ফন্ট সাইজ:
থিম:
তেঁতুলপাতায় সংসার

৭ম পর্ব

লেখক: লেখনীতে সাদিয়া

#তেঁতুলপাতায়_সংসার

#লেখনীতে_সাদিয়া

#পর্ব_৭

❌কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ

বৈশাখের শেষ সময়। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হবে হবে ভাব। বাহির থেকে ঝিঁঝিঁপোকা আর ব্যাঙ এর ডাক শুনা যাচ্ছে। চড়ের তীব্র শব্দে সিকান্দারের মাটির ঘরটা কেঁপে ওঠল। শুনশান নীরবতায় ঘরটা ছেয়ে নিলো কিছুক্ষণ। বাহিরে বোধহয় ঠান্ডা বাতাস বইছে। না জানি কখন ঝড় শুরু হয়ে যায়।

বেশ কিছুক্ষণ রমিছা বানু চোখ বড় করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা আদোও ঘটেছে কিনা তাই যেন তিনি ধরতে পারলেন না। মেয়ের ফুঁপানোর শব্দে ধ্যান ভাঙ্গল রমিছা বানুর। তিনি গগন ফাটানো এক চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, "আয় হায় রে আমার ঝি ডারে শেষ কইরা ফেললো। কিরে সিকান্দার কি করছোস তুই? আমার ছোডু মাইয়ার গালে চড় ক্যান দিছোস তুই? হায় হায় রে। ওই কালনাগিনী আমার পুতেরে কানমন্তনা দিয়া শেষ কইরা ফালাইলো। আমার সংসারডা তছনছ কইরা ফাললো গো।"

"আম্মা জারির গিত বন্ধ করো। আমি হাফসার লগে কথা কইতাছি।" সিকান্দার বেশ কঠোর গলায় বলে ওঠে কথাটা।

"কি কথা কইতাছোস তুই? তোর অলক্ষ্মী ডাইনি বউয়ের লাইগা আমার ঝির গালে চড় মারছোস? হের কথা হুইনা মা বোনের লগে কাইজ্জা কইবার আইছোস? এই আছিলো তোর মনে সিকান্দার? এর লাইগাই তোরে বড় করছিলাম?"

মায়ের কান্নারত চিৎকারে ভেতরটা সিকান্দারের মুচড়ে ওঠলেও কথা বাড়ালো না। গালে হাত চেঁপে কাঁদতে থাকা হাফসার দিকে চেয়ে বলল,

"আম্মার মতো আমারে বদল পাইছ না হাফসা। তোর জামার দাগ ভালা কইরা দেখলেই বুঝা যায় এইডা তরকারির ঝোল পড়ার দাগ। ঝুডা পানির দাগ এত কড়া হইবো না। আমারে গাঁধার বুঝ দিবার যাইস না। সত্যডা নিজে কইবি নাকি আমার বাহির করতে হইবো? মনে রাখিস হাফসা যদি আমি বাইর করি তাইলে কিন্তু তোর...."

বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই হাফসা ভাইয়ের পায়ে ধরে বসে পড়ল।

"ভাইজান, ভাইজান ভুল হইছে আমার। আমারে মাফ কইরা দেও। এমন ভুল আমি জীবনে করমু না। আমারে মাফ কইরা দাও।"

এই অবস্থায় রমিছা বানু কপাল কুঁচকে স্থির হয়ে গেলেন। সিকান্দারের পায়ে পড়ে বসে থাকা মেয়ের দিকে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে রইলেন তিনি। মেয়ে উনার বলে কি? কি ভুল করলো? মাফ চায় ক্যান?

সিকান্দারের চোখমুখ অত্যন্ত লাল আর গম্ভীর হয়ে আছে। পাথরের মতো শক্ত চিত্তে সে দাঁড়িয়ে কাঠকাঠ গলায় বলে ওঠল, "পা ছাড়। তোরে পা ধরতে কই নাই। পা ছাইড়া কি হইছে সত্য কইরা কো। বানাইয়া কোনো মিছা কতা কইলে তোর কপালে কোন শনি টানমু ভালা কইরাই জানোস।"

"আ..আমরে মাফ কইরা দেও ভাইজান। আ..আমার ভুল হইছে।"

"তোরে ওঠতে কইছি হাফসা।"

ভাইয়ের চিৎকারে হাফসা দ্রুত ওঠে দাঁড়ালো। কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে মাথা নুয়ে দাঁড়ালো ও। রমিছা বানু এবার কিছুটা নীরবেই বিষয়টা দেখে গেলেন।

"শুরু কর।"

"....

"কি জিগাই তোরে? জামাত ঝোলের দাগ কেমনে লাগছে? হাছা কইরা কো।"

হাফসা জড়সড় কন্ঠে সময় নিয়ে উত্তর দিলো, "আ..আমি লাগাইছি।"

ছেলের পিছনে দাঁড়ানো রমিছা বানু চিৎকার করে বলে ওঠেন, "কি কইলি?"

সিকান্দার বোনের দিকে গভীর নয়নে তাকিয়ে। হাফসা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে নামিয়ে নিলো। ধরে আসা কন্ঠে বলল, "হেইদিন ভাবি আমার হাতের উপর তরকারি ফালাইয়া দেওয়ার পর আমি মুরগির তরকারি আর ভাত নিয়া ঘরে আইসা পড়ছিলাম। জামাডা এর আগেরদিন ধুইয়া বিছনায় রাখছিলাম ট্রাংকে রাখমু বইলা। কিন্তু..."

হাফসা ফুঁপিয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেঁপে সেটা সয়ে নিয়ে সিকান্দার হীম শীতল গলায় হুশিয়ার দিয়ে দিলো, "থামবি না। কতার মাঝে চুপ করবি না কইয়া দিলাম হাফসা।"

হাফসা ফুঁপিয়ে বলে ওঠল আবার, "খাওয়ার সময় বাটি থেইকা ঝোল জামাডাত পইড়া গেছিলো। আমি লগেলগে পানি ডালছি ওঠছে না। আম্মা দেখলে আমারে মারবো। হেই ডরে আমি ভাবির উপরে দোষ দিছিলাম...."

আবারও ঢুকরে কেঁদে ওঠে হাফসা।

সিকান্দার আর রমিছা বানু কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। এরপর হঠাৎ ধারালো গলায় জানতে চাইলো সিকান্দার, "কামডা তুই ঠিক করছোস? একবার চিন্তা কইরা দেখছোস কি করছোস তুই? একজনের উপরে এমন মিছা অপবাদ কেমনে দিলি তুই হাফসা? তোর কলিজা একটু কাঁপলো না? পরের ঘরো গিয়া এমন বাটপারি কইরা ভাত খাইবি তুই? এই শিক্ষা দিয়া বড় করতাছি তোরে?"

হাফসা আবারও ভাইয়ের পায়ে পড়ল, "আমার ভুল হইছে ভাইজান। এবারের মতো মাফ কইরা দেন। এমন ভুল আর করমু না।"

"আমার পা ছাইড়া দে তুই।"

"ভাইজান আমারে মা..."

কথা শেষ করার আগে সিকান্দার এক ঝাটকায় নিজের পা সরিয়ে নিলো। এতে অবশ্য হাফসা কিছুটা দূরে গিয়ে পড়ল ঝিটকে। কিন্তু টু শব্দটুক আর করলো না।

রমিছা বানু হঠাৎ আঁতকে বলে ওঠেন, "কি করতাছোস?"

মায়ের কথা পাত্তা দিলো না সিকান্দার। রাগে ওর ভেতরটা ফসফস করছিলো। হাফসার কান্না মুখ দেখে আর মারলো না। মেয়ে ভয়ে কাঁপছে। ওর দিকে শাণিত নজর দিয়ে বলল সিকান্দার,

"তুই যেই কামডা করছোস এইডা অন্যায়। জুলুম করছোস মেহেরুনের উপরে। একবার চিন্তা কইরা দেখছোস তোর এই বানোয়াট কথার লাইগা মাইয়াডার উপর কি হইছে? একবার চিন্তা করছোস তোর একটা মিছা কতার জের কত দূর গড়াইছে? এমন জটিল একটা ঘটনা ঘটাইয়া তুই আমার চোখের সামনে বইয়া আছোস হাফসা? তোরে মারতে মারতে আধামরা কইরা ফালানো দরকার।"

"ভাইজান, ভাইজান আমার ভুল হইছে। এইবারের মতো মাফ কইরা দেন আমারে।"

"আমার সামনে পড়বি না তুই। আর কোনোদিন যদি দেখছি মেহেরুনের লাগে খারাপ ব্যবহার করছোস, ছোডু হইয়াও ওরে অসম্মান করছোস তাইলে কইলজা টান মাইরা বাহির কইরা ফালমু কিন্তু হাফসা। মানুষের কইলজায় টান দেওয়ার স্বভাব আছে কিন্তু সিকান্দার ভূঁইয়ার। এই জীবনে আর কোনোদিন এমন কূটনামি করলে হেইদিন মনে করবি তোর জীবনের শেষ দিন।"

হাফসা মুখে হাত চেঁপে ফুপাচ্ছে। সিকান্দার রাগে কটমট করলেও হাফসা কে আর শাসন করলো না। ও এবার এগিয়ে গেলো মায়ের দিকে। রমিছা বানু কিছুটা বিস্ময় নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে,

"তুমি কিছু কইবা আম্মা?"

আমতাআমতা করে ওঠেন রমিছা বানু।

"তোমার ঝি কইছে আর তুমিও তার লগে লগে তাল দিছো তাই না আম্মা? হাছামিছা কিছু দেহো নাই? মেহেরুনের কথাও হুনবার মনে করছো না তাই না আম্মা?"

ঢোক গিলেন রমিছা বানু। এটা ঠিক মেহেরুনের উপর ক্ষোভের কারণেই তিনি বাচবিচার করেন নি। মেয়ের কথা সত্য বলেই চড়াও হয়েছিলেন মুর্শেদের মেয়ের উপর। কিন্তু তিনি তো আর জানতেন না মেয়ের ভেতরে এই প্যাঁচ ছিলো। তাই ছেলের চোখের দিকে তাকাতে একটু গাঁইগুঁই করলেন তিনি।

"কি হইলো আম্মা? এহন কিছু কইবা না তুমি? তোমার ঝি দেইখা তার কথা হুইনা অন্যের ঝি এর উপরে রাগ দেহানি খুব ভালা কাম বইলা মনে করতাছো তুমি? বিষয়ডা কি একটু বুদ্ধি খাডাইয়া চিন্তা করা যাইতো না আম্মা?"

"ক..কি কইবার চাস?"

"এইডাই যে তুমি মেহেরুন রে মাইরা কি ঠিক করছো?"

"কি এমন মারছি তোর বউরে? জেল ফাঁস দিছি নাকি খুন করছি? একটা চরই তো দিছিলাম হের লাইগা পুত হইয়া মায়ের উপরে এমন জেরা করতাছোস? কি করবি? আমারে মারবি তুই? নাকি বউয়ের হাতের মার খাওয়াইবি? কি করবার চাস এহন? আমি তো ভাবছিলাম তোর বউ আমার ঝিয়ের জামাত ঝোল লাগাইছে ইচ্ছা কইরা হের লাইগাই তো..."

"মেহেরুন ইচ্ছা কইরা এমন কাম করবো হেইডা আমি এই জীবনে বিশ্বাস করমু না আম্মা।"

"বিশ্বাস না করলে বউরে কোলে নিয়া বইয়া থাক তুই। বউয়ের আঁচলের নিচে ডুইকা থাক গা। আমার কাছে আইছোস ক্যান? দুনিয়াত আর কোনো হাউরি নাই যে বউরে একটু মারে না? হেই বাড়ির হাশেমের বউরে যে হের হাউরি মারে হের লাইগা হের পুতে মায়ের লগে কাইজা করবার আহে? শাসন করতে যায় মায়েরে? তোর বউরে মারছি এক্কেবারে দোষ হইয়া গেছে আমার।"

"এক জন গু খায় হের লাইগা তুমিও কি গু খাইবা আম্মা?" সিকান্দার বেশ শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো।

"কিইই?"

"কেউ গু খাইবো দেইখা তোমারও গু খাইতে হইবো এমন তো কথা না আম্মা। উদারন দেহাইবার যাও ক্যান? আর মারের কথা কি কইলা আম্মা? যেয় আদর করে হেয়ই মারবার পারে আম্মা। কিন্তু তুমি তো মেহেরুনরে জাত শত্রু ভাবো। আদর কি করবা? হেই বাড়ির হাশেমের বউয়ের কথা কইলা না? হাশেমের মা হাশেমের বউরে একবার মারলে দশবার আদর কইরা ডাকে। হাশেম বউরে মারবার গেলে হাশেমের মা হাশেমরে দৌড়ায়। বউয়ের কি লাগবো হেইডা হাশেমের মা হাশেমরে কইয়া দেয়। একবার রাগ ওঠলে মারে আরেকবার আদর করে। কিন্তু তুমি একটা দিন একটা বার মেহেরুনের লগে ভালা কইরা কথা কইছো কিনা সন্দেহ। তোমার মাইয়ারে একটা চড় দিছি বইলা তোমার অন্তর জ্বলতাছে। তাইলে মেহেরুন রে কেমনে মারতে গেলা তুমি আম্মা? হের শইলে হাত তুলা তোমার একদম উচিৎ হইছে না আম্মা। আমার বউরে চুলে ধইরা বাইর কইরা দেওয়া তোমার অন্যায় হইছে। কামডা তুমি একটুও ঠিক করো নাই আম্মা। একটুও না। নিজের বিবেকের কাছে জিগাইও কামডা ভালা হইছে কিনা।"

সিকান্দার আর দাঁড়ালো না। গটগট পায়ে বের হয়ে এলো মায়ের ঘর থেকে। রমিছা বানু কিছুক্ষণ থম মেরে রইলেন। ছেলের কথাগুলি বারবার উনার কানে বাজছে। ছেলের এই কাটাকাটা কথা ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখলেন তিনি। ওই মুর্শেদের মাইয়া কি তাবিজ করলো? বুকটা কেঁপে ওঠল উনার। অতঃপর মেয়ের গুনগুনানি শুনে সেদিক গিয়ে মেয়ের মুখে একটা ডুসনি দিয়ে দিলেন। চুল খামছে ধরে বললেন,

"এত ছলচাতুরী কেমনে শিখলি তুই? জানোস না মিছা কথা আমি হুনবার পারি না। এত বড় মিছা কতা কইলি ক্যান তুই?"

মেয়ের পিঠে গুম করে এক কিল বসিয়ে দিলেন রমিছা বানু। কিছুদূর গিয়ে হাপাতে লাগলেন তিনি। ওই মুর্শেদ শিকদারের মাইয়া যতদিন এই বাড়িত আছে ততদিন উনার শান্তি নাই। অলক্ষ্মী টা শনি টাইনা আনতাছে উনার ছেলের কপালে। ভবিষ্যতে যদি একমাত্র সহায় সম্বল আদরের মানিককে হারিয়ে ফেলেন? যা ব্যবস্থা করার দ্রুত করতে হইবো। ওই মাইয়ারে তাড়াইয়া সিকান্দাররে আরেকটা বিয়া দিতেই হইবো। মেয়ের মিথ্যের জন্য উনার বেশ রাগ পেলেও মেহেরুন কে চড় দিয়েছে বলে একটুও আফসোস করলেন না তিনি।

মনে উতাল পাতল ঝড় নিয়ে সিকান্দার ঘরে গেলো। মেহেরুন শক্ত অভিমতে ঘাটের কোণায় চুপচাপ বসে ছিলো। যেন পাথরের এক মূর্তি। মেহেরুনের চোখের দিকে তাকানোর সাহস আর শক্তি সিকান্দারের কোনোটাই হলো না। তাই চুপচাপ সে চিৎ হয়ে কপাল বাহু দিয়ে ঢেকে শুয়ে পড়ল। টু শব্দটা করলো না বউয়ের সাথে। মাটির ঘরটায় নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে রইলো অনেকক্ষণ যাবত। বাহিরে ঝড়ো হাওয়া বইছে। বাতাসের প্রভাবে মাটির ঘরটার পিছনে গাছগাছালির সাঁইসাঁই শব্দ ভেসে আসছে। ঘরের উপরের টিন গুলি অনেক পুরনো হয়েছে। কালবৈশাখী ঝরে জোড়া দেওয়া টিন কিছু জায়গায় সরে গিয়েছে। তারউপর পুরনো বলে ঝংকার ধরে ফুটো হয়ে গিয়েছে। সেই ফাঁকফোকর দিয়ে বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। এবার আষাঢ়ের আগে কিছু টিন না পাল্টালে আর টিকা যাবে না ঘরে। হাতে টাকা নেই। টিন পাল্টাতে গেলেও মেলা খরচা পড়বে। টিন কিনা যোগালির খরচা সব মিলিয়ে হাজার দুই টান দিবে। পুরো ঘরের টিন না পাল্টালেও ১০০০ টাকার মতো খরচা হবে ঠিকঠাক করতে। এত টাকার বাড়ি কই? দোকানে মাল নেই। এদিকে জীবনের এই যন্ত্রণার রেশ সব চিন্তায় সিকান্দার প্রায় দিশেহারা।

বউয়ের সাথে তাই আর কথা কাটাকাটি করার ইচ্ছা হলো না। তার মা যেটা করেছে একদম ঠিক হয়নি। বউয়ের নিশ্চয়ই মন খারাপ? কিভাবে কি দিয়ে কথা শুরু করবে সে? সিকান্দার খুটির মতো শক্ত হয়ে শুয়ে রইলো। এদিকে খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে পেট। সকালে সেই যে ভাত খেয়েছিলো ডাল আর শুঁটকি ভর্তা দিয়ে সারাদিন এক কাপ লাল চা ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি তার।

এদিকে মেহেরুনও আজ পাথর বনেছে। স্বামীর সাথে টু শব্দ করার ইচ্ছে হলো না। আহ্লাদ করে খাওয়ার জন্যে ডাকলোও না তেমন। কিছুক্ষণ স্বামীর পায়ের কাছটায় ঘাপটি মেরে বসে থেকে না পারতেই জিজ্ঞেস করলো,

"আমনে খাইবেন না?"

সাথে সাথে জবাব এলো না। বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় পর ওভাবে শুয়েই সিকান্দার ভারি গলায় উত্তর দিলো, "খিদা নাই। পাশে আইয়া শো।"

মেহেরুন আর বাড়তি আলাপ করলো না। আর না তো স্বামী কে জোর করলো খাওয়ার জন্যে। সেই শক্তিটাই পাচ্ছে না অসাড় শরীরে। ওর নিজেরও বেশ খিদে লেগেছে। কিন্তু ওই ভাত তার গলা দিয়ে নামবে না। যে ভাত ও নিজে রান্না করেনি সে ভাত খাবে কি করে? শাশুড়ির রান্না করা ভাত ভুলেও গলা দিয়ে নামলে শাশুড়ির কথা শর্ষে পরিমাণও কম পড়বে না। ভাতের খুটা দিতে দিতে পিত্তি জ্বালিয়ে ফেলবে। তাই চুপচাপ খিদেয় জ্বলতে থাকা পেটে খিল মেরে মেহেরুন গিয়ে শুয়ে পড়ল স্বামীর অপর পাশে।

সিকান্দার চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলেও মেহেরুন স্বামীকে পিঠ দেখিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। বাহিরের বৈশাখী বাতাস একটুও কমেনি। সেই সাথে সাথে গর্জনও ভেসে আসছে। উপরের চালের ফুটো দিয়ে মাঝেমাঝেই বিদ্যুৎ ঝলকানি চোখে এসে লাগছে। সাথে ঘরটাও মৃদু জ্বলে ওঠছে যেন প্রকৃতির আলোয়। বেশ অনেকক্ষণ দুজন এভাবেই শুয়ে ছিলো। বাহিরের ঝড়ো বাতাসে আবহাওয়া ঠান্ডা হয়ে এসেছে। গায়ে খানিক শীতলও লাগছে। মেহেরুন তাই কুঁকড়ে শুয়ে আছে।

মিনিট কত গড়ানোর পর সিকান্দার কপাল থেকে বাহু সরিয়ে তাকায় বউয়ের দিকে। আচমকা ক্ষীণ কাতর গলায় ফিসফিস করে ওঠল সিকান্দার,

"তোরে একটু বুকে জড়াইয়া শুইতে দিবি মেহেরুন? আমার বুকের ভেতরডা না ধড়ফড় করতাছে।"

সঙ্গেসঙ্গে এক বিজলির আলোর সাথে সাথে কেঁপে ওঠল পুরো ধরণি। সেই সাথে মেহেরুনের শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো। ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠল ওর সমস্ত শরীর। এটা কি লোকটার সেই কাতর স্বরে নাকি বিদ্যুৎ চমকের শব্দে তা ঠাউর করতে বেগ পুহাতে হলো মেয়েটার। এই কন্ঠ বহুদিন ধরে শুনা হয় না মেহেরুনের। বাপ মায়ের আড়ালে বটতলায় ধানখেতের সমাগমে লুকিয়ে চুড়িয়ে যখন লোকটার সাথে প্রেম করতো তখন বোধহয় শুনা হতো এমন নরম শ্লথ কন্ঠ।

মেহেরুন মন্থর বেগে স্বামীর দিকে তাকায়। স্বামীর এই করুণ ক্রান্তিমান মুখ দেখে বুকের ভেতরডা মুচড়ে ওঠে মেহেরুনের। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে।

বউকে নির্নিমিখ তাকিয়ে থাকতে দেখে সিকান্দার মিগধ গলায় বলে ফের, "একটু বুকে আয় না মেহেরুন। বড্ড বেশি জ্বলতাছে বুকের ছাতি ডা। একটু আইবি রে বউ?"

মেহেরুন হুট করে ফুঁপিয়ে ওঠল। সিকান্দার এরপর নিজেই হাত বাড়িয়ে বউ কে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। বাহিরে তখন তুমুল বাতাস আর গর্জন বইছে প্রকৃতির এদিকে এক মানবীর ফুঁপানো কান্না আর স্থির শুয়ে থাকা মানবের চাঁপা হাহাকার মটির ছোট ঘরটাকে আরো ভারি করে তুলছে যেন।

স্বামীর বুক আঁকড়ে ধরে মেহেরুন ফুঁপাতে লাগল। ভেতরের দীর্ঘদিনের জমানো কষ্ট বুঝি সুযোগ পেয়ে সব উগড়ে দিচ্ছে। সিকান্দার বউকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ শুয়ে তাকিয়ে আছে ঝং ধরা উপরের টিনের দিকে। মেহেরুনের কান্নার তোপ কখন যে ওর চোখের কার্নিশ ভিজিয়ে দিয়েছে ও নিজেও টের পায় না। কিন্তু যখনই পায় দ্রুত করে বউয়ের অদেখায় মুছে নেয় গড়িয়ে না পড়া সে পানিটুক।

মেহেরুনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে ডাকে সিকান্দার, "মেহেরুন? তোরে আমি খুব কষ্ট দেই তাই না রে? আমার মতো একটা জানোয়ারের ঘরে ক্যান আইছিলি তুই?"

মেহেরুনের ফুঁপানো বাড়ে। এমন প্রশ্ন সিকান্দারের কি আদোও মানায়? মানুষটা কি তাদের সাক্ষাৎ তাদের প্রণয়ের সব কথা ভুলে বসেছে? আত্মার সেই টান উপেক্ষা করে মেহেরুন কি করে না এসে পারতো এই মাটির ঘরে? ফুঁপাতে ফুঁপাতে মেয়েটা উত্তর দেয়,

"আমার লাইগাই আমনের সব অশান্তি। আমনের জীবনে শান্তি নাই। হের চেয়ে ভালা এইডাই হইবো আমনে আমারে বাপের বাড়ি রাইখা আহেন। আমনের মাও শান্তি পাইবো। আমি গেলে গা আমনের সংসারেও শান্তি আইবো।"

সিকান্দার দাঁত চেঁপে আনে। মনে মনে আওড়ায়, "আমি দুনিয়ার কোনো নারীর মাঝেই যে শান্তি পামু না রে মেহেরুন। কারণ সিকান্দার ভূঁইয়ার জীবনে যদি তিল পরিমানও শান্তি আল্লাহ লিখকা দিয়া রাহে তাইলে হেইডাও তোর মাঝেই দিছেরে বউ।"

তবে মুখ ফুটে বলে, "আমার আফসোস তোরে কদর করবার পারি না আমি।"

"বাঞ্ছা মাইনষের আবার কিয়ের কদর?"

"আমার জ্বালা বাড়াইস না মেহেরুন। চুপচাপ একটু বুকে শুইয়া থাক না বউ।"

এই বলে মেহেরুন কে আরো শক্ত করে ধরে নেয়। চাঁপা অভিমান নিয়ে মেহেরুন বলে, "আমারে কাইলকা একটু আব্বার কাছে দিয়া আইবেন। আমার ভালা লাগতাছে না। আমি একটু হেই বাড়িত যাইবার চাই।"

"মেহরুন?"

বেশ সময় পর কাতর স্বরে ডেকে ওঠল সিকান্দার।

"কন।"

"আমারে তুই হাচাই ছাইড়া যাবি গা?"

বুকটা কামড়ে ওঠল মেহেরুনের। সে চকিতে তাকালো স্বামীর মুখের দিকে। বউকে তাকাতে দেখে সিকান্দার মুখ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো।

"তোরে না দিবার পারি সুখ আর না দিবার পারি শান্তি। সব কিছুর মাঝেই অভাব। আমার জীবনে খোদা ক্যান যে এত অভাব দিছিলো।"

"আমনে তো ভালোবাসার দিবার গিয়ার অভাবে পড়েন সিকান্দার ভূঁইয়া? খালি আমার লগে কুত্তার মতো ব্যবহার করার লাইগাই আমনের অভাব থাহে না।"

মেহেরুন কথাটা বলে ফেললেও মাথা নিচু করে নিলো। স্বামীর দিকে আর তাকালো না। তাকালে হয়তো দেখতে পেতো স্বামীর দুঃখে ডুবা সেই তিক্ত হাসির ঝিলিকটা।

"মাথাডা খুব ধরছে। একটু ঘুমাইতে দে।"

এই কথা শুনে মেহেরুন চুপচাপ সরে আসতে চাইলে সিকান্দার বাঁধা দিয়ে বলে, "অমানুষের বুকে থাকতেও খুব জ্বালা তাই না রে মেহেরুন?"

বউ তা জবাব দিলো না দেখে সে সত্যি এটাই ভেবে নিজেকে বিদ্রূপ করে হাসলো। ভঙ্গুর গলায় বলল, "কষ্ট কইরা একটু থাক। আমি ঘুমাইলে না হয় সইরা যাইস।"

মেহেরুনের কপালে ভাঁজ পড়ে। সে থম করে কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে মুখ তুলে তাকায় স্বামীর দিকে, "শুনছেন? ঘুমাইয়া গেছেন আমনে?"

"ক্যান? কিছু কইবি?"

"হো।"

"কো।"

মেহেরুন একটা ঢোক গিলল। সময় নিলেও ফট করে প্রশ্ন করে বলল, "আমনে কি সত্যি আমারে কোনো কারণে বিয়া করছিলেন?"

সিকান্দার ঝাটকা দিয়ে ওঠল। যেন ওর শরীরে ঝং ধরা টিন বেঁধ করে বাহিরের বজ্রপাত এসে আছড়ে পড়েছে। চোখের সমস্ত ঘুম ছুটে গিয়ে ও বড় করে তাকালো বউয়ের দিকে। মুহূর্তে ওর মাঝে কিছুটা আতঙ্ক দেখা দিলো। সেই সাথে ঘাম। শ্বাসের গতি বাড়লো কিছুটা।

"তু..তুই..."

"কি হইছে আমনের? এমন করতাছেন ক্যান। শইল খারাপ লাগতাছে? পানি খাইবেন?"

সিকান্দার মুখ হা করে শ্বাস টানতে টানতে বলল, "তুই এই কথা জিগাইলি ক্যান বউ? তুই কি হেইদিন আমগো কথা..."

আর বলতে পারলো না সিকান্দার ওঠে বসল। মেহেরুনও স্বামীর এই অস্থির ভাব দেখে কিছুটা শঙ্কিত হলো। দ্রুত বিছানার পাশের টুলের উপর হারিকেনের পাশে রাখা প্লাসিকের জগ থেকে স্টিলের গ্লাসে পানি ঢেলে সামনে ধরল। সিকান্দার সবটুকু পানি ঢকঢক করে গিলে নিশ্বাস ছাড়ল।

"কি হইছে আমনের? শইল খারাপ করছে বেশি?"

"বুকটা ধড়ফড় করতাছে। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়া নিতাছে। একটু ঘুমামু আমি। আমারে বিরক্ত করিস না মেহেরুন।"

এবার সিকান্দার বউয়ের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল। মেহেরুন স্বামীর মুখের দিকে কাত হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। লোকটার কি বেশি খারাপ লাগছে শরীর? আজেবাজে চিন্তা করতে করতে ওর চোখে ঘুম ধরা দিলো। সারদিনের না খাওয়া আর কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে নেওয়া আঁখিতে সহজের যেন ঘুম ধরা দিলো।

বউ ঘুমিয়ে গিয়েছে বুঝে সিকান্দার এবার চোখ তুলে তাকায়। মেহেরুনের গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। মেয়েটাকে ও নিজে মারলেই ওর পরান ধড়ফড় করে, জ্বলে। আর এই গালে আম্মা মারছে? বুকটা মুচড়ে ওঠে যেন ওর। মা এখনো অহেতুক সন্দেশ আর জেদ কেন পুষে রেখেছে মনে? মেহেরুন কে একটু মেনে নিলে কি হয়? বুকের ভেতরটা জ্বলে ওর। বিড়বিড় করে তাই বলে সিকান্দার,

"তিন বছরের প্রতিদান হিসেবে তুই আমারে বিশ্বাস করবি না মেহেরুন। সত্যি জানলে আমার কথা শুনবার চাইবি না। আমারে কিছু কওয়ার সুযোগও দিবি না আমি জানি। মুখ ফিরাইয়া নিবি আমার থেইকা আর হেইডাই আমারে আরো পুড়াইবো। সিকান্দার ভূঁইয়ার অস্তিত্ব ধ্বংস করবো।"

চলমান....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন