ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

২০তম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

২০../

রমনা পার্কের কাঠফাটা রোদ আর ঘামঝরানো গরমের মাঝেও চারদিকে এক নিস্তব্ধতা। একটি সিমেন্টের বেঞ্চিতে দুপাশে দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছে তিথি আর শান।বেঞ্চের ওপর আয়েশ করে হাত রেখে সে উদাস গলায় বলল, "এবার আপনাকে সরাসরি খান বাড়ির ছোট পুত্রবধূ করে নিয়ে যাব।"

তিথি একটু তেতো হাসল, "মিথ্যা আশা দেওয়া দয়া করে বন্ধ করুন।"

"আমি মিথ্যা আশা দিচ্ছি না তিথি," শানের স্বরে দৃঢ়তা।

তিথি এবার তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "রুশদীকে কি আমাদের সম্পর্কের কথা বলেছেন?"

"বলা হয়নি। আপনি কি বলেছেন?"

তিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "না! সাহস করতে পারিনি। রুশদী বিষয়টাকে কীভাবে নেবে, ঠিক বুঝতে পারছি না।"

শান অভয় দিয়ে বলল, "আমি বলে দিব, সমস্যা নেই।"

"আপনার ফ্যামিলি কি আমাদের এই সম্পর্ক মানবে?"

"ভাইয়া মানলেই পুরো ফ্যামিলি মেনে যাবে।"

"আর যদি ভাইয়া না মানে?"

শান মৃদু হেসে বলল, "ভাইয়া আজ পর্যন্ত আমার কোনো চাওয়া অপূর্ণ রাখেনি।নিজের দিকটা অপূর্ণ রেখেও সে সবসময় আমাকে পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে। আমার একটা আবদার সে রাখবে না—এমনটা হতেই পারে না।"

তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আর্দ্র কণ্ঠে বলল, "আপনি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবেন তো?"

শান কথা বাড়াল না। শুধু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

"তোমার হাতটা দাও তো!"

"কেন?"

"আরে দিন না!"

তিথি একটু ইতস্তত করে নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিল। শান তার প্যান্টের পকেট থেকে ছোট একখানা মখমলের বক্স বের করল। সেখান থেকে ঝকঝকে একটি আংটি বের করে সযত্নে পরিয়ে দিল তিথির অনামিকায়। তিথি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই আংটির দিকে।

শান শান্ত স্বরে বলল, "একে বোধহয় বাগদান বা এনগেজমেন্ট বলে। আপনাকে নিজের বলে দাবি করে রাখলাম। ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি শান—একবার যখন কোনো মেয়েকে মন দিয়েছি, তাকেই ভালোবেসেছি। বিয়ে করলে তাকেই করব।আমার এই মন দ্বিতীয় কাউকে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। আপনার প্রতি যে ভালোবাসাটা জন্মেছে, তা অন্য কারো জন্য আসবে না।"

তিথির চোখ দুটো নোনা জলে টলমল করে উঠল। ধরা গলায় বলল, "যদি কখনো এমন সময় আসে যে আপনি নিজেই পিছিয়ে গেলেন?"

"আসবে না!" শানের উত্তর ছিল পাহাড়ের মতো অটল।

তিথি আবারও সতর্ক করল, "আপনি কিন্তু এখনো আমার পরিচয় জানেন না। যদি জানার পর মনে হয় যে এই মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, তখন? আমার পরিচয় কিন্তু খুব একটা সম্মানজনক না শান।"

"আমি আপনাকে ভালোবেসেছি তিথি, আপনার পরিচয়কে নয়। আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।"

—০—

বিগত কয়েকটা দিন রুশদীর পায়ের যন্ত্রণায় কাটলেও আজ শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।পায়ের ব্যথাটা এখন আর নেই বললেই চলে। এই কদিন রুশদীকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছাড়েনি ফারাজ। রুশদী বারবার বলেছিল, "অযথা কাজ ফেলে আমার কাছে আটকে থাকার দরকার নেই," কিন্তু ফারাজ শোনেনি। তার জেদের কাছে হার মেনেই রুশদীকে ঘরে বন্দি থাকতে হয়েছে।

আজ অনেকদিন পর রুশদী একটু বাইরে বেরোনোর সুযোগ পেল।রুশদী চেয়েছিল একাই আসবে, কিন্তু ফারাজ তাকে একা ছাড়ার পাত্র নয়।সে এসেছে সঙ্গে নিয়েছে দুজন বডিগার্ড। এখন সরকারি হাই স্কুলের গেটের সামনে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে। মাথার ওপর দুপুরের তপ্ত সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে।ফারাজের কপালে বিরক্তির ভাঁজ স্পষ্ট, কারণ রুশদী এখনো খোলসা করেনি কেন এই ভরদুপুরে তাকে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।

স্কুল ছুটি হতেই হইহই করে একদল ছাত্র বেরোতে শুরু করল। সেই জনসমুদ্রের মাঝে রুশদীর চোখ খুঁজে ফিরছিল পরিচিত একটি মুখকে। হঠাৎ সে দেখতে পেল, ১৫-১৬ বছরের এক কিশোর পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে ভীষণ উদাসীন ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে। স্কুলের চপলতা নেই তার মাঝে, বরং একরাশ বিষণ্ণতা যেন তাকে ঘিরে রেখেছে। দেখামাত্রই রুশদী হাত নাড়িয়ে ডাক দিল— "নাহিদ...!"

প্রিয় বড় বোনের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই নাহিদ থমকে দাঁড়াল। ভিড়ের মাঝে রুশদীকে দেখতে পেয়েই তার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল। দুজনে দুই দিক থেকে দৌড়ে এসে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের বন্ধনটা ছিল আত্মার। এক মায়ের গর্ভে জন্ম না নিলেও তারা, আপন ভাই বোনের থেকে কোন অংশে কম নয়। নাহিদ চিরকালই একটু নরম স্বভাবের, আবেগ সামলাতে পারে না। এতদিন পর বোনকে কাছে পেয়ে তার চোখের কোণটা ভিজে উঠল।

রুশদী পরম মমতায় নাহিদের মাথায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করল, "কেমন আছিস রে?"

নাহিদ ধরা গলায় উত্তর দিল, "ভালো আছি আপু। তুমি কেমন আছো?"

"আমি তো অনেক ভালো! বাড়ির সবাই কেমন আছে রে?তোর আম্মু,আব্বু—সবাই ঠিক আছে তো?"

নাহিদের মুখটা নিমেষেই অন্ধকার হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, "নানু মারা গেছে আপু।"

রুশদী চমকে উঠল, "বলিস কী! কবে হলো এসব? আমাকে জানাসনি কেন?"

"দু-মাসের বেশি হলো। আম্মু তোমাকে জানাতে বারণ করেছিল। বাবা আর আম্মু তোমার ওপর ভীষণ রেগে আছে। বাবার বিজনেসটা একদম ডুবে গেছে, আর তারা এই সবকিছুর দায় তোমার ওপর চাপাচ্ছে। আম্মু বলছিল, তোমাকে পেলে নাকি মেরেই ফেলবে!"

আবেগের মুহূর্তে এমন তিক্ত কথা রুশদীকে স্পর্শ করল না।সে গায়ে মাখলোনা কথাটি।মৃদু হেসে নাহিদের কাঁধে হাত রাখল, "থাক, ওসব কথা এখন বাদ দে। আমি কাউকে ভয় পাই না। আজ আমার বার্থডে বয়ের মুখটা এমন অন্ধকার কেন? শুভ

জন্মদিন, নাহিদ হোসাইন!"

নাহিদ অবাক হয়ে তাকাল, "তোমার মনে আছে আপু?"

রুশদী মুচকি হেসে বলল, "আমার একমাত্র ভাইয়ের জন্মদিন আমি কোনোদিন ভুলতে পারি?"

ফারাজ এতক্ষণ দূর থেকে সবটা পর্যবেক্ষণ করছিল। এবার সে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। নাহিদ ভদ্র ছেলের মতো ফারাজকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।"

ফারাজ সালামের উত্তর না নিয়ে বেশ রসিয়ে বলল, "হ্যাপি বার্থডে, মাই ডিয়ার শালা!"

সবটুকু ঠিকই ছিল, কিন্তু ফারাজের মুখ থেকে ওই বিশেষ সম্বোধনটা নাহিদের কানে ঠিক ভালো শোনাল না। তার কেমন কালো হয়ে গেল।

আজ নাহিদের জন্মদিন বলে,এতদিন বাদে রুশদী দেখা করতে এসেছে ভাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের পর থেকে নাহিদের সাথে তার আর আগের মতো কথা হয় না, দেখা হওয়া তো আরও কঠিন। দিনটিকে স্মরণীয় করতে ওরা প্রথমে শহরের এক নামী রেস্টুরেন্টে পেটপুজো সারল। এরপর রুশদী চাইল ভাইকে কিছু কিনে দিতে। তাই ওরা এখন এক নামী ব্র্যান্ডের শোরুমে।

রুশদী নিবিষ্ট মনে নাহিদের জন্য জামা পছন্দ করছে। নাহিদও বোনের পাশে পাশে বেশ শান্ত ও ভদ্রভাবে হাঁটছে। তাদের ঠিক পেছনেই ছায়ার মতো লেগে আছে ফারাজ। আগে যখন সে নাহিদকে ‘শালা’ বলে ডেকেছিল, তখন ছেলেটার মুখের অদ্ভুত ভঙ্গি ফারাজের চোখ এড়ায়নি। একমাত্র শ্যালক বলে কথা, একটু মজা করার সুযোগ কি আর ছাড়া যায়?

ফারাজ পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এই আমার প্রাণপ্রিয় শালা নাহিদ।"

নাহিদ খুব ভদ্রতার সঙ্গে উত্তর নিল,"জি ভাইয়া...?"

ফারাজ এবার বেশ জোরের সাথেই নাহিদের কাঁধে হাত রাখল। "এই শালা, আমি কি তোমার ভাইয়া লাগি? একমাত্র দুলাভাইকে কেউ ভাইয়া ডাকে নাকি? আমি ছাড়া আর কোনো দুলাভাই কি আছে তোমার? শালা নাহিদ!"

‘শালা’ শব্দটা এবার নাহিদের বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না।বিরক্ত লাগছে।তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে,সে আমতা আমতা করে বলল, "না মানে ভাইয়া... আসলে ‘ভাইয়া’ ডাকটাতেই আমি বেশি কমফোর্ট ফিল করি, তাই..."

"আরে শালা! আবার ভাইয়া ডাকে! দুলাভাই ডাকো, দুলাভাই!"

নাহিদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নিচু করে বলল, "আচ্ছা দুলাভাই।"

"গুড! মাই ডিয়ার শালা! আমার শালাটা বড্ড সুইট!"

বলেই ফারাজ টেনে নাহিদের গাল টিপে দিল।

ফারাজের এসব কর্মকাণ্ডে নাহিদ এবার রীতিমতো বিরক্ত। সে মুখ গোমড়া করে বলেই ফেলল, "আপনি আমাকে বারবার এভাবে ‘শালা’ বলে গালি দিচ্ছেন কেন?"

"আরে আমি কোথায় গালি দিলাম? আমি তো তোমাকে আদর করে ডাকছি। তুমি কি আমার শালা না?"

"এই নামে ডাকবেন না! আমার একদম ভালো লাগে না।"

ফারাজ নাহিদের কাধে হাত রেখে বলে,

"তুমিও দেখছি তোমার বোনের মতোই হয়েছ! তোমাদের আদর করে কোনো একটা নামে ডাকলেই ছ্যাত করে ওঠো। শালা, তোমরা এমন কেন?"

নাহিদ শান্ত সুরেই বলল,"ভাইয়া, আপনাকে বললাম না ওই নামে ডাকবেন না!"

ফারাজ তবুও থামল না, মুচকি হেসে আবারও বলল, "শালা নাহিদ...!"

নাহিদ আর সহ্য করতে পারল না। ফারাজের হাত নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে সে সোজা রুশদীর কাছে চলে এল। রুশদী তখন একটা শার্ট পছন্দ করছিল। তাকে নালিশ করার সুরে নাহিদ বলল, "আপু, ভাইয়া আমাকে ‘শালা’ বলে গালি দিচ্ছে!"

রুশদী সবটা শুনে একটু হেসেই বলল, "তুই অকারণে চেতছিস কেন? উনি তো মজা করছে!"

ফারাজ কাছে আসতেই রুশদী এবার তার দিকে ফিরে চাইল। গলায় হালকা শাসনের সুর তুলে বলল, "আপনি কেন ওকে খামোখা বিরক্ত করছেন?"

ফারাজ হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে বলল,

"আরে তুমিও রাগছ কেন? আমি তো একটু ইয়ার্কি করছিলাম। ও তো দেখছি একদম সেন্টি খেয়ে গেল! ওকে বাবা, সরি মাই ডিয়ার শালা!"

রুশদী এবার কঠোরভাবে বলল, "ফারাজ, আপনি চুপ করবেন? দেখছেন তো ও ব্যাপারটা সহজভাবে নিচ্ছে না। একদম আর ওকে খেপাবেন না!"

--

If you hard, you gotta get

on the floor...if you are a party freak,

then step on the floor

if you are an animal,

Tear on the floor

break a sweet on the floor

yeah! We work in the flower ❞

রাত একটা।গুলশান ২-এর সেই নামী নাইট ক্লাবটির স্পিকারগুলো থেকে তখন বিকট শব্দে গান ফেটে পড়ছে। চারদিকের নীল-লাল আলো আর কড়া পারফিউমের গন্ধে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ। ক্লাবের ভেতরটা তখন আধুনিকতার নামে এক চরম উচ্ছৃঙ্খলতায় মত্ত। ডান্স ফ্লোরে আধো-অন্ধকারে যে যার মতো উদ্দাম নাচানাচিতে ব্যস্ত। তরুণীদের পরনের পোশাকগুলো এতটাই সংক্ষিপ্ত যে সেগুলোকে ঠিক পোশাক বলা চলে কি না, তা নিয়ে সংশয় জাগে। হাতে মদের বোতল আর ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি নিয়ে তারা মিশে যাচ্ছে ভিড়ের মাঝে।

সিফাতের সাথে আজ শানও এখানে এসেছে। সিফাতের মতো রোজ রোজ এই নেশার নরকে আসার অভ্যাস শানের নেই, কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আর মনের অবাধ্য টানে আজ সে নিজেকে আটকাতে পারেনি।এই বয়সে ছেলেদের উড়ু উড়ু মন কতক্ষণ আর আটকে রাখা যায়? তাদের টেবিলের ওপর সাজানো দামী মদের বোতল। সিফাত একের পর এক গ্লাস সে খালি করে চলেছে যান্ত্রিকভাবে। ড্রাগ আর অ্যালকোহলে তার শরীর এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, সহজে এখন আর নেশাই চড়তে চায় না।

শান সেখানে বসে আছে বেশ সতর্ক হয়ে। সে জানে, সীমানা পার করলেই বিপদ। যদি কোনোভাবে টলমলে পায়ে বাড়ি ফেরে আর ফারাজের সামনে পড়ে যায়, তবে তার কপালে যে কী দুর্ভোগ আছে—তা ভেবেই শানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সিফাতকে আবার বোতল টানতে দেখে শান হাত বাড়িয়ে বাধা দিল, "সিফাত, অনেক হয়েছে রে। আর খাস না। বাসায় ফিরতে হবে, রাত অনেক হয়েছে।"

নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন সিফাত ঝট করে শানের হাত সরিয়ে দিল। রক্তিম চোখে তাকিয়ে মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, "শাট আপ! ফাক আ বিচ..."

মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ ব্যাধি, যা মানুষের বিবেক আর মস্তিষ্ককে পঙ্গু করে দেয়। সিফাতের মস্তিষ্ক এখন আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই; সেখানে রাজত্ব করছে কেবল তীব্র নেশার চাহিদা। শান বুঝল, এই অবস্থায় একে বাধা দেওয়া মানেই অকারণে কিছু গালি শোনা। কিন্তু এই অবস্থায় ফেলে রেখে চলেও যাওয়া যায় না। কখন কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে ঠিক নেই।

সিফাত গ্লাসের পর গ্লাস শেষ করে একসময় চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে হেলান দিয়ে বসল। ঝাপসা চোখে সে ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকাল। সেই আলো-আঁধারির ভিড়ের মাঝে হঠাতই তার দৃষ্টি আটকে গেল এক তরুণীর ওপর। লাল রঙের একটি বডিকন ড্রেস পরা মেয়েটি তখন সুরের তালে শরীর দোলাচ্ছে। মেয়েটির সেই পরিচিত আদল আর আগুনের মতো লাল পোশাকটি দেখে সিফাতের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্কে এক ঝটকায় বিদ্যুৎ খেলে গেল।সেই উগ্র গানের তালে মাতাল ক্লাবের ডান্স ফ্লোরে লাল রঙের বডিকন পরা মেয়েটি যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিকাণ্ড। হাঁটু পর্যন্ত ঝুল, ঘাড়ের কাছে সরু ফিতার সেই ড্রেসটি তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে নির্লজ্জভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ঠোঁটে রক্তবর্ণের লিপস্টিক আর মুখের ভারি মেকআপে তাকে কোনো এক পৌরাণিক মায়াবিনীর মতো লাগছে। সোনালী রঙের চুলে কৃত্রিম আলোর ছটা পড়ে এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি করছে। সুন্দরী সে সন্দেহ নেই, তবে সেই সৌন্দর্য যেন এক বিষাক্ত তৃষ্ণার মতো।

সিফাতের নেশাতুর চোখ সেই লাল রঙের মরণফাঁদে আটকে গেল। মেয়েটিও বোধহয় সিফাতের সুঠাম দেহ দেখে প্রলুব্ধ হয়েছিল। সে চোখ দিয়ে সিফাতকে এক অদ্ভুত ইশারায় কাছে ডাকল। সিফাতের অবচেতন মন তখন একজন সঙ্গিনীর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মরিয়া। শান আবারও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু নেশার ঘোরে থাকা সিফাত তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে শানের হাত ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেল সেই আগুনের দিকে।

মেয়েদের স্বভাবজাত লাজুকতার কোনো চিহ্ন এই মেয়ের মাঝে নেই। সিফাত কাছে যেতেই এলিসা তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। সিফাতও দেরি না করে মেয়েটির কোমরে হাত রেখে নিজের দিকে টেনে নিল। তার অভিজ্ঞ চোখ এক পলকেই চিনে নিল এই চঞ্চলা হরিণীকে। সে কোনো ভূমিকা না করেই এলিসার গলায় উষ্ণ এক চুম্বন একে দিল। এলিসার চোখেমুখে তখন সম্মতির ঝিলিক।

সিফাত নেশা জড়ানো গলায় ইংরেজিতে শুধালো, "What’s up, darling? And what’s your name?"

মেয়েটি মোহময়ী হাসি দিয়ে উত্তর দিল, "My name is Elisa. What's yours?"

"Lady Killer!"

"Nice name with a nice body!"

"But your figure is more stunning than your name, babes!"

"Thank you, darling!"

সিফাত আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। সরাসরি প্রস্তাব দিল, "Can I check the flavor of your lipstick?"

এলিসার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সিফাত তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এই কলুষিত পরিবেশে এমন নষ্টামি দেখার মতো সময় কারো নেই; আশপাশের শত শত মানুষ তখন যে যার মতো আদিম খেলায় মত্ত। এলিসা বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, বরং আরও বেশি আহ্লাদে গলে গিয়ে বলল, "I like your personality, babes! I prefer men who are this direct!"

সিফাত তার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "Do you want to enjoy something more directly, darling Elisa?"

"Why not?"

"Then let’s go!"

এলিসা ক্লাবের একজন নিয়মিত এবং প্রভাবশালী সদস্য। সে সিফাতের হাত ধরে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশেষ কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল।--

--

রাত তখন আড়াইটা। শান ঠায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, শরীরে রাজ্যের অবসাদ। এমন সময় টলমলে পায়ে ফিরে এল সিফাত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে পাহাড়সমান কোনো পরিশ্রম করে এসেছে, হাঁপাচ্ছে আর ঘামছে। শান বিরক্তি আর উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করল, "কী অবস্থা তোর? ড্রাগ নিয়েছিস নাকি? তোকে খুঁজতে খুঁজতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, কোথায় গিয়েছিলি তুই?"

সিফাত ধপাস করে চেয়ারে বসে আবার গ্লাসে মদ ঢালতে শুরু করল। নির্লিপ্ত স্বরে বলল, "ডেটে গিয়েছিলাম!"

"হোয়াট দ্য ফাক! তুই ওই মেয়েটার সাথে ডেটে গিয়েছিলি? তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস জানতাম না!" শানের কণ্ঠে ঘৃণা ঝরে পড়ল।

সিফাত অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, "এনজয় ইওর লাইফ ব্রো! জাস্ট চিল। আমাকে জ্ঞান না দিয়ে তোর যদি কাউকে ভালো লাগে, তুইও যা!"

"আমার রুচি তোর মতো এত জঘন্য না," বলেই শান রাগে এক নিশ্বাসে কয়েক গ্লাস পান করে ফেলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নেশার নীল বিষ দুজনের রক্তে মিশে গেল। শান আর সিফাত—দুজনই এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, পুরোপুরি মাতাল। ক্লাবের ঝাপসা আলো আর কড়া মিউজিকের মাঝে শান হঠাৎ থমকে গেল।

শানের গলার স্বর আতঙ্কে বুজে এল, সে ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া...!"

সিফাত চোখ পিটপিট করে তাকাল, "কীহ?"

"ভা..ভা..ভাইয়া...!" শানের চোখেমুখে তখন জমাট বাঁধা আতঙ্ক। সে হাত দিয়ে পেছনের অন্ধকারের দিকে ইশারা করল। সিফাত টলতে টলতে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির অবয়ব আর রাগী চাউনি দেখে শান বিড়বিড় করল, "দেখতে ঠিক ফারাজ ভাইয়ার মতো লাগছে না?দে..!"

ফারাজ বজ্রকঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে।সিফাত কথা শেষ হওয়ার আগেই সে সজোরে এক বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় কষিয়ে দিল সিফাতের গালে।

-

রুশদী তখনও ঘুমায়নি, অপেক্ষা করছিল ফারাজ এর জন্য।পানি খেতে নিচে নামলে দেখল,শান ও সিফাতকে কয়েকজন গার্ড ধরাধরি করে শান এর রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।তাদের দেখে স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ মনে হচ্ছে না।রুশদী এ নিয়ে ফারাজকে প্রশ্ন করলে, ফারাজ উত্তর না দিয়ে হনহনিয়ে রুমে চলে গেল।

ফারাজ নিজের ঘরে ঢুকে গায়ের দামি ব্লেজারটা এক ঝটকায় খুলে বিছানায় ছুড়ে দিল। রুশদী ছায়ার মতো পিছু নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজায় লক করল।ফারাজকে রাগান্বিত দেখাচ্ছে।

“এত রাত অবধি কোথায় ছিলেন আপনি? আর ভাইয়াদের অমন অবস্থা কেন?কোত্থেকে নিয়ে আসলেন আমাদের?”

ফারাজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের কলারটা আলগা করল। আয়নায় প্রতিফলিত তার রাগান্বিত মুখখানা।গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, “বারে গিয়েছিল ওরা। সেখান থেকে ধরে নিয়ে এসেছি বেয়াদব দুটোকে।”

রুশদী কথাটায় তেমন রিয়াক্ট করলো না, বড়লোক ঘরের ছেলেদের একটু-আধটু উচ্ছৃঙ্খলতা তার কাছে নতুন নয়। তবে তার খটকা লাগল অন্য জায়গায়। ফারাজ জানল কী করে ওরা বারে গিয়েছিল?মান ওরা বারে গেলে তো আর ঢাক ঢোল পিটিয়ে যাবে না!

“আপনি কীভাবে জানলেন ওনারা ওখানেই আছেন?”

ফারাজ বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। “আমিও ক্লাবে গিয়েছিলাম। নিজের চোখে দেখলাম বসে বসে গিলছে!”

রুশদীর কপালে ভাঁজ পড়ল। সে ফারাজের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। “আপনি ক্লাবে কী করতে গিয়েছিলেন?”

ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। ফারাজ এমনিতে ভাইদের কাণ্ডে চটে আছে, তার ওপর রুশদীর এই জেরা জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালল। সে কপাল কুঁচকে বলল, “আমি সেখানে কী করতে গিয়েছিলাম সেটা তোমার না জানলেও চলবে রুশদী।”

“না, আমার কাছে এটাই এখন সবচেয়ে জরুরি,” রুশদী হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁধল।ব “ কী করতে গিয়েছিলেন সেখানে?”

“ কাজে!” ফারাজ এড়িয়ে যেতে চাইল।

রুশদী বাঁকা হাসল, “রাত তিনটা বাজে কি তবে আপনি নাইট ক্লাবে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন?”

“রুশদী!” ফারাজের কণ্ঠে সতর্কবাণী।

কিন্তু রুশদী থামল না। সে এক পা এগিয়ে এল। “আসলে আমার জানামতে ওই সময়ে নাইট ক্লাবে কোনো ইবাদত হয় না। সেখানে চলে অশ্লীলতা, মদ আর স্বল্পবসনা নারীদের উদ্দাম নাচ। এর ভেতর আপনি কোন ফরজ কাজটা পালন করতে গিয়েছিলেন, সেটা জানলে আমার মনের খটকাটা কাটত।”

ফারাজ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। রুশদীর চোখের মণি যেন তার ভেতরের সত্যটা টেনে বের করতে চাইছে। সে ধীর স্বরে প্রশ্ন করল, “তোমার কি আমাকে তেমন লোক মনে হয়?”

রুশদী মাথা নাড়াল। “না, আমি জানি আপনি খুব নীতিবান মানুষ। কিন্তু সাধুরা তো অসাধু জায়গায় যায় না। আপনি কাজের নামটা গোপন করছেন দেখেই সন্দেহটা বাড়ছে। নামটা বলেই দিন না, আমার সন্দেহ এক লহমায় ধুলোয় মিশে যাবে!”

“একজন বন্ধুর ফেয়ারওয়েল পার্টি ছিল। দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে তো, তাই বাধ্য হয়ে যেতে হলো।”

রুশদী এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “ওহ!মদ খাওয়ার পার্টি?”

“রুশদী, একটা ক্লাবে বার সেকশন আর সাধারণ রেস্টুরেন্ট সেকশন আলাদা থাকে, বুঝতে পেরেছ?”

“হুম! বেশ বুঝতে পারছি আপনি আমায় নুলা বুঝ দিচ্ছেন,” রুশদী হাতছানি দিয়ে ফারাজকে নিজের কাছে ডাকল, “এদিকে আসুন, চেক করব!”

ফারাজ অবাক হয়ে বলল, “কী চেক করবে?”

“মদ খেয়েছেন কি না?”

ফারাজ এবার হেসেই ফেলল। রুশদীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে দুষ্টুমি করে প্রশ্ন করল, “আমি যদি মদ খেয়েও থাকি, তুমি সেটা টের পাবে কীভাবে?”

রুশদী নিজের নাকে আঙুল ঠেকিয়ে গলার স্বরে কিছুটা তেজ মিশিয়ে বলল, “এই যে আমার ডিটেকটিভ নাক আছে, কী করতে? গন্ধ শুঁকেই সব বুঝে ফেলব!”

ফারাজ মুচকি হেসে টিপ্পনী কাটল, “তোমার

কুকুরের নাক নাকি?”

রুশদী তৎক্ষণাৎ চোখ পাকিয়ে তাকাল। তার সেই ‘

ভয়ংকর চাউনি দেখে ফারাজ নিজের হাসি আর চাপতে পারল না। ভাইদের কান্ড দেখেছে যতটা রাগান্বিত হয়ে গেছিল,তা নিমিষেই পানি হয়ে গেল রুশদীর এমন কথা বার্তা শুনে।ফারাজ দুই হাত দুপাশে মেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করার মতো করে বলল, “ঠিক আছে, কুল! নাও চেক করো।”

রুশদী তার খুব কাছে এগিয়ে এল। ফারাজের বুকের ওপর হালকা ঝুঁকে পড়ে নাক দিয়ে শুঁকে দেখল কোনো উগ্র পানীয়ের ঘ্রাণ আসছে কি না। না, দামী পারফিউমের ঘ্রাণ ছাড়া আর কিছুই নেই। রুশদী কিছুটা হতাশ হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল, “এবারের মতো বেঁচে গেলেন!”

ফারাজ দুষ্টুমির ছলে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কেন? মদ খেয়ে এলে কি আমায় মারতে?”

“নাহ! বড় একটা চুমু দিতাম!” রুশদী খুব সাবলীলভাবে কথাটা বলে ফেলল।

আহ!কি বড়ো লস হয়ে গেল?এটা কোনো কথা? মদ না খাওয়ায় সে একটা চুমু মিস করে গেল? কপট আফসোস নিয়ে কপালে হাত দিয়ে ফারাজ বলল, “শিট! বিশাল লস হয়ে গেল আমার।আগক জানলে একটু লাল পানি খেয়েই আসতাম! তোমার ইয়াম্মি চুমুটা মিস হয়ে গেল,শিট!!”

রুশদী লজ্জা পেলেও তা আড়াল করে চেঁচিয়ে উঠল, “ইস্! ফালতু কথা কম বলবেন। আমার তরফ থেকে এটাই আপনার জন্য ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং—এইসব ড্রিঙ্কস-ফ্রিঙ্কস আমি একদম পছন্দ করি না। যে কারণেই হোক, ভুলেও কখনো এসবের ধারেকাছে যাবেন না।”

ফারাজ এবার এক পা এগিয়ে এল। রুশদীর খুব কাছে গিয়ে নীচু গলায় প্রশ্ন করল, “ইদানীং খুব শাসন করছ আমায়! তা, বউয়ের অধিকার খাটাচ্ছ বুঝি?”

রুশদী দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক চিতিয়ে জবাব দিল, “বউ যখন, অধিকার তো খাটাবই!”

ফারাজ এবার রুশদীর কোমরের কাছে হাত রেখে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তার কণ্ঠস্বর এখন গভীর এবং নেশাতুর। “তবে কি আমিও স্বামীর অধিকার খাটাই? কী বলো?”

হঠাৎ এই ঘনিষ্ঠতায় রুশদীর শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে গেল। সে মৃদু কেঁপে উঠল। ফারাজের চোখের গভীরে থাকা সেই অন্যরকম চাহনি তাকে দিশেহারা করে দিল। কথা গুছিয়ে উঠতে পারল না রুশদী। নিজের ভেতরের প্রবল অস্বস্তি আর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি লুকিয়ে বলল,"স্বামী যখন, তখন অধিকারতো খাটাবেনই! "

"আচ্ছা তাই!"

"ইয়েস ক্যাপ্টেন!"

" l love you রুমাইসা!"

"উম!এভাবে ভালো লাগছে না অন্য ভাবে বলুন।"

"তুমি আমার জান

হাঁপানি রোগের টান

আজ তো মুরগির রান

বাংলা ছবির গান

আই লাভ ইউ জান!

নাও এবার লাভইউ টু বলো! "

"হেট ইউ টু!"

ফারাজ কান চুলকে বলল,

"ইদানীং বোধহয় আমি কানে কম শুনি, তুমি লাভ ইউ বলছো।আমি হেট ইউ শুনছি!"

রুশদী ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,

"হেট ইউ'ই বলেছি আমি।"

-

বিছানার এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে সিফাত। শরীরটা যেন বিষের মতো ভার হয়ে আছে, গতরাতের হ্যাংওভার এখনো কাটেনি। প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র দুর্বলতা; মনে হচ্ছে হাড়ের ভেতর থেকে কেউ সব শক্তি শুষে নিয়েছে। পাশের বাথরুম থেকে শানের ওয়াক ওয়াক শব্দটা তীরের মতো কানে এসে বিঁধছে ওর। ঘুম ভাঙার পর থেকে এই নিয়ে শান কয়েক দফা বমি করল।

বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সিফাত চেঁচিয়ে উঠল, "এই চুপ করবি? তুই কি প্রেগন্যান্ট নাকি যে এভাবে বমি করছিস? যা চুল গিলতে পারিস না, তা গিলতে গিয়েছিলি কেন? শালা, মেজাজটাই নষ্ট করে দিলি! আর একবার যদি বমির শব্দ পাই, তবে তোকে কোমডে ঢুকিয়ে ফ্লাশ করে দেব!"

বাথরুমের ভেতর শানের নাভিশ্বাস দশা। পেটে কিছু নেই, অথচ পিত্তি জ্বলে যাওয়া বমি দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখ-চোখ ধুয়ে টলমল পায়ে বেরিয়ে এসে বিছানায় ধপ করে বসল সে। মনের ভেতর অপরাধবোধ আর আতঙ্ক সাপ হয়ে দংশন করছে—না জানি গতকাল রাতের কাণ্ডের জন্য ভাইয়া কী শাস্তি তুলে রেখেছেন!

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা সাদা খাম ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। শান মাথা তুলে দেখল, ফারাজ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। শানের মুখে কোনো কথা সরল না, কিন্তু ফারাজ বরফশীতল কণ্ঠে বলল, "তোমার টিকিট। আগামীকালই ফ্লাইট। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ভেবেছিলাম ফুটবলের প্রতি তোমার এই টান, একদিন ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করবে, কিন্তু তোমার মাঝে আমি সেই জেদ বা শৃঙ্খলা দেখছি না। বিদেশে চলে যাও, মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ড্যাডও অন্তত খুশি হবেন।"

শানের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। এক মুহূর্তের সামান্য উত্তেজনায় করা ভুলটা যে এতটা প্রকাণ্ড রূপ নেবে, তা ও ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। নিজের স্বপ্ন, নিজের ভালোবাসার ফুটবল—সবই আজ এই ভুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল। বাড়িতে একমাত্র ভাইয়াই ওর পাশে ছিল, অথচ সেই ভাইয়া আজ নিজ হাতে ওর স্বপ্নের পথ আগলে দাঁড়াল। কক্ষজুড়ে তখন এক ভারী নীরবতা।সিফাত অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে, তবে তার চোখের কোণে লেগে আছে এক চিলতে আশা। যদি ফারাজ ভাই একবার ফিরে তাকান!

ফারাজের-"তোমাদের দুজনের আসলে লজ্জা থাকা উচিত। বড় বড় বুলি আওড়াও, ফুটবল না থাকলে নাকি মরে যাবে! অথচ কয়েকদিন পর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ,তোমরা তো মেডিকেল টেস্টেই বাদ পড়ে যাবে। সবটুকু স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিলে! হাহ্! আমিই আসলে ভুল করেছিলাম। তোমদের মতো মেরুদণ্ডহীনদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না।"

ফারাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে চাইলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই শান আর্তনাদ করে উঠল, "ভাইয়া...!"

বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়ালেন ফারাজ। তার বজ্রকঠিন কণ্ঠে চেচিয়ে উঠল শান এর উপর, "খবরদার! আর একটা বার যদি ভাইয়া বলে ডেকেছিস, তবে থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেব। লজ্জা লাগে না এই মুখে আমাকে বড় ভাই ডাকতে? তোদের জন্য তোদের ড্যাড এর বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি, আর তোরা আমার মুখটা এমনভাবে ডোবালি? তোদের প্রতি বলার মতো কোনো ভাষা আমার অবশিষ্ট নেই।"

শান ডুকরে কেঁদে উঠল, "ভাইয়া প্লিজ, একটা সুযোগ! আমি কসম করছি, এমনটা আর কখনো হবে না। দোহাই তোমার ভাইয়া, এমন কঠোর হয়ো না।"

ফারাজ শীতল গলায় বললেন, "সুযোগ শেষ। তোদের শেষ সুযোগটা তোরা নিজেরাই ড্রেনের নর্দমায় ছুড়ে ফেলেছিস।"

শানের চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে টলটলায়মান পায়ে সিফাত এসে ফারাজকে জাপটে ধরল। নেশার ঘোর এখনো পুরোপুরি কাটেনি, মস্তিষ্ক যেন অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করছে। ফারাজের বুকে মাথা রেখে সিফাত হু হু করে কেঁদে ফেলল।

আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সে ভাঙা গলায় বলতে লাগল, "আমার নিজের কোনো ভাই নেই ভাইয়া। কিন্তু বাবার পরে তুমিই ছিলে আমার মাথার ওপর সেই বিশাল বটগাছের ছায়া। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান ভাবতাম। ছোটবেলা থেকে আজ অবধি তুমি আমাদের জন্য যা করেছ, নিজের আপন ভাইও বোধহয় এতটা করে না। শানের জন্য যা করেছ, আমার জন্য তার চেয়ে তিল পরিমাণ কম করোনি, বরং বেশিই করেছ। কিন্তু আমি মানুষটা পচে গেছি ভাইয়া! আমি অনেক খারাপ হয়ে গেছি। এই বিষাক্ত নেশা আমাকে গিলে খেয়েছে। কেন যে এমন হয়ে গেলাম জানি না, ভালো-মন্দের বোধশক্তি সব হারিয়ে ফেলেছি আমি..."সিফাতের কণ্ঠ তখন কান্নায় বুজে আসছে, সে ফারাজের শার্ট খামচে ধরে হাহাকার করে উঠল, "বিশ্বাস করো ভাইয়া, কাল শানকে জোর করে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম। ও যেতে চায়নি, ওর কোনো দোষ নেই। সব অপরাধ আমার, সব ভুল আমার! আমি জানি আমার জন্য তোমাকে সবার সামনে ছোট হতে হয়েছে, তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। কিন্তু আমি কী করব ভাইয়া? নেশাটা না করলে আমার মাথা আর কাজ করে না, সব ওলটপালট হয়ে যায়। ওভারডোজ মেডিসিনের ঘোরে আমি পাগল হয়ে যাই, নিজেকে সামলাতে পারি না। তবুও আমি সব ছেড়ে দেব ভাইয়া, তুমি যদি বলো আমি আজই সব ছুড়ে ফেলে দেব। দরকার হলে ফুটবল খেলাও ছেড়ে দেব, কিন্তু প্লিজ তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমার মতো বখে যাওয়া ছেলেদের জন্য তোমার মতো একটা বটগাছ খুব দরকার। আমার কোনো আপন ভাই নেই ভাইয়া, তুমিই তো আমার সব!"

সিফাতের এই আর্তনাদ আর বুকফাটা স্বীকারোক্তি ফারাজের কঠিন হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল। যে পাথরপ্রতিম কাঠিন্য নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাগ বড্ড অভিমানী জিনিস, কিন্তু ভালোবাসার কাছে তা বরাবরই হার মানে।দুই ভাইয়ের এই অসহায়ত্ব দেখে ফারাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।

ফারাজ লম্বা একটা শ্বাস ফেলে সিফাতের মাথায় হাত রাখল।গম্ভীর কিন্তু নরম গলায় বললেন, "তোদের আমি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দেখতে চাই। এবার যেন ট্রফিটা আমাদের দেশেই আসে, মনে থাকে যেন!"

ফারাজের মুখ থেকে এই অভয়বাণী শোনা মাত্রই ঘরের গুমোট পরিবেশ এক নিমেষে জাদুকরীভাবে বদলে গেল। যেন গাঢ় মেঘ কেটে গিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়ল ঘরের ভেতর। শান আর সিফাত মুহূর্তকাল একে অপরের দিকে স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই আনন্দের এক প্রবল জোয়ার আছড়ে পড়ল তাদের ওপর।

"ইয়েসসস! ভাইয়া থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!" চিৎকার করে উঠল শান।

এতক্ষণ যে শরীরে একবিন্দু শক্তি ছিল না, সেই শরীরে যেন হাজার ওয়াটের বিদ্যুৎ খেলে গেল। সিফাত খুশিতে আত্মহারা হয়ে ফারাজকে জড়িয়ে ধরে। শানও যোগ দিল তাতে। দুজনের নাচানাচি আর পাগলামি দেখে মনেই হচ্ছিল না কিছুক্ষণ আগে এখানে শোকের ছায়া নেমেছিল। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঘুরতে লাগল, বিছানার চাদর এলমেলো হয়ে গেল, বালিশগুলো ছিটকে পড়ল মেঝেতে।

তাদের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখে ফারাজের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন