ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুপারিশ

২য় পর্ব

লেখক: Miju.Sheikh
#সুপারিশ
#Miju.Sheikh
#পর্ব সংখ্যা ২
রাত তখন প্রায় বারোটা।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ। শুধু ছাদের ওপর বৃষ্টির পানির টুপটাপ শব্দ আর মাঝেমধ্যে দূরে কোনো গাড়ি যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
রাফি নিজের ঘরে বসে আছে।
সামনে টেবিলের ওপর সেই বাদামি খামটা।
খামটা সে বাবার হাত থেকে নেওয়ার পর আর খুলতে পারেনি। আসলে খুলতে চায়নি।
কিন্তু মনের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।
সুপারিশপত্রে এমন কী আছে, যেটা নিয়ে বাবা এত ভয় পাচ্ছে?
রাফি চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেল।
বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আবার টেবিলের কাছে এসে খামটার দিকে তাকাল।
“ধুর!”
নিজের মনেই কথাটা বলে খামটা হাতে তুলে নিল।
“একবার দেখলেই তো কিছু হবে না।”
খামটা খুলতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
রাফি তাড়াতাড়ি খামটা টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দিল।
“কে?”
“আমি।”
মায়ের গলা।
রাফি দরজা খুলে দিল।
মা ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ঘুমাসনি?”
“না।”
“কী ভাবছিস?”
“কিছু না।”
মা মুচকি হেসে বললেন,
“তুই যখন ‘কিছু না’ বলিস, তখনই বুঝি অনেক কিছু।”
রাফি বিছানায় গিয়ে বসে পড়ল।
“মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“কর।”
“আব্বু কি কোনো কিছু আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছে?”
মায়ের মুখের হাসিটা হঠাৎ থেমে গেল।
“কেন?”
“এমনি মনে হলো।”
“তোর আব্বু তোকে কেন কিছু লুকাবে?”
রাফি চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আজ একটা খাম পেয়েছিলাম।”
মা এবার পুরোপুরি স্থির হয়ে গেলেন।
“কী খাম?”
“বাদামি রঙের। উপরে লেখা ছিল সুপারিশপত্র।”
মায়ের চোখে মুহূর্তের জন্য ভয় দেখা গেল।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
কিন্তু রাফির চোখ সেটা এড়িয়ে গেল না।
“মা?”
“হুম?”
“তুমি কিছু জানো?”
মা মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
“না।”
“মিথ্যা বলছো।”
“রাফি!”
“তোমার চোখে আমি দেখেছি।”
মা কিছু বললেন না।
রাফি ধীরে ধীরে উঠে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“কী আছে ওই চিঠিতে?”
মা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সবকিছু জানার বয়স তোর হয়েছে। কিন্তু সব সত্যি জানার সময় এখনো হয়নি।”
“এই কথাটাই সবাই কেন বলছে?”
“কারন কিছু সত্যি জানলে মানুষ বদলে যায়।”
রাফি হেসে ফেলল।
“আমি এত সহজে বদলাই না মা।”
মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই জানিস না।”
তারপর তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রাফি দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
মায়ের কথাটা মাথায় ঘুরতে লাগল।
কিছু সত্যি জানলে মানুষ বদলে যায়।
কিন্তু কী সেই সত্য?
---
পরদিন সকাল।
রাইসা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে নাস্তা বানাচ্ছিল।
রাইয়ান মেঝেতে বসে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে।
আদনান ঘুমঘুম চোখে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
“চা কোথায়?”
রাইসা না তাকিয়েই বলল,
“চা বানানো হয়নি।”
“কেন?”
“কারন আমি মানুষ।”
“মানে?”
“রোবট না যে সারাদিন কাজ করব।”
আদনান হাই তুলে বলল,
“তাহলে আমি বানিয়ে দিই।”
রাইসা এবার ঘুরে তাকাল।
“আপনি চা বানাবেন?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি?”
“হ্যাঁ।”
“শেষবার চা বানিয়ে কী করেছিলেন মনে আছে?”
আদনান একটু ভেবে বলল,
“না।”
“দুধের বদলে লবণ দিয়েছিলেন।”
আদনান মাথা চুলকাল।
“ওটা ভুল ছিল।”
“আর আপনি বলেছিলেন লবণ চায়ে নতুন ফ্লেভার।”
“তখন তো আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম।”
রাইসা হেসে ফেলল।
আদনানও হেসে বলল,
“আজকে তুমি বানিয়ে দাও।”
“এই তো।”
ঠিক তখনই রাইয়ান হামাগুড়ি দিয়ে এসে বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল।
আদনান তাকে কোলে তুলে নিল।
“আমার বাপের কী খবর?”
রাইয়ান বাবার গালে হাত দিয়ে একটা থাপ্পড় দিল।
রাইসা হেসে বলল,
“দেখলেন? আপনার খবর ভালো না।”
আদনান ছেলেকে বলল,
“তুইও মায়ের দলে?”
রাইয়ান হাসল।
“মা!”
রাইসা একটু থমকে গেল।
“কি বললি?”
রাইয়ান আবার বলল,
“মা।”
রাইসার চোখ চকচক করে উঠল।
“আদনান! শুনছো?”
“হ্যাঁ।”
“ও আমাকে মা বলেছে!”
“হ্যাঁ, আমিও শুনেছি।”
রাইসা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিল।
“আমার বাবু!”
আদনান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের দেখছিল।
এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই তো একটা সংসারকে সংসার বানায়।
বাইরের মানুষ হয়তো বুঝে না।
কিন্তু একটা শিশুর মুখে প্রথমবার “মা” শোনা, স্বামীর চোখে স্ত্রীর জন্য লুকিয়ে থাকা মায়া, শাশুড়ির বকুনি আর বিকেলে সবাই মিলে এক টেবিলে বসে খাওয়া...
এসবই তো জীবনের আসল সুখ।
তখনও কেউ জানত না, এই সুখের ভেতরেই একদিন এমন একটা ঝড় ঢুকবে, যেটা সামলাতে সবাইকে একসাথে দাঁড়াতে হবে।
---
দুপুরের দিকে রাফি আবার রাইসাদের বাসায় এল।
আজ তার হাতে কোনো হেলমেট নেই।
মুখও গম্ভীর।
রাইসা দরজা খুলেই বলল,
“কি হয়েছে?”
“আপা, তোমার সাথে কথা আছে।”
“বল।”
“একটু একা।”
রাইসা অবাক হয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল।
আদনানও তখন বসার ঘরে ছিল।
রাফি সরাসরি বলল,
“দুলাভাই, আপনিও থাকেন।”
আদনান মাথা নেড়ে বলল,
“বলো।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর পকেট থেকে একটা ছবি বের করল।
ছবিটা টেবিলের ওপর রাখল।
রাইসা ছবিটা হাতে তুলে নিল।
“এটা কে?”
“যাকে আব্বু আমার সাথে বিয়ে দিতে চায়।”
রাইসা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেয়েটা তো সুন্দর।”
“সুন্দর না।”
“তাহলে?”
“ভালো।”
আদনান হেসে বলল,
“তাহলে সমস্যা কী?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“সমস্যা হলো, আমি ওকে আগে থেকেই চিনি।”
রাইসা থমকে গেল।
“কীভাবে?”
“তিন বছর আগে একটা ঘটনা হয়েছিল।”
“কী ঘটনা?”
রাফি উত্তর দিল না।
আদনান এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“রাফি, যা হয়েছে সেটা বল।”
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
“তখন আমি ঢাকায় ছিলাম না। একটা কাজে বাইরে গিয়েছিলাম। সেখানেই ওর সাথে দেখা।”
“তারপর?”
“তারপর কিছু হয়নি।”
“কিছু হয়নি হলে ভয় পাচ্ছিস কেন?”
রাফি মাথা নিচু করল।
“কারন ওর জীবনটা খুব সহজ না।”
রাইসা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“মানে?”
“ওর একটা সন্তান আছে।”
ঘরে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো।
রাইসা ধীরে ধীরে বলল,
“কি?”
“হ্যাঁ।”
আদনানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
রাফি বলল,
“আব্বু জানে। তবুও বিয়েটা করতে চাইছে।”
রাইসা অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু কেন?”
রাফি মাথা তুলল।
“এই প্রশ্নের উত্তরই তো আমি খুঁজছি।”
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল।
রাফি জানালার দিকে তাকাল।
তার মুখের রঙ বদলে গেল।
“ওরা এসেছে।”
“কারা?”
“আমার আব্বু।”
রাইসা বলল,
“তাতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?”
রাফি খুব নিচু গলায় বলল,
“আব্বু একা আসেনি।”
আদনান উঠে দাঁড়াল।
“কার সাথে এসেছে?”
রাফি উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।
টিংটং।
রাইসা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে সে থমকে গেল।
একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক।
তার পাশে একজন মহিলা।
আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে সেই মেয়েটা।
ছবির মেয়েটা।
রাইসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা।
বাচ্চাটা ঘুমিয়ে আছে।
মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
রাফি দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
রাফির সাথে চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।
মেয়েটার চোখে ছিল ভয়।
আর রাফির চোখে...
অবিশ্বাস।
কারন তিন বছর আগে যে মেয়েটাকে সে শেষবার দেখেছিল, আজ সেই মেয়েটাই তার পরিবারের দরজায় দাঁড়িয়ে।
আর তার কোলে যে শিশুটি...
রাফি তাকে দেখে কেন যেন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ধাক্কা অনুভব করল।
মেয়েটা খুব আস্তে বলল,
“রাফি...”
রাফির ঠোঁট শুকিয়ে গেল।
“তুমি?”
মেয়েটা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু শিশুটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
পেছন থেকে হাশেম সাহেবের গলা শোনা গেল,
“হ্যাঁ। ও-ই।”
রাফি বাবার দিকে তাকাল।
“কিন্তু আপনি আমাকে বলেননি...”
হাশেম সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
“কারন কিছু কথা আগে থেকে বললে তুই কখনো এই দরজা খুলতি না।”
রাফি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আর ঠিক তখনই ঘুমন্ত শিশুটার মুখ থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ বের হলো।
“আ...ব্বু...”
রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে এক পা পিছিয়ে গেল।
“কি বলল ও?”
মেয়েটা চোখ নামিয়ে ফেলল।
হাশেম সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
আদনান আর রাইসা একে অপরের দিকে তাকাল।
কেউ কিছু বলল না।
কারন একটা ছোট্ট শব্দ...
একটা পুরোনো সম্পর্ক...
আর একটা সুপারিশ এখন ধীরে ধীরে তাদের সবার জীবনকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করাচ্ছিল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা তখনও উত্তরহীন।
শিশুটার বাবা কে?
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন