#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১১
সায়মা নিচে নেমে মার সামনে দাঁড়ায় এবং সবাইকে সালাম দেয়।
- আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সবাই কিছুক্ষণ সায়মার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে সালামের উত্তর নেয়।
সবাই– ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নাজমা আক্তার মেয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
মা শা আল্লাহ আমার মেয়েকে কত সুন্দর লাগছে। তুই কবে কিনেছিস বোরকা? আর পড়া শুরু করলি কবে থেকে?
- কাল ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার সময় শপিংমলে গিয়েছিলাম তখন কিনেছি। আমার একজন নতুন বান্ধবি হয়েছে ওর নাম নুর। ও আমাকে ইসলামে মেয়েদের পর্দার বিধান সম্পর্কে বুঝিয়েছে, নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বুঝিয়েছে। আমি এতো দিন ভুল পথে চলেছি। কারো কথা শুনি নি এর জন্য তোমারা আমাকে মাফ করে দিও আম্মু।
নাজমা আক্তারের চোখের পানি যেনো আজকে থামছেই না। এটা খুশির কান্না। তার মেয়েকে আল্লাহর পথে ফিরে আসতে দেখে উনি অনেক খুশি হয়েছেন। কত দোয়া করেছেন আল্লাহর কাছে তার দুই সন্তানকে যেনো আল্লাহ হেদায়েত দান করেন। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন। সে বিশ্বাস করে তার ছেলেও কোন না কোন উছিলায় আল্লাহর দ্বীনের পথে ইসলামের পথে আসবে ইন শা আল্লাহ। তিনি আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
নাজমা আক্তার বলেন,
আলহামদুলিল্লাহ। আমি অনেক খুশি হয়েছি তোমার এই পরিবর্তন দেখে৷
সায়মা মুচকি হাসি দিয়ে খাবার টেবিলে বাবার পাশের চেয়ারে বসে। তার বাবাও মেয়ের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে দেন। তিনিও তো চান তার ছেলে মেয়েগুলো দ্বীনের পথে আসুক। বাবার আদর পেয়ে সায়মা মুচকি হাসে।
সাদিফ সায়মাকে প্রশ্ন করে,
ব্যাপার কি বল তো সায়মা? তোকে দেখছি ২ দিন ধরে অনেক মুচকি হাসছিস। ঘটনা কি?
- মুচকি হাসা তো সুন্নত। আমি আমার নবীর সুন্নত পালন করছি আলহামদুলিল্লাহ।
- বাহ বেশ ভালো।
সায়মা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
সবাই খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যেও না কিন্তু।
সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া শেষ করে আনিসুর রহমান চলে যান অফিসে এবং সাদিফ সায়মা চলে যায় ইউনিভার্সিটি তে। সবাই চলে যাওয়ার পর খাওয়ার টেবিল গুছিয়ে নাজমা আক্তার ওজু করে আসেন। তাকে তো আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে হবে। তার দোয়া কবুল হয়েছে। সে অনেক খুশি আলহামদুলিল্লাহ৷
...........................
সায়মাকে ইউনিভার্সিটির গেইট এর সামনে সাদিফ নামিয়ে দেয়। তার কিছু কাজ আছে সে একটু পর ভিতরে আসবে। সায়মা সামনের দিকে হাটতে থাকে। সামনে সে দেখে নুর ওদের বিল্ডিং এর ভিতরে যাচ্ছে। সায়মা নুরকে ডাক দেয়। নুর পিছনে তাকিয়ে সায়মা কে দেখে। সায়মা ব্রাউন কালার বোরকা আর হিজাব পরে তার কাছে এগিয়ে আসছে। নুরের চোখে পানি চিক চিক করছে। তার প্রিয় বান্ধবির এই সুন্দর পরিবর্তন দেখে সে আজ অনেক খুশি।
সায়মা নূরকে সালাম দেয়,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নুর উত্তর দেয়,
ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
দুইজন দুইজনকে জড়িয়ে ধরে।
নুর বলে,
তোমার এই পরিবর্তনে আমি অনেক খুশি হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। এই নাও তোমার জন্য আমার পক্ষ থেকে হাদিয়া।
সায়মা ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখে তার ভিতর খুব সুন্দর একটি লেভেন্ডার কালারের বোরকা আর ম্যাচিং হিজাব সাথে একটি হাদিস ও কোরআনের তাফসীর উল্লেখ করা বই।
- তোমার জন্য বোরকা টা অনেক শখ করে কিনেছি। আর এই বইটি তোমাকে কোরআনের আয়াত এবং হাদিস সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।
- মা শা আল্লাহ। জাযাকাল্লাহু খায়রান নুর। বোরকা টা অনেক সুন্দর আর এই বইটি আমার অনেক প্রয়োজন ছিলো এই মুহুর্তে।
- হাদিয়া দেয়া রাসুল (সা.) এর সুন্নত। আমাদের সব সময় একে অপরকে হাদিয়া দেওয়া উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহারাদি বিনিময় করো, তোমাদের পারস্পরিক মহব্বত সৃষ্টি হবে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৭)
আর আল্লাহর জন্য পারস্পরিক মহব্বত/ভালোবাসা সৃষ্টি করাও ইবাদত। যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরের সঙ্গে মহব্বত রাখে, আল্লাহ তাদের ওপর খুশি হন। তাদের ভালোবাসেন।
- জাযাকাল্লাহু খায়রান নুর। চলো ক্লাসে যাই।
- হ্যাঁ চলো।
সাদিফ কিছু কাজের জন্য বাহিরে গিয়েছিলো আসতে তার দেরি হয়ে যায় তাই সে কোন দিক না তাকিয়ে সোজা তার ক্লাসে প্রবেশ করে।
সায়মাদের ক্লাস শেষ হতে হতে প্রায় ২ টা বেজে যায়। দুইজনই ক্লাস শেষ করে একটি খালি রুমে যায় নামাজ আদায়ের জন্য। যখন নুর নামাজ পরছিলো তখন সায়মা পাহারা দিচ্ছিলো যেনো কেউ রুমে প্রবেশ না করে। আবার যখন সায়মা নামাজ পরছিলো তখন নুর পাহারা দিচ্ছিলো যেনো কেউ রুমে প্রবেশ না করে। দুইজনের নামাজ শেষে তারা ক্যান্টিনে যায় কিছু খাওয়ার জন্য। দুই জন খাবার ওর্ডার করে বসে।
সায়মা নূরকে বলে,
নুর আমাকে নামাজ নিয়ে কোরআন এবং হাদিসের আলোকে আরও কিছু বলো।
নুর বলতেই যাবে তখন পুরো ক্যান্টিনে হই চই শুরু হয়ে যায়। সব মেয়েদের হই হুল্লোড়।
নুর অবাক হয়ে সায়মা কে জিজ্ঞেস করে যে সব মেয়েরা এমন করছে কেন? সায়মা পিছনে তাকিয়ে দেখলো তার ভাই ক্যান্টিনে এসেছে তাই এত মেয়েদের হই হুল্লোড় শুরু হয়েছে।
- ভাইয়া এসেছে। তাই এরা এমন করছে৷ ভাইয়া কে দেখামাত্র পাগল হয়ে যায় এক এক জন।
- ওহ।
নুরের এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। সে এসব পছন্দ করে না। সাদিফ সোজা তাদের টেবিলে চেয়ার টেনে বসে পরলো।
সাদিফ বলে,
সায়মা খাবার ওর্ডার দিয়েছিস?? আমার জন্যও দিয়ে আয় না প্লিজ।
সায়মা ভাই এর জন্য খাবার ওর্ডার দিতে চলে যায়। নুর সেই তখন থেকে মাথা নিচু করে বসে আছে। সায়মা মেয়েটা কেন ওকে এভাবে একা রেখে গেলো? ও যে অন্য টেবিলে চলে যাবে সেটাও পারছে না কারণ কোনো টেবিল এই মুহুর্তে খালি নেই। একজন পরপুরুষের সামনে এভাবে বসে থাকতে তার অনেক খারাপ লাগছে। সাদিফ অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছে সে আসার পর থেকেই নুর মাথা নিচু করে বসে আছে কোন কথাও বলছে না। সাদিফ একটা কাশি দিয়ে কথা শুরু করার চেষ্টা করে।
- হাই। পরমুহূর্তেই আবার বলে উঠে আসসালামু আলাইকুম।
নুর সামান্য মাথা তুলে একবার সাদিফের দিকে তাকায় সাদিফ ও তার দিকে তাকিয়ে ছিলো সেইজন্য নুর তাকানোর সাথে সাথে তাদের চোখাচোখি হয়ে যায়। নুর সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলে আর নিচু গলায় সালামের উত্তর দেয়।
- ওয়ালাইকুম আসসালাম।
- কেমন আছেন আপনি?
- আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?
- এতক্ষণ বেশি ভালো ছিলাম না কিন্তু এই মুহুর্তে বেশ ভালো আছি।
নুরের দিকে তাকিয়ে সাদিফ খুব সুন্দর করে একটি হাসি দেয়। এই হাসি দেখে তো সব মেয়ে তার দেওয়ানি। কে না এই মাতাল করা হাসির প্রেমে পড়বে? কিন্তু নুর একবার ও মাথা উঁচু করে দেখেনি। সে শুধু অপেক্ষা করছে কখন সায়মা আসবে।
- আপনি কি সব সময়ই এমন কম কথা বলেন?
- হুম।
- ওহ আচ্ছা। আমার তো এমন টা মনে হয় না। কই সায়মার সাথে তো হেসে হেসে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেন। আমি আসলেই সাইলেন্ট মোডে চলে যান।
সায়মা চেয়ারে বসতে বসতে প্রশ্ন করে,
কে কাকে দেখে সাইলেন্ট মোডে চলে যায় ভাইয়া?
- তোর বান্ধবি। আমাকে দেখলে সব সময় চুপ হয়ে যায় আর মাথা নিচু করে ফেলে। দেখ সেই কখন থেকে মাথা নিচু করে আছে। আচ্ছা উনার কি ঘার ব্যাথা হয় না?
- তুমি নুরের জন্য পরপুরুষ তাই ও তোমাকে দেখলে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না আর মাথা নিচু করে থাকে।
সাদিফ নুরের দিকে তাকায়।
চলবে।
একজন দ্বীনদার বন্ধু যে তোমাকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে সে তোমার জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অনেক সুন্দর একটি নেয়ামত। ❤️