ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুপারিশ

৩য় পর্ব

লেখক: Miju.Sheikh

#সুপারিশ

#Miju.Sheikh
#পর্ব সংখ্যা ৩

“আ...ব্বু...”
শব্দটা খুব ছোট ছিল।
কিন্তু ঘরের মধ্যে থাকা প্রত্যেকটা মানুষের কাছে মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ করে একটা ভারী পাথর ছুঁড়ে মেরেছে।
রাফি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখ শুধু বাচ্চাটার দিকে।
বাচ্চাটা তখনো মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে। মুখটা একপাশে ফিরানো। ছোট্ট নাক, কপালে কয়েকটা চুল লেগে আছে। এত ছোট একটা বাচ্চা, অথচ তার একটা শব্দেই রাফির মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
রাইসা প্রথমে রাফির দিকে তাকাল, তারপর মেয়েটার দিকে।
মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে পানি জমে আছে।
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
“ও আমাকে আব্বু বলল কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
“আমি জিজ্ঞেস করছি, ও আমাকে আব্বু বলল কেন?”
তার গলার স্বর এবার একটু চড়া হয়ে গেল।
হাশেম সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন,
“এখানে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলা ঠিক হবে না। সবাই বস।”
রাফি হেসে ফেলল।
কেমন একটা অদ্ভুত হাসি।
“সবাই বসব?”
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমাকে তিন বছর ধরে একটা কথা বলেননি। আজ হঠাৎ করে একটা মেয়েকে নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড় করালেন, যার কোলে একটা বাচ্চা। তারপর বাচ্চাটা আমাকে আব্বু ডাকল। আর আপনি বলছেন সবাই বস?”
রাইসা এগিয়ে এসে ভাইয়ের হাত ধরল।
“রাফি, আগে শান্ত হ।”
“আপা, তুমি চুপ করো।”
রাইসা থেমে গেল।
রাফি আবার মেয়েটার দিকে তাকাল।
“তোমার নাম এখনো ইরাম?”
মেয়েটা ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“তুমি বিয়ে করেছিলে?”
ইরাম কিছু বলল না।
হাশেম সাহেব বললেন,
“রাফি, সব কথা এখন বলা যাবে না।”
রাফি এবার বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
“কেন যাবে না?”
“কারন—”
“কারন কী?”
হাশেম সাহেব চুপ।
রাফি নিজের চুলে হাত চালিয়ে বলল,
“আমি কি এতটাই ছোট যে আমাকে কিছুই বলা যাবে না?”
ইরাম এবার খুব আস্তে বলল,
“রাফি...”
“তুমি চুপ করো।”
ইরাম চমকে গেল।
রাফির গলার রাগটা যেন শুধু তার ওপর না। নিজের ওপরও।
“তুমি আমাকে তিন বছর আগে কেন ছেড়ে চলে গেছিলে?”
ইরামের চোখ থেকে একটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
“আমি ছেড়ে যাইনি।”
“তাহলে?”
“আমাকে যেতে হয়েছিল।”
“কে পাঠিয়েছিল?”
ইরাম উত্তর দিল না।
রাফি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
“তোমার স্বামী?”
এই কথায় ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে গেল।
ইরাম শিশুটাকে বুকে আরও শক্ত করে ধরল।
রাইসা অবাক হয়ে বলল,
“রাফি, তুমি কি বলতে চাচ্ছো ইরামের বিয়ে হয়েছিল?”
রাফি উত্তর দিল না।
ইরাম এবার মাথা নিচু করে বলল,
“হ্যাঁ।”
রাইসা ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
“তাহলে...”
কথাটা শেষ করতে পারল না।
রাফি ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওর বিয়ে হয়েছিল।”
আদনান এতক্ষণ চুপ করে সব দেখছিল। এবার সে বলল,
“আর বাচ্চাটা?”
রাফি উত্তর দেওয়ার আগেই ইরাম বলল,
“আমার মেয়ে।”
“বাবা?”
ইরাম চুপ।
আদনান আর কিছু বলল না।
রাফি আবার বলল,
“তুমি কি এখনো ওর সাথে আছো?”
ইরাম মাথা নাড়ল।
“না।”
“ডিভোর্স?”
“না।”
রাফি অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে?”
ইরাম চোখ মুছে বলল,
“আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই অনেকদিন।”
“কিন্তু ডিভোর্স হয়নি?”
“না।”
“কেন?”
ইরাম কোনো উত্তর দিল না।
হাশেম সাহেব এবার বললেন,
“এইসব কথা এখন না।”
রাফি তেড়ে গেল,
“আপনি আবার চুপ করতে বলছেন?”
“রাফি!”
“না আব্বু। আজকে আমাকে বলতে হবে। আমি আর চুপ থাকব না।”
তার গলা কেঁপে উঠল।
“আপনি কি জানতেন ওর বাচ্চা আছে?”
“হ্যাঁ।”
“জানতেন ওর বিয়ে হয়েছিল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমাকে কেন কিছু বলেননি?”
হাশেম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“কারন আমি জানতাম তুই শুনলে কখনো রাজি হবি না।”
রাফি তিক্তভাবে হাসল।
“আর আপনি ভাবলেন আমাকে না জানিয়ে আমার জীবন ঠিক করে দেবেন?”
“আমি তোর খারাপ চাইনি।”
“কিন্তু আপনি আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন!”
ইরাম এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“রাফি, তোমার আব্বুকে দোষ দিও না।”
রাফি তার দিকে তাকাল।
“তুমি আবার ওনাকে বাঁচাতে আসছো কেন?”
ইরাম চোখ নামিয়ে ফেলল।
“কারন উনি আমাকে একসময় বাঁচিয়েছিলেন।”
রাফি থমকে গেল।
“কী?”
ইরাম আর কিছু বলল না।
হাশেম সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
আদনান বুঝতে পারল, এখানে এমন একটা ঘটনা আছে যেটা সে এখনো জানে না।
সে শান্ত গলায় বলল,
“আব্বু, আপনি যদি সব না বলেন তাহলে ব্যাপারটা আরও খারাপ হবে।”
হাশেম সাহেব আদনানের দিকে তাকালেন।
তারপর ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।
“তিন বছর আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল।”
রাফি সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
“কী ঘটনা?”
“সেদিন রাতে ইরাম আমার কাছে এসেছিল।”
ইরাম মাথা নিচু করে বসে আছে।
“ও তখন একা ছিল। সঙ্গে এই বাচ্চাটাও ছিল না।”
রাফি অবাক হয়ে বলল,
“বাচ্চা ছিল না?”
ইরাম চোখ বন্ধ করল।
হাশেম সাহেব বললেন,
“কারন বাচ্চাটা তখন জন্মায়নি।”
ঘরের সবাই চুপ।
“ইরাম তখন গর্ভবতী ছিল।”
রাফির মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“তারপর?”
“ওর স্বামী ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।”
রাইসা মুখে হাত দিল।
“কেন?”
হাশেম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
“ওর স্বামী দাবি করেছিল, বাচ্চাটা তার না।”
ইরামের চোখ দিয়ে এবার টপটপ করে পানি পড়তে লাগল।
রাফি তাকিয়ে রইল।
“কিন্তু...”
হাশেম সাহেব বললেন,
“ইরাম তখন একা। নিজের পরিবারও ওকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। তখন ও আমার কাছে এসেছিল।”
রাফি ধীরে বলল,
“কেন?”
“কারন আমি ওর বাবাকে চিনতাম।”
“তারপর আপনি কী করেছিলেন?”
হাশেম সাহেবের মুখে কষ্ট ফুটে উঠল।
“আমি একটা সুপারিশ করেছিলাম।”
রাফি কেমন যেন স্থির হয়ে গেল।
“কিসের সুপারিশ?”
“ইরাম যেন একটা নিরাপদ জায়গায় থাকতে পারে, চিকিৎসা পায়, আর সন্তান জন্মানোর পর যেন ওকে কেউ জোর করে নিয়ে যেতে না পারে... সেই ব্যবস্থা করার জন্য।”
রাফি ধীরে ধীরে বলল,
“এটাই সেই সুপারিশ?”
হাশেম সাহেব মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
“তাহলে আমার সাথে এর সম্পর্ক কোথায়?”
হাশেম সাহেব এবার তার দিকে তাকালেন।
“সেটাই তো আসল কথা।”
রাফির বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
“মানে?”
“সেই সময় তুইই ইরামকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলি।”
রাফি ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“আমি?”
“হ্যাঁ।”
রাফি মনে করার চেষ্টা করল।
তিন বছর আগে...
একটা বৃষ্টির রাত...
রাস্তার পাশে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল সে।
মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছিল।
সে তাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সেদিন মেয়েটার মুখ ভালো করে দেখেনি।
শুধু মনে আছে, মেয়েটা বারবার বলছিল,
“আমাকে একটু বাঁচান।”
রাফির বুকটা ধক করে উঠল।
“ইরাম... তুমি কি সেই মেয়ে?”
ইরাম ধীরে মাথা তুলল।
“হ্যাঁ।”
রাফি পিছিয়ে গেল।
“তুমি?”
ইরাম কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“সেদিন তুমি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলে।”
রাফি কপালে হাত রাখল।
“আমি তো জানতাম না...”
“জানার কথাও ছিল না।”
“তাহলে তুমি আমাকে চিনতে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে এতদিন আমাকে কিছু বলোনি কেন?”
ইরাম এবার চোখ তুলে তাকাল।
“কারন তোমার জীবন নষ্ট করতে চাইনি।”
রাফি কিছু বলল না।
তারপর তার চোখ চলে গেল শিশুটার দিকে।
বাচ্চাটা ঘুম থেকে একটু নড়েচড়ে উঠেছে।
ইরাম তাকে আদর করে আবার ঘুম পাড়াতে লাগল।
রাফি খুব আস্তে বলল,
“ওর নাম কী?”
“আয়রা।”
“বয়স?”
“দুই বছর চার মাস।”
রাফি থমকে গেল।
দুই বছর চার মাস।
তার মাথার মধ্যে হিসাবটা ঘুরে গেল।
সে ইরামের দিকে তাকাল।
“আয়রা জন্মানোর সময়...”
ইরাম কথা কেটে বলল,
“হ্যাঁ।”
“তখন তুমি কোথায় ছিলে?”
“হাসপাতালে।”
“কার সাথে?”
ইরাম চুপ।
রাফি এবার বুঝতে পারল, একটা প্রশ্ন আছে যেটার উত্তর সবাই এড়িয়ে যাচ্ছে।
“আয়রার জন্মের সময় ওর বাবা কোথায় ছিল?”
ইরামের চোখ আবার পানিতে ভরে গেল।
“আমি জানি না।”
“জানো না?”
“না।”
“তুমি কীভাবে জানো না?”
“কারন ও চলে গিয়েছিল।”
“কে?”
ইরাম মুখ খুলল।
কিন্তু শব্দ বের হলো না।
হাশেম সাহেব বললেন,
“ওর স্বামী।”
রাফি বলল,
“তাহলে বাচ্চাটা ওর?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আমাকে আব্বু বলল কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
ঠিক তখন আয়রা ঘুমের মধ্যে আবার একটু নড়ল।
তারপর চোখ খুলে সরাসরি রাফির দিকে তাকাল।
ছোট্ট হাতটা ইরামের বুক থেকে বেরিয়ে এলো।
“আব্বু...”
এইবার রাফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ধীরে ধীরে শিশুটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“তুমি আমাকে কেন আব্বু বলছো?”
আয়রা কিছু বুঝল না।
শুধু হাত বাড়িয়ে দিল।
রাফি কয়েক সেকেন্ড সেই ছোট্ট হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে দিল।
আয়রার ছোট্ট আঙুলগুলো তার আঙুল জড়িয়ে ধরল।
রাফির বুকটা কেমন করে উঠল।
এই অনুভূতিটা সে আগে কখনো পায়নি।
কিন্তু একই সাথে মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন আরও জোরে বাজতে লাগল।
এই বাচ্চা তাকে আব্বু ডাকতে শিখল কীভাবে?
সে ইরামের দিকে তাকাল।
“তুমি ওকে কী বলেছো আমার ব্যাপারে?”
ইরাম মাথা নিচু করে বলল,
“কিছু না।”
“তাহলে?”
“ও নিজে থেকেই তোমাকে চিনেছে।”
রাফি অবাক হয়ে বলল,
“একটা দুই বছরের বাচ্চা কীভাবে আমাকে চিনবে?”
ইরাম চুপ।
রাইসা এবার বলল,
“ইরাম, তুমি কিছু লুকাচ্ছো।”
ইরাম চোখ তুলে রাইসার দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ।”
রাফির বুক ধক করে উঠল।
“কী?”
ইরাম কিছু বলার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।
সবাই দরজার দিকে তাকাল।
একজন লোক দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
তার হাতে একটা ফাইল।
হাশেম সাহেব তাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
“আপনি এখানে কেন?”
লোকটা কোনো উত্তর দিল না।
সে ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“সময় হয়ে গেছে।”
হাশেম সাহেবের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
“আমি বলেছিলাম, এখন না।”
লোকটা শান্ত গলায় বলল,
“আপনি তিন বছর ধরে বলছেন এখন না। কিন্তু সত্যি কখনো অপেক্ষা করে না।”
রাফি ফাইলটার দিকে তাকাল।
“এটা কী?”
লোকটা এবার তার দিকে তাকাল।
“আপনি রাফি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আপনারই আগে জানা উচিত।”
লোকটা ফাইলটা খুলে একটা কাগজ বের করল।
রাফি কাগজটা হাতে নিল।
উপরে কিছু লেখা।
তার চোখ প্রথম লাইনেই আটকে গেল।
“সুপারিশের ভিত্তিতে...”
রাফি পড়তে লাগল।
তারপর হঠাৎ তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
“এটা...”
আদনান এগিয়ে এসে বলল,
“কী আছে?”
রাফি উত্তর দিতে পারল না।
সে শুধু ইরামের দিকে তাকাল।
ইরাম চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।
যেন সে জানে, এতদিনের লুকানো কথাগুলো আর বেশিক্ষন লুকিয়ে রাখা যাবে না।
আর কাগজের শেষ লাইনে লেখা ছিল এমন একটা নাম...
যে নামটা রাফি কোনোদিন ভাবেনি এই গল্পের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন