ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

৯ম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মদীদ

৯.

—০—

খান বাড়িতে রুশদীর আজ বারো তম দিন। এই অল্প কদিনেই সে নিজেকে এই নতুন পরিবেশের সাথে বেশ মানিয়ে নিয়েছে।নিজের অজান্তেই সে খুঁজে পেয়েছে এমন এক পরিবার, যা সে এতদিন শুধু কল্পনাতেই এনেছিল।স্নেহমাখা শাসনের জন্য রাইমা খানের মতো একজন মা পেয়েছে, আর ছোট ভাই নাহিদের অভাবটা যেন সুদে-আসলে পূরণ করে দিয়েছে শান।মাতৃত্বের এক অদ্ভুত সুখানুভূতি রুশদীর মনে খেলা করে যখন পুচকি শের সারাটা দিন 'মম মম' বলে তার আঁচল ধরে ঘুরঘুর করে।

তবে খান বাড়ির একটা মানুষের সাথে রুশদীর দূরত্বটা এখনো রয়েই গেছে।তিনি হলেন শেহজাদ খান। রাজনৈতিক ব্যস্ততায় তিনি প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকেন, আর যখন থাকেন, তখন তার গাম্ভীর্য পুরো বাড়ি তখন একদম চুপ হয়ে থাকে। তাকে দেখলেই রুশদীর বুকটা ধক করে ওঠে, এক অজানা ভয়ে সে তটস্থ থাকে। তাই শ্বশুরমশাই বাড়িতে থাকলে রুশদী নিজের ঘর ছেড়ে বের হয় না।

খান বাড়ির প্রশস্ত লনে একটু খোলা বাতাস নিতে এলো রুশদী।তখন চারপাশটা বিকেলের নরম আলোয় ছেয়ে আছে। এ বাড়িতে করার মতো তেমন কিছুই নেই তার।সারাদিন শুয়ে বসে কেটে যায়, বোরিং লাগে খুব।কলেজ যাওয়া শুরু করা উচিত, অলরেডি অনেকদিন গ্যাপ পড়ে গিয়েছে।যতই হোক নতুন বউ, এ ব্যাপারে কাউকে মুখ ফুটে বলতেও পারছে না।তবে রাইমা খানকে বলে দেখলে মন্দ হয় না,রুশদী ভাবল এনিয়ে একবার কথা বলবে ওনার সঙ্গে।

লনের মাঝখানে ফারাজ বসে আছে—গায়ে ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর টি-শার্ট। সামনের টি-টেবিলে সাজানো হরেক রকমের ফল। ফারাজ খুব আয়েশ করে তার হাতে বসে থাকা রঙচঙে ম্যাকাও পাখিটাকে ফল খাওয়াচ্ছে।

​পাখিটাকে দেখে রুশদীর চোখে এক চিলতে বিস্ময় খেলে গেল। বেশ উত্তেজিত হয়েই সে ফারাজের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনি ফারাজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—

​"এই খাটো পটল, এদিকে এসো!"

​এমন ডাক শুনে রুশদীর চোখেমুখে কিঞ্চিৎ বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। ফারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।বিকেলের বাতাসে তার পিঠের ওপর আলগা করে বাঁধা চুলগুলো উড়ছিল।পরনে হালকা গোলাপি রঙের ছিমছাম সুতির কামিজ।রুশদীকে কাছে আসতে দেখে ম্যাকাও পাখিটা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল।সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে রুশদী কিঞ্চিৎ রাগান্বিত স্বরে বলল,

​"আপনি খাটো পটল কাকে বললেন?"

​ফারাজ শান্তভাবে ওর দিকে তাকিয়ে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল, "আশেপাশে তুমি ছাড়া আর কেউ আছে?"

​"নাহ্!"

​"তবে তোমাকেই বলেছি।"

ওদের বিয়ের অনেকটা দিন পেরিয়ে গিয়েছে।তবে রুশদী এখনও ঠিকঠাক লোকটাকে চিনে উঠতে পারেনি।খুব অদ্ভুত রকম লোক,হঠাৎ গম্ভীর হয়ে থাকে,আবার মাঝে মধ্যে অযথা কারন তুলে রুশদীর সঙ্গে ঝগড়া করার চেষ্টা করে।ঝগড়া না ঠিক, খুনসুটি বললেও চলে।লোকটার সবচেয়ে আজব ব্যাপার সে রুশদীর উপর স্বামীর অধিকার খাটাতে আসেন না, রুশদীকে নিজের মত থাকার সুযোগ দেন।বিয়ের প্রথম দিন গুলোতে ফারাজ এর সঙ্গে থাকতে এমনকি কথা বলতেও খুব অস্বস্তি হতো রুশদীর।এসব বুঝতে ফারাজ এর সময় লাগেনি, তাই কি রুশদীকে নিজের মত মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন তিনি?

রুশদী বলল,

"আপনাকে এসব নামে ডাকতে মানা করেছি না?"

​ফারাজ এবার সোজা হয়ে বসল। প্রশ্ন করল,

"তোমার হাইট কত?"

​"৫ ফুট ২ ইঞ্চি!" রুশদী বেশ জোর দিয়েই বলল।

​এবার ফারাজ উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে লম্বা একটা ছায়ার মতো রুশদীর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

"আর আমি ৬ ফুট!"

​"তো?"

​"তো... তুমি খাটো পটলই!"

​'খাটো পটল 'নামটা রুশদীর একেবারে অপছন্দ।মনে হয় তাকে অপমান করতে এই নামে ডাকা হচ্ছে।রুশদী এবার আরো বিরক্ত।গলার স্বর এক পর্দা চড়িয়ে বলল,

"আপনি আমার উচ্চতা নিয়ে খোঁচা দিচ্ছেন কেন?"

​"কই, না তো! আমি তো শুধু একটা নিক নেম দিলাম তোমার।"

​"আমাকে এসব ফালতু নামে ডাকার কোনো দরকার নেই। আমার নাম রুশদী। পারলে রুশদী নামে ডাকবেন, নয়তো নাম ধরে ডাকারই দরকার নেই।"

ফারাজ বুঝল রুশদী রেগে যাচ্ছে।মেয়েটার অভ্যাস খারাপ,ছোটখাটো বিষয়ে সহজেই রেগে যায়।রাগ একটু বেশি,আবার তার ফেভারিট কাজ হচ্ছে তর্ক করা।অপর ব্যাক্তির কথা পছন্দ না হলে চুপ থাকতে পারে না।মুখের উপর উত্তর দিতেই হবে তার।তবে এই সূত্র কার্যকর হয় শুধুমাত্র অপর ব্যাক্তি ফারাজ হলে।রুশদীর সম্পর্কে এতোটুকু টের পেয়েছে সে।ফারাজ রুশদীকে খোঁচাতে বলল,

"বাই এনি চান্স, তুমি কি রেগে যাচ্ছ?"

যতই হোক সে নতুন বউ, হাজবেন্ডের সঙ্গে তর্ক বা বেয়াদবি কোনটাই করার ইচ্ছা নেই রুশদী।বেয়াদবি দেখায়।তবে মন মত উত্তর না দিতে পারলে পেটের ভাত হজম হবে না তার।সে সামান্য রাগ দিয়ে বলল, ​"রাগব না? আপনি আমার শারীরিক গঠন নিয়ে আজেবাজে কথা বলবেন আর আমি রাগব না?আজব কথা!"

​"আমি কী আজেবাজে বলেছি?"

​"বলেননি? আচ্ছা, আপনি যেমন অস্বাভাবিক লম্বা, আমি যদি এখন আপনাকে 'খাম্বা' বলে ডাকি, আপনার কেমন লাগবে?"

​"ডাকতে পারো।তোমার ভালো লাগলে অবশ্যই ডাকতে পারো।"

রুশদী নিজেকে নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পেরে রাগান্বিত চোখে তাকালো ফারাজ এর দিকে।​রুশদীর রাগের মাত্রা বাড়তে দেখে ফারাজ এর হাসি পেল।ঠোঁটের কোণে হাসি টিপে রেখে বলল, "আরেহ, তুমি তো দেখি সিরিয়াসলি রেগে যাচ্ছ! বাই দ্য ওয়ে, রাগলে তোমাকে বেশ সুন্দর দেখায়, মিসেস খাম্বা!মাঝে মাঝে তোমার এর সৌন্দর্য দেখার জন্য হলেও তোমাকে রাগানোটা ফরজ হয়ে দাড়াবে আমার জন্য!"

হাজবেন্ডের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রশংসায় রুশদীর খুশি কম রাগ হলো বেশি,

"আপনি আসলেই ম্যানারলেস! মানুষের সাথে কথা বলার ন্যূনতম ভদ্রতা আপনার নেই।"

​রুশদী তাকে এনিয়ে কত বার 'ম্যানারলেস'বলেছে তার হিসেব নেই৷ফারাজ কিছু বললেই সে রুশদীর কাছে হয়ে যায় ম্যানারলেস।এদিকে বেচারা তো একটু বউকে পটানোর চেষ্টা করে!তার বউ এটা বুঝে না,কপাল পোড়া।ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

"আমি ম্যানারলেস হওয়ার মতো কী করলাম?"

​"কচু!"

​ফারাজ মুখ কুচকে বলল,"খাই না, গলা চুলকায়!"

​রুশদী এক মুহূর্ত ফারাজ এর দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা এমন কেন?বলল,

"আজব তো আপনি!"

​"কী আজব?"

​"আপনার মাথা!"

​ফারাজ এবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল, "আমার মাথা আবার কী দোষ করল?"

রুশদী উত্তর দেওয়ার বদলে সেখান থেকে গটগট পায়ে চলে গেল।রুশদী তর্ক তে একটু বেশি পটু। ফারাজ এর সঙ্গে এমন এক কথা দুকথা বলতে বলতে লেগে যেতে পারে বিশাল যুদ্ধ।এর চেয়ে ওখান থেকে প্রস্থান করাটাই বেশি বেটার মনে করল সে।

রুশদীকে এমন রেগে মেগে চলে যেতে দেখে ফারাজ হেসে উঠলো।এমন তুচ্ছ কারনে কেউ এতটা রেখে যেতে পারে,রুশদীকে না দেখলে বুঝত না সে।মেয়েটা আসলেই আজব,অদ্ভুত।বিয়েতে নিজেই না করে আবার নিজেই রাজি হয়েছে।প্রথম দেখায় রুশদীর অপছন্দের ব্যক্তি হয়ে উঠেছিল সে।তারপরও মেয়েটা বিয়ের পর থেকে চেষ্টা করছে ফারাজকে মেনে নেওয়ার।নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার।প্রশংসার যোগ্য সে।ইদানিং মেয়েটাকে দরুন লাগে তার।বউ বউ একটা ফিল আসে।যদিও রুশদীকে ফারাজ আগে থেকেই পছন্দ করে,বিয়ের পর আরেকটু বেশি পছন্দ হওয়ার কারন 'শের ও রুশদীর' বন্ডিং টা।ফারাজের কলিজার একাংশ তার ছেলে শের।সেই শেরকে যদি কেউ ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখে,তার প্রতি কি তরতর করে ভালোবাসা বেড়ে যাবে না ফারাজের?

রুশদী চলে যেতেই ফারাজ এর পোষা ম্যাকাও পাখিটা এসে ফারাজ এর কাধে এসে বসল।পাখিটার নাম সখ করে ফারাজ রেখেছে"ট্যাটো"।আধো আধো কিছু কথা বলতে পারে সে। ট্যাটো নিজের ভাষায় প্রশ্ন করল,

"এটা কে?এটা কে?"

ফারাজের দিকে তাকিয়ে ট্যাটো আবার বলল,

"নাম কি? নাম কি? "

"নাম রুশদী, কিন্তু তুই 'খাটো পটল' বলে ডাকবে ঠিক আছে?"

ট্যাটোকে কারো নাম শিখিয়ে দিলে সে সেটা মনে রাখতে পারে।ফারাজ রুশদীর নাম শিখিয়ে দিতেই ট্যাটো নিজে নিজে বলতে লাগলো,

"খাটো পটল! খাটো পটল!"

ফারাজ ট্যাটোর দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলো,

"বুঝলি ট্যাটো!বিয়ে একটা করেছি বউ মন বুঝেনা।আমাকে দেখলেই ছ্যাত করে উঠে।কথায় রসকষ নেই।জন্মের সময় হয়তো মুখে মধু দেয়নি।তাই,মধুর কথা বলতে পারেনা।বউ ভালো আছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, বউ মন বোঝে না।পছন্দ করে বিয়ে করে লাভ কি হলো বলতো?বলতেই পারলাম না তাকে আমি ভালো-টালো বাসি৷বাসর রাতে সাহস করে বলতে নিয়েছিলাম,বউ মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে কিছু মধুর বানী শুনিয়ে দিলেন।হাহ্!এখন কী করি?বউ তো থেকেই নেই।মনে হচ্ছে বউ ধার এনেছি,আবার ফেরত দিতে হবে।এখন কি করি বলতো?"

ট্যাটো মালিকের দিকে তাকিয়ে রইল।মালিকের এত কথা তার মাথায় ঢুকেনি।অবুঝ পাখিটা তাই উত্তরও দিতে পারছে না।ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে উত্তর চাইলো।ট্যাটো দুপাশে মাথা কাত করল মানে তার কাছে উত্তর নেই।ফারাজ বলল,

"বুঝবি না তো।কারন, তোর মাথাও আমার বউয়ের মতো ছোটো।"

—০—

খানবাড়ির দোতলার করিডোর। রুশদী ফারাজ এর রুমের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে ডাক এল,

"ওহ! ভাবি জি!"

​পেছনে ফিরতেই দেখল শান দাঁড়িয়ে।শান এর সঙ্গে তার বন্ধুত্বটা ভালোই হয়েছে,শান অনেক দুষ্টু প্রকৃতির।রুশদীর সঙ্গে কিছু না কিছু নিয়ে মজা করতেই থাকে সারাক্ষণ।দুষ্টুর কাতারে আরেকজন আছে,সিফাত।তবে ওর সঙ্গে রুশদীর তেমন একটা কথা হয় না।

রুশদী পিছনে ঘুরে বলল, "কিছু বলবেন?"

​শান ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এল।রুশদীর মুখে আপনি সম্মোধন তার পছন্দ না।রুশদীর কাছ থেকে পাওয়া এই সম্মানে সে নিজেকে অসম্মানিত মনে করে।সে কি ৭০ বছরের বুড়ো যে তাকে আপনি করে ডাকতে হবে?

"প্রথম কথা হলো, তুমি আমাকে 'আপনি' বলতে পারবে না। 'তুমি' করে বলবে। তুমি আপনি ডাকলে কেমন যেন সেন্টি মার্কা ভাব চলে আসে। আমি তোমার চেয়ে মাত্র দুই-তিন বছরের বড়! সো, এত সম্মানের আমার দরকার নেই।"

​রুশদী হেসেই ফেলল, "ওকে, তুমিই বললাম। এখন বলো, কিছু বলবে?"

​শান বুক ফাটা কষ্ট নিয়ে ও আক্ষেপ নিয়ে বলল,

"তোমার বোনের সমস্যা কী? পাত্তা দেয় না কেন আমাকে?"

​তিথি আগেই বলেছিল যে, শান নাকি তাদের বিয়ের দিনেই তাকে প্রপোজ করেছে। রুশদী পুরো ব্যাপারটাকে মজা হিসেবেই নিয়েছে।এত দ্রুত কেউ কারো প্রেমে পড়ে নাকি!সেও দুষ্টুমি করে বলল,

"আমি কী করে বলব? ওর হয়তো তোমাকে পছন্দ নয়!"

​শানের চোখমুখের ভঙ্গি বদলে গেল,

"কেন পছন্দ না? আমি কি দেখতে খারাপ? আমার নাক কি বোঁচা? আমি কি কালো? আমি কি খাটো? আমার চোখ কি টেরা? নাকি আমার মাথায় চুল নেই?"

শান এর এমন কথা শুনে রুশদীর বেশ হাসি পেল।​রুশদী হাসি চেপে মাথা নেড়ে সায় দিল,

"সবই তো... আছে!"

​"তাহলে কেন পছন্দ করবে না? তুমি ভাবি হয়ে আছো কী করতে? একটু পটিয়ে দাও। এইটুকু না করতে পারলে তো ভাবি জাতে কলঙ্ক লেগে যাবে!"

​"আমি কি ঘটক?"

​"হলে সমস্যা কী? দেবরকে একটা সেটিং করে দিতে না হয় হলে একটু ঘটক। তুমি আমার জন্য এইটুকু করতে পারবে না? একটা বিয়ে করিয়ে দাও ভাবি! আমাকে এমন বউহীনা এতিম দেখতে কি তোমাদের খুব ভালো লাগে? সবাই জোড়া জোড়া, শুধু আমিই কপাল পোড়া। দাও না ভাবি, দাও না একটা বিয়ে করিয়ে!"

রুশদী আর হাসি চেপে রাখতে পারল না, হাসতে হাসতে বলল, "সরি, পারব না!"

​বলেই রুশদী হাঁটা ধরল। শান নাছোড়বান্দা, সে পিছু পিছু আসতে আসতে সুর করে গেয়ে উঠল—

ও ভাবি, বিয়া করাই দেও না!

ও ভাবি ভাবি গো, মন তো ন মানে,

আরে বিয়া গরাই দাও না!"

—০—

​লনের দোলনায় একা বসে ছিল রুশদী। হঠাৎ সামনে ছায়া পড়তেই দেখল ছোট্ট শের দাঁড়িয়ে। তার হাতে একখানা বড় ডেইরি মিল্ক চকলেট। শের সেটা রুশদীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "এই নাও চকলেট!"

​শের ছেলেটা অদ্ভুত।সে মাঝেমধ্যেই রুশদীর জন্য ফুল বা ছোটখাটো উপহার নিয়ে আসে। রুশদীর সাথে ভাব জমানোর একটা নিরন্তর চেষ্টা থাকে ওর মধ্যে।শের এর এই কান্ড গুলো বেশ লাগে রুশদীর কাছে।রুশদীর মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য, পুচকুটার এই চেষ্টা গুলি পুচকুটাকে আরো বেশি স্পেশাল করে তুলেছে রুশদীর কাছে।

রুশদী চকলেটটা হাতে নিয়ে ম্লান হাসল। বলল,

"আমি তো চকলেট খাই না!"

​শেরের কপালে ভাঁজ পড়ল। "কেন?"

​"আমার পছন্দ না।"

​"কিন্তু মেয়েদের তো চকলেট খুব পছন্দ হয়!"

শেরের কণ্ঠে বিস্ময়।

​রুশদী চুপ করে রইল। আসলে ওর মাইগ্রেনের তীব্র সমস্যা। মিষ্টি জাতীয় খাবার বা চকলেট খেলেই যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যায়।তাই অনেক আগে থেকেই মিষ্টি খাওয়া একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছে সে।

​রুশদীর অনীহা দেখে শেরের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। সে নিজের ভাগের প্রিয় চকলেটটা মমের জন্য এনেছিল। ভাবছিল মম খুশি হবে।কিন্তু মমতো চকলেট খায় না বলছে। মুখটা নিচু করে সে বিড়বিড় করল,

"তাহলে তুমি খাবে না?"

​শেরের করুণ মুখটা দেখে রুশদীর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত অবুঝ একটা বাচ্চার মন খারাপ সে সহ্য করতে পারে না। মায়ায় পড়ে রুশদী চট করে বলল, "আরে, আমি তো তোমার সাথে মজা করছিলাম! চকলেট তো আমার খুব ফেভারিট।"

​শেরের চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

"সত্যি?"

​"হুম, একদম সত্যি!"

​রুশদী চকলেটটা খুলে ছোট এক টুকরো মুখে দিতেই শেরের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।রুশদী চকলেট টা গিলল না মুখেই রেখে দিল, নয়ত পরে এর মাশুল দিতে হবে ওর।শের আহ্লাদে রুশদীর গা ঘেঁষে দোলনায় উঠে বসল।বলল,

"আমি জানতাম তুমি পছন্দ করবে! জানো মম, এই চকলেটটা আমি পাপার থেকে গিফট পেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার জন্য রেখে দিয়েছি।"

"ওহ্ তাই নাকি?থ্যাঙ্ক ইউ চকলেটার জন্য! "

ওদের ভিতর কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। শের বেশ খুশি একটা 'মম' পেয়ে।মম টা তাকে অনেক অনেক আদর করে এর জন্য সে আরো খুশি।সবার মতো তারও একটা মা হয়েছে।সেও বলতে পারবে তার মা আছে।ওর মা'র কথা প্রশ্ন করলে আর বলতে হবে না,'আমার মা নেই'।রাতে ঘুমানোর সময় মা তার মাথায় বিলি কেটে দিবে।স্কুলের কোন প্রোগ্রামেও অন্যদের মায়েদের মতো তার মা তার সঙ্গে যাবে।সে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে,মা দৌড়ে গিয়ে কোলে তুলে নিবে।ইশ!শুধুমাত্র মায়ের এই আদর স্নেহ গুলোর বাকি ছিল ওর জীবনে।নয়তো পাপা তার কোন চাহিদাই অপূর্ণ রাখেনি।

হুট করে রুশদী প্রশ্ন করল,

"তোমার পাপা কেমন শের? "

রুশদীর প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শের। তার ছোট মাথায় কথাটির অর্থ ঢুকলো না। সে বোকা বোকা নয়নে তার মম এর দিকে তাকিয়ে শিশু সুলভ কন্ঠে বলল,

"পাপা তো পাপার মতই।"

"ভালো না খারাপ!"

"পাপাতো ভালোই!খারাপ কেন হবে?"

রুশদীও বোকা একটা বচ্চার কাছে একটা মানুষের পার্সোনালিটি জানতে চাচ্ছে।সে নিজেই নিজের কপাল চাপড়ালো, নিজের কান্ড দেখে।

রুশদী বলল,

"আচ্ছা বাদ দাও এটা।বলো আমাকে তোমার কেমন লাগে।"

এপ্রশ্নের উত্তর ছিলো শের এর কাছে।সে চমৎকার এক হাসি দিয়ে বলল,

"তোমাকে এত্তো গুলা ভালো লাগে।তুমি অনেক বেশি প্রিটি এন্ড সুইট।আ..ম.....ইউ আর দা মোস্ট বিউটিফুল গার্ল ইন দিস ওয়ার্ল্ড"

শেরের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়ে লাজুক হাসলো রুশদী।বড়োদের চেয়ে বাচ্চাদের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে ওর বেশি ভালো লাগে।বাচ্চারা পবিত্র হয়, ওদের ভিতর মিথ্যা থাকেনা।

"আমাকে এত সুন্দর লাগার কারন কি?"

শের খানিকটা ভেবে উত্তর দিল,

"অনেক গুলা কারন আছে।"

রুশদী ওর কথায় আরেকটু মনোযোগ দিল,

"বলতো সেগুলো।শুনি একটু।"

মম নিজে থেকে শেরকে প্রশ্ন করছে,এতে বেশ আনন্দ লাগছে ওর কাছে।শের বেশ বড়দের মতো বোঝানোর ভঙ্গিমায় বলল,

"ফার্স্ট অফ অল, তুমি আমার মম।মম মানে মা।আর মায়েরা কখনও অসুন্দর হয় না।শুধু মায়েরা না,পাপা বলেছে—কোনো মানুষই অসুন্দর না।যাদের মন সুন্দর না তারাই অন্যকে অসুন্দর বলে।"

"বাহ্!তোমার পাপা তো তোমাকে অনেক দারুন দারুন কথা শিখিয়েছে।আর কী কী শিখিয়েছে তোমার পাপা?"

শের মনে করার চেষ্টা করলে পাপা তাকে আর কি কি শিখিয়েছে।কিন্তু কিছু মনে পরল না।কত কিছুই তো শিখিয়েছে,অত কিছু কি আর মনে থাকে?

"মনে পড়ছে না তো মম!"

"উম!তাহলে আমার অন্য গল্প করি।তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো?"

শের এক মুহূর্ত দেরি হলো না উত্তর দিতে,

"অবিয়াসলি পাপাকে?"

"কেন?"

"আই ডোন্ট নো মম!বাট,পাপাকে ছাড়া একদম ভালো লাগে না।পাপা দূরে গেলে আমার অনেক কষ্ট হয়।তুমি যখন ছিলে না,তখন তো আমার মা ছিল না।পাপা ছিল শুধু।পাপা আমাকে সব রকম আদর করত।পাপাই আমার পাপা & মম ছিলো।আমি কান্না করলে পাপাও কান্না করত।"

-

ফারাজ বাসায় না থাকলে শেরকে প্রতিদিন তার দাদু রাইমা খান খাইয়ে দেন। তবে আজকের দিনটা ভিন্ন ; আজ তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছে তার মম—রুশদী। মায়ের ভালোবাসার এই ওমে ধীরে ধীরে শেরের মাতৃহীন জীবনের শূন্যস্থানটা যেন এক অদ্ভুত পূর্ণতায় ভরে উঠছে। যার মা নেই, কেবল সেই বোঝে এই অনুভূতির আসল মূল্য। বুকের ভেতরের এতদিনের চাতক পাখির মতো তৃষ্ণাটা যখন একটু একটু করে মায়ের আদরে মিটতে শুরু করে, তখন মনের ভেতর ঠিক কতটা আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়!

দুপুরের খাবারের পর শের কিছুক্ষণ দাদুর বেডরুমে সময় কাটাল।শেরের বেশিরভাগ সময় কাটে সিফাত আর শানের সঙ্গে। বয়সের বিস্তর ফারাক থাকলেও ওরা বন্ধুর মতো। তিনজনে মিলে সারাটা দিন এমন সব অদ্ভুতুড়ে দুষ্টুমিতে মেতে পুরো বাড়ি মাথায় করে রাখে। কিন্তু আজ শেরের সেই দুই দোস্ত উধাও! তার ঝিংকু চাচু সকাল সকাল কোথায় যেন বেরিয়েছে, আর সিফুরও আজ সারা দিনে কোনো পাত্তা নেই।

শেহজাদ খানকে রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরেই কাটাতে হয়। তবে বাড়িতে ফিরলে যতটুকু সময় হাতে পান, তার পুরোটাই উজাড় করে দেন প্রিয় নাতির জন্য। আজ বাড়ি ফেরার সময়ও তিনি নাতির জন্য একগাদা উপহার নিয়ে এসেছেন।খেলনা আর উপহারগুলো নাতির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমু খেলেন। খান বাড়ির সবার চোখের মণি এই শেহরান খান শের। সে এই বাড়ির রত্ন, সবার অন্ধের যষ্টি। বাড়ির প্রতিটি মানুষের সমস্ত আদর আর আবদার যেন এই একটা ছোট্ট প্রাণকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাকে ছাড়া যেন এ বাড়ির চার দেয়ালে কোনো প্রাণই থাকে না।

দাদুর কাছ থেকে পাওয়া উপহারগুলো দুহাতে জড়িয়ে ধরে শের মহা উচ্ছ্বাসে নিজের রুমে এল। ঘরে ঢুকেই ভাবল, উপহারগুলো তার মমকে দেখাবে। সেগুলো বিছানায় যত্ন করে রেখে সে দেখল, মম বারান্দার দোলনাটায় একা বসে আছে। শের গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মমকে ডাকল। রুশদী খুব ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জমে থাকা উদাসীনতা দেখে মনে হলো মনের আকাশে কোথাও যেন মেঘ জমেছে, তার ভীষণ মন খারাপ। শের কৌতূহল নিয়ে একটার পর একটা প্রশ্ন করে চললেও রুশদী খুব ছোট ছোট উত্তরে দায়সারাভাবে কথা শেষ করল। মমর এমন মনমরা ভাব দেখে শেরের ছোট্ট মনটাও কেমন যেন দমে গেল। সে চুপিচুপি রুমে ফিরে এসে তার ট্যাব দিয়ে পাপা-কে ফোন লাগাল।

ওপাশ থেকে রিং হতেই ফিসফিসিয়ে বলল, "হ্যালো, পাপা!"

ফারাজ ওইপাশ থেকে বলল,

"হুম!পাপা বলে।"

শেরের গলাটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল, সে ভীষণ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "পাপা, মম কি আমার ওপর রেগে আছে?"

ছেলের ওমন ভেজা কণ্ঠ শুনে ফারাজের মনেও চিন্তার মেঘ জমে উঠল। সে ফাইলের ওপর থেকে কলমটা নামিয়ে রেখে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, "তোমার মম কেন হুট করে রেগে থাকবে, পাপা? তুমি কি কোনো দুষ্টুমি করেছ?"

"নো পাপা! আমি কোনো দুষ্টুমিই করিনি! কিন্তু মম আমার সঙ্গে ভালোমতো হেসে হেসে কথা বলছে না। মম কি আমাকে ইগনোর করছে?"

বলতে বলতে শেরের ছোট্ট মনটা একদম ভারী হয়ে উঠল। বুক চিরে ওর এখন জোরে জোরে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। জন্মের পর থেকে যে অবোধ শিশুটি মাতৃস্নেহের এক ফোঁটা স্বাদ পায়নি, সে প্রথম দিন থেকেই রুশদীকে নিজের গর্ভধারিণী মা বলে মেনে নিয়েছে; ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে তাকে। নিষ্পাপ বাচ্চাটার মনে একটা সুপ্ত আশা—তার মম তাকে সবসময় ভালোবাসবে, আদর করবে। কিন্তু মম আজ ওভাবে মন খারাপ করে বসে আছে, কোনো প্রশ্নেরই ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছে না—এতেই শেরের মনে হচ্ছে মম হয়তো তার ওপর রাগ করে আছে, কিংবা তাকে আর মোটেও পছন্দ করছে না। জীবনের শুরুতে মা ছাড়া বাচ্চাটা অবশেষে পাওয়া এই নতুন মাকে আবারও হারিয়ে ফেলার এক তীব্র আতঙ্কে বাচ্চাটার চোখে জল চলে এল।

ফারাজ ওপাশ থেকে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, "তোমাকে ইগনোর করবে কেন, পাপা? তুমি তো একদম লক্ষ্মী একটা ছেলে, মোটেও পচা বেবি নও। তোমার মম এখন কী করছে?"

"মম দোলনায় বসে আছে পাপা... একদম মুড অফ করে!"

ফারাজ খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেল। রুশদী কি সত্যিই শেরকে এড়িয়ে চলছে, যার কারণে শের এর এমন মন খারাপ?নাকি শের ভুল বুঝছে?রুশদীকে সে যতটুকু চিনেছে, তাতে এটুকু সে হলফ করে বলতে পারে—শেরেকে কষ্ট দেওয়ার মতো মেয়ে রুশদী নয়।

শেরের কাঁদো কাঁদো কণ্ঠস্বর আচমকা এক চরম বিস্ময়ে রূপ নিল। সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, "পাপা! মম... মম কান্না করছে!"

"তোমার মমের বোধহয় মন খারাপ।তুমি মমের পাশে গিয়ে বাে থাকো, আমি আসছি।এসে তোমাদের ঘুরতে নিয়ে যাব, ওকে?"

—০—

ফারাজের ঘরের বারান্দায় ল্যাভেন্ডার রঙের একলাফে চোখে পড়া একটা বিশাল দোলনা আছে।পড়ন্ত দুপুরে রুশদী সেখানেই জড়সড় হয়ে বসে ছিল।পাশেই আছে ছোট্ট শের।বাচ্চাটা সারাক্ষণ রুশদীর ছায়ার মতো লেগে থাকে; যেন এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হলেই রুশদী কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাবে।

আজ রুশদীর মনটা বড় ভার। বাবার স্মৃতিগুলো অবাধ্য হয়ে বারবার ফিরে আসছে। কিছু স্মৃতি ভুলে থাকতে চাইলেও ভোলা যায় না, সেগুলো আমৃত্যু বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা হয়ে বেঁচে থাকে। নিজের বর্তমানের চেয়েও ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা ভেবে তার দুশ্চিন্তা বেশি হচ্ছিল। নাহিদা চেয়েছিলেন ছেলেকে বিদেশে বোনের কাছে পাঠিয়ে দিতে, আনাস হকও স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করানোর।খান পরিবার থেকে পাওয়া টাকায় সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন একটা আশা ছিল ওনাদের।কিন্তু খান পরিবার এক পয়সাও দেয়নি। এই নিয়ে বাড়িতে যে কী অশান্তি হচ্ছে আর নাহিদা যে কী বিষোদ্গার করছেন, তা ভেবেই রুশদীর বুক কাঁপছে।

নিজের বিষণ্ণ ভাবনায় রুশদী এতটাই মগ্ন ছিল যে, ফারাজ কখন এসে সামনে দাঁড়িয়েছে তা টেরই পায়নি সে। ফারাজ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল রুশদীকে।দেখল তার উদাসীন চোখ দুটো। তারপর গলা পরিষ্কার করে হালকা স্বরে ডাকল,

"ঘুরতে যাবে?"

ফারাজের কণ্ঠস্বরে চমকে উঠে চোখ তুলে তাকাল রুশদী। একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

"জি?"

"কোথাও থেকে ঘুরে আসবে?"

রুশদী দ্বিধায় পড়ে গেল। ফারাজ কি তাকে নিয়ে একান্তে সময় কাটাতে চাইছে?বিয়ের পর ওরা এখনও স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীদের মত সম্পর্কে যেতে পারে নি,হয় এজন্যই।সরাসরি না বলাটা কি ঠিক হবে? দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা রুশদীর বদলে জবাবটা দিল শের। ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেই সে খুশিতে নেচে উঠে বলল,

"হ্যাঁ! চলো, চলো ঘুরতে যাই!"

রুশদী একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,

"কোথায় যাবেন?"

ফারাজ সরাসরি তাকাল তার চোখের দিকে, "তোমার পছন্দের কোনো জায়গা আছে?"

রুশদী নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল, "না।"

"আচ্ছা, তাহলে ঝটপট তৈরি হয়ে নাও।"

রুশদী আকাশের রোদের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে বলল, "এই ভরদুপুরে যাবেন?"

"আগে রেডি তো হও! রেডি হতে হতেই বিকেল হয়ে যাবে।"

বিকেলের রোদে তখন এক মায়াবী আভা। ফারাজ প্রথমে ভেবেছিল শহরের কোলাহল এড়িয়ে দূরে কোথাও যাবে, যেখানে ভিড় নেই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, মানুষের ভিড়ে মিশে না গেলে তো ঠিক ঘোরাঘুরির অনুভূতিটা পাওয়া যায় না। তাই সে রুশদী আর শেরকে নিয়ে সোজা চলে এল উত্তরার 'দিয়াবাড়ি'তে।

দিয়াবাড়ির এই দিকটা বিকেলে একদম মেলা হয়ে যায়। একদিকে লেকের শান্ত জল, অন্যদিকে একের পর এক ফুচকার দোকান, নাগরদোলার কিঁচকিঁচ শব্দ আর পরিবার নিয়ে আসা অসংখ্য মানুষের কলরব।

ফারাজ আর শান দুজনেই বেশ শখ করে দুটো দামি বাইক কিনেছিল, কিন্তু ওগুলো গ্যারেজেই পড়ে থাকে বেশি।আজ শখ করেই বাইক দুটো বের করা হয়েছে।ওদের সঙ্গে সিফাতকেও আসতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তার ঘুরতে যাওয়ার মুড নেই বলে আসেনি।লেকপাড়ের একটা খোলা জায়গায় তারা বাইক পার্ক করল।তাদের সাথে সাথে আরও দুটো বাইকে করে চারজন বডিগার্ড এসেছে। শেহজাদ খানের কড়া নির্দেশ—পরিবার নিয়ে বের হলে নিরাপত্তা ছাড়া বের হওয়া চলবে না। শত্রুর অভাব নেই চারদিকে, তাই সেফটির ব্যাপারে আপস নেই। তবে ফারাজের এভাবেই ঘোরার ইচ্ছে ছিল না।তার পছন্দ না এভাবে গার্ড নিয়ে ঘোরা।তাই, সে বডিগার্ডদের একটু দূরে থাকতে বলে দিল যেন সাধারণ মানুষের নজরে তারা আলাদা হয়ে না পড়ে। নয়তো মানুষ এমনভাবে তাকিয়ে থাকবে যে আর স্বস্তিতে আর ঘোরা যাবে না।

বাইক থামতেই রুশদী ফারাজের পেছন থেকে নামল। ওর চোখেমুখে এখনো আড়ষ্টতা। ওদিকে শানের বাইক থেকে শের লাফ দিয়ে নেমে এক ছুটে লেকের ধারের দিকে গেল। ওরা লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল। বাম পাশে স্থির জলরাশি আর ডান পাশে ফুচকার দোকানগুলোর সারি। মাঝখানের রাস্তা দিয়ে তাদের মতোই অনেক পরিবার গল্প করতে করতে এগোচ্ছে।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা একটা ফুচকার দোকানে বসল। তারা অর্ডারও দিল।রুশদী আর ফারাজ এক পিসও মুখে তুলল না। শান আর শের কয়েক পিস মুখে তুলতেই আর খাওয়ার রুচি রইল না তাদের।প্লেট ভর্তি ফুচকা রেখেই ওরা উঠে পড়ল।

শের রুশদীর হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছে। শান আর ফারাজ তাদের থেকে কয়েক কদম পিছিয়ে। রুশদীকে বিয়ে করার পর ফারাজের মনে যে ভয়টা পাহাড় সমান হয়ে চেপে বসেছিল, তা হলো শেরকে নিয়ে। যদি রুশদী বাচ্চাটাকে মেনে নিতে না পারত, তবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ফারাজকে দহনে পুড়তে হতো। একটি ভুল সিদ্ধান্তের মাসুল দিতে হতো ওই অবুঝ শিশুটিকে।

কিন্তু ফারাজ নিজেকে আজ বড় ভাগ্যবান মনে করছে। শের যে দিন থেকে রুশদীকে নিজের মা হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে, রুশদীও ঠিক ততটাই আপন করে নিয়েছে তাকে।বিয়ের পর থেকে ছেলেটা সারাক্ষণ রুশদীর আঁচল ধরেই ঘুরে বেড়ায়, অথচ আগে সে এক মুহূর্ত ফারাজকে ছাড়া থাকতে পারত না। সৎ মা মানেই অবহেলা আর অনাদর—এই চিরচেনা ধারণাটিকে রুশদী হয়তো ভুল প্রমাণ করে দেবে, এই ভরসাটুকু ফারাজ নিজের অজান্তেই মনে লালন করতে শুরু করেছে।সামনে ওই মা-ছেলের হাঁটার ছন্দ দেখে ফারাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

শান আর শের নাগরদোলার টিকিট কাটতে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল।রুশদী আর ফারাজ একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইল।ফারাজ লক্ষ্য করল, রুশদীর বিষণ্ণতা এখনো কাটেনি।সে আনত নয়নে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে; তার স্মৃতির পাতায় বাবার মুখটা বারবার ভেসে উঠছে তার।মেয়েটিকে আজও বলা হয়নি,সে মেয়েটিকে ভালোবাসে।বলা হয়নি,এক প্রকার পাগলই সে মেয়েটির।মনের মানুষের এমন মন খারাপ কি সহ্য করা যায়?

ফারাজ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কি নাগরদোলায় চড়বে?"

রুশদী ক্লান্ত চোখে তাকাল। নিস্পৃহ গলায় বলল,

"না, ওসবে চড়লে মাথা ঘুরে বমি পায়।"

"ওহ্! অন্য কিছু খাবে?"

"না।"

"আশেপাশে তাকিয়ে দেখো আগে, হয়তো কিছু একটা খেতে ইচ্ছে করবে।"

রুশদী অনিচ্ছাসত্ত্বেও চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ছোট করে বলল, "নাহ্, কিছুই পছন্দ হচ্ছে না।"

"তবে কোনো ভালো রেস্টুরেন্টে যাই চলো?"

"আমার আসলেও কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনারা খেতে চাইলে চলুন।"

রুশদীর অনীহা দেখে ফারাজ আর কথা বাড়াল না। কিছুক্ষণ পর শান আর শের রাইড শেষ করে ফিরে এল। নাগরদোলায় চড়ার সময় খুব বাহাদুরি দেখালেও নামার পর শেরের অবস্থা করুণ।বেচারার সব এনার্জি নিমিষেই উবে গেছে। এখন সে শানের কোলে ক্লান্ত লতার মতো মাথা এলিয়ে দিয়েছে চাচুর কাঁধে।

মূলত রুশদীর মনটা একটু ভালো করার জন্যই আজ এখানে আসা। কিন্তু তাকে এখনো উদাসীন দেখে ফারাজ নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

"চলে যাবে, নাকি আর কিছুক্ষণ থাকবে?"

রুশদী একটু ভেবে নিয়ে বলল, "এদিক দিয়ে আরেকটু হাঁটি? বাতাসটা বেশ ভালো লাগছে।"

তারা আবার লেকের পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল। এখন গোধূলি লগ্ন। আকাশে রঙের খেলা চলছে—নীল আর কমলা মিলেমিশে এক অপূর্ব মায়ার সৃষ্টি করেছে। লেকের ওপর দিয়ে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া রুশদীর অবাধ্য চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছিল বারবার। নাগরদোলার ঝক্কি সইতে না পেরে শের শানের কাঁধেই ঘুমিয়ে পড়েছে। শান ওদের থেকে কিছুটা এগিয়ে হাঁটছে, আর পেছনে পা মিলিয়ে হাঁটছে ফারাজ ও রুশদী। তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা; ফারাজ ভাবছে কী করে রুশদীর মনের ভার কমানো যায়, আর রুশদী ভাবছে জীবনের এই বদলে যাওয়া সমীকরণগুলো নিয়ে।

ফারাজের পরনে আজ ধবধবে সাদা ফর্মাল প্যান্ট আর আইস ব্লু শার্ট। পায়ে ম্যাচিং স্নিকার্স। অন্যদিকে রুশদী আজ সাদা পায়রা।পরনে শুভ্র থ্রি-পিস, ওড়নাটা এক কাঁধ থেকে অবহেলায় ঝুলে আছে। ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিকের ছোঁয়া আর পিঠ পর্যন্ত খোলা চুল—ব্যস, এই সাধারণ সাজেই তাকে অনন্য লাগছে।ফারাজের দীর্ঘ দেহের পাশে রুশদীকে খানিকটা খাটো দেখালেও, পাশ থেকে তাদের দুজনকে দারুণ মানিয়েছে।

হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটল। "উফ!" শব্দ করে পা মচকে রুশদী প্রায় বসে পড়তে যাচ্ছিল। রুশদীর হিল জুতো পরার একদম অভ্যাস নেই, আজ শখ করে পরেছে ঠিকই কিন্তু তাল সামলাতে পারছিল না। ও পড়ে যাওয়ার আগেই ফারাজ বিদ্যুৎবেগে ওর বাহু খপ করে ধরে ফেলল। শক্ত হাতে আগলে ধরে ফারাজ উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

"কী হলো?ব্যথা পেয়েছো?"

রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করে বলল, "কিছু না, চলুন।"

ফারাজ ভ্রু কুঁচকে ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল, "হিল পরে হাঁটতে পারো না তো পরেছ কেন? এখনই খোলো এগুলো।"

রুশদী অবাক হয়ে তাকাল, "কী!"

" হিল জুতো খোলো!"

"না, সমস্যা নেই।"

"বেশি কথা আমার পছন্দ না। খুলতে বলছি খোলো! হিল পরে তো হাঁটতেই পারছ না।"

পায়ের গোড়ালিতে বেশ মোচড় লেগেছে রুশদীর, ব্যথায় টনটন করছে চারপাশ। ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকাই দায়, সেখানে হাঁটা তো বিলাসিতা। তবুও জেদ ধরে সে বলল, "বললাম তো সমস্যা নেই।"

ফারাজ লক্ষ্য করল মেয়েটা ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, তবুও জেদ ছাড়ছে না।ফারাজ শুরু থেকেই খেয়াল করেছে রুশদী হিল পড়ে হাঁটতে পারছে না ঠিকঠাক।মেয়ে ভাঙবে তবু মচকাবে না।এবার ফারাজ একটু ধমক সুরে বলল, "চুপচাপ হিল খোলো!দাঁড়িয়ে থাকতে পারছ না আবার বলছে সমস্যা নেই।"

এত কিছুর পরেও রুশদী স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, নড়ার কোনো লক্ষণ নেই। ফারাজ বুঝল, এই মেয়ে সহজে হার মানার পাত্রী নয়। সে চারপাশের শত শত মানুষের তোয়াক্কা না করে হুট করেই এক হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে পড়ল রুশদীর পায়ের কাছে। ফারাজের এমন আকস্মিক কাণ্ডে রুশদী আঁতকে উঠল। সে পিছু হটার চেষ্টা করতেই ফারাজ শক্ত করে ওর বাম পা-টা ধরে ফেলল এবং অতি সাবধানে হিল জুতোটা খুলতে শুরু করল।

রুশদী অপ্রস্তুত হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "পাগল নাকি আপনি? কী করছেন ?"

ফারাজ নিজের কাজে মগ্ন থেকেই গম্ভীর গলায় জবাব দিল, "যা করছি চুপচাপ করতে দাও।"

"আরে উঠুন! মানুষ দেখছে।সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।পা ছাড়ুন!" কিছুটা কড়া গলায় বলল রুশদী।

ফারাজ নিস্পৃহভাবে বলল, "দেখলে দেখুক,সমস্যা কি তাতে?"

আশেপাশের অসংখ্য মানুষ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। রুশদী লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে; ফারাজের মতো একজন মানুষ মাঝরাস্তায় এভাবে নিচু হয়ে তার জুতো খুলে দিচ্ছে, এটা ভাবতেই তার গাল লাল হয়ে উঠল। লোকটার কি একটুও লজ্জা লাগছে না?

রুশদীর দু-পা থেকে হিল জোড়া খুলে ফারাজ নিজের হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। রুশদী ফারাজ এর দিকে কিঞ্চিত রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে "এখন কি আমি এভাবে খালি পায়ে হাঁটব?"

ফারাজ কোনো উত্তর না দিয়ে নিচু হয়ে নিজের স্নিকার্সের ফিতে খুলতে শুরু করল। তারপর নিজের জুতো জোড়া রুশদীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "নাও, এগুলো পরো।"

রুশদী হতভম্ব হয়ে যাচ্ছে ফারাজ এর কান্ড দেখে।লোকটা এমনও?সে বলল, "না! আপনি আমার হিল দিন।"

রুশদী হাত বাড়িয়ে হিল দুটো নিতে চাইল, কিন্তু ফারাজ ক্ষিপ্র হাতে সেগুলো নিজের পিঠের আড়ালে নিয়ে নিল। তারপর শাসন মেশানো গলায় বলল, "তোমাকে যেটা বলেছি, সেটা করো।"

ফারাজের সাথে তেরামো করে লাভ হবে না বুঝতে পেরে রুশদী চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো বড় বড় স্নিকার্স গুলো পড়ে নিল।রুশদীর পা অনুযায়ী অনেকটাই বড় স্নিকার্স গুলো।রুশদী ফিতা টাইট করে বাধল,যেন ঢিল না লাগে।তবুও ফারাজের পায়ের মাপের তুলনায় জুতোজোড়া তার পায়ে অনেক বড় দেখাচ্ছিল। জুতো পরে রুশদী আবার হাত বাড়িয়ে বলল, "হয়েছে তো? এবার আমার হিলগুলো দিন।"

ফারাজ সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, "সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটো।"

রুশদী দ্রুত পায়ে তাকে অনুসরণ করতে করতে খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলল, "জুতো জোড়া আমার হাতে দিতে বললাম না?আমার কথা কি আপনার কানে পৌঁছায় না?"

"আমার হাতে থাকলে তোমার সমস্যা কী?"

"অন্যদের কথা বাদ দিলাম, শান ভাইয়া দেখলে কী ভাববে?"

ফারাজ গলা চড়িয়ে একটু উচ্চস্বরেই বলল, "শান! পেছনে তাকাবি না একদম।"

শান ঘটনার শুরু থেকেই সবকিছু আঁচ করতে পেরেছিল। কিন্তু ওরা লজ্জা পেতে পারে ভেবে সে এতক্ষণ পেছনে তাকায়নি, নিজের মতো ধীর পায়ে হাঁটছিল। ফারাজের কথা শুনে সে হাত দিয়ে স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গি করে পিচনে ফিরে মুচকি হেসে বলল, "ওক্কে সাব! হুকুম তামিল হবে।"

আবার সে সামনে ফিরে হাঁটা শুরু করল। রুশদী এবার চরম লজ্জায় পড়ে গেল। সে বাম হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে নিচু গলায় দাঁতে দাঁত চেপে ফারাজকে বলল, "এটা বলার খুব প্রয়োজন ছিল? "

"শান আর পেছনে ফিরে দেখবে না, তুমি এখন নিঃসংকোচে হাঁটতে পারো।"

ফারাজের কথা শুনে রুশদী আর উচ্চবাচ্য করল না। সে মনে মনে ভাবল—এই লোকের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। তার যখন এতই শখ, তখন মেয়েদের জুতো হাতে নিয়েই হাঁটুক! তাতে তার কী?

ওরা ওভাবেই পাশাপাশি পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। ফারাজের এক হাতে একজোড়া সুরুচিপূর্ণ মেয়েলি হিল জুতো, আর তার পাশেই হাঁটছে রুশদী—যার পায়ে ফারাজের সেই বিশাল আকৃতির স্নিকার্স। বউ এর জুতো জোড়া হাতে নিয়ে,ফারাজ নিজে এখন খালি হাঁটছে।পেছন থেকে এই দৃশ্যটি যে কাউকে থমকে দিতে বাধ্য; ফারাজকে দেখতে ঠিক 'হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল'-এর মতো লাগছে।

হাঁটতে হাঁটতে রুশদী আলত করে লেকের শান্ত জলের দিকে তাকাল। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মিগুলো লেকের বুকে আছড়ে পড়ে এক অপার্থিব রঙের খেলা তৈরি করেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, আচমকা রুশদীর বাম হাতটা ফারাজ নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল।

মুহূর্তেই রুশদীর শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। এক অদ্ভুত শিহরণে তার বুক কেঁপে উঠল।সে বড় বড় চোখ করে বিষ্ময়ে ফারাজের দিকে তাকাল।এ এক এমন স্পর্শ, যাতে কোনো জোর নেই, আছে কেবল পরম নির্ভরতা। ফারাজ কিন্তু রুশদীর দিকে তাকাল না। সে সামনে তাকিয়ে এক পলক রুশদীকে দেখে নিয়ে আবার সূর্যাস্তের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। তারপর খুব শান্ত কিন্তু গভীর স্বরে বলে উঠল—

"জীবনকে অস্তরাগের রঙে সাজাতে তোমার প্রয়োজন আছে রুশদী। জীবনের অপূর্ণতা ঘোচাতে তুমি আমার পূর্ণতা হয়ে এসেছ।"

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন