#ইসরাত_জাহান_আফিয়া {পর্ব -২৯/খ}
#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
আরিয়া দরজা বন্ধ করতেই সবাই একসঙ্গে তার দিকে ছুটে এল। আরিয়া এসে খাটের উপর দুম করে শুয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলো।
রুদ্র তাড়াতাড়ি বলল,
—"কী জানলি? আঙ্কেল কী বললেন?"
আরিয়া চারদিকে একবার তাকিয়ে উঠে বসে নিচু গলায় বলল,
—"পাপা যা বলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে রেহেনা আন্টির কাছেই আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর আছে।"
অর্ক গম্ভীর মুখে বলল,
—"মানে আমাদের চট্টগ্রাম যেতেই হবে।"
প্রেম মাথা নেড়ে বলল,
—"কিন্তু সমস্যা হলো, বাড়ির কেউ তো যেতে দেবে না।"
সাহিল সোফায় ধপ করে বসে বলল,
—"চল পালিয়ে যাই!"
তার কথা শুনে সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
—"চুপ!"
প্রেম কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
—"তোর মাথায় সবসময় এসবই আসে?"
সাহিল মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—"আরে, আইডিয়া দিলাম।"
রুদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—"এমন একটা অজুহাত বানাতে হবে যাতে কেউ সন্দেহই না করে।"
নুসরাত বলল,
—"পিকনিক?"
আনিকা মাথা নাড়ল।
—"না, ওটা কেউ বিশ্বাস করবে না।"
আলিফা বলল,
—"কলেজ ট্যুর?"
ঈশান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—"কিছুদিন আগেই গিয়েছি।"
আবার সবাই চুপ।
ঠিক তখনই আরিয়ার কোলে বসে থাকা পটল "মিয়াঁও" করে উঠল।
সাহিল বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—"দেখ, পটলও চিন্তায় পড়ে গেছে।"
আরিয়া বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—"আমার মনে হয় একটা কাজ করা যায়।"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—"কী?"
আরিয়া ধীরে ধীরে বলল,
—"আমরা সবাই বাড়িতে বলব, রুদ্রর এক আত্মীয়ের বাসায় কয়েক দিনের জন্য ঘুরতে যাচ্ছি।"
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
—"না, ধরা পড়ে যাব। বাবা-মা নিশ্চয়ই ফোন করবে।"
প্রেম একটু ভেবে বলল,
—"তাহলে?"
রুদ্র হঠাৎ বলল,
—"শোন... আমরা আগে মাহির খানের অফিসের ঠিকানা বের করি। তারপর বাসে করে চট্টগ্রাম যাব। যাওয়ার পর একটা হোটেলে উঠব। রেহেনা খানের সঙ্গে দেখা করে সব জেনে সেদিনই ফিরে আসব।"
সাহিল উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
—"এই তো! এটাই প্ল্যান!"
অদ্রিতা সন্দেহের চোখে তাকাল।
—"আর বাড়িতে কী বলব?"
রুদ্র মুচকি হেসে বলল,
—"সেটা আমি ভেবে রেখেছি..."
তার কথা শেষ হতেই সবাই কৌতূহলী হয়ে আরও কাছে এগিয়ে এল।
রুদ্র নিচু গলায় নিজের পরিকল্পনাটা বলতে শুরু করল।রুদ্র একটু গলা খাঁকানি দিয়ে নিচু অথচ আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল,
—"শোন, আমরা কেউ একা যাচ্ছি না। সবাই মিলে একসঙ্গে যাচ্ছি। তো আমরা বড়দের গিয়ে বলব যে, আমাদের কলেজ বা ফ্রেন্ডসার্কেল থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের দিকে একটা স্টাডি ট্যুর বা সামার ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। এটা অফিশিয়াল কোনো প্রজেক্ট না হলেও, কলেজ লেভেলের একটা গ্রুপ ট্রিপ।"
সাহিল চোখ বড় বড় করে বলল,
—"আরে দারুণ আইডিয়া! কিন্তু কলেজ থেকে যদি কেউ জেনে যায়?"
রুদ্র হাসল,
—"কেউ জানবে না। কারণ আমরা বলব, ট্যুরটা সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের উদ্যোগে—বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করেছি। আর সাথে বড় কেউ একজন না থাকলে তো বাবা-মা পারমিশন দেবে না, তাই আমরা বলব আমাদের সাথে কলেজের সিনিয়র বা একজন গাইড ভাইয়া যাবেন। আর খরচও আমরা জমানো টাকা দিয়েই চালাব।"
অদ্রিতা একটু চিন্তা করে বলল,
—"মা তো রাজি হতে চাইবে না সহজে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম... এত দূর একা ছাড়তে চাইবে না আর উনিও তো।"
আরিয়া,নুসরাত নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল
—"বাবাহ আজ একটা উনি নেই বলে।
ঈশান আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়ল,
—"সেটা আমরা সামলে নেব। তুমি একা বলো না, আমরা সবাই মিলে একসাথে গিয়ে বলব । একেকজনের বাবা-মা একেকজনকে বোঝাবে। আর আমরা বলব, মাত্র দুই-তিন দিনের ব্যাপার। সব বন্ধুরা মিলে একসাথে একটু ঘুরতেও যাব, আবার প্রজেক্টের একটা কাজও হবে।"
নুসরাত কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—"হ্যাঁ, এই আইডিয়াটা মন্দ না। সবাই একসাথে যাওয়ার কথা বললে বিশ্বাসযোগ্যতা একটু বেশি থাকবে।"
আরিয়া বিড়াল পটলকে কোলে নিয়ে বলল,
—"তাহলে আর দেরি করা ঠিক হবে না। কালকেই সবাই যার যার বাসায় একটু একটু করে কথা বল ভাগ।
সবাই একসঙ্গে মাথা নেড়ে রুদ্রর এই গোপন পরিকল্পনায় সম্মতি জানাল।
বিকেলের নরম আলোটা ঘরের জানালা দিয়ে এসে পড়ছে। ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসেছেন নাজমুল শিকদার, সঙ্গে তাঁর পুরো পরিবার। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর কিছু বিস্কুট। সবাই মিলে গল্প করতে করতেই চায়ে চুমুক দিচ্ছেন তাঁরা। ঠিক তখনই আরিয়া সিড়ি দিয়ে নেমে সোজা সবার সামনে এসে একটু থেমে পাপাও সবাইকে উদ্দেশ করে বলল
–"আমরা সবাই মিলে কাল বা পরশু একটা ট্যুরে যাচ্ছি, পাপা প্লিজ না বলো না।
মেয়ের এমন আকস্মিক ঘোষণায় নাজমুল শিকদারসহ সবাই চায়ে চুমুক দেওয়া থামিয়ে অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তের জন্য যেন থমকে যান।
আরমান শিকদারের কথায় পুরো ড্রইংরুম এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল।
—"তোমাদের সঙ্গে পরিবারের একজন বড় মানুষ যাবে। তাহলেই যেতে দেব।"
কথাটা শুনে আরিয়া, রুদ্র, ঈশান, সাহিল,অর্ক প্রেম,—সবার মুখ একসঙ্গে মলিন হয়ে গেল।
তারা একে অপরের দিকে তাকাল, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না।
আরিশ শিকদার হেসে বললেন,
—"কী হলো? এতক্ষণ তো খুব উৎসাহ ছিল!"
সাহিল মাথা চুলকে বলল,
—"আ... মানে... আমরা ভাবছিলাম বন্ধুরা মিলে গেলে বেশি মজা হবে।"
আহনাফ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
—"তোমাদের ওপর এতটা ভরসা করা যায় নাকি?"
নুসরাত তাড়াতাড়ি বলল,
—"ভাইয়া! আমরা আর ছোট নেই।"
ঈশিতা হেসে বলল,
—"ওহ! ম্যাডামরা বড় হয়ে গেছে!"
সবাই হেসে উঠল।
রোজিনা শিকদার নুসরাতের গাল টেনে দিয়ে বলল,
—"বড় হয়ে গেলেই তো দায়িত্ববান হতে হয়।"
রুদ্র ভদ্রভাবে বলল,
—"আংকেল , আমরা সব খরচ নিজেরাই করব। কোথায় থাকব, কীভাবে যাব—সব প্ল্যান করে রেখেছি।আর আমি তো আছি আমি সব সামনে নেব টেনশন করবেন না তাও প্লিজ আমাদের যেতে দিন আঙ্কেল।"
নাজমুল শিকদার অবাক হয়ে বললেন,
—"তাই নাকি? তাহলে তো দেখছি পুরো প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছ!"
প্রেম বুঝতে পারল, আর কিছু বললে সন্দেহ হবে।
সে দ্রুত বিষয়টা ঘুরিয়ে দিয়ে বলল,
—"আমরা পরে আবার কথা বলব।"
কথা শেষ করে সবাই একে একে সেখান থেকে উঠে গেল।
---
নিজেদের রুমে ঢুকতেই সাহিল দরজা লাগিয়ে দিল।
—"শেষ! সব শেষ!"
অদ্রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—"আমি আগেই বলেছিলাম, এত সহজে কেউ রাজি হবে না।"
নুসরাত বিছানায় বসে বলল,
—"এখন কী করব?"
কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
হঠাৎ রুদ্র বলল,
—"আমি একটা আইডিয়া পেয়েছি।"
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
—"কী আইডিয়া?"
রুদ্র নিচু গলায় বলল,
—"আমরা সবাই না গিয়ে ভাগ হয়ে যাব।"
ঈশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—"মানে?"
—"পরিবারের সবাইকে বলব আমরা কক্সবাজার ঘুরতে যাচ্ছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে একদিনের জন্য আমি, আরিয়া, সাহিল আর ঈশান ব্রো চট্টগ্রাম শহরে চলে যাব। বাকিরা কক্সবাজারেই থাকবে।"
প্রেম কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,
—"খারাপ না... কিন্তু যদি বড়রা আমাদের সঙ্গে থাকে?"
রুদ্র হেসে বলল,
—"সেটারও ব্যবস্থা আছে।"
আরিয়া অবাক হয়ে বলল,
—"কী ব্যবস্থা?"
রুদ্র রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
—"বড়দের এমনভাবে ব্যস্ত রাখতে হবে, যেন তারা নিজেরাই আমাদের ঘুরতে পাঠিয়ে দেয়।"
সাহিল চোখ বড় বড় করে বলল,
—"তোর মাথায় এসব আসে কীভাবে ডাডাহ?"
রুদ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
—"গোয়েন্দা সিনেমা বেশি দেখি।"
সবাই আবার হেসে উঠল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
ঠক... ঠক...
সবাই একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
আরিয়া ধীরে ধীরে দরজা খুলতেই দেখল...
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আহনাফ।
দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে সে সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—"তোমাদের মিটিং শেষ হলে আমিও কি একটু ভেতরে আসতে পারি?"
কথাটা শুনে সবার বুক ধক করে উঠল।আহনাফ কি কিছু বুঝে ফেলেছে?আহানাফ এসে আরিয়ার ঘরে সোফায় বসে বলল
–"বাবারা তোদের যেতে বলেছে কিন্তু কিন্তু সাথে আরিয়ান যাবে তাহলে তোরা যেতে পারবি।আর বাকিদের বাসায় জানিয়ে দিয়েছে তারাও রাজি হয়েছে। তো আরিয়ানের সাথে যেতে প্রস্তুত হ। বলে এক মুহূর্ত দেরি না করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
আহনাফ চলে যেতে রুদ্র দরজা লক করে এসে রুদ্র নিচু গলায় বলল,
—"তাহলে মিশন সাকসেসফুল। আরিয়ান ভাইয়া গেলে আর কোন সমস্যা নেই।
আরিয়া উৎসাহিত হয়ে বলল
—"তাহলে আর কিসের দেরি প্লেনের টিকিট বুক কর।ভাইয়াকে আমি সামলে নিবো।
রুদ্র দেরি না করে ল্যাপটপে বসে সবার জন্য টিকিট বুকিং করল।
চলবে...
(📌সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করবেন, বেশি বেশি রেসপন্স করবেন তাহলে পর্ব তাড়াতাড়ি পাবেন)