ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

১০ম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মদীদ

১০.

(যে কোনো ভুল পেলে আমাকে জানাবেন)

এইচএসসি পরীক্ষার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে।পরীক্ষা এসে রুশদীর দরজায় কড়া নাড়ছে।মাঝখানে বেশ কয়েকটা দিন পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল সে। বইয়ের পাতা উল্টে দেখাও হয়নি এতদিন। কিন্তু এখন আর ফাঁকিবাজি করলে চলবে না। সম্পূর্ণ দমে পড়াশুনা শুরু করতে হবে। গোল্ডেন প্লাস তো বটেই, ভালো গ্রেড না এলে রুশদীর জীবন যেন এক লহমায় তছনছ হয়ে যাবে। এতদিনের খাটুনি আর স্বপ্নগুলো সে অংকুরেই নষ্ট হতে দিতে চায় না।

দীর্ঘ বিশ দিন পর আজ কলেজে পা রেখেছে রুশদী। মনের গহীনে এক নতুন জেদ,এখন থেকে প্রতিটি সেকেন্ড হবে হিসেবি। এর জন্য, আজ তার চিরশত্রু লুৎফর স্যারের অখাদ্য গণিত ক্লাসটাও সে আজ গিলছে প্রচণ্ড মনোযোগ দিয়ে। লাস্ট কবে সে লুৎফর স্যারের ক্লাসে এতটা মনোযোগী ছিল, আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।

রুশদীর পাশে বসা তিথি। তবে তার মনোযোগ যেন সাত আসমানের ওপারে ডানা মেলেছে।রুশদীর সাথে সে একায় অবিরাম পকপক করে যাচ্ছে। রুশদী পুরোপুরি ক্লাসে মগ্ন থাকলেও বান্ধবীর মন রক্ষার্থে মাঝেমধ্যে যন্ত্রের মতো 'হু-হা' করে মাথা নাড়াচ্ছে। তিথি বোকা নয়, রুশদীর এই মেকি মনোযোগ ধরে ফেলে সে বিরক্তিতে 'চ' সূচক শব্দ করে একটা মৃদু ধাক্কা দিল রুশদীকে।

"আরে শোন না! দারুণ ইয়াম্মি একটা খবর আছে,"

ফিসফিস করে বলল তিথি।

রুশদীর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় তিথির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,

"কী হয়েছে বলবি তো?"

"আচ্ছা ইয়াম্মি খবর পরে বলছি।তোর দেবর একটা আস্ত বজ্জাত!"

রুশদীর ওর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,

"এই শান ভাইয়াকে নিয়ে নো ব্যাড মন্তব্য।সে যথেষ্ট ভালো লোক,তুই খারাপ।লুচু চেংরী।"

প্রিয় বান্ধবীকে শান এর পক্ষ নিতে দেখে সহ্য হলো তিথির। সে অবলা বাচ্চাদের মত কান্না করে বলল,

"তুই বিয়ের পর কেমন স্বার্থপর হয়ে গেছিস,উম....তুই আর আমাকে ভালুবাচিস না।পুচা মেয়ে!"

সেই তিথির সস্তা ওভার এক্টিং।রুশদী এক ধমক মেরে বলল,

"চুপ!নাটক বন্ধ।কি বলবি বল।"

"ওই বেডা আমাকে মেসেজে দিয়ে দিসটাপ করে।"

"কি বলে ডিস্টার্ব করে?"

তিথি খুব এক্সাইটেড হয়ে বলল,

"বলে আমি খুব সুন্দর, বুটিফুল...!"

"কঁচুর ফুল তুই আর কিছু!"

বান্ধবীর এমন ব্যবহারে সন্তুষ্ট নয় তিথি।সে রুশদীকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললো,

"তুমি বদলে গেছ প্রিয়,তুমি আর তুমি নেই।"

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা হুট করে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। রুশদী আর তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই যান্ত্রিকভাবে সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। সামনে তাকিয়ে দেখল স্বয়ং প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাসে ঢুকেছেন। স্যারের উপস্থিতিতে সবাই বসার পর রুশদীও বসার উপক্রম করছিল, ঠিক তখনই গমগমে কণ্ঠে শোনা গেল,

"রুশদী!"

নিজের নাম শুনে বিদ্যুতের খাম্বার মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। থতমত খেয়ে বলল,

"ইয়েস স্যার!"

প্রিন্সিপাল স্যার পুরো ক্লাসের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বেশ ঘোষণা দেওয়ার ঢঙে বললেন,

"রুশদী তোমাদের ক্লাসমেট ঠিকই, কিন্তু ওর আরও দুটো বড় পরিচয় আছে। ও আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের পুত্রবধূ।"

কথাটা শেষ হতে না হতেই পুরো ক্লাসরুমে যেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। মুহূর্তের মধ্যে পিনপতন নীরবতা ভেঙে শুরু হলো শোরগোল আর কানাঘুষা। সহপাঠীদের চোখেমুখে তখন বিস্ময় আর অবিশ্বাসের সংমিশ্রণ। সবাই ড্যাবড্যাব করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন তারা কোনো রূপকথার রাজকন্যাকে দেখছে। যে মেয়েটি একটু আগেও সাধারণ ছিল, এক নিমেষে সে পুরো কলেজের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো।রুশদী অস্বস্তি লাগল এসবে।

প্রিন্সিপাল স্যারের গমগমে কণ্ঠস্বর পুরো ক্লাসরুমের গুঞ্জনকে এক নিমেষে বন্ধ করে দিল। তিনি বেশ কড়া গলায় বলতে শুরু করলেন,

"ক্লাস কুয়াইট! সবাই শান্ত হও। আজ থেকে একটা কথা মাথায় রাখবে, রুশদীর সাথে তোমরা সবাই অত্যন্ত বন্ধুসুলভ আচরণ করবে। ওর কোনো অসুবিধা যেন আমি না শুনি।"

এরপর তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট প্রানটির দিকে তাকিয়ে স্নেহের স্বরে বললেন,

"শের, যাও তুমি তোমার মম এর কাছে গিয়ে বসো।"

লুৎফর স্যারের দিকে ফিরে তিনি যোগ করলেন, "স্যার, শের আমাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এবং মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের নাতি। ও এখন একটু ক্লাসে ওর মম এর সাথেই থাকবে। ও কোন বিরক্ত করবে না তাই না। ওকে স্যার,ও তাহলে থাকছে!"

লুৎফর স্যার বিনয়ের সাথে মাথা নুইয়ে সম্মতি জানালেন, "জি স্যার, অবশ্যই।"

পুরো ক্লাসের সবকটি চোখ তখন বিস্ময়ে চড়কগাছ। সবার কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে দিয়ে ছোট্ট শের টুপটুপ করে হেঁটে লাস্ট বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। তিথি একগাল হেসে আদরে শেরকে কোলে তুলে নিয়ে রুশদী আর নিজের মাঝখানের জায়গাটিতে বসিয়ে দিল।

যাওয়ার আগে প্রিন্সিপাল স্যার পুনরায় তাগিদ দিয়ে গেলেন, "ওকে ক্লাস, বাই! সবাই এবার পড়াশোনায় মন দাও। এবার কিন্তু আমাদের কলেজ থেকে হানড্রেড পার্সেন্ট জিপিএ-৫ চাই।"

এই বলে তিনি গটগট করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন।

স্যার বেরিয়ে যেতেই রুশদী ব্রেঞ্চে বসে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে শেরের চোখের দিকে তাকাল। সে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,

"তুমি? তুমি এই অসময়ে আমার ক্লাসে কী করছো শুনি?"

শের তার কচি কচি মুক্তোর মতো দাঁতগুলো বের করে মায়াবী এক চিলতে হাসি দিল। বলল,

"তোমাকে খুব মিস করছিলাম মম, তাই চলে আসলাম। আফটার অল, এটা তো আমার দাদুর স্কুল। আমি যা বলি, এখানে সব নিয়ম তেমন করেই হয়! হি হি!"

রুশদী চোখ-মুখ কুঁচকে শাসনের সুরে বলল, "তা তো বুঝলাম। কিন্তু এখন তো তোমার নিজেরও ক্লাস চলার কথা। তুমি নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমার ক্লাসে কেন?"

শের বেশ স্মার্টলি কাঁধ নাচিয়ে বলল, "নো প্রবলেম মম!"

"প্রবলেম তো আছেই সোনা। তুমি ক্লাস মিস করলে কেন, হুম? পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি আমার একদম পছন্দ না শের।"

রুশদীর কণ্ঠস্বর এবার বেশ কঠিন শোনাল।মম এর এমন বকা খেয়ে মুহূর্তেই শেরের উজ্জ্বল মুখটা শরতের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। সে অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে নখের ডগা খুঁটতে খুঁটতে খুব নিচু স্বরে বলল, "সরি মম!"

পাশে বসে থাকা তিথি এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে শেরের নরম চিবুক নেড়ে রুশদীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

"এই রুশের বাচ্চা! তুই পিচ্চিটাকে ওভাবে বকছিস কেন রে একদম কড়া হেডমিস্ট্রেসদের মতো? আহা রে, শের তুমি শোনো,তুমি প্রতিদিন আমাদের ক্লাসে আসবে আর আমাদের মাঝখানে এভাবেই বসে থাকবে, কেমন?"

শের বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু রেখেই বিড়বিড় করে বলল, "নো! মম বলেছে পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি একদম পছন্দ না।"

তিথি এবার রুশদীকে টিপ্পনী কেটে বলল, "তোর মম নিজেই তো একটা ফাঁকিবাজ! ওর কথা বাদ দাও তো সোনা, তুমি এই খালামণির কথা শোনো।"

রুশদী মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, "ওরে বাবা! দেখছি মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!"

তিথিও হাসতে হাসতে পালটা জবাব দিল, "মা যখন অকারণে বকবে, তখন মাসির দরদ তো একটু বেশি হবেই।"

রুশদী খেয়াল করল শের সত্যিই খুব মন খারাপ করেছে। ওর ছোট্ট হাত দুটো কোলের ওপর স্থির হয়ে আছে। নিজের ওপরই রাগ হলো রুশদীর।কেন শুধু শুধু ওকে বলতে গেল?এখন তো ওর মন খারাপ দেখে তারও খারাপ লাগছে! সে আলতো করে শেরকে নিজের বাহুবন্ধনে টেনে নিল। একদম নরম সুরে কানের কাছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

"মম এর কথায় খুব মন খারাপ করেছো?"

শের অস্ফুট স্বরে ছোট করে জবাব দিল, "নাহ।"

"তাহলে মাথা নিচু করে এমন করে বসে আছো কেন? দেখি, আমার প্রিন্স এর মুখটা একটু দেখি, তাকাও তো আমার দিকে।"

রুশদী নিজের কোমল দুই হাত দিয়ে শেরের তুলতুলে গাল দুটো ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। তারপর আদুরে কন্ঠে বলল,

"আচ্ছা শোনো, আমরা একটা রুলস করি। তোমার ক্লাস ছুটি হয় সাড়ে এগারোটায়, আর আমারটা সাড়ে বারোটায়। তুমি প্রতিদিন তোমার ক্লাস শেষ করে, আমার ক্লাসে এসে বসবে। কিন্তু নিজের ক্লাস শেষ হওয়ার আগে আসা চলবে না, প্রমিজ? এখন খুশি তো?"

বলেই রুশদী শেরের কপালে পরম ভালোবাসায় একটি ছোট্ট চুমু এঁকে দিল। আদুরে গলায় আবদার করল,

"নাও, এখন একটু হেসো তো দেখি। তোমাকে হাসলে কত কিউট লাগে জানো?"

মম এর এই মিষ্টি অনুমতি আর কপালে সেই উষ্ণ পরশ পেয়ে শেরের মেঘলা মনে যেন এক নিমিষেই হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল। অভিমানের সব কালো ছায়া ধুয়ে মুছে গিয়ে তার সেই পরিচিত মায়াবী হাসিটা আবার ফিরে এল। সে তার সেই চিরচেনা স্টাইলে মুক্তোর মতো সাদা দাঁতগুলো বের হাসল।

-—০—

স্কুলের ছুটির পর দুপুরের কড়া রোদে আমগাছের ছায়াটা বেশ আরামদায়ক।রুশদী, তিথি আর পুঁচকে শের মাঠের সবুজ ঘাসে জাঁকিয়ে বসেছে।তাদের হাতে ক্যান্টিনের স্পেশাল বার্গার।খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছিল, তাই তিনজনেই বেশ আয়েশ করে খাওয়ায় মন দিয়েছে। মাঠ প্রায় জনশূন্য, শুধু দূরে কয়েকটা ফ্রেন্ড সার্কেলের জটলা দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ এক জোড়া জুতো এসে থামল তাদের ঠিক সামনে। রুশদী আর তিথি বার্গারে কামড় দিতে গিয়েও থেমে গেল। মুখ তুলে তাকাতেই বিরক্তির এক চরম শিখরে পৌঁছাল তারা। আর শের? তার ছোট্ট কপালটা কুঁচকে গেল রাগে।

আগন্তুকের নাম ফাহাদ। রুশদী ও তিথির ব্যাচমেট এবং এক সময়ের ত্যক্ত-বিরক্ত করা সেই নাছোড়বান্দা ছেলে, যে রুশদীকে পছন্দ করার নামে রাস্তায় আর কলেজে কম জ্বালানি দেয়নি। রুশদী,তিথি ওকে পাত্তাই দিল না।যেন ওর সামনে কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, স্রেফ একটা অকেজো খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। তারা নির্বিকার ভঙ্গিতে আবার বার্গারে মন দিল।

ফাহাদ একটু ঝুঁকে মিনতি করার সুরে বলল, "রুশদী, তোমার সাথে আমার খুব জরুরি কথা আছে। প্লিজ একটু শোনো।"

রুশদী কানে তুলো দিয়ে বসে থাকার ভান করল। সে এতটাই অবজ্ঞা করছে যে ফাহাদ যেন অস্তিত্বহীন। কিন্তু পাশে থাকা তিথির মটকা তো এমনিতেই সবসময় গরম থাকে,সে হাতের বার্গারটা একপাশে রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

"ফাহাদ, তুমি আসলেও একটা জাত-ছেঁচড়া! একটা বিবাহিত মেয়েকে এভাবে ডিস্টার্ব করতে তোমার লজ্জা লাগে না? কোন আক্কেলে তুমি এখানে এসেছ? এর আগেও তো তোমাকে ঝাড়ু-পেটা করা বাকি রাখা হয়েছিল, তারপরও শিক্ষা হয়নি? তোমার মতো নির্লজ্জ আর বেহায়া ছেলে আমি দুনিয়াতে দুটো দেখিনি!"

তিথির এই সরাসরি কথার আক্রমণে ফাহাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ওদিকে শের তার ছোট্ট হাতের মুঠো শক্ত করে ফাহাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন সুযোগ পেলেই সে ফাহাদকে উত্তম-মাধ্যম দিবে।

ফাহাদ বিরক্ত হয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল,

“তিথি, তুমি প্লিজ আমাদের মাঝে কথা বলো না তো!”

‘আমাদের মাঝে’ শব্দটা রুশদীর কানে সীসার মতো বিঁধল। সে বার্গারটা সরিয়ে রেখে কঠোর গলায় বলে উঠল,

“আমাদের মাঝে মানে? কথা বলার সময় নিজের সীমা বজায় রেখে কথা বলো ফাহাদ। তোমার সাথে আমার কোনো লেনদেন নেই, দয়া করে এখান থেকে যাও। আমাকে বাধ্য কোরো না তোমার নামে কমপ্লেন করতে। তোমাকে তো বহুবার বলেছি আমি বিবাহিত, তারপরও কেন কুকুরের মতো পিছে পড়ে আছো?”

ফাহাদ নাছোড়বান্দার মতো আবারও অনুনয় করল,

“রুশদী, প্লিজ আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো। আই রিয়েলি লাইক ইউ। তুমি যখন বলেছিলে তোমার ছেলে আছে, আমি বিশ্বাস করিনি। ভেবেছিলাম আমাকে এড়ানোর জন্য মজা করছো।আমি সত্যিই শকড! তুমি কীভাবে...”

ফাহাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই শের যেন অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। এই পচা ভাইয়া টাকে সে আগে থেকেই দু-চক্ষে দেখতে পারে না, তার ওপর সে আজ তার মমকে এভাবে বিরক্ত করছে! শের রুশদীর কোলের কাছ থেকে সরে এসে ফাহাদের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। নিজের ছোট্ট তর্জনী উঁচিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,

“এই পচা! তুমি আমার মমকে ডিস্টার্ব করছো কেন? তুমি জানো আমি কে?”

ফাহাদ অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমি জানি তুমি কে। তুমি পিচ্চি মানুষ, একটু সামনে থেকে সরো তো! আমার ওর সাথে জরুরি কথা আছে।”

বলেই ফাহাদ যখন শেরের কাঁধে হাত দিয়ে ওকে একপাশে সরাতে চাইল, শের মুহূর্তেই এক ঝটকায় ফাহাদের হাত সরিয়ে দিল। রাগে বাচ্চার মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে।শের রেগে একদম লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে। সে বলল,

“আমার মম এর সাথে আরেকবার কথা বলতে চাইলে তোমাকে মেরে ভর্তা বানিয়ে দেব! একদম টাচ করবে না আমাকে!”

শেরকে এভাবে কথা বলতে দেখে রুশদী কিছুটা বিস্মিত হলো।ফাহাদ ছেলেটা সুবিধের নয়, রাগের মাথায় বাচ্চার গায়ে হাত তুলে বসতে পারে। সে শেরকে টেনে আনতে চাইল,

“শের সোনা, এদিকে এসো তো!পচাদের সাথে কথা বললে তুমিও পচা হয়ে যাবে।ওর দিকে তাকাতে হবে না।”

কিন্তু শের একচুলও নড়ল না। সে কোমরে দু-হাত দিয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে ফাহাদকে ক্রুদ্ধ নয়নে মেপে দেখতে লাগল। ওর দৃষ্টিতে এমন এক তেজ, যেন ওই একরত্তি শরীরেই সে একটা আস্ত বডিগার্ড! রুশদী অপলক চেয়ে দেখল ওর ছোট্ট বডিগার্ডকে।বিড়বিড় করে বলল,'মাই অ্যাংরি বার্ড!'

ফাহাদ এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,

“তুমি প্লিজ সামনে থেকে সরো তো! ডিস্টার্ব করো না।”

ফাহাদ পুনরায় রুশদীর দিকে এগোতে চাইলে শেরের রাগ এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। রাগে ওর গোলগাল মুখটা একদম লাল টমেটো হয়ে উঠেছে। অ্যাংরি বার্ড এর মতো ফুঁসে উঠে সে হুমকি দিল,

“বেশি কথা বললে আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে বলে তোমাকে কলেজ থেকে বের করে দেব!”

ফাহাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আরে পিচ্চি, আমি নিজেই প্রিন্সিপালের ছেলে! এবার বলো, কী করবে?”

শের দমবার পাত্র নয়। সে বুক ফুলিয়ে পালটা জবাব দিল,

“তাহলে প্রিন্সিপাল স্যারকেও বের করে দেব! তুমি জানো না আমার পাপাকে? আমার পাপাকে বললে তোমাকে এই সিটি থেকেই বের করে দেবে।”

এতটুকু একটা ছেলের মুখে এমন ভয়ংকর সব হুমকি শুনে রুশদী আর তিথির হাসি পেয়ে গেল। বাচ্চার কী সাহস! কিন্তু ফাহাদ ততক্ষণে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। সে এক প্রকার বিরক্তির চোটে শেরকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। শের ঘাসের ওপর ছিটকে পড়ল। ফাহাদ ওসব পাত্তা না দিয়ে রুশদীর দিকে ঝুঁকে বলল, “রুশদী, শো...”

কথাটা শেষ করতে পারল না ফাহাদ। শেরকে ধাক্কা দিতে দেখে রুশদীর মাথার রগ দপদপ করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ফাহাদের গালে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কোত্থেকে কালো পোশাক আর সানগ্লাস পরা বিশালদেহী দুজন বডিগার্ড ঝড়ের বেগে ছুটে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ফাহাদের মাথায় রাইফেলের নল ঠেকিয়ে দিল।

আকস্মিক এই ঘটনায় ফাহাদ যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। থাপ্পড়ের জ্বালা ভুলে সে তখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছে। রুশদী দ্রুত শেরকে টেনে তুলল। ওর গায়ের ধুলোবালি ঝাড়তে ঝাড়তে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,

“তুমি ব্যথা পাওনি তোা?”

শের শান্ত গলায় উত্তর দিল, “না মম, পাইনি।” এরপর সে বডিগার্ড দুটোর দিকে তাকিয়ে আদেশ দিল, “একে এক্ষুনি গুলি মেরে দাও তো আঙ্কেল!”

এরা মূলত শারফারাজ খানের নিয়োগ করা সিকিউরিটি, যারা ছায়ার মতো শেরের আশেপাশের অবস্থান করে। একটু দূরে থাকে যাতে শেরের বন্দি বন্দি না লাগে।বডিগার্ডদের একজন রুশদীর দিকে তাকিয়ে কঠোর স্বরে অনুমতি চাইল, “ম্যাম, ক্যান উই শ্যুট?”

বিপজ্জনক পরিস্থিতি দেখে রুশদী এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল। ফাহাদের মাথায় বন্দুকের নল দেখে সে চিৎকার করে বলে উঠল, “না না না! শ্যুট করবেন না! ওকে ছেড়ে দিন, জাস্ট যেতে দিন।”

“ওকে ম্যাম,”

বডিগার্ড দুজন যান্ত্রিকভাবে বন্দুক নামিয়ে সরে দাঁড়াল।ফাহাদ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে, সে আর টু শব্দটি না করে ওখান থেকে উল্টো দিকে দৌড় দিল। রুশদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেরকে নিজের বুকের সাথে জাপটে ধরল।

—০—

সময়টা বিকেল। বিকেলের সোনাঝরা রোদ তখন চারদিকে মায়ার জাল বুনেছে।পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আভা আবির ছড়িয়ে বিদায় নিচ্ছে, আর নীড়ে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত।চারিপাশে মৃদু হাওয়া বইছে। খান বাড়ির প্রশস্ত সবুজ লনটা এখন এক ঝাঁক কবুতরের মেলায় পরিণত হয়েছে। বিচিত্র সব জাতের কবুতর,সবই ফারাজের শখের। ফারাজ এগুলো পালে। যদিও পরিচর্যার দায়িত্ব কর্মচারীদের ওপরই থাকে, ফারাজের কাজ শুধু দেশ-বিদেশ থেকে দামী আর সুন্দর কবুতরগুলো খুঁজে আনা।

লনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রুশদী আর শের। তারা মনের আনন্দে কবুতরগুলোকে খাবার দিচ্ছে। শ’খানেক কবুতরের সেই ডানা ঝাপটানো আর বাকবাকুম শব্দ,বেশ লাগছে তাদের কাছে।কোনোটা রুশদীর কাঁধে বসছে, কোনোটা শেরে’র হাতের তালু থেকে খুঁটে খুঁটে দানা খাচ্ছে।দু'জনেই খিলখিল হাসসে।

অফিসে কাজের চাপ কম থাকায় আজ দুপুর দুপুরের বাড়ি ফিরেছে ফারাজ।দরকার হলে আবার রাতে যেতে পারে অফিসে।নিজের ঘরের বারান্দায় পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছিল ফারাজ। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ।

হঠাৎ করেই ফারাজের দৃষ্টি থমকে গেল কবুতরদের খাবার দিতে ব্যস্ত রুশদীর ওপর।এক ঝাঁক সাদা কবুতরের মাঝখানে সাদা পোশাকে রুশদীকে মনে হচ্ছে এক শ্বেত পায়রা। বিকেলের হিমেল হাওয়ায় যখন তার চুলগুলো অবাধ্য হয়ে মুখের ওপর এসে পড়ল, রুশদী আলতো করে তা সরিয়ে দিল। সেই মুহূর্তে তার স্নিগ্ধ চেহারায় এক জাদুকরী হাসি ফুটে উঠল।যে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে এক স্নিগ্ধতা।

ফারাজ হাতের কফি না শেষ করেই লনে নেমে এল। তাকে দেখেও না দেখার ভান করলো, শের ও রুশদী।

ফারাজ ডাকল, "এই খাটো পটল, কথা আছে তোর সঙ্গে। "

ফারাজ আবারও এসব ফালতু নামে ঢাকায় বিরক্ত হলো রুশদী বলল,

"বলতে থাকুন মিস্টার ম্যানারলেস খাম্বা!"

"সিরিয়াস কথা, তুমি আমার দিকে তাকাও।"

রুশদী ফারাজের দিকে না তাকিয়ে কবুতরকে খাবার দেওয়ায় মনোযোগী হল। বলল,

"আমি কান দিয়ে শুনবো চোখ দিয়ে না।"

ফারাজ কিছুটা ধমকের সুরে শেরকে বলে,

"শের, এখান থেকে যাও!"

"চলো মম!" শের রুশদীর হাত ধরে চলে যেতে চাইল। কিন্তু ফারাজের কন্ঠস্বর এবার আরও কঠোর হলো, "রুশদী তুমি নয়, শুধু শের যাবে। শের, তুমি একা যাও!"

পাপার এমন রেগে যেতে দেখে শের দমে গেল। সে মাথা নিচু করে ছোট ছোট পায়ে সে লন থেকে প্রস্থান করল।

"বলুন এবার আপনার সিরিয়াস কথা। "

ফারাজ নিজের রাগটাকে দমিয়ে রাখল। সে শান্ত ও শীতল গলায় প্রশ্ন করল, "কলেজে প্রিন্সিপালের ছেলের সাথে আজ কী হয়েছিল তোমাদের? সবটা বলো।"

রুশদী ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "আপনাকে এসব কথা কে বলেছে?"

"বডিগার্ড বলেছে।"

"তাহলে তো সব শুনেই নিয়েছেন, আমাকে আবার প্রশ্ন করার কী মানে?"

ফারাজ একপা এগিয়ে এসে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "তবুও পুরো ঘটনাটা আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি। বলো আসলে কী হয়েছিল।"

রুশদী জেদি বালিকার মতো মুখ ঘুরিয়ে বলল, "আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।"

ফারাজের চোখ তখন রাগে লাল হয়ে উঠেছে।মেয়েটা কোনো কথার সোজা উত্তর দেয় না।

"লাস্ট বার বলছি রুশদী, মুখ খোলো। কী হয়েছিল বলো!"

"সরি, বলতে পারব না।"

রুশদীর এই এক কথা ফারাজের রাগটাকে যেন সীমানার বাইরে নিয়ে গেল।ফারাজ ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত গুঁজে রুশদীর দিকে আগুনের মতো চোখ গরম করে তাকালো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, রাগে রগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

"ঠিক আছে রুশদী।কাল সকালে প্রিন্সিপাল অফিসে তোমার আর আমার দেখা হচ্ছে।"

ফারাজের গলার স্বর শুনে রুশদীর বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল। সে বুঝতে পারল, ফারাজ কি করতে চাচ্ছে। আগামীকাল প্রিন্সিপাল অফিসে যাওয়া মানেই পুরো কলেজে জানাজানি হওয়া।এসব জিনিস নিয়ে এসে ঝামেলা মোটেও চায় না,এজন্যই ফারাজকে আগেই কিছু বলেনি। রুশদী কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ফারাজের চলে যাওয়া আটকাতে তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।

ফারাজ থামল ঠিকই, কিন্তু শীতল দৃষ্টিতে রুশদীর ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, "হাত ছাড়ো। আমাদের কথা বলা শেষ। এখন তুমি যাই বলো না কেন, আমি কিছুই শুনছি না।"

রুশদী হাত না ছেড়ে আদেশ এর স্বরে বলল, "আপনি প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে যাচ্ছেন না, ব্যস!"

"অবশ্যই আমি যাচ্ছি।"

"দেখুন, এমনিতেই আমার প্রেস্টিজের বারোটা বেজে আছে, দয়া করে সেটাকে তেরোটা বাজাবেন না। চারিদিকে সবাই আমাকে নিয়ে গসিপ করছে,আপনার সঙ্গে বিয়ে হওয়ায়।আপনি আগামীকাল গেলে তারা আরও একটা সুযোগ পেয়ে যাবে। দয়া করে পুরো কলেজের সামনে আমাকে হাসির পাত্র বানাবেন না।"

"তুমি আসলেই বোকা!"

"আমি বোকা নই! শুধু চাচ্ছি না আপনি কাল যান।"

"আমি যাচ্ছি, এটাই আমার শেষ কথা।"

রুশদী তাদের কলেজের চেয়ারম্যানের বউ এইটা জানার পর থেকেই তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা চলছে কলেজে।এর ভিতর যদি আবার ফাহাদকে নিয়ে কোন ঝামেলা হয় নতুন করে,তবে তো হলোই।

"তেড়ামো করবেন না তো! ঝামেলাটা আর বড় করার দরকার নেই। কলেজের সবাই আমাকে দেখে ফিসফিস করবে, এসব আমার একদম পছন্দ না। আমি আর গসিপের পাত্র হতে চাই না।"

"ভাবো, তুমি কতটা ভীতু! নিজের কলেজে গসিপের শিকার হচ্ছো অথচ অ্যাকশন নিতে ভয় পাচ্ছো। শোনো রুশদী, কাউকে দেখে যদি মনে হয় তোমাকে নিয়ে গসিপ করছে, সোজা তার হাতে টিসি লেটার ধরিয়ে দেবে। যারা তোমাকে নিয়ে কথা বলছে তাদের নামের লিস্ট করো, আগামীকাল আমি সবগুলোকে টিসি দিয়ে বের করে দেব।"

কথাটা বলেই ফারাজ গটগট করে ভেতরে চলে গেল। রুশদী কপালে হাত দিয়ে লনের ঘাসের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে।কাল থেকে কলেজে আবার নতুন ড্রামা শুরু হবে। ধ্যাত! কিছুই আর ভালো লাগছে না।

—০—

জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যার কালো সেই অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় তিথি মগ্ন ছিল তার বইয়ের পাতায়। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাক সেই নীরবতাকে ভাঙছিল।

"টু্ং!"

ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে তিথির।টুং! শব্দটা তিথির কানে গিয়ে বিধে। লহমায় তার একাগ্রতা টুটে গেল।সে পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিতেই দেখল,হোয়াটসঅ্যাপে একটি অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে।

তিথির সরু ললাটে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। কৌতূহল আর বিরক্তি মেশানো মনে মেসেজটি ওপেন করে,স্কিনের ভেসে ওঠা মেসেজটি পড়ল। লেখা,

"হ্যালো ডার্লিং!"

মুহূর্তেই তিথির বুঝল বার্তা দাতা কে! আঙুলের ডগায় দ্রুতলয়ে সে টাইপ করল,

"ব্লক খেতে না চাইলে ভদ্রমতো কথা বলুন, মিস্টার শানান খান।"

ওপাশ থেকে উত্তর আসতে দেরি হলো না।কয়েকটা অবাক হওয়ার ইমোজি পাঠিয়ে সে লিখল, "কীভাবে বুঝলে আমি? বুঝছি, একেই বলে দিলের টান!"

তিথির বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। মেকি আহ্লাদ আর সস্তা রোমান্টিসিজম তার দু চোখের বিষ। সে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে কড়া ভাষায় উত্তর দিল,

"কঁচু! নিজের চেহারার অত বড় একটা প্রোফাইল পিক দিয়ে রাখলে কে না চিনতে পারবে? তাছাড়া আপনার আইডি নামও সুন্দর করে লেখা আছে,শানান খান। এখন কাজের কথা বলুন।"

শান তিথির এই রূঢ়তাকেও উপভোগ করছে।আর পাঁচটা ছেঁচড়া প্রেমিকের মত,সস্তা ফ্লার্টিং শুরু করে, পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,

"কথা তো অনেক আছে, তুমি কোনটা শুনতে চাও?"

তিথি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে চুপ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। শানের এই পিছু লেগে থাকা, গায়ে পড়া স্বভাব তাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। সে জানে শান তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই অতিষ্ঠ করা আচরণ তিথির কাছে স্রেফ ছেলেমানুষি আর অভদ্রতা মনে হয়। তবে সম্পর্কে সে রুশদীর দেবর, সেই খাতিরেই তিথি এর সাথে এখনো রুড বিহেভি করেনি। নয়ত সে-ও তিথি! ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে নিরুত্তাপভাবে লিখল,

"আপনি যা বলার জন্য মেসেজ দিয়েছেন সেটাই বলুন। আর কোনো কথা না থাকলে মেসেজ দেওয়া বন্ধ করুন।"

"কাল কলেজ শেষে ওয়েট করিয়েন মিস তিথি সরকার।"

"কেন?"

"আমি আসব তাই।"

"তো আমি কী করব আপনি আসবেন তাতে?"

তিথির এই সরাসরি প্রত্যাখ্যানেও শানান অবিচল। সে সেই অচেনা, অজনা, স্লো পয়জনের মায়াজাল বুনছে। সে মেসেজ সেন্ড করলো,

"তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে তাই।"

"কেন করব?"

"কেন করবেন না?"

"কারণ আমার দরকার নেই।"

"আছে, আছে,দরকার আছে বেপস! আমি ঠিক সময়ে থাকব, তুমি ভুলেও আগে চলে যাবে না। টা টা! কাল দেখা হচ্ছে।"

মেসেজটি পাঠিয়েই শানান অফলাইনে চলে গেল, সে তিথিকে আর পাল্টা তর্কের সুযোগ দিতে চায় না সে। তিথি নীল হয়ে থাকা সিন অপশনটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। কোনো রিপ্লাই দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না সে। ফোনটা সজোরে টেবিলের ওপর উল্টে রেখে সে আবার বইয়ের পাতায় চোখ ফেরাল।

—০—

এস. কে. ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ—ঢাকা শহরের ব্যস্ততম বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠন।ঢাকার শহরের সবচেয়ে বড়,প্রতিষ্ঠানের ভিতর একটি স্কুল এন্ড কলেজটি।

হঠাৎ কলেজের পিয়ন এসে রুশদীর ডাক এলো। মুহূর্তেই রুশদীর হৃদস্পন্দন থমকে গেল, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল ভয়ে।কলিজায় ফুঁ দিয়ে কয়েকবার দোয়া-দরুদ পড়ে সে অত্যন্ত ভারী পায়ে প্রিন্সিপাল অফিসের দিকে পা বাড়াল।

প্রিন্সিপাল অফিসের দরজায় পৌঁছে অনুমতি চাই

"স্যার, মে আই কাম ইন?"

ভেতর থেকে গম্ভীর ও গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর এল,

"ইয়েস, কাম ইন।"

রুশদী ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল এক থমথমে পরিবেশ।প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী সেই পুরুষটি, পরনে দামী স্যুট-কোট, পায়ে পা তুলে অত্যন্ত দাম্ভিক আর গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে।গম্ভীর লোকটি ফারাজ।তার পাশের চেয়ারেই প্রিন্সিপাল স্যার বসে আছেন। আর তাদের একটু দূরে ফাহাদ মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।শের-ও আছে সেই রুমে।রুশদী গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল।

প্রিন্সিপাল স্যার সরাসরি রুশদীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "কাল ঠিক কী হয়েছিল রুশদী? তোমার তো কালকেই পুরো ব্যাপারটা আমাকে জানানো উচিত ছিল। কেন বলনি? এখন যা হয়েছে ঘটনার শুরু থেকে খুলে বলো।"

রুশদীর এসব নিয়ে বলার মত রুচি হচ্ছিল না।

রুশদীর এই জড়তা দেখে ফারাজ অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে বলল,

"স্যার, আমি এখানে ওকে জেরা করার জন্য ডাকিনি। আমি আপনাকে যা বলেছি সেটাই যথেষ্ট। আমার কথা কি আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না যে আপনি ওকে আবার জেরা করছেন?"

প্রিন্সিপাল ফারুখ আলম মুখমন্ডলে এক চিলতে বিনয়ী হাসি ফুটে উঠল, তবে সেই ছিল পরিস্থিতির চাপ। তিনি কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে বললেন,

"নো স্যার! আপনার কথা বিশ্বাস হবে না কেন? আমি তো কেবল..."

প্রিন্সিপালকে কথা শেষ করতে দিল না ফারাজ। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অত্যন্ত দৃঢ় সুরে বলল,

"বিশ্বাস যদি হয়ে থাকে, তবে ওর মুখ থেকে আবার শোনার কোনো প্রয়োজন আমি মনে করছি না। আমি এখানে সাধারণ কোনো অভিভাবকের মতো বিচার নিয়ে আসিনি যে আপনি বিচার করবেন। এটা আমার স্কুল, আমার কলেজ মিস্টার আলম ভুলে যাবেন না।"

ফারাজের রুক্ষতা এবং মালিকসুলভ দাপটের সামনে প্রিন্সিপাল যেন এক মুহূর্তে ক্ষুদ্র হয়ে গেলেন। মালিক পক্ষের মুখের ওপর কথা বলার দুঃসাহস বা সামর্থ্য কোনোটিই এই মুহূর্তে তার নেই। তিনি নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কোমল এবং বিনীত রেখে নিচু স্বরে বললেন,

"জ্বি স্যার, আমি বুঝতে পেরেছি।"

ফারাজ এবার তার শিকারের দিকে মুখ ফেরাল। সে স্থির দৃষ্টিতে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

"হে ইউ! তোমার নাম কী যেন?"

"ফাহাদ আলম।"

ফারাজ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ফাহাদকে পর্যবেক্ষণ করল। তার জহুরি চোখ জোড়া ফাহাদের পা থেকে মাথা অবধি মেপে নিল।২০-২১ বছরের এক যুবক, যে এখন লোকদেখানো মাথা নিচু করে বিনীত হওয়ার ভান করছে।কিন্তু ফারাজের বুঝতে বাকি নেই যে এই বিনয়ের আবরনের নিচে ফাহাদের ভেতরে এক রাগে, জেদে ফোসছে।ফারাজের ক্ষমতার জন্য চুপ রয়েছে সে। ফারাজ দাঁতে দাঁত চেপে প্রচণ্ড কড়া গলায় বলল,

"তো ফাহাদ, তুমি কি জানতে না যে রুশদী আমার ওয়াইফ আর শের আমার ছেলে?"

ফাহাদ মাথা নিচু রেখেই কাঁপা কাঁপা গলায় প্রতিউত্তর করল,

"রুশদী আপনার..."

"রুশদী ম্যাম! নট রুশদী।" ফারাজের কণ্ঠের হুঙ্কারে ফাহাদ কেপে উঠলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে রাগে।ফাহাদ ভেতরে ভেতরে চরম অপমানিত বোধ করল।রুশদীর সামনে এভাবে ছোট হওয়াটা তার পৌরুষে আঘাত হানলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "জ্বি... জানতাম ম্যাম আপনার ওয়াইফ।"

"জানতে? তারপরও তুমি ওকে বিরক্ত করতে? তুমি জানো তো আমি কে?"

"জ্বি স্যার, জানি।"

"তারপরও? তোমার সাহস অনেক ফাহাদ! তোমার কলিজা কয়টা বল তো? একটা নাকি দুইটা?"

ফাহাদ কোনোমতে উত্তর দিল, "একটা।"

"তুমি ভুল ফাহাদ। তোমার কলিজা দুইটা। তা না হলে তুমি শারফারাজ খানের বউকে বিরক্ত করার সাহস পেতে না। ওহ না, আমিও তো ভুল বলছি! তোমার কলিজা আসলে তিনটা। নাহলে তুমি শারফারাজ খানের ছেলেকে ধাক্কা দেওয়ার দুঃসাহস পেতে না। তোমার হাতে কি অনেক জোর ফাহাদ? হাতি ঘোড়া মারো নাকি?"

ফাহাদ কিছুটা ঘাবড়ালো।ফাহাদ এবার আতঙ্কিত হয়ে মিথ্যা বলার চেষ্টা করল।

"স্যার আমি... আমি আসলে ধাক্কা দিতে চাইনি!"

"সিসিটিভি ফুটেজ দেখাব তোমায়? আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলো না ফাহাদ।"

"সরি স্যার!" ফাহাদ আর পেরে উঠছিল না।

ফারাজ চিৎকার করে উঠল না, বরং খুব শান্ত কিন্তু ভয়ানক গলায় বলল, "তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি ফাহাদ! তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলার সাহস করো? এই জিবটা যদি এখন আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলি, তবে এই শহরের কারও বাপের ক্ষমতা নেই আমাকে আটকানোর।"

পুরো রুমে তখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। রুশদী এক কোণায় দাঁড়িয়ে,অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে ফারাজের ব্যক্তিত্ব তার ধরনার বাহিরে।ফারাজকে সে কখনও এতটা রাগান্বিত দেখেনি!

"রুশদী আমার সম্মান, আর তুমি সেই সম্মানে ধুলো ছেটানোর চেষ্টা করেছ! তোমার মতো রাস্তার ছেলেদের জন্য আমার হাতে রক্ত মাখাতে আমার সেকেন্ড খানেক সময়ও লাগবে না। মেরে পুঁতে ফেললেও এই শহরে কেউ আমাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা রাখে না।শোনো ফাহাদ, আজ থেকে যদি রুশদীর ছায়ার আশেপাশেও তোমাকে দেখি, তবে তোমার ওই একটা কলিজা আর শরীরে থাকবে না। আমি কি পরিষ্কার বোঝাতে পেরেছি?এখন মুখ ফুটে বলো—'জ্বি স্যার, বুঝতে পেরেছি'।"

ফাহাদের মুখ অপমানে নীল হয়ে গেছে, গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না।তবুও প্রাণভয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় সে বলল, "জ্বি স্যার... বুঝতে পেরেছি।"

"গুড। এবার আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও। মনে রেখো, দ্বিতীয়বার আমি আর কথা বলব না, সরাসরি অ্যাকশনে যাব। গেট আউট!"

ফাহাদ এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না। অপমানে তার কানঝাঁঝাঁ করছিল। হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার ঋজু ভঙ্গি আর পায়ের দাপট স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল,এই অপমান সে হজম করেনি। তার ভেতরে এখন প্রতিশোধের বিষাক্ত নীল দহন চলছে। তার চলন বলে দিচ্ছ, সে প্রতিশোধ নিবে।এদিকে প্রিন্সিপাল ফারুখ আলম কাঠের পুতুলের মতো নিজের চেয়ারে স্থির হয়ে আছেন। চাকরির ভয় আর মালিকপক্ষের দাপট তার মুখ বন্ধ করে দিলেও, তার নিজের ছেলেকে এভাবে অপমান করা আর তাকে পরোক্ষভাবে অপমান করাটা তিনি সহজভাবে নিতে পারেননি।

পুরোটা সময় রুশদী রুমের এক কোণায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটতেই চাইছে না। তার বড় বড় দু’টি চোখে -মুখে একরাশ হওয়া বিস্ময়। সে মনে মনে ভাবছে, ‘এই লোক এত সিনেমাটিক ডায়লগ কোত্থেকে শিখল?'

ফাহাদ চলে যাওয়ার পর ছোট্ট শের গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে রুশদীর আঙুল ধরে টানল। রুশদীর ধ্যান তখনো কাটেনি। সে যেন অন্য কোনো জগতে চলে গেছে। শের যখন দ্বিতীয়বার জোরে টান দিয়ে ডাকল, তখন তার তন্দ্রা টুটল। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল— "হুহ্!"

রুশদী নিচু হয়ে শেরের দিকে তাকালে, শের দুষ্টুমি মাখা মুখে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "পাপা অন ফায়ার..!

রুশদী কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখনো ফারাজের ওপর নিবদ্ধ। ফারাজ তখন তার দিকে এগিয়ে আসছে। রুশদী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফারাজ তার কবজি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।কোনো বাক্যব্যয় না করেই ফারাজ তাকে টেনে নিয়ে চলল অডিটোরিয়ামের দিকে। শের-ও রুশদীর অন্য হাত ধরে তাদের সাথে দৌড়াতে লাগল

অডিটোরিয়ামে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই।শিক্ষার্থী কানায় কানায় পূর্ণ। স্টেজে দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষক তখনো অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ফারাজ ঝড়ের বেগে স্টেজে উঠে গেল এবং সেই শিক্ষককে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে মাইক্রোফোনটা দখল করে নিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো অডিটোরিয়ামের, হাজার হাজার জোড়া চোখ এখন স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই তিন মানব-মানবীর ওপর স্থির।

ফারাজ তার গম্ভীর আর ভরাট কণ্ঠেবলতে শুরু করল,"আই থিঙ্ক অল অফ ইউ নো মি ভেরি ওয়েল!"

সারা হলরুম থেকে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,"ইয়েস স্যার!"

ফারাজ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জড়সড় রুশদীকে সবার সামনে আনল। রুশদী তখন লজ্জায় আর সংকোচে মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে। ফারাজ বজ্রকণ্ঠে বলতে শুরু করল,"আমার পাশে কলেজ ইউনিফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটি, শি ইজ মাই ওয়াইফ—রুমাইসা হক রুশদী। আমি তোমাদের একটা ওয়ার্নিং দিতে চাই। এটা আমার ফার্স্ট ওয়ার্নিং এবং দিস ইজ দা লাস্ট ওয়ান। ওকে নিয়ে কোনো আজেবাজে মন্তব্য বা কুৎসা যদি আমার কানে আসে, তবে টিসি পেপার হাতে নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থেকো।মনে রেখো, তোমাদের এখান থেকে একশ-দুইশ স্টুডেন্টকে টিসি দিলে আমাদের কলেজের কিছুই হবে না।হাজার হাজার স্টুডেন্ট এই কলেজের গেটে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটা চান্স পাওয়ার জন্য। সো, যদি সম্মান নিয়ে থাকতে চাও, তবে বিহেভ ইয়োরসেলফ! মাইন্ড ইট, আমি শারফরাজ খান শুধু বলার জন্য বলি না,সেটা করতে পারব বলে বলি।"

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন