ফন্ট সাইজ:
থিম:
অস্তরাগের রঙ

১৯তম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#অস্তরাগের_রঙ

#তেজরিন_উম্মীদ

১৯..।।

সিফাতকে শান একপ্রকার জোর করেই চট্টগ্রামে নিয়ে এসেছে। এখানে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা তার ছিল না। ঢাকাতেই নিজের চেনা ক্লাবে সাথে আড্ডা দিয়ে দারুণ সময় কেটে যাচ্ছিল তার; সেটাই তো আসল এনজয়মেন্ট! অথচ এই গ্রামে এসে নিজেকে এক বন্দি কয়েদি মনে হচ্ছে। কোনো কিছুই তার ভালো লাগছে না, এখন কোনোমতে ঢাকা ফিরতে পারলেই সে বাঁচবে।

তখন সকাল প্রায় এগারোটা। সকালের নাস্তা শেষ করে সে ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। কিন্তু পুরোনো এই বাড়ির ভেতরে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।ওদিকে গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলা জরুরি, তাই সিফাত বাধ্য হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হলো। কিন্তু বাইরেও নেটের অবস্থা তথৈবচ।

সিফাত বিরক্ত হয়ে যখন ফোনটা পকেটে পুরছে, ঠিক তখনই তার চোখ গেল মিতুর ওপর। সাদামাটা মিতু নামের মেয়েটা বাড়ির বাইরে যাচ্ছে। সিফাত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অলস পায়ে মিতুর পিছু নিল। উদ্দেশ্য খুব সরল—কিছু সস্তা ফ্লার্টিং করে মেয়েটাকে একটু পটানো। আসলে মিতুর মতো এমন খেত আর অতি-সাধারণ টাইপের মেয়ে সিফাতের সাথে একদমই যায় না। তার পছন্দ আল্ট্রা-মডার্ন, ওয়েস্টার্ন পোশাক পরা ঢাকার মেয়েরা। কিন্তু এই মুহূর্তে এই করার মতো আর কোনো বিনোদন নেই। স্রেফ বোরিং টাইম পাস করার জন্যই সে মিতুকে বেছে নিল।

সিফাত পেছন থেকে ডাকল,

"হেই মিতু!"

মিতু থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকাল। সিফাত তাকে ডাকছে দেখে সে আর পা বাড়াল না। সিফাত একটু হেসে তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল,

"Where are you going?"

মিতু মাটির দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, "এমনি একটু হাঁটছি!"

"Let’s explore your village together!" সিফাত বেশ চটপটে গলায় বলল।

মিতু চট করে একবার সিফাতের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, "না... নাহ্!"

সিফাত একটু অবাক হওয়ার ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলল, "কী, নাহ্?"

"না... মানে, আপনার সঙ্গে আমি ঘুরতে যেতে পারব না। গ্রামের মানুষ দেখলে নানা কথা বলবে, খারাপ ভাববে। আর... আর আমি কখনো কোনো ছেলের সঙ্গে একা ঘুরি না!"

সিরিয়াসলি! একটা মেয়ে সিফাতকে এভাবে সরাসরি মুখের ওপর না করে দিল? ব্যপারটা সিফাত কোনোভাবেই হজম করতে পারল না। তার মতো হ্যান্ডসাম, মডার্ন একটা ছেলেকে এই পাড়াগাঁয়ের একটা মেয়ে কীভাবে রিজেক্ট করে! ধাক্কাটা সোজা গিয়ে লাগল সিফাতের পুরুষালি ইগোতে। সে মুখটা একটু শক্ত করে অবহেলার সুরে বলল, "ওকে দেন, তুমিই যাও। টাটা!"

কথাটা বলেই সিফাত আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ওদিকে সরল মিতু হুট করে অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করল। মুখ ফসকে সে এমন একটা কথা বলে ফেলেছে, যা হয়তো নতুন অতিথিকে অপমান করে ফেলেছে। লোকটা মনে হয় খুব মাইন্ড করেছে! মিতু অপরাধী মুখে একটু এগিয়ে গিয়ে ডাকল, "ইয়ে... আপনি চাইলে আমাদের বাগানে ঘুরতে পারেন!"

সিফাত দাঁড়াল। পেছনে ফিরে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "এইটুকু বাগানে আর কী ঘুরব?"

মিতু তড়িঘড়ি করে বলল, "না, এদিকে আমাদের আরও একটা অনেক বড় বাগান আছে।"

সিফাত মনে মনে হাসল। মেয়েটা যে অলরেডি তার জালে পা দিতে শুরু করেছে, তা বুঝতে পেরে তার ইগো কিছুটা শান্ত হলো। সে পকেটে হাত গুঁজে ভাব নিয়ে বলল, "দেন চলো!"

শেখ নিবাসের সাথে লাগোয়া এই বাগানটা সত্যিই বেশ বিশাল।ভেতরে সুন্দর করে ইট-সিমেন্ট দিয়ে বসার জুতসই জায়গাও তৈরি করা আছে কয়েকটা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শহরের কোনো সাজানো পার্ক। মিতু সিফাতকে সাথে নিয়ে সেই বাগানের সরু পথ ধরে হাঁটতে লাগল। বাইরে মিতু নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করলেও, তার ভেতরের অবস্থা তখন কেরোসিন! একটা অচেনা, শহরের আধুনিক ছেলের সাথে সে একা একা হাঁটছে—ভাবতেই তার বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে, ভয়ে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।

এই অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙতে মিতু খুব নিচু স্বরে, আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল, "আপনি... আপনি ফুটবল খেলেন, তাই না?"

"হুম! কীভাবে জানলে?"

মিতু লাজুক হেসে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, "কালকে ইন্টারনেটে আপনার একটা খেলার ভিডিও দেখেছি। ওই... ওই শান ভাইয়াটাও ছিল আপনার সাথে।"

সিফাত একটু বাঁকা হেসে মিতুর একদম কাছাকাছি দাঁড়াল। তার চোখে তখন শিকারী চাউনি। সে গলার স্বর কিছুটা নিচু করে, একটু মাদকতা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, "Has anyone ever told you? You are very beautiful!"

কথাটা শোনামাত্রই মিতুর পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেল! তার বুকের ভেতর ধক করে একটা আছাড় খেল হৃদপিণ্ড। গ্রামের এক রক্ষণশীল পরিবেশে বড় হওয়া মিতু কোনোদিন কোনো ছেলের মুখ থেকে সরাসরি এমন প্রশংসা শোনেনি, তাও আবার এমন আকর্ষণীয় এক শহরের ছেলের মুখে! লজ্জায় তার কান-ঝাঁঝাঁ করতে লাগল, গালের দুপাশ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে চোখ দুটোকে কোনোমতেই সিফাতের চোখের দিকে তুলে তাকাতে পারল না। আমতা আমতা করে, বলল, "সবাই... সবাই বলে আমি দেখতে শ্যামলা হলেও সুন্দর। তবে গায়ের রঙটা আরেকটু ফর্সা হলে নাকি আরও ভালো লাগত।"

সিফাত একটা মৃদু হাসল। এই সরল মেয়েদের কীভাবে কাবু করতে হয়, তা তার খুব ভালো করেই জানা। বলল, "রঙে কী বা আসে যায় বলো? আসল সৌন্দর্য তো মনে! By the way, তুমি কিন্তু সত্যিই ভীষণ ইনোসেন্ট আর বিউটিফুল! তোমার এই শ্যামলা রূপটাই তোমাকে আর দশটা মেয়ের চেয়ে আলাদা করেছে।"

সিফাতের মুখে নিজের এত প্রশংসা শুনে মিতুর মনের ভেতর যেন হাজারটা বসন্তের ফুল একসাথে ফুটে উঠল। এক অদ্ভুত ভালো লাগার রেশ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তার মনে হলো, ঢাকা থেকে আসা এই ফুটবলার, এত ধনী আর সুদর্শন একটা ছেলে তাকে এত বড় কথা বলল! নিজের অজান্তেই সিফাতের প্রতি তার মনে একধরণের ভালো লাগা আর দুর্বলতা তৈরি হতে শুরু করল।

খানিকটা নীরবতা কাটিয়ে সিফাত চারপাশে তাকিয়ে বলল, "পরিবেশটা সুন্দর, তাই না?"া

মিতু নিজের লজ্জা ঢাকা দিতে একটু জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, "হুম, খুব সুন্দর!"

সিফাত মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হেসে বলল, "পরিবেশটা সুন্দর, কারণ এই সুন্দর পরিবেশে তুমি আমার পাশে আছ!"

মিতুর মনে হলো সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না, লজ্জায় মাটি ফুঁড়ে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে তার। এই প্রশংসা সামলানোর ক্ষমতা তার সরল মনের নেই। সে তড়িঘড়ি করে সিফাতের দৃষ্টি এড়িয়ে বলল, "চলুন... চলুন ওইদিকে যাই। ওদিকে অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটেছে।"

"ওদিকে কেন যাব ফুল দেখতে? আসল ফুল তো আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে! এত সুন্দর একটা ফুল ছেড়ে আমি কেন বাগানের অন্য ফুল দেখতে যাব, বলো?"

এবার মিতুর অবস্থা একদম লজ্জাবতী লতার মতো হয়ে গেল। লজ্জায় সে যেন আক্ষরিক অর্থেই গুটিয়ে গেল। কোনো ছেলে আজ অব্দি তার সাথে এভাবে কথা বলেনি, এভাবপ তাকায়নি।তবে কি ছেলেটা তাকে সত্যি পছন্দ করে বসল?

--

নানুবাড়িতে বেশিদিন থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই রুশদীর। কেবল মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর টানেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও এখানে আসা। এই বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন দমবন্ধ লাগে তার। নানাবাড়ির প্রতিটা ধূলিকণায়, প্রতিটি কোণায় সে তার মাকে অনুভব করে।মা'র সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িতে।মনে হয় মা বুঝি আশেপাশেই কোথাও আছেন, অথচ পরক্ষণেই মনে হয় মা তো সেই দূর আকাশের তারা! যাকে অনুভব করা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। এই শূন্যতা রুশদীর বুকটা কষ্টে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

এখানে আসার পর আজ দু'রাত আর তিন দিন কেটে গেল। আজকেই ঢাকা ফিরে যেতে চেয়েছিল রুশদী, কিন্তু ওর মামারা কিছুতেই ছাড়লেন না। নতুন ভাগ্নি-জামাই এসেছে বলে কথা, এত তাড়াতাড়ি কি যেতে দেওয়া যায়? সবার জোরাজুরিতে আজকের দিনটা রাজী হলেও, আগামীকাল তারা রওনা দেবে—সেটা রুশদী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে।

চট্টগ্রামে এসে একটুও ঘুরে না দেখলে কেমন দেখায়? সময় কম হলেও যতটুকু সম্ভব ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত হলো। ফারাজ প্রথমে শেখ নিবাসের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বের হতে চেয়েছিল। কিন্তু রুশদীই বাধা দিল। এত মানুষ একসঙ্গে ঘুরলে কিছুই ঠিকঠাক দেখা হবে না। পরেরবার সময় নিয়ে এসে সবাইকে নিয়ে ঘোরা যাবে। স্ত্রীর কথায় ফারাজও আর দ্বিমত করেনি।

শেষমেশ ফারাজ, শের, রুশদী, শান এবং সিফাত—এই পাঁচজন মিলে বের হলো। খুব বেশি দূরে না গিয়ে প্রথমে পাহাড় এবং এরপর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বিখ্যাত পাহাড়ের নাম চন্দ্রনাথ পাহাড়। সবুজ অরণ্যে ঘেরা এই পাহাড়ের সৌন্দর্য যেমন চোখ জুড়ানো, তেমনি এর চূড়ায় ওঠার পথটা অত্যন্ত দুর্গম। খাড়া পাথুরে রাস্তা আর হাজারো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার রোমাঞ্চ বহু পর্যটককে আকর্ষণ করে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়টি আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রুশদী আর সিফাতের মোটেও ইচ্ছে ছিল না এত কষ্ট করে এই পাহাড়ে চড়ার। কিন্তু বাকি তিনজনের পাহাড় দেখার প্রবল শখ।তাই শেষ পর্যন্ত আসতে হলো বটে, কিন্তু এখন পাহাড়ে উঠতে গিয়ে সবার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! প্রচলিত একটা কথা আছে 'দুনিয়াতে বেঁচে থাকতেই যদি নিজের পাপের শাস্তি পেতে চান, তবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে চলে আসুন; ওপরে উঠতে উঠতে সব পাপ ধুয়ে-মুছে আপনি নিষ্পাপ হয়ে যাবেন!'

যে পাহাড় বেয়ে উঠতে ছেলেদেরই জান বের হয়ে যায়, সেখানে রুশদী তো হাঁপিয়ে উঠেছে। আর পুচকে শেরের পক্ষে এই খাড়া পাহাড় চড়া অসম্ভব। তাই সে মহা আনন্দে তাদের পাহারা দিতে আসা দেহরক্ষীদের কোলে চড়ে বসেছে। মন্ত্রীর পরিবার বলে কথা, সঙ্গে চারজন বডিগার্ড সবসময়ই থাকে। বডিগার্ডদের কল্যাণে শেরের অন্তত কষ্ট করে পাহাড় চড়তে হচ্ছে না, কিন্তু বাকিদের অবস্থা..

হঠাৎ সিফাত দু’হাঁটুতে হাত দিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তীব্র ক্লান্তি নিয়ে সে ফারাজের দিকে তাকিয়ে বলল—

"ভাইয়া আমি আর হাঁটতে পারবো না!"

সিফাতের অবস্থা দেখে সবাই একটু থামল। অবশ্য খুব বেশি উঁচুতে ওঠার পরিকল্পনা তাদেরও ছিল না। এই বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো তাদের মতো মানুষের পক্ষে অসম্ভব।ওদের ইচ্ছা মোটামুটি এমন একটা উচ্চতায় যাওয়া, যেখান থেকে পুরো প্রকৃতিকে একনজরে দেখা যায়, পাহাড়ের আসল রূপটা মন দিয়ে অনুভব করা যায়।

কালো পোশাকধারী বডিগার্ডের কোলে আরামে বসে থাকা শের বলল,

"উফ! সিফু ডিলার, তুমি টু মাচ অলস! তুমি এতটুকু এসেই টায়ার্ড? দেখো, আমি এখনও কেমন এনার্জিটিক!"

সিফাত শেরের দিকে তাকাল, "তুই আগে বডিগার্ডের কোল থেকে নাম, তারপর তোর এনার্জি দেখব চেংটা বাঁদর!"

"সিফু ডিলার!"

এর মাঝেই শান বসে পড়ার মতো অবস্থা করে বলল, "পাহাড় দেখতে আর কত ওপরে উঠতে হবে? আমি আর এক পা-ও হাঁটতে পারছি না। মনে হচ্ছে পা দুটো এখনই শরীর থেকে খুলে পড়ে যাবে!"

রুশদীর গলাটা তৃষ্ণায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে কোনোমতে শুকনো ঢোক গিলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আগে যখন বলছিলাম এখানে আসতে হবে না, তখন তো কেউ শোনেনি! এখন বোঝো ঠেলা! আর কত ওপরে উঠবেন? আমার তো মনে হচ্ছে ওপরে উঠতে উঠতে আমরা একবারে ওপরেই চলে যাব!"

ফারাজ সবার দিকে একনজর তাকাল। সবারই তথৈবচ অবস্থা, এখনই যেন বয়লার মুরগির মত ধপাস করে পড়ে মরবে। সবাই বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। তবে ফারাজের পাহাড় বড্ড প্রিয়, তার জোরাজুরিতেই এই অভিযানে আসা। সে কিছুটা অপরাধী মুখে, আবার কিছুটা উৎসাহ দিয়ে বলল, "আর একটু,পরের পয়েন্টটা থেকেই পাহাড়ের সুন্দর একটা ভিউ পাওয়া যায়।ওখান থেকে আমার ব্যাক করব।"

আরও হাঁটতে হবে ভেবে সবাই হতাশায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে এত দূর কষ্ট করে যেহেতু এসেছে, পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ না করে ফিরে যাওয়া যায়?

হাঁটার মাঝেই শের খেয়াল করল, তার মম খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। বুকটা ধড়ফড় করছে রুশদীর। পুচকে শেরের মনটা খারাপ হয়ে গেল, মমের কি খুব কষ্ট হচ্ছে? সে চিন্তিত মুখে জিজ্ঞেস করল, "মম, তোমার কি খুব খারাপ লাগছে?"

রুশদী কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে বলল, "হুম, একটু একটু!"

মমের শরীর খারাপ লাগছে শুনে শেরের ভীষণ মায়া হলো। সে কোনো কিছু না ভেবেই অবুঝের মতো বলে বসল, "তাহলে তুমিও পাপার কোলে চড়ে চলো! আমার মতো তুমিও তাহলে ফুল এনার্জিটিক থাকবে!"

শেরের মুখে এই কথা শুনে শান আর সিফাত দুজনেই একসঙ্গে হো হো করে হেসেই উঠল। রুশদী রীতিমতো চমকে উঠে ফারাজের দিকে তাকাল। শের অবুঝ হতে পারে, কিন্তু এতগুলো বডিগার্ড আর শান-সিফাতের সামনে সে এটা কী বলে বসল! লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় রুশদীর মুখটা লাল হয়ে গেল।

ফারাজ পরিস্থিতি সামলাতে শান আর সিফাতের দিকে গরম চোখে তাকাল। যেন বুঝিয়ে দিল—'একদম হাসবি না!'

কিন্তু এতে কাজ হলো না। সিফাত ও শান আরো জোরে জোরে হাসতে হাসতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।

শের বড় বড় চোখ করে কিছুই বুঝতে পারল না। সে তো মমের ভালোর জন্যই বলেছিল, তাহলে সবাই হাসল কেন? আর মমই বা কেন লজ্জায় মুখটা অমন করে ফেলল?

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সেই কাঙ্ক্ষিত ভিউ পয়েন্টে পৌঁছানো মাত্রই এক লহমায় উধাও হয়ে গেল সবার দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি। ওপর থেকে সামনের দিকে তাকাতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি যেন আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা এক মাতাল হাওয়া এসে ছুঁয়ে গেল সবাইকে। সেই বাতাসে মিশে আছে অচেনা পাহাড়ি বুনো ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখে মনটা আকুল হয়ে ওঠে, মনে হয় আজীবন এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেও এই দৃশ্য দেখার তৃষ্ণা ফুরাবে না। মহান আল্লাহর সৃষ্টি এত নিখুঁত আর সুন্দর হতে পারে, তা ভাবতেই সবার হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল।

পুংটা শের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে একছুটে গিয়ে দাঁড়াল পাহাড়ের একেবারে ঢাল ঘেঁষে। এত চমৎকার আর চোখজুড়ানো দৃশ্য সে এর আগে কখনো দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে সে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাকিরাও একে একে গিয়ে ঢালের কাছে জড়ো হলো। সবাই নীরব হয়ে উপভোগ করতে লাগল এই হিমশীতল হাওয়া আর পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা নিস্তব্ধতা। ফারাজ আলতো করে দু'হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিল, যেন এই মাতাল হাওয়া আর মেঘের ছোঁয়াকে নিজের মাঝে ধারণ করে নিতে চায়। তার দেখাদেখি শান, সিফাত এবং রুশদীও একইভাবে হাত মেলে ধরল। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই পাঁচজন মানুষের দৃশ্যটি দেখতে সত্যি দারুণ লাগছিল।

কিছুক্ষণ পর ফারাজ, শের আর রুশদী পাহাড়ের ঢালের এক কোণে পাশাপাশি বসল। শের বসেছে ঠিক রুশদী আর ফারাজের মাঝখানটাতে। চারদিকের শান্ত পরিবেশের মাঝে ফারাজ শেরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করল, "শের, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?"

"আমি আরও বড় হবো!"

ফারাজ আর রুশদী দুজনেই না হেসে পারল না।শের মজা করতে কথাটা বলেছে ওরা বুঝলো। ফারাজ আবার বলল,

"আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার ড্রিম বা স্বপ্ন কী? যেমন আমার স্বপ্ন ছিল আমি একদিন পাইলট হব, আমি পাইলট হয়েছি। তোমার তেমন কোনো ড্রিম আছে?"

"আমার ড্রিম তো একটা ছিল, ওটা তো পূরণ হয়েই গিয়েছে!"

"তাই নাকি? কী ড্রিম ছিল তোমার?" ফারাজ বেশ কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইল।

রুশদী এবং ফারাজ দুজনেই খুব মনোযোগ দিয়ে শেরের মুখের দিকে তাকাল। শের তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে রুশদী আর ফারাজকে দেখিয়ে বলল, "আমার ড্রিম ছিল আমার একটা খুব কিউট মম থাকবে। আমার মম এখন আছে। আর অন্যদের মতো আমি আমার মম অ্যান্ড পাপাকে নিয়ে একসাথে ঘুরতে যাব। মম-পাপা দুজনে আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসবে। অ্যান্ড নাও, মাই ড্রিম কামস ট্রু!"

এইটুকুই স্বপ্ন ছিল এই পুচকের? একটি সুন্দর পরিবার আর মা-বাবার ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে বড় কোনো চাওয়া নেই তার মনে! শেরের এই নিষ্পাপ মনের স্বপ্ন শুনে রুশদী আর ফারাজ স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের দুজনের চোখ গিয়ে আটকে গেল একে অপরের দৃষ্টিতে। সেই নীরব চাউনিতে যেন অনেক কথা চালাচালি হয়ে গেল।

ফারাজ তার দৃষ্টি শেরের দিক থেকে সরিয়ে দূর পাহাড়ের সীমানায় মেলে দিল। এক বুক গভীর অনুভূতি নিয়ে সে আলতো গলায় বলল,

"জানো শের, এই দুনিয়াতে আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে পরিবার!"

"শের-এর পাপা!"

রুশদীর হঠাৎ এমন ডাকে ফারাজ তার দিকে তাকাল। দেখল রুশদী গালে হাত রেখে, ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে এক অদ্ভুত মায়াভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।ফারাজ মৃদু হেসে সায় দিল,

"হুম!"

চন্দ্রনাথ পাহাড়কে সাক্ষী রেখে, রুশদী আজ তার জীবনের সবচেয়ে সেরা এবং পবিত্র জবানবন্দীটা দিল। অত্যন্ত নরম গলায় বলল,

"মুই তোরে হোসপাং!"

ফারাজ মৃদু হেসে উঠল। সে বুঝতে পেরেছে রুশদী কী বলেছে।সাথে ছোট্ট শের দাঁড়িয়ে থাকায় সরাসরি বাংলাতে কথাটা বলতে পারছিল না রুশদী, তাই সে বেছে নিয়েছে পাহাড়ের সেই মিষ্টি চাকমা ভাষা।ফারাজও রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে চটপট উত্তর দিল,

"আমিও আমার রুমাইসা!"

শের অবাক হয়ে বলল,"মম, তুমি ওটা পাপাকে কী বললে?"

রুশদী শেরে’র গালে একটা হালকা চিমটি কেটে বলল, "ওটা চাকমা ভাষা সোনা।তুমি ছোট, বড় হও, তখন বুঝবে।"

শের ওদিকে আর না গিয়ে বরং একটা মিষ্টি আবদার করল, "মম, এটা তো তোমার জেলা, তাই না? তুমি তো এখানকার ল্যাঙ্গুয়েজ পারো!তাহলে এখানকার ল্যাঙ্গুয়েজের একটা গান শোনাও প্লিজ প্লিজ!"

রুশদী আর দ্বিমত করল না।সে ফারাজের চোখের দিকে তাকাল। যেন গানটি শুধু ফারাজকেই উদ্দেশ্য করে গাওয়া। সে চট্টগ্রামে একটি বিখ্যাত গান গেয়ে উঠল—

"কইলজার ভিতর গাঁথি

রাইখুম তোয়ারে...(২বার)

সিনার লগে গাথি রাইখুম

তোয়ারে ও ন'নাইরে..!

কইলজার ভিতর গাঁথি

রাইখুম তোয়ারে।"

রুশদী একটুখানি থামল, ফারাজের চোখে চোখ রেখে আবার শুরু করল—

"তুই হইলি আর মধুর বাঁশি

মনেরই আশা,তোরে ছাড়া

খোয়ানডে পাইয়ুম ভালোবাসা?

সুন্দর সুন্দর গান শুনাইউম

নিশিত জাগিয়া ও ন'নাইরে...

কইলজার ভিতর গাঁথি

রাইখুম তোয়ারে...!"

—০—

পাহাড় দেখতে দেখতে শান আর সিফাত কিছুটা এগিয়ে গেল।খুব বেশি দূরে নয়, আশেপাশেই হেঁটে হেঁটে চারপাশটা দেখতে লাগল তারা।এর মাঝপ শান পকেট থেকে ফোন বের করে তিথিকে ভিডিও কল দিল। তারপর ফোনের ক্যামেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখাতে দেখাতে নিজের মত কথা বলতে লাগল।

তা দেখে সিফাতের তো রীতিমতো বিরক্তিতে গা জ্বলে যাওয়ার জোগাড়!গার্লফ্রেন্ড কি শুধু শানেরই আছে, সিফাতের নেই? আলবাত আছে! শানের চেয়েও বেশি আছে। একটা না, কতগুলো আছে তার হিসাব সিফাত নিজেও জানে না। কই, সে তো কখনো গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এমন ঢং করে বেড়ায় না! একটা প্রেম নিয়ে শান যা শুরু করেছে, হুহ! অসহ্য!

বিরক্তি কাটাতে সিফাত চারদিকটায় চোখ বোলাল। হঠাৎ তার নজর গেল পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসা কয়েকজনের ওপর। তাদের পরনে কেমন যেন অদ্ভুত ধরণের পোশাক। সিফাত শানের পিঠে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,

"এই শান, ফোন রাখ। তাড়াতাড়ি এদিকে আয়!"

শান তড়িঘড়ি করে কল কেটে সিফাতের পাশে এসে দাঁড়াল। সিফাত শানের ঘাড়ে হাত রেখে সামনের দিকে ইশারা করে বলল,

"এই, এগুলা কোন গ্রহের প্রাণী রে ভাই?"

শান ভালো করে তাকিয়ে দেখল, বেশ কিছুটা দূরে কয়েকজন উপজাতি মেয়ে হেঁটে আসছে। তাদের পরনে নিজস্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী পোশাক। শান বলল,

"চাকমা বা মারমা উপজাতি বোধহয়!"

মেয়েরা যখন কাছাকাছি এলো, শান আর সিফাত তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মেয়েদের দলটিতে চারজন ছিল। তারাও লক্ষ্য করল যে এই দুই ছেলে তাদের দেখে হাসছে। ওরাও নিজেদের মধ্যে কিছু একটা ফিসফিস করে ফুসুরফাসুর করে নিল। শানরা ভেবেছিল মেয়েগুলো হয়তো তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, কিন্তু তা না করে মেয়েগুলো তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল!

দলের একটা চটপটে মেয়ে সরাসরি সিফাতের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

"তোর নাগান হি?"

মেয়েগুলো আচমকা এভাবে সামনে এসে দাঁড়ানোয় ওরা দুজন এমনিতেই একটু ভড়কে গিয়েছিল। তার ওপর মেয়ের মুখের এই অদ্ভুত ভাষা শুনে ওরা পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল! কথার আগামাথা কিছুই না বুঝতে পেরে ওরা কপাল কুঁচকে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। ওদের এমন বোকা বনে যাওয়া দেখে মেয়েগুলো বোধহয় বেশ মজা পেল। ওরাই নিজেদের মধ্যে হেসে উঠল।

সিফাত আর শান দুজনে একসঙ্গে বলে উঠল,

"হোয়াট?!"

মেয়েটি এবার একটু হেসে আবার বলল,

"মুই রিতু চাকমা। তোর নাগান হি?"

সিফাত শানের কানে কানে বলল, "ভাই মেয়েগুলো দেখতে তো একের! কিন্তু আমাদের কোনো গালিটালি দিচ্ছে নাকি রে? কিছুই তো বুঝলাম না!"

শান নিজেও মেয়েটির কথা বুঝতে পারে নি।তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারল যে মেয়েটি চাকমা এবং তাদের সঙ্গে চাকমা ভাষাতেই কথা বলছে। বাঙালি পর্যটক দেখে হয়তো এমনিই কথা বলতে এসেছে, নয়তো তারা ওভাবে তাকিয়ে ছিল বলে রেগেমেগে নিজেদের ভাষায় গালিগালাজ করছে!

শান সিফাতের কানে কানে বলল, "মনে হয় ওদের ভাষায় আমাদের গালি দিচ্ছে!"

রিতু চাকমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বান্ধবী সিমু চাকমা একটু ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে উঠল,

"গালি দিচ্ছি না। জিগাইছি আপনার নাম কী?"

সিফাত অল্প হেসে বলল,"আমি সিফাত।"

শানও হেসে বলল, "আমি শান!"

রিতু চাকমা এবার সরাসরি সিফাতের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,

"সিফাত, মুই তোর লগে হতা হবার চাং!"

চাকমা ভাষার এই বাক্যটি সিফাত কিছুটা আঁচ করতে পারল। সে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল

, "তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও? এটাই তো বলেছ, নাকি?"

রিতু এবার বেশ লাজুক মুখে মাথা নেড়ে বলল, "হুম!"

সিফাত পকেটে হাত গুঁজে ভাব নিয়ে বলল,

"বলো, নো প্রবলেম!"

কিন্তু মূল কথাটা বলতে গিয়ে রিতু ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। সে একটু ইতস্তত করে, মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বলল,

"মুই তোরে হুসপাং!"

"এই চ্যাংচুং ফ্যাং চ্যাং ল্যাং মানে কী?"

রিতুর কথা না বুঝতে পেরে সিফাত না জেনেই আবোল-তাবোল মন্তব্য করে বসল। রিতু চাকমা ভাষায় বলেছিল 'মুই তোরে হুসপাং', যার বাংলা অর্থ হলো—'আমি তোমাকে ভালোবাসি।'

সিফাতের এমন জবাব শুনে মেয়েগুলোর পুরো দল খিলখিল করে হেসে উঠল। বাংলা জানা সিমু চাকমা হেসে কেটে বলল,

"রিতু আপনাকে বলেছে ও আপনাকে ভালোবাসে!"

শান আর সিফাত দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে বাকা হাসল। সিফাত দেখতে একদম রাজপুত্রের মতো হ্যান্ডসাম, এমন হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। সিফাত তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

"গুড! বাট এমন চাইনিজ ভাষায় প্রপোজাল লাইফে ফার্স্ট টাইম পেলাম!"

বাঙালিদের এই এক সমস্যা; বাংলা আর ইংরেজি বাদে পৃথিবীর বাকি সব ভাষাকেই 'চাইনিজ' বলে চালিয়ে দেয়!

সিফাতের কথা শুনে রিতু একটু মুখ ফুলিয়ে বলল, "এটা চাইনিজ না, চাকমা ভাষা! মুই তোরে হুসপাং মানে হলো আই লাভ ইউ!"

মেয়েটি দেখতে সত্যিই বেশ মায়াবী আর সুন্দর ছিল। কিন্তু মেয়েদের প্রতি সিফাতের এখন আর আলাদা কোনো আগ্রহ নেই। ঢাকায় এর চেয়েও সুন্দরী সুন্দরী কত মেয়ে তার পেছনে ঘোরে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সে একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রিতুকে জিজ্ঞেস করল,

"তোমার বয়স কত?"

রিতু সরল মুখে উত্তর দিল, "আঠারো!"

সিফাত বাঁকা হেসে বলল, "শোনো রূপবতী, তোমার এই বছরের বয়সের থেকেও আমার গার্লফ্রেন্ডের সংখ্যা বেশি! ধরো আঠারো পেরিয়ে ১৯ নাম্বার গার্লফ্রেন্ড যদি তুমি হতে চাও, আমার নো প্রবলেম। রাজি আছো?"

প্লেবয় এর সাথে ফ্লাটিং করতে আসলে যা হয় আরকি!তারা তো আর জানে না এই সিফাত সিকদার গভীর জলের ফিস।

ভাগ্যিস ওদের সঙ্গে মিতু নামের বোকা মেয়েটা আসেনি।নতুবা, সিফাতেই এতোটুকু কথায় হয়তোবা কারো মন ভেঙে যেতে।আশা তো সেও পেয়েছে সিফাত এর কাছ থেকে।

--

তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। রাত এগারোটার দিকেই তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। বিদায়ের আগে বাড়ির ছোট-বড় সবাই মিলে সামনের ফাঁকা জায়গাটুকুতে ‘জুতা চোর’ খেলায় মেতে উঠেছে। সবাই চাইছে একসাথে কাটানো এই শেষ মুহূর্তটুকু স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে। বড় ভাই-বোনেরা মেতে আছে খেলায়, আর বাড়ির ছোটরা এবং মুরুব্বিরা দর্শক হয়ে চেয়ার পেতে গোল হয়ে বসে সেই খেলা দেখছে। রুশদীও ফারাজের সব বারণ উপেক্ষা করে খেলায় যোগ দিয়েছে। ফারাজদেরও খেলার জন্য বলা হয়েছিল, কিন্তু এই সব খেলাধুলোয় তারা একদমই অভ্যস্ত নয়।তাই ওরা আপাতত দর্শক।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রুশদীর প্রতিপক্ষ দলে খেলছে উজান নামের ওই ছেলেটা। দূর থেকে ওদের দেখে ফারাজের ভেতরটা ঈর্ষায় জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। এই ছেলে নাকি ক্যাপ্টেন শারফারাজ খানের বউকে পছন্দ করত! ভাবতেই ফারাজের পুরো শরীর কেমন যেন ঘিনঘিন করে উঠল। সে চোখে একরাশ বিরক্তি আর কড়া দৃষ্টি নিয়ে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল। কতবার বারণ করেছিল এই মেয়েকে খেলায় না নামতে! কিন্তু রুশদী কি আর তার কথা শোনার বান্দা? সে চিরকাল নিজের মর্জিতেই চলে।

এবার রুশদীর দলের চাল। জুতা ছিনিয়ে আনার জন্য রুশদী প্রতিপক্ষ দলের সীমানায় গেল। যাওয়ার কাজটা ঠিকঠাক করলেও, জুতা নিয়ে নিজের কোর্টে ফিরে আসার সময় ঘটল বিপত্তি। জোরে দৌড়াতে গিয়ে রুশদী আচমকা হোঁচট খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল। ব্যথায় পুরো শরীর মুহূর্তেই টনটন করে উঠল তার, মনে হলো পায়ের গোড়ালিটা বুঝি মারাত্মতভাবে মচকে বা ভেঙে গেছে! "ও মাগো!" বলে একটা চিৎকার দিয়ে সে কোঁকাতে লাগল। চারপাশের সবাই খেলা থামিয়ে রুশদীর দিকে ছুটে এল। অবস্থা বেশ গুরুতর দেখে কেউ একজন তড়িঘড়ি করে বরফ এনে তার পায়ে চেপে ধরল। ব্যথার চোটে রুশদীর পক্ষে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানো তো দূর, রুমে হেঁটে যাওয়াও অসম্ভব। ঠিক তখনই উজান একটু বাড়িয়ে রুশদীর হাত ধরে তাকে তোলার চেষ্টা করল। তা দেখে ফারাজ একপ্রকার জোর করেই উজানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আশেপাশের মুরুব্বিরা কে কী ভাববে—সেই লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করেই ফারাজ রুশদীকে এক ঝটকায় পাঁজাখোল করে কোলে তুলে নিল। তারপর সোজা হাঁটা দিল ঘরের দিকে।

—০—

আজ ভোরেই ওরা ঢাকা এসে পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম থেকেই রুশদীর পায়ের প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে আনা হয়েছিল।এখানে পৌঁছানোর পর ফারাজ কোনো ঝুঁকি না নিয়ে আবারও একজন ভালো ডাক্তার দেখাল, এক্সরে-স্ক্যান সবই করানো হলো। সৌভাগ্যবশত তেমন মেজর কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি, পা-টা কেবল সামান্য মচকে গেছে। তবে ব্যথার তীব্রতা সন্ধ্যা অব্দি বেশ ভালোই ছিল। এখন রাত বাড়ার সাথে সাথে ব্যথাটা একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে, যদিও পুরোপুরি ঠিক হতে আরও কয়েকটা দিন সময় লাগবে।

রাতের খাবারটা রাইমা খান নিজেই এসে রুশদীকে খাইয়ে দিয়ে গেছেন।খাবার শেষে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোও তিনি যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছেন। ফারাজ একটা জরুরি কাজে একটু বাইরে গিয়েছিল, কাজ শেষ করে সে যখন রুমে ফিরল তখন ঘড়িতে রাত এগারোটা।রুশদী তখন বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল। সিফাত ঢাকা ফিরেই নিজের বাড়িতে চলে গেছে, আর শের শান এর সঙ্গে আছে।

ফারাজ রুমে ঢুকে আলতো করে হাতের ঘড়িটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর অলস পায়ে বিছানার কাছে এসে রুশদীর মুখোমুখি বসল। কণ্ঠস্বরে একটু কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বলল, "বলেছিলাম না খেলায় নামতে না? বড়দের কথা না শুনলে এমনই শাস্তি হয়! আর কখনো খেলবে? বেয়াদব মেয়ে একটা, কোনো কথাই কানে তোলে না!"

এমনিতেই পায়ের ব্যথায় রুশদীর জান যায় যায় অবস্থা, তার ওপর ফারাজের এই অসহ্য খোঁচা মারা কথা কি আর সহ্য হয়! সে মুখটা ঝামটা দিয়ে তড়বড় করে বলে উঠল, "খেলব! একশ বার খেলব! কী করবেন আপনি, শুনি?"

ফারাজ কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, "কানের নিচে দু-তিনটা বসালে এই তড়পানি আর তর্ক করা একদম ভুলে যাবে!"

"আপনি মারবেন আমাকে? এত সাহস আপনার? দেখি, মারুন তো আমাকে!"

কথাটা বলেই রুশদী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে নিজের গালটা ফারাজের দিকে বাড়িয়ে দিল। কিন্তু ফারাজ মারার বদলে রুশদীর সেই নরম গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি একটা চুমু খেল। আচমকা এই কাণ্ডে রুশদী থতমত খেয়ে গেল। সে নিজের গালটা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে চোখ বড় বড় করে বলল,

"ই!আপনাকে আমি মারতে বললাম, আর আপনি আমাকে চুমু দিলেন কেন?"

ফারাজ একটা বাঁকা হাসি হেসে রুশদীর চোখের দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কিন্তু গভীর কণ্ঠে বলল,

"শারফারাজ খান কাপুরুষ নয় যে, সে তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবে।

রুশদী আর কোনো পাল্টা জবাব দিতে পারল না। ফারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগার নদী বয়ে গেল। সত্যি বলতে, বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে রুশদী ভেবেছিল লোকটার সাথে সংসার করা বোধহয় তার জন্য কঠিন হবে। কিন্তু পবিত্র তিন অক্ষরের ‘কবুল’ শব্দটা উচ্চারণের পর থেকেই যেন অলৌকিকভাবে সবকিছু বদলে গেল। আল্লাহ তার হৃদয়ে এই মানুষটার জন্য এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিলেন। বিয়ের পর থেকে লোকটাকে দেখলেই তার কেমন যেন এক আপন অনুভূতি হতো, বড্ড জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করত! যখন মন খারাপ হতো, তখন মনে হতো এই চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে প্রাণভরে কাঁদলে সব কষ্ট এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।

তাছাড়া, বিয়ের পর থেকে রুশদীর প্রতি ফারাজের করা প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি সূক্ষ্ম কেয়ারিং তাকে দিন দিন এই পুরুষের প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে। ভালোবাসাটার বীজ হয়তো বপন হয়েছিল কবুল বলার মাধ্যমে, তবে তা মহীরুহ হয়ে উঠেছিল ফারাজের চমৎকার ব্যক্তিত্ব আর ভালোবাসাময় কাজগুলোর মধ্য দিয়ে। আসলে, প্রথম ভালোবাসা কাকে বলে? কবুল বলার পর নিজের বৈধ মানুষটির জন্য ভালোলাগার যে তরঙ্গ হৃদয়ে বয়ে যায় সেটাই তো প্রকৃত প্রথম ভালোবাসা!

ফারাজের প্রতিটি ছোটখাটো যত্ন রুশদীর মন ছুঁয়ে যায়। ওই যে সেদিন, রুশদীর হাই হিল জুতো জোড়া পরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল দেখে ফারাজ নিজে সেই জুতো হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে শুরু করেছিল—ইশ! তখনকার সেই তীব্র আনন্দের অনুভূতিটা মুখে বলে বোঝানোর মতো নয়। এর মাঝে যখন সে জানতে পারল ফারাজ তাকে এই বিয়ের অনেক আগে থেকেই মনে মনে পছন্দ করত, উফ! সেদিন যে কী পরিমাণ সুখ পেয়েছিল রুশদী! আনন্দে যেন পুরো পৃথিবীটা তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছিল। সেদিন ফারাজ তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে যে গভীর ভালোবাসার প্রথম চুমু এঁকে দিয়েছিল, তার উষ্ণতা রুশদী আজও স্পষ্ট অনুভব করতে পারে।

রুশদী তার স্মৃতির জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে ফারাজের চোখের দিকে তাকাল। প্রশ্ন করল,

"কেউ যদি বউয়ের গায়ে হাত তোলে, তাকে বুঝি আপনার কাপুরুষ মনে হয়?"

ফারাজ রুশদীর কপালের অবাধ্য চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল,

"বউ আল্লাহর দেওয়া এক পরম নিয়ামত, সেরা একটা উপহার। তার গায়ে হাত তোলা কোনো সুপুরুষের কাজ হতে পারে না।বউকে তো ফুলের মতো পরম যত্নে আগলে রাখতে হয়, ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখতে হয়।"

ফারাজ রুশদীর মচকানো পা-টার ওপর নিজের হাতটা আলতো করে রাখল। তারপর তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আরও গভীর সুরে বলল,

"পুরুষ মানুষের শক্তি তো বাইরে দেখানোর জন্য, ঘরের ভেতরে নিজের স্ত্রীর ওপর বাহুবল খাটানোর জন্য নয়। একটা মেয়ের অহংকার হওয়া উচিত তার স্বামী। যে স্বামী তার স্ত্রীর চোখে ভয়ের জল আনে, সে আর যাই হোক, পুরুষ নামের যোগ্য নয়।"

রাত তখন গভীর।রুশদী বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছে, নামলেও পায়ের ব্যথার কারণে ঠিকঠাক হাটতে পারল না। বাম পা টা উচু করে ডান পায়ে ভর দিয়ে এগোতে লাগলো, মাঝ পথেই ধপাস!"আহ্!" চিৎকার করে উঠলো।ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠল ফারাজ।বেডসাইড টেবিলের উপরে থাকা ল্যাম্পটা জ্বালালো।রুশদীকে ফ্লোরে বসে কাঁদতে দেখে তার কাছে ছুটে গেল,

"কোথায় যাচ্ছিলে তুমি?একা একা উঠতে বলছে কে? সব বিষয়ে বেশি পাকনামি না করলে হয় না?এবার বোঝো ঠ্যালা! বেশি ব্যথা করছে? "

ব্যথাই রুশদীর জান যায় যায় অবস্থা।বাম পা টা মচকে ছিল,আবারো বাম পায়েই ব্যথাটা পেয়েছে সে।পা টা একদম অবশ হয়ে গিয়েছে ব্যথায়।সেরে যাওয়া ব্যথাটাকে আবার নতুন করে তুলল সে। রুশদী ওয়াশরুমে যাচ্ছিল, এর জন্য কি আর ফারাজকে ডেকে তোলা যায়?রুশদী কাতর কন্ঠে বলল,

"আরেহ রাখুন আপনার বকাঝোকা! ব্যাথায় আমার জান যাচ্ছে!আর উনি জ্ঞানের ঝুড়ি খুলে বসেছে।

"বেশি ব্যাথা লাগছে?"

"হম!"

রুশদীর চোখে টলমল করা পানি দেখে ফারাজের রাগটা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুশদীর মুখোমুখি মেঝেতেই বসে পড়ল।

​"হাতটা দাও আমার কাঁধে," ফারাজের গলা এবার নরম, আগের সেই ঝাঁঝালো ভাবটা আর নেই।

​"লাগবে না, আমি একাই..." রুশদী মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একাই উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করতেই বাঁ পায়ে আবার একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল।"আহ্!" সে চোখ বন্ধ করে ফারাজের শার্টের হাতা খপ করে চেপে ধরল।

​"বললাম না, সব জায়গায় বেশি পকানামি করবে না।! "

​ফারাজ আর কথা বাড়ানোর সুযোগ দিল না। এক ঝটকায় রুশদীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। আকস্মিকতায় রুশদী ভয়ে ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরল। ফারাজ ওকে সাবধানে বিছানায় এনে বসাল, তারপর দেয়ালের সুইচ চেপে ঘরের মেইন লাইটটা জ্বেলে দিল।

​হঠাৎ আলোতে রুশদী চোখ কুঁচকে ফেলল। ফারাজ নিচে বসে ঝুঁকে রুশদীর বাঁ পা-টা আলতো করে নিজের কোলের ওপর রাখল। গোড়ালির ওপরের অংশটা এরই মধ্যে বেশ ফুলে উঠেছে এবং লালচে হয়ে গেছে।ফারাজকে এমন করতে দেখে আতকে উঠল,

"আরো কি করছেন..!"

"কথা কম বলো দেখতে দাও!"

ফারাজ পায়ে হালকা টাচ করতেই রুশদীর পুরো শরীর জারা দিয়ে উঠে।চোখ মুখ কুঁচকে আর্তনাদের সুরে বলে

​"ছুঁবেন না! প্লিজ, প্রচণ্ড লাগছে,"

​"আরে ছুঁচ্ছি না, জাস্ট দেখছি,"

"কি এমন প্রয়োজন ছিলো যে, এমন ফুলো যাওয়া পা নিয়ে তোমার বিছানা ছাড়তে হলো? কোথায় যাচ্ছিলে?"

রুশদীর বলতে লজ্জা লাগলেও বললো,

"ওয়াশরুমে! "

"আমাকে ডাকতে পারলে না?"

রুশদী কেমন রাগ দেখিয়ে চোখমুখ ঘুরিয়ে বলল,

"আমি ওয়াশরুমে যাব দেন আপনাকে কেন ডাকবো?"

"আমি ওয়াশরুমে ভিতরে গিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম না,তোমাকে দেখে আসতাম। হয়ে গেলে আবার নিয়ে আসতাম কলি করে! "

রুশদী কথাটা ইমাজিন করতেই তার শরীর কেমন ঘিনঘিন করে উঠলো! ইচ!ফরাজ ওকে ওয়াশরুমে দিয়ে আসলো আবার নিয়ে আসলো।বিষয়টা কেমন লাগে।রুশদী ব্যথার ভিতরেও বলল,

"ই..চুপ থাকেন তো আপনি! যত্তসব ন্যাছরা কথা। কেমন লাগে শুনতে ইচ!"

রুশদী এমন রিয়াক্টে কিছুটা মজাই নিল ফারাজ,

"এমন করার কি আছে!এখন যদি ইমারজেন্সিতে এখানে পটি করে দাও?এর থেকে ভালো তো আমার অপশন ছিল না! "

"এই চুপ থাকেন তো আপনি! ফালতু কথা বলছেন! এমনি ব্যথায় কান্না পাচ্ছে আমার, তার উপর আপনার ফালতু কথা। চুপ থাকুন তো। "

ফারাজ পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে বলল। "তুমি কি আমার ডাক দেয়াটা উচিত ছিল রুশদী।দেখো পা টা কেমন হয়ে গেছে।এখন এই মাঝরাতে ডাক্তার কোথায় পাব?"

​

"ডাক্তার লাগবে না।"

"ত্যারামও কম কর,পায়ের অবস্থা দেখছো নীল হয়ে গিয়েছে।"

"চেকআপ তো করেছেই লাগবে না কিছু, ডক্টর যে মলম দিয়া মলম লাগিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে,"

​ফারাজ ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন রুশদীর এই সবজান্তা স্বভাবের ওপর ওর চরম বিরক্তি ধরেছে। সে ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

​"তুমি এখানে চুপচাপ বসে থাকো। একদম নড়বে না। আমি মলম আর বরফ নিয়ে আসছি।"

​ফারাজ দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। রুশদী বিছানায় হেলান দিয়ে নিজের অবশ হয়ে যাওয়া পা টার দিকে তাকিয়ে রইল।যে পায়ের মধ্যে লেগেছিল, এখন আবার সেই একই পায়ে ব্যথা পেয়েছে। একেই বলে মরার উপর দশের ঘা।ব্যথাটা তো কমতেই শুরু করেছিল, এরপর তার অতি পাকনামি করতে গিয়ে আরো ব্যথা পেয়ে বসলো।ফারাজ যখন হাতে বরফের ব্যাগ আর ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে ঘরে ঢুকল, রুশদী তখনো ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ফারাজ কোনো কথা না বাড়িয়ে আবার ওর পায়ের কাছে মেঝেতে বসল।

​"পা-টা সোজা করো।"

​"না, প্লিজ! বরফ দিলে আরও জমাত বেঁধে যাবে, তখন আরও বেশি ব্যথা করবে," রুশদী আবার নিজের ভাঙা রেকর্ড বাজানো শুরু করল।

ফারাজ একটা কড়া চাউনি দিল। "চুপচাপ পা সোজা করো তো! ডাক্তারদের মতো জ্ঞান দেওয়া বন্ধ করো। বরফ দিলে ফোলাটা কমবে।"

​

রুশদী আর সাহস পেল না। ফারাজ অত্যন্ত সাবধানে ওর ফুলে যাওয়া গোড়ালিতে বরফের ব্যাগটা ছোঁয়াতেই রুশদী শিউরে উঠে ফারাজের হাতটা চেপে ধরল। বরফের তীব্র ঠাণ্ডা অনুভূতিটা প্রথম দিকে একটু কষ্টদায়ক হলেও, আস্তে আস্তে জায়গাটা যেন কিছুটা অবশ হয়ে এল এবং ব্যথার তীব্রতা একটু কমল। মিনিট দশেক এভাবে বরফ সেঁক দেওয়ার পর ফারাজ বরফের ব্যাগটা সরিয়ে রাখল।রুশদী তাকিয়ে দেখল এই ম্যানারলেস লোকটার যত্ন! সত্যি অনেক ম্যানারলেস ইনি।

​এবার সে ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা ব্যথানাশক মলম বের করল। মলমের টিউবটা খুলে খানিকটা মলম নিজের আঙুলে নিল। ফারাজ আলতো হাতে রুশদীর পায়ে মলমটা লাগাতে শুরু করল।

​ফারাজের হাতের আঙুলগুলো যখন খুব সাবধানে, ওর ব্যথার জায়গায় মলমটা মালিশ করে দিচ্ছিল, রুশদীর সারা শরীরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি খেলে গেল। ফারাজের ছোঁয়াটা এতই কোমল ছিল যে রুশদী ঠিকঠাক অনুভব করতে পারছিল না।রুশদী একদৃষ্টিতে ফারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ল্যাম্পের মৃদু আলোয় ফারাজের চোখে-মুখে, ফারাজ এর সেই শান্ত সমুদ্রের মতো আকাশি রং এর সূর্য বলে ল্যাম্পের সোনালী আলো করে জ্বলজ্বল করছে।ফারাজ এর রুশদীর সব থেকে পছন্দ ফারাজ এর চোখ জোড়া।ফারাজ ওর দিকে তাকালে সেখানে একটা শান্ত সমুদ্র দেখতে পায় রুশদী।তবে এখন সেখানে শুধু রুশদীর জন্য তীব্র উদ্বেগ আর যত্ন স্পষ্ট।

​"কেমন লাগছে এখন?ফারাজ মুখ না তুলেই নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।

​রুশদী একটু আমতা-আমতা করে বলল, "না... এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো লাগছে। অবশ ভাবটা কমছে।"

​ফারাজ মলম লাগানো শেষ করে একটা ক্রেপ ব্যান্ডেজ দিয়ে পা-টা পেঁচিয়ে দিল, যাতে নড়াচড়া না হয়।প্রথমবার ব্যথার পর পর ব্যথাটা প্রায় সেড়ে গিয়েছিল তাই আর ব্যান্ডেজ করা হয়নি ওর পা। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে রুশদীর কপালে হাত দিয়ে দেখল ব্যথার চোটে গা গরম হয়েছে কি না। ফারাজের যত্নে রুশদীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠল।বুকটা দূরু দূরু করপ উঠল!"

ফারাজ বলল,

"ওয়াশরুমে যাবে? নিয়ে যাব?! "

এ প্রশ্নের মুডটাই কেমন যেন হয়ে গেল রুশদীর। সে কিছুটা বিরক্ত কর।বিরক্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে তাদের দাঁত পিছে বলল,

"নাহ!"

রুশদীকে চ্যাতাতে ফরজ দুষ্টু হেসে বলল,

"কেন এখানেই সেরে ফেলেছ নাকি? গন্ধ তো পাচ্ছি না!"

রুশদী কটমট দৃষ্টিতে তাকালো ফারাজের দিকে এসব ফালতু জোকস শোনে। ফারাজ হেসেই উড়িয়ে দিল তা।সে বিছানায় উঠে বসে।

"আমি তোমার জন্য আগামীকাল আমার ট্রিপ মিস দিচ্ছি। আর তুমি আমার দিকে এভাবেই তাকাচ্ছ? ইটস নট ফেয়ার রুশদী।এভাবে চলতে থাকলে কবে যেন আমার লাইসেন্স একবারে বাতিল করে দিবে।"

"আমি আপনাকে বলেছি আমার জন্য আপনার ট্রিপ মিস দিতে?জান আপনি? আমাকে কেন শুনাচ্ছেন?"

"তোমার মনে হয় আমি তোমাকে এই অবস্থায় রেখে ট্রিপে যেতে পারব!গেলেও বিমান চালাতে চালাতে যখন তোমার কথা মাথায় আসবে বিমান ভর্তি প্যাসেঞ্জার নিয়ে আমি সোজা ল্যান্ড করব বারমুডাটাইঙ্গেলে।আর তোমাকে যদি এ অবস্থায় রেখে যাই, এক ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে আবার গায়ে ব্যথা তে বসেছ।আমি না থাকলে আবার হাত পা আস্ত রাখবে নাকি কে জানে। বউয়ের জন্য এত কিছু করি তবুও বউয়ের মন পাই না!অসভ্য বউটা শুধু মুখে মুখে তর্ক করে।তর্ক ছাড়া আর কিছু শেখোনি?"

"নাহ্! জন্মের পর থেকে এইটাই খুব মনোযোগ দিয়ে শিখেছি!আপনার দরকার আপনি ট্রিপে যান! এসব কথা শুনতে পারবো না আমি!"

"আমার ইচ্ছা আমার বউকে রেখে আমি ট্রিপে যাব না, তোমার কি তাতে তুমি কে? হু আর ইউ! "

"আমি সারফরাজ খানের বউ! "

"শারফারজান খান তো আমি! "

"তাহলে আপনারই বউ! "

এবার দু'জন এক সঙ্গে ফিক করে হেসে উঠলো।

"আমি ওয়াশরুমে যেতে বা যেকোনো দরকার হলে আমাকে ডাকবে, একদম একা ওঠার চেষ্টা করবে না," ফারাজ রুশদীর গায়ের ওপর কাঁথাটা টেনে দিতে দিতে বলল।

​রুশদী শুধু আলতো করে মাথা নাড়ল। ফারাজের এই দায়িত্বশীলতা আর কেয়ারিং রূপটা রুশদীর মনকে এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরিয়ে দিল। সে মনে মনে চাইল, রাতটা যেন এভাবেই কেটে যায়।

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন