ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ বিকালের মুগ্ধতা

৩৩তম পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান আফিয়া

#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা (পর্ব ৩২)

লেখনীতে:- 
#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
ঝমঝম করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি মেঠো পথে। সেই নির্জন, আধা-ভাঙা কুঠুরির ভেতর কাজী সাহেবের গম্ভীর গলার আওয়াজ মিলিয়ে যাওয়ার পরও চারপাশটা যেন থমথমে হয়ে রইল। তিনবার "কবুল" শব্দটা নোভার কানে কোনো বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধেছে। চোখে কালো চশমা আঁটা শান্ত মেয়েটার বুকের ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে—যে ঝড়ের তাণ্ডবে তার পুরো পৃথিবীটা এক মুহূর্তে তছনছ হয়ে গেল। চোখের কোণে জমা জল বোরখার কালো নেকাব ভিজিয়ে নিঃশব্দে নিচে ঝরে পড়ল।
পাশে বসে থাকা ঈশানের অবস্থাও ততক্ষণে শোচনীয়! তার মুখের চেনা বাঁকা হাসি উধাও। কপালে হাত দিয়ে সে মনে মনে নিজের ভাগ্যকে কোসছে। কোথায় সে এসেছিল আরিয়ার কথামতো মেয়েটাকে ভয় দেখিয়ে আসল সত্য জানতে, আর এখানে এসে গ্রামের ক্ষিপ্ত মুরুব্বিদের চাপে পড়ে একেবারে কাজীর সামনে বসে বিয়ে করে বের হতে হচ্ছে!মুরুব্বিরা কাজী সাহেবকে নিয়ে বিদায় নিতেই
পকেট থেকে কাঁপতে কাঁপতে ফোনটা বের করল ঈশান। হাত দুটো তার থরথর করে কাঁপছে। গ্রুপে একটা মেসেজ ড্রপ করা দরকার, । সে দ্রুত 'ঝিঙ্কু গ্রুপে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে টাইপ করল—
—"আরিয়া! রুদ্র!সাহিল তোরা প্লিজ তাড়াতাড়ি এই লোকেশনে আয়। আমি বিশাল এক বিপদে পড়ে গেছি... মানে তোদের প্ল্যান করতে গিয়ে আমার লাইফটাইম সেটেলমেন্ট হয়ে গেছে! তাড়াতাড়ি আয় বলছি বাল!"
এদিকে কক্সবাজার থেকে রওনা দেওয়া ট্যাক্সিটা তখন সীতাকুণ্ডের নির্দিষ্ট এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। ট্যাক্সির ভেতরে বসে আরিয়া বারবার ঘড়ি দেখছিল। হঠাৎ করেই ঈশানের সেই মেসেজ আর লাইভ লোকেশন স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই গাড়ির ভেতর একটা হুলস্থূল পড়ে গেল।
আরিয়া চোখ গোল গোল করে চেঁচিয়ে উঠল,
—"স্টপ! ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি থামান! ঈশান এই লোকেশন পাঠিয়েছে কেন? 
রুদ্র ফোনটা নিজের হাতে টেনে নিয়ে লোকেশন চেক করতে করতেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। সে গম্ভীর গলায় বলল,
—"চল, জলদি যা এখানে! মনে হচ্ছে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে।"
তারা আর দেরি না করে ট্যাক্সি থেকে নেমেই দৌড়ে ঠিকানার উদ্দেশ্যে ছুটল। মিনিট দশেক বাদেই তারা সেই কুঠুরির সামনে গিয়ে হাজির হলো। দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই তাদের চোখ তো কপালে ওঠার জোগাড়! 
মেসেজটা পাঠিয়েই ঈশান কুঠুরির বাইরে এলো। ওদিকে নোভা তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে ভেজা কাপড়ে ধপ করে মেঠো পথে বসে পড়েছে। নিজের জীবনে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত সত্যিটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টির পানির ছিটকা উড়িয়ে কালো রঙের গাড়িটা এসে থামল ঈশানের পাঠানো লোকেশনে। গাড়ি থেকে এক ঝটকায় নেমে এলো আরিয়া, রুদ্র আর সাহিল।
আরিয়া গাড়ির গ্লাস নামিয়ে রেগে মেগে বলল,
— "ঈশান! তুই এখানে কী করছিস? আর লোকেশন পাঠালি কেন? কিডন্যাপ করতে গিয়ে তুই কি হারায় গেছিস নাকি?"
ঈশান নিজের ভেজা চুল খামচে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— "আরে বইন, তুই সব শুনলে মাথা ঘুরে পইড়া যাবি! আমি কিডন্যাপ করতে গেছিলাম ঠিকই, কিন্তু লোকাল মুরুব্বিরা আমায় ধরে কাজী ডেকে এই চশমিস বিচ্ছুর সাথে বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে! এখন আমি কী করব?"
আরিয়া, রুদ্র আর সাহিল একযোগে চিৎকার করে উঠল,
— "কীহ্?!"
আরিয়া নিজের কপালে হাত দিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে আর কথা না বাড়িয়ে রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল। মেয়েটির মুখ বোরখা আর নেকাবে শক্ত করে ঢাকা, শুধু চশমার আড়ালে ভেজা চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। আরিয়া এখনও জানে না এই মেয়েটির আসল চেহারা কেমন, কিন্তু তার ভেতরের সিক্সথ সেন্স আর ব্যাকগ্রাউন্ড ইনফরমেশন বলছিল—এই মেয়েটিই নোভা! যে রহস্যের জট খুলতে তারা কক্সবাজার থেকে লুকিয়ে এখানে এসেছে, সেই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু এই মেয়েটিই।
আরিয়া নোভাকে সযত্নে ধরে তুলে গাড়ির ব্যাকসিটে বসাল। নোভার শরীরে তখনও থরথর করে কাঁপন। আরিয়া কিছু না ভেবেই ইশানের পরনের কালো ওভারসাইজড হুডিটা জোর করে খুলিয়ে নোভার গায়ে জড়িয়ে দিল। আরিয়া নিজেও নিজের পোশাক ঠিক করে হুডির ক্যাপ মাথায় টেনে দিল, যাতে কেউ তাকে হুট করে চিনে না ফেলে।
সাহিল ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে বলল,
— "এখন কোথায় যাব আমরা?"
আরিয়া গম্ভীর গলায় বলল,
— "সব নাটক বন্ধ করে সোজা গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে । এখন আমরা সোজা চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের খান বাড়িতে যাব! রেহেনা আন্টির মুখোমুখি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।"
সবাই দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার ঠিক ওই মুহূর্তেই আরিয়ার ফোনে সশব্দে রিং বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল এক আতঙ্কের নাম—'আরিয়ান ভাইয়া'!
আরিয়া একটা গভীর শ্বাস নিয়ে কাঁপা হাতে কলটা রিসিভ করে কানে দিল।
ওপাশ থেকে আরিয়ানের বরফশীতল, কঠোর আর হুংকার ছাড়ার মতো কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "আরিয়া! তোরা এখন কোথায়? হোটেলের রুমে তোদের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?"
আরিয়া ঢোক গিলে বলল,
— "ভ-ভাইয়া... আমরা একটু বাইরে এসেছি। একটা জরুরি কাজে..."
আরিয়ান হোটেলের রুমে অদ্রিতাদের ধমক দিয়ে ততক্ষণে সব সত্যি জেনেই বসে ছিল। সে গর্জে উঠে বলল,
— "আমাকে নাটক শোনাবি না আরিয়া! অদ্রিতারা আমায় সব বলে দিয়েছে। তোরা যে সীতাকুণ্ডে খান বাড়ির দিকে যাচ্ছিস, সেটা আমি জানি! তোদের এত বড় সাহস হয় কীভাবে আমার আদেশ অমান্য করার?"
আরিয়া ভয় পেয়েও একটু শক্ত হয়ে বলল,
— "ভাইয়া, তুমি যাই বলো না কেন, আমাদের জানা দরকার নোভা কে! রেহেনা আন্টি কেন এত বছর ধরে আমাদের কাছ থেকে নোভাকে লুকিয়ে রেখেছে? আমরা এখন খান বাড়ির দিকেই যাচ্ছি।"
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— "ছুটকি! কে নোভা কে কিছুই তো বুঝতেছি না। মাহির খানের ফুপি রেহেনা খান?তোর মাথায় যে কি চলছে কিছুই বুঝছি না! আমি অলরেডি কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের হাইওয়েতে আছি আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাব আমরা সবাই একসাথে খান বাড়িতে ঢুকবো। 
আরিয়ান কলটা কেটে দিল। আরিয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে আরিয়ান ভাইয়া আসছে, কিন্তু ততক্ষণে তাদের আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই।
বৃষ্টি তখন একটু ধরে এসেছে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে সীতাকুণ্ডের খান বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল আরিয়ার গাড়িটা।
গাড়ি থেকে নেমে নোভা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মুখ ঢেকে সোজা বাড়ির দরজার দিকে দৌড় দিল। ভেতরে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সে সম্পূর্ণ অচেনা। তার পেছনে পেছনে ঈশান, সাহিল, রুদ্র আর মাথা থেকে ক্যাপ টানা আরিয়া ভেতরে ঢুকল।
ড্রয়িংরুমে তখন মাহির কফির কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নোভাকে এভাবে বোরখা-নেকাব আর এক অচেনা ছেলেদের হুডি পরে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঢুকতে দেখে মাহির ঘাবড়ে গেল। সে কফির কাপটা টেবিলে রেখে ছুটে এলো নোভার কাছে,
— "চাশমিস? কী হয়েছে তোর? এভাবে কান্নাকাটি করছিস কেন? পাখি তোকে কি কেউ কিছু বলেছে,?"
নোভা কিছু বলতে পারল না, সে মাহিরের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ঠিক তখনই পেছনে থাকা ঈশান আমতা আমতা করে বলে উঠল,
— "মানে... , একটা বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে গেছে! গ্রামে একটা ভুল বোঝাবুঝিতে কাজী ডেকে আমার সাথে ওর... আই মিন নোভার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে !"
"কী বললে তুমি?!"
মাহিরের মাথার ওপর যেন একযোগে একশোটা বাজ পড়ল! তার হাতের কফির কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল । যে ছোট চাশমিস মেয়েটাকে সে শৈশব থেকে ভালোবেসে এসেছে, নিজের মনের গহীনে আগলে রেখে এসেছে—সেই নোভার হঠাৎ অন্য একটা অচেনা ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেল? মাহিরের বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। তার চোখ দুটো মূহূর্তেই লাল হয়ে এলো কষ্টের তীব্রতায়।
ঘটনার আকস্মিকতায় ড্রয়িংরুমে ছুটে এলেন রেহেনা খান। তিনি হতবাক হয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিলেন। নোভা তখন কান্নায় ভেঙে পড়ে জড়িয়ে ধরল মাহিরকে, আর নিজের ওপর ঘটা এই অন্যায়ের কথা ভেবে মাহিরও চোখের জল ধরে রাখতে পারল না।রেহেনা অপরিচিত মানুষ দেখে তাদের দিকে তাকালো,মাহির কে জিজ্ঞেস করতে লাগলো নোভা কাঁদছে কেন কিন্তু মানুষ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখ দুটো লাল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়া ভিড়ের মধ্যে থেকে এক পা সামনে এগিয়ে এলো। তার মাথায় তখনও হুডির ক্যাপ টানা, মুখটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।
রেহেনা খান কাঁপানো গলায় আরিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "তোমরা কারা? আর আমার মেয়ের সাথে কী হয়েছে? তুমি কে খুকি?"
আরিয়া কিছু বলল না আর একে চুপ থাকলে দেখে পাশ থেকে রুদ্র বলল 
—"আন্টি প্লিজ আপনাকে শান্ত হয়ে বসুন আমি আপনাকে বলছি সবকিছু। 
ছেলেটার নরম স্বরে কথা বলাতে কিছু স্বস্তি পেলো রেহেনা,তারপর সে সবাইকে বসতে বলল সোফায়, এক এক করে সবাই বসে পড়ল নোভা আর মাহির অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে নোভা এখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে মাহির বুকে।অন্যদিকে ঈশান এটা দেখে কটমট করে নোভা দিকে তাকালো। 
আরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরেসুস্থে দুই হাত দিয়ে নিজের মাথার হুডির ক্যাপটা পেছনে ঠেলে দিল।
ঝাড়বাতির প্রখর আলোয় সোজা ফুটে উঠল আরিয়ার মুখমণ্ডল।
আর সেই ফর্সা, মায়াবী আর চেনা মুখটা দেখা মাত্রই রেহেনা খানের চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! তাঁর গায়ের রক্ত যেন মুহূর্তে হিম হয়ে গেল! এক অদ্ভুত ভীতি আর শকে রেহেনা খান দু-পা পিছিয়ে গিয়ে সোফায় ভর দিয়ে বসে পড়লেন ।
রেহেনা খানের মুখ দিয়ে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ বের হলো,
— "তু-মি...?"
আরিয়াকে দেখার সাথে সাথেই রেহেনা খানের বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল—তবে কি বিশ বছর আগের সেই গোপন অতীত আজ সবার সামনে ভেসে উঠবে? তবে কি নোভাকে তিনি আজ চিরতরে হারিয়ে ফেলবেন? নোভাকে হারানোর সেই ভয় রেহেনা খানকে গ্রাস করে ফেলল।
রেহেনা খান থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। তিনি আর সহ্য করতে না পেরে সোজাসুজি মেঝেতে বসে পড়ে সবার সামনে সেই আঠারো বছর আগের সত্যিটা যেটা সে কখনো কারো সামনে আনতে চাইনি কিন্তু আজ সেটা সামনে চলে এসেছে ।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— "আমায় ক্ষমা করে দিস তোরা!নোভা নাজমুল আর রোজিনার সন্তান। সেই শিকদার বংশের রক্ত। কিন্তু আমার কি দোষ ছিল আমার কাছে তো কেউ ছিল না সে আস্তে আস্তে অতিথি সবকিছু খুলে বলতে লাগলো 
(অতীতে ফিরে যাওয়া যাক)... 
তখন আমাদের শিকদার বাড়ির পাশে ছিল ছোট্ট সেই পৈতৃক ভিটে। বাড়ির ঠিক পাশেই ছিল সবুজ ঘেরা বড় একটা পুকুর। সেই পুকুরপাড়ে আনমনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশ দেখা আর ভাবনার সাগরে ভেসে বেড়ানোই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। গ্রামের প্রভাবশালী খান বংশের একমাত্র রাজকন্যা আমি, আদরে-আহ্লাদে বড় হওয়া একটা মেয়ে। আমার বাবা রিফাত খান আর নাজমুল শিকদারের বাবা নিজামুদ্দিন শিকদার ছিলেন একে অপরের কলিজার টুকরো বন্ধু। দুই পরিবারের যাতায়াত ছিল রক্তের সম্পর্কের চেয়েও গভীর, যেন এক সুতোয় বাঁধা দুটি ঘর।
তখন আমার বয়স সবেমাত্র ষোলো, দশম শ্রেণির ছাত্রী। কিন্তু আমার শারীরিক গঠন আর বয়সের সেই কোঠা ছাড়ানো রূপ দেখে যে কেউ ভুল করে ভাবত আমি বুঝি কোনো ভরন্ত যুবতী! মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা মাথাভریق ঘন, কালো লম্বা চুল আর আমার মিষ্টি হাসি চারপাশটা সবসময় আলোকিত করে রাখত। গ্রামের সবাই আমাকে নয়নের মণি বলে ডাকত। কিন্তু আমার নিজের চোখ দুটো তো অন্য কাউকে খুঁজত!
সেদিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। আমাদের সহজ-সরল সেই পরিবেশে কিশোরী মনের অজান্তেই আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম নাজমুল শিকদারকে। তখন তার বয়স মাত্র সতেরো, সবেমাত্র কলেজে পা রেখেছে। কিশোরী মনের সেই প্রথম ভালোলাগা ধীরে ধীরে আমার না বলা গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম, একটু বড় হয়ে বাবাকে নিজে গিয়ে বলব যে আমি আমার এই প্রথম প্রণয়কেই জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাই। কিন্তু আমার লাজুক স্বভাব, সামাজিক সংকোচ আর মেয়েলি জড়তার কারণে কখনো সাহস করে নাজমুলের সামনে গিয়ে নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারিনি। আমি শুধু দূর থেকে তাকে ভালোবেসে গেছি, আর বুকভরা আশা নিয়ে প্রার্থনা করেছি—নাজমুল যেন একদিন নিজে থেকেই আমার মনের কথা বুঝতে পারে।
এরই মধ্যে আমার বড় বোনের দেবর বা অন্য কোনো কাজে আমাকে কিছুদিন দেশের বাইরে বড় বোনের কাছে চলে যেতে হলো। আমি যখন পরবাসে, তখন ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকেনি। আমার অবর্তমানে গ্রামের বাড়িতে ঘটে গেছে এক বিরাট ঝড়, যার বিন্দুমাত্র আঁচ আমি পাইনি।
আমি যখন তিন মাস পর বুকভরা আশা আর নিবিড় ভালোবাসা নিয়ে দেশে ফিরলাম, তখন আমার মন শুধু নাজমুলকে এক পলক দেখার জন্য ছটফট করছিল। কিন্তু দেশে ফিরে যা শুনলাম, তা আমার পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিল! জানতে পারলাম, চৌধুরী বাড়িতে এক দাওয়াতে গিয়ে সামাজিক চাপে এবং পরিস্থিতির শিকার হয়ে নাজমুলের বিয়ে হয়ে গেছে রোজিনার সঙ্গে।
এই খবর শোনার পর আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গিয়েছিল। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কোনো রকমে উদাস ও আনমনা হয়ে নাজমুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছে। আমার সেই কিশোরী বয়সের গোপন ভালোবাসার কথাটি আর লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কাঁপাপা কাঁপা গলায় স্বীকার করলাম, আমি বহু বছর ধরে শুধু তাঁকেই ভালোবেসে আসছি।
আমার কথা শুনে নাজমুল মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর অত্যন্ত কাঠিন্য নিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল:
—"এখন এসব বলে লাভ কী, রেহেনা? আমি এখন বিবাহিত। আমি তোমাকে কখনো সেভাবে দেখিনি। আর তুমি তো আগে কখনো আমাকে কিছু বলোনি। আজ যখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে, এখন এসব বলার কোনো মানে হয় না। আমি আমার রোজকে খুব ভালোবাসি। সে আমার জীবনের প্রথম নারী।"
নাজমুলের সেই নির্মম ও স্পষ্ট কথাগুলো যেন তীরের মতো এসে বিঁধল আমার বুকে। কিশোরী বয়সের সেই পবিত্র, কাচভাঙা স্বপ্নগুলো নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আমি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে নাজমুলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম—
—"তুমি যখন আমার হবেই না, তাহলে কেন তোমার সাথে আমার দেখা হলো? কেনইবা আমার মনে তোমার জন্য এত ভালোবাসা সৃষ্টি হলো? আচ্ছা, আমাকে কি ভালোবাসা যায় না? আমি কি ভালোবাসার একটুও যোগ্য নই? তোমার ঘরের দাসী হয়ে সারা জীবন তোমার পায়ের কাছে পড়ে থাকতাম, একবার যদি তুমি মুখে ভালোবাসার কথা বলতে! কিন্তু তুমি তো তা বললে না, আর আমাকে ভালোবাসলেও না... আচ্ছা, এই দুনিয়ায় মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি চায়, তাকেই কেন পায় না, বলতে পারো? আচ্ছা যাও, তুমি তোমার সংসার নিয়ে সুখী হও। আমার জীবনের সমস্ত সুখও তোমার হোক, সারা জীবন তুমি হাসি-খুশি থেকো।"
কথাগুলো শেষ করে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে পারিনি। চোখের জল লুকিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। সেই দিন আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।সেদিন নাজমুলের কাছ থেকে অবহেলা আর বুকভাঙ্গা কষ্ট নিয়ে ফিরে আসার পর আমার জীবনটা একদম থমকে গিয়েছিল। নিজের কষ্ট ঢাকতে আর পরিবারের অমতে কিছুদিন পর আমি সোজা চলে গেলাম দেশের বাইরে, বড় বোনের কাছে। ভিনদেশে গিয়ে নিজেকে পড়াশোনায় ডুবিয়ে দিলাম। বোন আর দুলাভাইয়ের ছায়ায় থেকে আস্তে আস্তে নিজের গ্র্যাজুয়েশন এবং মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম। বাহ্যিকভাবে সবাই ভাবল রেহেনা বুঝি নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতা সবসময় আমাকে কুরে কুরে খেত।
​এভাবে দেখতে দেখতে জীবনের আটটি বছর পেরিয়ে গেল। দেশের মাটির টান, আর অবচেতন মনে নাজমুলকে ভুলে যাওয়ার হাজারো চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হলাম। আট বছর আগের সেই না বলা ভালোবাসা আর অবহেলার স্মৃতিগুলো আজও তাজা ছিল। অবশেষে সব পড়াশোনা শেষ করে সিদ্ধান্ত নিলাম, আর নয়—এবার নিজের দেশে ফিরে যাব। শিকড় তো শিকড়ই টানে।
​দেশে ফেরার কিছুদিন পরই আমার জীবনে এক অদ্ভুত ও আকস্মিক ঘটনা ঘটে গেল। একদিন হঠাৎ করেই শারীরিক কিছু জটিলতা ও অসুস্থতা অনুভব করায় স্থানীয় একটি নামকরা হাসপাতালে যেতে হলো। হাসপাতালের ভেতরে পা রাখতেই হঠাৎ দেখি মানুষের ছোটাছুটি আর চরম আতঙ্ক! চারদিক থেকে চিৎকার ভেসে আসছে—"আগুন লেগেছে! হাসপাতালে আগুন লেগেছে!"
​চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্কে সবাই যখন জীবন নিয়ে পালাচ্ছে, তখন আমার নিজের অসুস্থতার কথা মাথা থেকে পুরোপুরি উবে গেল। আমি এক অদ্ভুত টানে হাসপাতালের ভেতরে ছুটে গেলাম। বাচ্চাদের ওয়ার্ডের সামনে ঠিক সেই মুহূর্তে কান্নার এক রোল আমার কানে এল—চারদিক থেকে নিষ্পাপ বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আমি আর ঠিক থাকতে পারলাম না, ধোঁয়া আর আগুনের পরোয়া না করে সোজাসুজি নবজাতকদের ওয়ার্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম। সামনে পৌঁছে দিয়ে দেখতে পারলাম সব বাচ্চাদের একে একে করে বের করছে, আমার হঠাৎ চোখ দূরে থাকে নাজমুলের দিকে আমাকে খেয়াল করেনি, নার্স তার কোলে একটা কন্যা শিশু বাচ্চা দিয়ে বলে,
—" সরি মিস্টার শিকদার আপনার টুইন সন্তানদের মধ্যে দিয়ে ছোট মেয়েটা বেঁচে আছে বড় জন হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বেই মারা গিয়েছে। 
সেই দিন আমি নাজমুলকে দূরে দাঁড়িয়ে কান্না করতে দেখেছিলাম, মেয়েটাকে কোলে নিয়ে সে কান্না করছিল কান্না করতে করতে কার কানে আজান দিচ্ছিলো,মৃত সন্তানের শোক আর জীবিত মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নাজমুলের সেই আর্তনাদ ও কান্নার দৃশ্য আমার বুকটাকে চিড়ে ফেলছিল। কান্না করতে করতেই সে বারবার বাচ্চার কানের কাছে আজান দিচ্ছিল। ঠিক তখনই হাসপাতালের অন্য একপ্রান্তে আগুন আরও ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে। চারপাশের সেই তুমুল বিশৃঙ্খলার মাঝে নার্স এবং চিকিৎসকরা তাড়াহুড়ো করে সবাইকে বাইরে বের করে নিয়ে যেতে লাগলেন।
​সেই হুলস্থূল অবস্থার মধ্যে আমি দেখতে পেলাম, নাজমুলের বড় ভাই নাজমুলকে জোর করে এবং হিঁচড়ে হাসপাতাল থেকে বাইরে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নাজমুল তার মৃত বা জীবিত সন্তানকে আঁকড়ে ধরে ভেতরে থেকে যাওয়ার বা অন্য একটা শিশুর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে জোরপূর্বক বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা বাইরে বের করার পরই আমি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে শিশু ওয়ার্ডের ভিতর ঢুকে গেলাম। ​ভিতরে ঢুকেই দেখি একটা শিশু একা পড়ে আছে। ঠিক তখনই এক নার্স বা হাসপাতালের কর্মী তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার সময় আমাকে বলে উঠল, "বোন, দ্রুত বের হন আগুন ছড়াচ্ছে, এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না!কিন্তু আমি বের হইনি, নার্স চলে যাওয়ার পরে আমি শিশুটিকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে নড়িয়ে চড়িয়ে দেখতে লাগলাম, নড়াচড়া খেয়ে হুট করে আমার করে কান্না করে দিল, তার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ থমকে গেল, হ্যাঁ ঠিক এই ছোট চেহারা আর নাজমুলের কোলে শিশুর চেহারা একদম মিলে গিয়েছে, সেই মুহূর্তে আমি দেরি না করে তাকে নিয়ে দৌড় বের হয়ে গেলাম শিশুদের ওয়ার্ড থেকে, বাইরে যখন সবাই জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন আমি কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে সেই শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে নিরাপদে বেরিয়ে এলাম। বাড়ি ফিরে এসে জানতে পারলাম, ওই আগুন লাগার ঘটনায় সেদিন হুলুস্থুল কাণ্ড হয়েছিল। কিন্তু কেউ আর খোঁজ পায়নি যে সেই নবজাতক শিশুটি কোথায় গেল।হসপিটালে চারদিক আগুন আর আগুন, হসপিটাল থেকে বের হতেই দেখি শিকদার বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে আছে, নাজমুল রোজীনাকে কোলে তুলে সাবধানে গাড়ির ভিতর তুলে দিচ্ছে, শারমিন ভাবির কোলে আরেকটা কন্যা সন্তান ছিল, আরেকটা কে নিয়ে আমি ওই রাতেআমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। আগুনের লেলিহান শিখা ও বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে আমি ওই শিশুটিকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলাম। দিনটা ছিলো (২৩/০৩/২০০৪)
শিশুটিকে ঢাকার একটা হসপিটালে ভর্তি করি, কারণ শিশুটা খুবই দুর্বল ছিল,তাকে রাত দিন জেগে জেগে যত্ন করে,রেখেছি সেই শিশুটিকে আমার বুকে দুদিন পর বাচ্চাটা সুস্থ হয়। তাকে নিয়ে আমি ওই দিনই চট্টগ্রামে এসে থাকতে শুরু করি, আপনার পরিচয় হয়ে ওঠে রেহেনা খানের একমাত্র মেয়ে নোভা।​গভীর একাকিত্বে ডুবে থাকা আমার জীবনে এই শিশুটি যেন হঠাৎ করেই আমার বেঁচে থাকার কারণ হয়ে গেল । আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই শিশুটি আর কেউ নয়—এটি আমার বহুদিনের না পাওয়ার বেদনা ভুলিয়ে দেওয়া এক পবিত্র উপহার, ​সেই থেকে গত আঠারো বছর ধরে আমি কাউকে কিছু বুঝতে দিইনি। সমাজের চোখে আমি একা হলেও, এই সন্তানকে নিজের সমস্ত মাতৃমমতা, বুকভরা ভালোবাসা আর পরম যত্নে লালন-পালন করে বড় করেছি। লোকালয়ের ভয়ে, সমাজের ভয়ে সব সত্য লুকিয়ে তাকে নিজের ছায়ায় আগলে রেখেছি,আর কাউকে লাইফে জড়াইনি এই ভেবে আপনি কি আমার মেয়েটাকে মেনে নেবে কিনা, আমার ইচ্ছে হয়নি ভাইয়া এবং আপুরা জোর করেছিল,কিন্তু আমি না করে দিয়েছিলাম, এই সন্তানকে নিজের সমস্ত মাতৃমমতা, বুকভরা ভালোবাসা আর পরম যত্নে লালন-পালন করে বড় করেছি। লোকালয়ের ভয়ে, সমাজের ভয়ে সব সত্য লুকিয়ে তাকে নিজের ছায়ায় আগলে রেখেছি।
(বর্তমান)....
রেহানা তোর কথাগুলো শেষ করে ধীরে ধীরে আরিয়ার সামনে যে হাত চেপে ধরে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো 
—"আমাকে ক্ষমা করে দে মা, আমি তোর পরিবার থেকে তোর বোনকে আলাদা রেখেছি, নোভাকে সবার থেকে লুকিয়ে রাখতে শুরু করলাম হারানোর ভয়ে,কারন ও ছাড়া কেউ ছিলো না আমার, আমাকে ক্ষমা করে দিস তোরা বলে কান্না করতে লাগলেন তিনি আরিয়ার হাত চেপে। 
রেহেনা খানের এই কথায় পুরো ড্রয়িংরুম স্তব্ধ হয়ে গেল! নোভা কান্না থামিয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল।তার সাথে সাথে মাহিরু ফকির দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো। 
নোভা যেন মায়ের মুখে এমন কথা শুনে শকে পাথর হয়ে গেল। সে নিজের বোরখা কিছুক্ষণ পূর্বেই খুলে ফেলেছিল পরনে তার কালো কালারের থ্রি পিস ।
সোজা ফুটে উঠল আরিয়ার হুবহু এক অবয়ব! একই গালের টোল, থুতনির নিচে কালো তিল একই চোখের গঠন!আরিয়া আর নোভা—দুই যমজ বোন একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
নোভা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক মায়ের একতরফা ভালোবাসা আর তাকে আগলে রাখার এই আকুলতা শুনে নোভার বুক ফেটে কান্না এলো। রেহেনা খান যে তাকে নিজের পেটের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, সেই সত্যিটা নোভার মন ছুঁয়ে গেল। নোভা দৌড়ে গিয়ে রেহেনা খানকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগল।
অদ্রিতাদের চোখের কোণ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ল। রেহেনা আন্টির ওপর তাদের মনে এতদিন যে ক্ষোভ ছিল, এক মায়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর নোভাকে হারানোর আকুল আকুতি শুনে ওদের সব অভিমান গলে জল হয়ে গেল। আরিয়াও এগিয়ে গিয়ে রেহেনা খানকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। 
অন্যদিকে আরিয়ান মনোযোগ দিয়ে দুই বোনের দিকে তাকিয়ে রইল, কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকলো 
—"ছু-ট-কি, ওকে নিয়ে আমার কাছে আয়। 
আরিয়া ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নোভা কে বলল।
—"কিরে চল।নোভা ধীর পায়ে ভাইয়ের দিকে এগোতে লাগলো, আরিয়ান এর কাছে পৌঁছাতেই আরিয়ান পরম মমতা দুই বোনকে বুকে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলো 
"—আজ থেকে আমরা চারজন হয়ে গেলাম। 
নোভা বোকার মতো পিটপিট করে তাকিয়ে বলল
—" চারজন?
—"আমার আরেকটা ছোট ননদী আছে।পাঁচ থেকে হুট করে অদ্রিতা বলে উঠলো।সবাই যখন ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তখন সে মনে মনে নিজেকে গালি দিতে লাগলো ঠিকই বলে ফেললে সবার সামনে ইস।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলো, 
—"না মানে আরেকটা বোন আছে তোমাদের পাঁচ বছর আমাদের সবার প্রিয় লবঙ্গ মানে লাবণ্য। 
সাহিলরা সবাই বাঁকা হয়ে তাকিয়ে ওহ হো করে হেসে উঠলো। দুই যমজ বোনের এই মেলবন্ধন আর এক মায়ের চোখের জল দেখে ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা এক আবেগঘন মায়ায় ভরে উঠল।
অন্যদিকে মাহির অপলক ভাবে নোভার দিকে তাকিয়ে রইল হঠাৎ নোভা মাহিরের দিকে তাকাল। ওদের চোখাচোখি হলো। মাহির এক সেকেন্ডের জন্য ভাবল, হয়তো এখনই ছুটে গিয়ে নোভাকে সব সত্যিটা বলে দেয়। বলে দেয় যে সে ওকে কতটা ভালোবাসে, যে ওকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। এখন আর কিছু বলার সময় নেই।
​মাহির অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
— "আমি চেয়েছিলাম আমার পুরো পৃথিবীর সুখ তোমার পায়ের কাছে এনে দিতে, আরাবি। কিন্তু আজ আমি কেবল দূর থেকে তোমাকে অন্য কারও হয়ে যেতে দেখছি। আমার অব্যক্ত ভালোবাসাগুলো কি এভাবেই বুকের ভেতরে ডুকরে মরবে? তুমি কি কখনও জানতে পারবে না, এই ছেলেটা তোমাকে কতটা ভালোবাসত? খুব ভালো থেকো নোভা, হয়তো অন্য কোনো জীবনে আমাদের আবার দেখা হবে, যেখানে আমি তোমাকে আমার ভালোবাসার কথা বলতে দেরি করব না আমার প্রিয় চাসমিস।"
(চলবে...)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন