#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা {পর্ব-১৭}
#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
আহনাফের হাতের ওই ‘Mine’ লেখাটার দিকে তাকিয়ে আরিয়া যখন মনে মনে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে মেঘের দেশে ভাসছিল, ঠিক তখনই আহনাফ ওর চেনা বাঁকা হাসিটা হাসল। কলমটা পকেটে পুরতে পুরতে বলল, “বেশি উড়ার দরকার নেই। পুরো লেখাটা আগে শেষ করতে দে।”
আরিয়া চোখ পিটপিট করে তাকাল। আহনাফ আবার পকেট থেকে কলমটা বের করে ‘Mine’ শব্দের ঠিক নিচেই চটপট বড় বড় অক্ষরে লিখে দিল—Mine খচ্চুরনি শাকচুন্নি !
লেখাটা শেষ করেই আহনাফ শব্দ করে হেসে উঠল। আরিয়া প্লাস্টারের দিকে তাকিয়ে থ! এক সেকেন্ডের মধ্যে ওর মুগ্ধতার মেঘ কেটে গিয়ে মাথায় রাগের রক্ত চড়ে গেল। এই লোকটা আস্ত একটা রোমান্সহীন রোবট! এত সুন্দর একটা মুহূর্তকে এভাবে নষ্ট করল?
আরিয়া রাগে গজগজ করতে করতে বলল, “কী লিখলেন এটা? আমি খচ্চুরনি? আমি শাকচুন্নি? আপনার সাহস তো কম না, খাড়ুস অফিসার!”
আহনাফ আরিয়ার রাগী মুখটা দেখে আরো মজা পেয়ে বলল, “ভুল তো কিছু লিখিনি। যে মেয়ে মাঝরাতে বাইক নিয়ে রেস করতে গিয়ে হাত ভেঙে আসে, সে শাকচুন্নি ছাড়া আর কী?”
“আপনি... আপনি আস্ত একটা জলহস্তী!” বলেই আরিয়া আর এক মুহূর্ত ভাবল না। নিজের রাগকে সামলাতে না পেরে সে ঝট করে আহনাফের ডান হাতটা টেনে ধরে ওনার শক্ত কবজিতে সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল!
“আউচ! তূবা! ছাড় বলছি!” আহনাফ ব্যথায় ককিয়ে উঠল। কিন্তু আরিয়া যেন আজ প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে, সে দাঁত কামড়ে ধরে রইল। আহনাফ বাঁ হাত দিয়ে আরিয়ার গালটা আলতো করে চেপে ধরতেই আরিয়া মুখটা ছেড়ে দিল।
আহনাফ নিজের কবজির দিকে তাকিয়ে দেখল দাঁতের একদম পারফেক্ট একটা লাল দাগ বসে গেছে। সে চোখ রাঙিয়ে বলল, “তুই কি মানুষ নাকি পাগলা কুকুর? এভাবে কেউ কামড়ায়? শাকচুন্নি কোথাকার ”
আরিয়া মুখ ভেংচে বলল, “যেমন কুকুর তেমন মুগুর! আমার প্লাস্টারে ওইসব ফালতু নাম লেখা এবার বের করছি!”
আহনাফ কামড়ের জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল বটে, কিন্তু আরিয়ার এই ডানপিটে স্বভাবের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ও হেসে ফেলল।
এরপর কেটে গেল বেশ কিছু দিন..
সময়ের নিয়মে আরিয়ার হাতের প্লাস্টার কাটার দিন চলে এলো। ডাক্তারের চেম্বার থেকে যখন প্লাস্টারটা কেটে ফেলা হলো, আরিয়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। দিন কয়েকের ফিজিওথেরাপি আর যত্নে ওর হাতটা এখন একদম আগের মতো সুস্থ ও সচল। কলেজে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর ভাই-বোনদের সাথে দুষ্টুমি—সব আবার আগের ট্র্যাকে ফিরে এসেছে।
কিন্তু এই খুশির মাঝেই শিকদার বাড়িতে একটা খবর এলো। আহনাফের নেভির ছুটি শেষ। শুধু ছুটি শেষই নয়, নেভি হেডকোয়ার্টার থেকে তার কাছে একটা জরুরি মেইল এসেছে। সাভারের মাদক সম্রাট রাকিব চৌধুরী ধরা পড়লেও তার আন্তর্জাতিক চক্রের মেইন ডন এবং চোরাচালানের বড় একটা গ্যাং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে একটি বিদেশি জাহাজে আস্তানা গেড়েছে। আর সেই গ্যাংস্টারদের ধরতে বাংলাদেশ নেভির একটি স্পেশাল স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে, যার লিডার করা হয়েছে খোদ লেফট্যানেন্ট কমান্ডার আহনাফ শিকদারকে!
মিশনটা অত্যন্ত গোপনীয় এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো মুহূর্তে প্রাণহানির আশঙ্কা আছে।
আজ রাতে আহনাফের বিদায়। পুরো শিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে এক থমথমে পরিবেশ। আরমান শিকদার আহনাফের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সাবধানে যাবে । দেশের দায়িত্ব আগে, তবে নিজের খেয়াল রেখো।দুই কাকাই এগিয়ে এসে ভাতিজা কে জড়িয়ে ধরল।
নাজমুল সিকদার বললেন এবার আসলে তোকে বিয়ে করিয়ে ছাড়বো সাবধানে থাকবে কিন্তু আর সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে আমাকে পাঠাবি। আমার তোর জন্য মেয়ে খুঁজতে হবে না বলে আহনাফকে কে চোখ টিপে দিলেন।
আরিশ শিকদারও বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়ে খুজতে হবে আহনাফের বিয়ে দিতে হবে ধুমধাম করে।
আহনাফ মাথায় চুলকে মনে মনে বলতে লাগলো মেয়ে তো তোমাদের সামনেই আছে খুজবাই বা কিসের জন্য। কিন্তু তার আর বলা হলো না তার মধ্যে ইশান এসে জড়িয়ে ধরে বলল ভাইয়া তাড়াতাড়ি আসবা আমরা কক্সবাজার যাব সবাই মিলে আরিয়ার জন্মদিনে।আহনাফ বলল আচ্ছা
মায়েরা সবাই মন খারাপ করে বসে আছেন। আরিয়ান গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে, সে সিআইডিতে থাকায় বোঝে এই মিশনগুলোর গভীরতা কতটা ভয়ংকর।
লাবন্য ও আহির এসে আহনাফকে জড়িয়ে ধরে লাবণ্য তো প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল তো বলল আহু ভাইটুস আমি তাড়াতাড়ি আতবা আমাল জন্য অনেক চতলেট আনবা ।
আহনাফ লাবণ্যকে শান্ত করে বলল ওকে মাই প্রিন্সেস তোমার জন্য অনেক আনবো চকলেট একদম কাঁদবেনা।
আহনাফ ইনায়া আর ঈশিতার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল সাবধানে চলাফেরা করবি আর কোন সমস্যা হলে আরিয়ান বা ইশান কে জানাবি।
আরিয়ান গিয়ে বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু এই পুরো থমথমে পরিবেশে একমাত্র আরিয়া শিকদারের মধ্যে কোনো কান্নাকাটি বা মন খারাপের বালাই নেই! আরিয়া শিকদার ভীষণ স্ট্রং একটা মেয়ে, সে সহজে নিজের মনের ভেতরের দুর্বলতা বা দুঃখ কারো সামনে প্রকাশ করে না। আহনাফের প্রতি ওর বুকের ভেতর একটা অন্যরকম টান তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ভালোবাসা নাকি অন্য কিছু—সেটা আরিয়া নিজেও এখনো পরিষ্কার জানে না।
তাই আহনাফ চলে যাচ্ছে শুনে ওর মনের এক কোণে সামান্য একটু খারাপ লাগলেও, ওপর দিয়ে সে খুশিতে মনে মনে নাচতে লাগল! যাক, অবশেষে এই খাড়ুস সিসিটিভি ক্যামেরাটা সাভার থেকে বিদায় হচ্ছে! এবার সে মন খুলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবে, ডানা মেলে উড়তে পারবে!
আহনাফ সবার থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা হাতে তুলল। যাওয়ার আগে সে চর্তুদ্দিকে চোখ ঘুরিয়ে আরিয়াকে খুঁজতে লাগল। আরিয়া তখন ড্রয়িংরুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে বিন্দাস মুডে আপেল চিবোচ্ছে।
আহনাফ ধীর পায়ে আরিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। ওনার চোখে এক অদ্ভুত গম্ভীর চাউনি।
আরিয়া চিবানো বন্ধ করে আপেলটা হাতে নিয়ে বলল, “কী ব্যাপার খাড়ুস অফিসার? বিদায় নিতে এসেছেন? যান যান, দেশের সেবা করুন। আপনার জন্য পুরো সাভারবাসী আজ স্বাধীন হতে চলেছে!”
আহনাফ আরিয়ার এই অতি-খুশি ভাব দেখে নিজের চোয়াল শক্ত করল। এই মেয়েটার মনে কি এক ফোঁটাও মায়া-দয়া নেই? ও যে এত বড় একটা ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে যাচ্ছে, অথচ আরিয়া কেমন স্বাভাবিক! আহনাফ আলতো করে আরিয়ার সুস্থ হয়ে যাওয়া ডান হাতটা টেনে নিল।
আহনাফ নিজের সেই কামড়ের দাগ বসা কবজিটা আরিয়ার চোখের সামনে তুলে ধরে একদম নিচু এবং ভারী গলায় বলল, “হাতটা একদম ঠিক হয়ে গেছে দেখছি। এবার আর আমার অনুপস্থিতিতে ভাঙার চেষ্টা করিস না। আর হ্যাঁ... এই কামড়ের দাগটা কিন্তু আমি মিশনে সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। এটা আমাকে মনে করাবে, সাভারে একটা খচ্চুরনি আছে যাকে ফিরে এসে সাইজ করতে হবে।”
আরিয়া একটুও দমে না গিয়ে এক গাল হেসে বলল, “আরে নিশ্চিত নিয়ে যান! আর ওখানে গিয়ে কোনো হাঙর-টাঙর কামড়ালে আমার এই কামড়ের দাগটা দেখিয়ে বলবেন—আমার সাভারের খচ্চুরনি এর চেয়েও জোরে কামড়াতে পারে! সাবধানে যাবেন, মিস্টার জলহস্তী!”
আহনাফ আরিয়ার এই টানটান উত্তরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেয়েটা আসলেই আলাদা, বড্ড শক্ত মনের। তবে ওর এই চোখ দুটোর পেছনের লুকানো ভাবটা আহনাফ ঠিকই পড়তে পারল। আহনাফ আর সময় নষ্ট করল না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে এক ঝটকায় ঘুরে মেইন গেটের দিকে হেঁটে চলে গেল।
বাইরে তখন কালো কুচকুচে রাত। আহনাফকে বহনকারী নেভির অফিশিয়াল গাড়িটি যখন স্টার্ট নিয়ে সাভারের রাস্তা ধরে হাইওয়ের দিকে এগিয়ে গেল, আরিয়া তখনো ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দটা পেতেই ওর হাতের আপেলটা কেমন যেন তেতো লাগতে শুরু করল। বুকটা এক সেকেন্ডের জন্য কেমন যেন খালি হয়ে উঠল।
সে নিজের মনের এই অদ্ভুত অনুভূতিটাকে ঝেড়ে ফেলার জন্য জোরে একটা শ্বাস নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে ফিসফিস করে বলল, “আরে ধুর আরু! তুই এত ভাবছিস কেন? খাড়ুস বিদায় হয়েছে, এখন লাইফ পুরো চিল! কাল থেকেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমবে।” সে মুখে হাসির রেখা টেনে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল, তবে মনের ভেতরের সেই অচেনা টানটা সে কিছুতেই এড়াতে পারল না।
চলবে....
(📌 বেশি বেশি রেসপন্স করার চেষ্টা করবেন,সবাই)