#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মীদ
১৫
(যে কোনো ভুল পেলে জানাবেন)
খান বাড়ির ড্রয়িং রুমের বিশাল সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন শেহজাদ খান ও রাইমা খান। ঠিক উল্টো পাশে সিফাতের বাবা সাজিদ সিকদার ও মা শানজানা খান। ফারাজ একদিকে বসে সবটা পর্যবেক্ষণ করছে।শান আর সিফাত পাশের একটি সিঙ্গেল সোফায় একে অপরের গা ঘেঁষে জড়সড় হয়ে বসে আছে, যেন ঝড়ের পূর্বাভাস টের পাচ্ছে তারা।
নিস্তব্ধতা ভেঙে শেহজাদ খানের কর্কশ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো, "শান, তোমার বিদেশের ফ্লাইটের টিকিট অলরেডি কাটা হয়ে গিয়েছে। অহেতুক সময় নষ্ট না করে গোছগাছ শুরু করো।"
শান এবার আর গতবারের মতো মাথা নত করল না। অতীতে বহুবার সে বাবার শাসনের কাছে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে, যার খেসারত সে আজও দিচ্ছে নিজের ভেতরে গুমরে মরে। আজ তার চোখে পরাজয়ের গ্লানি নেই, আছে এক অদম্য জেদ। সে সাহসে বুক বেঁধে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, "ড্যাড, আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি দেশেই থাকব, আমি ফুটবল খেলব।"
শেহজাদ খান গর্জে উঠে বললেন, "কী বললে? এখনো ওই থার্ড ক্লাস চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়ে আছ তুমি? এই ফুটবল খেলে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কার ফিউচার গড়েছে? বাংলাদেশের ফুটবলের জঘন্য অবস্থা জানো তুমি? এসবের পেছনে সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নেই। চুপচাপ আমার কথা মানো, বড় হয়ে আমার রাজনৈতিক গদিতে বসবে। কিন্তু এরকম ফালতু জেদ ধরে আমি তোমার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে দেব না। দুদিন পর পর ইনজুরি নিয়ে বাড়িতে পড়ে থাকবে আর আমার টাকা নষ্ট করবে—এসব আমি সইব না!"
তিনি সিফাতের দিকে ফিরেও বললেন, "সিফাত, তুমিও ওর কথায় প্রভাবিত হবে না। নিজের ফিউচারে মন দাও। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কোনো বড় ফুটবলার বের হতে পারেনি। আগে ন্যাশনাল টিমের অবস্থা দেখো, তারপর স্বপ্ন দেখো। সাজিদ, তুমি তোমার ছেলেকে ভালো করে বোঝাও।"
সাজিদ সিকদার কেবল মাথা নাড়লেন, কিন্তু তার নির্লিপ্ত ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
শান বলল,"আমি এবার তোমার কোনো কথাই শুনছি না ড্যাড। আমি খেলব, বাংলাদেশ টিমের হয়েই খেলব। ইন ফিউচার একজন সফল ফুটবলার হয়ে আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব যে তোমার ধারণা ভুল ছিল।"
শেহজাদ খান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে শানের জেদকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন,
"জোকস করছ?বাংলাদেশ টিম থেকে খেলে ভালো ফুটবলার? হা হা হা। "
বাবার এই ক্রমাগত অপমান শান দমল না। বুকভরা আবেগ নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "ওটা কেবল ফুটবল না ড্যাড! ওটা আমার স্বপ্ন, ওটা আমার নিশ্বাস নেওয়ার একমাত্র মাধ্যম। ওটাকে যদি আবারও আমার থেকে আলাদা করার চেষ্টা করো, তবে আমি মরে যাব! ফুটবল ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না ড্যাড, কিচ্ছুতেই
না!"
শেহজাদ খান ভ্রু কুঁচকে কর্কশ স্বরে বললেন, "এখন আমাকে মরার হুমকি দিচ্ছ তুমি?"
"না ড্যাড, হুমকি দিচ্ছি না। শুধু আগাম জানিয়ে রাখছি—ফুটবল থেকে আমাকে আলাদা করার চেষ্টা করলে আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে থাকবো। "
"আর ওই যে দুদিন পর পর ইনজুরি হয়ে পঙ্গুর মতো ঘরে পড়ে থাকবে, তখন কে চালাবে তোমাকে? সারাজীবন কি আমার ঘাড়ে বসে খাবে? আমি তোমাকে সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারব না, জেনে রেখো।"
ফারাজ এবার আর চুপ করে রাখতে পারল না। সে সজোরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, দুচোখ আগুনের মতো জ্বলছে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল, "আপনি না খাওয়ান ড্যাড, আমি ওকে সারাজীবন বসিয়ে খাওয়াব! আমার সারাজীবনের উপার্জনে ও তিনবেলা পেট ভরে খেলে আমার খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে না। তবুও ও ওর ইচ্ছেটা পূরণ করুক। দয়া করে ওর স্বপ্নে আর বাধা দেবেন না!"
"আর সিফাত? ওকেও কি তোমার ঘাড়েই বসাবে? ওকেও কে খাওয়াবে?"
ফারাজ এবার বাবার ওপর চরম বিরক্তি নিয়ে ফেটে পড়ল। সে স্পষ্ট গলায় জানিয়ে দিল, "হ্যাঁ, ওকেও খাওয়াব আমি! দরকার হলে সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আমি ওদের দু'জনকে রাজকীয় হালে খাওয়াব। তবুও ওদের স্বপ্নটা আমি আর নষ্ট হতে দেব না!
ফারাজ না থেমে সাজিদ শিকদারের উদ্দেশ্যে বলল, "আর ফুপা, আপনি? আপনিও ড্যাডের কথায় এভাবে প্রভাবিত হলেন? ড্যাড তার ছেলেকে ফুটবলার বানাবে নাকি অন্য কিছু, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিফাত তো আপনার সন্তান! ওর জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার একমাত্র আপনারই সাজে।সিফাত ভবিষ্যতে কী হবে—ডাক্তার নাকি মন্ত্রী—সেটা ঠিক করার দায়িত্ব ছিল আপনার। অথচ ড্যাড আপনাকে দু'টো কথা বোঝালো আর আপনি বিনা বাক্যব্যয়ে সায় দিয়ে দিলেন? এই নয়টা মাসে ছেলেটার ভেতরের যে পরিবর্তন, সেটা কি একবারও আপনার চোখে পড়েনি? নাকি এখন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে—আগের সেই প্রাণোচ্ছ্বল সিফাত শিকদার আজ কোন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে?"
সাজিদ শিকদার স্ত্রীর পাশে পাথর হয়ে বসে রইলেন। একটা শব্দও তাঁর মুখ দিয়ে সরল না, শুধু মাথাটা অনুশোচনায় আরও নুয়ে পড়ল। ফারাজ মিথ্যে বলেনি। এই নয় মাসে তিনি নিজের চোখের সামনে এক নক্ষত্রের পতন দেখেছেন। তাঁর উজ্জ্বল, মেধাবী ছেলেটা যেন কোনো এক গভীর ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে গেছে।
একটা সময় যে ছেলেটা দিনরাত ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকত, যার কাছে একটা সিগারেটের ধোঁয়াও ছিল অচেনা, আজ সে নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সাজিদ শিকদার নিজেই ছেলের ঘর থেকে ইনজেকশন, কোকেন আর বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করেছেন। শাসন, বারণ কিংবা আকুতি—কোনো কিছুই সেই পতন ঠেকাতে পারেনি। তিনি যেন নিজের হাতে ধ্বংস করা নিজের ছেলের জীবনের সামনে বসে আছেন।
সাজিদ শিকদার নিশ্চুপ থাকলেও শেহজাদ খান গর্জে ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, "ফারাজ! তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। বড়দের সাথে কথা বলার ধরনটা অন্তত সংযত করো। আমি যখন একবার বলে দিয়েছি যে শান আর সিফাত ফুটবলার হবে না, তার মানে হবে না। এসব ফালতু ফুটবলের নেশা নিয়ে আমি ওদের পড়ে থাকতে দেব না। ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আমিই নির্ধারণ করব।"
"ফুটবলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে লাভ নেই। আমিও স্পষ্ট বলে দিচ্ছি—আমার ভাই ফুটবলারই হবে। ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে এবং সুযোগ পেলে বিশ্বকে দেখিয়ে দেবে ও কী করতে পারে। আপনি চাইলেও ওদের আটকে রাখতে পারবেন না।"
শেহজাদ খানের চোখ দুটো রাগে ছোট হয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি শুধালেন, "তুমি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো?"
"অবশ্যই! আমি আপনাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ করছি। আমার ভাইয়েরা ফুটবল খেলেই এমন কিছু করে দেখাবে, যা আপনি মন্ত্রী হয়েও এই দেশের জন্য করতে পারেননি। ওরা হবে এই দেশের কোটি মানুষের আইডল। ওদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে যত বাধা আসবে, আমি পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে সে সব সরিয়ে দেব। যা যা করা লাগে, আমি একা হাতে তাই করবো।"
"ফারাজ!" শেহজাদ খানের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ল।
ফারাজ ভাইদের জন্য আজ যতটুকু অসভ্য হওয়া দরকার হলো।যে বাবার সঙ্গে কোনদিন বেয়াদবি করেনি, তার সঙ্গে উঁচু করার কথা বলতে লাগলো।দোষটা শেহজাদ খানে এর-ই না?
"ধমক দেবেন না ড্যাড! আমি ছোটো না। মনে রাখবেন, আমি আপনারই রক্ত। আপনি যদি নিজের অহংকার ধরে রাখতে জেদ ধরেন, তবে আমিও আমার কথায় অটল থাকব।।"
"ওরা ফুটবল খেলবে না। এটাই আমার শেষ কথা," শেহজাদ খান দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।
ফারাজ দ্বিগুণ তেজে গর্জে উঠল, "ওরা ফুটবল খেলবে!"
"আমি বলছি খেলবে না!"
"আর আমি বলছি খেলবে!"
ফারাজের শেষ বিষ্ফোরণে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের উপস্থিত সকলের মানুষের সঙ্গে যেন আসবাবপত্র গুলোও থরথর করে কেঁপে উঠল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আগুনের পিণ্ড হয়ে আছে। বাবার চোখের মনিতে সরাসরি চোখ রেখে কথা বলছে সে।শান সোফার এক কোণে বসে অশ্রুসজল চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভাইকে এর আগে অনেকবার রেগে যেতে দেখেছে, শাসন করতে দেখেছে,কিন্তু বাবার সাথে তর্ক করতে দেখেনি।আজ শুধু ছোট ভাইদের স্বপ্নের জন্য ফারাজ যেভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যিই অভাবনীয়।
শেহজাদ খানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মুষ্টিবদ্ধ হাতে তিনি নিজের সীমাহীন রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। ছেলের এই অবাধ্যতা তাঁর কাছে শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং এক চরম অপমান। তিনি শীতল কণ্ঠে বললেন, "ফারাজ, তুমি কিন্তু এবার অনেক বেশি বাড়িয়ে করছ।"
"হয়তো করছি। কারণ কম করলে সেটা আমার ভাইদের প্রতি অন্যায় হতো ড্যাড। আপনিই আমাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। দয়া করে এমন কিছু করবেন না যাতে আমি আরও বেশি অবাধ্য হয়ে উঠি।"
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাইমা খান শাঁসিয়ে উঠলেন, "ফারাজ, অনেক হয়েছে, এবার থামো! ড্যাড এর সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তুমি কি ভুলে গেছো? গলার স্বর নামাও। আগে তো কখনো তুমি এতটা অভদ্র আচরণ করোনি!"
মায়ের ধমকেও ফারাজ আজ দমল না। সে স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলল, "আম্মি, ড্যাডও আগে কখনো এমন কোনো কাজ করেননি যার জন্য আমাকে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে হয়। আজ তিনি বাধ্য করেছেন বলেই আমি আমার সীমা অতিক্রম করছি।"
রাইমা খান অবিশ্বাসের চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেকি সত্যিই তাঁর সেই ফারাজ?
শেহজাদ খান এবার বড়ই ধূর্ততার সাথে মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সাজিদ শিকদারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন, "সাজিদ, তুমিও কি চাও তোমার ছেলে ফুটবলার হোক? তুমিও কি ফারাজের এই পাগলামিতে সায় দিচ্ছ?"
সাজিদ শিকদার আজ আর নয় মাস আগের সেই মানুষটি নেই। সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত আর ছেলের ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন তাঁকে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলেন। গলায় এক অদ্ভুত স্থিরতা নিয়ে বললেন, "হ্যাঁ ভাইজান! আমার ছেলে যা চায়, আমি এখন সেটাই চাই। আমার ছেলে যদি ফুটবলার হতে চায়, সে ফুটবলার হবে। যদি সে মিউজিশিয়ান হতে চায়, তবে তাই হবে। এমনকি সে যদি সাধারণ একজন মানুষ হতে চায়, তবে আমি তাতেই খুশি। ওর স্বপ্নের পথে আমি আর কোনোদিন কাঁটাতার হয়ে দাঁড়াবো না।"
সিফাত বিস্ময়ে বিষ্ফোরিত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজ কানে শোনা কথাগুলোই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। এই কি সেই মানুষটা? যে মাত্র নয় মাস আগে ফুটবল খেলবো বলায় তাকে কুকুরের মতো পিটিয়েছিল? ফুটবল থেকে দূরে রাখতে তাকে অন্ধকার ঘরে পশুর মতো বন্দি করে রেখেছিল? সিফাত অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল,বাবার চেহারায় কি তবে সত্যি অনুশোচনার ছাপ ফুটে উঠেছে?
---
ফারাজ বারান্দায় রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরলয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। একটু আগেই সে বসুন্ধরা কিংস-এর প্রেসিডেন্টের সাথে দীর্ঘ বৈঠক শেষ করে ফিরেছে। শান ধীরপায়ে ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়াল, তার চোখেমুখে রাজ্যের উৎকণ্ঠা আর একরাশ প্রশ্ন।
নিস্তব্ধতা ভেঙে শান প্রশ্ন করল, "ভাইয়া, প্রেসিডেন্ট কী বললেন?"
ফারাজ কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে শানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"পরশু থেকেই প্র্যাকটিসে যাচ্ছিস তুই। কোনো দেরি করার দরকার নেই।"
শানের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল।মুহূর্তেই আবার, সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কত টাকা দিতে হলো ভাইয়া? অনেক ঝামেলা হয়েছে নিশ্চয়ই?"
ফারাজ আদুরে ধমক দিয়ে বলল, "তোর ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই শুধু তোর ড্রিমে ফোকাস কর। বাকিটা আমি সামলে নেব।"
শান খুশিমনে চলে যেতে নিলে ফারাজ তাকে থামাল। "একটু দাঁড়া, কথা আছে। সিফাত কোথায়?"
"বোধহয় আমার রুমেই আছে ভাইয়া।"
"ফুপি আর ফুপার সাথে কথা হলো। উনারা চাচ্ছেন সিফাতের বিয়ে দিয়ে দিতে। ভাবছেন সংসারী হলে হয়তো ছেলেটা একটু লাইনে আসবে, নেশাটেশা ছাড়বে। আমি বললাম, বিয়ে যখন দেবেনই, তখন ওর যদি কোনো পছন্দ থাকে তবে সেটা জেনে নেওয়া ভালো। নইলে জোর করে বিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তুই কি জানিস সিফাতের কোনো গার্লফ্রেন্ড টার্লফ্রেন্ড আছে কি না?"
শান এবার খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল। আমতা আমতা করে বলল, "জি ভাইয়া... আছে।"
"নাম কী?" ফারাজ সরাসরি জানতে চাইল।
"ভাইয়া, সবগুলোর নাম তো আমার ঠিক জানা নেই।"
শানের উত্তর শুনে ফারাজ আকাশ থেকে পড়ল।
"সবগুলোর নাম জানিস না মানে? ওর গার্লফ্রেন্ড কয়টা?"
শান আঙুল গুনে মনে করার চেষ্টা করল।
"পরশুদিন পর্যন্ত ১৫টা ছিল। গতকাল দুটোর সাথে ব্রেকআপ হয়েছে, তার মানে ১৩টা। আবার কাল রাতে নতুন চারটার সাথে রিলেশন শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বোধহয় ১৯টা। সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল, বাড়তে বা কমতে পারে।"
ফারাজ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
"বলিস কী! এতগুলো মেয়ে ও একসাথে ম্যানেজ করে কীভাবে?"
শান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আরে ভাইয়া, ওর যে লুক, যে ফিটনেস—মেয়েরা তো লাইন ধরে বসে থাকে ওর সাথে প্রেম করার জন্য। ওর ইনস্টাগ্রাম চেক করলে দেখবে প্রতিদিন শয়ে শয়ে প্রপোজাল আসছে। আল্লাহ যদি ওর মতো চেহারা আর কপাল আমাকেও দিত! ও যে এ পর্যন্ত কতগুলো প্রেম করেছে...! আমি আজ পর্যন্ত এতগুলা মেয়ের চোখে দেখি নাই, যতগুলোর সাথে প্রেম করেছে। "
ফারাজ কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। "আমি ভেবেছিলাম পছন্দের কোনো মেয়ে থাকলে তার সাথেই বিয়েটা ঠিক করব, কিন্তু তুই যা শোনালি তাতে তো আমার নিজেরই মাথা ঘুরে যাচ্ছে! বুঝলাম, ওর সাথে আমাকে সরাসরিই বসতে হবে। তবে সাবধান শান, তুইও কি ওর মতো প্রেমের টেম্পু চালানো শুরু করেছিস নাকি?"
শান আকাশ পানে হাত তুলে তওবা পড়ার ভঙ্গিতে বলল, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এসব অপবিত্র কাজে আমি নেই ভাইয়া। আমি হলাম খাঁটি পবিত্র পাপী!"
ফারাজ বাঁকা হেসে শানের কাঁধে হাত রাখল। "হুম, মনে রাখিস—অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ!"
--
আজ দু'দিন হলো সিফাত ও শান ক্লাবে চলে গিয়েছে।ওরা দু'জনই বসুন্ধরা কিংস এর খেলে।আবার ব্যাক করার জন্য যদিও খরচাপাতি একটু বেশি পড়েছে,তবে সবটা বড়ো ভাই হিসিবে সামলে নিয়ে ফারাজ।বড় ভাই হিসেবে তার দায়িত্ব,ছোট ভাইদের ইচ্ছাটা পূরণ করা।
শানরা চলে যাওয়ার পর থেকে খান বাড়িটা কেমন চুপ হয়ে গিয়েছে।ওরাই তো মাতিয়ে রাখত বাড়ি টা। প্রিয় চাচু ক্লাবে চলে যাওয়ার শেরটা সঙ্গি হারিয়েছে। কিন্তু ব্যাপার না দেখা যাবে দুদিন পর ক্লাব থেকে ছুটি নিয়ে আবার বাড়িতে হাজির ওরা।
ভোরবেলা ট্রিপ শেষে যখন আহাদ আর ফারাজ ফিরল, ফারাজ আর আহাদকে বাড়ি যেতে দিল না। বন্ধু,বোন জামাই তথা সহকর্মীকে এক প্রকার জোর করেই নিজের সঙ্গে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো সে। প্রিমাও খবর পাওয়া মাত্রই সকাল সকাল চলে এসেছে ওর মামার বাড়িতে।
এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আবছা ছায়া নামতে শুরু করেছে চারদিকে। দুপুরের আহার পর্ব চুকিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় আড্ডায় মেতেছে সবাই। ফারাজ, আহাদ আর প্রিমা তো আছেই, সাথে যুক্ত হয়েছে রুশদী। রুশদীর সঙ্গে প্রিমার পরিচয়টা এর মধ্যেই বেশ জমে উঠেছে। বড় সোফাটায় প্রিমা আর আহাদ পাশাপাশি বসেছে, সিঙ্গেল সোফায় আয়েশ করে বসেছে ফারাজ। আর পাশের সোফাটায় পাশাপাশি বসে রুশদী ও শের।
কিন্তু এই আড্ডার আমেজ শেরের ভেতরে নেই। সে ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে। তার ক্রদ্ধ দৃষ্টি বারবার গিয়ে পড়ছে ফারাজের কোলের দিকে। সেখানে বেশ আয়েশ করে বসে আছে পিচ্চি প্রিমরোজ। শেরের ছোট্ট মনে ঝড়ের বেগে অভিমান আর বিরক্তি আছড়ে পড়ছে—পাপা কেন এই পচা মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে? এই প্রিমরোজ মেয়েটাকে তার দু-চোখের বিষ মনে হয়।
শেরের মনে হচ্ছে, এই মেয়েটা এলেই পাপা তাকে ভুলে যায়। শুধু পাপা কেন, শান চাচু থেকে শুরু করে দাদু—সবাই তাকে ফেলে এই প্রিমরোজকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার আদরের ভাগে কেউ থাবা বসাবে, এটা শের কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। পাপা কেন অন্যকে আদর করবে? পাপা তো শুধু তার! অথচ প্রিমরোজ এলেই পাপা তাকে চকলেট দেয়, কোলে বসিয়ে গল্প করে।
শেরের বিরক্তি চরমে পৌঁছাল যখন দেখল রুশদীও ফারাজের কোল থেকে প্রিমরোজকে নিজের কাছে টেনে নিল। রুশদী যেন প্রিমরোজের মায়ায় পড়ে গেছে। সে বাচ্চাদের মতো আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,"হেই কিউটি, নাম কি তোমার?"
প্রিমরোজ তার আধো আধো বুলি আর চপলতায় উত্তর দিল,"আমাল নাম পিমলোজ।"
বাচ্চা মেয়েটার এমন আধো আধো বোল শুনে রুশদীর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা দেখতে সত্যিই মাশাল্লাহ্! গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, আর দুই গাল যেন পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে। তার চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া, আর এইটুকু বয়সেই মাথার চুলগুলো হালকা বাদামী রঙের—সব মিলিয়ে প্রিমরোজকে দেখতে কোনো জীবন্ত পুতুলের চেয়ে কম লাগছে না। রুশদী ভাবল, সব বাচ্চাই তো সুন্দর,প্রিমরোজকে বিশেষ নজরে দেখছে সে। এ ছাড়া কিছুই নয়।
প্রিমরোজের কথা বলার ধরন শুনে ড্রয়িং রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। শুধু একজন বাদে—শের। সবার সমস্বরে হাসির মাঝে প্রিমা রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, "রুশদী, ওর পুরো নাম প্রিমরোজ আমনা।"
রুশদী আলতো করে প্রিমরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর ওর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যটা শেরের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। ঠিক তখনই প্রিমরোজের প্রতি রুশদীর ভালোবাসা আরও উপচে পড়ল। রুশদী প্রিমরোজের তুলতুলে গাল দুটোর দিকে তাকিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মেয়েটার গালের লালচে আভা তাকে যেন বারবার কাছে টানছে।
রুশদী প্রিমরোজকে আরেকটু নিবিড়ভাবে আদর করতে করতে আলতো স্বরে বলল,"এই রোজ, তুমি তো ভারী কিউট! তোমাকে একটা ছোট্ট করে চুমু দিই?"
রুশদীর এমন আবদার শুনে উপস্থিত সবাই বেশ মজা পেল। কিন্তু শেরের কাছে মনে হলো, তার পৃথিবীর শেষ সম্বলটুকুও বোধহয় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মম এর ভালোবাসা এভাবে ভাগ হতে দেখে সে যেন পাথর হয়ে গেল।বাচ্চাদের মতো কান্না জুরে বসল সে।
---
এক্সাম হল থেকে বের হতেই যেন এক দলা তাজা বাতাস শরীরে এসে লাগল। করিডোরেই রুশদীর দেখা হয়ে গেল তিথির সাথে। দু'জনের সিট আলাদা রুমে পড়েছে।দেখা হতেই দুজনের সেই চেনা আড্ডা শুরু হলো। পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন ছিল, কোন অংকটা মেলাতে গিয়ে ঘাম ছুটেছে—এসব বকর বকর করতে করতে দু'জনে পা বাড়াল গেটের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতে আচমকা তিথি একটু আমতা আমতা করে বলে উঠল,"ওই রুশদী, শান ভাইয়া আসলে কেমন রে?"
রুশদী এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে তিথির দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর ঠোঁট উল্টে একটা ভেংচি কেটে বলল,"ভাইয়া? তা ভাইয়া থেকে হঠাৎ সাইয়া বানানোর কোনো ইচ্ছা জেগেছে নাকি রে তোর?"
তিথি গাল ফুলিয়ে ধমক দিয়ে বলল, "ধ্যাত! আমি তোকে সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি, আর তুই ইয়ার্কি মারছিস?"
রুশদী এবার একটু নরম হয়ে হাসল, "ভাইয়া তো ভালোই, খারাপ হতে যাবে কেন? এখন তুই ঠিক কোন ধরনের ‘ভালো’র কথা শুনতে চাচ্ছিস সেটা বল, আমি সেভাবেই উত্তরটা সাজাচ্ছি।"
তিথি এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, "উনি আমাকে প্রপোজ করেছেন।"
"তো সমস্যা কী? প্রেম কর! প্রেম কর, তারপর বিয়ে কর—ব্যাস! আমরা দু'জন দুই জা হয়ে এক বাড়িতে রাজত্ব করব।"
"মজা করছিস রুশদী? হঠাৎ করে কারো সাথে কি অমনি প্রেম করা যায়?"—তিথির কণ্ঠে সংশয়।
রুশদী এবার বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, "প্রেম কি আর বলে-কয়ে আসে রে? প্রেম তো হুটহাট জীবনে আসে। আস্ত একটা ঝড়ের মতো দেখবি উড়ে এসে জুড়ে বসবে তোর মনে, তারপর আর ছাড়ার নামগন্ধ নেই।"
তিথি তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বিড়বিড়িয়ে বলল, "তাহলে কি হ্যাঁ বলে দেব?"
রুশদী একগাল হেসে উৎসাহ দিয়ে বলল, "বলে দে! জিতে যাবি।"
তিথি এবার চোখ কপালে তুলে বলল, "তুই কি দালালি করছিস ওর হয়ে?"
রুশদী ফিক করে হেসে দিয়ে জবাব দিল, "আরে না! দালালি না, আমি তো ফ্রিতে ঘটকালি করছি।"
—০—
আজ শুক্রবার।রাইমা খান নিজে রান্না করবেন আজকে।একটু পায়েসও করবেন।রুশদীর তার কাজে হেল্প করতে চাইলেও তিনি বাধা দিবেন।রুশদী তবুও কিছু একটা করবে তাই পায়েসের জন্য কাজু বাদাম কাটতে লাগলো।
হুট করে রাইমা খান প্রশ্ন করলেন,
"তোমার বাবার সঙ্গে কথা হয়? "
রাইমা খান যখন কথাটি বললেন, রুশদীর হাতের চাকুট এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।কাজুবাদামগুলো কুচি কুচি করে কাটতে কাটতে সে উদাসীন স্বরে বলল, "নাহ!"
পারিবারিক সম্পর্কের সেই ক্ষতবিক্ষত জায়গাটা আজও বড় বেশি বিষিয়ে আছে। রাইমা খান পায়েসের ওপর দুধের সর সামলাতে সামলাতে মৃদু স্বরে যোগ করলেন, "না বলাই ভালো! উনারা হঠাৎ বেশি ভালোবাসা দেখালে আবার গলে যেও না। একটু কেয়ারফুল থেকো।"
রুশদী শুধু একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, "জি!"
পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে উঠেছিল। সেটা
স্বাভাবিক করতেই রাইমা খান স্মিত হেসে বললেন, "জানো, আমার প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি যে ফারাজ কাউকে পছন্দ করতে পারে!"
কথাটা শোনামাত্রই রুশদীর বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে উঠল। একটা অদৃশ্য ঈর্ষার কাঁটা যেন বিঁধল চট করে। মুখটা কালো করে সে আবারও কাজে মনোযোগ দেওয়ার ভান করল। একটু নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, "কেন বিশ্বাস হয়নি?"
"ওর ডিভোর্সের পর আমরা অনেক চেষ্টা করেও ওকে বিয়েতে রাজি করাতে পারিনি। সেই ফারাজ নিজে থেকে একটা মেয়েকে পছন্দ করে বসে আছে—এটা আমাদের কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ছিল।"
রুশদীর মনের মেঘটা আরও ঘনীভূত হলো। ফারাজ কি তবে অন্য কাউকে...? অবান্তর এক অভিমানে তার গলা বুজে এলো। সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কাকে পছন্দ করতেন উনি? ডিভোর্সের পর কি অন্য কাউকে পছন্দ করেছিলেন?"
রাইমা খান অবাক হয়ে রুশদীর দিকে তাকালেন।বললেন, "ও যে তোমাকেই পছন্দ করত, তুমি জানো না?"
"কী!"
চলবে....