ফন্ট সাইজ:
থিম:
হেদায়েতের নুর

১৯তম পর্ব

লেখক: নাফিসা বিনতে সুলতানা

#হেদায়েতের_নুর

#নাফিসা_বিনতে_সুলতান

পর্ব:১৯

ফ্রেড: আমরা হারলাম তুই জিতলি। এই সবাই জোরে তালি দে সাদিফ ভাইয়ের জন্য।

ফ্রেড আর তার বন্ধুদের হইহুল্লোড় শুনে সবাই জোরো হয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এসব কিছু নূরের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে কোনো ভাবেই বুঝতে পারছে না এখানে এসব কি হচ্ছে কেনো হচ্ছে। এমন পরিবেশ দেখে সাদিফের জান যায় যায় অবস্থা হয়ে গিয়েছে। তার কোনো কিছু নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তার ভয় একটাই নুর যদি এখন তাকে ভুল বুঝে সে কি করবে তখন।

সাদিফ: ফ্রেড কি হচ্ছে এসব। এক্ষনি থামা এসব।

ফ্রেড: আরে কি বলিস থামবো মানে? তুই বাজি জিতে গেলি আনন্দ করবো না???

এই বলে ফ্রেড সাদিফের হাত ধরে ওকে নিয়ে লাফানো শুরু করে। সাদিফ আর নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না। ঝাড়া দিয়ে ফ্রেড কে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়। রাগে সাদিফ ঘামতে শুরু করেছে।

ফ্রেড: আরে আরে তুই রেগে যাচ্ছিস কেন ?? উল্লাস কর।

সাদিফ কিছু বলতে যাবে এর আগেই নুর বলে উঠে – এখানে কি হচ্ছে? কিসের বাজি কিসের উল্লাস?

সাদিফ: নুর তুমি আমার কথা শুনো।

সাদিফকে বলতে না দিয়ে ফ্রেড নূরের সামনে আসে।

ফ্রেড: ও কি বলবে আমি বলছি। সাদিফ তোমাকে নিয়ে বাজি ধরেছিলো আমার সাথে ।

নুর অবাক হয়ে একবার সাদিফের দিকে তাকায় তারপর আবার ফ্রেডের দিকে তাকায়।

নুর: আমাকে নিয়ে ????

ফ্রেড: হ্যাঁ তোমাকে নিয়ে। এই ইউনিভার্সিটির সবাই জানে তুমি কোনো ছেলের সাথে কথা বলো না পাত্তা দাও না। তাই সাদিফ বাজি ধরেছিলো সে তোমাকে তার প্রতি দূর্বল করে দেখাবে। তোমাকে দিয়ে আই লাভ ইউ বলাবে । তুমি আই লাভ ইউ না বললেও ওর প্রতি দূর্বল হয়েছো তাই ও জিতে গেছে ।

নুর কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। হাত পা অনবরত কাপছে। চোখে পানি জমা হয়েছে পলক ফেললেই টুপ করে পড়বে। নূরের এই অবস্থা দেখে সাদিফের অন্তর কেঁপে উঠে।

সাদিফ: নুর তুমি ওদের কথা শুনো না। তুমি আমার দিকে তাকাও আমার কথাটা শোনো।

নুর এবার সাদিফের দিকে তাকালো আর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরলো। এই দৃশ্য দেখার পর সাদিফের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। সাদিফের শরীর দ্বিগুণ গতিতে কাপছে।

নুর: ওরা যা যা বলছে সেটা কি সত্যি??

সাদিফ: নুর আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি ব্যাপারটা।

নুর: আমি শুধু জানতে চেয়েছি সত্যি কি না???

সাদিফ: নুর

নুর: হ্যাঁ কি না? চিৎকার করে।

সাদিফ মাথা নিচু করে ফেলেছে। সে কি বলবে বুঝতে পারছে না।

সাদিফকে মাথা নিচু করতে দেখে নুর এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তেই আছে।

নুর: কেনো করলেন আপনি এমন ? কেনো??? চিৎকার করে।

ফ্রেড: তোমার অহংকার ভাঙতে চেয়েছিলো। বলছিলো কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে ওর পিছনে ঘুরে আর তুমি কি জিনিস। তুমি সুন্দর না । বাজি না ধরলে তোমার দিকে ফিরেও তাকাতো না।

সাদিফ: তুই কি চুপ করবি নাকি না? এত বাড়াবাড়ি করছিস কেনো।

নুর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। নূরের দুনিয়া ঘুরছে।

সাদিফ: নুর তুমি আমার কথা টা শোনো তুমি আমাকে ভুল বুঝো না প্লীজ। আমি মানছি শুরু টা হয়েছিলো বাজি দিয়ে কিন্তু আমি জানি না কখন কিভাবে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

নুর: মিথ্যা বলা বন্ধ করুন আপনি । আর কত মিথ্যা বলবেন????

সাদিফ কাদতে কাদতে মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে। নূরের বোরকার কাপড় নিজের হাতে মুঠ করে সাদিফ কাদতে কাদতে বলে – আমি সত্যি তোমাকে ভালবাসি। তোমার জন্য আমার ভালবাসা মিথ্যা না। আমি তোমাকে কিভাবে বিশ্বাস করাবো।

চারিদিকে নীরবতা । শুধু সাদিফ আর নূরের কান্নার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।

সাদিফ : আমাকে মাফ করে দাও। একটাবারের মতো আমাকে সুযোগ দাও। আমি নিজেকে পাল্টে ফেলবো। আমাকে তুমি মাফ করে দাও।

নুর সাদিফের থেকে বোরকার কাপড় ছাড়িয়ে নিয়ে সেখান থেকে চলে যায় ।

সাদিফ এবার আর সহ্য করতে না পেরে জোরে চিৎকার করে কাদতে থাকে। ইউনিভার্সিটির সবাই বিস্ময় নিয়ে সাদিফের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদিফকে এতটা অসহায় আর দূর্বল তারা কখনও দেখে নি। ফ্রেডের মুখে দেখা যাচ্ছে একটা পৈশাচিক আনন্দ। ফ্রেড এবার সাদিফের সামনে দাড়িয়ে বলে– সব সময় হিরো হয়েছিস। সব সময় জিতেছিস। আজকে তুই আমার কাছে জিতে গেলেও নিজের কাছে হেরে গেছিস। রায়ান ইসলাম সাদিফ হেরে গেছে নিজের কাছে। আমি এইসব ইচ্ছে করে করেছি তোকে হারানোর জন্য। তোকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে আমার অনেক ভালো লাগছে জানিস।

এতক্ষণ যাবৎ সাদিফ সব শুধু শুনে গেছে কিচ্ছু বলে নি। এবার আর নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারে না সে। উঠে ফ্রেড আর ওর বন্ধুদের ইচ্ছেমত মার*ছে। ওরা এতজন মিলেও সাদিফকে সামলাতে পারছে না। সাদিফ দিক দিশা ভুলে গিয়ে উম্মাদের মতো ওদের মে*রেই যাচ্ছে। মার*তে মার*তে ওদের অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছে। সাদিফের এই রূপ দেখে কেউ তাকে থামানোর সাহস যোগাতে পারছে না। উপায় না পেয়ে তারা প্রিন্সিপাল কে খবর দেয়। সব টিচার এবং প্রিন্সিপাল এসে সাদিফকে থামায়। ফ্রেড আর ওর ফ্রেন্ডদের অবস্থা খারাপ দেখে তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। প্রিন্সিপাল সাদিফের বাবাকে খবর দিয়েছেন তার সাথে তাড়াতাড়ি দেখা করার জন্য।

**********************************

কিছুক্ষন আগেই আনিসুর রহমান প্রিন্সিপাল স্যার এর রুমে এসেছেন। প্রিন্সিপাল স্যার প্রচণ্ড রেগে আছেন। কয়দিন পর পর সাদিফের এই মারামারি করাতে সে অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন। ছেলের এত এত বিচার শোনার পর ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরেন আনিসুর রহমান। পুরো রাস্তায় তারা কেউ কারো সাথে কথা বলে নি।

বাসায় পৌঁছানোর পর আনিসুর রহমান তার রাগ ঝাড়তে শুরু করেছেন সাদিফের উপর।

আনিসুর রহমান: নাজমা তোমার ছেলেকে ভালো হয়ে যেতে বলো এখনো সময় আছে। বয়স তো আর কম হয় নি। আর কতদিন এসব করে বেড়াবে??

সাদিফ মাথা নিচু করে বাবার সব কথা শুনে গেছে আজ কোনো প্রতিবাদ করে নি। কিছুক্ষন পর রুমে গিয়ে সাদিফ নীচে বসে খাটের সাথে হেলান দেয়। চোখ দিয়ে শুধু তার পানিই পড়ছে।

*********************************

বাসায় এসে নুর মনমরা হয়ে শুয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না কারো সাথে। চোখের পানি পড়তে পড়তে পানি এখন শুকিয়ে গালে দাগ পড়ে গেছে। আয়েশা আক্তার মেয়ের অবস্থা দেখে তার পাশে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন– কি হয়েছে মা তোর? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

নুর: কিছু না আম্মু।

আয়েশা আক্তার: কিছুতো অবশ্যই হয়েছে। বল মা আমায় ।

নুর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। হঠাৎ মেয়ের এমন কান্না দেখে আয়েশা আক্তার ঘাবড়ে যান।

আয়েশা আক্তার: এই নুর কি হয়েছে তোর???

নুর আস্তে আস্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে তার মা কে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব বললো।

আয়েশা আক্তার: সাদিফ ছেলেটা যে এমন। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ওইদিন ও ওর বোনকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসলো দেখে তো অনেক ভদ্র মনে হচ্ছিলো। আমার মেয়েটার সাথে এমন কেনো হচ্ছে বার বার।

আয়েশা আক্তার অনেক ভেঙে পড়েছেন। বাংলাদেশে থাকতে অনেকবার নূরের বিয়ে ভেঙেছে তার একমাত্র কারন নূরের শ্যামলা গায়ের রং । উনি নূরকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন।

রাতে নুর তার বাবার কাছে গিয়ে বলে– আব্বু আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইবো তুমি কি আমাকে দিবে?

সিকদার আহমেদ: অবশ্যই দিবো। কি চাই তোমার মা?

নুর: আমি বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই।

সিকদার আহমেদ: হঠাৎ??

নুর: আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে আব্বু প্লীজ।

সিকদার আহমেদ: আচ্ছা ঠিক আছে কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশের থেকে ঘুরে আসবো ইন শা আল্লাহ্।

নুর: আজই যাবো আব্বু।

সিকদার: আজ? কি বলো তুমি এসব।

নুর: প্লীজ আব্বু মানা করবেন না ।

সিকদার: আচ্ছা দেখছি।

তিনি সব ঠিকঠাক করে জানালেন ভোর ৫ টায় ফ্লাইট। যে যার মতো পেকিং করতে চলে যায়। সব গোছগাছ করে নুর সারারাত জায়নামাজে কাটিয়ে দেয় কাদতে কাদতে ।

************************************

সাদিফকে রাতে নাজমা বেগম জোর করেও খাওয়াতে পারেন নি। ফজরের নামাজের পর তিনি সাদিফকে চেক করার জন্য তার রুমে যান। তিনি দুই তিনবার নক করার পরও সাদিফের সাড়াশব্দ না পেয়ে রুমে প্রবেশ করেন। রুমে গিয়ে তিনি দেখেন সাদিফ ফ্লোরে পড়ে আছে। তিনি সাদিফকে ঝাকি দিয়ে ডাকার পরও সাদিফ নড়েচড়ে না। তিনি সাথে সাথে আনিসুর রহমানকে ডাক দেন। তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করে সাদিফকে হাসপাতালে নেয়া হয়।

অন্যদিকে নুররা এয়ারপোর্টে পৌছায়। সব কাজ শেষ করে প্লেন ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

চলবে।

কেমন লাগছে জানাবেন

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন