#চলো_নিরালায়
#তেজরিন_উম্মীদ
২
🚫কোন প্রকার কপি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫
মেহনাজের বয়স যখন সবে আঠারো, ঠিক তখনই তার জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল। বিয়ের পিঁড়িতে বসার বয়স তখনও হয়নি, কিন্তু পরিবারের তাড়াহুড়োয় তাকে বসতে হলো কনের সাজে। সম্বন্ধটা এসেছিল মেহনাজের বাবার এক পুরনো বন্ধুর ঘর থেকে। বিশাল প্রতিপত্তি আর বিত্ত-বৈভবের হাতছানি দেখে মেহনাজের মা আর ভাবি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। এমন রাজকীয় পরিবারে মেয়েকে পাঠাতে পারলেই যেন সব সার্থকতা—এই জেদ ধরে তারা উঠেপড়ে লাগলেন। মেহনাজ আগে থেকেই ধর্মভীরু,সাথে খুব শান্ত প্রকৃতির মেয়ে ছিল বড়দের মুখের ওপর কথা বলা তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাই ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে পরিবারের পছন্দেই ঘর বাঁধল সে।
কিন্তু সেই রূপকথার মতো প্রাসাদে সুখ সইলো না তার। বিয়ের দুই বছর পার হতে না হতেই গায়ের ওপর তকমা লেগে গেল ‘ডিভোর্সি’। তার মেয়ে উমাইজার বয়স তখন মাত্র এক মাস তেরো দিন। কোলের শিশুটিকে নিয়ে মেহনাজ যেন অথৈ সাগরে পড়ল। যার জন্য এত আয়োজন করে বিয়ে, সেই পরিবারই তাকে পর করে দিল। আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই জুটত, বুক ফেটে আসা কান্নাগুলো লুকানোর একটা কাঁধ পাওয়া যেত। কিন্তু নিয়তি তাকে একা করে দিয়েছে।তবুও,আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ও বাড়ি থাকলেও হয়তো তার কপালে সুখ জুটতো না।
চিলেকোঠার ছোট রুমটা অন্ধকারে ডুবে আছে। বাইরের রাস্তার সোডিয়াম বাতির এক চিলতে আলো জানলার গ্রিল গলে ভেতরে এসে পড়েছে, যা অন্ধকারের বুক চিরে রুমটাকে আবছাভাবে দৃশ্যমান করে তুলেছে। জায়নামাজের ওপর বসে মেহনাজ তখন মাত্র তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করেছে।
মোনাজাতে দু'হাত তুলতেই বুকের ভেতর জমানো পাহাড়সম কষ্টগুলো বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো দু'চোখ দিয়ে নেমে এলো। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ নোনা জল যেন তার নিঃশব্দ আর্তনাদ। মেহনাজ ধরা গলায় ডুকরে কেঁদে উঠল,
"ইয়া আল্লাহ, আপনিই ভালো জানেন আমি কোন পাপের এই শাস্তি পাচ্ছি। নাকি এটা আমার ধৈর্যের পরীক্ষা? হে মাবুদ, আপনার এই পাপী বান্দার ধৈর্য বড়ই কম। আমি আর পারছি না আল্লাহ, আমি ভেঙে পড়েছি। দয়া করে আমাকে সহ্য করার শক্তি দিন। চারপাশের মানুষের এত গঞ্জনা, এত বিদ্রূপ শোনার মতো ক্ষমতা আমার নেই। আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। এই অসহায় বান্দাকে আপনার রহমতের চাদরে ঢেকে নিন।"
মায়ের কান্নার অস্ফুট শব্দে উমাইজার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। ছোট ছোট হাত দিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল সে। ঝাপসা চোখে দেখল, জায়নামাজে বসে মা কাঁদছে। তবে মায়ের এই কান্না দেখে উমাইজা খুব একটা ঘাবড়ালো না। কারণ, প্রায় দিনই সে তার আম্মিকে নামাজে এভাবে কাঁদতে দেখে। মা তাকে শিখিয়েছে—নামাজে আল্লাহর দরবারে কাঁদা ভালো, এতে আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন। উমাইজা ওভাবেই বসে ঘুম-ঘুম চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহনাজ মোনাজাত শেষ করে মেয়ের কাছে এগিয়ে এল। কপালে হাত দিয়ে দেখল জ্বরের তপ্ত ভাবটা কিছুটা কমেছে কি না।শরীরটা ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যায় সামান্য কিছু টাকার ওষুধ এনেছিল মেহনাজ, তাতেই কাজ হয়েছে বোধহয়।
উমাইজা আদুরে ভঙ্গিতে মায়ের কোলে চড়ে বসল। মেহনাজ তাকে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"ঘুমাবেন না আম্মিজান? এখনো তো রাত শেষ হয়নি।"
উমাইজা আধো আধো কণ্ঠে উত্তর দিল, "তোমাল সাতে নামাত পলব।"
মেহনাজ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একটু হাসল। ছোটবেলা থেকেই সে উমাইজাকে ইসলামের সুন্দর আর ইতিবাচক দিকগুলো শিখিয়েছে। তাই এইটুকু বয়সেই ধর্মের প্রতি ওর দারুণ আগ্রহ। মেহনাজ যখনই নামাজে দাঁড়ায়, খুদে উমাইজাও পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে।
"আচ্ছা আম্মিজান।"
মেহনাজের পাশে ছোট্ট একটা হিজাব মাথায় দিয়ে ফজরের সালাতে দাঁড়াল উমাইজা। মা যখন রুকুতে যায়, সে-ও যায়; মা সেজদায় গেলে সে-ও অনুকরণ করে। এর মধ্যেই ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। চিলেকোঠার ঘর হওয়ায় খুব দ্রুতই আলো ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল।
নামাজ শেষে মেহনাজ কোরআন তিলাওয়াত শুরু করলে উমাইজা উৎসাহ নিয়ে পাশে এসে বসল। বলল, "আম্মি, আমিও পলব সুলা (সূরা)।"
মেহনাজ স্নেহের হাসি হেসে বলল, "আপনিও পড়বেন? আচ্ছা, আমার সঙ্গে সঙ্গে বলুন—ইন্না আ’তাইনা কাল কাওসার।"
উমাইজা গম্ভীর মুখে অনুকরণ করল, "ইনা আতানা কাল কাওছাল।"
মেহনাজ পরের অংশটুকু বলল, "ফাসাল্লি লি-রাব্বিকা ওয়ানহার।"
বাচ্চা মানুষের জিভ আড়ষ্ট, তাই উচ্চারণে গোলমাল করে সে বলে উঠল, "ফাছা লি লি লাবিলিকা ওয়াহাল।"
মেয়ের অদ্ভুত উচ্চারণ শুনে মেহনাজ নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। কৌতুক করে আবার জিজ্ঞেস করল, "কী বললেন? আবার বলুন তো আম্মিজান!"
উমাইজা এবার আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল করে বসল, "ফাছালি বালিকা হাল!"
এবার মেহনাজ শব্দ করেই হেসে ফেলল। কতদিন পর তার মনে এমন নির্মল আনন্দ এল! সে মেয়েকে শুধরে দিয়ে বলল, "ওটা 'ফাছালি বালিকা হাল' না আম্মিজান, ওটা হলো—ফাসাল্লি লি-রাব্বিকা ওয়ানহার।"
উমাইজা নাছোড়বান্দা, সে তার মতো করেই বলল, "ওদায় (ওইটাই)!"
"ওদায় না আম্মি ওইটাই, উচ্চারণটা ঠিক করে বলুন।"
উমাইজা আবারও মাথা নেড়ে জোর দিয়ে বলল, "হ্যাঁ... ওদায়!"
মেহনাজের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন এই একরত্তি মেয়ের হাসিমুখ আর ভাঙা বুলিতে মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল।
--
গত রাতের দেরিতে ঘুমানোর খেসারত দিতে হলো আজ। রোদের তেজ মাথার ওপর উঠে এলেও রুশমের ঘুম ভাঙল না। মাঝরাস্তায় মেহনাজকে উত্যক্ত করার যে বখাটেপনার পরিকল্পনা ছিল, ঘুমের ঘোরে তা ভেস্তে গেল। লতা এসে চিল চিৎকার করে ঘুম না ভাঙালে হয়তো বিকেল অবধি সে বিছানাতেই পড়ে থাকত। ধড়ফড়িয়ে উঠে রুশম আড়মোড়া ভাঙল। বাথরুম থেকে ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে সোজা পা বাড়াল ছাদের দিকে।
ছাদে পা রাখতেই দুপুরের প্রখর রোদে চোখ কুঁচকে এল তার। রুশমদের বাড়ির ছাদটা বেশ বড়। একপাশে ছাউনি দেওয়া একটা বসার জায়গা আছে। সেখানে ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বসে আছেন রাকিব মারওয়াত। রুশমের বাবা।
রাকিব সাহেবের স্বভাবটা কিছুটা অদ্ভুত। প্রতিদিন সকাল এগারোটা থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনি এই ছাদেই কাটান। ঝড়-বৃষ্টি বা তপ্ত রোদ—কোনো কিছুই তার এই নিয়মে ছেদ ঘটাতে পারে না। ভোরে আর বিকেলে গাছে জল দেওয়াটা তার নেশা, কিন্তু দুপুরের এই সময়টুকু তিনি কেন ছাদে বসে থাকেন, তা আজও কারো কাছে খোলসা করেননি। জিজ্ঞেস করলে শুধু এক টুকরো রহস্যময় হাসি দিয়ে বলেন, "এটা আমার টাইম টেবিল।"
রুশম ব্রাশ করতে করতেই বাবার সামনের খালি আসনটায় ধপ করে বসে পড়ল। রাকিব মারওয়াত একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার উদাসীন ভঙ্গিতে রোদেলা আকাশের দিকে চাইলেন। মুখের ফেনা ছাদের বাইরে থুথু করে ফেলে দিয়ে রুশম গম্ভীর গলায় বলল,
"আব্বু, একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।"
রাকিব সাহেব নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, "বলো, শুনছি।"
"আপাতত ত্রিশ লাখ টাকা লাগবে। পরে সংখ্যাটা বাড়তে পারে।"
ছেলের চাওয়া শুনেও রাকিব সাহেবের চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি শান্তভাবে বললেন, "তুমি যদি গাড়ি কিনতে চাও বা জমি,আমি টাকা দিতে রাজি আছি। কিন্তু যদি ব্যবসার নাম করে টাকা চাও, তবে দুঃখিত। ব্যবসার জন্য তোমাকে আমি একটা টাকাও দেব না।"
বাবার সোজাসাপ্টা উত্তরে রুশমের মেজাজটা কিঞ্চিৎ বিগড়ে গেল। সে ব্রাশ করতে করতে ঝামটে উঠে বলল, "বিজনেস করতে টাকা দিতে তোমার সমস্যাটা কোথায়?"
ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রাকিব সাহেব পালটা প্রশ্ন করলেন, "চাকরি করতে তোমার সমস্যাটা কোথায়?"
"আমি অন্যের অধীনে গোলামি করতে পারব না," রুশমের কণ্ঠে দম্ভ ফুটে উঠল।
রাকিব সাহেব এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। ধীরস্থিরভাবে বললেন, "শোনো রুশম, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে না পারলে আমিও তোমাকে কোনো পুঁজি দেব না। ব্যবসা করতে হলে আগে দায়িত্ব নিতে শিখতে হয়। "
রুশম কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, "আরে আব্বু, তুমি যদি আমাকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই না দাও, তবে আমি নিজেকে প্রমাণ করব কীভাবে?"
রাকিব মারওয়াত ছেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, "আমি তোমাকে কেন টাকা দেব? তোমার যোগ্যতা কী? এটা কি লোন হিসেবে নিচ্ছ?"
বাবার কথার প্যাঁচ ধরতে পেরে রুশম কিছুটা নমনীয় হয়ে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, লোন হিসেবেই দাও। আমি কথা দিচ্ছি, সময়মতো টাকা ফেরত দিয়ে দেব।"
রাকিব সাহেব হালকা হাসলেন, তবে সেই হাসিতে প্রশ্রয় ছিল না। তিনি বললেন, "ব্যাংক থেকে লোন নিতে গেলেও কিছু না কিছু বন্ধক বা জিম্মি রাখতে হয়। তুমি তেমন কিছু দিতে পারবে আমাকে? তবেই আমি টাকা দেওয়ার কথা ভাবব।"
রুশম এবার স্পষ্ট বুঝল, তার বাবা আসলে টাকা না দেওয়ার জন্যই এভাবে কথা ঘোরাচ্ছেন। সে সরাসরি আসল কথায় এল, "সমস্যাটা কী আব্বু? তুমি আমাকে টাকা দিতে চাচ্ছ না কেন?"
রাকিব সাহেবও পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, "তুমি আমার ব্যবসায় বসতে চাচ্ছ না কেন?"
"কারণ আমি নিজের যোগ্যতায় বড় হতে চাই,"
রুশমের কণ্ঠে দম্ভ আর আত্মবিশ্বাসের মিশেল।
ছেলের এই কথা শুনে রাকিব মারওয়াত যেন মনে মনে কিছুটা খুশিই হলেন, কিন্তু প্রকাশ করলেন না। তিনি ধীরলয়ে বলতে শুরু করলেন, "তবে হও, আমার কোনো নিষেধ নেই। নিজের পরিশ্রমে বড় হয়ে দেখাও। তোমার মতো আমার বাবার এত টাকা-পয়সা ছিল না। আমি একদম শূন্য থেকে শুরু করে আজ এই অবস্থানে এসেছি। এখন আমি যদি তোমাকে সব টাকা দিয়ে দিই, তবে তো তুমি শুরুতেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলে। সেটাকে কি আদৌও সাফল্য বলা যাবে? কারণ সেই সাফল্যের পেছনে তোমার কোনো ঘাম নেই। তুমি তো শূন্য থেকে নয়, বরং সাফল্য থেকেই শুরু করছ।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, "আগে নিজে খেটে একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করো। তখন দেখবে নিজের ওপর এক অদ্ভুত গর্ববোধ কাজ করবে। আমি তোমাকে একদম সাহায্য করব না তা বলছি না, কিন্তু শুরুতেই পুরো টাকাটা তোমার হাতে তুলে দিয়ে আমি তোমার পরিশ্রম করার মানসিকতাটা নষ্ট করতে নারাজ।"
রুশম আর কোনো তর্কে গেল না। বাবার কথাগুলো যেমন তিতা, তেমনই সত্য। সে শুধু ছোট করে বলল, "বুঝতে পেরেছি।"
--
আজকের সকালটা মেহনাজের কাছে একটু অন্যরকম মনে হলো। রাস্তার সেই বখাটে লোকটা আজ পথে দাঁড়িয়ে ছিল না, তার উৎকট চাহনি বা কথাগুলো মেহনাজকে তাড়া করেনি। মনে মনে একটা স্বস্তি অনুভব করল সে। যদি লোকটা এভাবেই চিরতরে তার জীবন থেকে হাওয়া হয়ে যেত, তবে হয়তো অনেকটা মানসিক বোঝা কমে যেত। দ্রুত পায়ে সে বাসায় পৌঁছাল।
উমাইজা আজও একা। প্রতিদিন মেহনাজ যখন আটটা থেকে বারোটা ডিউটিতে থাকে, এই চার ঘণ্টা শিশুটি একাই ঘরে থাকে। ভোরে উঠে মায়ের সাথে নামাজ পড়ে বলে মেহনাজ ফেরার আগ পর্যন্ত সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। মাঝেমধ্যে আগে ঘুম ভাঙলে সে লক্ষ্মী মেয়ের মতো রুমের ভেতর একা একাই খেলে, বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না—কারণ মায়ের কড়া বারণ। তবুও মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে মেহনাজ টেবিলের ওপর ছোট একটা সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে, যাতে কাজের ফাঁকে ফোনে চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে পারে উমাইজা ঠিক আছে কি না।
বাসায় ফিরে মেহনাজ দেখল উমাইজা তখনও ঘুমোচ্ছে। বোরখা ছেড়ে দ্রুত গোসল সেরে জোহরের নামাজ আদায় করে নিল সে। এরপর রান্নাঘরে গিয়ে দেখল নতুন বিপদ—গ্যাস শেষ। মাস শেষে হাতে একদম টাকা নেই, এখন এই মুহূর্তে সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্যও তার নেই। দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ল মেহনাজের। উপায়ান্তর না দেখে ভাতের পাতিলটা নিয়ে সে নিচে তাদের পরান্নাঘরে গেল। চুলায় পাতিলটা বসাতে যাবে, ঠিক তখনই ঝড়ের বেগে উদয় হলো চম্পা।
"আরে আরে! কী করো কী তুমি?" চম্পার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
মেহনাজ নরম গলায় বলল, "ভাবি, আমার সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। তাই একটু তোমাদের চুলায় রান্না করতে এলাম।"
চম্পা মুখ বাঁকিয়ে ঝামটে উঠল, "আমাদেরও তো গ্যাস শেষ!"
মেহনাজ কথা না বাড়িয়ে চুলাটা অন করে দেখল নীলাভ শিখা জ্বলছে। বুঝতে বাকি রইল না যে ভাবি মিথ্যে বলছেন। সে শান্তভাবে বলল, "গ্যাস তো আছে ভাবি।"
ধরা খেয়ে চম্পা এবার রাখঢাক ছেড়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করল, "আছে তো আমাদের জন্য আছে! তোমার জন্য কি আমরা গ্যাস কিনা রাখছি? জানো এহন সিলিন্ডারের দাম কত?"
মেহনাজ অসহায় স্বরে অনুরোধ করল, "ভাবি, আমি তো আর রোজ রোজ আসি না। শুধু এখনকার মতো একটু রাঁধতে দাও। আমি রাতের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা করে নেব।"
"ওসব আমি বুঝি না বাপু! সোজা কথা—তুমি আমার চুলায় রাঁধতে পারবা না। গ্যাস কি তুমি কিনে দাও?
নিজেরটা নিজে বোঝো গে যাও। যাও এখান থেকে!"
মেহনাজ বুঝতে পারল, এখানে দাঁড়িয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই; অযথা অপমানিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। তাই ভাতের পাতিলটা হাতে নিয়ে সে নিঃশব্দে নিজের ঘরে ফিরে এল। একটু পরেই উমাইজা ঘুম থেকে উঠবে, উঠেই খাবারের জন্য বায়না ধরবে। কী খাওয়াবে সে মেয়েটাকে? এ মাসের খরচের আর মাত্র ৫৩০ টাকা অবশিষ্ট আছে। আজ ২৬ তারিখ, বেতন পেতে পেতে আরও অন্তত আট-দশ দিন। নিরুপায় হয়ে মেহনাজ তার সযত্নে রাখা মাটির ব্যাংকটা ভাঙল। সেখান থেকে বের হলো মাত্র ৬৭০ টাকা। সব মিলিয়ে যা হলো, তাতে একটা গ্যাস সিলিন্ডারের দাম হবে না।
মেহনাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৈরি হয়ে নিল। ঘরে বসে থাকলে সমাধান আসবে না। ততক্ষণে উমাইজাও উঠে পড়েছে। মেয়েটিকেও ছোট একটা বোরখা পরিয়ে নিজের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বের হলো সে। অন্তত দুপুরের খাবারের তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে!
বাইরের হোটেল থেকে খাবার কিনতে গিয়েই প্রায় ২০০ টাকা শেষ হয়ে গেল। ফেরার পথে ল্যাবরেটরি গলিতে ঢুকতেই মেহনাজের বুকটা ধক করে উঠল। সামনেই রুশম! সে তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আড্ডায় মেতে ছিল। মেহনাজকে দেখতে পেয়েই সে আড্ডা ছেড়ে মাঝরাস্তায় এসে দাঁড়াল। তবে আজ সে সরাসরি মেহনাজকে কিছু বলল না; বরং মেহনাজের হাত ধরে থাকা ছোট্ট বোরখাওয়ালি উমাইজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। উমাইজার গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে হাসিমুখে বলল,
"আসসালামু আলাইকুম, উমাইজা।"
উমাইজা মিষ্টি করে উত্তর দিল, "ওলেকুম চালাম।"
"কোথায় গিয়েছিলে?" রুশমের প্রশ্নে উমাইজা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মেহনাজ মেয়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
উমাইজা থমকে গেল। সে বুঝতে পারল মা তাকে কথা বলতে নিষেধ করছে। সে বড় বড় চোখে মায়ের দিকে অসহায়ভাবে তাকাল। তার ছোট্ট মনে দ্বিধা—আম্মি তো সবসময় বলে বড়দের প্রশ্নের উত্তর সুন্দর করে দিতে, তবে আজ কেন বাধা দিচ্ছে?
উমাইজাকে মায়ের দিকে ওভাবে তাকাতে দেখে রুশম বুঝে গেল মেহনাজের ইঙ্গিত। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এবার মেহনাজের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, "আসসালামু আলাইকুম, মাস্টারনি!"
লোকটাকে দেখলেই মেহনাজের পিত্তি জ্বলে যায়। তার এই উপহাসের সালামের উত্তর দিতে একদমই ইচ্ছে করল না মেহনাজের। সে নিকাবের আড়ালে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে রইল। কিন্তু তার ওই বাদামি চোখ দু'টোর তীক্ষ্ণ চাহনি বলে দিচ্ছিল ভেতরে ভেতরে সে কতটা রেগে যাচ্ছে।
রুশম সেই চোখের ভাষা পড়ে নিয়ে মৃদু হাসল। যেন মেহনাজকে আরও একটু উসকে দিতে চাইল সে। বলল, "সালামের উত্তর নিলেন না? আপনি না খুব ধার্মিক মানুষ? সালাম দিলে যে উত্তর নিতে হয়, এটুকুও কি মাস্টারনি জানেন না?"
মেহনাজ তখনও পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, হাত ছাড়ল না মেয়ের। তার নীরবতা দেখে রুশমের মুখে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসিটা আবার খেলে গেল। সে যেন মেহনাজের ধৈর্য পরীক্ষা নিতে চাইছে। রুশম আবারও জিজ্ঞেস করল,
"উত্তরটা কি নেবেন না?"
অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেহনাজকে ঠোঁট নাড়তে হলো। অস্ফুট স্বরে কেবল বলল, "ওয়ালাইকুম আসসালাম।"
"তা এই অসময়ে মা-মেয়ে মিলে কোথা থেকে আসা হলো?" রুশমের গলায় রাজ্যের কৌতূহল।
মেহনাজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। সেই বাদামি চোখে এখন শুধু রাগ নয়, তীব্র বিরক্তি। সে সংক্ষেপে উত্তর দিল, "আপনাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।"
রুশম একটুও দমে না গিয়ে মাথা নাড়াল।
"হুম, কথায় যুক্তি আছে। তবুও যদি বলতেন, হয়তো কোনো উপকারে আসতাম।"
"পথ ছাড়ুন,"
রুশম দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে বলল, "আপনার মুখে এই একটা কথা একদমই সুন্দর লাগে না।"
মেহনাজ এবার নিজেকে আর সামলাতে পারল না। ঝামটে উঠে বলল, "আপনি তো ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে, তবুও এসব অভদ্রতামি কেন করেন? "
রুশম যেন এই তীরের মতোই ধারালো কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে একটুও না ঘাবড়ে হেসেই উত্তর দিল,
"আপনার কথাতেই তো উত্তর লুকিয়ে আছে মাস্টারনি। আমার পরিবার ভদ্র, কিন্তু আমি তো নই!"
মেহনাজ আর কথা বাড়ানোর রুচি পেল না। নিচু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়াল, "বেয়াদব!"
এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে উমাইজাকে একরকম টেনেই হাঁটা ধরল সে। "উমাইজা চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
রুশম এবার আর বাধা দিল না। উমাইজা সাথে আছে বলেই হয়তো সে নিজেকে কিছুটা সংযত রাখল। বখাটে হলেও বাচ্চাদের সামনে অসভ্যতা করার মতো নিচতা হয়তো তার ভেতরে এখনও তৈরি হয়নি। সে শুধু একদৃষ্টিতে মেহনাজের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
--
রাত তখন একটা ছুঁইছুঁই।হঠাৎ বেজে উঠল কলিং বেলের সেই পরিচিত শব্দ—"টুংটাং"। বাড়ির সবাই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, কেবল তন্মনা ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিল। শব্দ যাতে মায়ের কান অবধি না পৌঁছায়, সেজন্য ভলিউম একদম কমিয়ে রাখা।
দরজা খুলতেই রুশম অনেকটা গায়ের জোরে তন্মনাকে ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সোফার দিকে এগোতে এগোতে অবহেলার সুরে বলল, "এই ডাইনি, আম্মা কইরে?"
তন্মনা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করল। এরপর তেড়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "আম্মা ঘুমাচ্ছে! কিন্তু তুই আমাকে ধাক্কা দিলি কেন?"
রুশম ততক্ষণে পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় জাঁকিয়ে বসেছে। আয়েশ করে বলল, "কেন বুনু, খুব লেগেছে নাকি?"
তন্মনা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল, "কুত্তা একটা!"
"কুত্তি, বড় ভাইয়ের সেবা কর। রান্নাঘরে কী খাবার আছে রেডি কর তো, পেটটা চোঁ চোঁ করছে।"
তন্মনা জ্বলে উঠে উত্তর দিল, "আমি কি তোর চাকর নাকি? নিজেরটা নিজে করে খা।"
রুশম আর তন্মনার সম্পর্কটা ঠিক যেন সাপ আর নেউলের। সারাক্ষণ সুযোগ পেলেই একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও তন্মনা ভাইকে 'তুই' করেই ডাকে। কেউ কাউকে এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারে না, অথচ গোপনে দুই ভাই-বোনের মতো আপন আর কেউ নেই।
রুশম একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, "গুরুজনের সেবা করা উত্তম কাজ বৎস। তাড়াতাড়ি বড় ভাইয়ের সেবা করো দেখি। তোমার সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে যদি একটা 'ফু' দিই, তবে দেখবে চ্যাল চ্যালাইয়া জান্নাতে চলে গেছ। দিস ইস বড় ভাইয়ের ফু-এর পাওয়ার!"
তন্মনা চোখ কপালে তুলে বলল, "তুই ফু দিলে আমি জান্নাতে না, সোজা জাহান্নামে যামু। খালি সকালডা হইতে দে, আম্মা যে তোরে কী ছুলডা ছুলব তখন বুঝবি। তখন তোর সব ভণ্ডামি বের হবে।"
রুশম এবার নাক সিঁটকে বলল, "এই অশিক্ষিত গেঁয়ো ভূত! শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারিস না? কী সব 'খামু-যামু'! ডিসগাস্টিং আন-এডুকেটেড পিপল!"
"ওরে আমার শিক্ষিতরে! এর জন্যই তো মাস্টার্স কমপ্লিট করার পরও চাকরি হয় না। অকর্মার মতো সারাদিন এলাকায় টো টো করে ঘুরে বেড়ায়, সে আসছে আমারে জ্ঞান দিতে!"
রুশম চেঁচিয়ে উঠল, "বড় ভাইকে সম্মান দিতে জানিস না?"
"তোর সম্মান তোর কাছেই রাখো, খবিশ একটা!"
"কত বড় সাহস! আট বছরের বড় ভাইকে তুই করে ডাকিস? দাঁড়া, এমন বদদোয়া দেব না তোকে—একদম পাতিলের তলার মতো কাইল্লা জামাই পাবি।"
তন্মনা ঝামটে উঠল, "তোর মতো ইবলিশের দোয়া আমার গায়ে লাগবে না। আর আমি তো সরকারি জামাই ছাড়া বিয়েই করব না, দেখে নিস।"
রুশম একটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল, "উয়্যাক থু! মেয়ে রাধতে পারে না তরকারি, আবার জামাই চায় সরকারি! তোর কপালে এলাকার পেটমোটা টেকো নান্টু কাকুর মতো কেউ জুটবে, লিখে রাখ!"
তন্মনা সোফার কুশনটা তুলে ছুড়ে মারল ভাইয়ের দিকে, "যা এখান থেকে। তোর সাথে কথা বলাই পাপ।"
রুশম কুশনটা লুফে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, "পাপ তো তুই করছিস ডাইনি, ক্ষুধার্তকে অন্ন না দিয়ে! যা না রে বোন, কিছু নিয়ে আয়। সত্যি খুব ক্ষুধা লাগছে।"
--
পরদিন সকালে ল্যাবরেটরির গলির সামনে আসতেই মেহনাজের বুকটা ধক করে উঠল। সেই দোতলা হলুদ রঙের 'স্মরণিকা' বিল্ডিংটার সামনে আজও দাঁড়িয়ে আছে রুশম। লোকটার মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। তাই বাড়িতে পৌঁছাতে দেরি হবে জেনেও মেহনাজ এই রাস্তা ছেড়ে পাশের সরু গলিটা ধরল। কিন্তু তার সেই স্বস্তিটুকুও সইলো না; একটু এগোতেই দেখল সামনের দিক থেকে ধীরপায়ে হেঁটে আসছে রুশম।
মেহনাজ এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে উল্টো পথ ধরল। ঠিক তখনই পেছন থেকে রুশমের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
"ও ম্যাডাম! পালাচ্ছেন কেন?"
মেহনাজ উত্তর দিল না, বরং হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু রুশম হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে একপ্রকার দৌড়ে এসে মেহনাজের পথ আগলে দাঁড়াল। দৌড়ে আসায় সে খানিকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। কোমরে দুহাত রেখে কয়েকবার লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল রুশম। তারপর বাঁকা হেসে প্রশ্ন করল,
"পালাচ্ছিলেন কেন? আমাকে কি খুব ভয় পান? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?"
মেহনাজ এবার তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। নিকাবের আড়াল থেকেও সেই চাহনির আগুন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। সে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল—
"আপনাকে আমি ভয় পাই না রুশম সাহেব। আমি ভয় পাই এই সমাজকে। যেটুকু সম্মান নিয়ে আজও বেঁচে আছি, সেটুকুর ওপর যেন সমাজের মানুষ কালি লেপে না দেয়, আমি সেই ভয় পাই।"
রুশম এবার একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
"সমাজ তো এমনিতেই আপনাকে একঘরে করে রেখেছে।সমাজ যা অনেক আগে আপনার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, তা হারানোর ভয় পাচ্ছেন কেন?"
কথাটা তীরের মতো মেহনাজের বুকে বিঁধল। মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল। রুশম মিথ্যে বলেনি। তার কি আসলেই হারানোর মতো কোনো সম্মান আর অবশিষ্ট আছে? ডিভোর্সি হওয়ার পর থেকে এই এলাকার মানুষ তো তার চরিত্র নিয়ে কতশত গল্প রটিয়েছে! তবে কি সে মিথ্যে এক পবিত্রতার আবরণে নিজেকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে?
পরক্ষণেই মেহনাজের চোখ দুটো রাগে আগুনের গোলকের মতো জ্বলে উঠল। সে ফুঁসে উঠে বলল,
"আপনার লজ্জা লাগে না? একটা শিক্ষিত ঘরের ছেলে হয়ে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন নারীকে বখাটেদের মতো বিরক্ত করতে আপনার বাধে না?"
রুশমের চোখের চাহনি এবার বদলে গেল। সে খুব স্থির গলায় বলল, "আমি বখাটে নই মেহনাজ।"
"তবে আপনি কী? এই যে ছায়ার মতো লেগে থাকেন, এটাকে কী বলা হয়?"
রুশম এক কদম এগিয়ে এসে বলল, "আমি যদি সত্যি বখাটে হতাম, তবে অনেক আগেই আপনার দিকে খারাপভাবে হাত বাড়াতাম। আমি কি তা করেছি? আমি আপনার পেছনে ছায়ার মতো ঘুরি যাতে অন্য কোনো প্রকৃত বখাটে আপনার দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে। আমি যদি সস্তা মজনু হতাম, তবে শত শত সুন্দরী মেয়ে আছে এ শহরে, তাদের পিছনে হাত ধুয়ে পড়ে থাকতাম। কিন্তু আমি শুধু একজনের পেছনেই পড়ে আছি।"
রুশমের গলার স্বর আর চোখের গভীরতা মেহনাজকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। সে বুঝতে পারল না এই জেদটা ভালোবাসার নাকি অন্য কিছুর।
মেহনাজ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। কণ্ঠস্বরে মিশে রইল রাজ্যের তিক্ততা, "আমার জানামতে আপনি কোনোদিন আমার চেহারা দেখেননি। শুধু এই চোখ দুটো দেখেই বলে দিলেন আমি কেমন হতে পারি? বাহ রুশম সাহেব! আপনার বিচারশক্তি তো দারুণ!"
রুশম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল, "চেহারা দিয়ে কী হয় মেহনাজ? যে নারীর চরিত্র সুন্দর, সে নারীই তো বিশ্বসুন্দরী।"
"চরিত্র সুন্দর?" মেহনাজ এবার যেন সত্যিই হোহো করে হেসে উঠল, যদিও সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। "হাসালেন রুশম সাহেব! সত্যিই খুব হাসালেন। আমার চরিত্রটা এখন অনেকটা ম্যাকাও ফল মতো হয়ে আছে। বোরখা পরে বের হই দেখে অপরিচিত অনেকেই ভাবে আমি বোধহয় খুব চরিত্রবান। কিন্তু যখনই একটু খোঁজ নেয়, অমনি আমার অতীতটা সামনে চলে আসে। এক লহমায় আমি হয়ে যাই এক 'চরিত্রহীন' নারী।"
রুশম একটুও বিচলিত হলো না। সে শান্ত গলায় বলল, "ডিভোর্সি হলেই কেউ কোনোদিন চরিত্রহীন হয় না।"
"এই যে আমি হয়েছি, আমার মতো হাজারো নারী প্রতিদিন হচ্ছে।"
"আমাদের সমাজটা ভালো নয় মেহনাজ।"
"সমাজের দোষ দিয়ে লাভ কী? আসল সমস্যা তো মানুষের মেন্টালিটিতে।"
রুশম এবার একটু ঝুঁকে এল। গাঢ় স্বরে বলল, "ঠিক ধরেছেন। আর আমার মেন্টালিটি ওই মানুষগুলোর মতো নয় বলেই আপনাকে আমি পছন্দ করি।"
মেহনাজ এবার কঠোর হলো। "নিজের সীমানা ছাড়াবেন না রুশম সাহেব। আচ্ছা, আপনার কি একটুও লজ্জা লাগে না? আপনি একজন পর্দাশীল নারীর পর্দা নষ্ট করছেন। বলুন তো, ধর্মের কোন বিধানে একজন পর-পুরুষের সঙ্গে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলার বৈধতা আছে?"
রুশম সরাসরি মেহনাজের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল, "পর-পুরুষের সঙ্গে কথা বলার কোনো বৈধতা নেই, আমি জানি। তবে—বিয়ে করবেন আমাকে? বৈধতা পাওয়ার তো এছাড়া আর কোনো পথ নেই।"
রুশমের মুখ থেকে বের হওয়া কথাটা যেন তপ্ত সিসার মতো মেহনাজের কানে এসে লাগল। সে যেন আকাশ থেকে পড়ল! চারপাশের শব্দ, বাতাসের হাহাকার—সব যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। মেহনাজের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেছে। সে ভাবতেও পারেনি এই বখাটে ছেলেটা হুট করে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসবে। তার বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করে কাঁপছে। ঘৃণা, বিস্ময় আর এক অদ্ভুত অপমানে তার শরীর রিরি করে উঠল।
মেহনাজ নিজেকে সামলে নিয়ে অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি নেশা করেছেন?"
রুশম নির্বিকার। "নাহ!"
"আপনি অবশ্যই নেশা করেছেন। কাণ্ডজ্ঞান হারিয়েছেন বলেই এমন কথা আপনার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে। দয়া করে বাসায় যান আর বেশি করে লেবু পানি খান। আপনার মাথা ঠিক নেই।"
চলবে,