ফন্ট সাইজ:
থিম:
কাঠগোলাপের গন্ধ

২য় পর্ব

লেখক: রুমান ইসলাম

অয়নের কথা শোনার পর নিতুর ঘুম কমে গেল। রাতে বারবার ঘুম ভাঙে। মনে হয় ঘরের ভেতর কেউ হাঁটছে। পায়ের শব্দ না, গন্ধের শব্দ। অয়ন বলেছিল, প্রতিটা অনুভূতির একটা গন্ধ আছে। এখন নিতু নিজেই গন্ধ পায়। নিজের ভয়ের গন্ধ—পোড়া চিনির মতো। নিজের কৌতূহলের গন্ধ—কাঁচা আমের মতো টক।

রাবেয়া খালা একদিন উপরে এলেন। হাতে বাটি ভর্তি পায়েস। “খা মা। শবেবরাতের পায়েস।”
নিতু অবাক হয়। “শবেবরাত তো আরও দুই মাস পরে খালা।”
“আমার শবেবরাত আজ,” খালা হাসেন। “সোমবারটা সকালে মইরা গেল। ওর আত্মার মাগফেরাতের জন্য।”
নিতুর বুক ধক করে ওঠে। “সোমবার? আপনার বিড়ালটা?”
“হ। বুড়া হইছিল। সকালে আমার কোলেই ঘুমাইল। আর উঠল না।” খালার চোখে পানি নেই। কিন্তু গলার স্বর ভারী। “ওর গায়ে গত তিন দিন ধইরা বকুল ফুলের গন্ধ পাইতেছিলাম। বুঝছিলাম সময় হইছে।”
নিতুর হাত থেকে বাটি পড়ে যায়। ঝনঝন করে ভাঙে। পায়েস ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। বকুল ফুলের গন্ধ। অয়ন বলেছিল, মরতে চাইলে গায়ে বকুল ফুলের গন্ধ আসে।
“তুমি ডরাইছ?” খালা নিতুর মুখের দিকে তাকান। নাক টানেন। “হ। পোড়া চিনির গন্ধ। ডরের গন্ধ।”
নিতু কথা বলে না।
“ওই পোলাডা তোমারে কী কইছে?” খালা জিজ্ঞেস করেন।
“কোন পোলা?”
“তোমার ভূতভাই। অয়ন।”
নিতু চমকে ওঠে। “আপনি কীভাবে জানেন ওসব কথা বলে?”
খালা হাসেন। দাঁত নেই, মাড়ি কালো। “আমি তো কইছিই। গন্ধ শুঁকি। তোর গা থিকা এখন দারুচিনির গন্ধ আসে। সাথে একটু কাঠগোলাপ। প্রেমে পড়ছস।”
নিতুর কান লাল হয়ে যায়। “ধুর খালা! কী যে বলেন!”
“আমি ঠিকই কই। কিন্তু সাবধান মা। ওই পোলার গায়ে কবরের মাটির গন্ধ। যে মানুষ কবরে ঘুমায়, তার লগে সংসার হয় না।”
খালা চলে যান। নিতু মেঝের পায়েস মুছে। কিন্তু মন থেকে বকুল ফুলের গন্ধ মোছে না।
---
রাত একটা। নিতুর ঘুম ভেঙে যায়। বৃষ্টি হচ্ছে। ঝমঝম। কারেন্ট নেই। ঘর অন্ধকার। হঠাৎ মনে হয় বারান্দায় কেউ হাঁটছে। চুড়ির শব্দ। রিনরিন।
নিতু মোম জ্বালায়। দরজা খুলে বারান্দায় যায়। কেউ নেই। শুধু কাঠগোলাপ গাছটা দুলছে। একটা ফুল ছিঁড়ে পড়ে আছে মেঝেতে। সাদা, ভেজা।
নিচ থেকে ফিসফাস শব্দ আসে। নিতু রেলিং ধরে নিচে তাকায়।
গেটের কাছে অয়ন দাঁড়িয়ে। হাতে নীল খাম। পরনে ভেজা পাঞ্জাবি। কাঁধে ঝোলা। ঝোলার ভেতর কী যেন নড়ছে।
গেট খুলে বেরিয়ে যায়। গোরস্থানের দিকে।
নিতুর বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পেটায়। এত রাতে গোরস্থানে কেন?
সে ছাতা নেয়। টর্চ নেয়। পা টিপে টিপে নামে। গেট খুলে বের হয়।
রাস্তা ফাঁকা। কুকুরও নেই। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর দূরে গোরস্থানের শিমুল গাছে বাদুড়ের ডাক।
নিতু গোরস্থানের গেটের কাছে যায়। গেট তালা মারা। কিন্তু পাশের দেয়াল ভাঙা। ছোটবেলায় ছেলেরা ওখান দিয়ে ঢুকে ঘুড়ি কুড়াত।
সে দেয়াল টপকায়। শাড়ি কাদায় মাখামাখি হয়।
ভেতরে অন্ধকার। শত শত কবর। নতুন, পুরোনো। টর্চের আলো ফেলে। আলো কাঁপছে।
হঠাৎ দেখে, তিন সারি পরে একটা টর্চের আলো নিভছে-জ্বলছে। নিতু এগোয়। পা কাদায় ডুবে যায়।
কাছে গিয়ে দেখে অয়ন। হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটা কবরের সামনে। নতুন কবর। মাটি এখনো আলগা। বাঁশের বেড়া দেওয়া। নামফলকে লেখা: মোছাঃ রেহানা কবির। মৃত্যু: ৫ই মে, ২০২৩।
অয়নের হাতে নীল খাম। সে খামটা কবরের মাটিতে গুঁজে দেয়। তারপর মাটিতে নাক ঠেকায়। জোরে শ্বাস নেয়। যেন মাটির গন্ধ শুঁকছে।
নিতু আর সহ্য করতে পারে না। “অয়ন ভাই!”
অয়ন চমকে ওঠে। টর্চ পড়ে যায়। বৃষ্টিতে ভিজে নিভে যায়। অন্ধকার।
“নিতু? আপনি এখানে?”
“আপনি এখানে কী করেন এত রাতে?” নিতু চিৎকার করে। গলা কাঁপছে। ভয়ে, রাগে, না অন্য কিছুর জন্য জানে না।
অয়ন উঠে দাঁড়ায়। “আমি কাজ করি।”
“কীসের কাজ? কবরে চিঠি দেন? মরা মানুষ চিঠি পড়ে?”
অয়ন কাছে আসে। বৃষ্টির পানিতে তার চশমা ঝাপসা। সে চশমা খুলে ফেলে। “মরা মানুষ চিঠি পড়ে না নিতু। কিন্তু যারা বেঁচে আছে, তারা পড়ে। রেহানা আন্টির ছেলে আমেরিকায়। মায়ের জানাজায় আসতে পারেনি। গত মাসে আমাকে চিঠি লিখেছিল। বলেছিল, ‘ভাই, আমার মায়ের কবরে একটা চিঠি দিয়ে আসবেন? লিখে দেবেন, আমি মাকে ভুলিনি।’”
নিতু চুপ করে যায়।
“আমি তার হয়ে কাঁদি নিতু,” অয়ন বলে। গলার স্বর ভেজা। বৃষ্টির জন্য না। “আমি কবরের পাশে বসে তার মায়ের গন্ধ শুঁকি। পুরোনো শাড়ির গন্ধ, পান-খাওয়া মুখের গন্ধ, শেষ বয়সের ওষুধের গন্ধ। তারপর ছেলেটাকে লিখে পাঠাই। ‘তোমার মায়ের গায়ে এখনো দোয়া-দরুদের গন্ধ লেগে আছে। তিনি তোমাকে মাফ করে দিয়েছেন।’”
নিতুর চোখে পানি আসে। বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যায়।
“আপনি পাগল,” নিতু ফিসফিস করে।
“হয়তো,” অয়ন হাসে। “কিন্তু আপনি কেন এসেছেন? আমার গন্ধ শুঁকতে?”
নিতু উত্তর দেয় না।
অয়ন নাক টানে। “আপনার গা থেকে এখন কাঠগোলাপের গন্ধ আসছে না নিতু। আসছে... আসছে লবণের গন্ধ। কান্নার গন্ধ। আপনি আমার জন্য কাঁদছেন?”
নিতু আর পারে না। অয়নের বুকে মুখ লুকায়। অয়নের পাঞ্জাবি ভেজা, ঠান্ডা। কিন্তু গন্ধটা উষ্ণ। দারুচিনির গন্ধ।
“বাড়ি চলেন,” নিতু বলে। “জ্বর আসবে।”
দুজন ভিজতে ভিজতে ফেরে। নিরালা বাড়ির গেটে এসে অয়ন দাঁড়ায়।
“নিতু,” সে বলে। “আপনি আমার থেকে দূরে থাকুন।”
“কেন?”
“কারণ আমার গায়ে কবরের মাটির গন্ধ। যে মানুষ কবরে ঘুমায়, তার লগে সংসার হয় না। রাবেয়া খালা ঠিকই বলেছে।”
নিতু কিছু বলে না। শুধু অয়নের হাত ধরে। হাতটা ঠান্ডা। বরফের মতো।
সেই রাতে নিতু স্বপ্ন দেখে। সে একটা কবরের পাশে বসে আছে। কবরের নামফলকে লেখা: অয়ন আহমেদ। আর কবরের মাটি থেকে কাঠগোলাপের গন্ধ আসছে।
ঘুম ভেঙে দেখে বালিশ ভেজা।
বারান্দায় গিয়ে দেখে, রূপা দাঁড়িয়ে। হাতে একগুচ্ছ কাঠগোলাপ।
“নিতু আপা,” রূপা বলে। চোখ লাল। “ভূতভাই কই? আমি তার জন্য ফুল আনছি।”
নিতু রূপাকে জড়িয়ে ধরে। রূপার চুলের গন্ধ শোঁকে। বাচ্চাদের গায়ের গন্ধ। ট্যালকম পাউডার আর সরলতার গন্ধ।
“ও ঘুমাচ্ছে রে রূপা,” নিতু বলে। “তুই ফুলগুলো আমাকে দে।”
রূপা ফুল দেয়। যাওয়ার আগে ফিসফিস করে বলে, “আপা, আমি কাল রাতে স্বপ্ন দে
খছি। ভূতভাইয়ের গায়ে বকুল ফুলের গন্ধ।”
নিতুর পায়ের নিচের মাটি সরে যায়।
বকুল ফুলের গন্ধ। মরতে চাইলে যে গন্ধ আসে।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন