#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মীদ
৭.
⛔(যেকোনো প্রকার ভুল পেলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন)
হলুদ সন্ধ্যার উৎসবমুখর কোলাহল তখনো চারপাশের বাতাসে ভাসছে।সন্ধ্যায় আবার নতুন করে শুরু হয়েছে সেই হলুদের মাতম। রঙে-রূপে চারপাশ রঙিন, গান আর নাচের ছন্দে মেতে উঠেছে সবাই।এই আনন্দোৎসব যখন শেষ হলো, রাতের আকাশ তখন অনেকখানি গভীরে নেমে গেছে।
রুশদীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল। রিসোর্টে আসার পর থেকে দিন তার কীভাবে কেটেছে, সে নিজেই জানে না। সত্যিই কি তার বিয়ে হচ্ছে? ছোটবেলা থেকে সে দেখে এসেছে, বিয়েতে মেয়ের বাড়ির লোকজনের কত রকম ব্যস্ততা থাকে, বাবারা মাথায় কত শত দায়িত্ব নিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়ান। অথচ তার এই বিয়েতে নিজের বলতে কোনো আত্মীয় পাশে নেই, নেই বাবার সেই চিরচেনা দায়িত্বশীল হাতটুকু। রেজাল্টে আসার পর থেকে বাবার দেখাও মেলেনি। নিজের একমাত্র মেয়েকে হলুদের ছোঁয়া দিতে আসেন নি তিনি।এতই তার ব্যস্ততা ! একটু সময়ের জন্য এসে মেয়ের গালে আলতো করে হলুদ ছুঁইয়ে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো? রুশদী নিজের মনকে শক্ত পাথরের মতো বেঁধে ফেলল। কাল বিয়ে, তার পরদিনই সে চলে যাবে সম্পূর্ণ এক অচেনা, অন্য বাড়িতে। বাপের বাড়ির মানুষের প্রতি এতটা মায়া জমিয়ে রাখতে নেই।
রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে উৎসবের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এলো। রুশদী আর তিথি একসঙ্গে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রুশদীর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ভেবে নাহিদের মনটা বড্ড খারাপ। ছোট ভাইয়ের মন ভালো করতে রুশদী আর তিথি মিলে কিছুক্ষণ তার সাথে লুডু খেলল, হাসাহাসি করার চেষ্টা করল। একসময় নাহিদের চোখে ঘুম নেমে এলে সে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। তার চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পর তিথি আর রুশদীও শুয়ে পড়ল।
পুরো ঘরজুড়ে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। রুশদী শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছে। জীবনটাকে নিয়ে সে ভাবছে—জীবনের না-মেলা সব জটিল অংকগুলো যেন আজ রাতে মেলানোর এক অক্লান্ত চেষ্টা তার। তিথি পাশেই শুয়ে ছিল, অন্ধকার ভেদ করেও সে বুঝতে পারছিল রুশদীর ভেতরের এই অস্থিরতা। প্রিয় বান্ধবীর জন্য তার মনের ভেতর আকাশসম ভালোবাসা জমে আছে। রুশদীকে সে নিজের আপন বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম দেখে না। সেই রুশদীর জীবনে কোনো অমঙ্গল আসুক, তা তিথি কোনোদিনই চাইতে পারে না।
অন্ধকার ঘরটার নীরবতা ভেঙে তিথি ডাকল,
"রুশদী!"
"হুহ!" রুশদী যেন নিজের ভাবনার জগৎ থেকে খানিকটা চমকে উঠে সাড়া দিল।
"তুমি খুশি তো রে?"
প্রশ্নটা রুশদীর বুকে তিরের মতো বিঁধল। সে বেশ চমকে উঠল। মেয়েটা হুট করে এমন প্রশ্ন কেন করল? নিজেকে সামলে নিয়ে রুশদী পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
"অখুশিই বা হব কেন?"
তিথি রুশদীর দিকে ঘুরে শুয়ে কিছুটা আকুল গলায় বলল,
"তুই এই বিয়েতে রাজি কেন হলিরে? তুই না বললি তুই বিয়ে করবি না? তাহলে হঠাৎ কীভাবে মত দিয়ে দিলি? আর চেয়ারম্যান স্যার... সরি, দুলাভাইয়ের যে আগের একটা ছেলে আছে, তাকে তুই মন থেকে মেনে নিয়েছিস তো? এসব নিয়ে পরে যদি তোকে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়!"
রুশদী ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তিথির দিকে ঘাড় কাত করে তাকাল,
"আমি বিয়েটা করছি, তার পেছনে বেশ কয়েকটা কারণ আছে সত্যি। তবে একটা মূল কারণ আছে। জানিস সেটা কী?"
"কী?"
"শের।"
"শের? দুলাভাইয়ের ছেলে?"
"হুম।এই সমাজ, এই পুরো পুরোনো দুনিয়াটা বলে সৎ মায়েরা নাকি সবসময় খারাপ হয়। সৎ মায়েরা কোনোদিন তাদের সৎ সন্তানদের ভালোবাসতে পারে না। যার জ্বলন্ত প্রমাণ আমি নিজে, আমার নিজের জীবন। কিন্তু তিথি, আমি এই চেনা নিয়মটা, এই ধারণাটা বদলে দিতে চাই। আমি প্রমাণ করতে চাই যে সৎ মায়েরা অবহেলা নয়, বুক উজাড় করে ভালোবাসতেও জানে। শুধু তার জন্য একটা সুন্দর মন থাকতে হয়।আমি সৎ মা হয়েও পুরো দুনিয়াকে দেখিয়ে দেব যে নিজের গর্ভের সন্তান না হলেও তাকে কতটা ভালোবাসা যায়। আমি জীবনে কখনো সৎ মায়ের ভালোবাসা পাইনি, সেই কষ্টটা আমি জানি। তাই শের-কে আমি একজন সৎ মায়ের সর্বোচ্চ ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখব।"
তিথি বলো কি তাকিয়ে রইল বান্ধবীদের।এতকিছু ভেবে বিয়ে করছে ও?"
ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে রুশদীর ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। এই মাঝরাতে এমন কর্কশ আওয়াজে দুজনেই চমকে উঠল। রুশদী চরম বিরক্তি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একটা অচেনা নাম্বার। রাত দুটো বাজে এখন! এই অসময়ে কে ফোন করতে পারে? কোনো জরুরি বিষয় হতে পারে ভেবে রুশদী কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল,
"হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে একটা ভীষণ গম্ভীর ও ভারী পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
"আমি! আপনার হবু বর, শারফারাজ খান!"
এত রাতে এই লোকটার ফোন আসবে, তা রুশদী
কল্পনার বাইরে ছিল। সে বেশ অবাক হলো। কী এমন প্রয়োজন হতে পারে যে মাঝরাতে ফোন করতে হলো? রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে শীতল গলায় বলল,
"জি, বলুন।"
"বাইরে আসতে পারবে?"
"জি?"
"বাইরে আসতে পারবে একটু? কথা আছে।"
"যা বলার ফোনেই বলুন।"
"সামনাসামনি কথা বলাটা প্রয়োজন বলেই বলছি।"
রুশদী ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,
"এত রাতে আমি বাইরে বের হতে পারব না। দুঃখিত, আমি শুয়ে পড়েছি।"
"বিয়ের আগের দিন রাতে হবু বউয়ের শোবার ঘরে যাওয়াটা মোটেও ভালো দেখায় না। নয়তো আমি নিজেই আসতাম। পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি তোমাকে, তোমার রুমের পাশের সুইমিং পুলটার কাছে এসো। আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে আছি।"
"আমি বের হব না!আপনার জরুরি কিছু বলার থাকলে ফোনেই বলুন, নয়তো কাল সকালে বলবেন। আমি রাখছি, ঘুমাব।"
"দরজা খোলো।"
"কী?" রুশদী স্তম্ভিত।
"তোমার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি
আমি। দরজা খোলো। কথা আজ, এখনই বলতে হবে।"
ফারাজের এমন ধৃষ্টতায় রুশদী রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল।রুমে এই লোকটাকে ঢুকতে দেওয়ার চেয়ে বাইরে যাওয়া ঢের ভালো। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
"পুলের সামনে যান। আমি আসছি।"
ফোনটা কেটে দিয়ে রুশদী মনে মনে গাল দিল। এই লোকের মাথায় কী চলে কে জানে! আগামীকালই তাদের বিয়ে, তবে এই মাঝরাতে এমন করার কী দরকার ছিল? রুশদীকে বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছাড়তে দেখে তিথির ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
"কী রে, দুলাভাই নাকি?"
"দুনিয়ার সবচেয়ে খবিশ লোক একটা!" রুশদী গায়ের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে ফুঁসে উঠল।
"বাহ্! কী রোমান্টিক টাইম স্পেন্ড করতে যাচ্ছিস বেবি এই মাঝরাতে!"
"চুপ কর! জুতো দিয়ে পিটাব তোকে এসব ফালতু কথা বললে!"
রুশদী নিজের সমস্ত তেজ দেখিয়ে রুম থেকে হনহন
করে বের হয়ে গেল।
কক্ষসংলগ্ন ছোট সুইমিং পুলটার দিকে এগোতেই রাতের হিমেল হাওয়া তার গায়ে লাগল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক নিস্তব্ধ রাতটাকে আরও গভীর করে তুলেছে। পুলের স্বচ্ছ জলে অন্ধকারের জোনাকি পোকাদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। রুশদী একটু তাকাতেই দেখল, পুলের এক পাশে একটা দীর্ঘ ছায়ামূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুশদী সাবধানে সেই আবছা অন্ধকারের ভেতর পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেল এবং লোকটার থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল।
তার চোখেমুখে তখন বিরক্তির চরম সীমা। সে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
"কী এমন কথা যা আপনার এখনই বলতে হবে? দিনের বেলা মনে ছিল না? রাত দুটো বাজে এখন,আপনার ইম্পোর্টেন্ট কথা মনে পড়েছে? যা বলবেন দ্রুত বলুন!"
ফারাজ কোনো কথা না বলে বেশ কিছুক্ষণ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নীরবতা রুশদীর ভেতরের বিরক্তিটাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে রুশদী চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
"কিছু বলবেন নাকি আমি রুমে যাব?"
ফারাজ ধীর শান্ত ভঙ্গিতে রুশদীর দিকে মুখ ফিরাল। সে সোজা রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,"দেখো, আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি। আর আমি জানি, তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ও জ্ঞানী একটা মেয়ে। তাই তোমাকে সরাসরিই বলছি। শের শুধু আমার সন্তান নয়, ও আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমার পুরো দুনিয়াটা ওকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। একদম ছোটবেলা থেকে, যখন ও একদলা নরম মাংসের পিণ্ড ছিল, তখন থেকে আজ অব্দি ওর প্রতিটি মুহূর্তের সাথে আমার পথচলা। ওকে অনেক যত্ন আর ভালোবাসায় আমি একলা বড় করেছি। আমার ছেলেকে যদি কেউ পছন্দ না করে, তবে সে আমার যত কাছের মানুষই হোক না কেন, তার সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে আমি দুই সেকেন্ডও ভাবব না।আমার ছেলের সবচেয়ে আপন মানুষ হলাম আমি। ওর পৃথিবীটা আমাকে ঘিরেই। ও আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। আমি বাসায় না ফিরলে ও না খেয়ে বসে থাকে। কালকের পর থেকে তুমি হবে আমার দুনিয়ার অর্ধেক, আর বাকি অর্ধেকটা জুড়ে থাকবে শুধু শের। তোমার প্রতি শের-এর অনেক বেশি প্রত্যাশা। ও একটা মা চায়। তোমাকে যেদিন দেখতে যাব, তার আগের দিন আমি ওকে জানিয়েছিলাম যে ওর জন্য আমি মা দেখতে যাচ্ছি। বিশ্বাস করো, ও যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিল! এত খুশি ওকে আমি কখনো হতে দেখিনি। ওর কাছে 'মা' শব্দটা বড্ড বেশি দামি, বড্ড পবিত্র। কাউকে এই নামে ডাকতে পারেনি।তোমাকে দেখে ও বড্ড খুশি হয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, তুমি কি ওর সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে? তুমি কি খান বাড়ির বউ হওয়ার পাশাপাশি আমার ছেলের মা হতে পারবে,রুশদী?"
রুশদী ঠিক বুঝে উঠতে পারল না—ফারাজ কি তাকে প্রস্তাব দিল, নাকি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে চাইল? যেটাই হোক না কেন, ফারাজের এমন কথার ধরন রুশদীকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দিল।
"আমার কথাগুলো শুনে যদি তোমার এখন মনে হয়ে থাকে যে আমার সাথে সংসার করা তোমার পক্ষে সম্ভব না, কিংবা তুমি এসব মেনে নিতে পারবে না—তবে এখনই পরিষ্কার বলে দাও, রুশদী। আমি কালকের বিয়েটা ভেঙে দেব। কিছুদিন আগে তুমি নিজে এই বিয়ে ভাঙার প্রস্তাব তুলেছিলে, তখন আমিই না করেছিলাম। কিন্তু আজ আমি তোমাকে শেষবারের মতো বলছি—ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলো। বিয়েটা কি ভেঙে দেব?"
ফারাজের মুখে বিয়ে ভাঙার কথা শুনে রুশদী একটু চমকে গেলেও নিজের ভেতরের শক্ত ভাবটা বজায় রাখল।
"মোরাল অব দ্য স্টোরি, আপনি কি ঘুরিয়ে-পেচিয়ে এটাই জানতে চাচ্ছেন যে আমি বিয়ের পর সেই চেনা, অত্যাচারী সৎ মা হব, নাকি শের-এর জন্য একজন ভালো মা হতে পারব?"
ফারাজ এক মুহূর্ত চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মৃদু স্বরে বলল, "আমি যতই ঘুরিয়ে-পেচিয়ে ভদ্র ভাষায় বলি না কেন, আমার কথার আসল অর্থ এটাই দাঁড়ায়।
"না, আমি আপনার ছেলেকে কখনো মানতে পারব না! সত্যি কথা এটাই—আমি পারব না অন্যের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে সংসার চালিয়ে যেতে। ক্রিটিকাল সৎ মা না হলেও আমি ওর জন্য আপন কেউ হতে পারব না। আমার বয়সই বা কত! এতসব মানিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না!"
রুশদীর মুখ থেকে হুট করে বের হওয়া এই কথাগুলো যেন তিরের মতো এসে বিঁধল ফারাজের বুকে। মনে হলো, কেউ তার বিশ্বাসটাকে খুব ভয়ঙ্করভাবে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে চুরমার করে দিল। বুকের বাঁ পাশটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল।কষ্টগুলোকে মুখ বুজে সহ্য করে নেয়। রুশদীকে সে মোটেও এমন নিচ মনমানসিকতার মেয়ে ভাবেনি। দিনশেষে তার এত বড় বিশ্বাসটা আজ কত নৃশংসভাবে ভাঙল! ফারাজ গোপনে একটা বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যেশ্বাসের সাথে যেন তার বুকের ভেতরের সবটুকু বাতাস বেরিয়ে গেল। সে বাকরুদ্ধ হয়ে, শূন্য দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইল রুশদীর দিকে। তার কেবলই মনে হতে লাগল—এবারও সে মানুষ চিনতে মস্ত বড় ভুল করল!
ফারাজকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুশদী তার চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে সশব্দে হেসে উঠল। তারপর বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলল, "ওহ্ হ্যালো মিস্টার! আপনি কি আমার মুখ থেকে এসব সস্তা বাংলা সিনেমার ডায়লগ শুনতে এসেছেন নাকি? আপনার কীভাবে মনে হলো আমি একটা অত্যাচারী সৎ মা হতে পারি? আমার নিজেরই তো নিজেকে তেমন ভাবতে কেমন যেন লাগছে! মাথার স্ক্রু কি সবকটা ঢিলে হয়ে গেছে আপনার? আপনার কী মনে হয়, আমি আমার লাইফ নিয়ে ফান করছি? কোনো কিছু না ভেবে এমনি এমনি আপনার সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি?আপনার একটা ছেলে আছে, একটা ফ্যামিলি আছে, আর বিয়ের পর আমাকে ঠিক কী কী দায়িত্ব পালন করতে হবে—সেসব না জেনেই কি আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি? এত ঢিলে ব্রেইন আমার? আর বিয়ে ভেঙে দেবেন মানে কী? আপনি কি বাংলা সিনেমার বড় ফ্যান নাকি, যে কথায় কথায় এমন ইমোশনাল ডায়লগ ছাড়েন? আপনার এই রাত দুটো বাজে এমন আজাইরা প্যাঁচাল পারার জন্য আমাকে ডেকে আনার কোনো মানে হয়? শুনুন ভাই, আপনার মুখের ওপর একটা কথা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি—আপনাকে আমার মোটেও পছন্দ না! বিয়ের পর আপনার ভালো বউ না হতে পারলেও, শের-এর একজন আদর্শ মা আমি ঠিকই হব। ম্যানারলেস খাম্বা কোথাকার!"
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে রুশদী একটু থামল।দম নিয়ে বলল,
"সারাদিনের ক্লান্তির পর একটু শান্তিতে বিছানায় শুয়েছিলাম, অমনি আপনার ডাক চলে এলো! দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে যান, তাহলে আর এসব ফালতু আর আজাইরা কথাবার্তা মাথায় আসবে না। ঘুমান মিয়া, এবার ঘরে যান!"
ফারাজকে নিজের বকতে বকতে বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে সে হনহন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল রুশদী। হাঁটতে হাঁটতে তার মনের ভেতরের রাগটা যেন আরও চড়চড় করে বাড়ছিল। এই লোকটার কীভাবে মনে হলো যে সে একটা অত্যাচারী সৎ মা হবে? তাকে দেখলে কি কোনো দিক থেকে তেমন মনে হয়? ছি!মেজাজ টাই চটকে দিল এই লোক।
ফারাজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটি এতক্ষণ ধরে যে ঝড়ের বেগে কী কী বলে গেল, তার প্রায় সবকিছুই ফারাজের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। এতগুলো কথার একটি বাক্যও সে নিজের মস্তিষ্কে ঠিকঠাক মেলাতে পারছে না। তবে সব কথার ভিড়ে কেবল একটিমাত্র বাক্য ফারাজের অবচেতন মনে গভীর দাগ কেটে বসে গেছে, বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—"আমি আপনার ভালো বউ না হতে পারলেও, শের-এর ভালো মা হবো!"
—০—
আজ পবিত্র শুক্রবার, জুম্মার দিন। এই পবিত্র দিনে রুশদী তার জীবনের এক নতুন আর পবিত্র অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এই দিনটি আসে একরাশ স্বপ্ন আর পাহাড় সমান ভয় নিয়ে। ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো পেছনে ফেলে এক অজানা ঠিকানায় নিজের অস্তিত্ব গেঁথে দেওয়ার নামই তো বিয়ে।
সময় গড়িয়ে তখন দুপুর বারোটা।রিসোর্টের সুসজ্জিত কক্ষে রুশদীকে সাজাতে বসেছেন মেকআপ আর্টিস্ট। জুম্মার নামাজের পরপরই নিকাহ্ পড়ানো হবে। তিথি নিজে ঝটপট সেজে নিয়ে এখন রুশদীর পাশে ছায়ার মতো লেগে আছে। তার উৎসাহ যেন বাঁধ ভেঙেছে। আর্টিস্ট যেই না রুশদীর চোখে আইশ্যাডো ছোঁয়াতে গেল, অমনি তিথি কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
"আরে আপু, এটা এভাবে না, একটু স্মোকি করে দিন না! রুশদীর চোখ দুটো এমনিতে হরিণীর মতো, বেশি গাঢ় করলে মানাবে না।"
মেকআপ আর্টিস্ট বেচারি একবার তিথির দিকে তাকায়, আবার মেকআপ ব্রাশের দিকে।রুশদী আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল। ও জানে তিথি এমনও। ওর প্রতি ভালোবাসার আধিক্যেই তিথি এমন পাগলুমি করে।মেকআপ আর্টিস্ট বিরক্ত হচ্ছে বুঝে রুশদী তিথিকে এক ধমক লাগালো,"এই তুই থাম তো!আপু, আপনি আপনার মতো সাজান। আর তিথি, তুই চুপচাপ সোফায় গিয়ে বস। কোন কথা বলবি না। "
রুশদীর শান্ত ধনক শুনে তিথি ঠোঁট উল্টে এক কোণে গিয়ে বসল।
—০—
রুশদী রুমে রুশদী তখন একা।মেকআপের সরঞ্জাম আর ফুলের সাজ সব পড়ে আছে একপাশে।তিথি কোনো প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছে।রুশদী একা বসে আছে বড় বিছানাটার ঠিক মাঝখানে পরনে লাল লেহেঙ্গা,দুহাত ভর্তি স্বর্ণের চুড়ি আর ঝুমকা।গয়নার ভারে ঘাড় নুইয়ে আসছে তার।ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল নাহিদ।
নাহিদ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে রুশদীর পাশে বসল। ওর মাথাটা নিচু, দৃষ্টি মাটির দিকে স্থির।বড় বোনের বিয়ের দিনে ভাইয়ের বুক ফাটা হাহাকার করছে।রুশদী বুঝল, তার কলিজার টুকরো ভাইটার আজ মন ভালো নেই। যে বোনটার সাথে সারাদিন দুষ্টুমিতে মেতে থাকতো, একটু পরেই সে অন্যের ঘরের লক্ষ্মী হয়ে চলে যাবে।এই শূন্যতা নাহিদ সইবে কী করে?
রুশদী আলতো করে নিজের এক হাত নাহিদের কাঁধের ওপর রাখল।রুশদী নাহিদের চোখের দিকে তাকাল না, তাকালে হয়তো নিজের বাঁধও ভেঙে যাবে।দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয়ে বলল,
"মুখটা ওভাবে নিচু করে রেখেছিস কেন? বোনটাকে কি একবারও বিদায়-বেলায় প্রাণভরে দেখে নিবি না?"
রুশদী নাহিদের কাঁধে রাখা হাতটায় একটু চাপ দিয়ে নড়েচড়ে বসলো।বলতে শুরু করল,
"নাহিদ, শোন। এখন যে তোর খুব খারাপ লাগছে, বুকটা হাহাকার করছে,এটা আমি জানি। এই খারাপ লাগাটা খুব তীব্র, ঠিক যেন বুকে ধারালো কোনো ছুরির মতো বিঁধছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই অনুভূতিটা খুব বেশিদিন টিকবে না। মানুষ বড় অদ্ভুত জীব রে নাহিদ! আজ আমি চলে যাচ্ছি বলে হয়তো তুই আজ আর কাল ডুকরে কাঁদবি।ছেলে মানুষ বলে হয়তো মুখ লুকিয়ে চোখের জল মুছবি। দু-তিনটে দিন তোর পৃথিবীটা বড় বেশি বিষণ্ণ মনে হবে। তারপর? তারপর দেখবি সময়ের প্রলেপে এই মোহটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে।একটা খুব কঠিন ধ্রুব সত্য কথা বলি,মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোও কি সারা জীবন কাঁদে? না, কাঁদে না। বড়জোর তিন দিন তারা বিলাপ করে। চতুর্থ দিনে গিয়ে নিজের মনকে শক্ত করে নেয়। পনেরো দিন পর পরিবেশ শান্ত হয়, আর মাস খানেক গেলে জীবন আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। দু-তিন মাস পর বিশেষ কোনো উপলক্ষ ছাড়া কেউ সেই মৃত মানুষটাকে মনেও করে না। সেখানে আমি তো আর মরে যাচ্ছি না নাহিদ! আমি কেবল এই বাড়ি থেকে অন্য একটা বাড়িতে যাচ্ছি। আমি তো এই শহরেই থাকব।পরিস্থিতি আর সময়ের সাথে সাথে মানুষের পছন্দ যেমন পাল্টায়, মানুষের আবেগও তেমনি রূপ বদলায়। পরিস্থিতি আর সময়ের সাথে সাথে মানুষের পছন্দ যেমন পাল্টায়, মানুষের আবেগও তেমনি রূপ বদলায়।আজ যে বিচ্ছেদকে তোর পাহাড়সম মনে হচ্ছে, কাল সেটাকেই তোর খুব তুচ্ছ মনে হবে। তাই মিছে মায়ায় চোখের জল না ফেলে বাস্তবতা মেনে নিতে শেখ। যেদিন তুই জীবনকে তার নিজস্ব রূপে গ্রহণ করতে পারবি, সেদিন থেকেই তুই ভালো থাকতে শুরু করবি।আর একটা কথা শোন, তোকে আমি চিনি। তোর মনে কোথাও যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। তুই ভাবছিস, তোর মায়ের আচরণের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে আমাকে এই সময়ে আমি বিয়ে করে নিচ্ছি। একদম না! একদম এই গিলটি ফিলিং মনে পুষবি না। আমাদের সমাজে এই বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়াটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। বরং আমি তো বলব, তোর মায়ের কারণে নয়, পরিস্থিতির খাতিরে আমি আরও ভালো একটা জীবনের দিকে পা বাড়াচ্ছি। সেখানে আমার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, আমি শান্তিতে থাকতে পারব। তাই নিজের মনে বিষাদ পুষে রাখিস না।আর ভাই, এবার একটু থাম তো! আমি মেয়ে যার বিয়ে হচ্ছে,সে-ই কাঁদছি না, আর তুই ছেলে হয়ে এমন ফ্যানফ্যান করে কাঁদছিস কেন? তোর এই কান্না দেখে আমার সত্যি খুব হাসি পাচ্ছে। নিজেকে একটু সামলা, এবার অন্তত একটা চওড়া হাসি দিয়ে তোর আপুকে বিদায় জানা!"
কার কথা কে শোনে! নাহিদ যেন আজ পৃথিবীর সমস্ত বিষাদ একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। নাহিদ তখন হেঁচকি তুলে কেঁদেই চলেছে।ছেলেটা বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ, একদম ফেত কান্দনে যাকে বলে!ভাইয়ের এই কান্নাকাটিতে রুশদীর ধৈর্য যেন এবার বাঁধ ভাঙল। সে কিছুটা ধমকের সুরে,বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলে উঠল,
"কান্না থামা নাহিদ, নাহলে এক চটকা মেরে তোর গালের সবগুলো দাঁত আমি আজ ফেলে দিব! বেয়াদব ছেলে কোথাকার! তোর এই ফ্যানফ্যানানির জন্য আমার বিয়ের ফিলটাই উড়ে যাচ্ছে। এটা কি বিয়ের বাড়ি না কি শ্মশানঘাট? কান্না থামা বলছি!"
নাহিদ বোনের ধমক খেয়ে থমকে গেল ঠিকই, কিন্তু কান্নার তোড় কি আর এত সহজে থামে? সে হেঁচকি তুলে অস্পষ্ট স্বরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,"আ...আ...আইম সরি আপু। আমি আসলে... আমি চাইলেও পারছি না।"
"হপ বেটা! কিসের সরি রে?তোর ওই মেকি সরি-ঠরি আমার লাগবে না। তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস, আর যদি সত্যি আমায় সরি বলতে চাস,তবে আগে এই প্যাঁকপ্যাঁকানি থামিয়ে একটু হাস। তোর এই মুখভরা হাসিটা দেখার জন্য আমার কলিজাটা পুড়ছে। দেখি, চোখ মুছ তো আগে!"
বলেই রুশদী পাশেই থাকা টিস্যু বক্সটা টেনে নিয়ে নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। নাহিদ বাধ্য ছেলের মতো টিস্যু নিয়ে চোখ-মুখ মুছে নিল। বোনের জোরাজুরিতে সে এক চিলতে মিথ্যে হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসির মাঝেও এক অদ্ভুত বিষাদ জড়িয়ে ছিল।
—০—
রিসোর্টের বিশাল উন্মুক্ত মাঠে বিয়ের প্যান্ডেল করা হয়েছে।স্টেজের উপর গম্ভীর্য নিয়ে সোফায় বসে আছে ফারাজ। তার পরনে জমকালো শেরওয়ানি, চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। ফারাজের পাশেই বসে আছে ছোট্ট শের। তার খুশির যেন সীমা নেই!আজকে পার্মানেন্টলি তার একটা মা হবে।আহা কি খুশির ব্যাপার! শেরকে দেখে মনে হচ্ছে, বিশাল ধরণীর বুকে সেই বুঝি আজ সবচেয়ে সুখী মানুষ।
ঠিক তখনই মেহমানদের ভিড় চিরে ধীরলয়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল রুশদীকে।পরনে তার রক্তরাঙা লেহেঙ্গা।মাথায় ভারি কারুকাজ করা দোপাট্টা। ফারাজ খেয়াল করল, রুশদী অন্য কোথাও তাকাচ্ছে না,তার সেই দুই জোড়া চোখের স্থির দৃষ্টি সরাসরি ফারাজের ওপর নিবদ্ধ। ফারাজও পলকহীন তাকিয়ে রইল। রুশদীর সেই দৃষ্টিতে কোনো অনুভূতিই নেই। একদম স্থির, স্বচ্ছ অনুভূতিহীন এক দৃষ্টি।তাদের চার চোখের এই নীরব কথোপকথন চলল দীর্ঘক্ষণ, কেউ দৃষ্টি সরাল না।যেন এই দৃষ্টিবিনিময়ের মাধ্যমেই তারা একে অপরের অস্তিত্বের গভীরতা মেপে নিচ্ছে।
রুশদী যখন স্টেজের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ফারাজ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।ওপর থেকে ঝরঝর করে ঝরতে শুরু করল তাজা গোলাপের পাপড়ি।ফারাজ হাত বাড়িয়ে দিল রুশদীর দিকে। কোনো দ্বিধা বা আপত্তি ছাড়াই রুশদী তার কোমল হাতটি ফারাজের প্রশস্ত হাতের ওপর রাখল।
এই সেই স্পর্শ! প্রথম অনুভব। রুশদীর হাতের আঙুল যখন ফারাজের হাতের তালু স্পর্শ করল, তখন মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গেল। এক অজানা বিদ্যুৎ খেলে গেল দুজনেই রক্তকণিকায়। এই স্পর্শের শিহরণে রুশদীর পা যেন কিছুটা টলে উঠল, আর ফারাজ শক্ত করে সেই হাতটি আগলে ধরল।
স্টেজে বর ও কনের জন্য বসার সোফা আলাদা। দুজনের মুখোমুখি বসেছে। মাঝখানে ঝুলছে একটি ফুলের পর্দা,সুগন্ধি রজনীগন্ধা আর গোলাপের সেই বুনন ভেদ করে অপর পাশের মানুষটিকে আবছা দেখা যাচ্ছে। ফারাজ কিছুটা নড়েচড়ে বসল। তার দৃষ্টি স্থির হলো সামনে বসে থাকা রুশদীর ওপর। রুশদীর পরনে আজ আনজারা ব্র্যান্ডের বিখ্যাত লাল লেহেঙ্গা। কানে, গলায় আর দুহাতে চকচক করছে ভারি স্বর্ণালঙ্কার।
ফারাজ রুশদীর মুখচ্ছবির দিকে তাকাল।ঘোমটাটা নাক অবধি টানা, মাথা নুইয়ে বসে আছে। লাল রঙটা রুশদীর ফর্সা গায়ের রঙে যেন আগুনের মতো জ্বলছে।কলেজ পড়ুয়া সেই চঞ্চল মেয়েটিকে আজ ভীষণ নরম লাগছে।ফারাজের অবাক লাগছে সে সত্যি দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে।দ্বিতীয়বারের মতো কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করছে।দ্বিতীয়বার তার জীবনে আসা এই নারীটির সঙ্গে অন্তত একটা সংসার হোক।সেই সংসারে সুখ থাক।
হঠাৎ কাজী সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ফারাজের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে দিল
"দেনমোহর কত ধার্য করব?"
ফারাজ কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বাক চোখে স্টেজের সামনে বসে থাকা রাইমা খানের দিকে তাকাল। রাইমা খান ধীরপায়ে স্টেজে উঠে রুশদীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। একই প্রশ্ন যখন রুশদীকে করা হলো, সে কোনো টাকা বা গয়নার অংকের দিকে গেল না।ফুলের পর্দা ভেদ করে ফারাজের অস্পষ্ট অবয়বের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর সুরে বলল,
"দেনমোহর হিসেবে আমি ওনার কাছ থেকে শুধু সুন্দর একটি জীবন চাই!"
রুশদীর কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু ছিল যে, স্টেজে থাকা গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া আর কেউ তা শুনতে পেল না। ফারাজ স্তব্ধ হয়ে গেল। আধুনিক এই যুগে, যেখানে দেনমোহরের অংক নিয়ে দরদাম চলে, সেখানে এই মেয়েটি স্রেফ একটা সুন্দর জীবন দাবি করছে? কোনো চাহিদা নে!আসলেই নেই!একটা সুন্দর জীবন চাই শুধু?
রাইমা খান নিজেও বেশ অবাক হলেন।মেয়েটা অন্যদের থেকে আলাদা এরজন্যই তো মেয়েটাকে এত পছন্দ হয়েছে ওনার।তিনি রুশদীর কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, "টাকা, গয়না বা জমির কোনো একটা দাবি বলো। এটা তোমার অধিকার।"
রুশদী ম্লান হেসে রাইমা খানের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, "আমার টাকা বা গয়না লাগবে না।যার কাছে জীবন সঁপে দিচ্ছি, তার কাছে সামান্য কাগজের নোটের দাবি করে কী হবে?"
রাইমা খান বুঝলেন,এই মেয়েকে বুঝিয়ে লাভ নেই, টাকা অংকে সে যাবে না।তাই তিনি নিজে থেকে কাজিকে বললেন,
"দেনমোহর ৫০ লাখ বাঁধুন কাজী সাহেব! "
খুতবা শেষে,কাজী সাহেব রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন,
"পিতা আনাস হকের কন্যা রুমাইসা হক রুশদী, আপনাকে শারফারাজ খান, পিতা শেহজাদ খান-এর সাথে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহে আবদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?রাজি থাকলে বলুন, কবুল।"
রুশদীর এক কাঁধে রাইমা খানের মমতাময়ী হাতের স্পর্শ, অন্যপাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে তিথি।অথচ এই ভিড়ের মাঝেও রুশদীর তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজে ফিরছিল। সে তাকিয়ে দেখল স্টেজের কিছুটা দূরে আনাস হক আর নাহিদা দাঁড়িয়ে আলাপ করছেন। আনাস হককে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বড্ড ব্যস্ত, যেন এই বিয়ের আসরের চেয়ে অন্য কোনো আলোচনা তাঁর কাছে বেশি জরুরি।নিজের মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি চলছে, অথচ বাবার ধ্যান এদিকে নেই!
মুহূর্তেই রুশদীর দুচোখ জ্বলে উঠল। বুক ফাটা অভিমানে চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল তপ্ত নোনা জল। প্রতিটি মেয়ে তার জীবনের এই সন্ধিক্ষণে বাবার কিংবা মায়ের হাতের একটু ভরসা চায়, মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো এক ফালি ছায়া চায়।কিন্তু মা তো পৃথিবীতে নেই, আর বাবা থেকেও নেই।রুশদীর পাশে তার আপন কেউ নেই!আব্বু কি পারতেন না ফরমালিটির জন্য হলেও আজ মেয়ের পাশে এসে তার সাহস হয়ে দাঁড়াতে? রুশদীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিল।
তাকে ওভাবে চুপ করে থাকতে দেখে রাইমা খান নিচু স্বরে তাগাদা দিলেন, "কবুল বলো রুশদী।" পাশ থেকে
তিথিও ভা বলল, "রুশদী, আর দেরি করিস না, কবুল বল।"
রুশদী হাতের মুঠোয় থাকা টিস্যু দিয়ে দ্রুত চোখ দুটো মুছে নিল। কান্নার তোড়ে গলার কাছে একরাশ কষ্ট দলা পাকিয়ে আছে, কোনো শব্দ যেন বেরোতে চাইছে না। সে দুচোখ বন্ধ করে তার মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল
"আ... আলহামদুলিল্লাহ, ক... ক... কবুল।"
কাজী সাহেব বললেন, "আরেকবার বলুন মা, কবুল।"
রুশদী পর্দার ওপাশে ফারাজ এর দিকে এক পলক তাকাল।মানুষটা তার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী হবে তো?যে সুখ খুঁজতে সে বিয়ে করছে,সে সুখ তার কপালে জুটবে তো?লোকটা তাকে সর্বোচ্চ সুখে রাখবে, এই আশাটা সে রাখতে পারে লোকটার উপর? এবার কণ্ঠকে একটু শক্ত করে দুবার উচ্চারণ করল, "কবুল, কবুল।"
এরপর কাজী সাহেব মুখ ফেরালেন ফারাজের দিকে।
"রুমাইসা হক রুশদীকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা মোহরানায় আপনার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; আপনি কি কবুল করলেন?"
ফারাজের স্পষ্ট স্বরে বলল, "আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করলাম।"
"আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম "ফরাজের একথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে নব দম্পতি হৃদয়ে এক অদ্ভুত তরঙ্গ বয়ে গেল।রুশদীর সর্বাঙ্গ এক অজানা শিহরণে থরথর করে কেঁপে উঠল। এই একটি মাত্র শব্দ কবুল বদলে দিল তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব।সে কারো অর্ধাঙ্গিনী হয়ে গেল। তার নবজীবনের সূচনা ঘটল।
তাদের মাঝের সেই সাদা ফুলের পর্দাটি ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হলে,ফারাজের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তার বিবাহিত স্ত্রী রুমাইসা হক রুশদী ওপর। নিজের অজান্তে লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিল ফারাজ।এই লজ্জার কারণ খুঁজে পেলোনা ফারাজ।খানেক আগেও তো এই লজ্জা ছিল না।
ফারাজ আবারও সাহস সঞ্চয় করে তাকাল রুশদীর মুখপানে। চাপা কান্নার ফলে রুশদীর নাক,গাল রক্তিম হয়ে উঠেছে। হাতের মুঠোর টিস্যু দিয়ে সে বারবার চোখ মুছছে। রুশদীর এই রূপের দিকে তাকিয়ে ফারাজের হৃদয়ে এক ভিন্ন অনুভূতি জেগে উঠলো।মেয়েটি এই মুহূর্ত থেকে তার বিবাহিত স্ত্রী।
কাজী সাহেব তখন হাত তুলে মোনাজাত ধরলেন,
"বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফী খাইরিন..."
মোনাজাতে ফাকে রুশদী আড়চোখে একপলক ফারাজকে দেখে নিল। পরক্ষণেই বিদ্যুৎবেগে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল সে। মনের ভেতর তখন এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়! খানিক আগেও যে পুরুষটি তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা কেউ ছিল, এক নিমেষে সে-ই হয়ে গেল তার ইহকালের পরম আশ্রয়, তার জীবনসঙ্গী। আজ থেকে তার নামের শেষে যুক্ত হলো এক নতুন পরিচয় শারফারাজ খানের অর্ধাঙ্গিনী। কথাটি মনে হতেই রুশদীর সারা শরীর এক মৃদু কম্পনে শিউরে উঠল।
কবুল পরার পর অপর মানুষটির জন্য যে শিহরণের তরঙ্গ তাদের অঙ্গ দিয়ে বয়ে গেল এটাই প্রকৃত, ফাস্ট লাভ।
—০—
বিয়ে পড়ানো শেষ হয়েছে খানিক আগেই।রুশদীকে কাঠের পুতুলের মতো স্টেজে বসিয়ে রাখা হয়েছে।চারপাশে গান আর মানুষের শোরগোলের মাঝে হুট করেই কোথা থেকে এসে ছোট্ট শের রুশদীর কোলের ওপর মাথা রেখে ডাকল, “মম!”
পিচ্চি টাকে দেখলেই রুশদী কেন যেন ভীষণ ভালো লাগে।রুশদী শেরের চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল, “হুম?”
শের তার বড় বড় চোখের নিষ্পাপ চাউনি রুশদীর মুখে স্থির করে বলল, “নাও ইউ আর মাই অফিসিয়াল মম, রাইট?”
রুশদী হাসল, “হুম, একদম তাই।”
“তোমার পুরো নাম কি মম?”
“রুমাইসা হক রুশদী। কিন্তু হঠাৎ আমার পুরো নাম জানার এত শখ কেন?”
শের একদম বাচ্চাদের মতো সরল মনে হাসিমুখে বলল, “কারণ, এখন থেকে কেউ যদি আমাকে আমার মম-এর নাম জিজ্ঞেস করে, আমি তোমার নাম বলব। কারণ তুমি এখন থেকে আমার অফিসিয়াল মম! ঠিক আছে না মম?”
বলেই খিলখিল করে হেসে দিল শের। সেই হাসিতে যেন মুক্তো ঝরছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাচ্চার সেই অমলিন হাসিটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র দৃশ্য। শেরের এই ছোট্ট একটা কথা যেন তিরের মতো রুশদীর বুকে বিঁধল। রুশদীর বুকটা এক অজানা মায়ায় টনটন করে উঠল।
রুশদী মুহূর্তেই অনুভব করতে পারল এই পুঁচকেটার করুণ ইতিহাস। হয়তো স্কুলে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কতবার ওকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে'তোমার মায়ের নাম কি?' তখন হয়তো এই নিষ্পাপ মুখটা কালো হয়ে যেত। হয়তো মাথা নিচু করে ভিজে গলায় বলত, ‘আমার মা নেই’। আহারে! কত বড় এক শূন্যতার পাহাড় এই ছোট্ট মনটা একা বয়ে বেড়িয়েছে এতদিন।
রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ঝুঁকে শেরের নাকটা আলতো করে টেনে দিল। বলল,
“অবশ্যই! এটাই বলবে। কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার মায়ের নাম কি, চিৎকার করে বলবে ‘রুমাইসা হক রুশদী’। আর আমার একমাত্র পুঁচকে বাবুটার নাম হলো ‘শেহরান খান শের’। ওকে?”
শের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে দারুণ কায়দায় বলল, “ওক্কে!”
—০—
তিথি একটা বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করছে নাহিদের জন্য। এই কদিনে নাহিদের সঙ্গে ওর বেশ চমৎকার একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। ছেলেটা যেমন চটপটে, তেমনি অমায়িক। তিথি ওকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে। দুজনে মিলে পুরো বিয়েবাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। কিন্তু এখন জুস আনতে গিয়ে নাহিদ যে কোথায় হাওয়া হলো, কে জানে!তার ফিরার নাম গন্ধও নেই।
তিথির এই অপেক্ষার মাঝে , এক পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এল,
“হ্যালো বিয়াইন!”
তিথি ভ্রু কুঁচকে ওভাবেই বসে রইল। সে ভাবল, নিশ্চয়ই অন্য কাউকে ডাকছে। রুশদীর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথে তার তো তেমন সখ্যতা নেই, তাকে আবার বিয়াইন বলে সম্বোধন করার মতো কে আছে? কিন্তু পরক্ষণেই সেই কণ্ঠটা আরও কাছে থেকে শোনা গেল,
“আরে বিয়ান, আপনাকে বলছি!”
তিথি এবার চোখ তুলে তাকাতেই দেখল সামনে শান দাঁড়িয়ে। গতকাল যার সঙ্গে একদফা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া হয়েছিল তার, আজ ৩২ পাটি দাঁত বের করে সে-ই সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে। তিথি বিরক্তও হলো না, আবার খুব একটা আহ্লাদিতও হলো না। নির্লিপ্ত গলায় শুধাল, “জি, বলুন?”
শান কোনো কথা ছাড়াই তিথির থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে বেঞ্চিতে বসে পড়ল। এরপর বেঞ্চের হাতলে এক হাত রেখে তাতে মাথা এলিয়ে দিয়ে একদম সোজাসুজি তিথির চোখের দিকে তাকাল। শানের চোখে আজ অন্যরকম এক ঘোর। চঞ্চল শান মুহূর্তেই যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেল। নিজের গলার স্বরকে যতটা সম্ভব দৃঢ় করে সে বলল,
“দেখ,খুব সিরিয়াস আর আমার ধৈর্য জিনিসটা বড্ড কম। তাই সাতপাঁচ না ভেবে সোজাসুজিই বলে দিচ্ছি— ‘আই লাভ ইউ’!”
স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ।দূরের সাউন্ডবক্সের আওয়াজ—সবই যেন তিথির কানের পাশ দিয়ে বয়ে গেল। শানের কথা শুনে তিথির চোখজোড়া কপালে উঠে গেল। এভাবে সোজাসুজি কেউ কাউকে বলে? যেখানে ভালো করে চেনাজানা নেই, নেই কোনো পূর্ব পরিচয়,হুট করে আকাশ থেকে পড়ার মতো কেউ এমন প্রপোজ করে বসতে পারে, তা তিথির ভাবনারও বাইরে ছিল। দুনিয়াতে এত ডিরেক্ট মানুষ যে থাকতে পারে, তা আজ সে চাক্ষুষ প্রমাণ পেল। তিথি নিজের বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারল না। অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন? নাকি উল্টাপাল্টা কিছু গিলেছেন, তাই মাথার ঠিক নেই?”
শান একদম সোজা হয়ে বসল। বলল, “দেখো, আমি মজা করতে ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু সিরিয়াস বিষয়ে আমি একদম হাড়কিপ্টে। আমি তোমাকে নিয়ে ফুললি সিরিয়াস। বিশ্বাস না হলে চলো এখনই বিয়েটা সেরে ফিলে।কাজী সাহেব বোধহয় এখনো আছে। দেরি করলে বিদায় নিতে পারেন।চল শুভ কাজটা সেরে ফেলি।"
তিথি এবার আসলেও ‘থ হয়ে গেল। এক তো একদিনের পরিচয়ে প্রপোজ, তার ওপর সরাসরি বিয়ের কথা! এ কি পাগল নাকি? তিথি ভাবল, বিয়াই যেহেতু হয়, হয়তো একটু বেশিই রসিকতা করছে। সেও পালটা মজা নেওয়ার জন্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“কিন্তু সমস্যা তো একটাই, মিস্টার । আমি তো আপনাকে ভালোবাসি না! তাই বিয়ের প্রশ্নই আসে না।”
“দেখো, তুমি আমাকে বাসো বা নাই বাসো, আমি তোমাকে বাসি এটাই যথেষ্ট! বিয়ের পর এসব নিয়ে কোনো ক্যাচাল হবে না। আগে চলো লাইফটা সেটিং করি। বিয়ের পর তোমাকে এত ভালোবাসব যে, তুমি নিজেই ভালোবাসতে বাধ্য হবে। তখন তুমিই আমার পেছনে ঘুরে বলবে,‘ওগো শান সাহেব, দয়া করে আমাকে একটু কম ভালোবাসুন, আপনার এত ভালোবাসায় আমার সুগার হয়ে যাচ্ছে! এত ভালোবাসা আমার আর সইছে না।’ বিশ্বাস করো, তখন তুমি আমার ভালোবাসার যন্ত্রণায় পালানোর রাস্তা খুঁজে পাবে না। তাই বলছি, সময় থাকতে চলো নিকাহ্টা সেরে ফেলি।”
“আই থিঙ্ক আপনার মাথায় আসলেও সমস্যা আছে। দ্রুত কোনো ডাক্তার দেখান, না হলে অবস্থা বেগতিক হতে পারে।"
বলেই তিথি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বিরক্তি আর একরাশ বিস্ময় নিয়ে হনহনিয়ে প্যান্ডেলের দিকে হাঁটা দিল। শান সেখানেই বসে থাকল। সে অপলক দৃষ্টিতে তিথির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তিথির রাগী হাঁটার ভঙ্গি দেখে সে আপনমনেই হাসল। তারপর বলল,
“মিয়া বিবি রাজি তো কিয়া করেগা কাজী? তুমি কবুল বলো আমি লাভ ইউ টু বলছি।"
চলবে....