#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ১২
সাদিফ এখনো তাদের টেবিলে বসা। নুর মাথা নিচু করে বসেই আছে। সাদিফ একবার চিন্তা করেছিলো ও উঠে যাবে। কিন্তু পরে আবার ভাবলো এমন চলতে থাকলে ও বাজি হেরে যাবে। নুরের মন জয় করতে পারবে না। নুর কে ওর সামনে স্বাভাবিক করতে হবে।
সাদিফ প্রশ্ন করে,
এই সায়মা আমি আসার আগে তোরা কি নিয়ে কথা বলছিলি?
- ওহ। আমি নুরকে কোরআন এবং হাদিসের আলোকে নামাজ নিয়ে কিছু বলতে বলছিলাম।
সাদিফ নূরের দিকে তাকিয়ে বলে,
নুর আপনি বলুন আমিও শুনতে আগ্রহী।
নুর হালকা তার মাথাটা উঁচু করে তাকিয়ে দেখে সায়মা আর সাদিফ দুইজনই তার দিকে তাকিয়ে আছে। নুর আবার মাথা নিচু করে ফেলে। নুর তবুও কিছু বলছে না দেখে সাদিফ আবার তাকে ডাক দেয়। এবার নুর চিন্তা করে তার বলা উচিত এতে করে যদি সায়মা এবং সাদিফ ঠিকমতো নামাজ আদায় করে। নুর জোরে শ্বাস নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে বলা শুরু করে,
ইসলামের প্রথম বাহ্যিক ইবাদত হলো নামাজ। নামাজের বিষয়ে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা রয়েছে ৮২ বার। নামাজের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর স্মরণ। আল্লাহ তাআলা কোরআন কারিমে বলেন, ‘আর তোমরা আমার স্মরণোদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা-২০ তহা, আয়াত: ১৪)।
নামাজ ইসলামের মূল পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইসলাম পাঁচটি খুঁটির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ করা ও রমজান মাসে রোজা পালন করা।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পৃষ্ঠা: ১৬, হাদিস: ৭)।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কর্ম থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা-২৯ আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হুজুরে কলব (হৃদয়ের উপস্থিতি) ব্যতীত নামাজ প্রকৃত নামাজ হয় না।’ (ফিকহুর রিজা)। হুজুর অর্থ উপস্থিতি, হাজির অর্থ উপস্থিত, কলব মানে দিল, হৃদয়, মন। সফল মুমিনদের পরিচয় পবিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে, ‘ওই সকল বিশ্বাসীগণ সফল, যারা তাদের নামাজে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়।’ (সুরা-২৩ মুমিনুন, আয়াত: ১-২)।
কোরআন হলো আল্লাহর কালাম, কালাম অর্থ কথা। কোরআন তিলাওয়াত করা মানে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা। নামাজে কোরআন তিলাওয়াত হলো আল্লাহর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলা। আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব দেন, প্রতিটি আহ্বানে সাড়া দেন, সকল আবেদন মঞ্জুর করেন, সব দোয়া কবুল করেন। (মিশকাত শরিফ)।
সুরা ফাতিহায় আমরা যখন বলি, ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন (সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহর জন্যই)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হামিদা নি, আবদি (আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল)।’ অতঃপর আমরা যখন বলি ‘আর রাহমানির রাহিম (তিনি পরম করুণাময় অতি দয়ালু)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আছনা আলাইয়া আবদি (আমার বান্দা আমার বিশেষ প্রশংসা করল)।’ এরপর যখন আমরা বলি, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দিন (তিনি বিচারদিনের মালিক)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মাজ্জাদানি আবদি (আমার বান্দা আমাকে সম্মানিত করল)’। এরপর আমরা যখন বলি, ‘ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়িন (শুধু আপনারই ইবাদত করি আর শুধু আপনার কাছেই সাহায্য চাই)’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হাজা বাইনি ওয়া বাইনা আবদি (এই ফয়সালাই হলো আমার ও আমার বান্দার মাঝে—বান্দা আমার ইবাদত ও আনুগত্য করবে, আমি তাকে সাহায্য–সহযোগিতা করব)।’ আমরা যখন বলি, ‘ইহদিনাছ ছিরাতল মুস্তাকিম, ছিরাতল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গয়রিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দল্লিন! (আমাদের সঠিক পথ দেখান, তাদের পথ যাদের আপনি নিয়ামত দিয়েছেন; তাদের পথ নয় যারা পথভ্রষ্ট; আর না যারা অভিশপ্ত)।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘লিআবদি মা ছাআল (আমার বান্দা যা চায়, তার জন্য তা-ই)।’
বিখ্যাত হাদিসে জিবরাইলে উল্লেখ রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এভাবে ইবাদত করো যে যেন তুমি তাঁকে (আল্লাহকে) দেখতে পাচ্ছো; যদি তুমি তাঁকে দেখতে না-ও পাও, তবে নিশ্চয় তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, ইমান অধ্যায়, পৃষ্ঠা: ৩৮, হাদিস: ৪৮)।
কথা গুলো বলার পর নুর থামলো এবং সাদিফ এবং সায়মার দিকে তাকালো। সায়মা অত্যান্ত মনোযোগের সাথে নুরের কথা গুলো শুনছিলো।
সায়মা নূরের প্রশংসা করে বলে,
তুমি অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে পারো যানো নুর? তোমার থেকে কোরআন, হাদিসের আলোচনা শুনতে আমার অনেক ভালো লাগে। কি ঠিক বলেছি না ভাইয়া?
সায়মা পাশে সাদিফের দিকে তাকায়। দেখে সাদিফ মাথা নিচু করে নুরের কথা গুলো শুনছিলো। তার কাছেও নুরের বলার ধরন বুঝানোর ধরন অনেক পছন্দ হয়েছে। তার এখন নিজেকে আল্লাহর জন্য পরিবর্তন করতে মন চাচ্ছে। সে এতদিন যাবত কি করে আসছে? সে তো এক ওয়াক্ত নামাজ ও আদায় করে না। সে তো দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। সায়মার ডাক দেওয়াতে তার ধ্যান ভাঙ্গে।
- হ্যাঁ?????
- কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে তুমি? তোমাকে সেই কখন থেকে ডাকছি আমি।
- সরি কিছু ভাবছিলাম আমি। তুই কি জিজ্ঞেস করছিলি আমাকে???
- আমি বলছিলাম কি যে নুরের বুঝানোর ধরন অনেক সুন্দর তাই না? একদম ওর কথা গুলো হৃদয়ে গিয়ে লাগে।
- হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। আল্লাহ নুরের মধ্যে এই নিয়ামত টা দিয়েছেন যে নুরের কথা গুলো হৃদয়ে গিয়ে লাগে। কথা গুলো সাদিফ নুরের চোখে চোখ রেখে বলে।
নুর অবাক হয়ে যায়। সাদিফকে তার এখন বড্ড অচেনা মনে হচ্ছে। ওর চোখ গুলো অনেক শান্ত দেখাচ্ছে। ২ দিন আগে ও যে সাদিফকে দেখেছিলো ইউনিভার্সিটির সবার মুখে সাদিফের যেসব কথা শুনেছিলো সেই সাদিফ আর এখন তার সামনে বসা সাদিফের মধ্যে সে কোন মিল খুজে পাচ্ছে না। এরই মধ্যে তাদের খাবার চলে আসে।
নুর একটু জোরে বিসমিল্লাহ বলে যাতে বাকি দুইজন ও খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে না যায়।
খাওয়া শেষে যে যার ক্লাসে চলে যায়।
সাদিফ সায়মার জন্য অপেক্ষা করছে এক সাথে বাসায় যাবে বলে। সাদিফ খেয়াল করে সায়মা ও নুর এক সাথে কথা বলতে বলতে হেটে আসছে।
সায়মা সাদিফের কাছে এসে বলে,
ভাইয়া তুমি বাসায় চলে যাও। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি। আমার শপিং মলে কিছু কাজ আছে তাই নুরকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি।
- চল আমিও যাবো সাথে।
- তুমি আমাদের সাথে যাবে? তুমি তো কখনো আমার সাথে শপিং এ যাও নি?
- আমারও কিছু কেনাকাটার প্রয়োজন আছে তাই আমিও যাবো। কথা না বাড়িয়ে চল।
- আচ্ছা চলো।
গাড়ি ওদের ইউনিভার্সিটির সামনের রোডে পার্ক করা। যার জন্য তাদের রাস্তা পার হতে হবে৷ তিন জন হেটে যাচ্ছিলো। হঠাৎ নুর থেমে যায়। নুরের শব্দ না পেয়ে সায়মা পিছনে তাকায়।
- কি হলো নুর?
- আসলে আমি রাস্তা পার হতে পারি না আমার ভয় লাগে। রাস্তা পার হতে গেলেই আমার মাথা ঘুরায়। মনে হয় যেনো এখনই কোন গাড়ির সাথে ধাক্কা খাবো। সব সময় আমার বাবা আমাকে হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দেয়।
- আরেহ এটা কোন ব্যাপার হলো। আসো আমার হাত ধরো আমি পার করিয়ে দিচ্ছি।
সায়মা নুরের হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে যায়। এতক্ষণ নুরের সব কথা সাদিফ ও মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।
সাদিফ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে। নুর ও সায়মা পিছনে বসছিলো তখনই সাদিফ বলে– কেউ একজন সামনে বসো। দুজনেই পিছনে বসলে আমার নিজেকে ড্রাইভার মনে হবে এবং নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ড্রাইভার নই।
নুর সায়মা কে বলে সামনে গিয়ে বসতে। সায়মা সামনে বসে ভাইয়ের পাশে। আর নুর পিছনে বসে।
চলবে
অনেক দিন পর পর্ব দিলাম। আসলে আমি অনেক অসুস্থ ছিলাম তাই এই কয়দিন দিতে পারি নি। আশা করি সবাই পাশে থাকবেন। জাযাকাল্লাহু খায়রান। ❤️