁকি দিয়েই দেখে ফেলল,বাহ্! সেখানে বেশ কয়েকটি হালকা, ঢোলাঢালা আর আরামদায়ক গেঞ্জি একদম নতুনের মতো পড়ে আছে!
গেঞ্জিগুলো দেখেই তৃধার মন আনন্দে নেচে উঠল। লোকটা পরুক কিংবা না পরুক, ওসব ছাইপাশ ভেবে তার কোনো লাভ নেই,আজ রাত থেকে তৃধা অন্তত এই নরকসম গরমে একটু আরামে ঘুমাতে পারবে!
তৃধা তড়িঘড়ি করে ঝুড়ি থেকে নিজের পছন্দের আর গায়ের মাপে হবে এমন কয়েকটা ভালো গেঞ্জি চুপচাপ সরিয়ে নিজের ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলল। তারপর বাকি ঝুড়িটা একদম সুন্দর করে রেখে দিয়ে নিজের ঘরে চলে এলো!
—
দিনে তীব্র গরমে যেমন মেজাজ ছাই হয়ে যাচ্ছিল, রাতে ঠিক তার উল্টো! ঝটপট হাত-মুখ ধুয়ে বিষাণের সেই ঢোলাঢালা আরামদায়ক সুতির গেঞ্জিটা গায়ে গলিয়ে দিতেই তৃধার দেহে যেন প্রাণ ফিরে এসেছে! এক নিমেষে কী যে এক স্বর্গীয় শান্তি ভর করল শরীরে! তৃধা নিজের দিকে তাকিয়ে হাসলো,গেঞ্জিটা তার হাঁটুর নিচে পর্যন্ত নেমে গেছে! গোল জামার মত! তবে আরামদায়ক।
তৃধা যেই না এবার বেশ একটা আয়েশ করে ঘুমাতে যাবে, হুট করেই কানে এলো দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে! তৃধা ভাবল,এত রাতে হয়তো চাচি বা অন্য কেউ কোনো প্রয়োজনে এসেছে।
কিন্তু দরজাটা একটুখানি ফাঁক করতেই তৃধার চোখের মনি কপালে ওঠার জোগাড়! সামনে দাঁড়িয়ে বিষাণ ভাই!
তৃধা আতঙ্কে দরজা আবার ধুম করে লাগিয়ে দিতে গেল, কিন্তু বিষাণ তার চটপটে এক হাত বাড়িয়ে দরজার ফ্রেম শক্ত করে চেপে ধরল। তৃধা ভেতর থেকে নিজের গায়ের সব শক্তি দিয়ে ধাক্কাতে লাগল, কিন্তু বিষাণ এক হাতেই দরজাটা ধরে রেখে কড়া গলায় ধমক দিল,
"ঐ টিকটিকির মতো শক্তি দিয়ে সারাদিন চেষ্টা করে তুই মরে গেলেও এই দরজা লাগাতে পারবি না! ছাড়!"
তৃধার দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। ‘কেন যে অভাগীর মতো দরজাটা খুলতে গেলাম!’ এবার কী করবে সে? বিষাণের সাথে শক্তিতে না পেরে শেষমেশ দরজার হাতল ছেড়ে পিছিয়ে এলো সে।
দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই বিষাণ তৃধাকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একনজর মেপে দেখল। তারপর মুখে হাত চাপা দিয়ে প্রচণ্ড এক হাসির তোড় আটকানোর চেষ্টা করল!
তৃধা অবাক হয়ে তাকাল। ‘এই লোকটাকে এত ফুরফুরে আর খুশি খুশি লাগছে কেন?!’
তৃধা বিষাণের চোখ অনুসরণ করে নিজের গায়ের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারল,লোকটা তৃধার পরা ওই গেঞ্জির দিকে তাকিয়েই খিকখিক করে হাসছে!
তৃধা চরম বিরক্তিতে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠল, "এখানে হাসার কী আছে, হ্যাঁ?!"
বিষাণ নিজের মুখের হাসিটা চট করে মুছে আবার সেই কড়া হাবভাব ফিরিয়ে এনে বলল, 
"যে মেয়ে সবার সামনে অত ডায়লগ দিল,আমাকে নাকি কোনোদিন বিয়েই করবে না! সে মেয়ে এখন আমাকে এতই মনে করছে যে আমারই গেঞ্জি গায়ে দিয়ে ঘুরছে?! বসে বসে বুঝি আমার কথাই ভাবা হচ্ছিল, হ্যাঁ? এত মনে পড়ে আমাকে?"
তৃধা চোখ উল্টে হাত নেড়ে বলল, "মনে মনে খিচুড়ি রান্না করে খেয়েও ফেললেন নাকি?!আপনাকে আমি মিস করব?এই জনমে ও না! আপনি কি পাগল, বিষাণ ভাই?!"
বিষাণ সে কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে আরও একটু এগিয়ে এসে বাঁকা হেসে বলল, 
"রোজ রাতে এভাবেই আমাকে জপিস নাকি?"
তৃধা বেকুব বনে গেল! এই লোক এত বড় শয়তান আর এত মিথ্যা কথা বলতে পারে?! সে সোজা রেগে চেঁচিয়ে উঠল, 
"আপনার সমস্যাটা কী, বলুন তো?!"
"কেন?"
"আমি আপনাকে মনে করে মোটেই এই গেঞ্জি পরিনি! আমার অনেক গরম লাগছিল, আরামের জন্য পরেছি, ব্যাস!"
বিষাণ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, সবই জানি! আর মুখ ফুটে বলতে হবে না!"
"আপনি কচু জানেন!"
কথাটা বলতে বলতেই তৃধার চোখ গেল বিষাণের ডান হাতে। অচিরেই তার ভ্যাবাচেকা খাওয়ার পালা! বিষাণের হাতে তিনটি সরু জালি বেত চিকচিক করছে!তৃধা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, 
"আপনার হাতে ওগুলো কী?"
"জালি বেত।"
"কিন্তু কেন? এগুলো নিয়ে এত রাতে আমার রুমে কী করছেন?!"
বিষাণ টেবিলের দিকে হেঁটে এসে বুক ফুলিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, 
"অনেক দিন হলো তোর পড়া ধরি না। তাই ভাবলাম আজ একটু ঝালাই করি! আজ প্রশ্ন করব কয়েকটা।"
তৃধা শুকনো একটা ঢোক গিলে ব্যাকুল গলায় বলল, "ওহ! আর যদি পড়া না পারি...?"
বিষাণ বিষাক্ত একটা হাসি উপহার দিয়ে বলল, "তাহলে আর কী! আগের দিনগুলোর মতো এই বেতগুলো একটার পর একটা সোজা তোর পিঠে পড়বে!"
তৃধা ভয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল, 
"কীইইহ্?! শেষমেশ সব জায়গায় হেরে গিয়ে সেই ক্ষোভ আর রাগ এভাবে আমার ওপর ঝাড়বেন?!"
"হ্যাঁ!" সংক্ষিপ্ত উত্তর বিষাণের।
তৃধা ফাঁপরে পড়ে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করল, 
"কিন্তু আমি তো অ্যাকাউন্টিংয়ের স্টুডেন্ট! আমি মানবিকের প্রশ্নের উত্তর কীভাবে পারব, বলুন?!"
“কি?
মনে মনে তৃধা বিড়বিড় করে আকুতি জানাতে লাগল, ‘কেউ বাঁচাও আমাকে! এই পাগল লোকটা আজ সত্যি সত্যি আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবে! কিন্তু এত রাতে তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে! আমি কী করব এখন?!’
বিষাণ বেত নাড়িয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
 "কী বিড়বিড় করছিস?"
তৃধা একরাশ মেজাজ নিয়ে বলে উঠল,
 "কতবার বলব আমি তৃধা! আমি নন্দ্রিতা নই!"
কথাটা শেষ হতেই হাওয়ায় সাঁই করে আওয়াজ হলো! বিষাণ হাতের জালি বেত দিয়ে সজোরে তৃধার হাতের ওপর এক বারি বসাল!
"আআআহ্!"
বিষাণ কড়া গলায় ধমকে উঠল, 
"ফালতু বকবক করলে আবার পড়বে!"
তৃধা লাফিয়ে পিছিয়ে গিয়ে হাতের ওপর দ্রুত ডলতে লাগল। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে তার চোখে সত্যি সত্যি জল চলে এলো। ‘আল্লাহ ,এই লোকটা তো পিটিয়ে চামড়া তুলে ফেলবে আজ!কি করি এখন আমি?’
তৃধাকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিষাণ বেত দিয়ে কাঠের পড়ার টেবিলে কষে একটা বাড়ি মারল!
তৃধা কেঁপে উঠে এক দৌড়ে গিয়ে ধুপ করে পড়ার চেয়ারে বসে পড়ল।
বিষাণ চেয়ারে বসা তৃধার দিকে বেত উঁচিয়ে বলল, "তিনটে প্রশ্ন করব। সবকটার উত্তর ঠিকঠাক দিবি!"
তৃধা কোনোমতে শুকনো গলায় একটা গলার ঢোক গিলে বলল,
 "কী... কীসের ওপর প্রশ্ন করবেন?"
"বই থেকে!"
"আরে ওটা তো বুঝলাম! কিন্তু কোন সাবজেক্ট? কোন টপিক?"
"টপিক আবার কী দেব? সোজা বইয়ের ভেতর থেকে ধরব!"
"মানে?! কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় ছাড়া পুরো বই আমি কীভাবে চট করে পারব?!"
বিষাণ চোখ ছোট ছোট করে বলল, 
"সামনে তোর টেস্ট পরীক্ষা, আর দুদিন বাদেই এসএসসি পরীক্ষা! আর তুই এখন বলছিস পুরো বই পড়া বাকি?!"
তৃধার বুক শুকিয়ে আমসি হয়ে গেল। ইস! কতবার আমাকে এই জীবনে এসএসসি পরীক্ষা দিতে হবে?! সত্যি আমার জীবনটা শেষ!
সে কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে বলল, 
"না... মানে, পুরো বই কি একদম হুবহু মুখস্থ থাকে নাকি? একটা স্পেসিফিক অধ্যায় বলুন, তারপর ওখান থেকে ধরুন। নাহলে কীভাবে পারব?"
বিষাণ টেবিল থেকে একটা বই তৃধার সামনে সজোরে ছুঁড়ে দিল। তৃধা এক নজর তাকাল,'যুক্তিবিদ্যা'। বইয়ের নাম দেখেই তৃধার মাথায় বাজ পড়ল! সাইন্সের বিষয়ের একটু হলেও জানা আছে, কিন্তু যুক্তিবিদ্যা বস্তুটা কী জিনিস, তার বিন্দুমাত্র ধারণাও তার মাথায় নেই!তৃধা একটু পৃষ্ঠা উল্টে বোঝার চেষ্টা করতেই বিষাণ ঠিক দুই মিনিটের মাথায় এক ঝটকায় বইটা টেনে নিয়ে নিল!
তৃধা চেঁচিয়ে উঠল, 
"আরে! আরেকটু দেখতে দিন না! এমন করছেন কেন?!"
"সময় শেষ!"
"আরে পরীক্ষার হলে স্যাররাও তো এত কড়া গার্ড দেন না! প্লিজ, আরেকটু সময় দিন!"
বিষাণ টেবিল থেকে একটা বই তৃধার সামনে সজোরে ছুঁড়ে দিল। তৃধা এক নজর তাকাল,পৌরনীতি ও সুশাসন। বইয়ের নাম দেখেই তৃধার মাথায় বাজ পড়ল! সাইন্সের বিষয়ের একটু হলেও জানা আছে, কিন্তু এই বস্তুটা কী জিনিস, তার বিন্দুমাত্র ধারণাও তার মাথায় নেই!তৃধা একটু পৃষ্ঠা উল্টে বোঝার চেষ্টা করতেই বিষাণ ঠিক দুই মিনিটের মাথায় এক ঝটকায় বইটা টেনে নিয়ে নিল!
তৃধা চেঁচিয়ে উঠল, 
"আরে! আরেকটু দেখতে দিন না! এমন করছেন কেন?!"
"সময় শেষ!"
"আরে পরীক্ষার হলে স্যাররাও তো এত কড়া গার্ড দেন না! প্লিজ, আরেকটু সময় দিন!"
বিষাণ বেতটা হাতের তালুতে আছড়ে বলল,
 "সময় শেষ বললাম না?! আর একটা বাড়তি কথা বললে প্রশ্ন করা ছাড়াই বেত চালানো শুরু করব!"
তৃধা একপ্রকার অসহায় হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। কী বিপদে পড়লাম! আরামে ঘুমাতে যাচ্ছিলাম, সেখান থেকে এখন মৃত্যুদণ্ড!
বিষাণ কড়া গলায় বলল, "প্রথম প্রশ্ন,পৌরনীতি বা Civics শব্দটির উৎপত্তি কোন ল্যাটিন শব্দ দুটি থেকে হয়েছে এবং এর মূল অর্থ কী?”
তৃধা মনে মনে ভাবল, “সে তো একটু আগেই মাত্র বইয়ে এটা দেখছে!! কিন্তু সিওর না,এটাই পড়েছিলাম মনে হয়!’ সে চট করে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলে উঠল,
 "ল্যাটিন শব্দ 'Civis' আর 'Civitas' থেকে এসেছে! আর এর অর্থ হলো নাগরিক ও নগররাষ্ট্র!"
বিষাণ ভ্রূ একটু ওপরে তুলে বলল, 
"হুম, ভাগ্যের জোরে পারলি! 
দ্বিতীয় প্রশ্ন,রাষ্ট্রের উপাদান কয়টি ও কী কী?”"
তৃধা এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল!
 ‘অ্যাঁ?!... কী বললেন ভাই?!’ সে মাথায় হাত দিয়ে ঢোক গিলল। বিষাণ বেতটা তুলে ধরায় ,সে চট করে তোতলাতে তোতলাতে আন্দাজে বলল, 
"ইয়ে... হলো ৪টি!পরেরটা মনে পড়ছে না!"
বিষাণ অসন্তুষ্ট মুখে বলল, 
"উত্তর আংশিক ঠিক, তাও মেনে নিলাম। এবার তিন নম্বর প্রশ্ন,এরিস্টটলের মতে সরকারের শ্রেণিবিভাগের মূল ভিত্তি দুটি কী কী এবং তাঁর বিখ্যাত বইটির নাম কী?"
তৃধা এবার একদম ফাঁকা! তৃধা এবার একদম ফাঁকা!এখানে তো যাওয়ার সুযোগ ই দেইনি লোকটা! এটা আবার কোন জিনিস?! আর কিসের শ্রেণিবিভাগ?!
সে ভীতিভরা চোখে বিষাণের হাতের বেতের দিকে তাকাল। বিষাণ আর সময় না দিয়ে লাঠি সোজা করে উঁচিয়ে ধরল মারার জন্য!
তৃধা ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল, 
"আরে দাঁড়ান দাঁড়ান! মনে করতে দিন একটু! প্লিজ!"
বলতে বলতেই হঠাৎ তৃধার চোখ গেল বিষাণের পেছনের অন্ধকারের দিকে। মুহূর্তেই তার ভয় পাওয়া চেহারা উধাও হয়ে গেল, আর সে চোখ দুটো একদম বড় বড় করে বিষাণের পেছনের দরজার ফাঁকের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল,
"চাচ্চু আপনি?!"
বিষাণ চমকে উঠল! এত রাতে বাবা এই ঘরে আসলো কীভাবে?! সে ভ্রূ কুঁচকে চট করে পেছনে ফিরে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
 "বাবা! তুমি...?"
কিন্তু পেছনে কেউ ছিল না! খাঁ খাঁ ফাঁকা ঘর!
বিষাণ মুহূর্তে বুঝতে পারল সে ধোঁকা খেয়েছে! সে প্রচণ্ড রেগে নন্দ্রিতাকে ধরে ধমক দিতে সামনে ঘুরল, কিন্তু সে তাকাবে কোথায়?! ততক্ষণে তৃধা ইঁদুরের মতো সুযোগ বুঝে চম্পট দিয়েছে!
বিষাণ চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই সিঁড়ির ওখান থেকে ভেসে এলো তৃধার গগনবিদারী, বিকট চিল চিৎকার,
"দাদুউউ! আমাকে বাঁচাও! বিষাণ ভাই আমাকে মেরেই ফেললওওওওও!"
বিষাণ চরম বিরক্তিতে মাথার চুল চেপে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। টেবিলের পাশ কেটে ওঠার সময় ধাক্কা লেগে নন্দ্রিতার পড়ার ব্যাগটা নিচে পড়ে যেতে নিলে,সে ধরে ফেলল, কিন্তু ব্যাগ থেকে বইখাতা সব ছিটকে পড়লো, সাথে সাথেই ভেতর থেকে ভাঁজ করা একটা হালকা কাগজ মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল,একটা চিঠি!
বিষাণ ঘর থেকে বের হতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। নিচে নন্দ্রিতার চিল্লাচিল্লির শব্দ তখনও কানে আসছে, কিন্তু মেঝেতে পড়ে থাকা সেই কাগজটার দিকে বিষাণের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো আটকে গেল। সে নিচু হয়ে এক হাত বাড়িয়ে চিঠিটা তুলে নিল!
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন