#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২২
কপি করা নিষেধ।
হঠাৎ সাদিফের কথা শুনে নাজমা আক্তার এবং আনিসুর রহমান অবাক হয়ে যান। সায়মা এবং সাদিফ যখন ছোট তখন তারা বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে সেটেল হয়েছেন । এই ২০ বছরের মধ্যে তারা আর বাংলাদেশে যায় নি। পরিবারের সবার সাথে ভিডিও কলে কথা হয়। ২০ বছর পর হঠাৎ সাদিফের মুখে বাংলাদেশে যাওয়ার কথা শুনে বেশ অবাকই হয়েছেন তারা।
আনিসুর: হঠাৎ বাংলাদেশে যেতে চাচ্ছো যে? আগে তো কখনো আগ্রহ প্রকাশ করো নি।
সাদিফ: কারণ আছে বাবা।
আনিসুর: আমি জানি সেটা। আমি তোমার বাবা তুমি যে কারণ ছাড়া কিছু করো না আমি সেটা ভালোভাবেই জানি। এখন কারণ টা বলো।
সাদিফ: বাবা আমি নূরকে বিয়ে করতে চাই।
আনিসুর: নুর? কে সে?
নাজমা আক্তার: তুই কি সায়মার বান্ধবীর কথা বলছিস?
সাদিফ: হ্যাঁ।
নাজমা: আরে এটা তো অনেক ভালো কথা। মেয়েটা ভারী মিষ্টি। সায়মার সাথে যখন প্রথম আমাদের বাসায় এসেছিলো প্রথম দেখাতেই আমার ওকে পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো।
আনিসুর: মেয়েটা অনেক ভদ্র আমারও পছন্দ হয়েছে ওকে। তাহলে ওর পরিবারের সাথে কথা বলা দরকার। কিন্তু এর সাথে বাংলাদেশে যাওয়ার কি সম্পর্ক?
সাদিফ: কারণ নুর ওর পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে।
আনিসুর: হঠাৎ কেনো?
সাদিফ মাথা টা নিচু করে বলে, আমার জন্য।
আনিসুর এবং নাজমা ব্রু কুচকে সাদিফের দিকে তাকায়।
তোমার জন্য মানে?
সাদিফ মাথা নিচু করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বলে। এতক্ষনে সায়মা ও নিচে এসেছে। সায়মা তার ভাইয়ের সব কথা শুনে থ হয়ে দাড়িয়ে আছে। তার ভাই এমনটা করতে পারে তার বিশ্বাসই হচ্ছে না ।
সায়মা: ভাই তুমি কিভাবে করতে পারলে এটা? তোমার বিবেকে বাঁধলো না? ও একটা সরল সোজা মেয়ে ওর উপর বাজি ধরে ভালবাসি বলানোর জন্য তুমি এসব করছিলে? ছিঃ ভাই! এর জন্যই তো আজ ১৫ দিন ওর কোনো খবর নেই। আমি কোনো ভাবে ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। নুর তো নিশ্চই আমাকেও ভুল ভাবছে। যে আমি সব জানি। তুমি এটা কেন করলে ভাই?
সায়মা কান্না করতে করতে সোফায় বসে পড়ে ।
নাজমা আক্তার: তোকে কি আমি এই শিক্ষা দিয়েছি সাদিফ? তুই আমার ছেলে হয়ে এমন করতে পারলি? তোর চিন্তা ধারা এতটা নিচ হয়ে গেছে। আমার ভাবতেই অবাক লাগছে। কি শান্ত মেয়েটা। সেই মেয়ের মনে তুই এভাবে আঘাত দিলি ? তোর মনে হয় ও তোকে মাফ করবে?
সাদিফ এতক্ষন বোন এবং মায়ের কথা মাথা নিচু করে শুনে গেছে।
সাদিফ: আমি আমার কাজের জন্য অনুতপ্ত। আমি কখন নাটক করতে করতে সত্যি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি টের পাইনি। আমি সারাজীবন ওর কাছে মাফ চেয়ে যাবো।
আনিসুর: আমি নূরের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো না।
বাবার এ কথা শুনে সাদিফ চমকে উঠে।
সাদিফ : তুমি কি বলছো বাবা!
আনিসুর: ঠিকই বলেছি। তুমি কিভাবে পারলে মেয়েটার মন নিয়ে খেলতে? বিবেকে বাঁধলো না তোমার? তুমি আবার ওকে কষ্ট দিবে না এর কি গ্যারান্টি আছে? আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তুমি ওর চেহারা নিয়েও আজেবাজে কথা বলেছো তখন। তোমার সাথে নাকি তাকে মানায় না। যাও তোমার সাথে যাকে মানায় এমন রূপসী মেয়ে বিয়ে করো। নূরের জীবন তোমার জন্য আমি নষ্ট হতে দিবো না।
সাদিফ সাথে সাথে বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসে।
সাদিফ : বাবা বিশ্বাস করুন আমি নূরকে অনেক বেশি ভালোবাসি। আমার ভালবাসা মিথ্যে না। আমি জানি আর আমার আল্লাহ জানে আমি নূরকে কতটা ভালবাসি। আমি আগে বোকা ছিলাম বুঝি নি। আমার চোখে নুর এই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারী। ওকে ছাড়া অন্য নারীর কথা আমি ভাবতেও পারি না। আমার জীবনে কোনো হুরের প্রয়োজন নেই আমি শুধু নূরকে চাই। আল্লাহ যদি আমাকে জান্নাতী হিসেবে কবুল করেন তখন ও আমি কোনো হুর চাবো না। আমার সঙ্গী হিসেবে শুধু নূরকে চাবো। ও তো আমার হেদায়েতের নুর। আল্লাহ ওর উছিলায় আমাকে হেদায়েত দান করছেন । আমার ছন্নছাড়া জীবনটাকে গুছিয়ে দিয়েছেন । আমি নূরকে ছাড়া আর কাউকে চাই না । আমায় নূরকে হালাল ভাবে এনে দিন বাবা। সাদিফ বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাদছে আর বাবাকে এসব কথা বলছে।
সাদিফ: নুর যখন আমাকে ভুল বুঝে চলে গেলো আমার নিজেকে শূন্য মনে হয়েছে। আমার জীবন থমকে গিয়েছিলো। আমি ওকে ছাড়া আমার জীবন কল্পনাও করতে পারছি না। আমার ভুলের এত বড় শাস্তি আমায় দিবেন না বাবা। কাদতে কাদতে সাদিফের হেঁচকি উঠে গিয়েছে। আনিসুর রহমান নাজমা আক্তার কে ইশারায় পানি আনতে বলেন। তিনি উঠে গিয়ে সাদিফের জন্য পানি নিয়ে আসেন।
সাদিফ পানি খেয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে ।
আনিসুর রহমান : সত্যি ভালোবাসো নূরকে?
সাদিফ: নিজের থেকেও বেশি। ওকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি।
আনিসুর: কখনো কষ্ট দিবে না তো নূরকে?
সাদিফ: না কখনো না। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে ওকে ভালো রাখার চেষ্টা করবো। সুখে দুঃখে ওর পাশে থাকবো ইন শা আল্লাহ্।
আনিসুর: যাও ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আমরা কাল বাংলাদেশে যাচ্ছি।
সাদিফ অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকায়।
সাদিফ : সত্যি বাবা?
আনিসুর মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়ায়। সাদিফ এক সেকেন্ড ও দেরি না করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। আনিসুর রহমান ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বাবা ছেলেকে দেখে নাজমা আক্তার এবং সায়মা মুচকি হাসে।
সায়মা: চলো ভাইয়া আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড ভাবীকে নিয়ে আসার জন্য তৈরি হই।
সাদিফ চোখের পানি মুছে সায়মা সামনে দাঁড়ায়।
সাদিফ;: তুই আমাকে মাফ করেছিস?
সায়মা: করি নি। কিন্তু করবো একটা শর্ত আছে।
সাদিফ ব্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে– কি শর্ত?
সায়মা: আমার ভাবীকে অনেক খুশি রাখতে হবে। ওর রাগ ভাঙ্গাতে হবে। ওর চোখে কখনো পানি আসতে দেয়া যাবে না। কি রাজি তো?
সাদিফ: ১০০% রাজি।
দুই ভাইবোন হেসে ফেলে।
আনিসুর: কিন্তু আগে তো নূরদের বাংলাদেশের ঠিকানা বের করতে হবে তাই না?
সাদিফ তার হাত দিয়ে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলে– আসলে আমি ওদের ঠিকানা বের করে তারপরই তোমাদের সাথে কথা বলতে এসেছি।
সায়মা, নাজমা আক্তার, আনিসুর রহমান একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোড়ে হেসে ফেলে। সাদিফ তাদের হাসি শুনে নিজের রুমে মাথা নিচু করে চলে যায় ।
সায়মা: ভাইয়া বোধহয় লজ্জা পেয়েছে।
আরেকদফা হাসাহাসি শুরু হয়।
*****************************************
আয়েশা আক্তার উঠে পরে নূরের জন্য ছেলে দেখা শুরু করেছেন। সে মনের প্রাণে চেষ্টা করছে এবার সে মেয়েকে বিয়ে দিবেই। কয়েকজন পাত্রপক্ষ নূরকে দেখে গেছে। কিন্তু তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। আয়েশা আক্তার হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। একটা ভালো ছেলের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলে তার চিন্তা কমবে ।
নুর মায়ের কোথায় ছেলের পক্ষের সামনে বসছে। যে যা বলছে তাই শুনছে। সে একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। রাতের পর রাত অঝোরে কেঁদেছে জায়নামাজে আল্লাহর কাছে। চোখ বন্ধ করলেই সাদিফের চেহারা ভেসে উঠছে । এমন তো হওয়ার কথা না। তার তো সাদিফকে ঘৃণা করার কথা। তাহলে চোখ বন্ধ করলেই কেন সাদিফকে দেখতে পাচ্ছে। কেন তার কথা মনে করে এত কষ্ট পাচ্ছে। এইসব প্রশ্নের জবাব নেই নূরের কাছে।
চলবে
কেমন লাগছে জানাবেন।🫶