—“কী বললে আব্বু?”
ইশার কণ্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট। সাইফুল চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
—“জায়ানকে আমরা তোর জন্য পছন্দ করেছি।”
কথাটা শুনে ইশা কয়েক মুহূর্তের জন্য একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে গিয়ে থামল জায়ানের ওপর। সকালের সেই অচেনা মানুষ। যার সঙ্গে আদালতের সামনে কয়েক মিনিট কথা বলেছিল সে। যে মানুষটা প্রথম দেখাতেই এমনভাবে কথা বলেছিল, যেন বহুদিনের পরিচিত। সেই মানুষটাই এখন তার সামনে বসে আছে তার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
ইশা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“কিন্তু আব্বু, আমি তো কিছুই জানতাম না!”
সাবিহা মেয়ের পাশে এসে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—“জানানোর মতো সময় পাইনি মা। আমরা আগে নিজেদের মধ্যে কথা বলেছি। তারপর ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে।”
ইশা একটু শক্ত গলায় বলল,
—“কিন্তু আমার মতামত?”
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল।
সাইফুল চৌধুরী মেয়ের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
—“তোর মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত হবে না মা। তুই রাজি না হলে এই বিয়ে কখনোই হবে না।”
ইশা কিছুটা শান্ত হলো। তারপর আবার জায়ানের দিকে তাকাল।
—“আর উনি?”
জায়ান এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার ধীরে ধীরে বলল,
—“আমি রাজি।”
ইশার চোখ বড় হয়ে গেল।
—“আপনি রাজি?”
—“হ্যাঁ।”
—“এত তাড়াতাড়ি?”
জায়ান তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
—“কিছু সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লাগে না।”
ইশা ঠোঁট চেপে রইল। তার মনে হচ্ছিল, মানুষটা যেন সবকিছু আগেই জানত। যেন আজকের এই কথোপকথন তার কাছে নতুন কিছু নয়।
মুনতাহা পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য হেসে বলল,
—“ইশা, তুই আগে জায়ানের সঙ্গে একটু কথা বল। তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নে।”
ইশা মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“একান্তে?”
মায়া মুচকি হেসে বলল,
—“হ্যাঁ, একান্তে কথা বললে হয়তো দুজন দুজনকে একটু ভালোভাবে বুঝতে পারবি।”
জায়ান হালকা হাসল।
—“ভয় পাচ্ছ?”
ইশা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি কাউকে ভয় পাই না।”
জায়ানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
—“জানি।”
আরিশ হেসে বলল,
—“তোদের দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে বিয়ের আগেই ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে।”
ইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“ভাইয়া, তুমি চুপ করবে?”
আরিশ আরও হেসে উঠল।
—“আচ্ছা বাবা, চুপ করলাম।”
কিছুক্ষণ পর ইশা উঠে দাঁড়াল। জায়ানও উঠে দাঁড়াল। দুজন বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে চলে গেল।
বাগানে তখন রাতের নরম বাতাস। শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুল ছড়িয়ে আছে। চারপাশে এক ধরনের শান্ত পরিবেশ। ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
—“আপনি সত্যিই এই বিয়েতে রাজি?”
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“কারণ তোমাকে আমার ভালো লেগেছে।”
ইশা কিছুটা থমকে গেল।
—“আমাকে আপনি কতক্ষণ দেখেছেন যে ভালো লেগে গেল?”
জায়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
—“কখনো কখনো কাউকে চিনতে বছরের পর বছর লাগে। আবার কখনো কাউকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়, মানুষটাকে আরও একটু জানতে চাই।”
ইশা মৃদু হেসে বলল,
—“আমি এসব কথায় বিশ্বাস করি না।”
—“বিশ্বাস করতে হবে না।”
—“তাহলে?”
—“সময়কে সুযোগ দাও।”
ইশা তার দিকে তাকিয়ে রইল। জায়ানের চোখে আজকের সেই কঠোরতা থাকলেও তার কণ্ঠে অদ্ভুত শান্তি।
ইশা কিছুক্ষণ পর বলল,
—“আপনার সম্পর্কে একটা কথা শুনেছি।”
জায়ানের চোখ সরু হলো।
—“কী?”
—“আপনি নাকি খুব রাগী।”
জায়ান হালকা হাসল।
—“কে বলেছে?”
—“মানুষ বলে।”
—“মানুষ আরও অনেক কিছু বলে।”
ইশা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
—“আপনি কি সত্যিই ওইসব অন্ধকার জগতের সঙ্গে জড়িত?”
জায়ান এবার আর হাসল না। তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে বলল,
—“কিছু প্রশ্নের উত্তর এখন দেওয়া সম্ভব নয়।”
ইশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—“মানে?”
—“মানে, তুমি যা শুনেছ তার সবটা সত্যি নয়।”
—“তাহলে কোনটা সত্যি?”
জায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“সময় হলে নিজেই জানতে পারবে।”
ইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আমি রহস্য পছন্দ করি না।”
—“কিন্তু আমার জীবনটাই রহস্যে ভরা।”
—“তাহলে আমি কীভাবে আপনাকে বিশ্বাস করব?”
জায়ান ধীরে ধীরে তার কাছে এসে থামল।
—“বিশ্বাস করতে আমি তোমাকে বাধ্য করব না। শুধু একটা সুযোগ চাইব।”
ইশা চুপ করে রইল।
জায়ান আবার বলল,
—“তোমার সঙ্গে আমি মিথ্যা বলব না। তবে সব সত্যি এখনই বলতেও পারব না।”
ইশা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে মায়ার কণ্ঠ ভেসে এলো,
—“জায়ান!”
জায়ান পেছনে ফিরে তাকাল।
মায়া দ্রুত বাগানের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
—“তোমার ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে।”
জায়ান ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনে অচেনা নম্বর দেখতে পেল। সে কল রিসিভ করল।
—“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো।
জায়ানের মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
—“কোথায়?”
কিছুক্ষণ শুনে সে বলল,
—“আমি আসছি।”
কল কেটে দিল।
ইশা তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করল।
—“কী হয়েছে?”
জায়ান উত্তর দিল না।
—“আমাকে এখন যেতে হবে।”
ইশা অবাক হয়ে বলল,
—“এখন?”
—“হ্যাঁ। জরুরি কাজ।”
—“কী কাজ?”
জায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“যেটা এখন তোমার জানা উচিত নয়।”
ইশার ভেতরে আবার অস্বস্তি তৈরি হলো।
—“আপনি সবকিছু এভাবে লুকিয়ে রাখেন কেন?”
জায়ান তার দিকে তাকাল।
—“কারণ কিছু সত্যি জানার সময় এখনও আসেনি।”
ইশা কিছু বলতে যাচ্ছিল। জায়ান তখন থেমে তার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
—“ইশা।”
—“হুম?”
—“আজ যা শুনলে, সেটা নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।”
—“কেন?”
জায়ান ধীরে ধীরে বলল,
—“কারণ আমার জীবনে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো জানার পর হয়তো তুমি আমাকে আগের মতো দেখবে না।”
ইশার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জেগে উঠল।
—“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”
জায়ান মাথা নাড়ল।
—“না। সতর্ক করছি।”
কথাটা বলে জায়ান ভেতরের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর সবাইকে বিদায় জানিয়ে সিকদার পরিবার চলে গেল।
ইশা বাগানেই দাঁড়িয়ে রইল। শিউলি গাছ থেকে একটি সাদা ফুল তার পায়ের কাছে পড়ল। সে নিচু হয়ে ফুলটা হাতে তুলে নিল।
কেন যেন তার মনে হচ্ছিল, এই রাতের পর তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
অন্যদিকে কালো গাড়িতে বসে জায়ান ফোনটা হাতে নিয়ে আবার সেই নম্বরে কল করল।
—“সব নিশ্চিত?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
—“হ্যাঁ, স্যার।”
—“চৌধুরী পরিবারের নাম কেন এর মধ্যে এসেছে?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ওপাশ থেকে বলা হলো,
—“আমরা নিশ্চিত নই। তবে পুরোনো ঘটনাটার সঙ্গে চৌধুরী পরিবারের একজনের সম্পর্ক থাকতে পারে।”
জায়ানের হাত শক্ত হয়ে মুঠো হলো।
—“কে?”
—“এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
জায়ান জানালার বাইরে তাকাল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ইশার মুখ।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—“ইশার কোনো ক্ষতি যেন না হয়।”
ওপাশের লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“স্যার?”
জায়ানের কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে উঠল,
—“আমি যা বলেছি, সেটাই করবে। ওর আশেপাশে কোনো অপরিচিত মানুষ দেখলে আমাকে জানাবে।”
—“জি, স্যার।”
কল কেটে গেল।
গাড়ি অন্ধকার রাস্তা ধরে দ্রুত এগিয়ে চলল।
আর চৌধুরী বাড়িতে দাঁড়িয়ে ইশা তখনও জানত না—তার আর জায়ানের সম্পর্কের মাঝখানে শুধু ভালোবাসা নয়, একটি পুরোনো রহস্যও অপেক্ষা করছে।
আর সেই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যার ফিরে আসা জায়ানের পুরো জীবনকে আবারও অন্ধকার করে দিতে চলেছে।
রানিং.......!
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#শিউলি_প্রণয়_কাব্য_
#লেখনীতে_মরিয়াম_রিতু
#৪র্থ_পর্ব