#অস্তরাগের_রঙ
#তেজরিন_উম্মীদ
১৬..
(যে কোনো ভুল পেলে জানাবেন)
মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছে।উন্মাদিনীর মতো সে ছুটে গেল বেডরুমে। ফারাজের আলমারিটা টেনে খুলল সে।একটু খুঁজতেই একটা পুরনো প্লাস্টিকের আইডি কার্ড পেল। তার নিজের আইডি কার্ড! যেটা অনেক আগে হারিয়ে গিয়েছিল।
রুশদী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটি তখন কপালে ওঠার দশা। যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখছে। হৃদপিণ্ডের ধকধকানিটা কানের পর্দায় আছড়ে পড়ছে হাতুড়ির মতো। ফারাজের কাছে এটা কোত্থেকে এলো?
দ্রুত হাতে সে ফারাজের চার্জে বসানো ফোনটা তুলে নিল।ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই রুশদী যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো।ওয়ালপেপারে তার একটা ছবি। অনেক আগের ছবি। জানালার পাশে বসে সে উদাস মনে বাইরের আকাশ দেখছিল—সেই মুহূর্তটা কীভাবে যেন বন্দী হয়ে আছে ফারাজের ফোনে। শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল শীতল এক স্রোত।সত্যি কি ফারাজ অন্তরালে এমন এক নিভৃত প্রেমিক লুকিয়ে ছিল? যার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে শুধু রুশদীরই পদচিহ্ন? এই অনুভূতির ভার সইতে না পারে না রুশদী। ফারাজকে ঘিরে গড়ে তোলা তার চেনা জগতটা আজ এক নিমিষেই অচেনা হয়ে গেল।ফারাজ তখন গোসলে ছিলে।সে বের হয়ে তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। রুশদী তার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে, তার আই কার্ড টা তুলে ধরে দুরুদুরু বুক নিয়ে বলল,
"এটা আমার আইডি কার্ড, অনেক আগে হারিয়ে গিয়েছিল আপনি কোথায় পেলেন?আর আপনি আমার এই ছবি কোথায় পেলেন? আম্মি যা বলল তা কি শত্যি?"
ফারাজ না বললেও মেয়েটা দেখি জেনে গেছে।ফারাজ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিল না। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে অবহেলার সুরে বলল, "আম্মি যা বলেছে সেটা আম্মিকেই জিজ্ঞেস করো। আমার কাছে কেন?"
যেই না ফারাজ তাকে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল, উত্তেজনার সে খপ করে খামচে ধরল ফারাজের টি-শার্টের কলার। উচ্চতায় ফারাজের ধারেকাছেও নয় সে, তাই পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে নিজেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে তুলে ধরল রুশদী। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর চোখে এক আকাশ সমান কৌতূহল ও তেজ। ফারাজের আকাশ নীল চোখের গভীর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে।ফারাজ একবার রুশদীর পায়ের আঙুলের দিকে তাকালো, যেখানে রুশদী ভারসাম্য বজায় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। তারপর তার মুখমণ্ডলে দৃষ্টি স্থির করে ব্যঙ্গভরা সুরে বলল,
"আঙুলের ওপর ওভাবে কসরত না করে বরং একটা টুল নিয়ে এসো। খামোখা আঙুলগুলো ভেঙে যাবে তোমার।গলার স্বর তো বেশ উঁচুতে তুলেছ, অথচ নিজেকে উঁচু করতে এখনো আঙুলের ওপর ভর দিতে হচ্ছে! ব্যাপারটা বড্ড বেমানান লাগছে না?"
রুশদী মুহূর্তের জন্য থমকাল, শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে আঙুলের ডগায় টান পড়ল তার, কিন্তু জেদ দমল না।সে আগের মতোই তেজদীপ্ত কণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করল,
"আপনি কি সত্যিই আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন?"
ফারাজ এবার তার দু'চোখে গভীর এক দৃষ্টি রাখল। যে দৃষ্টির তল পাওয়া দায়। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
"তাতে কি তোমার খুব সমস্যা হচ্ছে?"
"সমস্যা নয়,কনফিউশন হচ্ছে।আর আমি ধোঁয়াশার ভেতর বাস করতে পারি না।"
"তাহলে সেই ধোঁয়াশা নিজেই কাটিয়ে নাও। এখন ছাড়ো আমাকে, যেতে দাও।"
ফারাজ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।রুশদী তার টি-শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আপনি কিন্তু আমাকে ভীষণ রাগাচ্ছেন। ভুলে যাবেন না, আমি কিন্তু মোটেও খুব একটা ভদ্র কিংবা ধৈর্যশীল মেয়ে নই। আমার ব্যবহারের কতটা খারাপ আপনার জানা নেই। যেটা জিজ্ঞেস করেছি, সেটার সোজাসুজি উত্তর দিন!"
ফারাজ এবার একচিলতে বাঁকা হাসি হাসল। শান্ত গলায় মনে করিয়ে দিল,
"নিজের চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড় একটা লোকের কলার চেপে ধরে এভাবে চিৎকার করতে তোমার লজ্জা লাগছে না?"
"নিজের চেয়ে দশ বছরের ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে করতে যদি আপনার লজ্জা না লাগে, তবে আমার কেন লাগবে? ত্যাড়ামো ছেড়ে জবাবটা দিন।"
ফারাজ এবার দুষ্টু হেসে বলল,"দিব না। যা করার করে নাও।"
"আপনি কিন্তু রাগাচ্ছেন আমাকে!সোজা বলুন আপনি কি আগে থেকে আমাকে পছন্দ করতেন? "
"হ্যা!
—০—
কিছু মাস আগে..
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—ঢাকার হৃদপিণ্ড চিরে জেগে থাকা এক ব্যস্ততম নগরী। চারদিকে যান্ত্রিক কোলাহল, ঘোষণা আর ট্রলির চাকার ঘর্ঘর শব্দে বাতাস ভারী হয়ে আছে। প্রতিদিনের মতোই এখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড়; তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেউ দুচোখে হাজারো রঙিন স্বপ্ন নিয়ে পরবাসে পাড়ি জমাচ্ছে, কেউবা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ফিরছে। কারও যাত্রার উদ্দেশ্য শুধুই অজানাকে জানা, আবার কারও চোখে স্বজন হারানোর বিষাদ। আনন্দের হাসি আর বিদায়ের দীর্ঘশ্বাসে ঘেরা এই জায়গাটি যেন জীবনের এক বিচিত্র মিলনমেলা।
এই চরম ব্যস্ততার মাঝে এয়ারপোর্টের ভেতরের নীল রঙের একটি বেঞ্চে একা বসে আছে এক কিশোরী। তার পরনে S.k স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাদা ইউনিফর্ম—জানান দিচ্ছে সে সোজাসুজি কলেজ থেকে এখানে এসেছে। পরিপাটি করে করা বেণিটা দীর্ঘ সময়ের ধকল আর অস্থিরতায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়েছে। মেয়েটির দুচোখ বেয়ে ঝর্ণার ধারার মতো অশ্রু নামছে, যেন কান্নার কোনো শেষ নেই। কান্নার তোড়ে তার ফর্সা মুখটা রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, ছোট্ট নাকটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে—যা এক অদ্ভুত মায়াবী আর নিষ্পাপ রূপ দিয়েছে তাকে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল পরিবেশেও মেয়েটি ঘামছে। এক চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টায় সে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে অস্থিরভাবে বাম হাতের নখ কামড়াচ্ছে।
তার বাদামী রঙের চোখ দুটোয় ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।হাতে শক্ত করে ধরা বিমানের টিকিট—হয়তো আর কিছুক্ষণ পরেই তার ফ্লাইট। প্রতিটি সেকেন্ড যেন তার কাছে এক একটি যুগের মতো মনে হচ্ছে। সময় কেন কাটছে না? তাকে যে যেতেই হবে, বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে তার!
ঠিক তখনই বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল লাউঞ্জ দিয়ে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে আসছিলেন এক দল এয়ারলাইন্স ক্রু। একটি দীর্ঘ ট্রিপ শেষ করে ফিরছেন তারা। সবার আগে আগে স্টাইলিশ ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন বিমানে ক্যাপ্টেন। পরনে ধবধবে সাদা শার্টের ওপর নীল রঙের প্যান্ট, গলায় নীল টাই। হাতের ভাজে রাখা নিজের নীল ব্লেজারটি আর অন্য হাতে নীলচে কালো একটি ট্রলি লাগেজ। ক্লিন শেভড চেহারা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক অদম্য ব্যক্তিত্বের ছাপ। তার হালকা নীল রঙের চোখ জোড়া অভ্যাসবশত চারদিকের পরিচিত পরিবেশে বুলিয়ে নিচ্ছিলেন। পেছনে নিজের ক্রু মেম্বারদের সাথে হালকা মেজাজে কথা বলতে বলতে তিনি এগিয়ে আসছেন।তাদের প্রত্যেকের হাঁটাচলায় একটা পেশাদারিত্ব আর আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
ব্যস্ত এই পৃথিবীর দুই বিপরীত মেরুর দুই মানুষ যেন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। একজনের চোখে অজানার আতঙ্ক, আর অন্যজনের চোখে গন্তব্যে পৌঁছানোর তৃপ্তি।ক্যাপ্টেন মাঝপথে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে স্মার্টফোনটা বের করে ‘অ্যারোপ্লেন মোড’ অফ করতেই নেটওয়ার্কের সিগন্যালগুলো জেগে উঠল। মেসেঞ্জারে দ্রুত হাতে একটি বার্তা পাঠিয়ে ফোনটা আবারও পকেটে গুঁজে নিলেন তিনি। তার এই হঠাত দাঁড়িয়ে পড়ায় পেছনের ক্রু মেম্বাররা তাকে ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল, কেউ কেউ ইতোমধ্যেই বহির্গমন গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
তিনি আবারও হাঁটতে শুরু করলেন।
হঠাতই তার তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে থমকাল সেই কলেজ ইউনিফর্ম পরা মেয়েটির ওপর। মেয়েটি রীতিমতো কাঁপছে। দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কান্নার বেগ সামলাতে সে হিমশিম খাচ্ছে। মেয়েটা একা বসে এভাবে কেন কাঁদছে—প্রশ্নটা মুহূর্তেই ক্যাপ্টেনের মনে খটকা তৈরি করল। এক অজানা মায়া কাজ করল তার ভেতর। তিনি আবারও থমকে দাঁড়ালেন। ভাবলেন, একবার কি গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন? কিন্তু পরক্ষণেই মেয়েটির হাতে ধরা টিকিটটার দিকে নজর গেল তার।
বিবেচনা তাকে বাধা দিল। এই ব্যস্ত বিমানবন্দরে প্রতিদিন কত সহস্র মানুষ আসে, কত শত বিচ্ছেদের গল্প লেখা হয়। হাজারো মানুষ এখানে আবেগপ্রবণ হয়, কাঁদে—সবার সাথে কথা বলার ফুরসত বা দায়িত্ব কি একজন ক্যাপ্টেনের আছে? তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে লাউডস্পিকারে যান্ত্রিক কণ্ঠে ঘোষণা ভেসে এল:
"Your attention please, passengers of NOVOAIR, flight VQ-911 to Chattogram. We are now ready to board at Gate Number 4. Please have your boarding pass and identification ready. Thank you."
ঘোষণাটি কানে আসামাত্র মেয়েটি যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে উন্মাদের মতো ৪ নম্বর গেটের দিকে দৌড় দিল। ক্যাপ্টেন তখন মাত্র তাকে অতিক্রম করে সামনে এগোচ্ছিলেন। মেয়েটি এতটাই দিশেহারা ছিল যে, সামনে কে আছে তা দেখার মতো মানসিক অবস্থায় সে ছিল না। ফল যা হওয়ার তাই হলো—শক্তপোক্ত ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল সে।
অপ্রস্তুত ক্যাপ্টেন টাল সামলাতে কিছুটা সরে গেলেও মেয়েটি নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; সশব্দে এয়ারপোর্টের মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কিন্তু শারীরিক ব্যথার চেয়েও গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ যেন তার কাছে বেশি ছিল। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ঝরঝর করে চোখের জল ফেলতে ফেলতেই মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া বিমানের টিকিট আর কিছু কাগজপত্র কুড়িয়ে নিল সে। যার সঙ্গে ধাক্কা খেল, তাকে একটা সৌজন্যমূলক ‘সরি’ বলার মতো বোধটুকুও তখন তার অবশিষ্ট নেই। সবটুকু শক্তি দিয়ে সে আবার দৌড় লাগাল বোর্ডিং গেটের দিকে।
ক্যাপ্টেন কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই আকস্মিকতায় ঘোর কাটতে না কাটতেই তার নজর গেল পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটি নীল রঙের কার্ডের দিকে। তিনি নিচু হয়ে সেটি তুলে নিলেন। একটি স্টুডেন্ট আইডি কার্ড—‘S.K International School and College’। কার্ডের ওপরের দিকে বড় বড় অক্ষরে নাম লেখা:
“Rumaisa Haque Rushdi”
ক্যাপ্টেন দ্রুত মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকালেন। রুশদী তখন ভিড় ঠেলে গেটের দিকে ছুটছে। ক্যাপ্টেন গলা উঁচিয়ে ডাক দিলেন,
"Excuse me, you left your ID card!"
মেয়েটি পিছু ফিরে তাকালো,কৌতূহল তার চোখে।কান্না মিশ্রিত কন্ঠে শুধালো,
"আমাকে বলছেন?"
ক্যাপ্টেন মুখের মাক্স টা ঠিক করে নিলেন,নিজ স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে তিনি শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
"কাঁদছ কেন?"
"এটা আপনার জন্য জরুরি নয়!"
শক্ত কন্ঠে কথাটি বলে মেয়েটি চলে গেল।মিশে গেল ভিড়ের মাঝে।ক্যাপ্টেনও আর ডেকে,মেয়েটির আইডি কার্ড ফিরিয়ে দিল না।রেখে দিল নিজের কাছে। কিন্তু কোন প্রয়োজনে?
-—০—
বিমানের ককপিটের নিঝুম পরিবেশে ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন আর যান্ত্রিক প্যানেলের নিয়ন আলোর খেলা। ক্যাপটেন তাঁর সিটে বসে ড্যাশবোর্ডের শেষ মুহূর্তের রিডিংগুলো ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন। পাশে কো-পাইলট আহাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাকা মাটি ছাড়াবে, বিশালাকার এই লৌহপাখিটি ডানা মেলবে নীল দিগন্তে। যাত্রীরা সবাই আসন গ্রহণ করেছেন, বিমানে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
প্যানেলের একটা সুইচ অ্যাডজাস্ট করার সময় হঠাৎ আহাদ পাশ থেকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে উঠল, "আচ্ছা আপনি কি গোপনে বিয়ে-টিয়ে করেছেন নাকি?"
অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে ক্যাপটেন খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। ভ্রু কুঁচকে আহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "হঠাৎ এ কথা কেন?"
আহাদের ঠোঁটে তখন চিলতে হাসি। সে ক্যাপটেনের বুক পকেটের দিকে ইশারা করে বলল, "না মানে, যেভাবে পকেটে সবসময় বউয়ের আইডি কার্ড নিয়ে ঘুরছেন।"
ক্যাপটেনের হাতটা অবজান্তেই বুক পকেটের ওপর চলে গেল। সেখানে সযত্নে রাখা সেই কলেজপড়ুয়া মেয়েটির আইডি কার্ড।ট্রিপে বের হওয়ার সময় কার্ডটা পকেটে রাখা এখন তাঁর এক অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। কেন আনেন? কেনই বা সেই অচেনা মেয়েটির স্মৃতি এভাবে আগলে রেখেছেন? এর কোনো যুক্তিযুক্ত উত্তর তাঁর জানা নেই।
শুধু এটুকুই জানেন, কার্ডটা পকেটের ঠিক ওই জায়গাটিতে থাকলে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করেন তিনি। হাজার ফুট উঁচুতে মেঘের রাজ্যে যখন নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরে, তখন এই কার্ডটি যেন এক প্রশান্তির ছোঁয়া হয়ে পাশে থাকে। এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে মনের গহীনে।
আহাদের কৌতূহলী দৃষ্টির সামনে ক্যাপটেন নিজের আবেগ সামলে নিয়ে হালকা হাসার চেষ্টা করলেন। মৃদু স্বরে বললেন, "আরে না, ওসব তেমন কিছু না!"
—০—
রাত তখন গভীর। ছোট্ট শের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নিস্তব্ধ ঘরে ফারাজ ধীর পায়ে আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল। পাল্লাটা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল তার সমস্ত আবেগ আর স্বপ্ন—পাইলটের সেই ধবধবে সাদা ইউনিফর্ম।
পোশাকটার ভাঁজে হাত রাখতেই দুটো কার্ড আঙুলের স্পর্শে উঠে এল। প্রথমটা তার লাইসেন্স কার্ড; যেখানে গর্বিত বড় অক্ষরে লেখা, 'Captain Sarfaraz Khan' ।আর দ্বিতীয়টি একটি স্টুডেন্ট আইডি কার্ড। এক অল্পবয়সী কিশোরীর ছবি দেওয়া কার্ড,যে মেয়েটি আচমকাই ফারাজের ধূসর জীবনে বসন্তের সুবাস নিয়ে এসেছিল।
ফারাজ আজও জানে না, কেন সে এই মেয়ের মোহে পড়েছিল।মানুষ তো সাধারণত কোনো বিশেষ গুণ বা রূপ দেখে প্রেমে পড়ে, কিন্তু ফারাজ তার কারণটা খুঁজে পায় না।এটা কি নিখাদ ভালোবাসা, নাকি অবাধ্য কোনো প্রেম?সে শুধু জানে, রুশদীকে পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার হৃদয়ে শিকড় গেড়েছে। এক অজানা টান তাকে প্রতিমুয়ূর্তে আচ্ছন্ন করে রাখে।
সেই যে এয়ারপোর্টে মেয়েটার আইডি কার্ডটা কুড়িয়ে পেয়েছিল, কেন যে সেটা আর ফেরত দেয়নি, তার উত্তরও ফারাজের কাছে নেই। কার্ডটা যেন তার অস্তিত্বের অংশ হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটা ফ্লাইটে, প্রতিটা দেশে সে এই কার্ডটি নিজের সাথেই রাখত। অবসরে নিভৃতে কার্ডের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকাটা কখন যেন তার মরণনেশায় পরিণত হলো।
এক সময় শুধু কার্ডের স্থির ছবিতে মন ভরল না ফারাজের। রক্ত-মাংসের রুশদীকে দেখার তৃষ্ণা তাকে পাগল করে তুলল। কার্ডে সব ঠিকানাই দেওয়া ছিল, তাই তাকে খুঁজে বের করতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। প্রায়ই সে নিজের গাড়িটা নিয়ে রুশদীর কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।কখনো আবার রুশদীর বাড়ির পেছনের রাস্তায় আড়ালে গাড়ি থামাত; যেখান থেকে জানলা দিয়ে দ্বিতীয় তলায় রুশদীকে আবছা দেখা যেত।
গোপনে তোলা রুশদীর অসংখ্য অস্পষ্ট ছবি এখন তার শুধু ফোনের গ্যালারিতে নয়, বরং হৃদয়ে গাঁথা। ফারাজ বুঝতে পারে না কেন সে এমনটা করে।সে শুধু জানে, ছটফটে সেই মেয়েটিকে চোখের সামনে দেখলে তার বুকের বাঁ পাশের চিনচিনে ব্যথাটা কিছুটা উপশম হয়।যখন সে নিশ্চিত হলো যে এই টানটা সাময়িক কোনো মোহ নয় বরং গভীর অনুরাগ, তখন সে আর দেরি করেনি।রাইমা খানকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিল তার ইচ্ছার কথা—সে বিয়ে করবে।
অবশ্য এর আগেই সে রুশদীর জীবনের প্রতিটি খতিয়ান নিজের নখদর্পণে নিয়ে এসেছিল। তার স্বভাব, তার পরিবার, এমনকি তার জীবনে অন্য কেউ আছে কি না—সবকিছু জেনেই ফারাজ এই অসম যুদ্ধে নেমেছে।রুশদী একটু অন্যরকম আছে।তবুও ফারাজের, এই অবাধ্য মেয়েটিকেই তার চাই।
—০—
বর্তমান,
আকাশের বুক চিরে উপচে পড়া পূর্ণিমার রুপালি জ্যোৎস্না আজ যেন চুইয়ে চুইয়ে শহরের প্রতিটি গলিতে পড়ছে। ছাদের এক কোণে বেতের চেয়ারে বসে আছে রুশদী, আর রেলিংয়ে হেলান দিয়ে শূন্য চোখে দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে ফারাজ। বাতাসের ঝাপটায় রুশদীর অবাধ্য চুলগুলো মুখে এসে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন ফারাজের শান্ত চেহারার দিকে।
নীরবতা ভেঙে রুশদী খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, "আমাকে প্রথম কোথায় দেখেছিলেন?"
ফারাজ দৃষ্টি ফেরাল না। নিস্পৃহ কণ্ঠে উত্তর দিল, "এয়ারপোর্টে!বসে বসে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছিলে।"
রুশদীর মনে পড়ল সে একবার একা চট্টগ্রাম গিয়েছিল,তার বড়ো নানু মারা গিয়েছিলেন।দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিমানে গিয়েছিল।তখনই হয়তো ফারাজ তাকে দেখেছে।
"আমার আইডি কার্ডটা কোথায় পেয়েছিলেন?"
ফারাজ এবারও সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, "এয়ারপোর্টেই!"
রুশদী এখন ফারাজের ফোনের গ্যালারি চেক করছে। একের পর এক ছবি—অধিকাংশই তার অগোচরে তোলা। কোনোটাতে সে কলেজের গেট দিয়ে বের হচ্ছে, কোনোটাতে সে জানালার পাশে বিষণ্ণ মুখে বসে আছে। রুশদী বিস্ময় সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "এত ছবি কবে তুলেছেন?"
ফারাজ স্থির গলায় উত্তর দিল, "অনেক দিন ধরে!"
রুশদী এবার ফোন থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। চোখে একরাশ প্রশ্ন, "আপনি যদি আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন, তবে কলেজে দেখা হওয়ার পর ওরকম করেছিলেন কেন?এমন খবিশের মতো ব্যবহার করেছিলেন কেন?আমাকে ৩০ মিনিট কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন?সরাসরি বলে দিলেই তো হতো।"
ফারাজ মৃদু হাসল, সে হাসিতে এক রহস্যময় তৃপ্তি। খুব শান্ত স্বরে বলল, "এটা বলা যাবে না, টপ সিক্রেট। নেক্সট কোশ্চেন করো।"
ছাদের ওপর রূপালি জ্যোৎস্না তখন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রুশদীর মুখে। তার রেশমের মতো কালো চুলগুলো এলোমেলো হয়ে অর্ধেক মুখ ঢেকে রেখেছে। সেই অবাধ্য চুলের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে আসা পূর্ণিমার আলোয় তাকে কোনো পরীর মতো লাগছে। একপাশে নিকষ অন্ধকার, আর অন্যপাশে জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধতায় ধোয়া তার মুখাবয়ব—ফারাজ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই রূপের দিকে তাকিয়ে রইল।
রুশদী ফোনটা ফারাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চেয়ারে পা তুলে বসল। হাঁটুতে দুহাত টানটান করে রেখে ফারাজের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "শান ভাইয়ার মুখে শুনেছিলাম,আপনার প্রথম স্ত্রীকে আপনি পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। তবে তাকে রেখে আমাকে দ্বিতীয়বার কেন পছন্দ করলেন? বা কীভাবে করলেন?"
ফারাজের শান্ত মুখটা মুহূর্তেই থমথমে হয়ে গেল। তার ঘন ভ্রু জোড়া কুঁচকে এল এক নিমিষে। মেয়েটা হঠাৎ এসব নিয়ে প্রশ্ন শুরু করল কেন?সে গম্ভীর গলায় পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, "আমার এক্স আসল কোত্থেকে এসবের মধ্যে?"
রুশদী বাঁকা হেসে খোঁচা দিয়ে বলল, "চলে আসল আরকি! কেন, মিস করেন নাকি নিজের সেই প্রাণপ্রিয় মানুষটিকে? খুব মনে পড়ছে বুঝি?কী নাম যেন বলেছিলেন—জু... জুনিয়া! মনে পড়ছে খুব জুনিয়াকে?"
ফারাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। রুশদীর এই বিদ্রূপাত্মক স্বর তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে ধমকের সুরে বলে উঠল, "রুশদী! তুমি কি আমাকে রাগানোর জন্য ওই মেয়ের নাম নিচ্ছ?"
রুশদী দুহাত নেড়ে ন্যাকামি করে বলল, "ওমা! আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো ভাবলাম জুনিয়ার নাম শুনে আপনি খুব খুশি হবেন। কেন, হননি বুঝি?"
"ওর নাম আরেকবার মুখে নিলে তোমার মুখ সেলাই করে দেব একদম! ও আমার পাস্ট ছিল, আর তুমি আমার প্রেজেন্ট। আমি আমার অতীতকে মনে রাখতে চাই না, রাখিনি। ওই নামটা কখনোই আমার সামনে আনবে না। তুমি আমার বর্তমান, আমি শুধু তোমাকেই চিনি এবং তোমাকে নিয়েই থাকব। বুঝেছ? অযথাই খোঁচা মেরে কথা বলবে না!"
"ইসস! আপনি তো দেখি সেন্টি খেয়ে গেলেন। আমি তো আপনার কথা ভেবেই বলছিলাম... জুনি—"
রুশদী কথা শেষ করার আগেই ফারাজ চরম বিরক্তি নিয়ে সেখান থেকে গটগট করে চলে গেল। তার মনে হলো, এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে নেই। অযথা তাকে খোঁচা মেরে কথা বলাটা সে নিতে পারছে না।
ফারাজ দৃষ্টির আড়াল হতেই রুশদীর মুখে খেলে গেল এক ভুবনজয়ী হাসি। এতক্ষণ বুকের গহীনে দমিয়ে রাখা আনন্দ আর উচ্ছ্বাস যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এল। ফারাজ তাকে আগে থেকেই পছন্দ করে, তাকে ভালোবাসে—এই ধ্রুব সত্যটা ভাবতেই রুশদীর গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। এক অজানা পুলক আর খুশির ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল তার হৃদয়ে। এমন অদ্ভুত শিহরণ সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
সে নিজের দুহাত বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে রেখে, লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল, "আমি প্রেমে পড়ে গেছি ওগো... ওগো জেন্টলম্যান!"
জ্যোৎস্নাস্নাত ছাদটা যেন রুশদীর সেই গোপন স্বীকারোক্তির সাক্ষী হয়ে রইল। যে ফারাজকে প্রথম দেখা থেকে এতকাল, ঝগড়ুটে,ম্যানারলেস বলত সেই মানুষটার হৃদয়েই তার জন্য বিশাল এক সিংহাসন পাতা—এটা ভেবেই সে আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ল।রুশদী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ফারাজ বোধহয় এতক্ষণে নিচে চলে গিয়েছে, তাই তার এই বাধভাঙা উল্লাস আর পাগলামি দেখার কেউ নেই। খাঁ খাঁ করা নির্জন ছাদটা যেন এখন শুধুই তার। সে মনের আনন্দে গুনগুন করে গান গেয়ে নিজের তালে নিজে নাচতে শুরু করল। খুশির কারণটা তো অতি সাধারণ অথচ ভীষণ দামি—প্রথম দেখায় যে লোকটাকে সে দুচক্ষে দেখতে পারত না, যার সাথে অকারণে ঝগড়া বেঁধে যেত, সেই গম্ভীর মানুষটাই কি না তাকে কত আগে থেকে পছন্দ করে! আর সে নিজে? সেও তো এখন... সামথিং সামথিং!হুম...!
নাচতে নাচতে আর ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সে থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন তার শরীরের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেল, বরফের মতো জমে গেল সে। ছাদের দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি, আর চোখ দুটো নিবদ্ধ ঠিক রুশদীর ওপর।ফারাজ কি তবে যায়নি? সে কি রুশদীর এই সব পাগলামি দেখে ফেলেছে?
লজ্জায় রুশদীর ইচ্ছে করল ছাদ ফেটে যদি মাটি দুভাগ হতো, তবে সে তার ভেতর ঢুকে যেত। না, এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা সম্ভব নয়! লজ্জায় চোখ-মুখ ঢেকে সে দরজার দিকে দৌড় দিল। এই চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার অন্তত নেই।
কিন্তু ভাগ্য আজ তার সাথে লুকোচুরি খেলছে। রুশদী যখন পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই খপ করে তার কবজিটা ধরে ফেলল ফারাজ। এক হ্যাঁচকা টানে রুশদীকে নিজের খুব কাছে নিয়ে এসে কোমড় জড়িয়ে ধরল সে। ফারাজের শরীরের উষ্ণতা আর সেই চেনা পারফিউমের ঘ্রাণে রুশদী আরও দিশেহারা হয়ে পড়ল। সে তখনও দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে।
ফারাজ তার এই ছটফটে বউয়ের এমন কাণ্ড দেখে শব্দ করে হাসল। মায়াভরা স্বরে বলল, "হাত সরাও! মুখে মুখে তর্ক করা বউটার এই লজ্জা মাখা মুখখানি আজ একটু তৃপ্তি করে দেখতে মন চাচ্ছে আমার।"
রুশদী হাত সরাল না, বরং আরও শক্ত করে মুখ চেপে রাখল। ফারাজ এবার কৃত্রিম ধমক দিয়ে বলল, "এই খাটো পটল! হাত সরাও বলছি।"
ফারাজের এমন ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য রুশদীকে আরও বেশি কাবু করে ফেলছে। তবে রুশদী তো দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। সে ভাবল, ফারাজের সামনে এভাবে হেরে গেলে তো চলবে না! অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সে হাত সরাল এবং স্বাভাবিক হওয়ার একটা আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু আজ কেন জানি নিজের হৃদস্পন্দনের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখের মায়ায় সে যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে।ফারাজ এই আকাশি রঙের চোখ জোড়া,ভীষণ ঘায়েল করে তাকে। ফারাজ রুশদীকে নিজের বাহুবন্ধনে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। তার চোখে দুষ্টুমিভরা ঝিলিক। নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, "নাচছিলে কেন ওভাবে? ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান তোমায় পছন্দ করে, সেই খুশিতে?"
রুশদী থতমত খেয়ে গেল। নিজের ধরা পড়ে যাওয়া আবেগ সামলাতে গিয়ে সে তোতলামি করে বলল, "মো...মোটেই না! আকাশটা পরিষ্কার, ওয়েদারটা আজ বেশ ভালো লাগছে, তাই।"
ফারাজ একদৃষ্টে রুশদীর লজ্জারাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পূর্ণিমার আলোয় সেই লালচে আভা যেন আরও মোহময় হয়ে উঠেছে। ফারাজ মৃদু হেসে বলল, "মানুষ প্রেমে পড়লে ওয়েদার ভালো লাগে। তো তুমি কার প্রেমে পড়লে?ম্যানেলেস খাম্বা ক্যাপ্টেন শারফারাজ খানের?"
রুশদী মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিয়ে ক্ষীণস্বরে বলল, "তেমন কিছুই না!"
ফারাজ এবার নিজের মুখটা রুশদীর কানের খুব কাছে এগিয়ে নিল। গরম নিঃশ্বাস রুশদীর ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ল। সে আদুরে গলায় বলল, "হুম... সামথিং সামথিং?"
রুশদী আর পারছিল না। হৃদপিণ্ডের ধকধকানিটা তখন গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। সে তর্জনী দিয়ে ফারাজের কপালটা আলতো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে মুখ কুঁচকে বলল, "নাথিং! নাথিং!"
ফারাজ এবার শব্দ করে হেসে উঠল। "মিথ্যাটাও ঠিকঠাক বলতে পারো না তুমি!"
রুশদী ছটফট করে উঠল। "ছাড়ুন আমাকে, আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে।"
"আবার মিথ্যা বলছ! আমি কাছে আসায় তোমার ভালোই লাগছে।তোমার হার্টবিটের শব্দ আমি এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি। আরও একটু কাছে আসব নাকি?"
রুশদী এবার চুপ হয়ে গেল। তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। ঠোঁট দুটো অবাধ্যের মতো কাঁপছে। এক অজানা বিদ্যুৎ তরঙ্গ যেন তার সারা শরীরে বয়ে যাচ্ছে। বাতাসে মিশে থাকা শিউলি ফুলের ঘ্রাণ আর ফারাজের শরীরের সেই পুরুষালি গন্ধে তার মগজ ঝিমঝিম করতে লাগল।
পরক্ষণেই ফারাজ সব দূরত্বের অবসান ঘটাল। কোনো সুযোগ না দিয়েই সে রুশদীর কাঁপা ঠোঁটজোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। গভীর, গাঢ় এক চুম্বন। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে দাঁড়াল। চাঁদের আলো, ঝিরঝিরে হাওয়া আর আকাশের তারারা সাক্ষী রইল এই নিভৃত মিলনের। রুশদী প্রথমে আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও, পরক্ষণেই তার সমস্ত বাধা দেওয়ার শক্তি উবে গেল। তার অবাধ্য হাত দুটো ফারাজের শার্ট খামচে ধরল। এক অদ্ভুত মাদকতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল—যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু আছে একে অপরকে অনুভব করার তীব্র তৃষ্ণা।
ফারাজ যখন রুশদীকে ছেড়ে দিল, রুশদী তখনো লজ্জার অতল সাগরে নিমজ্জিত। তার চোখের পাতা বোজা, মাথা নিচু। ফারাজ আলতো করে রুশদীর থুতনি ধরে মুখটা তুলল। ফারাজ ফিসফিসিয়ে বলল, "এটুকুতেই এত লজ্জা? আরও কাছে আসা তো এখনো বাকি, ম্যাডাম!"
রুশদী আর এক মুহূর্ত সইতে পারল না। লজ্জায় চুরমার হয়ে সে ফারাজের শক্ত বুকে মুখ লুকাল। ফারাজ তাকে দুই হাতে আগলে নিল—যেন সে এক অমূল্য রত্ন। বিয়েষ দিয়ে যে সম্পর্কের যান্ত্রিক সূচনা হয়েছিল, আজ পূর্ণিমার এই রাতে তার মনে প্রেমের চারাগাছটা মহীরুহে পরিণত হলো।
আকাশের চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকাল যেন এই নবদম্পতির একান্ত মুহূর্তকে আরও একটু গোপনীয়তা দিতে। চারদিকের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে শুধু শোনা যাচ্ছিল তাদের যৌথ হৃদস্পন্দন। আজ থেকে আর কেউ কারো থেকে দূরে নয়; এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান আর রুশদী একে অপরের হৃদয়ের চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল।
চলবে...