"একজন বিবাহিত মেয়েকে এভাবে রাস্তাঘাটে বখাটেদের মতো বিরক্ত করতে আপনার লজ্জা লাগে না? আপনি কি জানেন আমার তিন বছরের একটা মেয়ে আছে?"
নেকাবের আড়ালে গোপন থেকে তপ্ত বিরক্তি ঝেড়ে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল মেহনাজ। তার দু'চোখে তখন অগ্নিশিখা। অথচ রুশম নির্বিকার। তার চোখেমুখে কোনো অনুশোচনার ছাপ নেই; বরং অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে নিজের রংচটা জিন্স প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল সে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, জানি তো। আপনার মেয়ের নাম উমাইজা আমাল। বয়স এখন তিন চলছে, তাই না? তাতে কী হয়েছে?"
দুপুরের তপ্ত রোদে ল্যাবরেটরি গলিটা তখন আগুনের চুল্লির মতো তেতে আছে। বাতাসের সাথে উড়ছে তপ্ত ধুলিকণা। স্কুল ছুটির পর এই ক্লান্তিকর সময়ে শিক্ষিকারা যখন বাড়ি ফেরেন, মাথার ওপর সূর্য তখন যেন সবটুকু তেজ ঢেলে দেয়। দ্রুত বাড়ি পৌঁছানো যায় বলেই মেহনাজ এই শর্টকাট গলিটা বেছে নেয়।ল্যাবরেটরীর গলি ।রোজকার মতো আজও ল্যাবরেটরী গলির সেই পুরনো হলুদ রঙের দোতলা 'স্মরণিকা' বাড়িটার ছাদ থেকে নেমে আসা বাগান বিলাস ফুলগাছের পাশে দেওয়াল ঘেঁষে যুবকটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহনাজ।ছেলেটার নাম -রুশম। পরনে রঙ চটা একটা জিন্সের প্যান্ট ও নীল শার্ট।বাতাসে শার্ট টা দুলছে।ছেলেটি গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা, গালে হালকা খোঁচা দাড়ি,মাথায় একঝাঁক ঝাঁকড়া চুল।দেহের গড়ন মোটামোটি চিকন চাকন। ছেলেটাকে বেশ মুখস্ত হয়ে গেছে মেহনাজ এর,ছেলেটার বয়স ২৬ এর কাছাকাছি হবে হয়তো।দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে,মাথার চুল ঠিক করতে করতে বিড়ি ফুকছে সে।তাকে দেখেতেই ভেতরটা চিড়বিড়িয়ে উঠল মেহনাজ।মেহনাজ কাছাকাছি চলে এলে রুশম পিচ ঢালা রাস্তায় উঠে আসে।মেহনাজ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রুশম ধীরলয়ে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল।তখনই বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটি বলেছিল মেহনাজ, আর রুশম প্রতুত্ত্যর করে।
রুশমের এমন বেপরোয়া উত্তরে মুহূর্তেই যেন পায়ের তলার মাটি হারিয়ে ফেলল মেহনাজ। লোকটা এত সহজে, এত স্বচ্ছন্দে এমন একটা কথা বলে ফেলল!মেহনাজ বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল।ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতেই মেহনাজ কন্ঠস্বর চড়িয়ে বলল, "আশ্চর্য তো! আমি যে বিবাহিত জানার পরেও আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন? "
রোদে আর রাগে মেহনাজের নেকাবের ভেতরের ফর্সা মুখটা তখন লাল জবার মতো রক্তিম হয়ে উঠেছে। রুশম মুগ্ধ হয়ে মেহনাজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ক্রুদ্ধ ভ্রুকুটির আড়ালে চোখ দু'টো যেন আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছে। কালো নেকাবের ওপাশে মেহনাজের মুখটা রাগে ঠিক কেমন দেখাচ্ছে, তা কল্পনা করতেই রুশমের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে এবার বেশ আয়েশ করে দু-পা এগিয়ে আসলো। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে বলল,
"ওয়েট মিস! আপনি বিবাহিত ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে আপনি ডিভোর্সি। সো, টেকনিক্যালি আপনি এখন একদম সিঙ্গেল।"
রুশমের প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ মেহনাজের কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। লোকটার বেহায়াপনা দেখে সে বিস্ময়ে স্তব্ধ না হয়ে পারে না। মাথার ওপর মধ্যাহ্নের সূর্য তখন আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে; সেই তাপে আর রুশম এর বিরক্তির তীব্রতায় মেহনাজের শরীর কাঁপতে শুরু করল। কালো বোরকার ভেতরে সে ঘামে জবজবে হয়ে গেছে।
এমনিতেই ডিভোর্সি তকমা গায়ে লাগায় এ সমাজ তাকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। পাড়ার ভাবিদের বিষাক্ত কটু কথার তো শেষ নেই। তার চরিত্রে দাগ কাটার জন্য সমাজের এক চিলতে অজুহাতই যথেষ্ট। তার ওপর এই বখাটে যুবক যদি রোজ এভাবে তাকে মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখে, তবে মানুষের মুখ কি আর বন্ধ থাকবে? মেহনাজ খেয়াল করল, আশপাশের বাড়ির বারান্দাগুলোতে কৌতুহলী চোখের আনাগোনা শুরু হয়েছে।কোনো এক ভাবি হয়তো পর্দা সরিয়ে তাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একসঙ্গে কথা বলাটা গিলছে। দূরত্ব থাকায় কথা না শুনতে পেলেও, নিজের মতো ভেবে নিচ্ছে কিছু একটা।না জানি কাল সকালেই এই নিয়ে রসালো কতো ঘটনা পাড়াময় রটে যায়!
মেহনাজ এবার নিজের সমস্ত তেজ গলায় ঢেলে ধমকের সুরে বলল, "নিজের সীমা ছাড়াবেন না।আমি কিন্তু আপনার নামে কমিশনারের কাছে কমপ্লেন করব। "
রুশম এবারও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং গা ছাড়া এক অবহেলার ভঙ্গিতে স্মিত হেসে বলল, "করতেই পারেন, আমার কোনো বাধা নেই।আমার পুরো নাম ইমতিয়াজ রুশম, বংশ পদবী সহ ইমতিয়াজ রুশম মারওয়াত। বাবার নাম রাকিব মারওয়াত। কমিশনার কে আগে আমার বাবার নাম বলবেন তাহলে চিনতে সুবিধা হবে। "
রুশমের উত্তরে হতভম্ব হয়ে গেল মেহনাজ।পাশাপাশি,
মেহনাজের ভেতরটা তখন হাহাকার করে উঠল। বাড়িতে উমাইজা অসুস্থ, তাকে একা ফেলে পেটের দায়ে আজ স্কুলে যেতে হয়েছে। মেয়ের চিন্তায় এমনিতেই মাথার প্রতিটি রগ দপদপ করে ছিঁড়ে যাচ্ছে, তার ওপর এই লোকটার অর্থহীন প্রলাপ যেন বিষের মতো লাগছে। অগত্যা রুশমের সঙ্গে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করাটা বোকামি মনে করে মেহনাজ ওকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে এগোতে চাইল।
কিন্তু না, রুশম আবারও তার পথ আগলে দাঁড়াল। মেহনাজ এবার বাঘিনীর মতো ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল—সেই চাউনিতে যেন লোকটাকে ভস্ম করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। মেহনাজের সেই আগ্নেয়গিরি সদৃশ রাগের তোয়াক্কা না করেই রুশম খুব ধীরস্থিরভাবে তার জিন্সের পকেট থেকে একখানা ডেইরি মিল্ক চকলেট বের করল। তারপর অবলীলায় মেহনাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
"এটা উমাইজার জন্য। ওকে দিয়ে দেবেন।"
মেহনাজ চকলেটের দিকে একপলক তাকিয়ে তপ্ত দৃষ্টি ফেরালো রুশমের চোখের ওপর। তার কণ্ঠস্বরে এখন আর শুধু রাগ নয়, বরং এক বুক ক্লান্তি মিশে আছে। সে ধরা গলায় বলল,
"আমাকে নিয়ে অন্তত খেলবেন না, আমি সস্তা কোনো খেলার পাত্র নই। দয়া করে আমাকে আর আমার মেয়েকে আমাদের মতো থাকতে দিন। এই সমাজ আমাদের এমনিতেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, অন্তত একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে দিন।"
রুশম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল, "আমিও তো সেটাই চাচ্ছি। আপনারা যেন ভালো থাকেন, সেটুকুই আমার চাওয়া।"
মেহনাজ আর যা-ই হোক, বোকা নয়। রুশমের এই রহস্যময় আচরণের অন্তর্নিহিত অর্থ সে বুঝতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। সে তিক্ত হেসে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল, "আপনার কি মনে হয় এই তথাকথিত সমাজ এটা মেনে নেবে? এক সন্তানের জননী, একজন ডিভোর্সি নারীর সাথে আপনার মতো একজন অবিবাহিত যুবক?.....হেহ! এই সমাজ কোনোদিনও সহজভাবে নেবে না।"
রুশমের উত্তর এল তড়িৎ এবং নির্ভীক, "যে সমাজ আমাদের মানবে না, সে সমাজে আমিও মানি না। "
"আবেগ দিয়ে জীবন চলে না মিস্টার রুশম। আপনার এসব থার্ড ক্লাস মার্কা কথাবার্তা নিজের কাছেই রাখুন।"
"আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন...!
মেহনাজ এবার খানিকটা তাচ্ছিল্যভরে বলল, "আপনাদের মতো বখাটে ছেলেদের আমি খুব ভালো করেই চিনি। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে আর অতিষ্ঠ করবেন না, একটু শান্তি দিন।"
"আমি কোনো বখাটে নই, মেহনাজ।" রুশমের কণ্ঠে এবার এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
"তাহলে ভরদুপুরে রাস্তাঘাটে একা একটা মেয়েকে এভাবে পথ আটকে বিরক্ত করাকে আপনি কী বলেন?"
"আমি আপনাকে বিরক্ত করতে চাইছি না... কিন্তু!"
রুশমের কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহনাজ বলে উঠল, "কিন্তু আপনি সেটাই করছেন। দেখুন রুশম, আমার বয়স তেইশ, আমি কোনো অবুঝ শিশু নই। আপনি কেন এসব করছেন, তা আমার অজানা নয়। কিন্তু এসব সম্ভব না। সমাজ ডিভোর্সিদের ভালো চোখে দেখে না। খোদ পরিবারই যেখানে আমাকে আগলে রাখেনি, সেখানে সমাজ তো অনেক দূরের কথা। আমাকে আর আমার মেয়েকে প্রতিদিন হাজারো প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে হয়। অনেক আগেই হয়তো আমি শেষ হয়ে যেতাম, শুধু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্টে বেঁচে আছি। দয়া করে আমার জীবনটা আর বিষিয়ে তুলবেন না।"
রুশম এবার অনেকটা সময় মেহনাজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর স্বরে বলল, "আমি জানি আপনি একজন যোদ্ধা। কিন্তু লড়াই করতে করতে যখন হাঁপিয়ে উঠবেন, তখন কি একটা শক্ত হাতের প্রয়োজন হবে না? আপনার মেয়ের কি একজন বাবার ছায়া দরকার হবে না?"
মেহনাজ এবার যেন পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে জবাব দিল, "না। আমার জন্য আমার আল্লাহ্-ই যথেষ্ট। আমার আর কাউকেই চাই না।"
রুশম শান্ত চোখে মেহনাজের চোখের মণির দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। গত তিন মাস ধরে নেকাবের আড়ালে থাকা এই চোখ দুটোই তার ধ্যান-জ্ঞান। পুরো চেহারা দেখার সৌভাগ্য আজও তার হয়নি, কিন্তু এই দুটো চোখ তার বড় পরিচিত। দূর থেকে দেখেই সে বলে দিতে পারে, ওটাই মেহনাজ। এই চোখ দুটোই তাকে ঘায়েল করার প্রথম অস্ত্র। চোখের কোণের সূক্ষ্ম গড়ন আর ঘন কালো পাপড়ির ছায়ায় ঘেরা হালকা বাদামী মণি। এই মায়ার মোহ কাটিয়ে আজও উঠতে পারেনি রুশম।রুশম একদম শান্ত চোখে মেহনাজের চোখের দিকে তাকাল। গত তিনটি মাস ধরে নেকাবের আড়ালে এই দুজোড়া চোখই সে দেখে আসছে। মেহনাজের পুরো চেহারা দেখার সৌভাগ্য আজও তার হয়নি, কিন্তু এই চোখ দুটোই তার কাছে অতি পরিচিত। দূর থেকে দেখেই সে বলে দিতে পারে—এ সেই নারী, যাকে সে মনে মনে খুঁজেছে। এই চোখ দুটোই তাকে ঘায়েল করার প্রথম অস্ত্র।
রুশম মেহনাজের কান্না করে শুকিয়ে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনের গহীন অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল। সেই চোখের পাতায় লেগে থাকা প্রতিটি শুকনো অশ্রুবিন্দুতে সে মেহনাজের সকল দুঃখ-কষ্ট আর হাহাকার নিজের চোখে উপলব্ধি করল।সে সরাসরি এক অদ্ভুত আর্দ্র গলায় প্রস্তাব দিয়ে বসল,
"উমাইজার আম্মি, আপনি কি..."
মেহনাজ এবার যেন বাস্তবতার ভারে হেরে গেল। সে অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে আর্তি জানিয়ে বলল, "আল্লাহর ওয়াস্তে আমার পথটা একটু ছাড়ুন। আমার মেয়েটা খুব অসুস্থ, বাড়িতে একদম একা পড়ে আছে সে।"
মেহনাজের কণ্ঠে উমাইজার অসুস্থতার খবর শুনে রুশমের চোখেমুখেও উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল। সে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন? কী হয়েছে ওর?"
"কিছু হয়নি, আপনি পথ ছাড়ুন।" মেহনাজ আর কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না।
রুশম এবার আর তাকে আটকাল না, নিঃশব্দে একপাশে সরে দাঁড়াল। মেহনাজ দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। রুশম অপলক চেয়ে রইল সেই দৃশ্যটির দিকে। কালো বোরকা পরিহিত, কাঁধে সাইড ব্যাগ ঝুলানো একজন নারী হনহন করে চলে যাচ্ছে। মাথার ওপর প্রখর সূর্যটা তাকে পোড়াচ্ছে, আর অল্প বাতাসে তার ঢোলাঢালা বোরকাটা অবাধ্য হয়ে দুলছে। এই সমাজ এই নারীকে যে নামেই ডাকুক না কেন, রুশম প্রতিজ্ঞা করল—একে সে নিজের ঘরে তুলবেই। এই সমাজ রুশম কোনকালেই মানতো না, এ সম্পর্কে তো আরো না।
হাঁটতে হাঁটতে মেহনাজের মনে হচ্ছিল—একটা মানুষ কতটা পাগল হলে এমন রোদে পুড়ে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? নির্লজ্জের মতো একটা অসহায় নারীকে বিরক্ত করতে পারে? রুশম কি আগে থেকেই এমন ছিল? -নাম রুশম আগে থেকে এমন ছিল না। রুশম বদলে গেছে।
মেহনাজ আড়ালে যেতেই রুশম পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল। একটা স্টিক দুই ঠোঁটের ভাঁজে রেখে লাইটার জ্বালাল। দুই আঙুলের মাঝে সিগারেট চেপে ধরে দীর্ঘ এক টান দিল রুশম। ধোঁয়া গিলতে গিলতে সে সেই পুরনো হলুদ রঙের বাড়িটার দেয়ালের সাথে গিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ওপরের সানশেডের কারণে সেখানে এক চিলতে ছায়া পড়েছে। রুশম মাথাটা দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে সমস্ত ধোঁয়া ছাড়ল। পরপর কয়েকটা টান দিয়ে সিগারেটটা শেষ করল সে। বিরতি না দিয়েই আবার আরেকটা সিগারেট ধরাল। দ্বিতীয় সিগারেটের প্রথম ধোঁয়াটা যখন আকাশের নীলিমায় মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে প্রায় দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া মেহনাজ এর দিকে তাকিয়ে আনমনে গুনগুন করে গান ধরল—
"চুমকি চলেছে একা পথে,
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে?রাগ করো
না সুন্দরী গো, রাগলে তোমায় লাগে
আরো ভালো..."
একটু দম নিয়ে রুশম গানের কলি পাল্টে আবার ধরল
"হার মেনেছে দিনের আলো,
রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো!"
--
সামাজিক প্রতিকূলতার উত্তাল সমুদ্রে একাকী হাল ধরে থাকা এক লড়াকু নাবিকের নাম—মেহনাজ মুর্তজা। মেহনাজ শুধু একজন নারী নয়, সে এক আত্মমর্যাদাশীল যোদ্ধা। সমাজ বিচ্ছিন্ন এই মানুষটির বেঁচে থাকার একমাত্র জ্বালানি, একমাত্র অনুপ্রেরণা হলো তার কলিজার টুকরো মেয়ে উমাইজা আমাল। এই ছোট্ট প্রাণটি না থাকলে মেহনাজ হয়তো কবেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করত। তার দিকে ধেয়ে আসা সমাজের প্রতিটি বিষাক্ত বাণ, প্রতিটি অপমান সে মুখ বুজে সয়ে নেয় শুধু উমাইজার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে। প্রতিটা দিন তাকে লড়তে হয় মানুষের কুটিল চাহনি আর বাঁকা কথার সাথে। 'ডিভোর্সি'—এই একটি শব্দ তার কপালে যেন এক চিরস্থায়ী কলঙ্কের তিলক এঁকে দিয়েছে, যা হাজার চেষ্টাতেও মোছা যাচ্ছে না। পাড়ার মোড়ে বের হলেই পরিচিত মুখগুলো অদ্ভুত সব কটু কথা ছুঁড়ে দেয়, চোখে ফুটে ওঠে লালসা কিংবা ঘৃণা। এমনকি নিজের রক্তমাংসের পরিবারও তাকে পর করে দিয়েছে; যার একমাত্র কারণ—সে তার ভাঙা সংসার জোড়া লাগাতে পারেনি।
মেহনাজ বর্তমানে এলাকার স্বনামধন্য ল্যাবরেটরী স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। বেতন যা পায়, তা যৎসামান্য। সেই অল্প আয়েই চলে মা-মেয়ের টানাটানির সংসার। কিন্তু এর চেয়েও বড় যন্ত্রণার কথা কী জানেন? মেহনাজকে নিজের ভাইয়ের বাড়িতেই ভাড়া থাকতে হয়। এই দোতলা বাড়িটা আসলে তার বাবারই করে যাওয়া। বাড়ির ওপরের চিলেকোঠার ঘরটা আগে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত, এখন সেখানেই প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা গুনে দিয়ে মেহনাজকে থাকতে হয়। তার বড় ভাই আর ভাবি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিনে পয়সায় থাকতে দিতে রাজি নন।
শুরুতে এই বিষয়টা মেহনাজের আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত করেছিল। সে ভেবেছিল, টাকা দিয়েই যদি থাকতে হয়, তবে ভাইয়ের বাড়ি কেন? কিন্তু পরক্ষণেই এক কঠিন বাস্তব তাকে জাপটে ধরে—নিরাপত্তা। অন্তত এই ছাদের নিচে থাকলে সে এবং তার মেয়ে কিছুটা নিরাপদে থাকবে। অন্তত উমাইজাকে ঘরে রেখে নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারবে।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে পায়ে হাঁটা পথে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্ব। দ্রুত পায়ে হেঁটে মেহনাজ তার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। নিচতলায় মেহনাজের ভাই বাহারাজ এর ছোট একটি মুদি দোকান। দূর থেকে সে দেখল, বাহারাজ দোকানে বসে ঝিমুচ্ছে। মেহনাজ আর ওদিকে নজর দিল না। দোকানের পাশ দিয়ে উঠে যাওয়া লোহার জং ধরা সিঁড়ি বেয়ে সে সোজাসুজি ছাদে চলে গেল। বাড়ির ভেতর দিয়েও ছাদে যাওয়ার পথ আছে, কিন্তু সে পথে আর পা বাড়াল না। হাজারো ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিজের ছোট্ট সেই চিলেকোঠার আশ্রয়ে ফিরে চলল সে।চিলেকোঠার জীর্ণ কক্ষের এক কোণে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে আছে ছোট্ট উমাইজা। নিস্তেজ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মেহনাজের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মাসের শেষ, পকেটে বাড়তি একটা পয়সাও নেই যে বড় কোনো ডাক্তার দেখাবে। মেয়েটা কতদিন ধরে জ্বরে ধুঁকছে! মেহনাজ কাঁধের ব্যাগটা একপাশে চালের ড্রামের ওপর রাখল। নেকাব সরিয়ে তড়িঘড়ি করে মেয়ের শিয়রে গিয়ে বসল সে। উমাইজার তপ্ত কপালে একটি কোমল চুমু খেয়ে চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, "তোমার নানু কোথায় সোনা?"
উমাইজা আধো-বোজা চোখে অস্ফুট স্বরে জবাব দিল, "নানুবাই তো আচেনি।"
মেহনাজের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মেয়ের গায়ে হাত দিতেই সে শিউরে উঠল; জ্বরে গা যেন পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। সে হন্তদন্ত হয়ে আবার প্রশ্ন করল, "কেন? তোমার নানু কি তোমাকে ওষুধ খাইয়ে দেয়নি?"
উমাইজা নিঃশব্দে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। মেহনাজের ভেতরটা রাগে আর অভিমানে হু-হু করে উঠল। সে ধরা গলায় বলল, "ইস! গা তো একদম পুড়ছে। তোমার মামিকেও তো বলে গিয়েছিলাম সকালে তোমাকে একটু দেখে রাখতে। মামি কি কোনো খাবার দিয়েছিল? ভাত খেয়েছিলে?"
উমাইজা এবারও 'না' সূচক মাথা নাড়ল। মুহূর্তেই মেহনাজের মাথার প্রতিটি রগ রাগে দপদপ করে উঠল। চারটা ঘণ্টা তার অবুঝ মেয়েটা এই প্রচণ্ড জ্বরে একা একা পড়ে আছে! সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। গায়ের বোরকাটা কোনোমতে খুলে ওড়নাটা জড়িয়ে হনহন করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ চিৎকারে ফেটে পড়ল,
"আম্মা! আম্মা! ভাবি!"
মেহনাজের মা আসার আগেই কামরা থেকে বেরিয়ে এলেন ভাবি চম্পা। গা এলিয়ে একটা দীর্ঘ হাই তুলে অত্যন্ত বিরক্ত স্বরে বললেন, "কী হইছে মেহনাজ? এমন চিল্লাও ক্যা?"
"ভাবি, আপনাকে আর আম্মাকে কি আমি হাত-পা ধরে বলে যাইনি উমাইজাকে একটু দেখে রাখতে? বলেছিলাম না সকালে ওকে একটু ভাত খাইয়ে ওষুধটা দিয়ে দিতে? বলেছিলাম আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব। কেন ওকে না খাইয়ে এভাবে ফেলে রাখলেন? বাচ্চাটার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!"
চম্পা কোনো উত্তর না দিয়ে বিশ্রিভাবে একবার মুখ ভেংচালেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পান চিবোতে চিবোতে উদাসীন ভঙ্গিতে কামরা থেকে বেরিয়ে এলেন মনোয়ারা বেগম। পানের রস গিলতে গিলতে কর্কশ স্বরে বললেন, "আবার কী হইছে? চিল্লাইতেছস ক্যান?"
মেহনাজ এবার কান্নামেশানো তেজি গলায় মাকে লক্ষ্য করে বলল, "আম্মা, আমি যাওয়ার সময় তোমাদের বলে গিয়েছিলাম মেয়েটা অসুস্থ। তোমার কথা না হয় বাদই দিলাম, ভাবি কি পারত না ওকে একটু ভাত আর ওষুধটা দিয়ে দিতে? চারটা ঘণ্টা আমার বাচ্চাটা ওই চিলেকোঠায় একা একা যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। তোমরা এমন পাষাণ কেন বলতে পারো?"
মেহনাজের আর্তি চম্পা ভাবির কানে যেন বিষ ঢেলে দিল।চম্পার আগে মনোয়ারা বেগম কোমরে হাত দিয়ে ঝংকার দিয়ে উঠলেন,
"শোন মেহনাজ, ওরে দেখি নাই, খাওয়াই নাই—বেশ করছি! তোর মাইয়ারে দেখার চাকরি নিছি আমরা? তোর মাইয়া দেখাশোনা করতে যাইব কিসের দায় ঠেকছে? তোর মাইয়া তুই দেখবি। আমাগো কি তোর মাইয়ার লাইগা বান্দি রাইখা গেছস? মাসে কয় টাকা দিস শুনি?"
নিজের গর্ভধারিণী মা আর মুখে এমন অমানুষিক কথা শুনে মেহনাজ যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। শাশুড়ির এমন তীক্ষ্ণ প্রতিবাদে চম্পা ভাবির মুখে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। মধ্যবিত্ত ঘুণে ধরা সমাজের এই এক বীভৎস রূপ।যেখানে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও সামাজিক কলঙ্ক বড় হয়ে দাঁড়ায়। মেহনাজ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল তার গর্ভধারিণী মায়ের দিকে। মনোয়ারা বেগমের চোখে আজ কোনো মমতা নেই, আছে শুধু একরাশ ঘৃণা আর অবজ্ঞা। তিনি পানের রসে রাঙানো ঠোঁট দুটো কুঁচকে মেহনাজের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন সে কোনো অচেনা অপরাধী।
মেহনাজ ধরা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, "আম্মা, তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? আমি কি তোমার নিজের পেটের মেয়ে নই? আর উমাইজা... ও কি তোমার নাতনি নয়? সামান্য একটু খাবার মুখে তুলে দেওয়ার জন্য আমাকে বুঝি আলাদা করে বাঁন্দি রাখতে হবে?"
মনোয়ারা বেগম পানের পিক ফেলে ঝংকার দিয়ে উঠলেন, "না, তুই আমার কিচ্ছু লাগস না! যে মেয়েরে জামাই চালায় না, তেমন আপদ আমার ঘরে জায়গা নাই। আর তোর ওই অলক্ষ্মী সন্তানও আমার কেউ না। কোন ভালো ঘরের মেয়ের বিয়ের দুই বছরের মাথায় ডিভোর্স হয় শুনি? সত্যি করে ক তো—কী এমন আকাম করে ধরা খাইছিলি যে জামাই তোরে লাথি দিয়া বিদায় করছে?"
মায়ের মুখে নিজের চরিত্র নিয়ে এমন কদর্য অপবাদ শুনে মেহনাজের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে শিউরে উঠে বলল, "আম্মা! তুমি নিজের মেয়ের নামে এমন কথা বলতে পারলে?"
"পারলাম তো, এখন কী করবি? সাহস থাকলে বাড়ি ছাইড়া যা। তোর লাইগা পাড়া-প্রতিবেশীর কত কথা যে শুনতে হয়, তার হিসাব আছে? কুলাঙ্গার মা* একখান!" মনোয়ারা বেগমের প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সিসার মতো মেহনাজের কানে বিঁধছিল।
মেহনাজ এবার নিজের আত্মসম্মানটুকু কুড়িয়ে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "কেন যাব আমি? আমি কি এখানে বিনে পয়সায় থাকি? ভাড়া গুনে দিয়ে থাকি। আর এই বাড়িতে কি আমার কোনো হিস্যা নেই? আব্বার রক্ত জল করা বাড়িতে আমারও তো ভাগ আছে।"
'হিস্যা'র কথা শুনতেই চম্পা ভাবি যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। চিৎকার শুনে দোকানের কাজ ফেলে বাহারাজও তড়িঘড়ি করে ভেতরে চলে এল। চম্পা এবার চিৎকার করে উঠলেন, "তোর আবার কিসের হিস্যা রে? এই বাড়ি তো তোর আব্বা আমার জামাইয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছে। ওগো তুমি কিছু কও না কেন? ও তো দেখি এখন বাড়ির ভাগ চায়! নির্লজ্জ মেয়েমানুষ একখান, নিজের ঘর সামলাইতে পারে না আবার বড় বড় কথা কয়!"
বাহারাজ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। বোনের অপমানে তার পৌরুষ আজ মৃত। সে শুধু বিড়বিড় করে বলল, "আমি আর কী কমু?"
এমন সময় অসুস্থ উমাইজা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। জ্বরে নুইয়ে পড়া শরীরটা নিয়ে সে টলমল পায়ে এসে মায়ের আঁচল শক্ত করে চেপে ধরল। বড়দের এই চিৎকার দেখে তার ছোট চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে। মেহনাজ দেখল, যাদের সে নিজের ভেবেছিল, তারা আজ কতটা অচেনা। সে আর কথা বাড়াল না, উমাইজাকে কোলে তুলে নিল। তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত স্বরে বলল, "তোমাদের আর কিছু বলার নেই আমার।"
মেহনাজ যখন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল, তখন পেছন থেকে চম্পা ভাবি মুখ ভেংচিয়ে টিপ্পনী কাটলেন, "কইবা কোন মুখে? আমি তো জামাইয়ের ভাত খাইতাছি, তোর কপালে তো তাও জোটে নাই। হুহ!"
মেহনাজের পা দুটো স্থির হয়ে গেল। চরম অপমানে তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। এই একই খোটা আর কতবার শুনতে হবে তাকে? সে একবার পেছনে ফিরে তাকাল। তার জন্মদাত্রী মা আর জন্মদাতা বাবার অভাব পূরণ করার কথা ছিল যে বড় ভাইয়ের, তারা দুজনেই পাথরের মতো নির্বিকার। কারও মুখে প্রতিবাদ তো দূরে থাক, সামান্য সহমর্মিতাও নেই। মেহনাজের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না, উমাইজাকে বুকে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে নিজের সেই নিঃসঙ্গ চিলেকোঠার আশ্রয়ে ফিরে এল।
--
"শয়তানের বাচ্চা, কানে কি আযানের শব্দ যায় না? জানোয়ারটা বসে বসে টিভি দেখছে! এখনই টিভি বন্ধ কর!"
লতা বেগমের কর্কশ চিৎকার ড্রয়িং রুমের দেয়াল ছাপিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। তন্মনা তখন সোফায় পা তুলে বেশ আয়েশ করে হিন্দি মুভি দেখছিল। টিভির ভলিউম বাড়ানো থাকায় আযানের সুমধুর ধ্বনি তার কানে না পৌঁছালেও লতা বেগমের তীক্ষ্ণ গালিগুলো তীরের মতো বিঁধল। মায়ের মুখে এমন কদর্য ভাষা শুনে তন্মনার কপাল কুঁচকে উঠল, চোখেমুখে ফুটে উঠল রাজ্যের বিরক্তি। সে গটগট করে উঠে গিয়ে টিভিটা বন্ধ করল। হাতের রিমোটটা আছাড় দেওয়ার ভঙ্গিতে সোফায় ছুড়ে মারল; ভাগ্যিস রিমোটটা নরম গদিতে পড়েছে, মেঝেতে পড়লে নির্ঘাত বিকট শব্দ হতো—আর সেই শব্দ কানে গেলে লতা বেগম হয়তো রুলটানা কোনো কিচ্ছা শুনিয়ে দিতেন তাকে।
তন্মনা রান্নাঘরের দিকে মুখ করে ঝাঁঝালো গলায় পালটা জবাব দিল, "আম্মা, তোমার মুখের ভাষা এত জঘন্য কেন? জানোয়ার আবার কেমন শব্দ? আর আমাকে যে হরহামেশা 'শয়তানের বাচ্চা' বলো, তাহলে সেই হিসেবে আসল শয়তানটা কে হলো শুনি?"
মেয়ের মুখে মুখে তর্ক শুনে লতা বেগম রান্নাঘর থেকে হাতে একটা তেতে থাকা গরম খুন্তি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সকাল থেকে এই গুমোট গরমে চুলার ধারে দাঁড়িয়ে সবার জন্য রাঁধতে রাঁধতে তাঁর নাভিশ্বাস উঠছে। ঘামে জবজবে শাড়ি আর মেজাজ—দুটোই এখন টগবগ করে ফুটছে। এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতের খুন্তিটা তন্মনার নাকের ডগায় নাচিয়ে তিনি হুঙ্কার দিলেন, "বেশি মুখে মুখে চ্যাঁচালে একদম খবর আছে বলে দিলাম!"
লতা বেগম মেয়ের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকে গেলেন। তন্মনার মাথার চুলগুলো যেন একেকটা জট পাকানো পাখির বাসা, পরনের থ্রি-পিসটা নোংরা হয়ে কুঁচকে আছে। লতা বেগম নাক সিটকে তিরস্কার করে বললেন, "ছি ছি ছি! তোর পোশাক-আশাকের এই ছিরি কেন? একটা ফকিন্নির চেয়েও জঘন্য লাগছে তোকে দেখতে। আর কি ভালো জামাকাপড় নেই তোর? আঠারো বছর বয়সের মেয়েরা এখন বাচ্চা-কাচ্চা পালছে, আর তোর এই দশা! যা বলছি শোন, ফকিন্নির বাচ্চা এখনই গোসলে যা!"
তন্মনা তেজি গলায় পালটা দিল, "খবরদার আম্মা! আব্বাকে আর কোনোদিন 'ফকিন্নি' বলবে না। এই যে নয়তলা বিল্ডিংয়ে বসে আয়েশ করছ, এটা কি তোমার বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছ? এই পুরোটা আমার বাপ রাকিব মারওয়াতের রক্তজল করা টাকায় করা। তাই ভুলেও আমাকে ফকিন্নির বাচ্চা বলবে না; মনে রেখো, তোমার বাপের চেয়ে আমার বাপ অনেক বেশি বড়লোক!"
লতা বেগম এবার আরও চড়া গলায় গর্জে উঠলেন, "মুখের ওপর আর একটা পাল্টা কথা বললে তোর খবর আছে তন্মনা!"
তন্মনা আর কোনো উত্তর দিল না ঠিকই, তবে মায়ের কথার পিঠে এক বিশ্রি মুখভঙ্গি করে নিজের অবজ্ঞা প্রকাশ করল।"টুং টাং..."
বাসার কলিংবেলটা বেজে উঠতেই লতা বেগম আড়চোখে দরজার দিকে তাকালেন। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে মেয়েকে কড়া গলায় আদেশ দিলেন, "দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দরজাটা খোল, দেখ কে এলো আবার এই অসময়ে।"
তন্মনা সোজাসুজি জানিয়ে দিল "পারব না, তোমার দরকার তুমি গিয়ে খোলো। আমি কি এ বাড়ির দারোয়ান নাকি?"
লতা বেগম মাঝপথে থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এমন এক তপ্ত চাহনি দিলেন যে তন্মনার কলিজা শুকিয়ে গেল। মায়ের সেই রাগী চোখের ভয় কাজ করায় সে আর দ্বিরুক্তি করার সাহস পেল না। গজগজ করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ভারী কাঠের পাল্লাটা খুলেই ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে তার তোয়াক্কা না করে এক দানবীয় ঝাড়ি মেরে বসল— "কী সমস্যা?"
দরজার ওপাশে তিনটি যুবক দাঁড়িয়ে। মাঝখানের ছেলেটির চেহারা বেশ মার্জিত ও ভদ্র, সে অত্যন্ত নমনীয় সুরে বলল, "আসলে বাইরে টু-লেট দেখে আসলাম। আপনারা কি ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেন?"
তন্মনা এক মুহূর্ত দেরি না করে রূঢ় স্বরে কেটে কেটে বলল, "নাহ!"
বলেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাদের মুখের ওপর সজোরে দরজাটা আটকে দিল। সে কেবল ভেতরে পা বাড়াতে যাবে, অমনি দ্বিতীয়বার কলিংবেল বেজে উঠল। তন্মনার পিত্তি জ্বলে গেল। ঝড়ের বেগে দরজা খুলে সে এবার বাঘিনীর মতো গর্জন করে উঠল, "আবার কী?"
ছেলেটি এবার রীতিমতো থতমত খেয়ে গেল। ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে অতিকষ্টে বলল, "কিন্তু... টু-লেটে তো পরিষ্কার লেখা ছিল ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হবে।"
তন্মনার ব্যবহার এমনিতেই কিছুটা রূঢ়, তার ওপর মায়ের সাথে একটু আগের তর্কের রেশ মেজাজটাকে আরও তপ্ত করে রেখেছে। মায়ের ওপর জমানো রাগটাই এই আগন্তুকদের ওপর উগড়ে দিয়ে সে বলল, "দেখেছেন যেহেতু, তাহলে আমাকে আবার ঢং করে প্রশ্ন করেছিলেন কেন? সোজা বললেই তো হতো আপনারা বাসা ভাড়া নিতে এসেছেন!"
"আচ্ছা, আমরা ব্যাচেলর বাসা নিতেই এসেছি। বাড়িওয়ালা কি বাসায় আছেন? কার সাথে কথা বলব?" ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে জানতে চাইল।
তন্মনা এবার দরজার কপাটে হাত রেখে চরম তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, "সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সোজা ছাদে চলে যান। ছাদে উঠে আবার ওই ছোট সিঁড়িটা দিয়ে ওপরের ছাদে উঠবেন। দেখবেন ওখানে ছাতার নিচে এক খাড়ুশ লোক বসে আছে। সাবধান, ভুলেও তাকে 'খাড়ুশ' বলতে যাবেন না, ওটা আমার বাপ—রাকিব মারওয়াত। এই নয়তলা বিল্ডিংয়ের মালিক। তাকে গিয়েই আপনাদের যত ভাড়ার আলাপ আছে সারুন। এখন জান জান, ফুটুন এখান থেকে!"
আগত যুবকদের আর কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই তন্মনা সশব্দে তাদের মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিল।আগত যুবকদের আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তন্মনা সশব্দে তাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। গটগট করে ভেতরে এসে ফ্রিজ থেকে একখানা আইসক্রিমের বক্স বের করল সে। তারপর সোফায় পা তুলে আয়েশ করে আইসক্রিম খেতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আবারও কলিংবেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজ— 'টুং টাং'।
রান্নাঘর থেকে লতা বেগম আবার দরজা খোলার আদেশ দিতেই তন্মনা সেই আগের মতোই ঝাঁঝালো কণ্ঠে গর্জে উঠল, "আমি কি এ বাড়ির কেনা গোলাম নাকি যে কথায় কথায় হুকুম তামিল করব? এটা করো, ওটা করো... পারব না আমি! তোমার দরকার তুমি গিয়ে খোলো।"
লতা বেগম হাতে গরম খুন্তি নিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই তন্মনার সব তেজ মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বিড়বিড় করতে করতে সে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল—দরজার ওপাশে ঘামে জবজবে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রুশম। লিফট বন্ধ থাকায় সিঁড়ি ভেঙে ছয় তলা উঠতে গিয়ে তার ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এক হাত দেয়ালের গায়ে ঠেকিয়ে সে হাঁপাচ্ছিল। তন্মনা দরজা খুলতেই রুশম কোনো ভূমিকা ছাড়াই ওর হাতের আইসক্রিমের বাটিটা ছিনিয়ে নিল। এরপর ওকে একপাশে সরিয়ে গটগট করে ভেতরে ঢুকে সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে বসল।
শার্টের ওপরের তিনটে বোতাম খুলে দিয়ে আয়েশ করে আইসক্রিম মুখে পুরল রুশম। তারপর বোন তন্মনাকে আদেশের সুরে বলল, "এই ডাইনি, যা তো—ফ্রিজ থেকে একদম ঠান্ডা কুল-কুল পানি নিয়ে আয়।"
তন্মনা বাঘিনীর মতো তেড়ে এসে বড়ো ভাইয়ের হাত থেকে নিজের আইসক্রিমের বাটিটা কেড়ে নিল। গটগট করে কিচেনের দিকে যেতে যেতে পালটা শোনাল, "পারব না! নিজের কাজ নিজে করে খাও গে। নবাবের ব্যাটা আসছে হুকুম ঝাড়তে!"
রুশম পেছন থেকে বিড়বিড় করল, "অসভ্য ডাইনি একটা!"
রুশমের গলার আওয়াজ পেতেই রণমূর্তি ধারণ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন লতা বেগম। সোফায় আয়েশ করে শুয়ে থাকা রুশমের সামনে গিয়ে কোমরে আঁচল গুঁজে দাঁড়ালেন তিনি। হাতের খুন্তিটা কাঁধের ওপর রেখে টিপ্পনী কেটে বললেন—
"এই যে, আমার নবাবজাদা বাপজান এলেন! বলি, কোন রাজ্য উদ্ধার করে ফিরলেন আমার বাপজান? সকালে বের হন, দুপুরে পেটে চাড়া দিলে হাজির হন, আবার খেয়েদেয়ে উধাও হয়ে রাত বারোটায় দর্শন দেন শুধু ঘুমানোর জন্য। বলি, এটা বাড়ি না কি কোনো হোটেল?"
রুশম কিছু বলতে চাইল, কিন্তু লতা বেগম থামলেন না। তিনি আরও চড়া গলায় বললেন, "লেখাপড়া শেষ করে আকাম্মা পোলাদের মতো টোটো কোম্পানির ম্যানেজার হয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছিস। তোর আর কোনো কাজকাম নেই রে? লোকমুখে শুনি, সারাদিন নাকি ল্যাবরেটরীর গলিতে বখাটেদের মতো দাঁড়িয়ে থাকিস, মেয়েদের বিরক্ত করিস।কি বখাটেগিরি করছিস, না? "
"ধুর আম্মা! তোমাকে এসব আজে বাজে কানপড়া দেয় বলো তো? তোমার ছেলের মতো এত শান্ত-ভদ্র ছেলে কি এই অট্ট এলাকায় আর একটাও আছে?"
খুব গর্বের সঙ্গে কথাটা বলল রুশম।
"অবশ্যই নেই! কারণ এই এলাকার অন্য সব ছেলেরা মাস্টার্স শেষ করে হয় চাকরি করছে, না হয় ব্যবসা। আর আমার গুণধর ছেলে মাস্টার্স শেষ করে পাড়ায় পাড়ায় বখাটেগিরি করে বেড়াচ্ছে!"
রুশম এবার খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, "উফ আম্মা, এখন এই ঘ্যানঘ্যানানি বাদ দিয়ে খাবার দাও তো। পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।"
"দুঃখিত বাপজান! আপনার জন্য আজ এই বাড়িতে রান্না হয়নি," লতা বেগম মুখিয়ে উঠলেন।
রুশম দমে না গিয়ে টিপ্পনী কাটল, "আমার জন্য না হোক, তোমার জন্য তো হয়েছে। তোমার ভাগের খাবারটাই দাও না হয়।"
লতা বেগম এবার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, "জুতোর বাড়ি মারব তোকে, জানোয়ার! বাপের অঢেল টাকা পেয়ে ওড়াচ্ছিস তো খুব, বাপটা মরলে কী করবি শুনি? বাপের টাকা আছে বলেই এত ফুটানি। ব্যাটা খালি একবার চোখ বুজুক, তারপর তোদের সবার দশা আমি দেখব।"
রুশম কপাল কুঁচকে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, "আহ আম্মা! আমার ভালো মুডটাকে একদম মেরে ফেলো না তো। আমার আব্বা তোমার চেয়ে হাজার গুণ ভালো, অন্তত তোমার মতো সারাক্ষণ এমন খ্যাট-খ্যাট করে না।"
"বাপ তো ভালো হবেই, মা তো আর ভালো না! মা ভালো হবে কী করে, মা তো তিতা হলেও উচিত কথা বলে। শোন, পনেরো দিনের ভেতরে যদি কোনো চাকরি না জোগাড় করতে পারিস, তবে এই বাড়িতে তোর খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ। কথাটা মগজে ঢুকিয়ে রাখিস!" লতা বেগমের শেষ কথাগুলো যেন চূড়ান্ত হুশিয়ারির মতো শোনাল।
"ধ্যাত!"
রুশম আর তর্কে না জড়িয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। আজ পাঁচ মাস হলো রুশম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে।প্রথমে BCS দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও এখন তার স্বপ্ন বড় কোনো ব্যবসা করা। কিন্তু বাবা রাকিব মারওয়াত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—আগে নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি করে দেখাতে হবে যে তার কোনো কিছু সামলানোর সক্ষমতা আছে, তবেই তিনি ব্যবসার মূলধন দেবেন। নচেৎ এক পয়সাও নয়। এদিকে রুশমের দর্শন পুরো ভিন্ন; তার কাছে চাকরি করা মানে অন্যের গোলামি করা। এই পরাধীন জীবন তার ধাতে সয় না। সে মনেপ্রাণে চায় নিজের স্বাধীন রাজত্ব গড়তে।
চলবে...
পর্ব ১..
#চলো_নিরালায়
#তেজরিন_উম্মীদ