#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২১
কপি করা নিষেধ।
বাংলাদেশে আসার পর থেকে নুর বেশ চুপচাপ। তার মা বাবা এটা লক্ষ্য করেছেন। যে মেয়ের মুখ সব সময় হাসিখুশি থাকতো সে এমন মনমরা হয়ে থাকলে যে কারো চোখে লাগবে। মরিয়ম বিভিন্ন ভাবে বোনের মন ভালো করার চেষ্টা করেছে। নুর বোনের মন রক্ষার জন্য হেসেছে। কিন্তু সেই হাসি দেখেই বুঝা যায় জোর করে হাসছে। আয়েশা আক্তার অনেকবার নূরকে জিজ্ঞেস করেছে তার মন এত খারাপ কেনো। কিন্তু নুর তেমন কিছুই বলে না একবারও। তার বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ১০ দিন হয়ে গেছে। নুর বাংলাদেশে আসার পরের দিনই সুমাইয়া ছুটে এসেছে নূরের কাছে। ছোট বেলা থেকে বেস্টফ্রেন্ড বলে কথা। একজন আরেকজন কে ছাড়া থাকতেই পারে না। সুমাইয়া এসেই নূরকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলো অনেকক্ষণ। নূরের মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করলে নুর সুমাইয়াকে শুরু থেকে সব খুলে বলে। দুই বান্ধবীর মধ্যে গোপন বলতে কিছু নেই। তার সব সময় নিজেদের মনের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়। পুরো ঘটনা শুনে তো সুমাইয়া রাগে গজগজ করতে থাকে।
সুমাইয়া: কি মনে করে কি সেই ছেলে নিজেকে? কত বড় সাহস আমার জানের টুকরার মনে এভাবে কষ্ট দেয়। এই নুর খবরদার এমন বাটপার ছেলের জন্য মন খারাপ করে বসে থাকবি না বলে দিলাম আমি।
নুর: ওর ব্যবহারের থেকে আমি বেশি কষ্ট কিসে পাচ্ছি জানিস?
সুমাইয়া: কিসে?
নুর: আমি ওকে ঘৃণা করতে চাই কিন্তু পারছি না। আমি ওকে ভুলার জন্য বাংলাদেশে চলে আসলাম তাও আমার মাথায় ওর কথায় ঘুরছে। আমার সাথে এমন কেন হচ্ছে বল তো?
সুমাইয়া: ভালবাসিস অনেক?
নুর: জানি না। কিন্তু আসতে আসতে ওর প্রতি একটা টান অনুভব হতে শুরু করেছিল। কিন্তু ও যে বাজি ধরে এসব করছে বুঝতে পারি নি। আমি আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করছি যেনো তিনি আমাকে সাদিফকে ভুলতে সাহায্য করেন। কিন্তু দিন শেষে ভুলতে পারছি না। আল্লাহ আমার জন্য কি পরিকল্পনা করে রেখেছেন আমি জানি না।
সুমাইয়া: নিঃসন্দেহে আল্লাহর পরিকল্পনা সবচেয়ে উত্তম। তিনি তোর জন্য যা ভেবে রেখেছেন নিশ্চই এতে তোর কল্যাণ আছে। আল্লাহ তাদেরকেই পরীক্ষা করেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন।
নুর: হ্যাঁ। আমি আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা করি। তিনি যা করবেন উত্তমটাই করবেন।
সুমাইয়া: এখন তুই কি করতে চাচ্ছিস? বাংলাদেশেই থাকবি নাকি আবার চলে গিয়ে ওখানে পড়াশোনা কন্টিনিউ করবি?
নুর: আমি এখনো এসব নিয়ে কিছু ভাবি নি। পড়ে ভেবে দেখবো।
সুমাইয়া: একটু আগে আন্টির সাথে কথা বলছিলাম তিনি তোর জন্য আবার ছেলে দেখা শুরু করেছেন।
নুর: ওহ।
সুমাইয়া: তুই কি এখন বিয়ে করতে চাস?
নুর: আমি এখন কিছুই চাই না। আমার কোনো চাওয়া নেই। আল্লাহ যা করবেন ভালোর জন্যই করবেন। যা আমার নসিবে আছে মেনে নিবো।
সুমাইয়া আর কিছু বললো না। নিজে হাতে তুলে নূরকে খাইয়ে দিলো। সুন্দর করে নূরের মাথায় তেল দিয়ে মাসাজ করে দিয়ে চুল বেণী করে দিলো। এই ১০ দিন ধরে সে প্রতিদিন নূরের বাসায় আসে। নূরের সাথে নানা কথা বলে নূরের মন ভালো করার চেষ্টা করে ।
......................................................................................
এই ১০ দিনে সাদিফের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সে এখন অনেক সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে। এখন সে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করে। প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে আগের গুনাহের জন্য মাফ চায়। প্রতিদিন নূরকে আল্লাহর কাছে চায়।
সাদিফ: ইয়া আল্লাহ আপনি তো বলেছেন আমাদের যা কিছু প্রয়োজন আপনার কাছে চেয়ে নিতে । আমি আপনার কাছে নূরকে চাই। হালাল ভাবে চাই। আমার নিয়তে কোনো ধরনের খারাপ কিছু নেই। আমি জানি আমি অনেক ভুল করেছি। আমার ভুলের জন্য নুর অনেক কষ্ট পেয়েছে। আপনি নূরকে হালাল করে দেন আমার জন্য । আমি ওর রাগ ভাঙাতে চাই। আমি ওর দুনিয়া এবং আখিরাতের সঙ্গী হতে চাই। আমি ওকে নিয়ে আপনার দ্বীন পালন করতে চাই। আমি ওর কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাই। ইয়া আল্লাহ আমি ওকে যখন প্রথম দেখেছি তখন থেকে এক অদ্ভুত টান অনুভব করেছি ওর প্রতি। শুরু থেকেই ওর প্রতি আমার মায়া কাজ করেছে। ইয়া আল্লাহ আমি ওকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। আপনি আমাকে ওর যোগ্য করে তুলুন। হালাল ভাবে মিলিয়ে দিন আমাদের।
অঝোরে কেঁদে কেঁদে রাত কেটেছে সাদিফের। সে নূরকে ছাড়া আর অন্য নারীর দিকে কোনো দিনও তাকাতেও চায় না। সে নূরকে দেখে তার সারাটাজীবন পার করতে চায়।
সাদিফের এই পরিবর্তনে তার পরিবার সবাই খুশি। বিশেষ করে নাজমা আক্তার । তিনি তো প্রতিদিন আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন । ইউনিভার্সিটিতে সাদিফকে দেখে সবাই অবাক। মাথা নিচু করে যায়। ক্লাস শেষ করে মাথা নিচু করে বসে চলে আসে। কোনো মেয়ের দিকে ভুলেও তাকায় না। এখন তার সম্পূর্ণ মনযোগ পড়াশোনার দিকে ।
.................................................................................
সকালে আনিসুর রহমান পেপার পড়ছেন এমন সময় সাদিফ তার রুমে নক করে।
সাদিফ: আসবো আব্বু?
আনিসুর: হ্যাঁ বাবা আসো। আমার রুমে আসার জন্য তোমার পারমিশন চাওয়ার দরকার নেই।
সাদিফ: বাবা আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
আনিসুর: হ্যাঁ বলো।
সাদিফ: আমি কোম্পানিতে জয়েন করতে চাই।
আনিসুর একটু অবাক হন। তার ছেলে নিজে থেকে কোম্পানিতে জয়েন করতে চাচ্ছে!
আনিসুর: কিন্তু তোমার পড়ালেখা তো এখনো শেষ হয়নি?
সাদিফ: আমি তো এখন ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিলাম। আর মাত্র একটা বছর বাকি আছে পড়ালেখা শেষ হতে। পড়ালেখার পাশাপাশি আমি কোম্পানিতে জয়েন করতে চাই। এখন থেকে কাজ বুঝে উঠলে পড়ে আমার জন্য সব গুছিয়ে নেয় সহজ হবে ।
আনিসুর রহমান ছেলের এত মিচিউরিটি দেখে অনেক খুশি হন। তিনি উঠে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন।
আনিসুর: আমি তোমার উপর অনেক সন্তুষ্ট বাবা। তুমি আগামীকালই জয়েন করবে ইন শা আল্লাহ্।
সাদিফ: ইন শা আল্লাহ্।
সে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। বারান্দায় দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
সাদিফ: নুর তোমাকে তোমার বাবার কাছ থেকে চেয়ে নেয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলছি। খুব শীঘ্রই আসছি তোমার বাবার থেকে তোমাকে হালাল ভাবে চেয়ে নিতে। একবার তোমার বাবা রাজি হোক আমি সারাজীবন তোমার পিছন ঘুরে তোমার রাগ ভাঙ্গাবো।
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
আজ ১ সপ্তাহ হলো সাদিফ অফিসে জয়েন করেছে। পড়ালেখা এবং অফিস দুটোকেই অনেক সুন্দরভাবে হ্যান্ডেল করছে সে। এই এক সপ্তাহেই তার ব্যবহার এবং কাজের ধরন দেখে সবাই তার অনেক প্রশংসা করছে। ছেলের এত উন্নতি দেখে আনিসুর রহমানের বুক গর্বে ফুলে উঠছে।
দুপুরে খাবার শেষে সাদিফ তার মা বাবাকে এক সাথে নিয়ে বসে ।
নাজমা আক্তার: কিছু বলবি বাবা?
সাদিফ: আমি তোমাদের কাছে কিছু চাই।
আনিসুর: আমার সব তো তোর ই বাবা কি চাস তুই বল আমায়?
নাজমা এবং আনিসুর উত্তরের আশায় সাদিফের দিকে তাকিয়ে আছেন। সাদিফ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে উঠে,
সাদিফ: আমি তোমাদের নিয়ে বাংলাদেশে যেতে চাই।
চলবে।
কেমন লাগছে জানাবেন🩷