#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মদীদ
৮.
⛔(যে কোনো ভুল পেলে আমাকে জানাবেন)
—০—
বাসর ঘরে বসে আছে রুশদী।ওর ভেতরের অস্বস্তিটা কমছিল না। একটা দমবন্ধ করা মুহূর্ত যেন তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। ভারী লেহেঙ্গার জাঁকজমক আর গহনার ওজন এই মুহূর্তে অসহ্য ঠেকছে তার কাছে। গা-গতর কেমন যেন হাঁসফাঁস করে উঠছে।সে ফারাজের অপেক্ষায় বসে আছে। বুকের ভেতর দুলছে এক অজানা দোলন। মনে মনে নিজেকে খুব করে প্রস্তুত করছে সে,নতুন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হতে।রুশদী জানে, এবার তার নিজের ভেতরেই একটা পরিবর্তন আনা দরকার। বিয়ের আগের আর বিয়ের পরের মেয়েদের আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা দরকার। সে মন থেকে চাইছে, নিজের আচরণের পরিবর্তন আনতে।প্রথম পরিচয়ে ফারাজ ছিল তার কাছে নিতান্তই এক অচেনা পুরুষ। আজ তাদের বিয়ে হয়েছে, সম্পর্কের নাম বদলেছে। শুরুর দিনগুলোতে ফারাজের সঙ্গে সে যেমন ব্যবহার করেছিল, এখনও কি সেই একই ব্যবহার ঠিক হবে? না, সেটা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে যাবে।রুশদী মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, ফারাজের সঙ্গে সে নিজের ব্যবহারে এবার পরিবর্তন আনবে।এই নতুন পরিবেশ আর নতুন মানুষটার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবে সে। নতুন জীবনের আলোয় নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তুলবে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দশটা চল্লিশের ঘর ছুঁইছুঁই।রুশদীর অপেক্ষার পালা এবার শেষ হলো।বাসর ঘরের দরজায় যেন এক ছোটখাটো যুদ্ধ জয় করে ফারাজকে ভেতরে ঢুকতে হলো। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কাজিনদের দলের সাথে দীর্ঘ দরকষাকষির পর শেষমেশ এক হাজার টাকার এক বান্ডিল ধরিয়ে দিয়ে সে মুক্তি পেয়েছে।
ফারাজ ঘরে ঢুকতেই একটা স্নিগ্ধ আবেশ তাকে ঘিরে ধরল। পুরো ঘর জুড়ে সাজানো কাঁচা ফুলের সুবাস।রুমটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে কিছুটা অস্বস্তি মেশানো পায়ে সে বিছানার এক কোণে এসে বসল। বিছানার ঠিক মাঝখানে নাখ অবধি লম্বা ঘোমটা টেনে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে রুশদী। ফারাজ শেরওয়ানির পকেট থেকে একটা চেক আর একটি মখমলের বক্স বের করল।চেকটা রুশদীর দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“এটা নাও।”
রুশদী ঘোমটার আড়াল থেকে হাত বাড়িয়ে চেকটা নিল। কিন্তু চেকের অংকের দিকে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল,পুরো ৫০ লক্ষ টাকা! এত বিশাল অংকের টাকা কিসের জন্য? রুশদীর বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে এল।সে মাথার ঘোমটাটা খানিকটা সরিয়ে ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এটা কিসের জন্য?”
ফারাজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে প্রতুত্ত্যর করল , “তোমার দেনমোহর। আর এটাও নাও।”
বলেই সে হাতের সেই মখমলের বক্সটা এগিয়ে ধরল। রুশদী এবার আর বক্সটা হাত দিয়ে স্পর্শ করল না, শুধু কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থেকে পুনরায় প্রশ্ন করল, “আর এটা কিসের জন্য?”
ফারাজ এবার আর কোনো জবাব দিল না। সে বক্সটা খুলে ভেতর থেকে একজোড়া নিখুঁত কারুকার্য খচিত স্বর্ণের চিকন বালা বের করল। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “হাত দাও।”
রুশদী অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। নিজের অজান্তেই সে তার ডান হাতটা ফারাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। কেন সে এমন করছে, কেন তার ভেতরে কোনো দ্বিধা কাজ করছে না,তা সে নিজেও জানে না। ফারাজ অতি যত্নে আর নিপুণ মনোযোগের সাথে রুশদীর হাতে বালা পরিয়ে দিতে লাগল। আজ সারাদিন ভারী গয়নার ভার সইতে না পেরে রুশদী আগেই হাতের সব চুড়ি খুলে ফেলেছিল, এখন তার শূন্য হাতের কবজিতে কেবল ফারাজের দেওয়া ভালোবাসার চিহ্নটুকু চকচক করছে।
ফারাজের হাতের স্পর্শ যখন রুশদীর ত্বকে লাগল, তখন তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এক অদ্ভুত অনুভূতি তার সমস্ত স্নায়ুতে খেলে যাচ্ছে। সে নিজেকে ফেরাতে না পেরে ফারাজের চোখের দিকে তাকাল।রুশদী বেশিক্ষণ সেই নীল সমুদ্রে ডুবে থাকতে পারল না, লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
রুশদী এবার নিজের ভেতরের সংকোচটুকু ঝেড়ে ফেলে সরাসরি ফারাজের দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহলী গলায় শুধাল, “একটা প্রশ্ন করেছিলাম আপনাকে”
ফারাজ বালার কাজগুলো একবার দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আম্মি বলল, বিয়ের রাতে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর জন্য বিশেষ কোনো উপহার থাকা উচিত। তাই...এটা।”
“কে পছন্দ করেছে এটা? কাজগুলো খুব সুন্দর তো!”
রুশদী মুগ্ধ নয়নে হাতের বালার দিকে তাকিয়ে বলল।
ফারাজ এবার রুশদীর দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মৃদু স্বরে বলল, “পছন্দটা আমারই। আমি নিজে কাস্টমাইজড করিয়েছি।”
“ওহ!”
সে হাতের বালা দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল।
ঘরের ভেতর এখন পিনপতন নীরবতা। ফারাজ নিঃশব্দে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু শব্দগুলো সাজিয়ে উঠতে পারছে না। অনেক সময় পার হয়ে গেলেও যখন ফারাজ কিছু বলল না, তখন রুশদীই নীরবতা ভাঙল। বলল, “যা বলতে চান,বলে ফেলুন।”
ফারাজ রুশদীর দিকে ঘাড় ঘোরালেও তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল বিছানায় পড়ে থাকা গোলাপের পাপড়িগুলোর ওপর। অনেকক্ষণ পর সে বলল, “যা বলতে চাই, তা বলতে অনেকটা সময় লাগবে,পরে বলব। এখন কি নফল নামাজ পড়বে না?”
“হুম, পড়ব তো।”
“তাহলে তুমি ওজু করে নাও।”
রুশদী নিজের ভারী বিয়ের পোশাক আর সাজগোজের দিকে একবার তাকাল। এক প্রকার অনুমতির সুরেই ফারাজকে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কি চেঞ্জ করে নেব?”
ফারাজ পূর্ণ দৃষ্টিতে একবার রুশদীর দিকে তাকাল। লাল লেহেঙ্গা আর ভারী গয়নায় রুশদীকে একদম ‘শারফারাজ খান’ এর অর্ধাঙ্গিনী মনে হচ্ছে। ফারাজ নরম গলায় বলল, “হ্যাঁ, বদলে নাও।নয়তো নামাজ পড়তে অসুবিধা হবে।”
ফারাজের অনুমতি পেয়ে রুশদী বিছানা ছেড়ে উঠল। তিথিকে দিয়ে সে আগেভাগেই তার কমফোর্টেবল একটি থ্রিপিস আনিয়ে রেখেছিল।ওয়াশরুমে ঢুকে ডলে ডলে মুখের সব মেকআপ তুলে ফেলল।ফ্রেশ হয়ে ওজু শেষ করে যখন সে বের হয়ে আসল।
ওয়াশরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ হতেই বিছানা থেকে ফারাজ সেদিকে তাকাল। রুশদী ভেজা চুলে হালকা পায়ে ফারাজের দিকে এগিয়ে এল। তার সাধারণ সাজ আর সিক্ত মুখশ্রীর মায়াবী রূপ দেখে ফারাজ যেন এক পলক স্থির হয়ে রইল।
রুশদী কাছে এসে শান্ত গলায় বলল, “আপনি ওজু করে আসুন।”
রুশদীর কথা শুনে ফারাজ ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি এবার পূর্ণভাবে রুশদীর ওপর নিবদ্ধ হলো।সে একপলকে পা থেকে মাথা অবধি রুশদীকে পরখ করে নিল। সদ্য গোসল করে আসা রুশদীর শরীরে এখন এক সিক্ত স্নিগ্ধতা। তার পরনে ল্যাভেন্ডার রঙের হালকা একটি জর্জেট থ্রি-পিস। ফর্সা গলা আর কানের পাশ দিয়ে টুপটুপ করে দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে। মাথায় ওড়নাটা খুব যত্ন করে দেওয়া, যেখান দিয়ে তার ভেজা চুলের দু-একটি গোছা অবাধ্য হয়ে কপালে এসে লুটিয়ে আছে।
ফারাজের চোখে যেন এক গভীর ঘোর লেগে গেল। সে অপলক দৃষ্টিতে রুশদীকে মেপে দেখতে লাগল।ফারাজের দৃষ্টি থমকে গেল রুশদীর ওষ্ঠাধরে। সিক্ত ঠোঁট দুটো প্রাকৃতিকভাবেই মারাত্মক লালচে গোলাপি, যা মেকআপ ছাড়া এই মুহূর্তে আরও বেশি জীবন্ত আর আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছে। এটুকু দেখাতেই ফারাজের সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন অবশ হয়ে এল, নেশার মতো এক আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরল। ফারাজ অনুভব করল তার হৃদস্পন্দন দ্রুততর হচ্ছে।
নিজেকে সামলে নিতে ফারাজ এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। জোরে একটা শ্বাস নিয়ে মাথাটা হালকা ঝাকিয়ে নিজের মোহগ্রস্ত ভাব কাটানোর চেষ্টা করল সে। তারপর আর একটি মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
প্রায় পনেরো মিনিট পর ফারাজ ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল। পরনে তার ধবধবে সাদা একটি সুতি পাঞ্জাবি। হাতের তোয়ালে দিয়ে সে তার ভেজা চুলগুলো মুছছিল। ওদিকে রুশদী তখন জানালার ধারের পর্দাটা সরিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।দরজার শব্দে সে পেছন ফিরল।
ফারাজ এরই মধ্যে ঘরের মেঝেতে দুটি জায়নামাজ বিছিয়ে ফেলেছে,একটি সামনে, অন্যটি ঠিক তার পেছনে।ওরা দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করল।
নামাজ শেষে ফারাজ দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করল। মোনাজাত শেষ করে সে জায়নামাজেই পেছন ঘুরে বসল। রুশদীর সিক্ত ও শান্ত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে সে অত্যন্ত মার্জিত এবং ধীরস্থির কণ্ঠে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, ইয়া হাবিবিতি।”
কথাটা বলে ফারাজ নিজের ডান হাতটা রুশদীর দিকে বাড়িয়ে দিল। রুশদী এক মুহূর্ত থমকে গেল। ফারাজের মুখে ‘হাবিবিতি’ডাকটা তার কর্ণকুহরে মধুর মতো বর্ষিত হলো। সে নিজের হাতটা ফারাজের হাতের ওপর রেখে নিচু স্বরে উত্তর দিল,
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!”
"তুমি তো জানো না,আমি তোমাকে প..!"
ফারাজকে শেষ করতে দিলনা রুশদী।হঠাৎ বলে উঠল,
"আমি খুব অন্য টাইপ একটা মেয়ে,আমি কতটা চঞ্চল তা আপনি জানেন।আমি যে কোন সিচুয়েশনে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।আমি নিজের নতুন জীবনকে মেনে নিয়েছি,কিন্তু আমার সময় লাগবে।আশা করি সে সময় টুকু আপনি আমাকে দিবেন। "
—০—
প্যান্ডেলের আলোকসজ্জা আর মানুষের শোরগোল থেকে দূরে, রিসোর্টের এক কোণে ঘাসে ঢাকা খোলা মাঠটায় শেরকে নিয়ে পায়চারি করছিল শান ও সিফাত।মাথার ওপর অগণিত নক্ষত্রখচিত আকাশ, আর চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।শের প্রতিদিন তার পাপার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু আজকের রাতটা যে অন্যরকম, তা এই অবুঝ শিশুটিকে কে বোঝাবে? আজ তো আর ফারাজের সাথে শেরের ঘুমানো চলবে না।তাই ওরা শের কে নিজেদের সাথে রেখেছে।ওদের সঙ্গে থাকলে শের হ্যাপি হ্যাপি থাকে।শের এর তার সিফু ডিলার ও শান চাচুর সঙ্গে সময় কাটাতে বেশ মজা লাগে।
কিন্তু সে এখন চাচুদের সঙ্গে না তার মমের সঙ্গে সময় কাটাতে চায়।
“উফ চাচু! আমি মম এর সাথে গল্প করব বলেছি না?চলো, আমি এখন মম এর কাছে যাব।”
শান এক মুহূর্তের জন্য মহাবিপদে পড়ে গেল।একে এখন কি করে বোঝায়?শান মাঠের ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল, যাতে সে সরাসরি শেরের চোখের দিকে তাকাতে পারে। শেরের কাঁধে দু-হাত রেখে অত্যন্ত নরম গলায় সে বলল,
“শের, আজকে তুমি তোমার মম এর সাথে গল্প করতে পারবে না।”
শানের কথা শুনে শেরের ছোট চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। তার প্রিয় রুশদী মম এখন হাতের নাগালে, অথচ তাকে কেন দূরে থাকতে হবে? সে হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদী সুরে বলল, “কেন? আমি কেন কথা বলতে পারব না? মম কি আমার ওপর রাগ করেছে?”
শান এবার দোটানায় পড়ে গেল। কীভাবে সে এই প্রশ্নের উত্তর দিবে?
“আচ্ছা শের, বলো তো ভাইয়া দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসে?”
শের এক মুহূর্তও দেরি না করে চট করে জবাব দিল, “আমাকে! পাপা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।”
“একদম ঠিক! আচ্ছা, ভাইয়া কি তোমার মমকে ভালোবাসে?শোনো, যে তোমাকে বেশি আদর করে, তুমি তাকে বেশি ভালোবাসো না? তোমার পাপা যদি মমকে অনেক ভালোবাসে, তবেই তো মম খুশি থাকবে।সেজন্য ওদের দুজনকে একটু একা থাকতে দিতে হবে।তাহলে ওরা একে অপরকে অনেক ভালোবাসবে। আর তোমার জন্য ছোট্ট একটা ভাইয়া বা বোনু নিয়ে আসবে পাপা। তখন তোমার তো আর একা একা লাগবে না, তুমি ওদের সাথে খেলতে পারবে। রাজি তো?”
শেরের সরল মনে শানের এই লজিকটা একদম গেঁথে গেল। একটা ছোট ভাই বা বোনের লোভে আর মমকে হারানোর ভয়ে সে নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল।সে উজ্জ্বল মুখে হাসল এবং বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দারুণ এক ভঙ্গিতে বলল, “ওক্কে চাচু! ডিল ডান!"
শানের বুক থেকে যেন বিশাল এক পাথর নেমে গেল। যাক,বাঁচা গেল এই পুচকির প্রশ্ন থেকে।
শান ও সিফাত আরও কিছুক্ষণ শেরকে নিয়ে পায়চারি করল। হঠাৎ শের ধপ করে ঘাসের ওপর আসন গেঁড়ে বসে পড়ল। তার ছোট ছোট হাত দুটো হাঁটুতে ঠেকিয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেরকে ওভাবে বসে পড়তে দেখে শান এবং সিফাতও আর দাঁড়িয়ে থাকল না। ওরাও পাশে ধুলোবালি উপেক্ষা করে বসে পড়ল,
শান প্রশ্ন করল,
“কী হলো শের? হঠাৎ এভাবে বসে পড়লে কেন? পা ব্যথা করছে?”
“চাচু, একটা কবিতা শোনাও তো!”
কবিতা আর শান?শান কবিতার 'ক' টাও পারে না। ছোটবেলায় আতা গাছে তোতা পাখি, আমাদের ছোট নদী এসব পড়েছিল।এসব ভুলে খেয়েছে সেই কবে। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“কবিতা? আরে শের, আমি কবিতা-টবিতা আমি পারি না,তুমি চাইলে আমি একটা র্যাপ সং বা ইংলিশ সং শোনাতে পারি। শুনবে?”
শানকে পঁচাতে সিফাত বলল,
"শান কবিতা বললে কবিতার পোস্টমর্টেম হয়ে যাবে রে চেংটা!শানেন্দনাথ ঠাকুর এর কবিতা শোনে আমি আমার কানে ১২ টা বাজাতে চাই না।"
শের তো কবিতাই শোনবে।সে মুখটা বাঁকিয়ে,শানকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করে বলল
“আমি এতকিছু জানি না। আমাকে কবিতা শোনাতেই হবে।না হলে আমি এখন পাপার কাছে যাচ্ছি, পাপা আমাকে সুন্দর একটা কবিতা পারে। আমি যাচ্ছি টা টা!”
বলেই শের যখন উঠে দাঁড়াতে চাইল, শানের হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল। এখন এই অসময়ে শের যদি গিয়ে বাসর ঘরের দরজায় টোকা দেয়, তবে আম্মি তাকে চিবিয়ে খাবে।তিনি শেরকে দেখে রাখতে বলেছেন। শান তড়িঘড়ি করে শেরের হাতটা টেনে ধরে আবার ঘাসের ওপর বসাল।
“আরে আরে, আমি শোনাচ্ছি।কবিতাইতোমাকে এমন কবিতা শোনাবো তুমি, তুমি মুগ্ধ হয়ে হাতে তালি দিবে।এই কবিতার জন্য কবিগুরুর পরে গিনিস বুকে আমার নাম উঠবে। "
শান গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিল।সিফাত নিজের কান চেপে বসলো।শানের কবিতা তার পথে হজম করা সম্ভব না।শান হাত নাড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে,বলতে শুরু করল,
“পড়ালেখা চাঙ্গে, আমি ভাসি গাঙ্গে,
গাঙ্গে নাই পানি, কপালে আছে শনি।
কপালে নাই কেউ, কবে জুটবে বউ?
পাদে নাই গন্ধ, বউয়ের মন বন্ধ!
কবে আমি পাব তারে? মনটা আমি দিব যারে!
মনের কথা বলতে গিয়ে, গলাটা যায় শুকিয়ে,
বউয়ের কথা ভাবলে পরে, মনটা যায় জুড়িয়ে।
রাতে মশা গান গায়, দিনে মাছি ডাকে,
পকেট ফাঁকা দেখে, প্রেমিকা ব্লক করে রাখে!
রাতে ঘুম আসে না, ভাবি শুধু একটা কথা,
কবে যে খাব আমি, বউয়ের হাতের রান্না!
ঘরে থাকি একা, মশা কামড়ায় রাতে,
বউ কবে আসবে, গল্প করতে সাথে!
পড়াশোনা চুলোয় যাক, বইয়ে লেগেছে ছাতা,
বউ না পেলে কে শুনবে, আমার মনের কথা!”
শানের এই চরম উদ্ভট আর হাস্যকর কবিতা শুনে শের এবং সিফাতের অবস্থা করুণ হয়ে পড়ল। দু'জনে হাসতে হাসতে ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে বিকট শব্দে হাসতে লাগলো।ওদের হাসির তোড়ে শানের কবি কবি ভাবটা মুহূর্তেই উড়ে গেল।সে চোখ খুলে গম্ভীর হয়ে তাকলে শের এর দিকে।
শান কিছুটা বিরক্ত হওয়ার ভান করে মুখ কুঁচকে বলল,
“এই যে মিস্টার শেহরান খান শের এবং সিফু সিকদার! আমার মতো এমন বিশ্বমানের কবি তোমরা বর্তমান দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি কোথাও পাবে না। তোমাদের উচিত ছিল আবেগাপ্লুত হওয়া, তা না করে তোমরা হাসছ?উমহু!,ইহা চরম অপমানের।যাও, আমার এই কালজয়ী কবিতার জন্য এখনই একটা নোবেল দেওয়ার ব্যবস্থা করো!”
শের কোনোমতে হাসি থামিয়ে পেটে হাত দিয়ে বলল,
“চাচু! এটা কি কবিতা ছিল নাকি?হা হা হা, তুমি যে বউ নিয়ে এমন কবিতা লিখেছ, পাপা শুনলে তো তোমাকে ঘর থেকেই বের করে দিবে।”
শান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল, “আরে হিংস, আমি বাস্তব কথা বলেছি। তোমার পাপা তো বউ পেয়ে গেছে, পোড়া কপাল আমার।আমার কথা কেউ ভাবলো না। ভাবলো শানটা একা একা কি করে থাকে, তাকে একটা বউ এনে দেওয়া উচিত। হাহ!'পড়াশোনা তো এমনিতেই রসাতলে গেছে, এখন একটা বউ পেলে অন্তত এই মশার কামড়গুলো তো একসাথে ভাগ করে নেওয়া যেত!”
শের আবার হোহো করে হেসে উঠে বলল, “চিন্তা করো না চাচু, আমি মমকে বলব তোমার জন্য একটা বউ খুঁজে দিতে। তখন তুমি চাচিকে সারারাত এই কবিতা শুনিয়ো!”
"এই তো পুরো আমার ভাতিজার মতো কথা বলেছ।তোমাকে উম্মাহ!লাভ ইউ শের।"
—০—
তিথি একদিন রাতে রুশদীর সাথে ঘুমিয়েছে, কিন্তু আজ রুশদী নেই। একা ঘরে ঘুম আসছিল না তার, তাই নাহিদকে ডেকে এনে, দু'জনে মিলে অনেকটা সময় লুডু খেলল। এক সময় নাহিদের চোখেও ঘুম নেমে এল, সে হাই তুলে নিজের রুমে চলে গেল। কিন্তু তিথির কিছুতেই ঘুম আসছে।এক তো তার একা একা লাগছে, তার উপর পারিবারিক সমস্যা টা তাকে একদম বিষিয়ে তুলেছে।
রুমে টিকতে না পেরে সে ধীরপায়ে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে এল। এখনো খান বাড়ির বেশ কয়েকজন আত্মীয় আড্ডা দিচ্ছে, হাসাহাসি করছে। তিথি কাউকে চেনে না, তাই সেখানে না গিয়ে সে একটু নির্জনতার খোঁজে সুইমিং পুলের দিকে পা বাড়াল। নীলচে পানির ওপর রাতের চাঁদের আলো পড়ে,পুলের পানি ঝিকিমিকি করছে। তিথি পুলে নিজের ছায়া দেখতে দেখতে হাঁটছে, কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে এক জোড়া চোখ অনেকক্ষণ ধরে তার পিছু নিয়েছে। সেই ভ্রমর তিতির একদম কাছে এসে, একহাত দূরত্ব রেখে পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো।এবং শিষ বাজিয়ে একটি গানের সুর তুলল,
“আরে তুমি রাজি জামাই সাজি কেয়া কারেগা কাজি?”
তিথির ভয়ে শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে উঠল তার।এক ঝটকায় পেছনে ঘুরতেই দেখল অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। ভয় আর কৌতূহল মেশানো হাতে ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালাতেই শানের সেই ৩২ পাটি দাঁত বের করা হাসিটা নজরে এল। তিথির ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্তির সুর মিশিয়ে সে বলল,
“আপনি? আপনি এই মাঝরাতে এখানে কী করছেন?”
শান একদম সাবলীলভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসল। পকেটে হাত গুঁজে দু-পা এগিয়ে এসে বলল,
“কেন? তোমাকে পাহারা দিতে এসেছি!”
তিথি অবাক হয়ে নিজের দিকে ইশারা করল, “আমাকে?”
“হ্যাঁ, তোমাকেই। এই রাত-বিরেতে একা একা নীল পরীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ, যদি কেউ চুরি করে নিয়ে যায়? তাই নিজের হবু বউকে পাহারা দিতে এলাম আর কী!”
‘বউ’ শব্দটা কানে আসতেই তিথির মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। লোকটা বলে কী? পাগলামির একটা সীমা থাকে! সে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“ওয়েট ওয়েট! আপনি কাকে বউ বলে ডাকছেন মিস্টার?”
শান যেন একদম অবাক হওয়ার ভান করল। নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “কেন? আমার বউকে!”
“আপনার বউকে?”
তিথি আবার প্রশ্ন করল।
“কেন তুমি নও?”
“মানে কী আপনার? কী বলতে চান আপনি?”
“মানে তুমি আমার হবু বউ। আজ হোক বা কাল, বউ আমার হতেই হবে তোমাকে।”
“ আজব তো! আপনার মাথার চিকিৎসার আসলেও খুব দরকার।বিরক্ত না করে জান তো এখান থেকে।”
তিথি আর তর্কে না গিয়ে সুইমিং পুলের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। তার পায়ের ছোঁয়ায় স্থির পানিতে ছোট ছোট ঢেউ খেলতে লাগল।
শান চলে না গিয়ে, তিথির পাশে এসে দাঁড়াল। তিথির শান্ত মুখটার দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা যাব, কিন্তু তুমি এত রাতে অন্ধকারে একা বাইরে কী করছ? ভয় করে না তোমার?”
তিথি ফোনের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে আকাশের রূপালি চাঁদের দিকে তাকাল। রাতের শীতল হাওয়া তার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। শান্ত স্বরে সে উত্তর দিল, “যার বেড়ে ওঠাই অন্ধকারে, সে অন্ধকারকে ভয় পায় না।”
তিথির এই কথাটি শানের হাসিখুশি মনে এক অজানা নাড়া দিয়ে গেল।তার কেন জেন মনে হলো মেয়েটা কোন প্রবলেম ফেস করছে।
সুইমিং পুলটি এখন এক শান্ত আয়নার মতো স্থির হয়ে আছে। মাথার ওপরে থাকা রূপালি চাঁদ যেন সিক্ত পানির গহীনে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে ব্যস্ত। চারপাশের বাগান থেকে শিউলি আর হাসনাহেনার মিশ্র সুবাস রাতের শীতল হাওয়ায় ভেসে আসছে।তিথির থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে শান পুলে পা ডুবিয়ে বসল। আশেপাশে জোনাকিরা ছোট ছোট আলোর বিন্দু হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক রাতের নিস্তব্ধতাকে ভাঙছে। শান পানির দিকে তাকিয়ে তিথির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,
“আচ্ছা, আম্মির কাছ থেকে জানলাম ভাবির নাকি আপন কোনো বোন নেই। তুমি কি তবে ভাবির কাজিন হও?”
তিথি পানির ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। অতি মৃদু স্বরে জবাব দিল, “নাহ্।”
“তাহলে? সৎ বোন?” শান একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় শুধাল।
“না। আমি রুশদীর রক্তের সম্পর্কেরই কেউ না।”
“ওহ! তার মানে তোমরা কাজিনও নও?”
“আসলে রুশদী আমার সম্পর্কের কেউ না, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
শান একটু অবাক হয়ে বলল, “বলো কী! তোমাদের বন্ডিংটা তো একদম আপন বোনের মতো। যে কেউ তোমাদের দেখলে বলবে তোমরা একই মায়ের পেটের বোন।”
তিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আসলে আপন মানুষদের আর ভালো লাগে । তাই পরকেই আপন করে নিচ্ছি। পরের কাছে যদি বুক ভরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায়, তবে সেই বিষাক্ত আপনদের দরকার কী?”
তিথির কণ্ঠের একটা চাপা অভিমান ও কষ্ট মিশে ছিল। তিথির মনটা যেন মলিন হয়ে যাচ্ছে দেখে শান নিজে প্রশ্ন ধরেন পাল্টে ফেলল। সে আবার সেই চিরচেনা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, সব না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে এখন কোন নামে ডাকব? বউ নাকি বিয়াইন?”
তিথির মেজাজটা আবার চট করে চড়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে বলল, “মানে কী আপনার? কী আজেবাজে বকছেন?”
“আরে আজেবাজে হবে কেন? লজিক্যালি তুমি আমার বউ আবার সম্পর্কে ‘বিয়াইন। এখন আমি কনফিউজড যে কোনটা বলে ডাকলে তুমি বেশি খুশি হবে!”
তিথি চটা গলায় বলল “আমি আপনার বউ লাগি?
শান দুই হাত পেছনে দিয়ে হেলান দিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “লাগো তো বটেই! তবে বউয়ের আগে একটা হবু আছে। তুমি হলে আমার হবু বউ’!”
“বিয়াই তো দেখি বেশ ভালোই মজা করতে পারেন!”
তিথির মুখে বিয়াই শব্দটা শোনামাত্র শান নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরল। চোখ-মুখ কুঁচকে যন্ত্রণার এক নিখুঁত অভিনয় করে আর্তনাদ করে উঠল,
“উফ বিয়াইন! এই বিয়াই ডাকটা একদম কলিজার লেগেছে। এখানে বড্ড লাগছে আমার!”
তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল। সে আরেকটু খোঁচা দিয়ে আদুরে কিন্তু বিদ্রুপের সুরে বলল, “ওমা, সত্যিই বিয়াই?”
শানের অবস্থা তখন নাজেহাল। সে যেন হার্ট অ্যাটাক করার জোগাড়! দাঁত চেপে কাঁপা গলায় বলল,
“উপস! উপস! দয়া করে আর বিয়াই বইলেন না বিয়ান। কলিজাটা একদম ফালি ফালি হয়ে যাচ্ছে!”
তিথি এবার মজা পেয়ে আরও সুর টেনে ডাকল, “ওও বিয়াই!”
"উপস কলিজাই লাগছেরে....আর তর সইছে না চলো নিকাহ করে ফেলি? "
তিথি বাঁকা হেসে বলল, “বিয়ে করবেন? তা পকেটে কি টাকা আছে? বিয়ের খরচ সামলাবেন কীভাবে?”
শান একদম নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “আমার পকেটে নেই তো কী হয়েছে? বাপের পকেটে তো গিজগিজ করছে!”
তিথি এবার হোহো করে হেসে ফেলল।
“বড় চমৎকার কথা তো! তা বিয়ের পর নিজে খাবেন কী, আর বউকেই বা খাওয়াবেন কী?”
“তুমি কি খুব বেশি খাও?কোনো সমস্যা নেই।আমি আমার ভাগের টুকু তোমাকে দিয়ে দিব।"
তিথির বিস্ময়ের সীমা নেই। লোকটা এত সুন্দর করে বাজে কথা বলতে পারে কীভাবে?
“আচ্ছা, খাওয়ার ঝামেলা তো না হয় মিটলো। তা ফিউচার প্ল্যান কী শুনি?”
শান এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের দর্শন শোনাল, “ফিউচার প্ল্যান আর কী! আমি বাপের হোটেলে খাব, আর তুমি শ্বশুরের হোটেলে খাবে। ব্যস, লাইফ জিংগালালা!”
তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাসতে হাসতে সে পুলের পাড় থেকে উঠে দাঁড়াল। পরনের জামা একটু ঝেড়ে নিয়ে প্যান্ডেলের দিকে হাঁটা ধরল সে। যাওয়ার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে শানকে বলে গেল,
“শুনুন মিস্টার শান, টাকা থাকলে পকেটে, আমার মতো শত বিয়ান আসবে রকেটে! তাই ফালতু ঘোরাঘুরি ছেড়ে আগে পকেটে টাকা ভরুন।”
শান হো হো করে হেসে উঠে তিথির যাওয়ার পানে তাকিয়ে বেসুরে গলায় গান ধরল,
“আরে ধুর! তুমি রাজি জামাই সাজি
কেয়া করেগা কাজী?বিয়ের পর
দুজন মিলে ভাজবো ডিম ভাজি।
পটলা পটলি নিয়ে চলো গ্রাম ছেড়ে
পালাই! তোমায় নিয়ে থাকবো সুখে
যদি থাকি ঢালায়!!
—০—
রিসিপশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে রাত প্রায় শেষ।আত্মীয়-স্বজনরা যে যার গন্তব্যে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।রুশদীর বুকের ভেতরটা এখন হাহাকার করে উঠছে।আজ সে চলে যাবে।আব্বুকে ছেড়ে এবার সে একেবারে চলে যাবে পরের ঘরে।পৃথিবীতে এই লোকটাই তো শুধু তার আপন ছিল,তাকে ছেড়ে আজ সে চলে যাবে।লোকটা যতই খারাপ হোক তবুও সে তো রুশদীর আব্বু।খারাপ তো লাগেই!
গুটিগুটি পায়ে আনাস হকের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল রুশদী। দরজা আধখোলা। ভেতরে আনাস হক নিজের ব্যাগ গোছাচ্ছেন।তিনি একটু ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখলেন রুশদী দাঁড়িয়ে আছে।লোকটার মাথা ঘুরছে এই মুহূর্তে,খান বাড়ি থেকে বলা হয়েছিল ' 'বিয়ের পর পরই টাকা পেয়ে যাবে'।অথচ তাদের সঙ্গে এনিয়ে কথা বলারই সুযোগ হচ্ছে না।খান পরিবার তাদের এড়িয়ে চলছে।এনিয়ে মেজাজ ঠিক নেই আনাস হকের।একটু আগে নাহিদাও টাকা নিয়ে চিৎকার চেঁচামচি করে গেছে।তিনি নির্বিকার গলায় প্রশ্ন করলেন,"কিছু বলবি?"
রুশদী কোনো উত্তর দিল না। সে কোনো এক অদৃশ্য টানে আব্বুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল এবং হুট করেই তাকে জড়িয়ে ধরল। এই আলিঙ্গনে ছিল আজন্মের এক জমাটবদ্ধ আকুতি।আব্বুর গায়ের গন্ধটা পেতেই তার চোখের কোণের বাঁধ ভেঙে গেল।কয়েক ফোটা নোনা জল গড়ালো।আব্বুর বুকের ওপর মুখ লুকিয়ে রুশদী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
"তোমাকে অনেক ভালোবাসি আব্বু।আম্মু চলে যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আপন বলতে আমার আর কেউ নেই। তুমি বিশ্বাস করো, শত চেষ্টার পরেও আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারি না। তোমার দেওয়া সব অন্যায় আবদার কেন হাসিমুখে মেনে নিই জানো? কারণ আমার খুব ভয় হয়,আমি যদি তোমার কথার অবাধ্য হই, তবে হয়তো তুমি খুব কষ্ট পাবে। তোমার সেই কষ্টের দায়ভার নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।"
খানিকটা দম নিয়ে রুশদী আবার বলল, "আমি জানি আমি তোমার কাছে বোঝা ছিলাম। কিন্তু শেষবারের মতো আমার একটা কথা রাখবে? ছোটবেলার মতো করে আমাকে শুধু একবার ‘মা’ বলে ডাকবে আব্বু? এই একটা ডাক শোনার জন্য আমার আত্মাটা বছরের পর বছর তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে। কথা দিচ্ছি, এই একটা আবদার রাখলে আমি আর কোনোদিন তোমার কাছে কিছুই চাইব না।"
রুশদী বরাবরই আব্বুর কাছে বড় অসহায়। আনাস হকের অবহেলা আর রূঢ় ব্যবহার তাকে বারবার বিষাক্ত করলেও, দিনশেষে ওই মানুষটার এক চিলতে স্নেহের জন্য সে সব অপমান,সকল কষ্ট ভুলে যেতে রাজি। কিন্তু আনাস হকের পাথুরে মনে মেয়ের এই আর্তনাদ এক বিন্দু করুণার উদ্রেক করল না। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনা বা স্নেহের লেশমাত্র দেখা গেল না। বরং মনে হলো, তিনি এই আবেগঘন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত নিষ্কৃতি পেতে চান।
খুবই অবহেলা আর বিরক্তির স্বরে তিনি রুশদীকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন,"আচ্ছা ডাকলাম মা, হয়েছে তো এবার?"
খান পরিবার থেকে এখনও পাওনা টাকাটা দেয়া হয়নি।এর জন্য মাথা ঠিক নেই এই লোকের।তার ওপর মেয়ের এসব নাটক উনার সহ্য হলো না।টাকার জন্য মেয়ে বিয়ে দিল অথচ টাকাই পেল না এখনও। মাথা ঠিক থাকে?
রুশদীর তপ্ত চোখের জল আব্বুর নির্লিপ্ততার কাছে হার মেনে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, আর আনাস হক যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার নিজের ব্যাগটা টেনে নিলেন।
না!রুশদী আর কোনোদিন এই দাবি নিয়ে আসবে। বলবে না আরেকবার তাকে 'মা ' বলে ডাকতে।
—০—
পরের দিন সকাল সকাল খান বাড়িতে হাজির হলো আনাস ও নাহিদা। তারা খান বাড়ির বিশাল ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে। তাদের সামনে বসে আছেন রাইমা খান। আভিজাত্যের চরম শিখরে থাকা এই নারীটি পায়ের ওপর পা তুলে কফিতে চুমুক দিচ্ছেন। তার সামনে বসে থাকা আনাস হক আর নাহিদার ভেতরে চলছে অস্থিরতা। নাহিদা বারবার আনাস হকের হাতের কোনুই দিয়ে গুঁতো দিচ্ছে কিছু শুরু করার জন্য,আর আনাস হক তাকে থামিয়ে দিচ্ছেন। রাইমা খান তাদের অবস্থা দেখে অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন,
"যা বলতে চাচ্ছেন সরাসরি বলুন। আমার হাতে খুব একটা সময় নেই।"
আনাস হক গলা ঝেড়ে আমতা আমতা করে শুরু করলেন, "আসলে যা দেওয়া-নেওয়ার কথা ছিল, তা তো এখনো হলো না। তাই আরকি আসা। তা ভাই সাহেব কি বাড়িতে আছেন? ওনার সাথে একটু কথা বললে..."
রাইমা খান কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সেটা টি-টেবিলে রাখলেন। তার চোখের চাউনি আরও ধারালো হয়ে উঠল।
"মন্ত্রী সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে আপনার মতো মানুষের সাথে অযথা সময় ব্যয় করার মতো সময় ওনার নেই। আর আপনি কিসের দেওয়া-নেওয়ার কথা বলছেন? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।"
আনাস হক এবার কিছুটা নির্লজ্জের মতো হেসে বললেন, "কিছু অর্থ তো দেওয়ার কথা ছিল। বিয়ে তো হয়ে গেল, মেয়েও আপনাদের বাড়িতে। এখন আমাদের পাওনাটা মিটিয়ে দিলে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারতাম আরকি।"
রাইমা খানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। তিনি সোজা হয়ে বসে বললেন,"আপনি কি রুশদীর বিনিময়ে পাওয়া টাকার কথা বলছেন? সোজা বাংলায় বলতে গেলে,নিজের মেয়েকে বিক্রি করা অর্থের কথা?"
আনাস হক থতমত খেয়ে গেলেন। "জি... জি মানে ওভাবেই তো কথা ছিল।"
"শুনুন আনাস সাহেব," রাইমা খানের কণ্ঠস্বর এবার বরফের মতো ঠান্ডা। "আমরা আমাদের ছেলের জন্য সম্মানিতা ঘরের বউ এনেছি, বাজার থেকে কোনো সস্তা পণ্য কিনে আনিনি যে তার বিনিময়ে আপনাদের হাতে নোটের বান্ডিল তুলে দিতে হবে। তাই এসব কদর্য বিষয় নিয়ে যদি দ্বিতীয়বার কথা না বলেন, তবেই আমরা খুশি হব।"
রুশদীর সাথে ফারাজ এর বিয়েতে যেন আনাস হক কোনো দ্বীধা না করে রাজি হয়ে যান তাই তাকে টাকার লোভ দেখিয়েছিলেন রাইমা খান।নতুবা তাদের মানসিকতা এতটাও নিচ না।এছাড়াও রুশদী বিয়ের আগে রাইমা খানকে কল করে শর্ত রেখে ছিল,তার বিনিময়ে যদি তার পরিবারকে যদি এক পয়সাও দেওয়া হয় তবে সে এই বিয়ে করবে না।
টাকা দেওয়া হবে না শুনে পাশে বসে থাকা নাহিদা এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বিড়াল যেমন হুট করে খ্যাক করে ওঠে, সেভাবেই চিৎকার করে উঠল সে।
"টাকা দিবেন না মানে? বিয়ের আগে তো কত মিষ্টি কথা! কথা ছিল মেয়ে আপনাদের চৌকাঠ পেরোলেই আমাদের পাওনা আমাদের হাতে দিয়ে দিবেন। এখন রুশদী ঘরে ঢুকতেই রূপ বদলে গেল? টাকা এখন দিবেন না কেন?"
রাইমা খান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার স্থির দৃষ্টি নাহিদাকে মনে করিয়ে দিল যে তিনি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাইমা খান বললেন,
"বোধহয় আপনাদের কানে সমস্যা আছে। একটু আগে আমি যা বলেছি, ওটাই আমার শেষ কথা। আমাদের বাড়িতে আপনাদের মতোন লোভী আর ছোটলোকদের কোনো স্থান নেই। টাকা তো পাবেনই না, বরং আবারও যদি এই দাবি নিয়ে আসেন, তবে মন্ত্রী সাহেবের ক্ষমতা সম্পর্কে আপনাদের ভালোই ধারণা হবে। এবার দয়া করে বিদায় হন।"
" আমরা ফাউ কথা শুনতে আসিনি। আপনাদের মতো বড়লোকের বাড়ির বউ হয়ে রুশদি এখন রাজরানি হয়ে আছে, আর আমাদের বেলায় লবডঙ্কা? মন্ত্রী সাহেবের খমতা দেখিয়ে পার পাবেন না। টাকা না নিয়ে আমরা এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না!"
রাইমা খান ঠাণ্ডা চোখের দৃষ্টি এবার সরাসরি নাহিদার চোখে।
"আমাদের বাড়ির কাজের লোকগুলোও আপনার চেয়ে নিচু গলায় কথা বলে।এটা ড্রইং রুম, মাছ বাজার নয়। আনাস সাহেব, আপনার স্ত্রীকে সামলান, নইলে আমার দারোয়ান ওকে গেটের বাইরে রেখে আসার সময়ও কিন্তু ঠিক এভাবেই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে।"
আনাস হক কিছুটা ভড়কে গিয়ে নাহিদার আঁচল টেনে ধরার চেষ্টা করলেন, "আরে নাহিদা, বসো। কথা তো শেষ হয়নি..."
"কি কথা শেষ হয়নি?" নাহিদা এবার আনাস হকের হাত ঝামটা দিয়ে সরিয়ে দিল। "তুমি তো একটা মেরুদণ্ডহীন মানুষ! নিজেদের পাওনা চাইতে এসেও কুঁকড়ে আছো? সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে আমাদের সময় লাগবে না। রুশদীর ওপর আমাদের অধিকার এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আমরা যদি এখনই ওকে নিয়ে যেতে চাই, আপনারা আটকাতে পারবেন না।"
বলে রুশদীকে ডাকতে লাগলেন তিনি,
"রুশদী... এই রুশদী! "
রাইমা খান মৃদু হাসলেন। তিনি বেল টিপে ভেতরে ইশারা করতেই দুজন দীর্ঘদেহী বডিগার্ড ঘরে ঢুকল।
"রুশদি এখন এই বাড়ির বউ, আপনাদের পণ্য নয় যে যখন খুশি ফেরত নিয়ে যাবেন। আর আপনাদের দাবি করা ওই তথাকথিত পাওনা... ওটা পাওনা নয়, ওটা ছিল একটা টোপ। যে বাবা-মা নিজের সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি করে, তাদের আইনের ভাষায় কী বলে জানেন তো? আমি চাইলে এখনই পুলিশের হাতে আপনাদের তুলে দিতে পারি, জালিয়াতি আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে।আপনরা চাইলে আরে বড়ো মামলাও ঠুকতে পারি।"
নাহিদা কিছুটা ভয় পেল ঠিকই, কিন্তু জেদ ছাড়ল না। "পুলিশের ভয় আমাদের দেখাবেন না! আপনারাও তো সেই লেনদেনে রাজি হয়েছিলেন। আমরা ডুবলে আপনাদেরও সাথে নিয়েই ডুবব।"
"প্রমাণ আছে কোনো"মৃদু হেসে বললেন রাইমা খান।
আবার বললেন,
"আপনাদের মতো লোভী মানুষের সাথে আমি কোনো লিখিত চুক্তি করিনি। এখন দয়া করে বিদায় হন। আমার ছেলের সাথে রুশদি এই মুহূর্তে ওপরের ঘরে আছে। আমি চাই না আপনাদের এই কুৎসিত চেহারাটা দেখে ওর সকালটা নষ্ট হোক।"
বডিগার্ডরা এক কদম এগিয়ে আসতেই আনাস হক বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। তিনি ফ্যাকাশে মুখে নাহিদার হাত শক্ত করে ধরলেন। "চলো এখান থেকে, পরে কথা হবে।"
নাহিদা যেতে যেতেও চিৎকার করে বলতে লাগল, "দেখে নেব আপনাদের! রুশদিকে দিয়েই আপনাদের হাঁড়ি ভাঙব আমি, মনে রাখবেন!"
তাঁদের চলে যাওয়া দ্বিতীয় তলা থেকে দেখল রুশদী।সে সবটাই শুনেছে এখানে দাড়িয়ে।টাকার লোভ মানুষকে কতটা নিচে নামাতে পারে,ছি!
চলবে...