#শেষ_বিকালের_মুগ্ধতা{পর্ব - ৩১}
লেখনীতে:-#ইসরাত_জাহান_আফিয়া
(🚫এই গল্পের কোনো অংশ কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)
সৈকতের মিষ্টি বাতাসে কক্সবাজারের রাতটা যেন এক অন্যরকম মায়াবী রূপ নিয়েছে। হোটেলের রুমের মৃদু আলোয় চারপাশটা শান্ত। বাইরে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন হালকা শোনা যাচ্ছে।
আরিয়া বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে অদ্রিতাকে ও ঝিংকু গ্রুপের সবাই উদ্দেশ্যে টাইপ করলো বলল,
—"অদ্রি যা ভাবছিলাম প্ল্যান একদম সেভাবেই এগোচ্ছে। কাল সকালে আমরা ঘুম থেকে উঠে সোজা চট্টগ্রামের বাসে বা ট্রেনে চড়ে বসব। ভাইয়াকে তো কক্সবাজারের হোটেলেই রেখে যাওয়া যাবে, কোনো সমস্যা হবে না।"
অদ্রিতা একটা বালিশ ঠিক করতে করতে চিন্তিত গলায় বলল এবং চিন্তা গ্রুপেও টাইপ করে দিল ,
—"উনাকে ফাঁকি দিয়ে চট্টগ্রাম যাওয়া কি অত সহজ হবে রে? ও যদি কোনোভাবে টের পেয়ে যায়, তাহলে পুরো প্লান তো মাটিই হবে, সাথে আমাদের অবস্থাও খারাপ করে ছাড়বে,আর উনি তো বলেছেন আমাদের সবাইকে একসাথে চট্টগ্রাম নিয়ে যাবে ।"
সাহিল অন্য রুম থেকে থেকে কফি কাপে চুমুক দিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে ঝিঙ্কু গ্রুপে টাইপ করে লিখল ,
—"আরে ভাবিসাব! ভাইয়া তো এখন আমাদের নিয়ে যাবে ঠিক আছে তখন আমরা যাব কিন্তু ভাইয়ের সাথে থাকলে আমরা ওই কাজটা ঠিক মতো করতে পারবো না এর জন্য আমরা একদিন আগে যাব তারপর ওইখানে যেসব ঠিকঠাকে করে ফিরে আসবো আবার না হয় ভাইয়ের সাথে যাব । আর কাল সকালে ও বিজনেস মিটিংস আর এখানকার লোকাল প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। ওই ফাঁকেই আমরা কেটে পড়ব। ঈশান ব্রো আর আমি সব ব্যাকআপ রেডি করে রেখেছি।"
ঈশান ল্যাপটপে টিকিটের পেজটা রিফ্রেশ করতে করতে হাতের ফোনে মেসেজগুলো দেখে টাইপ করল ,
—"এক্স্যাক্টলি। চট্টগ্রাম পৌঁছানোর পর সিটাকুণ্ডের খান বাড়িতে পৌঁছাতে বড়জোড় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগবে। রেহেনা আন্টির সাথে দেখা করে আমরা আবার রাতের মধ্যে কক্সবাজারে ব্যাক করতে পারব। টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তোরা জাস্ট নিশ্চিন্ত থাক।"
নসরাত একটা ফ্রুট জুসের ক্যান নাড়াতে নাড়াতে টাইপ করল ,
—"ঠিক আছে, তাহলে কাল সকাল ঠিক সাতটায় সবাই রেডি হয়ে যাবি। কেউ যেন ওভারস্লিপ না করে!"
সবাই যার যার মতো প্ল্যান ফাইনাল করে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। আরিয়া শুতে যাওয়ার আগে জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকাল। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের ঢেউগুলো চিকচিক করছে। হঠাৎ তার চোখের সামনে এয়ারপোর্টে ঘটে যাওয়া সেই রহস্যময় ঘটনাটার কথা ভেসে উঠল—সেই তীক্ষ্ণ ধূসর চোখের মানুষটা, আর তার সেই অদ্ভুত কথা... “লুকস লাইক ফেইট ওয়ান্টেড আস টু মিট দিস ওয়ে সানসাইন”।
শরীরটা একটা অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল আরিয়ার। সে দ্রুত মাথা ঝেড়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিল, "আরে ধুর! বেড়া মনে হয় পাগল এই কারণে তো ওরকম পোশাক পড়েছিল। জানালার পর্দা টেনে দিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরের দিন (চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ড — খান বাড়ি)
সকালের সোনাঝরা রোদে সীতাকুণ্ডের পাহাড়গুলো যেন আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। পাখিদের কলকাকলি আর পেছনের পাহাড়ি ঝরনার কুলকুল শব্দে চারপাশটা মুখরিত।
রেহেনা খান বারান্দার কাঠের চেয়ারে বসে সকালের চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। ঠিক তখনই হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নোভা একটা কালো রঙের বোরখা আরাবিয়ান নেকাব মুখ ঢেকে পরে মায়ের পাশে এসে দাড়ালো। তার চোখে সেই চেনা কালো ফ্রেমের চশমা, চুলে একটা ছোট্ট ক্লিপ আটকানো।
রেহেনা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আদরভরা গলায় বললেন,
—"মাম্মাম, এটা কি আমার ছোট্ট আরাবি? মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর লাগছে, বোরখা কি মাহির এনে দিয়েছে?।
নোভা টেবিল থেকে একটা কুকি তুলে নিয়ে মুখে দিয়ে বলল,
—"জি আম্মু, আজ শুধু প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আর একটা ছোট টেস্ট আছে। কলেজ শেষ করেই আমি আর সুমাইয়া সোজা লাইব্রেরিতে বসব। আজ একটু নোটস কমপ্লিট করতে হবে।"
ঠিক তখনই মাহির হাতে কফির কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে হাজির হলো। সে নোভার দিকে তাকাতেই সে অবাক হয়ে গেল কালো বোরখায় আবদ্ধ নয় রমণীকে অনেক সুন্দর লাগছে, নিজেকে গম্ভীর করে বলল,
—"এই চাশমিস,তোকে তো ভালোই লাগছে, এভাবেই থাকিস, আর নিচে দেখ তোর বান্ধবী সময়ে দাঁড়িয়ে চিল্লাচ্ছে তাড়াতাড়ি যা না হলে সারা বাড়িতেও আকাশ উড়িয়ে দিবে মেয়েটা।
নোভা মাহিরের দিকে একটু রাগ দেখিয়ে চোখ গোল গোল করে বলল,
—"আমার বেস্টটিকে নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেন বলুন তো মাহিন্দ্র নাথদত্ত ? আপনি আপনার অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকুন না!"
মাহির একটু দুষ্টু হাসি দিয়ে নোভার নাকের ডগায় হালকা একটা টোকা দিয়ে বলল,
—" তোর বান্ধবীকে নিয়ে তো অনেক প্রবলেম কারণ ও সবসময় বান্দরের মত লাফায়।বাই দ্যা ওয়ে নিক নামটা অনেক সুন্দর ছিল।
রেহেনা খান এই মিষ্টি ঝগড়া দেখে মুচকি হেসে বললেন,
—"তোরা দুজনে সারাদিন ঝগড়া না করলে কি খাবার হজম হয় না তোদের? মাহির,তুই সব সময় আমার মেয়েটাকে জালাস কেন। তোর ওই শিকদার গ্রুপের ফ্রেন্ড আরিয়ান কি আজ আসার কথা বলেছিল?"
মাহির কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
—"হ্যাঁ ফুপি, আরিয়ানের সাথে সকালে ফোনে কথা হয়েছে। ওরা কাল বা পরশুর মধ্যে কক্সবাজার থেকে সরাসরি আমাদের এখানে সীতাকুণ্ডে আসছে। আমি বলে দিয়েছি আমাদের বাড়িতেই যেন ওঠে। ওরা আসলে বেশ ভালোই জমবে।"
নোভা কৌতূহলী হয়ে বলল,
—"আসলে কি ওরা ফ্যামিলিসহ আসছে, নাকি শুধু ভাইয়ের বন্ধুরা?"
মাহির মুচকি হেসে বলল,
—"আরিয়ান একা আসছে না, ওর সাথে ওর ছোট বোন আরিয়া আর ওদের কিছু ক্লোজ ফ্রেন্ডসও আছে। তুই তো কারো সাথে মেশিসই কম, ওদের দেখলে বুঝতে পারবি জেনারেশন এখন কতটা ফাস্ট!"
নোভা আর কিছু না বলে নিচের দিকে এগিয়ে গেল গিয়ে দেখল সুমাইয়া সোফায় বসে বসে ফোন টিপছে । নোভার মনের ভেতর একটা অজানা কৌতূহল কাজ করতে শুরু করল—কে এই আরিয়া? নোভাকে কে দেখার সাথে সাথেই সুমাইয়া ফোনটা ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল
—"এই মেয়ে চোখ ঢাক না হলে, আমি মরে যাব কি সুন্দর লাগছে তোকে মাশাল্লাহ আমি ছেলে হলে এখনই তোকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলতাম।
নোভা ওর নাটক দেখে হেসে উঠলো হাসতে হাসতে হাসতে বলল
—"থাক থাক তোর আর মরতে হবে না এখন চল না হলে কলেজে লেট হয়ে যাবে।ওদের কথোপকথন সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে রেহেনা শুনে মুচকি হেসে বললেন
—"এই সুমাইয়া মামনি তোমরা দুজন সাবধানে যাবে আর সাবধানে বাসায় ফিরে আসবে,।
সুমাইয়া দৌড়ে যেয়ে রেহেনাকে জড়িয়ে ধরে বলল
—"ওকে আন্টি এখন একটা মিষ্টি করে হামি দিয়ে দাও। রেহেনা নোভাকে কাছে ডেকে দুইজনের কপালে আদর করে চুমু দিলেন। তারপর তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে কলেজে যেতে বললেন। যেমন একটা ছোট বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানো হয় ঠিক ওদের এরকম ট্রিট করলেন। দুই বান্ধবী মিলে খুশিতে খুশিতে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
অন্যদিকে.... (কক্সবাজার হোটেল)
এদিকে কক্সবাজারে তখন চরম উত্তেজনার মুহূর্ত। আরিয়ান হোটেলের লাউঞ্জে বসে অফিসের কিছু জরুরি ফাইল চেক করছে। আর সুযোগ বুঝে আরিয়া, রুদ্র, সাহিল আর ঈশান অত্যন্ত সন্তর্পণে হোটেলের লবি পেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ক্যাচ করে চট্টগ্রাম হাইওয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে।
ট্যাকসির পেছনের সিটে বসে আরিয়া গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—"উফ! ফাইনাল মিশন স্টার্ট! ভাইয়া টের পাওয়ার আগেই আমাদের দ্রুত সীতাকুণ্ড পৌঁছে আবার ব্যাক করতে হবে আর ঈশান তোকে যেটা বলেছি তুই ফাস্টে মোবাইল কলেজের সামনে যে ওকে কিডন্যাপ করবি যদি কোন ভুল করিস তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না ।"
ঈশান আরিয়ার দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল
—"যথা আজ্ঞা বইন দেখিস আমি ঠিকভাবেই কিডন্যাপ করে তোর হাতে তুলে দেব।
রুদ্র ল্যাপটপ থেকে ম্যাপ চেক করে বলল,
—"রাস্তা ফাঁকা আছে, ড্রাইভার আঙ্কেল একটু জোরে চালান প্লিজ। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।"
সাহিল ড্রাইভারের ঠিক পাশের সিটে বসে উৎসাহের চোটে গান গেয়ে উঠতে লাগল,
—"চল যাই রে... পাহাড়ে চল যাই রে..."
আরিয়া সাহিলের জামার কলার ধরে পেছনে টেনে এনে বলল,
—"চুপ কর ফাজিল! ড্রাইভার আঙ্কেলের মাথা নষ্ট করিস না। এমনিতেই টেনশনে আছি, তোর গান শুনলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।"
সবাই মিলে হাসতে হাসতে গাড়িটা তখন চট্টগ্রাম অভিমুখে ছুটে চলেছে। প্রকৃতির রূপ বদলাতে শুরু করেছে—উঁচু পাহাড়, সবুজ বনের সারি আর দূরের নীল আকাশ মিলে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
(অন্যদিকে শিকদার বাড়ি).....
বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসার আগেই রোজিনা সিকদার পরম যত্নে লাবণ্যকে সাজিয়ে তুললেন। নাজমুল সিকদার কালরাতে আরিয়া ও লাবণ্যের জন্য লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে এনেছেন,রোজিনার জন্য এনেছেন তবে তারটা সবুজ রঙের, আজ সেটাই পরিয়ে দিয়েছেন ছোট মেয়েটিকে। গাঢ় লাল রঙের শাড়িতে ছোট্ট লাবণ্যকে দেখতে একদম রাজকুমারীর মতো লাগছে। কোমর সমান লম্বা চুলে খোপা করে চুলে লাল রিবন গুঁজে দিয়ে রোজিনা তার কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ পরিয়ে দিলেন।
শাড়ি পরে লাবণ্যর খুশিতে মন ভরে উঠল। সে শাড়ির কুঁচি ধরে ঘরে এদিক-সেদিক হেঁটে বেড়াচ্ছে আর আয়নায় নিজেকে দেখছে।
সাজ শেষ হতেই সে দৌড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে ছুটল। সেখানে একে একে সবাইকে তার লাল শাড়ি পরা রূপ দেখাতে লাগল।আজ শুক্রবার থাকার কারণে সবাই বাড়িতেই আছে, একবার আরমান,শিকদার,শারমিন,আরিশ,মেহেরুন,আহনাফ, ইনায়া,ঈশিতাকে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছে আর বলছে
—"বড় বাবা, দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে!"—লাবণ্য বড় বাবা ও মেজ বাবার সামনে গিয়ে একপাক ঘুরে শাড়িটা দেখাল।এরপর মামনির কাছে গেল, "মামনি, দেগো পাপা আমাল জন্য কেমন সুন্দর শারি এনে দিয়েতে"
আহনাফের সামনে যেয়ে শাড়ি ঘুরে ঘুরে শাড়ি দেখাতে লাগলো আহনাফ হেসে বলল
—"এই আমার ছোট্ট বনুকে অনেক সুন্দর লাগছে মাশাআল্লাহ।
মেজ বাবা ও মামনির কাছে গিয়েও বাহবা কুড়ালো সে। লিভিং রুমের সোফায় বসা ঈশিতা, ইনায়া তো লাবণ্যকে ঘিরে ধরে হুটোপুটি শুরু করে দিল। সবাই মিলে তার শাড়ির প্রশংসা করায় লাবণ্যর দুই গাল খুশিতে লাল হয়ে উঠল।
বাড়ির সবার ঘর ঘুরে সবাইকে নিজের লাল শাড়ি দেখানো শেষ করে লাবণ্য সাড়ে দুই হাতে উচিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো আহিরের রুমের দিকে। আহিরের রুমের দরজা একটু ফাঁকা করাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই লাবণ্য দেখল, আহির তার পিছু ফিরে গভীর মনোযোগ দিয়ে পিসিতে গেম খেলছে। হেডফোনটা এক কান থেকে নামানো, আর স্ক্রিনে গেমের মারকাট শব্দ শোনা যাচ্ছে।দরজা ঠেলে লাবণ্য সোজা আহিরের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েকবার হাত থেকে খোঁচা দিয়ে আহি আহি বলতে লাগলো। লাল টুকটুকে শাড়ি পরে, খোপায় ফুল গুঁজে ঠিক তার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাবণ্যর দিকে তাকাতেই আহিরের পিসির স্ক্রিন থেকে মনোযোগ উঠে গেল। সে গেমের মাউস আর কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে বসল।
আহির কিছু মুহূর্ত পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল ছোট্ট ভুতুর দিকে তার চোখে তখন ভালোবাসার এক অন্যরকম ঝিলিক। এক অদ্ভুত মায়ায় আপ্লুত হয়ে সে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার এই দুষ্টু ভুতুকে এত সুন্দর লাগবে এত সুন্দর একটা রূপ ধারণ করে ফেলেছে।
ছোট্ট লাবণ্য নিজের শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে আহিরের সামনে একপাক ঘুরে আবদারের সুরে বলল,
— "দেতো আহি আমি বউ তেজেছি তুমি আমাকে বিয়ে কলবে?"
লাবণ্যের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে আহির অবাক হয়ে তাকাল। আহির একটু রাগ মিশিয়ে ধমকের সুরে বলল—
— "এই তোতলু কি বললি বিয়ে মানে কি জানিস ভুতু একটা!"
কিন্তু নাছোড়বান্দা লাবণ্য সহজে ছাড়ার পাত্রী নয়। সে চোখ রাঙিয়ে হাত গুটিয়ে কোমরে হাত দিয়ে হুমকি দিয়ে বসল—
— "আমি সব জানি তুমি এখুনি আমাতে বিয়ে তলবা বলতো তবুল...."
আহির মুচকি হেসে তাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলল—
— "আগে কবুল বলা ঠিক কর তারপর করবো বিয়ে তোকে....."
ছোট্ট লাবণ্য রেগে গিয়ে রাগী লুকে আবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—
— "তুবুল তুবুল..."
আহির এবার হোঁচট খেয়ে হেসে দিয়ে বলল—
— "কবুল কবুল হবে তুবুল না!"
আহিরের কথা শুনে লাবণ্যের চোখ ছলছল করে উঠল। সে মন খারাপ করে ফুঁপিয়ে বলে উঠল—
— "বিয়ে হয়ে গিয়েতে হি হি আমি তোমাল বউ আহি আরিপু বলেছে তিনবার তবুল বললেই বিয়ে হয়ে যায়..."
আহির নরম গলায় তাকে বুঝিয়ে বলল—
— "না হয় না তুই ছোট ভুতু না এই কারণে তোকে ভুলভাল বুঝিয়েছি আরিয়া আপু।"
এবার আর কান্না আটকে রাখতে পারল না লাবণ্য। সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে আহিরের জামার কোণ ধরে বলল—
— "না আমি তোমাল বউ হয়ে গিয়েতি আরিপু ভুনভান বোঝায়নি আমি আহিলের বউ বলো আমি তোমাল বউ।"
ছোট্ট লাবণ্যের এই কান্না আর অবুঝ আবদার দেখে আহিরের মন গলে গেল। সে নরম হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে পরম যত্নে বুঝিয়ে বলল—
— "আচ্ছা তুই আগে বড় হ, বড় হলে তোকেই আমার বউ বানাবো। প্রমিস আজ থেকে তুই এই আহির শিকদারের আহ্লাদী ছোট ভুতু বউ, হয়েছে শান্তি?"
আহিলের মুখে এমন কথা শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো । সে লজ্জা মিশ্রিত এক মিষ্টি হাসি দিয়ে আহিরের আরও একটু কাছে এগিয়ে গেল টেবিলে উঠে আহিরের গলা জড়িয়ে ধরে বলল
—"হয়েতে আহি...আলাপু।
তাহির অবাক হলো ওর কথা শুনে পরক্ষনে ও নিজেও বলল
—"আলাপু টু মাই ভুতু। বলেই হেসে উঠলো।
তারপর লাবণ্যকে কলে সাথে করে ক্যামেরা নিয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো লাবণের কয়েকটা ছবি তুলে দিতে। কয়েকটা সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিলাম তারপর নিজের ফোনে লাবণ্য কে নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলল। এভাবেই কাটলো তাদের সুন্দর দুষ্টু মিষ্টি মুহূর্ত।
অন্যদিকে.....( চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড)
পরিকল্পনা অনুযায়ী সবটাই ঠিক করল টেক্সিতে বসে আরিয়ারা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নামে তারা প্রথমেই নোভা কে খুজবে। প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য রুদ্র আগেই ঈশানকে সুমাইয়ার একটা ছবি মোবাইল স্ক্রিনে দেখিয়ে ভালো করে চিনিয়ে দিয়েছিল।এই ছবিটা মূলত পেয়েছে মাহির খানের আইডি থেকে সুমাইয়া নামের একটা একাউন্টে যেখানে নোভার বার্থডের কিছু পিক পোস্ট করা যেখানে নোভার মুখ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু সুমাইয়ার মুখ দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, নোভা কোন কলেজ থেকে বের হবে—সব খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিয়েছিল রুদ্র।সেই তথ্য সংগ্রহ করেছে সুমাইয়ার ফেসবুক একাউন্ট থেকে ।
সেই পরিকল্পনা মতোই ঈশান নোভার কলেজের সামনে গিয়ে হাজির হয়। চুপচাপ একটা পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে নোভার বের হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। কলেজ ছুটির পর সুমাইয়া বের হতেই ঈশানের চিনতে একটুও ভুল হয়নি,তারপরে তোমার পাশে কালো বোরখা আবদ্ধ রমণীকে দেখে সে একটু কনফিউস হয়ে যায় তারপরে মনে মনে ভেবে নিল এটাই হয়তো নোভা। কারণ রুদ্রের দেওয়া বর্ণনায় সে সুমাইয়াকে আগেই চিনে রেখেছিল। এরপর থেকে ঈশান নোভার পিছু পিছু সন্তর্পণে হাঁটতে শুরু করে।কিন্তু সমস্যা বাঁধে অন্য জায়গায়। নোভার সাথে তার বান্ধবী সুমাইয়া থাকায় ওই মুহূর্তে তাকে একা পাওয়া সুযোগ হচ্ছিল না। তাই ঈশানকে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়। বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর অবশেষে সুমাইয়া নিজের বাড়ির রাস্তার দিকে আলাদা হয়ে যায়। ততক্ষণে চারপাশ পেরিয়ে অন্ধকার নেমে আসে সন্ধ্যার।আর বিকাল থেকে আকাশের অবস্থা ভালো না তার মতে বাড়ি তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর একটা শর্টকাট রাস্তা বেছে নিল নোভা। সেই ফাঁকা একটা রাস্তা ধরে একা একা বাড়ির উদ্দেশ্যে হেঁটে চলতে শুরু করে নোভা।
ঠিক সেই মোক্ষম সুযোগটি লুফে নেয় ঈশান। পিছন থেকে দৌড়ে এসে হঠাৎ নোভার মুখ চেপে ধরে সে।ঠিক ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ যেন ফেটে পড়ল।ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেল। ঈশান চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আশপাশে যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা নেই।হঠাৎ করে তার চোখে গেল সামনে একটা ঘরের দিকে, আর কালবিলম্ব না করে তাকে নিয়েই পাশের একটা কুঠুরির ভেতরে নিয়ে যায়। নোভা নিজেকে ছাড়ানোর বহু চেষ্টা করছে মুখ থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে তার মুখ ইশানের হাতে আটকানো,এই কারনে আচমকা এই হামলায় নোভা প্রথমে কি করবে বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু পরমুহূর্তেই টের পেল চরম এক বিপদ তাকে ঘিরে ধরেছে। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য সে প্রাণপণে হাত-পা ছুড়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলল। কিন্তু ঈশানের শক্ত হাতের গ্রিপের কারণে তার মুখ থেকে কোনো জোরালো শব্দ বা চিৎকার বের হতে পারছিল না; মুখ দিয়ে শুধু গোঙানির মতো অস্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে আসছিল।
শ্বাসরুদ্ধকর সেই পরিস্থিতিতে বাঁচার আর কোনো রাস্তা না পেয়ে নোভা তার শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করল। বন্দি থাকা অবস্থায় সে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঈশানের হাত কামড়ে বসল! ব্যথায় ঈশানের হাত কেঁপে উঠলেও সে গ্রিপ ঢিলা করল না, আরো জোরে মুখটা চেপে ধরল, নোভা নিজেকে ছাড়ানোর বহু চেষ্টা করছে মুখ থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে তার মুখ ইশানের হাতে আটকানো এই কারণে শব্দ ছাড়া কথা বের হচ্ছে না, ওর গুমড়ানোর শব্দ শুনে বৃষ্টিতে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলেন, গ্রামের কতিপয় তার পিছু কিছু মুরুব্বি মহিলা ও পুরুষ সেই শব্দ শুনে, সেই মুহূর্তে ঘরের সামনে হাজির হন এলাকার কতিপয় মুরুব্বি ও কিছু লোক। তারা ভেতরে এই দৃশ্য দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং ঈশানকে উদ্দেশ করে অত্যন্ত বাজে ও কটু ভাষায় বকাবকি শুরু করে দেন। মুরুব্বিরা রাগে ফেটে পড়ে বলতে থাকেন— "বয়সে এত ছোট, অথচ এখনই এসব নষ্টামি শুরু করেছিস!
ঈশান তাদের দেখে হকচকিয়ে গিয়ে নোভার মুখ ছেড়ে দেয় দিয়ে বলল — "আরে মুরুব্বি মুরিব্বি হুহ্ হুহ্ আপনারা ভুল বুঝছেন! আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে বা এমন কিছু করতে আসেনি, আমি জাস্ট একটু... মানে পরিস্থিতি অন্যরকম!"
ওদিকে ভয়ে ও আতঙ্কে নোভা তখন অঝোরে কেঁদে চলেছে। সে কাঁদতে কাঁদতে কাঁদতে মুরুব্বিদের হাত জড়িয়ে ধরে বলে— "বিশ্বাস করুন , আমি এই লোকটাকে চিনিই না! উনি জোর করে আমাকে টেনেহিঁচড়ে এখানে এনেছে, আমার সাথে উনার কোনো সম্পর্ক নেই!"
কিন্তু মুরুব্বিরা কারোর কথাই কানে তুলতে নারাজ। তারা নোভার কান্না বা ঈশানের সাফাইয়ের বিন্দুুমাত্র তোয়াক্কা না করে উল্টো ধমক দিয়ে বলেন—চুপ! একদম চুপ! মুখে যতোই সাফাই গাস কেন, তোদের চালচলন আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি! দিনের আলোয় এই লুকোচুরি কিসের হালায়? তোরা যখন কোনো খারাপ সম্পর্কের মাজেজা না-ই রাখিস, তাইলে আর কিসের ডর? এখনি তোদের মাইনষের সামনে পাক্কা বিয়া দেওয়ামু, তহন বুঝবি মজা!”হুট করে বিয়ের কথা শুনে দুজনেই হকচকিয়ে যায়, ঈশানের আগে নিজের চুল খামচে ধরল প্ল্যান মতো সবকিছু তো দূর, উল্টো এমন এক বিপদে পড়েছে যে তার মাথা কাজ করছে না। কপালে হাত দিয়ে নিজের ভাগ্যকে দুষে সে আওড়ালো—
"আরে ভাইসাব, এটা কী হলো! কিডন্যাপ করতে আসলাম, আর হয়ে গেল একেবারে লাইফটাইম পার্মানেন্ট প্যারা! আমার পনেরোটা গার্লফ্রেন্ডের কি হবে? এই বিচ্ছুরেরে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে দিল! আম্মউউ গো আমি শেষ!"
নোভা অবাক হয়ে ইশানের দিকে তাকালো।
ওদিকে মুরুব্বিদের চোখ তো কপালে ওঠার জোগাড়! থমকে দাঁড়িয়ে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর ভিড়ের মধ্য থেকে এক বয়োবৃদ্ধা মহিলা চাদর ঠিক করতে করতে অবাক ও ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠলেন—
“এই তোরা কী ফষ্টি-নষ্টি করন লাগি এই ঘরে ঢুকছস? ছিঃ ছিঃ! এক্কেরে নির্লজ্জের দল! আর দেইখ্যা লাভ নাই, ওগোরে অহনই বিয়া পড়াইয়া দেন। এই যুগের পোলাপানগুলা কি মাথা পুরা আউলাইয়া গ্যাছে নাকি একেবারে?”
নোভা আর ঈশানের শত চেষ্টার পরও মুরুব্বিরা এক বিন্দুও বুঝলেন না। উল্টো তড়িঘড়ি করে দুজনকে ধরে এনে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে জোরপূর্বক বিয়ের পড়ানোর উদ্দেশ্যে কাজী কে ডেকে এনে তার সামনে বসিয়ে দিলেন।
কাজীর গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল ঘরের কোণ থেকে— "আরাবি শিকদার নোভা... আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?"
নোভা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দুটি তখন শূন্য, দৃষ্টি জমাট বাঁধা। সে যখন কাঁপতে কাঁপতে প্রথমবার "কবুল" বলল, ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখের সামনে হলের উজ্জ্বল আলো মুছে গিয়ে ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠল মাহিরের মুখখানি। কিশোরী বয়সে যার প্রেমে পড়ে তার মন প্রথম চঞ্চল হয়েছিল, যে মানুষটি তার সহজ-সরল মনে ঝড় তুলেছিল প্রণয়ের প্রথম জোয়ারে— সেই মাহির যেন আজ মলিন মায়াভরা চোখে তাকিয়ে দেখছে তাকে।
কাজীর দ্বিতীয় প্রশ্ন— "ইশান শিকদার... আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?"
ঈশান শক্ত করে চোখ বন্ধ করে গম্ভীর মুখে দ্বিতীয়বার "কবুল" উচ্চারণ করল।
এভাবেই তিন কবুলের শক্ত বাঁধনে চিরদিনের মতো তারা দুজনে আবদ্ধ হয়ে গেল। নোভার হৃদয়টা পড়ে রইল বহু দূরে, চোখের সামনে ভেসে ওঠা তার প্রথম ভালোবাসা মাহিরের সেই চেনা মুখের ছায়ায়, আর এক অদৃশ্য নিষ্ঠুর বাস্তবতায় দুজনে মিলে হারিয়ে গেল এক নতুন কিন্তু অপরিচিত ঠিকানায়।
চলবে......
#বি:দ্র:-(কি আর বলব সবাই পড়ে চলে যায় রিয়েক্ট করেন না সবাই এই পর্বে বেশি বেশি গঠনমূলক কমেন্ট ও শেয়ার করে দিবেন,)