ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাঠগোলাপের গন্ধ

১ম পর্ব

লেখক: রুমান ইসলাম

ফ্ল্যাপের লেখা-

নিতুর বয়স সাতাশ। সে বিশ্বাস করে, প্রতিটা মানুষের গায়ের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। সুখের গন্ধ, দুঃখের গন্ধ, অপেক্ষার গন্ধ, বিশ্বাসঘাতকতার গন্ধ।
আজিমপুর গোরস্থানের পাশে ‘নিরালা’ বাড়ির দোতলায় নিতু একা থাকে। বাবা নেই, মা-বোন গ্রামে। তার একমাত্র সঙ্গী বারান্দার কাঠগোলাপ গাছ আর লাইব্রেরির বই।
এক শ্রাবণের সন্ধ্যায় তার দরজায় এসে দাঁড়ায় অয়ন। হাতে টিনের স্যুটকেস। পেশায় গন্ধ-সংগ্রাহক। সে কবরের পাশে বসে কান্নার গন্ধ শোঁকে, রিকশাওয়ালার ঘামের গন্ধ লিখে রাখে, মিথ্যুকের গা থেকে পোড়া রাবারের গন্ধ টের পায়।
নিতুর গন্ধটা কাঠগোলাপের মতো। ভেজা, সাদা, একটু মন খারাপি।
নিরালা বাড়িতে আরও থাকে বাড়িওয়ালা সেলিম সাহেব, যিনি রোজ রাতে ছাদে উঠে মৃত বউয়ের সাথে কথা বলেন। থাকে নিচতলার ভাড়াটে রাবেয়া খালা, যার তিনকূলে কেউ নেই, কিন্তু বিড়ালের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারেন কার বাড়িতে বাচ্চা হবে। থাকে পাশের বাসার ক্লাস টেনে পড়া রূপা, যে রোজ নিতুর জন্য কাঠগোলাপ কুড়িয়ে আনে আর অয়নকে ‘ভূতভাই’ ডাকে।
একদিন অয়ন উধাও হয়ে যায়। রেখে যায় একটা শুকনো কাঠগোলাপ আর টিনের স্যুটকেস।
তিন বছর পর অয়ন ফিরে আসে। হাতে মৃত্যুর গন্ধ নিয়ে।
নিতুর বয়স সাতাশ। এই বয়সে মেয়েরা দুই ভাগ হয়ে যায়। একদল বিয়ে করে ফেলে, বাচ্চার নাম ঠিক করে, শাশুড়ির সাথে ঝগড়া করে। আরেকদল রাত জেগে বই পড়ে, অকারণে মন খারাপ করে, আর জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখে। নিতু দ্বিতীয় দলে।
সে বিশ্বাস করে, প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা করে ময়না পাখি থাকে। যার ডাক শুনলে বুকের ভেতর হুহু করে, চোখে পানি আসে, কিন্তু কেন আসে বোঝা যায় না। নিতুর ময়না পাখিটা থাকে আজিমপুর গোরস্থানের পাশে, একটা পুরোনো দোতলা বাড়িতে। বাড়িটার নাম ‘নিরালা’। নামের সাথে বাড়ির কোনো মিল নেই। দিনরাত হইচই, মানুষের গন্ধ, রান্নার গন্ধ, কান্নার গন্ধ।
বাড়ির মালিক সেলিম সাহেব। বয়স ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুল সব সাদা, কিন্তু গোঁফ এখনো কালো। কলপ দেন। বিপত্নীক। বউ মারা গেছেন দশ বছর আগে। তারপর থেকে লোকটা রোজ রাত এগারোটায় ছাদে ওঠেন। একটা বেতের চেয়ারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করেন। পাড়ার লোক বলে, মৃত বউয়ের সাথে কথা বলেন। নিতু বিশ্বাস করে না। আবার অবিশ্বাসও করে না।
নিচতলায় তিনটা ফ্যামিলি ভাড়া থাকে। সামনের দুই রুমে রাবেয়া খালা। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, কিন্তু শরীর এখনো শক্ত। তিনকূলে কেউ নেই। স্বামী রিকশা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন পঁচিশ বছর আগে। ছেলেমেয়ে হয়নি। এখন পাঁচটা বিড়াল পোষেন। বিড়ালগুলোর নামও অদ্ভুত—সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার। শনিবার আর রবিবার নামে কোনো বিড়াল নেই। জিজ্ঞেস করলে রাবেয়া খালা হাসেন। “শনি-রবি ছুটির দিন। বিড়ালও ছুটি কাটায়।”
খালার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। কারো গায়ের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারেন তার বাড়িতে কী ঘটতে যাচ্ছে। পাড়ার বউরা তাই প্রায়ই আসে। “খালা, আমার গন্ধ শুঁকে কন তো, আমার ছেলেটা পাশ করবে?” রাবেয়া খালা শুঁকে বলেন, “তোর পোলার গায়ে লবণ-পোড়া গন্ধ। ফেল করবে। দোয়া পড়া।” আশ্চর্যের ব্যাপার, কথা মিলে যায়।
দোতলার পুরোটা নিতুর। তিনটা রুম, ডাইনিং, কিচেন, সামনে টানা বারান্দা। বারান্দায় একটা কাঠগোলাপ গাছ। টবে না, ছাদ ফুঁড়ে উঠেছে। বাবা লাগিয়েছিলেন নিতুর জন্মের বছর। এখন গাছটা দোতলা ছাড়িয়ে গেছে। শ্রাবণ মাসে ফুল ফোটে। সাদা, মাঝখানে হলুদ। বৃষ্টি হলে গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করে।
নিতুর বাবা মারা গেছেন তিন বছর। হার্ট অ্যাটাক। সকালে চা খাচ্ছিলেন, হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে কাত হয়ে পড়লেন। ব্যস। মা আর ছোটবোন তানিয়া গ্রামে চলে গেছে। নিতু যায়নি। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে চাকরি করে। সহকারী লাইব্রেরিয়ান। বইয়ের গন্ধ ছাড়া ঘুম আসে না। পুরোনো বইয়ের পাতার ভ্যাপসা গন্ধ, নতুন বইয়ের কালির গন্ধ, মাঝখানের তাকে রাখা রবীন্দ্রনাথের বইগুলোর গন্ধ—সব আলাদা।
শ্রাবণ মাস। তারিখ ১৭। বিকেল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। আকাশ কালো। গোরস্থানের দিক থেকে ভেজা মাটির গন্ধ আসছে। নিতু বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে। পরনে সাদা সুতির শাড়ি। হাতে তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ উপন্যাস। বইটা তিনবার পড়া শেষ। তবু বারবার পড়ে। কেন পড়ে জানে না।
নিচ থেকে রাবেয়া খালার গলা ভেসে আসে। “সোমবার! এই সোমবার! মাছের কাঁটা খাবি না কইলাম। গলায় বিঁধবে।”
বিড়ালটা মিউ মিউ করছে।
সেলিম সাহেব গেট খুলে ঢুকছেন। হাতে বাজারের ব্যাগ। ছাতা নেই। ভিজে গেছেন। নিতুকে দেখে হাসলেন। “মা, বৃষ্টিতে ভিজো না। ঠান্ডা লাগবে।”
“আপনিও তো ভিজলেন চাচা।”
“আমার আর ঠান্ডা লাগার বয়স আছে? আমার এখন শুধু গরম লাগে। বুকের ভেতর গরম।” বলে হাসলেন। হাসিটা শুকনো।
সেলিম সাহেব উপরে উঠে গেলেন। নিজের ঘরে ঢোকার আগে নিতুর দিকে তাকালেন। “মা, তোমার ঘরে কি কেউ আসবে আজ?”
নিতু অবাক হয়। “না তো। কেন চাচা?”
“না, এমনি। মনে হলো তোমার বারান্দায় আজ দুই কাপ চা লাগবে।”
নিতু কিছু বলে না। সেলিম সাহেব মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত কথা বলেন।
সন্ধ্যা সাতটা। বৃষ্টি বাড়ছে। ঝমঝম শব্দ। কারেন্ট চলে গেছে। নিতু মোম জ্বালায়। বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখে। কাঠগোলাপ গাছের পাতা বেয়ে পানি পড়ছে। টুপটাপ। একটা কাঠগোলাপ ছিঁড়ে খোঁপায় গুঁজে দেয়।
হঠাৎ কলিংবেল।
এই বৃষ্টিতে কে এলো? রাবেয়া খালা? না, খালা কখনো উপরে আসেন না। সেলিম সাহেব? উনি তো এইমাত্র গেলেন।
নিতু মোম হাতে নিয়ে দরজা খোলে।
দরজার বাইরে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। শুকনো, লম্বা, কাঁধ ঝুঁকে আছে। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচে বৃষ্টির পানি। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, কাদায় মাখামাখি। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, ফিতা ছেঁড়া। হাতে একটা টিনের স্যুটকেস। পুরোনো, রঙ চটা, একপাশে ডেন্ট পড়া।
ছেলেটা ভিজে চুপসে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপছে। কিন্তু চোখ দুটো স্থির। নিতুর দিকে তাকিয়ে আছে।
“আপনি নিতু?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করে। গলার স্বর ভাঙা, খসখসে। যেন অনেকদিন কথা বলেনি, অথবা অনেক চিৎকার করে গলা বসে গেছে।
“জি।” নিতুর গলা দিয়ে স্বর বের হয় না।
“আমি অয়ন। নিচতলার সেলিম ভাই বলল, আপনার এখানে একটা রুম ভাড়া হবে। পেছনের ঘরটা।”
নিতু আরও অবাক হয়। সে তো কাউকে বলেনি রুম ভাড়া দেবে। পেছনের ঘরটা তালা মারা থাকে। স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার হয়। বাবার পুরোনো বই, মায়ের সেলাই মেশিন, ভাঙা হারমোনিয়াম—এসব রাখা।
“আমি তো... আমি তো কাউকে বলিনি...”
“আমার খুব দরকার আপা,” অয়ন তাড়াতাড়ি বলে। কথার মধ্যে একটা কাকুতি। “আমি কোনো ঝামেলা করব না। সারাদিন বাইরে থাকব। রাতে এসে ঘুমাব শুধু। ভাড়া অ্যাডভান্স দিয়ে দেব। তিন মাসের।”
বৃষ্টির ছাঁট আসছে বারান্দায়। ছেলেটার চশমা ঘোলা হয়ে গেছে। পাঞ্জাবি গা-এর সাথে লেপ্টে আছে। নিতুর মায়া লাগে। তার বাবা বলতেন, ‘বৃষ্টির দিনে কেউ দরজায় এলে ফিরিয়ে দিতে নেই। অলক্ষ্মী হয়। যে ফিরিয়ে দেয়, তার ঘর থেকে লক্ষ্মী চলে যায়।’
নিতু দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। “ভেতরে আসুন।”
অয়ন জুতা খোলে। স্যান্ডেলের ফিতা ছেঁড়া। খালি পায়ে ভেতরে ঢোকে। পায়ের ছাপ পড়ে মেঝেতে। কাদা-পানি মেশানো ছাপ।
“বসুন,” নিতু বলে।
অয়ন বসে না। দাঁড়িয়েই থাকে। টিনের স্যুটকেসটা বুকের সাথে চেপে ধরে আছে। যেন ওটা না, তার কলিজা।
“আপনি কী করেন?” নিতু জিজ্ঞেস করে। ভদ্রতার জন্য।
অয়ন উত্তর দেয় না। চারপাশে তাকায়। দেয়ালে বাবার ছবি, বুকশেলফে বই, কোণায় হারমোনিয়াম। তারপর নাক টানে। জোরে শ্বাস নেয়। চোখ বন্ধ করে।
“এই বাড়িতে কাঠগোলাপের গন্ধ,” অয়ন বলে। চোখ বন্ধ রেখেই। “ভেজা কাঠগোলাপ। সাথে একটু... পুরোনো বইয়ের গন্ধ। আর... আর একটু মনখারাপি গন্ধ।”
নিতুর শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। এই ছেলে কীভাবে বুঝল? তার মন খারাপ তো কাউকে বলেনি।
“আপনি... আপনি কীভাবে...”
অয়ন চোখ খোলে। হাসে। হাসিটা সুন্দর। শুকনো মুখে হাসিটা যেন বেমানান। “আমি গন্ধ পাই নিতু। সব গন্ধ। মানুষের গন্ধ, বাড়ির গন্ধ, দুঃখের গন্ধ, সুখের গন্ধ।”
নিচ থেকে রাবেয়া খালার চিৎকার ভেসে আসে। “বুধবার! এই বুধবার! খাটের নিচে কী করস? বাইর হ!”
অয়ন চমকে ওঠে। “বিড়াল?”
“হ্যাঁ। খালার পাঁচটা বিড়াল।”
অয়ন আবার নাক টানে। “বিড়ালের গায়ে মাছের গন্ধ। সাথে একটু... মৃত্যুর গন্ধ।”
নিতুর হাত থেকে মোম পড়ে যায়। নিভে যায়। ঘর অন্ধকার। শুধু বাইরের বৃষ্টির শব্দ। আর দুজন মানুষের নিঃশ্বাস।
অন্ধকারে অয়নের গলা ভেসে আসে। “আমি পেছনের ঘরটা নেব নিতু। ভাড়া কত?”
নিতুর উত্তর দেওয়ার আগেই কারেন্ট চলে আসে। আলো জ্বলে ওঠে।
আলোতে নিতু দেখে, অয়নের চোখে পানি। বৃষ্টির পানি না। চোখের পানি।
আর টিনের স্যুটকেসের গায়ে লাল রঙ দিয়ে লেখা: গন্ধের কবরস্থান।
নিতু বুঝতে পারে, তার জীবনে ময়না পাখিটা ডেকে উঠেছে। এই ছেলেটাই তার ময়না পাখি। যা
র ডাক শুনলে বুকের ভেতর হুহু করবে।
কিন্তু সে জানে না, ময়না পাখি খাঁচায় থাকে না। উড়ে যায়
অয়ন পেছনের ঘরটা নিয়ে নিল। ভাড়া নিয়ে কোনো দরদাম করল না। নিতু পাঁচ হাজার বলেছিল, অয়ন পনেরো হাজার দিয়ে দিল। তিন মাসের অ্যাডভান্স। একটা পুরোনো পলিথিনে প্যাঁচানো নোট। নোটগুলো ভেজা, শ্যাওলা-শ্যাওলা গন্ধ।
“টাকা গুনবেন না?” অয়ন জিজ্ঞেস করেছিল।
নিতু মাথা নেড়েছিল। গুনতে ইচ্ছা করেনি। এই ছেলেটার চোখের দিকে তাকালে টাকার কথা মনে থাকে না।
ঘরটা তিনদিন ধরে পরিষ্কার করল নিতু। বাবার বইগুলো সরাল, মায়ের সেলাই মেশিন বারান্দায় রাখল, ভাঙা হারমোনিয়ামটা রাবেয়া খালাকে দিয়ে দিল। খালা বললেন, “এই দিয়া কী করমু? বাজাইতে তো পারি না।”
“আপনার বুধবারটা বাজাবে,” নিতু হেসে বলেছিল।
ঘর পরিষ্কার করে নিতু দেখল, জানালাটা গোরস্থানের দিকে। জানালা খুললেই কবর দেখা যায়। সারি সারি। নতুন, পুরোনো। কোনোটায় নামফলক আছে, কোনোটায় নেই। রাতে জোনাকি জ্বলে। দিনে কাক ডাকে।
“আপনার অসুবিধা হবে না তো?” নিতু জিজ্ঞেস করেছিল অয়নকে।
অয়ন জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল। অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিল, “না। আমার ওদের সাথেই থাকার কথা।”
নিতু কথার মানে বোঝেনি। জিজ্ঞেসও করেনি।
অয়ন ঘরে ঢোকার পর প্রথম কাজ করল দরজায় তালা লাগানো। ভেতর থেকে। দিনে তিনবার তালা খোলে—সকালে একবার, দুপুরে একবার, সন্ধ্যায় একবার। বাথরুমে যায়, খায়, আবার ঢুকে যায়। নিতু দুপুরে ভাত বেড়ে দরজার সামনে রাখে। একটা থালা, এক গ্লাস পানি। একটু পর থালা খালি হয়ে যায়। গ্লাস খালি। কে খায়, কীভাবে খায়, নিতু দেখে না।
ছেলেটা অদ্ভুত। সারাদিন কী করে? ঘুমায়? বই পড়ে? টিনের স্যুটকেসটা খোলে না। খাটের নিচে রাখে।
নিচতলার রাবেয়া খালা একদিন নিতুকে ডেকে বললেন, “ওই পোলাডা কেডা? রাইতের বেলা ছাদে উঠে। আমি দেখছি। তোর সেলিম ভাইয়ের লগে কথা কয়।”
“কী কথা কয়?”
“জানি না। দূর থিকা ফিসফাস শুনছি। মরা মানুষের কথা কয় মনে হয়।”
নিতুর বুক ধক করে ওঠে। সেলিম সাহেব তো রোজ রাতে ছাদে ওঠেন। মৃত বউয়ের সাথে কথা বলেন। অয়ন তার সাথে কী কথা বলবে?
এর মধ্যে পাশের বাসার রূপা এসে জুটেছে। রূপা ক্লাস টেনে পড়ে। শ্যামলা, কোঁকড়া চুল, চোখ দুটো বড় বড়। সারাদিন নিতুদের বাসায় পড়ে থাকে। নিতুর শাড়ি পরে, লিপস্টিক দেয়, বই ঘাঁটে।
“নিতু আপা, তোমাদের বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া আসছে?” রূপা জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ। তুই কীভাবে জানলি?”
“দেখছি। লম্বা, শুকনা, চশমা পরে। ভূতের মতো।” রূপা খিলখিল করে হাসে। “আমি নাম দিছি ভূতভাই।”
নিতু ধমক দেয়। “এসব কী নাম! উনি তোর বড়।”
“বড় হইলে কী হইছে? রাতে ছাদে উঠে কবরের দিকে তাকায় থাকে। আমি দেখছি। ভূত না তো কী?”
নিতু কথা বাড়ায় না। কিন্তু রাতে নিজের ঘর থেকে উঁকি দেয়। সত্যিই। ছাদে দুটো ছায়া। একটা সেলিম সাহেবের, আরেকটা অয়নের। দুজন পাশাপাশি বসে। কথা বলছে না। শুধু গোরস্থানের দিকে তাকিয়ে আছে। জোনাকি উড়ছে ওদের মাথার উপর।
একদিন দুপুরবেলা ঘটনাটা ঘটে।
নিতু লাইব্রেরি থেকে ফিরেছে। গরমে ঘেমে গেছে। গোসল করে বারান্দায় চুল শুকাচ্ছে। হঠাৎ দেখে অয়নের ঘরের দরজা খোলা। হাট করে খোলা। অয়ন নেই।
নিতুর বুকের ভেতর দড়াম করে ওঠে। কৌতূহল। নিষিদ্ধ কৌতূহল।
সে পা টিপে টিপে দরজার কাছে যায়। উঁকি দেয়।
ঘরটা ফাঁকা। একটা চৌকি, একটা টেবিল, একটা চেয়ার। চৌকিতে চাদর নেই। টেবিলের উপর একটা হারিকেন, একটা মগ, আর টিনের স্যুটকেসটা। স্যুটকেসটা খোলা।
নিতুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সে ঘরে ঢোকে। স্যুটকেসের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।
ভেতরে কোনো কাপড় নেই। কোনো লুঙ্গি-গেঞ্জি নেই। আছে শুধু খাতা। মোটা মোটা ডায়েরি। একশোর উপরে হবে। সবগুলো এক সাইজের। কালো মলাট, সাদা লেবেল। লেবেলে তারিখ লেখা।
নিতু কাঁপা হাতে প্রথম খাতাটা তোলে। ১লা জানুয়ারি, ১৯৯৭।
প্রথম পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: আজ থেকে আমি মানুষের গন্ধ জমাব। আমার নাকই আমার খাতা। আমার শ্বাসই আমার কলম।
নিতু পাতা উল্টায়।
৭ই জানুয়ারি, ১৯৯৭। রমিজ মিয়া, রিকশাওয়ালা। বয়স ৪৫। গায়ে ঘাম আর বিড়ির গন্ধ। সাথে একটু লেবু পাতার গন্ধ। তার বউ মারা গেছে গত বছর কলেরায়। এখনো রাতে শোকে কাঁদে। কান্নার গন্ধ লবণাক্ত। আর একটু আঁশটে।
১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭। কলেজের মেয়ে, নাম জানি না। প্রেমিক ধোঁকা দিয়েছে। গায়ে হাসনাহেনার গন্ধ ছিল, এখন পোড়া রাবারের গন্ধ। মিথ্যা বলার গন্ধ। মেয়েটা তিনদিন পর গলায় দড়ি দেবে। বকুল ফুলের গন্ধ পাচ্ছি তার গা থেকে।
নিতুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। বকুল ফুলের গন্ধ? অয়ন বলেছিল, কেউ মরতে চাইলে তার গা থেকে বকুল ফুলের গন্ধ আসে।
সে তাড়াতাড়ি আরেকটা খাতা টানে। ৫ই মে, ২০২৩। এই তো তিন মাস আগের।
মিসেস রেহানা কবির। বয়স ৭২। আজিমপুর ১৭/২ নম্বর কবর। ছেলে আমেরিকায়। আসতে পারেনি। মায়ের কবরের মাটিতে কেঁদেছি। মাটির গন্ধে লবণ আর পুরোনো শাড়ির গন্ধ। ছেলের জন্য রেখে যাওয়া চিঠির গন্ধও পেলাম। মা লিখেছিলেন: ‘বাবা, আসতে পারলি না। তোর গায়ের গন্ধটা ভুলে যাচ্ছি।’
নিতুর চোখে পানি এসে যায়। এই ছেলে পাগল না। এই ছেলে অভিশপ্ত।
হঠাৎ পেছন থেকে গলা। “চুরি করে মানুষের ডায়েরি পড়তে নেই নিতু।”
নিতু বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঘুরে তাকায়। অয়ন দাঁড়িয়ে। কখন এসেছে টের পায়নি। পায়ে জুতা নেই। হাতে একটা নীল খাম।
“আমি... আমি...” নিতু তোতলায়।
অয়ন হাসে। “আপনি ভয় পেয়েছেন। আপনার গা থেকে এখন ভয়ের গন্ধ আসছে। পোড়া চিনির মতো।”
সে ঘরে ঢোকে। নিতুর হাত থেকে খাতাটা নিয়ে স্যুটকেসে রাখে। ঢাকনা বন্ধ করে।
“আপনি কী করেন অয়ন ভাই?” নিতু এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে। গলা কাঁপছে।
অয়ন চৌকিতে বসে। নিতুকে বসতে বলে। “আমি গন্ধ সংগ্রাহক।”
“মানে?”
“ছোটবেলায় আমার টাইফয়েড হয়েছিল। তিন মাস। বাঁচার কথা ছিল না। বেঁচে গেলাম। কিন্তু নাকটা নষ্ট হয়ে গেল। ডাক্তার বলল, আর গন্ধ পাব না।” অয়ন চশমা খুলে চোখ মোছে। “এক মাস পর বুঝলাম, ডাক্তার ভুল। আমি গন্ধ পাই। কিন্তু ফুলের গন্ধ না, খাবারের গন্ধ না। আমি অনুভূতির গন্ধ পাই।”
নিতু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
“মানুষ মিথ্যা বললে তার গা থেকে পোড়া রাবারের গন্ধ আসে,” অয়ন বলে। চোখ বন্ধ করে। “কেউ ভালোবাসলে দারুচিনির গন্ধ। কেউ হিংসা করলে পচা পেঁয়াজের গন্ধ। কেউ মরতে চাইলে বকুল ফুলের গন্ধ। আর কেউ কাউকে মনে মনে কবর দিলে মাটির গন্ধ আসে। ভেজা মাটি।”
“আমার গন্ধটা কেমন?” নিতু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে।
অয়ন চোখ খোলে। নিতুর দিকে তাকায়। অনেকক্ষণ। তারপর বলে, “কাঠগোলাপের মতো। ভেজা, সাদা, একটু মনখারাপি। আর... আর এখন একটু কৌতূহলের গন্ধ। সাথে ভয়।”
নিতুর কান গরম হয়ে যায়।
“আপনি রাগ করেছেন?” অয়ন জিজ্ঞেস করে।
“না।” নিতু মিথ্যা বলে। সাথে সাথে অয়নের নাক কুঁচকে যায়।
“মিথ্যা বলবেন না। পোড়া রাবারের গন্ধ আসছে।”
নিতু এবার হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে চোখে পানি এসে যায়। “আপনি আসলেই পাগল।”
“হয়তো,” অয়ন বলে। “কিন্তু রাবেয়া খালা পাগল না। উনি সত্যিই বিড়ালের গন্ধ শুঁকে ভবিষ্যৎ বলেন। আর সেলিম ভাইও পাগল না। উনি সত্যিই ছাদে বউয়ের সাথে কথা বলেন।”
“আপনি কীভাবে জানেন?”
“কারণ সেলিম ভাইয়ের গা থেকে আমি কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ পাই। ওটা ওনার মৃত বউয়ের প্রিয় ফুল ছিল। মৃত মানুষের গন্ধ জীবিত মানুষের গায়ে লেগে থাকে, যদি ভালোবাসা সত্যি হয়।”
সেদিন রাতে নিতুর ঘুম আসে না। বারান্দায় বসে থাকে। কাঠগোলাপ গাছের দিকে তাকি
য়ে। হঠাৎ মনে হয়, গাছটা থেকে আজ কাঠগোলাপের গন্ধ আসছে না। আসছে দারুচিনির গন্ধ।
ভালোবাসার গন্ধ।
কিন্তু কার ভালোবাসা?
রানিং.......
উপন্যাসের নাম: কাঠগোলাপের গন্ধ
লেখক: তহমিনা আফরিন রুমানা
উৎসর্গ: যারা একা একা রাত জাগে আক্ষেপ জমায়, মন খারাপ করে তাদের জন্য 🤍🌸

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন