ফন্ট সাইজ:
থিম:
তেঁতুলপাতায় সংসার

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: লেখনীতে সাদিয়া

#তেঁতুলপাতায়_সংসার

#লেখনীতে_সাদিয়া
#পর্ব_৬
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মেহেরুন। ওদিকে ননদ হাফসার চিৎকার চেঁচামেচি বাড়ছে। মেহেরুন চুপচাপ দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ চিন্তা করলো কি এমন করেছে সে? হাফসার কি কিছু সমস্যা হয়েছে তার দ্বারা। সকাল থেকে এমন কোনো কারণ খুঁজে পেলো না। তাই কালকেও চিন্তা করলো। না কালও তো এমন কিছুই হয়নি তাহলে ও চিৎকার করছে কেন? 
ততক্ষণে হাফসা রাগে গজরাতে গজরাতে উঠোনে নেমে এসেছে। হাতে তার সাদা একটা জামা। মেহেরুন কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই হাফসা খেঁকিয়ে ওঠল, 
  "এই যে বড়লোক বাপের বেটি, অলক্ষ্মী মাইয়া বউ সংসারে ক্ষয় ছাড়া কি করতে পারেন আমনে? আম্মা ঠিকি কয় আমনে সব কিছু ধ্বংস কইরা শান্তি হইবেন। অলক্ষ্মী অপয়া বেডি কোনহানের।"
  "কি হইছে হাফসা? এমনে কথা কইতাছো ক্যান? আমি কি করছি তোমার?" 
  "কি করছেন জানেন না? কাচা আবু সাজেন? আম্মা? ও আম্মা? কই গেলা তুমি?"
মুখে পান চিবিয়ে রমিছা বানু এগিয়ে এলেন, "কি হইছে? এমন চেঁচাস ক্যান? তোর চাচির ঘরে গেছিলাম একটু পান চিবাইতে। কি হইছে কি?"
  "দেহো আম্মা, তুমি যে মুরগির ডিম বেইচ্চা টেকা জমাইয়া আমার সাদা পিছলা কাপড়ের জামাডা বানাইয়া দিছিলা হেইডা ভাবি কি করছে তুমি একবার দেহো।"
রমিছা বানু হায় হায় করে চোখ বড় করে নিলেন। আগ্রহ বশত মেহেরুনও উঁকি দিলো জামাটায়। তরকারির ঝোল ছড়িয়ে লেগে আছে নিচের অংশ টায়। সাদা জামাটায় খুব চোখে লাগছে হলুদ ঝোলের দাগ। সে বছর শাশুড়ি ননদের কান্নাকাটি দেখে ডিম আর একটা মুরগি বেচার টাকা দিয়ে জর্জেট কাপড়ের এই গোল জামাটা বানিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু হাফসা তাকে দোষারোপ করছে কেন? 
  "ও অলক্ষ্মী রে সব কিছুর মাঝে তোর অলক্ষ্মী গিরি না করলে হয় না? আমার সব কিছু ছাই কইরা তুই এই বাড়িত্তে বাহির হইবি তাই না?"
  "আম্মা। আমি কিছু করি নাই। আমি কেমনে জানমু হের জামায় ঝোল ভরছে কি কইরা?" 
  
  "আম্মা এই বেডি মিছা কথা কয়। হেয় নিজেই ইচ্চা কইরা বোধহয় ঝুডা পানি ফালাইছে। না হইলে এত ঝোল কেমনে লাগছে কোও তুমি?"
মেহেরুন অবাক চিত্তে বলে, "এইডা কেমন কতা কও হাফসা? তোমার জামা আমি দেহিও নাই আমি কেমনে ঝুডা পানি ফালামু? আর ফালামুই ক্যান? এইডি কেমন ধরনের কথা কোও তুমি?"
  "দেখছো আম্মা? এত বড় ক্ষতি কইরা কেমনে চোপা লাড়াইতাছে। আমি কি মিছা কতা কইতাছি? হেয় ছাড়া এমন কাম কেডা করবো তুমি কও?"
এতক্ষণ রমিছা বানু চুপ ছিলেন। মেহেরুন যেই কিছু বলতে যাবে নিজেকে নিয়ে ওমনি তেড়ে ওঠেন তিনি, "চুপ কর অলক্ষ্মী। একটা কতা কবি না। আমার সংসারে কোনো ভালা কিছু তোর ভালা লাগে না? সব ছাই বানাইয়া এই বাড়িত্তেন বাহির হইবি ঠিক করছোস?"
  "আম্মা আমনে কি কন? আমি হাফসার জামায় ঝোল লাগামু কেমনে? আমি হের জামা পামু কই? এইডা একবারও চিন্তা করতাছেন না? আমারে আমনে দেখবার পারেন না ঠিক আছে তাই বইলা অযুক্তির কথা কেমন কন?"
মেহেরুনের এই জবাবই বুঝি ওর কাল হয়ে দাঁড়ালো। বাঘিনীর মতো খেপে গেলো রমিছা বানু। এক কথায় দুই কথায় তিনি মেহেরুনের গালে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিলেন। আকস্মিক কান্ডে স্তব্ধ হয়ে গেলো মেহেরুন। এদিকে রমিছা বানু রণমূর্তি ধারণ করলেন যেন। দীর্ঘদিনের জমানো রাগ আর ক্ষোভ দাবানলের মতো বের হয়ে আসছিলো উনার ভেতর থেকে। চোখের সামনে কয়েক বছর আগে স্বামী আর সন্তানের লাশ ভেসে ওঠলো। তাতেই সমস্ত সীমা অতিক্রম করে তিনি তেড়ে গেলেন মেহেরুনের উপর। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরুনের চুলের মুঠি ধরে বলতে লাগলেন তিনি, 
  "বাহির হো। আমার বাড়ি থেইকা বাহির হো মা গি। আমার স্বামী আর সন্তান কব্বরে গেছে এহন আমার আরেক পুতরে মাইরা আমারে ধ্বংস করবার চাস। অলক্ষ্মী বাঞ্ছা বাহির হো আমার বাড়ি থেইকা।"
মেহেরুন যেন পাথর হয়ে গেলো। না নিজেকে সামলালো আর না তো শাশুড়ি কে এক বিন্দু আটকালো। বোবা প্রাণীকেও আঘাত করা হলে সে আকুতি করে চিৎকার করে নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করে অথচ মেহেরুন যেন সেই শক্তিটাও হারিয়েছে। ওর দুনিয়া বুঝি থমকে গিয়েছে। 
উঠানে রমিছা বানু মেহেরুনের চুল ধরে রেখেছে পাশেই হাফসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। মাকে একটুও আটকানোর চেষ্টা করছে না। এই দৃশ্য দেখে মেহেরুনের চাচি শাশুড়ি দৌড়ে এলেন, 
  "কি গো সিকান্দারের মা তুমি এইগুলা করো কি? ছাড়ো বউরে।"
  "আইজকা আমরে ওই কালনাগিনীরে আমার বাড়ি থেইকা বাহির কইরা দিয়াম। অনেক সহ্য করছি। আর না। ওই মুর্শেদের মাইয়া আমার সংসারডারে ধ্বংস করবো। আমার সিকান্দার... আমার সিকান্দাররে কব্বরে নিবো ওই কালনাগিনী।"
রমিছা বানু হাপাচ্ছেন। হাফসা এবার মাকে সামলাতে গেলো। মেহেরুনের চাচি শাশুড়ি হাফসা কে বেশ ধমকালেন। আরো আগে জানাতে পারতো না? এমন জঘন্য ঝগড়া থামাতে পারতো না? সিকান্দারের চাচিই মেহেরুন কে সামলালো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চুল ঠিক করে দিলো, 
  "আহারে সরল সোজা পাইয়া বউডারে এক্কেবারে শেষ কইরা দিতাছে।"
হাফসা রমিছা বানু কে নিয়ে ঘরে চলে গেলো। মেহেরুন নিস্তেজ পাথরের মতো জমে দাঁড়িয়ে রইলো। ওকে দেখলে মনে হবে এক টুকরো কাঠের কন্ড। যার ভিতরে প্রাণের ছিটেফোঁটা নেই। 
  "বউ তুমি নাও দিয়া চুপচাপ ঘরে শুইয়া থাহো গা। সিকান্দার বাড়ি আইলে একটা ব্যবস্থা হইবো। রাগের মাথায় কিছু কইরো না মা। চুপচাপ ঘরে গিয়া শুইয়া থাকো। সিকান্দারের মায়ের আইজকা কি হইছে কে জানে? বেশি ছিট ওঠছিলো বোধহয় মাথায়। কিন্তু হেয় কামডা এক্কেবারে ঠিক করে নাই। তুমি ঘরে যাও মা।"
চাচি শাশুড়ির কোনো কথা মেহেরুনের কানে ঢুকলো কিনা বুঝা গেলো না। ও না তো কিছু বলল আর না তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো। চাচি শাশুড়ি যেতেই মেহেরুন মাটির বারান্দায় থম মেরে বসলো। যেন এক খন্ড পাথরের টুকরো বসে আছে। 
বেলা গড়িয়ে বিকেল হলো। মেহেরুন সেই যে বারান্দায় বসেছে সারাদিনে এই জায়গা থেকে একটুও নড়েছে। প্রাণহীন পাথরের মতো ওখানেই বসে রইলো পথের দিকে তাকিয়ে। সারাদিনে শাশুড়ি না হয় হাজারটা কথা বলেছে। তাকে কটু কথা বলে গালাগালিও করেছে, বিদ্রূপ করেছে। কিন্তু মেহেরুন টু শব্দটিও করেনি। যেন ওর মুখের সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। পাথরের মতো নির্জীব নিষ্প্রাণ চোখে কেবল তাকিয়ে ছিলো সড়কের দিকে। 
আছরের আযান শুনে মেহেরুন ঘর থেকে বোবা প্রাণীর মতো কাপড় নিয়ে পুকুড়ে নাইতে গেলো। ওদিকে শাশুড়ি চিৎকার করে,
  "বড়লোকের দেমাগি মাইয়ার কি মরণের শোকে ধরছে? বোবার মতো বইয়া আছে ক্যান? বেলা গড়াইতাছে। রান্ধন বারণ লাগবো না নাহি? না আমগোরে উভাস রাখবার চিন্তা করছে কালনাগিনী ডা?"
মেহেরুন সব শুনেও জবাব দিলো না। চুপচাপ গোসল সারল। রমিছা বানু বাঁকা চোখে তা দেখে চলে গেলো। ভাবল গোসল দিয়ে এসে রান্না বসাবে। 
কিন্তু উনাকে আশাহত করে মেহেরুন গোসল করে বারান্দার দড়িতে ভেজা কাপড় গুলি মেলে দিয়ে চুপচাপ ঘরে চলে গেলো। গিয়েই দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো ও। মেহেরুন কে দরজা লাগাতে দেখে বাহির থেকে রমিছা বানুর চড়া গলা শুনা গেলো। 
  "অপয়াডা ভাবছে কি? দরজায় খিল দিছে ক্যা? কি বুঝাইছে আমারে? রান্ধা বাড়া করবো না? আইজকা আহুক খালি আমার পোলা। এর একটা বিহিত না কইরা আমি শান্তি হমু না। হয় এই মুর্শেদের অলক্ষ্মী মাইয়া থাকবো এই বাড়িত নাইলে আমি।"
শাশুড়ি বাড়ি মাথায় তুলে নিচ্ছে মেহেরুন রান্না না করে শুয়ে পড়েছে বলে। মেহেরুনের বাপ মা কে নিয়েও টুকটাক কথা বলছে আবছা শুনতে পাচ্ছে মেহেরুন। কিন্তু কিছুই আর না বলে চুপচাপ কাত হয়ে শুয়ে থাকলো ও। 
বউ কে বকতে বকতেও যখন রমিছা বানু দেখলো মেহেরুন দরজা খুলল না তখন না পারতেই তিনি মাগরিবের আগে নিজেই রান্না বসাতে গেলেন। মুর্শেদের মাইয়ার এই প্রথম এত বড় আস্পর্ধা তিনি মানতে না নারাজ। মেয়ে ঘরে একটা ছেলে সারাদিন পর বাড়ি ফিরবে। ভাত না পেলে কিভাবে কি হয়? ঘরে কিছু নেও। তাই বাহিরে পাতা শুকনা পাতা দিয়ে তিন পট চাল আর আলু সিদ্ধ বসিয়েছে এক সাথে। মরিচ ঢলে গরম ভাতের সাথে আলু দিয়ে খেয়ে ফেলবে। 
একদিন এক বেলা একটু আলু সিদ্ধ ভাত করে রমিছা বানুর মুখ আর থামে না। ওদিকে রাত প্রায় নয়টার দিকে সিকান্দার বাড়ি ফিরলো। ওর চোখমুখ বড্ড করুন আর ক্লান্তিতে কালো হয়ে আছে। ঘরে ঢুকেই দেখতে পায় মেহেরুন চুপচাপ কাত হয়ে শুয়ে আছে। সিকান্দার এক পলক দেখে বের হয়ে গেলো। কল চাঁপিয়ে পানি বের করে গপগপ করে শরীরে পানি ঢালল। একটু পর ফিরে এসে দেখলো মেহেরুন এবার বসে আছে। চোখমুখ বড্ড শীতল থমথমে হয়ে আছে। 
উদোম শরীরে কেবল মলিন লুঙ্গি পরনে। ভেজা গামছাটা দিয়ে চুলের পানি মুছে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখল। বাঁকা চোখে মেহেরুনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 
  "কি হইছে? এমনে বইয়া আছোস ক্যান?"
মেহেরুন একটা জবাব দেয় না। বরফের খন্ডের মতো শুধু বসে থাকে। 
  "কিরে কি জিগাই তোরে আমি?"
এবারও মেহেরুনের জবাব আসে না। সিকান্দার আর চুপ করে থাকতে পারে না। হাতে টাকা পয়সা নাই। এর উপর মায়ের সারাক্ষণ অভিযোগ লেগেই থাকে মেহেরুন কে নিয়ে। পূর্ব রাগ ক্ষোভের কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। ইদানীং তিনি উৎপাত শুরু করেছেন মেহেরুন কে বিদায় করা নিয়ে। এই এক যন্ত্রণা। অভাবে মেজাজ গরমে সিকান্দার বউয়ের সাথে করা খ্যাঁট খ্যাঁট আচরণে নিজেই অন্তঃদহনে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। এত সব কিছু তার আর ভালো লাগে না। বউয়ের এই নিস্তেজ মুখ আর সইতে না পেরে সিকান্দার বিছানায় গিয়ে ওর পাশে বসে। কোলের উপর থাকা মেহেরুনের হাত দুটি ছুঁয়ে দেওয়ার আগেই মেহেরুন ছিটকে নিজের হাত সরিয়ে নিলো, 
  "ছুঁইবেন না আমারে..."
মেহেরুনের লাল চোখমুখ দেখে সিকান্দার থমকে যায়। ও খানিক চিন্তিত মুখে কপাল কুঁচকে তাকায়। 
  "কি হইছে মেহেরুন? খুইল্লা কো আমারে বউ।"
সিকান্দার হাত বাড়িয়ে মেহেরুনের বাহু ছুঁতে গেলেই ছিটকে দূরে সরে এলো মেয়েটা। ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়ল বিছানা ছেড়ে। এবার বুঝি মেয়েটা অগ্নিগিরির মতো ফাটলো। শান্তশিষ্ট সরল মেয়েটা বিক্ষিপ্ত ভাবে চিৎকার করে ওঠল, 
  "কি হইছে জানতে চান? জানতে চান কি হইছে? আমনে আমারে চোখে দেহেন? বিয়ার আগের প্রেম ভালোবাসা আমনের এহন কই গেছে সিকান্দার ভূঁইয়া? যেই বেডা আমি একটু দুঃকু পাইলে আহ উহ করতো হেয় বেডা এহন আমারে চোহেও দেহে না। একটা বাচ্চাই আমনের লাইগা সব? বাচ্চা দিবার পারি না বইলা আমনের সব ভালোবাসা পালাই গেছে? এহন আর মানুষ বইলা মনে হয় না আমারে? ওঠতে বইতে সারাক্ষণ খ্যাঁচখ্যাঁচ করেন। আইজকাল দুই একটা চড় দিতেও আমনের হাত কাঁপে না। এতেও কি শান্তি হয় না আমনের মার? নাকি তিনি চায় দিন রাইত খালি আমনে আমারে মারেন। এর উপরে আমনের মায়ের তো আছেন কথা। আমনেরে ভালোবাইসা বাপের ঘর ছাড়ছি এইডাই কি আমার অপরাধ? আমার জীবনের কাল? আমনে কি শুনবার চান আর? আমনের মা আইজকা আমারে মারছে এইডাই শুনতে চান? আমনের মা আমার চুলের মুঠি ধইরা আমারে বাহির কইরা দিবার চাইছে। এইডাই শুনবার চান? কি কমু আমি? আর কি খুইল্লা কইতে হইবো আমার?"
মেহেরুন চিৎকার করে কেঁদে ওঠল। কাঁদতে কাঁদতে ও মাটিতে বসে পড়ল। সিকান্দার দাঁতে দাঁত কটমট করে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে সে আসলে জানতো না। বিকেল বেলায় চাচাতো ভাই মকবুল শুধু উড়ো খবর দিয়েছিলো মেহেরুন আর রমিছা বানু ঝামেলা করেছে। সামান্য ভেবেই সিকান্দার আর আসেনি। দোকানে মাল নেই, বেচাকেনা নেই, হাতে টাকা নেই ঘরে বাজার নেই। সব মিলিয়ে ভীষণ মেজাজ খিটখিট করছিলো ওর। তাই ইচ্ছে করেই আর বাড়ি ফিরেনি। কিন্তু মায়ের এই বাড়াবাড়ি কান্ড ভাবতেও পারেনি সিকান্দার
খাটের কোণায় মেহেরুন মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদছে। পাশে ঘর থেকে মায়ের শব্দও আসছে। সিকান্দার বাঁকা চোখে একবার কান্নারত মেহেরুন কে দেখলো। বউ কে কোনো কিছু না বলেই থমথমে মুখে এগিয়ে গেলো পাশের ঘরে। 
 ছেলেকে আসতে দেখে রমিছা বানু মুখ ফিরিয়ে নিলেন, "আমার ঘরে আইছোস ক্যান পুত? তোর বেডি দেখলে গাল ফুলাইবো। নাকি বেডির কথায় মারে গালমন্দ করবার আইছোস?"
মায়ের ত্যাঁছড়া কথায় কোনো জবাব দিলো না সিকান্দার। উল্টো গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলো, "কি হইছে আম্মা?"
  "কি হইছে হুনছোস না? তোর বউ যে বেডাগো লাহান চিল্লাইয়া সাত পাড়া হুনাইয়া কইছে হেইডা হুনছোস না তুই?"
  "তোমারে জিগাইছি আম্মা। কি হইছে তোমার মুখ থেইকা শুনি। কো কি হইছে?"
রমিছা বানু নড়েচড়ে বসে সময় নিয়ে বলল, "তোর বেডি আমার ঝি এর জামাত ঝুডা পানি ফালাইয়া দিছে। হেইডা কইছি না তে দোষ করছি আমি। আমার মুহে মুহে কথা শুরু করছে। আমি নাকি মিছা কতা কইছি। আমার সাথে তর্ক শুরু কইরা দিছে। রাগে একটা চড় দিছি খালি।"
  "তোমার কাছে পড়ে আইতাছি আম্মা। আগে তোমার ঝি রে ডাক দাও।"
  "ক্যান? আমার ঝি আইবো ক্যান? আমার ঝি কিছু করে নাই। হেরে যদি খালি একটা কতা হুনাইবি তাইলে খবর আছে কিন্তু সিকান্দার। তোর বউরে রাগের মাথায় একটা মারছি হের লাইগা ফাঁস দিলে আমারে দে। আমার ঝি রে ডাকবি না।"
মায়ের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সিকান্দার। চিৎকার করে হাফসাকে ডাকতে লাগল ও। ভেতরের ঘর থেকে হাফসা এগিয়ে এলো। মাথা নিচু করে ভীতু মুখে দাঁড়ালো ভাইয়ের সামনে। 
  "কি হইছে তোর জামার? নিয়া আয়।"
  "ভা..ভাই..."
  "যা কইতাছি হেইডা কর।"
ভাই এর ধমকে হাফসা কেঁপে ওঠল। ওদিকে রমিছা বানু গলা ছেড়েছেন। উনার মেয়েকে সিকান্দার বকলে ওই মুর্শেদের মেয়েকে তিনি ঘর থেকে বের করবেন।
কাঁপতে কাঁপতে হাফসা জর্জেটের সাদা গোলজামা টা নিয়ে এলো। কোনো কথা না বলেই সেটা এগিয়ে দিলো ভাইয়ের দিকে। ভাইকে ও ভীষণ ভয় পায়। মুখ দেখলেই হৃদয় কাঁপে ভয়ে। ওর সমস্ত শরীর কাঁপছে। 
বোনের হাত থেকে জামাটা নিয়ে ঝোলের দাগের দিকে গভীর চোখে তাকালো সিকান্দার। তা দেখে রমিছা বানু বললেন, "দেখছোস? এইবার বিশ্বাস হইছে? খালি বউয়ের চাটুকতা করবার আইয়োছ। এইবার নিজের চোহেই দেখ আমার ঝিয়ের জামাডা ওই অলক্ষ্মী কেমনে নষ্ট করছে। অভাবের সংসার। কত কষ্ট কইরা মুরগির ডিম বেইচ্চা টেকা জমাইয়া জামাডা বানাইয়া দিছি। আর কালনাগিনী ডা করছে কি দেখছোস? হের পরেও একটা চর দিছি বইলা তোর বউ নকড়া করছে। হারাডা দিন বারান্দায় সং সাইজ্জা বইয়া আছিলো। রান্ধনের সময় হইতেই বড়লোকের ঝি দেমাগ দেহাইয়া না রাইন্ধা গিয়া শুইয়া পড়লো। খালি তো বউয়ের পক্ষ হইয়া আইয়োছ আমারে কথা হুনাইতে। এহন নিজের চোক্কেই দেখ কি করছে তোর বেডি। সামান্য একটা চড় দিছি বইলা কত দেমাগ। শাশুড়ি হইয়া একটা চড় দিছি হের লাইগা কি হইছে এমন? হেই বাড়ির কলিমের বউয়েরে যে শাশুড়ি ওঠতে বইতে মারে হের বেলায়? হেই বাড়ির বউ কি এত নকড়া ধরে?" 
মায়ের এতক্ষণ দেওয়া লম্বা ভাষণ চুপচাপ শুনলো সিকান্দার। বাঁধ্য ছেলের মতো একটা প্রতিবাদও করলো না। ছেলেকে থম মেরে ঝোলের দাগের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রমিছা বানু একটু স্বস্তি পান। যাক ছেলে তার কথা বুঝেছে। 
রমিছা বানু কে হতবাক করে দিয়ে সিকান্দার অভাবনীয় এক কাজ করে বসল। তাতে রমিছা বানু নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। চটাস করে এক শব্দ হওয়ায় মাটির ঘরটাও বুঝি কেঁপে ওঠল। রমিছা বানু চোখ বড় করে আঁতকে ওঠে ছোট্ট ঘরে হারিকেনের হলদে টিমটিম করা আলোয় সেই দৃশ্যের দিকেই তাকিয়ে থাকে। শান্ত স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সিকান্দার আচমকা বোনের গালে ঠাসস করে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে। 
চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন