ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ বিকালের মুগ্ধতা

১৭তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান আফিয়া

#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা {পর্ব-১৬}

#ইসরাত_জাহান_আফিয়া 
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
আহনাফের ধমক খেয়ে আরিয়ার ফ্রেন্ড সার্কেল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সাহিল স্পিকারটা পকেটে পুরে আমতা আমতা করে বলল, “ইয়ে... বইন, আমরা তাহলে আজকে আসি রে। তুই রেস্ট নে। কাল কলেজে তোর অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে দেব।” প্রেম আর অর্ক তো আহনাফের কড়া চাহনি দেখে দরজার দিকে অলরেডি দুই পা বাড়িয়ে দিয়েছে। নুসরাত আর অদ্রিতা আরিয়ার কপালে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “বাঘ তো পুরো খেপে আছে রে! আমরা কেটে পড়ি, সাবধানে থাকিস।”
বন্ধুরা রুম থেকে বের হতেই কেবিনে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আরিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে ভালো হাতটা দিয়ে বালিশটা আঁকড়ে ধরে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে রইল। আহনাফ ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে আড়চোখে ওর দিকে তাকাল। রাগটা তার এখনো কমেনি, তবে আরিয়ার এই অভিমানী মুখটা দেখে বুকের ভেতর কোথাও একটা নরম অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠল। সে গম্ভীর গলায় বলল, “বেশি নাটক করতে হবে না। সোজা হয়ে ঘুমা। কাল সকালে ডিসচার্জ হবে, বাড়ি ফিরে বাকি নাচানাচি করিস।” আরিয়া কোনো উত্তর দিল না, শুধু একটা লম্বা শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নিল।
পরদিন সকালে সব ফরমালিটি শেষ করে আরিয়াকে শিকদার বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। গাড়ি থেকে নামার সময় আরিয়াকে বেশ সাবধানে ধরে নামাল আরিয়ান আর ইশান। আরিয়া ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল পুরো বাড়ি যেন ভেঙে পড়েছে তার জন্য। বড় বাবা মেজো বাবা আর তার পাপা ও মায়েরা সবাই সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
রোজিনা বেগম (আরিয়ার মা) তো আরিয়াকে দেখেই কেঁদে ফেললেন, “ওরে আমার কপাল! মেয়েটা আস্ত হাতটাই ভেঙে নিয়ে এলো! তোকে কতবার বলেছি বাইক নিয়ে অত রাতে বাইরে যাবি না!ইশান তুই ও কেন বজ্জাত তার কথা শুননি বাবা তোর পায়ের অবস্থাও ভালো না এই মেয়েকে নিয়ে আমি আর পারিনা আস্ত বজ্জাত।
ইশান পাশ থেকে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “মামনি, আমি তো জাস্ট.... 
আরিয়ান চোখ রাঙাতেই ইশান চুপ মেরে গেল। আরিয়া হেসে ফেলার চেষ্টা করে বলল, “আরে আম্মু, আমি ঠিক আছি তো। দেখো না, কেমন হিরোদের মতো প্লাস্টার করে এসেছি!”
আহনাফ পেছন থেকে এসে কড়া গলায় বলল, “হিরোইনগিরি অনেক হয়েছে, এখন সোজা রুমে যা।”
লাবণ্য দৌড়ে এসে আরিয়াকে জড়িয়ে ধরল বলল আরিপি তোমাল হাতে কি হয়েতে আমি এতটু হামি দেই ব্যথা চলে যাবে বলেই সে দেরি না করে আরিয়ার হাতে একটা ছোট্ট হামি দিয়ে দিল আরিয়া ও তাকে ছোট্ট করে একটা গালে আমি দিল। 
আরিয়াকে ওর রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। বিছানায় হেলান দিয়ে বসতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল সে। কিন্তু আরিয়া বুঝতে পারেনি, আসল 'অত্যাচার'টা তখনো বাকি ছিল! বিকেলে যখন বড়রা সবাই নিচে চা খেতে গেছেন এবং আহনাফ নিজের ডিউটির কাজে একটু বাইরে গেছে, ঠিক তখনই আরিয়ার রুমে এক এক করে ঢুকলো তার পুরো ভাই-বোন গ্যাং—আরিয়ান, ইশান, ঈশিতা, ইনায়া, লাবণ্য আর আহির! সবার হাতে রঙিন মার্কার পেন আর স্কেচ পেন!
আরিয়া ওদের হাতের মার্কার দেখে চোখ বড় বড় করে বলল, “ওই! তোমাদের মতলব ভালো ঠেকছে না কিন্তু!
ইশান আহির, ঈশিতা লাবণের দিকে তাকিয়ে বলল তোরা এই মার্কার নিয়ে আমার রুমে কী করছিস?”
ঈশিতা বাঁকা হেসে বলল, “কী আবার করব আরু? তুই এত কষ্ট করে হাতটা ভাঙলি, আর আমরা তোর এই ধবধবে সাদা প্লাস্টারে একটু রঙ মেলাব না? এটা তো আমাদের ভাই-বোনদের ঐতিহ্য!”
ইনায়া বিছানায় উঠে বলল, “একদম! আমি তো অলরেডি ঠিক করে রেখেছি ওর প্লাস্টারে একটা মিকি মাউস আঁকব।”
লাবণ্য আর ঈশিতা ততক্ষণে আরিয়ার বিছানার দুই পাশে চেপে বসেছে। আরিয়া চেঁচিয়ে বলল, ভাইয়া! দেখো না এরা কী করছে! তুমি তো সিআইডি অফিসার, এদের অ্যারেস্ট করো!”
আরিয়ান মুচকি হেসে পকেট থেকে একটা পার্মানেন্ট ব্ল্যাক মার্কার বের করে বলল, “আই অ্যাম সরি ছুটকি! এখানে সিআইডি অফিসারের পাওয়ার খাটবে না। কারণ আইডিয়াটা আমারই ছিল!” এই বলেই আরিয়ান আরিয়ার প্লাস্টার করা হাতের একদম ওপরের অংশে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিল -Don't cross your limit!
আরিয়া হা হয়ে চেয়ে রইল। এরপর শুরু হলো আসল ধামাকা। ইশান এসে আরিয়ার কবজির কাছে একটা মস্ত বড় ‘বোকা গাধা’র ছবি আঁকল এবং নিচে লিখল, এখানে একটি শিং ভাঙা হরিণ বাস করে।”
আরিয়া ভালো হাত দিয়ে ইশানের পিঠে একটা চড় কষিয়ে বলল, “মগা বলদ! তোকে আমি পরে দেখে নেব!”
আহির আর লাবণ্য মিলে প্লাস্টারের মাঝখানের অংশটায় লাল, নীল, সবুজ রঙ দিয়ে চমৎকার সব ফুল, লতা-পাতা আর ফানি কার্টুন এঁকে পুরো প্লাস্টারটাকে একটা জীবন্ত আর্ট গ্যালারি বানিয়ে ফেলল। ঈশিতা আর ইনায়া ডানা কাটা পরীর ছবি এঁকে তাতে আরিয়ার মুখ বসিয়ে দিল। পুরো হাতটা এখন আর সাদা প্লাস্টার নয়, যেন একটা রঙিন ক্যানভাস! আরিয়া প্রথমে রাগ করলেও ভাই-বোনদের এই পাগলামি আর ভালোবাসা দেখে নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। পুরো রুমে তখন হাসির রোল উঠেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল আহনাফ। ওর হাতে আরিয়ার বিকেলের ওষুধের ফাইল। ঘরের ভেতরের এই হট্টগোল আর আরিয়ার হাতের ওই রঙিন কাণ্ডকারখানা দেখে ও দরজায় থমকে দাঁড়াল।
রুমের সবাই আহনাফকে দেখে মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে গেল। ইশান মার্কারটা পকেটে লুকাতে লুকাতে বলল, “ইয়ে... আহনাফ ভাইয়া এসেছে। আমরা তাহলে নিচে যাই, চাচীমা ডাকছিল মনে হয়।” আরিয়ানও গলা ঝেড়ে বলল, “হ্যাঁ, চল চল, আমাদের ড্রয়িংটা তো শেষ।” এক এক করে সব ভাই-বোন রুম থেকে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেল।
রুমে এখন শুধু আহনাফ আর আরিয়া। আহনাফ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আরিয়ার বিছানার পাশে বসল। ওষুধের ফাইলটা টেবিলে রেখে সে আরিয়ার ওই প্লাস্টার করা রঙিন হাতটার দিকে তাকাল। ভাই-বোনদের ফানি লেখার মাঝে ওর চোখ গেল আরিয়ানের লেখাটার দিকে। আহনাফ আলতো করে আরিয়ার প্লাস্টার করা হাতটা নিজের হাতের ওপর তুলে নিল। ওনার স্পর্শে আরিয়ার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিউরন বয়ে গেল।
আহনাফ আঙুল দিয়ে প্লাস্টারের ওপরের ড্রয়িংগুলো ছুঁয়ে দেখতে দেখতে একদম নিচু, গম্ভীর কিন্তু ভীষণ মায়াবী গলায় বলল, “অনেক তো হাসাহাসি হলো। এবার বলো, ব্যথাটা কেমন আছে ?”
আরিয়া আহনাফের এই হুট করে বদলে যাওয়া নরম রূপ দেখে কিছুটা ভড়কে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল, “এখন... এখন আর তেমন ব্যথা নেই।”
আহনাফ আরিয়ার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, “ব্যথা থাকবে কী করে? তোর তো মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই। ওই সাদাদ শাহরিয়ারের দেওয়া ডায়েরি বুক পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াস, আর নিজের খেয়াল রাখার কথা ভুলে যাচ্ছিস। আর কতবার তোকে বলব নিজের খেয়াল রাখতে তূবা?”
'তূবা' নামটা আহনাফের মুখে এত গভীর শোনায় যে আরিয়ার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেল। আহনাফের চোখে সে স্পষ্ট দেখতে পেল এক তীব্র অধিকারবোধ, এক বুক ভালোবাসা আর কিছুটা জেলাসি! আরিয়া মিষ্টি করে হেসে বলল, “কেন? আমি বিপদে পড়লে আপনার এত লাগে কেন, মিস্টার খাড়ুস ন অফিসার?”
আহনাফ আরিয়ার হাতের প্লাস্টারে থাকা একটা খালি জায়গায় নিজের পকেট থেকে কলম বের করে খুব যত্ন সহকারে ছোট করে লিখে দিল Mine. 
সে লেখাটা শেষ করে আরিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, কারণ এই শিং ভাঙা হরিণটাকে সামলানোর দায়িত্ব শুধু আমার। এখন চুপচাপ ওষুধটা খেয়ে ঘুমাও।”
আরিয়া নিজের হাতের ওই ‘Mine’ লেখাটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক চরম মুগ্ধতায় হারিয়ে গেল। হাত ভাঙাটা যে এত সুন্দর হতে পারে, তা সে আজ প্রথম বুঝতে পারল।
চলবে...
(📌 গল্পটা যদি ভালো লেগে থাকে, তাহলে চুপিচুপি পড়ে চলে যাবেন না কিন্তু! একটা ফলো দিয়ে পাশে থাকুন। আপনাদের রেসপন্স করাটাই লেখার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। )🌷

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন