#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা {পর্ব -৩০}
#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
(📌 চুপিচুপি গল্প পড়ে চলে যাবেন না কিন্তু! আপনাদের রেসপন্স ও মন্তব্য আমার লেখার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।)
বিকাশের নরম রোদ এসে পড়ছে আরিয়ার ঘরের জানালার কাঁচ ভেদ করে। সোনালী আলোয় ঘরটার চারপাশটা কেমন যেন মায়াবী এক রূপ ধারণ করেছে। খাটের ওপর ছড়ানো-সটানো জামাকাপড়, ট্রাভেল ব্যাগ আর কিছু ছোটখাটো জিনিসপত্র। সবাই মিলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ব্যাগ গোছগাছ করছে। কালকেই প্লেনের ফ্লাইট—সবাই এখন চরম উত্তেজনার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
রুদ্র ল্যাপটপটা বন্ধ করে বিছানায় রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
—"টিকেট কনফার্ম! একদম টাইম টু টাইম সব সেট।"
সাহিল তার একটা জ্যাকেট ব্যাগে গুঁজে দিয়ে নাটকীয় ভাবে বলল,
—"ভাই রে, আরিয়ান ভাইয়া সাথে থাকবে সাথী আবার অদ্রিতা ভাবি শুনলেই তো আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। উনরা আবার ভীষণ কড়া মানুষ! একটু এদিক-সেদিক হলেই খবর আছে।"
আরিয়া আলমারি থেকে একটা ড্রেস বের করতে করতে হো হো হেসে বলল,
—"আরে, ভাইয়াকে নিয়ে অত টেনশন করতে হবে কেন? ভাইয়া থাকবে ভাবিকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।
অদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—"মানে? তুই উনাকে প্লানের ব্যাপার বলিসনি?"
আরিয়া একটু মুচকি হেসে ইশারা করে বলল,
—"সব না হলেও... আংশিক। শোন, কাল আমরা যখন রওনা দেব, এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথেই আমি ভাইয়াকে গাড়িতে একা পেয়ে সব খুলে বলব। ভাইয়া যতই গম্ভীর হোক না কেন, রেহেনা আন্টির কাছে আমাদের কেন যাওয়া দরকার—সেটা আমি ঠিক বুঝিয়ে বলব। ভাইয়া আমাদের এই সিক্রেট মিশনে অবশ্যই রাজি হবে, আমি জানি।"
নুসরাত ব্যাগটা চেইন আটকে দিয়ে বলল,
—"যদি রাজি না হন?"
আরিয়া আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে বলল,
—"না হয়ে যায় কোথায়! ভাইয়া আমাদের ভালোবাসে, ও কখনো চায় না আমরা অন্ধকারের মধ্যে থাকি। তাছাড়া, চট্টগ্রাম তো কক্সবাজারের পাশেই। ভাইয়াকে ম্যানেজ করা অদ্রিতার উপর ওপর ছেড়ে দে।"
প্রেম মাথা নেড়ে বলল,
—"ঠিক আছে, তাহলে প্ল্যান ফাইনাল। আমাদের সবার ব্যাগ গোছানো প্রায় শেষ। কাল ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আমরা সবাই একসঙ্গে এ বাড়ি থেকে বের হব। আর এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর টাইম হলো রাত আটটা।"
ঈশান ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"প্লেন ছাড়বে রাত আটটায়, তাই আমাদের এয়ারপোর্টে থাকতে হবে সাতটার মধ্যে। সবাই টাইমমতো রেডি থাকবি কিন্তু।"
রুদ্র সবাইকে মনে করিয়ে দিয়ে বলল,
—"আর হ্যাঁ, এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর বড়দের সামনে আমরা সবাই একসাথে থাকব। যখন ভাইয়া আর আমরা বোর্ডিংয়ের দিকে যাব, তখন আমাদের মূল প্ল্যান শুরু হবে। কক্সবাজার পৌঁছে আমরা হোটেলে চেক-ইন করার পরই, আমি, আরিয়া, সাহিল আর ঈশান—এই চারজন চুপচাপ ওখান থেকে চট্টগ্রাম সিটিতে খান বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেব। বাকিরা কক্সবাজারের হোটেলেই থাকবে আর বড়দের সামলাবে।"
সাহিল উৎসাহে একটা হাত তালি দিয়ে বলে উঠল,
—"দারুণ! একদম পারফেক্ট টাইম ম্যানেজমেন্ট। এবার শুধু মিশন সাকসেসফুল করার পালা!"
নুসরাত মুচকি হেসে বলল,
—"তাহলে আর দেরি কেন? আজ রাতটা ভালোমতো ঘুমিয়ে নিই, কাল অনেক ধকল সামলাতে হবে।"
সবাই যার যার মতো শেষ মুহূর্তের গোছগাছ শেষ করে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
.......
শিকদার বাড়ির সবাই রাতের খাবার শেষ করে সবাই যে যার মতো নিজ নিজ রুমে চলে গেছে। আরিয়াদের আগামীকাল রাত আটটার ফ্লাইট—তাই তাদের সবার মনেই ভ্রমণের আনন্দ।বন্ধু মহল সবাই মিলে ঝিংকু গ্রুপের একের পর এক প্ল্যানের কথা বলছে।
আরিয়া নিজের রুম থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে আরিয়ানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় দু'বার নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো—
—"কাম ইন ছুটকি ।"
আরিয়া দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
আরিয়ান বিছানায় বসে ল্যাপটপে কিছু অফিসিয়াল কাজ করছিল। আরিয়াকে দেখে ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল,
—"কিছু বলবি ছুটকি?"
আরিয়া মুচকি হেসে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
—"হ্যাঁ ভাইয়া, একটা কথা ছিল।"
—"বল।"
—"আমরা শুধু কক্সবাজারে না... চট্টগ্রামেও যাব।"
আরিয়ান ভ্রু তুলল।
—"চট্টগ্রাম?"
—"হুম। দু-একদিন ঘুরে আবার কক্সবাজারে ফিরব।"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
—"সমস্যা নেই। চট্টগ্রামেও অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। তাহলে কক্সবাজারে পৌঁছেই চট্টগ্রামের জন্যও একটা হোটেল বুক করে ফেলব।"
আরিয়ার ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল।
—"থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া।"
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
—"তবে হঠাৎ চট্টগ্রাম যাওয়ার ইচ্ছা হলো কেন?"
আরিয়া দুষ্টু হেসে উত্তর দিল,
—"তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।"
—"সারপ্রাইজ?"
—"হুম... এখন বলব না। সময় হলে নিজেই জানতে পারবে।"
আরিয়ান অনেক প্রশ্ন করতে চাইলেও আরিয়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।দরজার কাছে গিয়ে বলল,
—"গুড নাইট, ভাইয়া। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।"
—"গুড নাইট।"
আরিয়া নিজের রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।ঝিঙ্কু গ্রুপে মেসেজ লিখে সবাইকে জানিয়ে দিল, পরদিন বিকেল থেকেই সবাই তৈরি হতে শুরু করল। ট্রাভেল ব্যাগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, মোবাইল, চার্জার—সবকিছু আরেকবার ভালোভাবে দেখে নিল সবাই।আজ বড়রা কেউ তাদের সঙ্গে যাচ্ছে না। শুধু ছোটরাই যাচ্ছে, আর তাদের দায়িত্বে থাকবে আরিয়ান।সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরেই সবাই বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
আহনাফ সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—"সবাই নিজের নিজের জিনিসপত্র নিয়েছ তো? কেউ যেন কোনো ঝামেলা না করো।এবার সোজাসুজি আরিয়ার সামনে যেয়ে বলল
—"খচ্চুরনি শান্তশিষ্ট ভাবে থাকবি এদিকে ওদিকে একা যাবি না, এবার চাইলো আরিয়ানদের দিকে তাকালো,
সবাই একসঙ্গে মাথা নাড়ল।বাড়ির বড়দের কাছ থেকে একে একে বিদায় নিল সবাই।শারমিন শিকদার আরিয়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—"নিজের খেয়াল রাখবে,সবাই সাবধানে থাকবে আর আমাদের ফোন করবে ।"
রোজিনা শিকদার সাহিলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—"দুষ্টুমি কম করবি। আর আরিয়ানের কথা শুনবি।"
সাহিল মুচকি হেসে বলল,
—"জি ফুপি।"
আর্মান শিকদার আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—"ওদের দায়িত্ব কিন্তু পুরোপুরি তোর।"
আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল,
—"চিন্তা করবে না বড় আব্বু । সবাইকে নিরাপদে নিয়েই ফিরব।"
সন্ধ্যা ছয়টা ত্রিশ মিনিটে সবাই গাড়িতে উঠে বসল।রাত আটটায় ফ্লাইট হওয়ায়, ঠিক সাতটার মধ্যেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে যাওয়ার পরিকল্পনা।
গাড়ি ধীরে ধীরে শিকদার বাড়ির গেট ছেড়ে গাড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরএয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে চলেছে। পুরো গাড়িজুড়ে হাসি-আড্ডার রেশ।
সাহিল জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল,
—"এটাই কিন্তু প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ প্লেন জার্নি!"
অর্ক হেসে বলল,
—"তোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্লেনে ওঠার আগেই তুই অজ্ঞান হয়ে যাবি।"
সবাই হেসে উঠল।
আরিয়ান স্টিয়ারিংয়ের পাশের সিটে বসে সবাইকে একবার দেখে বলল,
—"এয়ারপোর্টে গিয়ে কেউ এদিক-ওদিক ঘুরবি না। সবাই একসাথেই থাকবি।"
—"জি, বস!"—একসঙ্গে বলে উঠল সবাই।
আরিয়ান চোখ রাঙাতেই আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে গাড়ি এয়ারপোর্টের সামনে এসে থামল।
সবাই নেমে নিজেদের লাগেজ নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।আরিয়ান আগে থেকেই অনলাইনে চেক-ইন করে রেখেছিল, তাই বেশি সময় নষ্ট হলো না।সিকিউরিটি চেক শেষ করে সবাই ওয়েটিং লাউঞ্জে গিয়ে বসল।
ঈশান চারদিকে তাকিয়ে বলল,
—"ওয়াও! এয়ারপোর্টটা সামনে থেকে আরও সুন্দর লাগছে।"
নুসরাত মোবাইল বের করে বলল,
—"একটা গ্রুপ সেলফি না তুললে কিন্তু চলবে না।"
সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুলে আবার নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল।
হঠাৎ লাউডস্পিকারে ঘোষণা ভেসে এলো—
—"ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী রাত ৮টার ফ্লাইটের সকল যাত্রীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে বোর্ডিং গেট নম্বর তিনে চলে আসার জন্য।"
সাহিল উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠল।
—"চল চল! আমাদের ডাক পড়ে গেছে!"
আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,
—"ধীরে। কারও কোনো তাড়া নেই। সবাই লাইন ধরে আসো।"
আরিয়া সবার পেছনে সে ফোন চালাচ্ছে আর এগোচ্ছে হঠাৎ করে এয়ারপোর্টের ভিড়ের মধ্যে হুট করে পা হড়কে পড়ে যাচ্ছিল আরিয়া। ঠিক তখনই সম্পূর্ণ কালো হুডি পরা লম্বা, এক মানব যার দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ আর চোখ দুটো অদ্ভুত ধূসর রঙের—বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে এক টানে তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।
আরিয়াকে নিজের খুব কাছে টেনে নিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে একটু বাঁকা ও বিপজ্জনক এক হাসিতে ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
—"লুকস লাইক ফেইট ওয়ান্টেড আস টু মিট দিস ওয়ে সানসাইন"
আরিয়া উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবে তাকে সেই মুহূর্তে আরিয়ানের ডাক পড়লো আরিয়া পিছে ঘুরে তাকালো। আরিয়ান বলল
—"কিরে ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস ছুটকি তাড়াতাড়ি আয়।
আরিয়া সামনের দিকে তাকে অবাক হয়ে গেল তার সামনে থেকে সে মানবটা তার সামনে নেই আরিয়া এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখতে চাইলে যে সে আজে কি না কিন্তু না সে কোথাও নেই। আরিয়ান এবার এসে আরিয়ার বাহি ধরে তাকে নিয়ে যেতে লাগলো যেতে যেতে বলল
—"বনু চল চল না হলে আমাদের দেখে প্লেন ছেড়ে দিবে।
সবাই বোর্ডিং গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
বোর্ডিং শেষ করে একে একে সবাই প্লেনে উঠে নিজেদের সিটে বসল।আরিয়া আর রুদ্র পাশাপাশি সিটের নাম্বার পেয়েছে আরিয়া জানালার পাশের সিটে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। রানওয়ের আলো ঝলমল করছে।
অদ্রিতার পাশে বসা আরিয়ান নিচু গলায় বলল,
—"এখন বলোতো, ওই সারপ্রাইজটা কী?"
অদ্রিতা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
—"আর একটু অপেক্ষা করেন । কক্সবাজারে পৌঁছালেই সব জানতে পারবেন ।"
আরিয়ান অসহায় ভঙ্গিতে হেসে বলল,
—"ঠিক আছে। দেখি সারপ্রাইজটা কি ।"
কয়েক মিনিট পর কেবিন ক্রুর কণ্ঠ ভেসে এলো—
—"সবাইকে সিটবেল্ট বাঁধার অনুরোধ করা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান উড্ডয়ন করবে।"
সবাই সিটবেল্ট বেঁধে নিল।
ধীরে ধীরে বিমানটি রানওয়ের ওপর গতি বাড়াতে শুরু করল...একে একে করে সবাই ক্লান্তিতে চোখ বুজে রাখলো, আরিয়া চোখ বুজতে বুজতে ঘুমিয়ে পড়েছে তার মাথাটা কাঁধে রুদ্রের কাঁধে এসে ঠেকলো রুদ্র চমকে আরিয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, আরিয়ান মুখের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠলো
তুমি সব ভালো আমার,
তুমি সব আলো আমার।
অন্ধকার তো না, তবে কি
বৃথা যাবে, প্রেম প্রার্থনা!
ঈশ্বর কি তোমার-আমার
মিলন লিখতে পারত না!
সে একভাবে আরিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল তার হয়তো এই ধর্মের দেওয়ালের জন্যই আরিয়াকে তার মনের কথা কখনোই বলা হবে না, রুদ্র প্রার্থনা করে আরিয়া যেন সব সময় ভালো থাকে আরিয়াকে ভালো দেখায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
(অন্যদিকে খান বাড়ি).....
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের ঠিক যেখানটায় আকাশটা পাহাড়ের চূড়াকে ছুঁয়ে যায়, ঠিক তেমনই এক ছায়াঘেরা মনোরম জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে (খান বাড়ি)। ব্রিটিশ আমলের নকশায় তৈরি এই বাড়িটার চারপাশে রয়েছে সারি সারি রেইনট্রি, সেগুন গাছের বন আর বাঁশঝাড়। বাড়ির ঠিক পেছন দিয়েই বয়ে চলেছে একটা ছোট পাহাড়ি ঝরনা। সারা বছর সেই ঝরনার পানি পাথরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ার একটানা কুলকুল শব্দ চারপাশের নীরবতাকে আরও মায়াবী করে তোলে।
এই বাড়ির প্রাণ হলেন বাড়ির একমাত্র কন্যার মেয়ে আরাবি (আরাবি সিকদার নোভা)। রেহানা খান একা হাতে সন্তানকে আগলে রাখা এক লড়াকু ও মমতাময়ী নারী। সমাজের হাজারো প্রতিকূলতা আর অতীতের নানা ঝড়েও তিনি যেন এই পাহাড়ের মতোই অটল। রেহানা খানের পৃথিবী জুড়ে শুধু তার সন্তান—নোভা।খান বাড়ির সবার চোখের মনি আরাবি মামা মামি ভাইদের আদরের সে। নোভা শান্ত সৃষ্ট সব সময় বই খাতা পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে খুব কম কথা বলে সবার সাথে যেটুকুই বলে ওইটুকুই যথেষ্ট সবার জন্য । নোভা সব সময় কলেজ থেকে এসে মাকে এসে দেখে বারান্দায় বসে চা খেতে, আজও বাসায় ফিরে তাই দেখল, বারান্দার মোড়ায় কাঠের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন রেহানা খান। তাকে দেখলে কেউ মনে করবে না তারা এত বড় একটা মেয়ে আছে, এখনো যুবতী নারীর মত সুন্দর চুলগুলা লম্বা কোমর ছাড়িয়ে গিয়েছে দেখতে অসম্ভব সুন্দর, নোভা কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মায়ের চোখের সেই মায়ার কমতি হয়নি এক বিন্দুতেও।
কলেজ থেকে এসেই মুখ না ধুয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে বারান্দায় এসে হাজির হলো নোভা। ওর পরনে কলেজের সাদা কালারের ড্রেস, চুলে বেনুনি করা চোখে একটা কালো ফ্রেমের চশমা । হাতে একগুচ্ছ বকুল ফুল।সে প্রতিদিনই মায়ের আসার পথে কুড়িয়ে আনে। রেহানা মেয়ের দিকে মুচকি হেসে বললেন
—"মাম্মাম তোমাকে না বলেছি এসে হাতমুখ ধুয়ে নিবে, আমার কথা শোনো না কেন জানবাচ্চা আমার?
—"আম্মু , দেখেছো আজ আকাশটা কী সুন্দর লাল হয়ে গেছে? মনে হচ্ছে পাহাড়ের গায়ে কেউ যেন আল্পনা এঁকে দিয়েছে,ঠিক তোমার মত সুন্দর !"—হাসতে হাসতে বলল নোভা।
রেহানা খান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হাসলেন। মেয়ের এই সারল্যই তাঁর জীবনের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়। তিনি নরম গলায় বললেন, " —"পাহাড়ে বসন্তের হাওয়া লেগেছে,আর আমার থেকে সুন্দর আমার জান বাচ্চাটা, কারণ নজর না লাগুক, বলে নোভার মাথায় একটা চুমু একে দিলেন। নোভাও মায়ের চুমু খেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো
ঠিক তখনই ভেতর থেকে ট্রে হাতে বেরিয়ে এলো মাহির খান রেহানার বড় ভাই মারহান খানের একমাত্র ছেলে । গরম নুডুলস এর বাটিটা ফুপির দিকে দিকে দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বসল ঠিক পাশেই। নোভারর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল
—"কলেজ থেকে এসেই এখানে কি তোর যা ফ্রেশ হয়ে আয় নুডুলস ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
নোভা মাহির কে ভয় পায় আবার একটু লজ্জা হবে, কারণ তার কিশোরী মনের প্রথম ভালোলাগার প্রণয়, সে মাহিরের কথা শুনে নিজের ঘরের দিকে ফ্রেশ হতে চলে গেল। রেহানা ভাইপোর দিকে তাকিয়ে বললেন
—"এত বকিস কেন ওকে ফাজিল ছেলে একটা। আমার মেয়েটাকে শুধু শুধু কষ্ট দিস কান মুলে দেবে একদম তোর।
মাহির ফুপির কথা শুনে হেসে দিল, কিছুক্ষণ পর মাহির বলল
—"ফুপি আমাদের বাসায় আমি যেই শিকদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ সাথে কাজ করছি তার ছেলে এবং আমার আমার ফ্রেন্ড আরিয়ান ও তার ভাই বোন বোন চট্টগ্রাম এসেছে আমি তাদের আমাদের বাসায় ইনভাইট করেছি তারা কার বা পরশু আসবে। তোমার কোন আপত্তি আছে ফুপি।
—"এই পাগল ছেলে আমার কেন আপত্তি থাকবে, তাই আসুক আমিও খুশি আমার আরো কয়েকটা ছেলে মেয়ে আমার সাথে কয়েকদিন থেকে গল্প করে যাবে এটা তো আমি আরো খুশি তাদের এসে কয়েকদিন থেকে যেতে বলবি না হলে কিন্তু আমি খুব রাগ করব।
মাহির জানতো তার ফুপু এমন কথাই বলবে কারণ তার ফুফু কে সে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে, মাহির হেসে ফুপিকে বলল
—"আমি জানতাম তুমি এমন কথাই বলবে আচ্ছা ঠিক আছে আমি আরিয়ানদের বলবো। তার মধ্যেই নোভা আসলো পরনে সাদা কালার একটা সালোয়ার কামিজ ওড়নাটা লাল কালারের চুলটা হলে ছোট ক্লিপ থেকে বেঁধেছে সে চোখে এখনো চশমা, এসেই মায়ের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে বলল
—"আম্মু কাল আমার কলেজে এক্সামের পর ব্যাচ আছে ফিরতে লেট হবে আমি সুমাইয়াদের সাথে বাসায় ফিরব, সুমাইয়া হলো নোভার একমাত্র কথা বলার সাথী এবং তার বেস্ট ফ্রেন্ড, দুজনের গলায় গলায় ভাব সুমাইয়া ইসলাম মেয়েটা হল বাবা মার খুব আদরের, সে খুব চঞ্চল সারাক্ষণ বকবক করতে থাকে, নোভার তো মাঝে মাঝে মনে হয় এই মেয়েকে যে বিয়ে করবে তার কপাল পুড়বে এত বকবক করতে পারে এই মেয়ে এই কারণে।
রেহানা মেয়ের কথা শুনে বলল
—"আচ্ছা আম্মু তুমি আর সুমাইয়া তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসবে, আর যদি মাহির পারে তোমাদের নিয়ে আসবে।
—"আচ্ছা আম্মু।
মাহির এবার নোভার দিকে তাকিয়ে নুডুলস এর বাটিটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলল
—"নিন আপনার নুডুলস ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলুন, আপনার জন্য ফুপিও এখনো খাইনি নেন আমরা তিনজন মিলে শুরু করি।
নোভা ভুরু কুঁচকে তাকানো মাহির দিকে বিড়বিড় করে বলে উঠলো "—রাজপুত্তর আজও তো ভালো করে কথা বলছে আবার একটু পরেই শুরু করবে এই লোকটাকে নিয়ে আমি কোথায় যায়।
মাহির নোভার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল
—"আরাবি বেশি বিড়বিড় না করে তাড়াতাড়ি শেষ কর। নোভাও খেতে শুরু করল, রেহেনা খান উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন, মাহির আর নোভা নিজেদের মতো গল্প করতে লাগল মাহির এক এক করে আরিয়ানদের কথা বলতে লাগলো আর নোভা হুম হ্যাঁ করতে লাগলো।
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঠান্ডা বাতাস তখন তাদের গায়ে আলতো পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।
.......
অন্যদিকে.....
রাত নয়টার মধ্যে আরিয়ারা কক্সবাজারে পৌঁছে গেল সবাই প্লেন থেকে নেমে গাড়ি বুক করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিল , হোটেলে পৌঁছাতেই বড় বড় দুইটা রুম বুকিং করা হলো দুইটার মধ্যেই চারটা করে বেড, আরিয়া আরিফা আনিকা নুসরাত অদ্রিতা, তাদের একটা রুম দেওয়া হলো, আর অন্যটাই সাহিলরা, ওরা নিজেদের রুমে ঢুকে একটা বেড আরিয়ানও ইশানের জন্য ছেড়ে অন্য তিনটা বেডে তারা সবাই ঘুমিয়ে গেল, আরিয়াদের রুমে আরিয়ারা সবাই জেগে কিভাবে কি করবে এইসব নিয়ে নিয়ে পরিকল্পনা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ মধ্যেই শিকদার বাড়ি থেকে ভিডিও কল আসলো আলিয়ার ফোনে আরিয়া দেখল হোয়াটসঅ্যাপে সেভ করা নাম্বার মাই ওয়ার্ল্ড লেখা এটা মূলত সে তার আম্মুর নাম্বার সেভ করে রেখেছে। ফোনটা রিসিভ করতেই দেখল লাবণ্যকে তারা যখন ট্রেনে উঠেছিল তখন লাবণ্য মূলত ঘুম ছিল। লাবণ্যকে দেখে আরিয়া বলল
—"কি হয়েছে মুখটা এমন করে রাখছিস কেনো?
পাশ থেকে রোজিনা শিকদার বলল
—"তুই বলে যাসনি এর কারণে, বলেছে শারমিন শিকদারের ডাক শুনে চলে গেল আরিয়া কে বলল "তোর মামনি ডাকছে আমি যায় তোরা দুই বোন কথা বল। আরিয়া ওকে বলল।
—"তুমি আমালে বলে যাও নি তেনো?
—"আচ্ছা আমি কি বিয়ে করে চলে এসেছি যে তোকে বলেই আসবো?
—"বিয়ে তি?
—"বিয়ে একটা ভালো জিনিস
—"বিয়ে কিভাবে কলে?
—"কবুল তিন বার বললেই বিয়ে করা হয়ে যায়
—"তবুল বললেই হবে সত্যি?
—"হ্যাঁ তোর তবুল বললেই হবে !
—"তুমি আতার সময় চথলেট এনো ঠিক আছে আরুপি।
—"আচ্ছা ঠিক আছে এনি দিবো এখন চুপচাপ যে ঘুমাও টাটা লবঙ্গ টেক কেয়ার লাভ ইউ..!
—"তাতা!আলাভু টেক কেয়াল।
এখানে দুই বোনের কথোপকথন শেষ হলো। আরি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে আরিয়া ভুল করতে বলল কি হয়েছে
অদ্রিতা আরে এর পিঠে ধুম করে একটা কিল মেরে বলল
—"এই ননদিনী তুই আমার ছোট ননদিনীকে থেকে বিয়ে কি সব শিখাচ্ছিস, ও ছোট মানুষ এগুলো বুঝে।
নুসরাতরা সবাই মিলে অদ্রিতারর কথায় মাথা নাড়িয়ে আরিয়া বলতে শুরু করল একের পর এক কথা এই নিয়ে। আরিয়া বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বলল
—"এই বাল চুপ এত প্যাচাল পারিস কেন এক একটা বাচাল নাকি তোরা লবঙ্গ কখনো বিয়ে করবে না নাকি এর আগে বলে রাখা ভালো আর একটাও কথা বলবিনা গু খা তোরা,
আরিয়ার ধমকে ওরা সবাই একদম ওকে চুপ হয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো।
চলবে...