#হেদায়েতের_নুর
#নাফিসা_বিনতে_সুলতান
পর্ব: ২৩
সাদিফ প্লেনে বসে আছে। সে এবং তার পুরো পরিবার আজকে বাংলাদেশে যাচ্ছে। দীর্ঘ কতগুলো বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখবে তারা। সায়মা তো প্রচণ্ড খুশি। বাংলাদেশের কথা তার তেমন একটা মনে নেই। কারণ তারা যখন চলে এসেছে তখন সে অনেক ছোট ছিলো। নিজের দেশকে অনুভব করার জন্য প্রহর গুনছে সে। আনিসুর রহমান এবং নাজমা আক্তার ও বেশ খুশি। ছেলের উছিলায় নিজ দেশে যাওয়া হচ্ছে।
সাদিফ প্রত্যেকটা মুহূর্ত গুনছে। আর কিছুটা সময় তারপরই তার নূরকে সে দেখবে। আজ প্রায় এক মাস হতে চললো সে নূরকে দেখে না। তার চোখ নূরকে এক পলক দেখার জন্য তৃষ্ণার্থ হয়ে আছে। তবে সে তার চোখের তৃষ্ণা নূরকে হালাল ভাবে পাবার পর মিটাবে। সাদিফ সবসময় চিন্তা করে সে নূরকে দেখেই এক জীবন পার করে দিতে পারবে। এত দেখে তবুও যেনো মন ভরে না।
******************************************************
কিছুক্ষন আগে সাদিফদের ফ্লাইট লেন্ড করেছে। তারা সবাই এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই নিজের দেশের মাটির ঘ্রাণ নিচ্ছে মন ভরে। এরই মধ্যে সাদিফের চাচা,মামা সবাই এসে হাজির এয়ারপোর্টে। সবার সাথে কথা বলে গাড়িতে উঠে তারা পারি দেয় বাসার উদ্দেশ্যে ।
বাসায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই সব চাচী, ফুপিরা ঘিরে ধরেছে সাদিফদের। তাদের আসার খবর পেয়ে সাদিফের মামা মামীরাও এসেছেন দেখা করতে। সব সময় ভিডিও কলে কথা হয়। কত বছর পর সামনা সামনি দেখছে একেওপরকে। সায়মা এত ভালোবাসা পেয়ে খুশীতে গদগদ করছে। তার যে এত খুশি ধরছেই না। বাহারি খাবার দাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। সবাই মিলে খেতে বসেছে। কাজিনরা সবাই একত্রে আড্ডার আসর বসিয়েছে। তারা খুব আগ্রহ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সব ঘটনা শুনছে। সাদিফ সবার জন্য টুকিটাকি গিফট নিয়ে এসেছে। আনিসুর রহমান এত বছর পর ভাইদের পেয়ে তাদের সাথে আড্ডায় মেতেছেন । বাড়িতে আজ উৎসব মুখোর পরিবেশ।
সবাই ক্লান্ত থাকার কারণে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজিনদের রাত জেগে আড্ডা দেয়ার প্ল্যান ছিলো। কিন্তু সাদিফ এবং সায়মা অনেক ক্লান্ত থাকার কারনে তাদের কে রেস্ট নিতে দিয়েছে। আড্ডা পরেও দেয়া যাবে।
***************************************************
ফজরের নামাজ পড়ে নুর আবার ঘুমিয়ে ছিলো। ইদানিং তার শরীরটা অনেক দূর্বল। প্রায় সময় সে শুয়ে থাকে। এই এক মাসের মধ্যে সে আরও শুকিয়ে গেছে।
মরিয়ম এসে নূরকে ডাকতে শুরু করে।
মরিয়ম: আপু? এই আপু? উঠ না।
নুর হালকা চোখ মেলে তাকায়। ঘুমে সে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না। প্রায় রাত সে সেজদায় কাদতে কাদতে নির্ঘুম কাটিয়েছে। গতকাল ও তাই করেছে। ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়েছে সে। এর মধ্যে ছোট বোনের ডাকাডাকি শুরু হয়ে গিয়েছে।
নুর: কি হয়েছে এভাবে ডাকাডাকি করছিস কেনো?
মরিয়ম: আম্মু তোমায় উঠতে বলেছে।
নুর: কেনো?
মরিয়ম: তা তো জানি না। আমাকে বললো তোমাকে যেনো ঘুম থেকে তুলি।
নুর: কয়টা বাজে এখন?
মরিয়ম: সাড়ে নয়টা।
নুর এবং মরিয়মের কথার মাঝেই আয়েশা আক্তার রুমে প্রবেশ করেন
আয়েশা: উঠে গেছিস?
নুর: জ্বি আম্মু। কিন্তু আজ হঠাৎ ডেকে তুললে যে?
আয়েশা: আরে দরকার আছে তাই তো ডাকছি। উঠে হাত মুখ ধুয়ে এই কাচা হলুদের লেপ টা মুখে লাগিয়ে নে তো। মুখটা গ্লো করবে।
নুর: হঠাৎ কাঁচা হলুদ?
আয়েশা: আজকে তোকে দেখতে আসবে।
নুর: ওহ। সে তো সব সময়ই আসে।
আয়েশা: হুম । আমি চাই তোর বিয়েটা হয়ে যাক। আল্লাহর কাছে কত দোয়া করছি যেনো তিনি একটা ভালো পাত্র মিলিয়ে দেন তোর জন্য। তারা দুপুরে আসবে । এর মধ্যে সব কাজ শেষ করে তৈরি হয়ে যা। আর মরিয়ম তুই আমার সাথে আয় আমাকে সাহায্য করবি। অনেক কাজ পড়ে আছে ।
আয়েশা আক্তার এবং মরিয়ম উঠে রান্না ঘরে চলে যায়।
নুর হলুদের বাটি হাতে নিয়ে খাটেই বসে থাকে কিছুক্ষণ। মনটা তার বিষন্ন হয়ে আছে। সে ছলছল চোখে জানালা দিয়ে আকাশ পানে তাকায় আর বলে,
নুর: ইয়া আল্লাহ। আমার ভালো আমি বুঝি না কিন্তু আপনি বুঝেন। আপনি যেটা আমার জন্য কল্যাণকর মনে করেন সেটাই করুন। আপনি আমার মনে শান্তি দান করুন। আমার মনের ভিতর কেমন লাগছে কেউ না বুঝলেও আপনি বুঝেন।
নুর চোখের পানি মুছে বাথরুমে চলে গেলো।
দুপুরে নূরকে সুন্দর ভাবে তৈরি করে দিয়েছেন আয়েশা আক্তার। নুর চুপচাপ বসে আছে। মুখে নেই কোনো হাসি। আয়েশা আক্তার সব গোছগাছ করে পাত্র পক্ষের আসার অপেক্ষা করছেন।
*********************************************"*
সাদিফ হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো সব ঠিক আছে কিনা? সাদা পাঞ্জাবী,সাদা পায়জামা হাতে ঘড়ি, চুল গুলো কপালে আঁচড়ে পড়ে আছে । নাহ দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। নিজের গেট্যাপ পছন্দ হয়েছে তার। একটু পরই নূরকে দেখবে। মেয়েটা তাকে দেখে কি পরিমান অবাক হবে? আজ সে নূরকে তার বাবার কাছে হালাল ভাবে চাইতে যাচ্ছে। আয়নায় নিজেকে দেখে মুচকি মুচকি হাসছে সাদিফ।
সায়মা: খুশীতে পাগল হয়ে গেলে নাকি ভাইয়া?
সাদিফ দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে সায়মা তার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে।
সাদিফ ব্রু উঁচু করে সায়মার দিকে তাকায়।
সাদিফ : কি সমস্যা এমনে দাঁত কেলাচ্ছিস কেন?
সায়মা: না বলছিলাম যে তুমি আয়নার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হেসে কি ভাবছিলে? নুর কে দেখার তর সইছেনা বুঝি?
সাদিফ: আমি না তোর বড় ভাই হই? আমাকে টিজ করতে লজ্জা লাগছে না তোর?
সায়মা: না। (দাঁত কেলিয়ে)
সাদিফ: তবে রে
এই বলে সাদিফ দৌড় দিতে গেলে সায়মা আগেই দৌড়ে পালিয়ে যায়। সাদিফ থেমে গিয়ে ঘাড় চুলকে হেসে উঠে।
সাদিফ: নুর ম্যাডাম আসলেই আপনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছেন ।
নূরদের বাসায় সাদিফ, তার বাবা–মা, সায়মা এবং দুই চাচী যাচ্ছে। অন্য কোনো ছেলে মানুষ সাথে নিচ্ছে না। কারণ অন্যদের দেখা দেয়া পর্দার খেলাফ। সাদিফ চায় না এমনটা হোক। সে পুরোপুরি ইসলামিক নিয়ম কানুন মেনে চলতে চায়।
নুরদের বাসায় পৌঁছানোর পর নূরের বাবা গেট খুলে দেন। সবাইকে বসতে দেয়া হয়। সায়মা এবং সাদিফকে দেখে আয়েশা আক্তার এবং সিকদার আহমেদ অবাক হোন। তারা একে অপরের দিকে একবার তাকালেন। পাত্রপক্ষের কথা তাদেরকে একজন মহিলা জানিয়েছে। সাদিফের পরিবার থেকেই সেই মহিলার মাধ্যমে নুরদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। তারা সাদিফের পুরো নাম জানতেন না এবং সাদিফের বাবার নাম জানতেন না বলে বুঝতে পারেন নি কিছু। কিছুক্ষন আলোচনার পর তারা জানতে পারেন সাদিফ হচ্ছে পাত্র। সিকদার আহমেদ এবং আয়েশা আক্তার সাদিফকে যখন প্রথম দেখেছিলেন তখনই পছন্দ করতেন। ছেলেটার আচরণ তাদের অনেক ভালো লেগেছিলো । দুপুরে খাওয়া দাওয়া পর্ব শেষ করার পর নূরকে তাদের সামনে আনা হয়। মরিয়ম গিয়ে নূরকে নিয়ে আসে। নুর মাথা নিচু করে আসতে থাকে । কোনো দিকে তাকায় না। সাদিফ আড়চোখে বার বার নূরকে দেখছে। কতগুলো দিন সে দেখে নি নূরকে। মেয়েটা রোবটের মতো হেঁটে আসছে। মাথাটা উপরে পর্যন্ত তুলছে না। নূরকে সোফায় বসানো হলো। নাজমা আক্তার বলছেন – মা শা আল্লাহ্। অনেক সুন্দর লাগছে নূরকে। ও যখন সায়মার সাথে প্রথম আমাদের বাসায় এসেছিলো তখনই আমার মনে ধরেছিলো ওকে। কি মিষ্টি মেয়ে। এই কথা শুনে নূরের বুকটা কেঁপে উঠে। উনার গলার আওয়াজ টা চেনা চেনা লাগছে না? আর উনি মাত্র সায়মার নাম নিলেন না? নূরের শরীর কাপতে শুরু করে। সে আস্তে আসতে চোখ তুলে সামনে তাকায়। তাকিয়েই প্রথমে নাজমা আক্তার কে দেখতে পায়। তার পাশে আনিসুর রহমান। অন্যদিকে দুইজন মহিলা এদেরকে নুর চিনতে পারলো না। তার বাম পাশে তাকাতেই দেখতে পায় সায়মাকে। সায়মা কে দেখে নুর চমকে উঠে। সায়মার পাশে তাকাতেই দেখতে পায় সাদিফকে। সাদা পাঞ্জাবিতে। সাদিফ এতক্ষন ধরে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। নুর যখন সাদিফের দিকে তাকায় দুইজনের চোখাচোখি হয়ে যায়। নুর সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেয়। নুর অস্থির হয়ে উঠছে। কি হচ্ছে তার সাথে ? সাদিফ এখানে কেনো? মাথা কাজ করছে না তার এখন। কিছুক্ষন কথাবার্তা বলার পর নাজমা আক্তার বলেন– আমাদের নূরকে অনেক পছন্দ। আমার ছেলের জন্য বউ করে নিতে চাই। আপনারা যদি রাজি থাকেন তাহলে আজকেই পাকা কথা বলতে চাই আমরা।
আয়েশা আক্তার সিকদার আহমেদ এর দিকে তাকালেন।
সিকদার: আগে আমার মেয়ের থেকে জানতে হবে সে রাজি কিনা? এটাই নিয়ম। এটাই সুন্নত আগে মেয়ের মত নেয়া। মরিয়ম তুমি নূরকে রুমে নিয়ে যাও আমি আর তোমার আম্মু আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে।
বাবার কথামতো মরিয়ম নূরকে রুমে নিয়ে আসে। নুর চিন্তায় হাসফাস করছে। কি করবে সে? তার কি সাদিফকে বিয়ে করা উচিৎ? সাদিফ কি আসলেই ভালো। সে যে অভিনয় করেছে সেটার পর নুর কিভাবে সাদিফকে বিয়ে করতে পারে? নুর মনে মনে কথা গুছাতে থাকে কিভাবে বাবা মা কে এই বিয়ের ব্যাপারে মানা করবে ।
নুর চলে যাওয়ার পর সিকদার আহমেদ যখন উঠতে যাবেন তখনই সাদিফ তার সামনে এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ হাঁটু গেঁড়ে বসে সিকদার আহমেদ এর সামনে।
সিকদার আহমেদ এবং আয়েশা আক্তার সাদিফের এই কান্ডে থতমত খেয়ে যান।
সিকদার: আরে আরে কি করছো তুমি এভাবে নিচে বসলে কেন?
সাদিফ সিকদার আহমেদ এর হাত টা নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।
সাদিফ: আঙ্কেল। আমি নূরকে অনেক পছন্দ করি। আমি কোনদিনও ওর সাথে হারাম কোনো সর্ম্পকে জড়ায়নি। আমি সব সময় চেয়েছি হাল্যালভাবে ওকে পেতে। আপনার থেকে ওকে চেয়ে নিতে চেয়েছি। নিজেকে ওর যোগ্য করার জন্য দিন রাত পরিশ্রম করেছি। পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করেছি। আমি দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি নূরকে হালাল ভাবে পাওয়ার জন্য। আপনি আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিবেন না। আমি আপনাকে প্রমিজ করছি আমি কখনও ওকে কষ্ট দিবো না। আমি নূরকে আল্লাহর জন্য ভালবাসি। আমি আমার সর্বচ্চো চেষ্টা করবো ওকে খুশি রাখার। ছায়ার মতো সারাজীবন পাশে থাকবো ওর। আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন আঙ্কেল। আমাকে খালি হতে ফিরিয়ে দিবেন না আপনি।
সিকদার আহমেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন সাদিফের দিকে। সাদিফের চোখে পানি চিকচিক করছে। চোখের পলক ফেললেই টুপ করে পড়বে। সাদিফ যে প্রতেকটা কথা মন থেকে বলেছে এটা তার চোখ দেখলেই বুঝা যায়। তিনি সাদিফের কাধে হাত রেখে উঠে চলে যান নূরের রুমে। আয়েশা আক্তার ও তার পিছু পিছু যান।
কি মনে হয় নুর কি উত্তর দিবে?
চলবে।