#পর্ব_৬
#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা
#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
ছাদের চারপাশে তখন হালকা বাতাস বইছে।
সূর্য প্রায় ডুবে গেছে। কমলা আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় নীল রঙে ঢেকে যাচ্ছে।
কিন্তু শিকদার বাড়ির ছাদ এখনো জমজমাট।
কেউ ছবি তুলছে, কেউ রিল বানাচ্ছে, কেউ আবার একে অপরকে নিয়ে মজা করছে।
সাহিল এখনো আরিয়ার তোলা ছবির শক সামলাতে পারে নি।
সে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
— “ভাই আমি তো এত ছবি পুরো বছরে তুলি না!”
আরিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
— “তুই বুঝবি না। স্মৃতি ধরে রাখতে হয়!”
অর্ক সাথে সাথে বলে উঠল—
— “স্মৃতি না গ্যালারি ভর্তি করতেছিস!”
সবাই আবার হেসে উঠল।
এদিকে নুসরাত, আনিকা আর আলিফা ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে গ্রুপ সেলফি তুলছে।
অদ্রিতা একটু দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ আকাশ দেখছিল।
হঠাৎ তার পাশে এসে দাঁড়ালো আরিয়ান।
অদ্রিতা সাথে সাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ শুরু হয়ে গেছে।
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল—
— “ এই মেয়ে এত ভয় পাও কেন আমাকে দেখলে?”
অদ্রিতা তাড়াতাড়ি বলল—
“কে-কেকে ভয় পায়?”
আরিয়ান একটু ঝুঁকে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল
“তাহলে তোতলাচ্ছো কেনো ।অদ্রিতা এবার সত্যিই থমকে গেল।লোকটার কণ্ঠস্বরটাই কেমন যেন অদ্ভুত।
চাইলেই মানুষকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
সে ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাতেই আরিয়ান হেসে ফেলল।
“হাহা এখানে কেন যাও ছবি তুলো ওদের সাথে ?”
অদ্রিতা কিছু বলল না।শুধু মুখ ঘুরিয়ে ফেলল।
আরিয়ান সেটা দেখেই হালকা হেসে অন্যদিকে তাকাল।
......
এদিকে লাবণ্য এবার জেদ ধরে বসেছে সে একা একা ছবি তুলবে।
প্রেম তাকে নামিয়ে দিতেই সে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে লাগলো।
আহির পাশে দাঁড়িয়ে বলল—
— “লবঙ্গ একটু হাস!”
লাবণ্য ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
— “আমি মডেন সব পালি চুপ তাকো তুমি!”
আহির মডেন শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল বলল -মডেন টা আবার কি বাবা
সবাই আবার হেসে উঠল।
ঠিক তখনই সাহিল চিৎকার করে বলল—
— “গুরুপ পিক তুলবো! সবাই একসাথে দাঁড়াও!”
এক মুহূর্তে সবাই এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করল।
কে কোথায় দাঁড়াবে সেটা নিয়েই যুদ্ধ লেগে গেল।
আরিয়া একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার হাত টেনে কাছে নিয়ে এলো।
সে অবাক হয়ে তাকাতেই দেখল আহনাফ।
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
আহনাফ একদম স্বাভাবিক গলায় বলল—
— “এদিকে দাঁড়া। জায়গা খালি।”আরিয়া কিছু বলল না।শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু তার হাতটা এখনো আহনাফের হাতে।আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো…আহনাফও হাত ছাড়ছে না।
কয়েক সেকেন্ড…
তারপরই দুজন একসাথে বুঝতে পেরে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।
সাহিল দূর থেকে সব দেখে মুখ চেপে হাসছে।
সে ইশানের কানে কানে বলল—
— “ভাই দেখছো কিছু?
ইশান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
— “না তুই দেখ ছোট আমি দেখবো না আমার সরম করে !
রুদ্র বলে উঠল—“চুপ কর সাহিল্লা! শুনে ফেলবে
ছবি তোলা শুরু হলো।কেউ হাসছে, কেউ ভেংচি কাটছে।আর লাবণ্য মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে বলছে—
“আমি পিনসিস”
সবাই ওর মুখে এই তোতলানো কথা শুনে হেসে উঠলো।
ফ্ল্যাশের আলোয় মুহূর্তগুলো যেন জমে যাচ্ছিল।
......
রাত প্রায় সাড়ে ছয়টা ।সবাই নিচে নেমে এসেছে।
ডাইনিং টেবিল ভর্তি খাবার।
চিকেন বিরিয়ানি, কাবাব, রোস্ট, সালাদ, কোল্ড ড্রিংকস—
সাহিল চেয়ার টেনে বসতেই বলল—
“ফুপি আমি আজকে পেটের ইঁদুর মরার আগে পর্যন্ত খাবো!”
রোজিনা হেসে বললেন—
— “আগে খা বাপ তারপর ইঁদুরকে মারিস ।”
সবাই হেসে উঠল।
খাওয়ার মাঝেও পুরো টেবিল মাথায় তুলেছে সবাই।
শুধু আহনাফ অদ্ভুত চুপচাপ।
সে মাঝে মাঝে চোখ তুলে আরিয়ার দিকে তাকাচ্ছে।
আরিয়া সেটা টের পেলেও না দেখার ভান করছে।
......
খাওয়া শেষে সবাই ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসলো।
রুদ্র হঠাৎ বলল—
— “চল সত্যি কিংবা সাহস খেলি!”সবাই সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল।
মাঝখানে একটা বোতল রাখা হলো।
প্রথমে ঘুরানো হলো বোতল।
বোতল গিয়ে থামল।আরিয়ার দিকে।
সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল—
“উউউউউ!”
সাহিল চোখ ছোট করে বলল—“সত্যি নাকি সাহস?”
আরিয়া শান্ত গলায় বলল—“সত্যি।”
ইশান সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নিয়ে বলল— “তোর ক্রাশ আছে?”
পুরো রুম একসাথে “ওওওওও” করে উঠল।
আরিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল— “না।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই অদ্ভুতভাবে আহনাফের চোখ নেমে গেল।কেন যেন বুকের ভেতর হালকা খচখচ করে উঠল তার।
অদ্রিতা সেটা খেয়াল করল।সে মুচকি হেসে চুপ করে রইল।
......
কিছুক্ষণ পর আবার বোতল ঘুরল।এবার গিয়ে থামল
আহনাফের দিকে।
সাহিল খলনায়কের মতো হাসল। “সত্যি নাকি সাহস ব্রো?”
আহনাফ হেলান দিয়ে বসে শান্ত গলায় বলল-“সাহস।”
সাথে সাথে পুরো দল চিৎকার করে উঠল।
সাহিল বলল—“তাহলে আপনাকে একজনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে—আপনি কাছে তাকে সুন্দর লাগছে।
আহনাফ ভ্রু তুলল।এটাই সাহস?”
সাহিল বলল-হ্যাঁ।”
রুম হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
আহনাফ ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল।
আরিয়া অজান্তেই নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
তারপর আহনাফ শান্ত, গভীর গলায় বলল—
“কালো শাড়িতে… তোকে খুব সুন্দর লাগছে ।”
পুরো রুম মুহূর্তে স্তব্ধ।আরিয়ার মনে হলো তার বুকের ভেতর কেউ হঠাৎ ঝড় নামিয়ে দিয়েছে।
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।কেউ কিছু বলার আগেই—
“উউউউউউউউউ!”পুরো ঘর চিৎকারে ফেটে পড়ল।
সাহিল সোফা চাপড়ে বলল—
— “ব্রো সরাসরি কিল্লা ফতে!”
অর্ক নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বলল—
— “এই প্রেম আমি সহ্য করতে পারছি না!”
আরিয়া একদম মাথা নিচু করে ফেলেছে।
আহনাফ এবারও স্বাভাবিক।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি স্পষ্ট।
আর দূরে বসে অদ্রিতা মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল—
— “খেলা তো এখন শুরু…”
ঠিক তখনই আরিয়ান সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল—
— আচ্ছা এত তাড়াতাড়ি কারো ঘুমানোর প্ল্যান তো নেই তাই না?”
সাহিল সাথে সাথে বলল—
— না ভাইয়া! আজকে সারারাত জাগবো!”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল—
— তাহলে সবাই রেডি হও। বাইরে ঘুরতে যাব।”
এক সেকেন্ড নীরবতা…
তারপর পুরো বাড়ি একসাথে চিৎকার করে উঠল—
“ইয়েসসসসস!”
লাবণ্য খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল—
— “আমিও যাব! আমিও যাব!”
প্রেম তাকে কোলে তুলে বলল—
— “আমাদের প্রিন্সেস ছাড়া কেউ যাবে নাকি?”
রোজিনা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বললেন—
— “এত রাতে কোথায় যাবি তোরা?”
আরিয়ান হেসে বলল—
— “আম্মু কাছেই যাচ্ছি। সবাই অনেকদিন পর একসাথে হয়েছে না তাই ওদের বলছিলাম নিয়ে যাব ?”
রোজিনা কিছুক্ষণ সবাইর উচ্ছ্বসিত মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।
— “আচ্ছা যা। কিন্তু বেশি রাত করিস না।”
সবাই আবার আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
......
পুরো বাড়ি মুহূর্তেই আবার ব্যস্ত হয়ে গেল।
কেউ ওড়না ঠিক করছে, কেউ ফোন খুঁজছে, কেউ আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
সাহিল নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে— “মেয়েরা প্লিজ আজকে তিন ঘন্টা নিস না!”
উপরে থেকে আনিকা চেঁচিয়ে বলল—
“চুপ থাক!”
ইশান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
— “এখনো ওরা শুধু রেডি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভাই…”সবাই আবার হেসে উঠল।
ওদের সাথে ইনারা আর ঈশিতা ও যাবে ওরাও রেডি হয়ে নিচে নামলো
কিছুক্ষণ পর আরিয়ারা সবাই নিচে নামল।
দুইটা গাড়িতে সবাই উঠবে ঠিক হলো।
লাবণ্য জেদ ধরে বসেছে সে আহিরের পাশেই বসবে।
আহিরও আজকাল তাকে একদম চোখের আড়াল করে না।
শেষমেশ সবাই বসে পড়ল।
আরিয়া গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই আহনাফ দরজা খুলে শান্ত গলায় বলল—
— “উঠ।”
আরিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গাড়িতে উঠে বসল।তার পাশে জানালার দিকটায় বসতেই আহনাফও এসে পাশের সিটে বসল।
গাড়ি ছাড়তেই রাতের শহরের আলো একের পর এক চোখে পড়তে লাগল।
হালকা ঠান্ডা বাতাসে আরিয়ার খোলা চুল বারবার উড়ছে।
একসময় সেই চুল এসে বারবার আহনাফের মুখে লাগতে লাগলো।
আহনাফ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে করে চুলগুলো সরিয়ে দিল।আরিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত জানালার বাইরে তাকাল।
আর সামনের সিটে বসে থাকা সাহিল আয়নায় সব দেখে মুখ টিপে হাসছে।
সে অর্কর কানে কানে বলল—
“আজকে কিছু একটা হবেই।”
অর্ক ফিসফিস করে বলল—
— “আমি প্রেমের গন্ধ পাচ্ছি।”
রুদ্র সাথে সাথে তাদের মাথায় চাপড় মেরে বলল—
— “তোরা একটু কম কর।”
অন্যদিকে দ্বিতীয় গাড়িতে বসে অদ্রিতা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ আরিয়ান গাড়ি চালাতে চালাতেই বলল-চুপচাপ কেন?”
অদ্রিতা একটু চমকে উঠে বলল—না… কিছু না।”
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল—“তুমি হাসলে বেশি সুন্দর লাগে জানো?”
অদ্রিতা একদম থমকে গেল।
তার মনে হলো হৃদপিণ্ডটা বোধহয় সত্যিই থেমে গেছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল।
আরিয়ান হালকা হেসে আবার রাস্তায় মন দিল।
কিন্তু তার চোখের কোণে দুষ্টু হাসি স্পষ্ট।
রাতের শহর, গাড়ির ভেতর হাসাহাসি, প্রিয় মানুষগুলো পাশে…
আরিয়ারদের সবার মনে হচ্ছিল—
এই মুহূর্তটা যদি থেমে যেত!
(গল্পটা পড়ে ভালো লাগলে অবশ্যই একটা রিয়্যাক্ট আর সুন্দর মতামত জানাতে ভুলবেন না।
আপনাদের প্রতিটি মন্তব্যই আমাকে নতুন পর্ব লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়,সবাই পড়ে চলে যাবেন না প্লিজ সবাই একটু রিয়েক্ট কইরেন পুকিরাাাাা।
খুব শীঘ্রই আসছে পরবর্তী পর্ব।
ধন্যবাদ সবাইকে।)🫠💗