ফন্ট সাইজ:
থিম:
শিউলি প্রণয় কাব্য.

৫ম পর্ব

লেখক: 𐙚_মরিয়াম রিতু~ᥫ᭡

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। চৌধুরী বাড়ির সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেলেও ইশার চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে থেকেও বারবার তার মনে পড়ছে জায়ানের কথাগুলো। বিশেষ করে শেষ কথাটা—“আমার জীবনে এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলো জানার পর হয়তো তুমি আমাকে আগের মতো দেখবে না।”
কথাটার অর্থ কী?
জায়ান কি সত্যিই এমন কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত, যেটা ইশার জানা উচিত নয়? নাকি তার জীবনের পেছনে এমন কোনো সত্যি লুকিয়ে আছে, যেটা সে কাউকে বলতে পারে না?
ইশা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুতেই ঘুম এলো না। শেষ পর্যন্ত সে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় চলে গেল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকাল ইশা। চারপাশ নিস্তব্ধ। শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুলগুলো চাঁদের আলোয় আরও সুন্দর লাগছে।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
ইশা চমকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
অপরিচিত নম্বর।
কয়েক সেকেন্ড দ্বিধা করে সে কলটা রিসিভ করল।
—“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই।
ইশা আবার বলল,
—“হ্যালো? কে বলছেন?”
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর খুব নিচু, অপরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
—“জায়ান সিকদারের কাছ থেকে দূরে থাকুন।”
ইশার বুক ধক করে উঠল।
—“আপনি কে?”
—“আপনার জন্যই বলছি। জায়ানের জীবনে পা রাখলে বিপদ আপনারও হবে।”
ইশার কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।
—“আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?”
—“হুমকি নয়। সতর্ক করছি।”
—“আপনি জায়ানকে চেনেন?”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল,
—“জায়ানকে আপনি যতটা চেনেন, তার চেয়ে অনেক বেশি আমি চিনি।”
ইশা কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই কল কেটে গেল।
ইশা সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে আবার কল করল।
কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।
সে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
কিন্তু এবার তার মনে ভয় ঢুকে গেছে।
জায়ানকে নিয়ে যে সন্দেহটা এতক্ষণ শুধু প্রশ্ন ছিল, সেটা এখন যেন সত্যির দিকে এগোচ্ছে।
অন্যদিকে শহরের এক নির্জন রাস্তা।
কালো গাড়ি এসে থামল।
জায়ান গাড়ি থেকে নেমে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লোকের দিকে তাকাল।
লোকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
জায়ান কঠিন গলায় বলল,
—“কী হয়েছে?”
লোকটি বলল,
—“স্যার, খবরটা সত্যি।”
—“কোন খবর?”
—“যে লোকটাকে আমরা এতদিন ধরে খুঁজছিলাম, সে আবার শহরে ফিরেছে।”
জায়ানের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
—“কোথায়?”
—“চৌধুরী পরিবারের আশেপাশে তাকে দেখা গেছে।”
কথাটা শুনে জায়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“ইশার দিকে নজর রাখো।”
লোকটি অবাক হয়ে তাকাল।
—“স্যার, আপনি কি মনে করছেন—”
জায়ান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।
—“আমি যা বলেছি, সেটা করো।”
—“জি, স্যার।”
—“আর একটা কথা।”
—“জি?”
—“ইশার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।”
লোকটি মাথা নাড়ল।
—“বুঝেছি, স্যার।”
জায়ান গাড়িতে উঠে বসল।
তার চোখে তখন শুধু রাগ নয়, গভীর চিন্তা।
যে মানুষটাকে সে এতদিন ধরে খুঁজছিল, সে ফিরে এসেছে।
আর ফিরে এসে প্রথমেই চৌধুরী পরিবারের আশেপাশে ঘুরছে।
এটা নিছক কাকতালীয় হতে পারে না।
পরদিন সকাল।
সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই ইশার ঘুম ভাঙল।
রাতের ঘটনাটা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি হলো।
সে কাউকে কিছু বলল না।
দ্রুত তৈরি হয়ে আদালতে যাওয়ার জন্য নিচে নেমে এলো।
সাবিহা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“মা, কাল রাতে ঠিকমতো ঘুমিয়েছিস?”
ইশা জোর করে হাসল।
—“হ্যাঁ আম্মু।”
—“মুখটা এমন লাগছে কেন?”
—“কাজের চিন্তা।”
সাবিহা আর কিছু বললেন না।
ইশা নাশতা করে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ তার চোখে পড়ল—একটি কালো গাড়ি কিছুটা দূরত্ব রেখে তাদের গাড়ির পেছনে আসছে।
প্রথমে বিষয়টা সে গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরও গাড়িটা একই দূরত্বে রইল।
ইশা পেছনে তাকিয়ে ড্রাইভারকে বলল,
—“চাচা, একটু দ্রুত চালান।”
ড্রাইভার অবাক হয়ে বলল,
—“কেন মা?”
—“এমনিই। একটু তাড়া আছে।”
গাড়ির গতি বাড়ল।
কিন্তু পেছনের কালো গাড়িটাও গতি বাড়িয়ে দিল।
ইশার সন্দেহ এবার আরও গভীর হলো।
সে ফোনটা বের করে গাড়ির নম্বরের একটা ছবি তুলতে চাইল। কিন্তু গাড়িটা এমনভাবে দূরে ছিল যে নম্বর স্পষ্ট দেখা গেল না।
ইশা মনে মনে বলল,
—“এটা কি সেই লোকগুলোর গাড়ি?”
অবশেষে আদালতের সামনে গাড়ি থামল।
ইশা দ্রুত নেমে ভেতরে ঢুকে গেল।
কোর্টরুমে ঢোকার আগেই নাবিলা তার কাছে এসে বলল,
—“তুই আজ এত চুপচাপ কেন?”
ইশা মৃদু হেসে বলল,
—“কিছু হয়নি।”
নাবিলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“মিথ্যা বলছিস।”
ইশা চুপ করে রইল।
নাবিলা আবার বলল,
—“গতকাল তোকে একজনের সঙ্গে দেখেছি।”
—“কার সঙ্গে?”
—“জায়ান।”
ইশা থেমে গেল।
—“তুমি জায়ানকে চেনো?”
নাবিলা মাথা নাড়ল।
—“ব্যক্তিগতভাবে না। তবে নাম শুনেছি।”
—“কেমন মানুষ?”
নাবিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“সত্যি বলতে, ওকে নিয়ে ভালো-মন্দ দুই ধরনের কথাই শুনেছি।”
—“কী ধরনের কথা?”
নাবিলা চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
—“ওর সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানো ঠিক না।”
ইশা কিছু বলল না।
নাবিলার কথায় তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।
কিন্তু একই সঙ্গে জায়ানের বলা কথাটাও মনে পড়ল—
“তুমি যা শুনেছ তার সবটা সত্যি নয়।”
দুপুরে আদালতের কাজ শেষ করে ইশা বাইরে বেরিয়ে এলো।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তার চোখ আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের ওপর।
জায়ান।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে ফোন। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
ইশাকে দেখেই সে ফোনটা পকেটে রেখে দিল।
—“কেমন আছ?”
ইশা অবাক হয়ে বলল,
—“আপনি এখানে?”
—“তোমাকে নিতে এসেছি।”
—“কেন?”
—“বাড়ি পৌঁছে দেব।”
ইশা ঠান্ডা গলায় বলল,
—“আমার ড্রাইভার আছে।”
—“জানি।”
—“তাহলে?”
জায়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“তোমার পেছনে যে কালো গাড়িটা আসছিল, সেটাও জানি।”
ইশার মুখের রং বদলে গেল।
—“আপনি কীভাবে জানেন?”
জায়ান তার দিকে একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল,
—“কারণ আমি তোমার ওপর নজর রাখছি।”
ইশা রেগে গেল।
—“আপনি আমার ওপর নজর রাখছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমার অনুমতি ছাড়া?”
—“তোমাকে নিরাপদ রাখার জন্য সবসময় অনুমতির দরকার হয় না।”
ইশা চোখ রাঙিয়ে বলল,
—“আপনি কে যে আমাকে নিরাপদ রাখবেন?”
জায়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—“যে মানুষটা তোমাকে নিয়ে চিন্তা করে।”
ইশা থমকে গেল।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—“আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।”
—“তুমি যতই শক্ত হও, সব বিপদ একা সামলাতে পারবে না।”
—“আমি এতদিন একাই সামলেছি।”
—“এবার পরিস্থিতি আলাদা।”
ইশা অবাক হয়ে বলল,
—“কী হয়েছে?”
জায়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“গত রাতে একটা ফোন পেয়েছিলে?”
ইশা স্তব্ধ হয়ে গেল।
—“আপনি কীভাবে জানলেন?”
জায়ানের মুখের ভাব বদলে গেল।
—“সে কী বলেছে?”
ইশা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“আপনার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে।”
জায়ানের চোখে এবার রাগ স্পষ্ট।
—“আর কিছু?”
—“বলেছে, আপনার জীবনে পা রাখলে আমারও বিপদ হবে।”
জায়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“ইশা, আজ থেকে তুমি একা কোথাও যাবে না।”
ইশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—“আপনি আমাকে আদেশ করছেন?”
—“হ্যাঁ।”
—“আমি আপনার স্ত্রী নই যে আপনি আমাকে আদেশ করবেন।”
জায়ান থমকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড ইশার দিকে তাকিয়ে থেকে তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।
—“এখনও নও।”
ইশা চোখ বড় করে তাকাল।
—“মানে?”
জায়ান শান্ত গলায় বলল,
—“সময় হলে বুঝবে।”
ইশা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
জায়ান তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এলো,
—“স্যার… একটা খারাপ খবর আছে।”
জায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—“কী হয়েছে?”
—“যে লোকটাকে আমরা এতদিন ধরে খুঁজছিলাম…”
একটু থেমে লোকটি বলল,
—“সে আজ আদালতে এসেছে।”
জায়ানের চোখ সরু হয়ে গেল।
—“কোথায়?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
—“ইশা চৌধুরীর কোর্টরুমে।”
জায়ান সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।
তার চোখে এবার শুধু রাগ নয়—ভয়।
কারণ সে জানত, যে মানুষটা ফিরে এসেছে, সে শুধু তার শত্রু নয়।
ইশার অতীতের সঙ্গেও তার একটা গভীর সম্পর্ক আছে।
জায়ান গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বলল,
—“ওকে খুঁজে বের করো।”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
—“জি, স্যার।”
—“আর ইশার আশেপাশে কোনো অচেনা মানুষ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।”
—“জি।”
জায়ান ফোনটা রেখে দিল।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল ইশার মুখ।
সে জানত, এই মুহূর্তে ইশাকে সত্যিটা বলা যাবে না।
কিন্তু আর কতদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব?
কারণ যে রহস্য এত বছর ধরে তাদের দুই পরিবারকে আলাদা করে রেখেছে, সেই রহস্যই হয়তো এবার ইশা আর জায়ানের জীবনকে এক সুতোয় বাঁধতে চলেছে।
আর সেই সত্যিটা সামনে এলে—
ইশা কি জায়ানকে বিশ্বাস করবে?
নাকি সবকিছু জেনে তাকে নিজের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেবে?
রানিং..........!
To be continued…
[ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন]
#শিউলি_প্রণয়_কাব্য_
#লেখনীতে_মরিয়াম_রিতু
#৫ম_পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন