#সুপারিশ
#Miju.Sheikh
#পর্ব সংখ্যা ১
“আমি কিন্তু বলে দিলাম, তোমার এই ছেলেকে আমি আর একদিনও সহ্য করব না!”
রান্নাঘর থেকে কথাটা ভেসে আসতেই বসার ঘরে বসে থাকা রাইসা মুখ টিপে হাসল।
তার কোলে তখন দেড় বছরের ছোট্ট রাইয়ান। ছেলেটা মায়ের ওড়না ধরে টানাটানি করছে আর মাঝেমধ্যে নিজের মতো করে কিছু একটা বলছে।
“আব্বু... আব্বু...”
সামনের সোফায় বসে থাকা আদনান পত্রিকার আড়াল থেকে মুখ বের করল।
“আমার ছেলে আবার কী করল?”
রাইসার শাশুড়ি নাজমা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন।
“কী করল? তুমি তোমার ছেলেরে জিগ্গেস করো সে কী করেছে!”
আদনান ভুরু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকাল।
রাইয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসল।
আদনানও হেসে ফেলল।
“দেখছো আম্মু? আমার ছেলে তো নিরীহ।”
“নিরীহ?”
নাজমা বেগম এমনভাবে তাকালেন, যেন এই একটা শব্দেই তার দশ বছরের সংসারের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ পেয়ে গেছে।
“তোমার নিরীহ ছেলে আজ সকালে আমার মোবাইলটা পানির বালতিতে ফেলে দিয়েছে।”
আদনানের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কী?”
রাইসা এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারল না।
“হ্যাঁ। শুধু মোবাইল না। তোমার আব্বুর চশমাটাও নিয়ে গেছিল।”
ঘরের ভেতর থেকে হাশেম সাহেবের গলা শোনা গেল,
“চশমা আমি পরে পেয়েছি। কিন্তু চশমার একটা কাচ নাই।”
আদনান মাথায় হাত দিল।
“ইয়া আল্লাহ!”
রাইসা হেসে বলল,
“তোমার ছেলে অনেক প্রতিভাবান। ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে।”
“হ্যাঁ, হবে। আগে আমার সংসারটা ধ্বংস করবে, তারপর বড় কিছু হবে।”
রাইয়ান কিছুই না বুঝে হেসে উঠল।
নাজমা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এই ছেলেকে তুমি শাসন করো। সারাদিন শুধু মায়ের সাথে লাগালাগি করে।”
রাইসা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বলল,
“আমার ছেলে আমাকে ভালোবাসে।”
“ভালোবাসে না। তোমারে দিয়ে সব দোষ থেকে বাঁচে।”
আদনান এবার হেসে বলল,
“আম্মু, আপনি বউ আর নাতির সাথে প্রতিযোগিতা করে জিততে পারবেন না।”
“তুই চুপ কর।”
“জি।”
“আর শোন, আজ দুপুরে তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক আসবে।”
আদনান এবার পত্রিকা নামিয়ে তাকাল।
“কেন?”
“কেন আবার? তোর শ্যালকের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে।”
রাইসা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভার করে ফেলল।
“আবার শুরু করবে?”
নাজমা বেগম বললেন,
“আমি কী শুরু করলাম?”
“ওই যে, বিয়ের কথা।”
আদনান রাইসার দিকে তাকাল।
“কার বিয়ে?”
“আমার ছোট ভাই রাফিদের।”
“ওর আবার কী হয়েছে?”
রাইসা বিরক্ত গলায় বলল,
“কিছু হয়নি। ওর বয়স হয়েছে। কিন্তু ও বিয়ে করতে চায় না।”
আদনান ভ্রু তুলে বলল,
“তাহলে?”
“তাহলে কী?”
“বিয়ে করতে চায় না, বিয়ে করবে না। সমস্যা কোথায়?”
রাইসা একটু থেমে বলল,
“সমস্যা হচ্ছে, আব্বু একটা মেয়েকে পছন্দ করেছেন।”
“আচ্ছা, মেয়েটা কেমন?”
“ভালো।”
“তাহলে রাফি রাজি না কেন?”
রাইসা উত্তর দেওয়ার আগেই নাজমা বেগম বললেন,
“কারন ছেলেটার মাথায় সমস্যা আছে।”
রাইসা হেসে ফেলল।
“আম্মু!”
“সত্যি কথা বলছি। চাকরি করে, টাকা কামায়, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু বিয়ের কথা উঠলেই এমন করে যেন ওকে জেলখানায় পাঠানো হবে।”
আদনান হেসে বলল,
“ওর ভয়টা অমূলক না।”
রাইসা এবার স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করল।
“আপনি কিন্তু বেশি কথা বলবেন না।”
“আমি তো কিছু বললাম না।”
“আপনি পুরুষ মানুষ। পুরুষদের উপর আমার বিশ্বাস নাই।”
আদনান ভান করে বুকের ওপর হাত রাখল।
“বিয়ের পাঁচ বছর পর এই কথা শুনতে হচ্ছে?”
“পাঁচ বছর ধরে আপনাকে দেখে অভিজ্ঞতা হয়েছে।”
“আমি কী করেছি?”
রাইসা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে একজনের গলা শোনা গেল।
“আপা!”
রাইসা উঠে দাঁড়াল।
“এই তো রাফি এসেছে।”
দরজা খুলতেই লম্বা, এলোমেলো চুলের একটা ছেলে ভেতরে ঢুকল।
হাতে হেলমেট।
মুখ দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব মানুষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
রাফি জুতা খুলতে খুলতে বলল,
“আপা, আমি কিন্তু আজকে তোমার কাছে শেষবারের মতো এসেছি।”
রাইসা অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
“আমাকে বাঁচাও।”
আদনান সোফায় বসে মুচকি হাসল।
“কী হয়েছে?”
রাফি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দুলাভাই, আপনি আমার একমাত্র আশা।”
আদনান গম্ভীর মুখ করে বলল,
“বলো।”
রাফি নাটকীয়ভাবে সোফায় বসে পড়ল।
“আমাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
রাইসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?”
“আপা, তুমি বুঝবে না।”
“কেন?”
“কারন তুমি নিজে ফেঁসে গেছো।”
আদনান মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপল।
রাইসা চোখ বড় করে বলল,
“কী বললি?”
“কিছু না।”
“না না, আবার বল।”
রাফি উঠে দৌড় দিতে চাইতেই রাইসা ওড়নার একপ্রান্ত দিয়ে তাকে আটকে দিল।
“আজকে তোকে ছাড়ব না।”
“আপা, আমি তোমার ছোট ভাই!”
“তাই তো মার কম দেব।”
ঘরের সবাই হেসে উঠল।
রাফিও হাসল।
কিন্তু সেই হাসির কয়েক মুহূর্ত পরেই রাফির ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে বাবার নাম।
রাফির মুখটা হঠাৎ বদলে গেল।
সে ফোনটা কেটে দিল।
আদনান সেটা লক্ষ্য করল।
“বাবার ফোন কেটে দিলি কেন?”
“এমনি।”
“এমনি?”
“হ্যাঁ।”
দুই সেকেন্ড পর আবার ফোন।
রাফি এবার ফোনটা সাইলেন্ট করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।
রাইসা তাকিয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
“কিছু হয়নি।”
“রাফি।”
“বললাম তো কিছু হয়নি।”
কথাটা বলেই সে উঠে দাঁড়াল।
“আমি যাই।”
রাইসা অবাক হয়ে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি?”
“হ্যাঁ।”
“দুপুরে আব্বু আসবে।”
“আমি থাকব না।”
“কোথায় যাবি?”
রাফি উত্তর দিল না।
শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আদনান এবার উঠে দাঁড়াল।
“রাফি।”
রাফি থামল।
“হুম?”
“তুই কোনো ঝামেলায় আছিস?”
রাফি কিছুক্ষন চুপ করে থাকল।
তারপর খুব স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“না দুলাভাই। ঝামেলা থাকলে তো আপনাকেই আগে বলতাম।”
আদনান তাকিয়ে রইল।
রাফি চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রাইসা ধীরে ধীরে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়াল।
“কিছু একটা হয়েছে।”
আদনান মাথা নাড়ল।
“আমিও তাই ভাবছি।”
“কিন্তু কী?”
“জানি না।”
রাইসা জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখন রোদ উঠেছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
রাস্তার পাশে মানুষ হাঁটছে, দোকান খুলছে, পাশের বাসার বাচ্চারা খেলছে।
কেউ জানে না, এই স্বাভাবিক দিনের ভেতরেই কোথাও একটা অস্বাভাবিক ঘটনা চুপচাপ নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।
---
দুপুরের একটু আগে রাইসার বাবা-মা এলেন।
রাইসার মা সালমা বেগম হাতে বেশ কয়েকটা ব্যাগ নিয়ে ঢুকলেন।
“এই যে মা, কোথায় আমার নাতি?”
রাইয়ান দৌড়ে গিয়ে নানুর পায়ে জড়িয়ে ধরল।
সালমা বেগম সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ নামিয়ে নাতিকে কোলে তুলে নিলেন।
“আমার জান!”
রাইসা হেসে বলল,
“আম্মু, আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করলে না আমি কেমন আছি?”
“তুই তো ভালোই আছিস। তোর চেহারা দেখেই বোঝা যায়।”
আদনান পাশ থেকে বলল,
“আম্মু, আপনি মেয়েকে নিয়ে খুব পক্ষপাত করেন।”
সালমা বেগম তাকিয়ে বললেন,
“তুই চুপ কর। তুই আমার মেয়েকে কাঁদালে কিন্তু আমি তোর মাকে নিয়ে আসব।”
নাজমা বেগম দূর থেকে বললেন,
“আমাকে কেন?”
“আপনাকে এনে বিচার বসাব।”
নাজমা বেগম হেসে বললেন,
“বিচার বসানোর আগে চা খাবেন?”
“চা খাব। তারপর বিচার।”
ঘরটা হাসিতে ভরে গেল।
দুই পরিবারের মধ্যে এমনই সম্পর্ক।
খুনসুটি আছে, কথা কাটাকাটি আছে, কিন্তু ভালোবাসাটাও কম নেই।
সন্ধ্যার দিকে রাফিও বাড়িতে ফিরল।
কিন্তু আজ আর তার মুখে সকালের সেই হাসি নেই।
বাবা হাশেম সাহেব তাকে ডেকে বসালেন।
“রাফি।”
“জি।”
“তুই আমার একটা কথা রাখবি?”
রাফি মাথা নিচু করল।
“কী কথা?”
হাশেম সাহেব কিছুক্ষন ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“আমি তোর জন্য একটা মেয়েকে পছন্দ করেছি।”
রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আব্বু, আবার শুরু করবেন না।”
“মেয়েটা ভালো।”
“সব মেয়েই ভালো।”
“তুই দেখেছিস?”
“দেখার দরকার কী?”
হাশেম সাহেব একটু বিরক্ত হলেন।
“তুই অন্তত একবার কথা বল।”
রাফি চুপ করে রইল।
হাশেম সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,
“এই বিয়েটা তোর জন্য শুধু বিয়ে না।”
রাফি এবার মাথা তুলল।
“মানে?”
বাবা উত্তর দিলেন না।
শুধু বললেন,
“সময় হলে সব জানতে পারবি।”
রাফির ভুরু কুঁচকে গেল।
“কী জানতে পারব?”
হাশেম সাহেব অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন,
“কিছু না।”
সেই মুহূর্তে পাশের ঘর থেকে একটা কাগজ মাটিতে পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
রাফি ঘুরে তাকাল।
টেবিলের নিচে একটা পুরোনো বাদামি খাম পড়ে আছে।
সে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর শুধু একটা নাম লেখা।
“মো. হাশেম উদ্দিন”
আর নিচে ছোট করে একটা কথা।
“সুপারিশপত্র।”
রাফির চোখ আটকে গেল শব্দটার ওপর।
“সুপারিশ?”
হাশেম সাহেবের মুখের রঙ বদলে গেল।
তিনি দ্রুত রাফির হাত থেকে খামটা নিয়ে নিলেন।
“এটা তুই কোথায় পেলি?”
“এখানেই ছিল।”
“তুই এটা খুলেছিস?”
“না।”
হাশেম সাহেব খামটা শক্ত করে হাতে চেপে ধরলেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
“এই খামটা নিয়ে আর কোনোদিন প্রশ্ন করবি না।”
রাফি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
এতদিনের চেনা বাবাকে আজ হঠাৎ কেমন অচেনা লাগছে।
আর সেই রাতে প্রথমবারের মতো রাফির মনে হলো...
তার বিয়ের পেছনে শুধু একটা মেয়ের ব্যাপার নেই।
এর পেছনে আরও কিছু আছে।
এমন কিছু...
যেটা তার বাবা বছরের পর বছর লুকিয়ে রেখেছেন।
আর সে জানত না,
এই একটা সুপারিশ একদিন তাদের দুই পরিবারকে এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা কারো পক্ষেই সহজ হবে না।
চলবে...