ফন্ট সাইজ:
থিম:
চলো নিরালায়

৭ম পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#চলো_নিরালায়

#তেজরিন_উম্মীদ

(৭)

⛔প্রকার কপি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ⛔

সারাদিন বিদ্যুৎহীন পুরো এলাকা।যান্ত্রিক শহরের এই বহুতল ভবনগুলো তখন যেন এক একটা পাথুরে গুহা।যদিও এই বিল্ডিং এ জেনারেটর আছে কিন্তু,জেনারেটরটাও ঠিক এই মোক্ষম সময়েই নষ্ট গেছে, যেন ভাড়াটিয়াদের ভোগান্তি বাড়িয়ে এক পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে সে। সেই তপ্ত গুমোটের ভেতর দিয়ে ভারি গিটার কেসটা কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল ছেলেটি। হলদেটে রঙের সেই গিটারটা ওর পিঠের ওপর এক বিষণ্ণ বোঝার মতো ঝুলে আছে।

কয়েক তলা খাড়া সিঁড়ি টপকে আসার পরিশ্রমে ওর শ্বাস এখন ভারী। কপালে জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলো অবাধ্য হয়ে ললাট বেয়ে নামছে, ঘামে ভেজা চুলের গুচ্ছ লেপ্টে আছে চোখের ওপর। তবুও ওর চাউনিতে কোনো বিরক্তি নেই, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা আর অনুভূতিহীন স্থবিরতা লেগে আছে সেখানে।

ঠিক মাঝপথে দেখা হলো রাকিব মারওয়াতের সঙ্গে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর চোখে চশমা আঁটা মার্জিত চেহারার এক প্রৌঢ়। সিঁড়িতে এই আগন্তুককে দেখে রাকিব সাহেব থামলেন, কৌতূহলী চোখে চেনার চেষ্টা করলেন নিজের ভবনের এই ভাড়াটিয়াকে। কিন্তু ছেলেটির চোখেমুখে সৌজন্যের কোনো লেশমাত্র নেই। সাধারণত বড়দের সামনে পড়লে এ শহরের মানুষ যে নূন্যতম সালাম বা কুশল বিনিময়টুকু করে, ছেলেটি তার ধার ধারল না। সে যেন এক নিস্পৃহ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

রাকিব সাহেব কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, "তুমি কয় তলায় থাকো?"

ছেলেটি ঠোঁট খুলল না। কেবল হাতের আঙুল তুলে ইশারায় বুঝিয়ে দিল—সপ্তম তলা। ওর নির্বাক ভঙ্গি দেখে রাকিব সাহেবের মনে সংশয় জাগল। তিনি নরম স্বরে শুধালেন, "তুমি কি কথা বলতে পারো না?"

এবার ছেলেটি সরাসরি ওঁর চোখের দিকে তাকাল। কোনো রকম দ্বিধা বা জড়তা ছাড়াই সোজাসুজি উত্তর দিল, "সবার সাথে বলি না।"

উত্তরটা শুনে রীতিমতো অবাক রাকিব সাহেব। বিনয়হীন এই ছেলেটি তাঁর পরিচয় জানে,ছেলেটি জানে না সে এইবারের বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলছে। তবে ছেলেটির ভাবভঙ্গি বলে দিচ্ছে—জানলেও হয়তো ওর অভিব্যক্তিতে বিন্দুমাত্র হেরফের হতো না। খানিকটা অবাক হয়ে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "নাম কী তোমার?"

"নাম নেই।"

সংক্ষিপ্ত এবং রুক্ষ উত্তরটি দিয়েই ছেলেটি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। রাকিব সাহেবকে এক প্রকার অবজ্ঞায় পাশ কাটিয়ে সে দীর্ঘ কদমে ওপরে উঠে গেল। স্তম্ভিত রাকিব সাহেব শুধু ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন—ছেলেটা বড্ড বেয়াদব।

---

মেহনাজের জীবনটা যেন এক অতলান্ত নীল সমুদ্র, যেখানে সে একলা নাবিক। দিকবিদিকহীন সেই নোনা জলের তোড়ে সে শুধু সাঁতরে চলেছে, কিন্তু কূলের দেখা নেই। তার পালের দড়ি ছিঁড়ে গেছে অনেক আগেই, সঙ্গী বলতে কেবল একরাশ বিষাদ। বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার পাহাড় সমাণ ভার তার পিঠের ওপর চেপে বসেছে, অপমানের প্রতিটি শব্দ তীরের মতো বিঁধে থাকে তার বুকে। তবুও, এই ঘোর অমানিশার মাঝেও তার বিশ্বাসের প্রদীপটি নেভেনি। সে জানে, তার মহান আল্লাহ তাকে দুহাত ভরে এখন দিচ্ছেন না ঠিকই, কিন্তু নিশ্চয়ই কোনো এক দিন তাকে নিরাশও করবেন না।

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় যখন পৃথিবী জেগে ওঠে, মেহনাজ তখন জায়নামাজে।নামাজ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করেছি। এরপর ছোট উমাইজার হাত ধরে ছাদে একটু পায়চারি। ছাদের এককোণে নিজের হাতে গড়া ছোট্ট এক টুকরো সবুজ বাগান তার—কয়েকটা সবজি গাছ,সাথে কিছু ফুলগাছ আছে। সেগুলোতে পানি দিতে দিতে উমাইজার খিলখিল হাসি বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়। সেই হাসিটুকুই মেহনাজের টিকে থাকার একমাত্র রসদ।

মেহনাজদের বাড়ির ঠিক পাশেই মেজো চাচার দোতলা দালান। দুই ছাদ যেন গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে, চাইলেই ওপার থেকে এপারে আসা যায়। হঠাৎ মেহনাজ দেখল তার চাচি রিক্তা সেখানে দাঁড়িয়ে। চাচি নিজেই আগ বাড়িয়ে কথা বললেন,

“কিরে, আজকে যাস নাই স্কুলে?”

মেহনাজ বিনয়ের সাথে জানাল, “আজ তো স্কুল বন্ধ চাচি।”

“ওহ আইচ্ছা!” রিক্তা বিড়বিড় করলেন। কিন্তু আসল কথাটি পেটে চেপে রাখতে পারলেন না। একটু নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “সমুদ্রর লগে কথা-টথা হয় নাই তোর?”

এক মুহূর্তের জন্য মেহনাজ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বুকটা সামান্য কেঁপে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “নাহ্ চাচি।”

রিক্তা বোধহয় ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আবার শুধালেন, “ও যাওয়ার পর থেকে একদিনও হয় নাই?”

“নাহ্!” মেহনাজের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

“আইচ্ছা! ও মনে হয় ফিরব কয়েকদিনের মধ্যে। ভাবতাছি এবার ওর বিয়াটা দিয়া দিমু। বয়স তো ম্যালা হইলো।”

কথাগুলো কেন তার দিকে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, মেহনাজের তা বুঝতে বাকি নেই। প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা ধারালো কাঁচের টুকরো। তবুও সে মৃদুস্বরে শুধু বলল, “হুম।”

রিক্তা আর কিছু না বলে চলে গেলেন। মেহনাজ তার মেয়ের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চাচির এই অযাচিত সন্দেহ আর বাঁকা কথাগুলো তার আত্মসম্মানে বিষের মতো জ্বালা ধরায়। সে জানে, কথা বাড়ালে কেবল গ্লানিই বাড়বে। তাই মৌনতাকেই সে তার বর্ম করে নিয়েছে।

ছুটির দিন বলে আজ আর স্কুলের তাড়া নেই। উমাইজার জন্য সকালের নাস্তা বানিয়ে মা-মেয়ে মিলে মেতে উঠল তাদের ছোট্ট চিলেকোঠা গোছাতে। বাইরের পৃথিবীটা যতই নিষ্ঠুর হোক, এই ছোট্ট ঘরটাই মেহনাজের পরম আশ্রয়, তার একার পৃথিবী।

বিকেলের মেহনাজের ব্যস্ততা বাড়ে।প্রতিদিন তিনটে বাচ্চাকে পড়াতে হয় তাকে—নিজের আদরের ভাতিজা রোহান, আর দুই ভাইবোন ইমরান ও ইরা। তবে আজ ইমরান আর ইরার আসার কথা নেই, তাই পড়ানো হবে কেবল রোহানের ওপর। ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গেলেও রোহানের দেখা না পেয়ে মেহনাজ দোতলা থেকে নিচে নেমে এল তাকে ডাকতে।

নিচে পা রাখতেই সে থমকে গেল। ড্রয়িংরুমটা লোকে লোকারণ্য, চারদিকে রঙিন বেলুনের বাহার আর উৎসবের সাজ। পুরুষ,মহিলার ভিড় দেখে মেহনাজ দ্রুত গায়ের ওড়না দিয়ে নিজেকে আগলে নিল। অস্বস্তি এড়াতে সে দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের কোণে আশ্রয় নিল। সেখানে চম্পা ভাবি ব্যস্ত হাতে মেহমানদের জন্য শরবত গুলছেন। পরনে তার জমকালো ভারি শাড়ি, চম্পার কিছুটা স্থূলকায় তাকে একটু অদ্ভুত দেখাচ্ছে।

মেহনাজকে দেখে চম্পা ভ্রু কুঁচকে শুধালো, “তুমি এই সময়ে নিচে কেন?”

“রোহানকে পড়ার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু বাড়িতে এত মানুষ কিসের ভাবি?” মেহনাজের কণ্ঠে কৌতূহল।

চম্পা সংক্ষিপ্ত আর নিরুত্তাপ গলায় বললেন, “এমনিই! তুমি যাও, রোহান আজ পড়বে না।”

মেহনাজের বুঝতে বাকি রইল না যে আজ বিশেষ কিছু। হঠাৎ তারিখটার কথা মনে পড়ল—আজ তো রোহানের জন্মদিন! নিজের ভাতিজার জন্মদিনের কথা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল? নাকি তাকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে? এক চিলতে তেতো হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটে। হয়তো সে এই জাঁকজমকপূর্ণ আসরে উপস্থিত থাকলে বাড়ির লোকের মান-সম্মান ধুলোয় মিশত।

এমন সময় সেখানে মেহনাজের বড় ভাই বাহারাজ ঢুকলেন। বোনকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আলগোছে বললেন, “কিরে, তুই এমন সাদাসিধে কেন? যা, তৈরি হয়ে আয়!”

বাহারাজের কথা শেষ হতে না হতেই চম্পা তাকে সজোরে একটা চিমটি কাটলেন, চোখেমুখে ইশারা করলেন যেন আর কথা না বাড়ায়। চম্পার এই চাতুরি মেহনাজের নজর এড়ালো না। সে নিচু স্বরে স্বামীকে ফিসফিস করে বলল, “একে আবার ডাকছ কেন?”

মেহনাজ ম্লান হেসে বাহারাজকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমি থাকলে তোদের সম্মানে টান পড়বে রে ভাই! আমার আসার দরকার নেই। তোর বউয়ের প্রিয় মানুষরা থাকলেই চলবে।”

সে চলে যাওয়ার উপক্রম করতেই চম্পা চড়া সুরে বলে উঠলেন, “কথার খোঁচা মারছ কেন মেহনাজ?”

মেহনাজ শান্ত স্বরে জবাব দিল, “খোঁচা দিইনি ভাবি। আপনার প্রিয়র তালিকায় যে আমার নাম নেই, তা তো জানাই কথা। তাই তো নিজের ভাতিজার জন্মদিনে দাওয়াতটুকুও জুটল না। যাক সেসব! দাওয়াত দিলেও হয়তো আমি আসতাম না,এসব জন্মদিন তন্মদিন আমার পছন্দ না।দাওয়াত না দিয়ে ভালো করেছেন নয়তো আপনি আবার অপমানিত হতেন। আসি ভাবি!”

মেহনাজ ধীরপায়ে ওপরে চলে এল। পেছনে ফেলে এল চম্পার বিষাক্ত চাহনি। মেহনাজের এই স্পষ্টবাদিতা আর ধারালো কথাগুলো চম্পার সহ্য হয় না।

সত্যিই যদি দাওয়াত পেত, মেহনাজ আসত না। কিন্তু আপনজনদের এই অবহেলা বুকটার কোথাও যেন আলপিন ফুটিয়ে দিয়ে গেল। তবে সে বিষাদ মনে চেপে রাখল না। এই সংসারে থাকতে হলে মনের চামড়াটা একটু মোটা করে নিতে হয়; গায়ে না মাখলে কিছুই না, আর মাখলেই সব বিষ।

রাত বারোটার দিকে মেহনাজ পা টিপে টিপে নিচতলায় নেমে এল। কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই, উৎসবের অবশিষ্টাংশ হিসেবে ড্রয়িংরুমে পড়ে আছে দু-একটা ফাটা বেলুন আর স্তব্ধতা। বাহারাজ আর চম্পা তখন সোফায় বসে উপহারের মোড়ক উন্মোচনে ব্যস্ত। মেহনাজ ধীরপদে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

"রোহান কি ঘুমিয়ে পড়েছে?" মেহনাজের কণ্ঠে একরাশ মমতা।

চম্পা তার উপস্থিতিকে পাত্তাই দিলেন না, মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বাহারাজ ঘাড় ঘুরিয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, "হ্যাঁ রে, ও তো কখন ঘুমিয়ে কাদা। তোর কোনো কাজ আছে?"

মেহনাজ হাত বাড়িয়ে একটি ছোট প্যাকেট এগিয়ে দিল। "এটা ওকে দিস। আমার পক্ষ থেকে ওর জন্মদিনের সামান্য উপহার।"

কথা শেষ হওয়ার আগেই চম্পা এক প্রকার ছোঁ মেরে প্যাকেটটা কেড়ে নিলেন। অত্যন্ত উৎসুক হয়ে মোড়ক ছিঁড়ে ভেতরে উঁকি দিলেন তিনি। ভেতরে একটি প্যান্ট আর একটা সাধারণ টি-শার্ট। দেখে বোঝা যাচ্ছে,বেশি দামি না । চম্পা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মুখ বাঁকিয়ে বললেন, "দিবা যখন, একটু দামি দেখেই দিতা! এমন ফকিন্নি মার্কা কাপড় দিলা কেন? আমার ছেলে তো এসব সস্তা জিনিস গায়েই দেয় না!"

চম্পার এই তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে মেহনাজ আহত হলো না, বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষণ্ণ হাসির রেখা। বাহারাজ বোনের ম্লান মুখ দেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় বলে উঠল, "আরে না মেহু, জামাটা তো দারুণ হয়েছে! তোর ভাবি তো এমনিই মজা করছে।"

মেহনাজ শান্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো অভিমান নেই, কেবল ধ্রুব সত্যের সুর। সে বলল, "ভাবি যে মজা করছে তা আমি জানি রে ভাই, তোর আর সাফাই গাইতে হবে না। আর ভাবি, রোহানের ফুপি তো আর বড়লোক নয়। যা দিয়েছে, তা কেবল ওর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই দিয়েছে।"

মেহনাজ আর কথা না বাড়িয়ে ওপরে নিজের আশ্রয়ে ফিরে চলল।

--

।লতা বেগম সকাল থেকেই ফুঁসছেন। ছেলে রুশমের অদ্ভুত জেদ আর এই তথাকথিত 'চাকরি' কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। লতার বিরক্তির কারণটা নেহাত অমূলক নয়। রাকিব মারওয়াতের প্রতাপ এ শহরে কম নয়—হাইওয়ের ধারে বিশাল দুটি পাম্প, সাথে জমজমাট ওয়ার্কশপ। মাসের শেষে সেখান থেকে আসা আয়ের অঙ্কটা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। এছাড়া সিন্ডিকেটের ব্যবসা আর শহরের বুকে দুটি দশ তলা অট্টালিকা তো আছেই। এমন বিত্তশালী বাবার একমাত্র ছেলে কিনা শেষমেশ পাড়ার এক সাধারণ প্রাইভেট স্কুলে মাস্টারি করে বেড়াবে?

আত্মীয়-স্বজনদের ফোন কল আর বাঁকা প্রশ্নে লতা অতিষ্ঠ। তাদের কৌতুকমাখা জিজ্ঞাসাগুলো লতাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। মানুষের কথা শুনলে মাঝে মাঝে লতার মনে হয়, রুশম বুঝি শিক্ষকতা নয়, কোনো মস্ত বড় অপরাধ করে ফেলেছে।

আজ সকালেও যখন রুশম পরিপাটি হয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছিল, লতা বাধা দিলেন। শুরু হলো মা-ছেলের তুমুল বাগবিতণ্ডা। কিন্তু রুশম ধাতুতে গড়া মানুষ; মায়ের কোনো বারণ, কোনো উপদেশের তোয়াক্কা না করেই সে নির্বিকার চিত্তে বেরিয়ে গেল। অবাধ্য ছেলের ওপর শাসন না খাটলে যা হয়, লতার সমস্ত পুঞ্জীভূত রাগ গিয়ে পড়ল রাকিব মারওয়াতের ওপর।

রাকিব সাহেব তখন ব্যবসার কাজে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। লতা সামনে এসে দাঁড়ালেন রণচণ্ডী মূর্তিতে।

"আপনার ছেলে কী করে বেড়াচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন না? এসব পাগলামি আপনি কীভাবে সহ্য করছেন?" লতার গলায় ঝাঁঝ।

রাকিব সাহেব চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে শান্ত গলায় বললেন, "জানোই তো লতা, ও তো জন্মগতভাবেই একটু আধপাগলা। আর পাগলে তো পাগলামিই করবে, তাই না?"

"অযথা রসিকতা বন্ধ করুন! রুশম যা করছে সেটা কোনো স্বাভাবিক পাগলামি নয়। ওকে বোঝান একটু।"

রাকিব সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "পাগলে তো মানুষের ভাষা বোঝে না বেগম!"

রাকিব সাহেবের গলায় এরকম অবহেলার সুর পছন্দ হলো না লতার।

"রুশমের আব্বু!" লতা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠলেন।

"আহা, রাগছ কেন লতা বেগম?"

লতা এবার সরাসরি আঙ্গুল তুলে সাবধান করে দিলেন, "আপনি আমার সামনে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের হিমুর বাবা’র মতো ভাব নেবেন না ভুলেও! কিংবা সেই শুভ্র’র বাবার মতো অদ্ভুত দার্শনিক কথা বলবেন না। আপনার এই উদাসীন চালচলন আমার একদম পছন্দ নয়।"

রাকিব সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। "কেন লতা? আমার ছেলেকে তোমার কোনো দিক থেকে নায়কদের চেয়ে কম মনে হয়? খোঁজ নিয়ে দেখো,সে কত ললনার মনে তান্ডব চালাচ্ছে!"

লতা বেগম অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন রাকিব মারওয়াতের দিকে। সংসারে কোনো জটিলতা বা ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ করতে এলেই এই লোকটা এমন এক রহস্যময় আর দার্শনিক রূপ ধারণ করেন যে লতার পিত্তি জ্বলে যায়। লতার রাগী মুখ দেখে রাকিব সাহেব প্রথমে একটু হাসলেন, পরক্ষণেই চেহারায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বললেন,

"লতা, যে ছেলে বারোটার আগে ঘুম থেকে উঠত না, সে এখন ঘড়ির কাঁটা ধরে সকাল সাতটায় ডিউটিতে ছুটছে। যার কাছে চাকরি মানেই ছিল স্রেফ 'গোলামি', সে এখন নিজ ইচ্ছায় স্কুলে ঘাম ঝরাচ্ছে।আমি ওকে কয়েকদিন দেখেছি, কড়া রোদের মাঝে ওই ল্যাবরেটরি গলির মোড়ে ও দাঁড়িয়ে আছে কারও অপেক্ষায়।যে একটু গরম সহ্য করতে পারতো না সে এভাবে রোদে পুড়ে দাঁড়িয়ে থাকতো কারো অপেক্ষায়, এখন আবার চাকরিও করছে। তোমার কাছে ব্যাপারটা একবারও অদ্ভুত ঠেকেনি?"

লতা ভ্রু কুঁচকে বললেন, "কী বলতে চাচ্ছেন সরাসরি বলুন তো!"

রাকিব সাহেব নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বললেন, "প্রেমে পড়েছে তোমার ছেলে!"

"কীহ্!" লতার চিৎকার করে উঠলেন।

রাকিব সাহেব হাত নেড়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন, "আহা, অত চিৎকার করার মতো কিছু বলিনি আমি। খুব সাধারণ কথা—রুশম প্রেমে পড়েছে।"

"আপনি বুঝলেন কী করে?" লতার কণ্ঠে অবিশ্বাস।

রাকিব সাহেব একটু মুচকি হেসে বললেন, "তোমার প্রেমে পড়ার পর আমার ভেতর ঠিক যে যে লক্ষণগুলো দেখা দিয়েছিল, অবিকল সেই লক্ষণগুলোই আমি আমার ছেলের ভেতর দেখতে পাচ্ছি। একই নৌকার মাঝি তো, তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি।"

লতা কপালে হাত দিয়ে বলল,

"এক টেনশনে বাঁচি না, আপনি আবার নতুন আরেক টেনশনের কথা শুনিয়ে দিলেন!"

"এখানে টেনশনের কিছু নেই লতা। ছেলে বড় হয়েছে, মন তো কাউকে দিতেই পারে। দুদিন পর বিয়ে দিয়ে দেব, ল্যাঠা চুকে যাবে।"

লতা এবার আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন, "বললেই হলো শেষ? কার প্রেমে পড়েছে, কেমন মেয়ে, তার বংশ-মর্যাদা কী—কিচ্ছু তো জানি না! আপনার ছেলে তো এক নম্বরের বজ্জাত; যা মাথায় চাপে তাই করে। কোনোদিন দেখবেন না জানিয়েই এক মেয়েকে ঘরে তুলে নিয়ে হাজির হয়েছে।"

"শোনো লতা, সংসারটা কিন্তু মানুষের বংশ বা পরিচয় দিয়ে চলে না, চলে মানুষের ‘মন’ দিয়ে। বংশ দেখে হয়তো আভিজাত্য মেলে, কিন্তু সুখ মেলে না। আমার ছেলে যাকে পছন্দ করবে, তার পরিবার কত বড় বা তার ধমনীতে কার রক্ত বইছে—তার চেয়েও জরুরি হলো মেয়েটার চরিত্র আর মন। রুশম যদি একটা পাথরের সঙ্গেও সংসার করতে চায়, আর সেই পাথরের ঘষায় যদি ওর জীবনটা ম্লান না হয়ে আরও উজ্জ্বল হয়, তবে সেই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ পুত্রবধূ। দিনশেষে মানুষ তো আর সার্টিফিকেট বা বংশলতিকা নিয়ে ঘুমোতে যায় না, সে পাশে একজন বিশ্বস্ত মানুষকে চায়।"

--

স্কুলের টিফিন ব্রেক শেষ হতেই ব্যস্ততা কমে এসেছে করিডোরগুলোতে। শিক্ষকরা একে একে নিজ নিজ ক্লাসে ফিরে গেছেন। এই সময়টুকু মেহনাজের জন্য কিছুটা অবসরের; কোনো ক্লাস নেই। নতুন শিক্ষক হিসেবে রুশমেরও এই পিরিয়ডটা ফাঁকা পড়ে যায়। সেও এসে বসল স্টাফ রুমে।

মেহনাজ নিজের ডেস্কে নিশ্চুপ বসে ছিল। তার ভাবনার আকাশ জুড়ে কেবল ছোট্ট উমাইজা। স্মার্টফোনটা চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে সে এক চরম অস্থিরতায় দিন কাটাচ্ছে। আগে সিসিটিভি ক্যামেরায় অন্তত চোখ বুলিয়ে মেয়েটাকে দেখে নিতে পারত, এক পশলা স্বস্তি জুটত মনে। এখন সারাক্ষণ একটা অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে—না জানি মেয়েটার কিছু হলো কিনা।মনে মনে সে হিসাব মেলাচ্ছে, কত দ্রুত কিছু টাকা জমিয়ে আবার একটা ফোন কেনা যায়।

রুশম নিজের ডেস্কে এসে বসল। রুমাল দিয়ে হাতদুটো আলতো করে মুছে ডেস্কে ভর দিয়ে হাতের তালুতে চিবুক রাখল সে। তারপর সরাসরি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল মেহনাজের দিকে। মেহনাজ ঘাড় নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলেও ঠিকই টের পাচ্ছিল—বিপরীত দিক থেকে এক জোড়া গভীর চোখ তাকে বিদ্ধ করছে।

এমন সময় মেহনাজের মনে পড়ে গেল পর্দার বিধান আর পরপুরুষের কুদৃষ্টি নিয়ে ইসলামের সেই অমোঘ সতর্কবাণী। লালসা বা অনধিকার দৃষ্টির ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবে মেহনাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তিক্ত অথচ শান্ত হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে জপ করল, "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছি)।

তারপর মুখ না তুলেই মেহনাজ শান্ত স্বরে বলল, "আপনি কি জানেন,একজন নারী দিকে এভাবে তাকিয়ে আপনি নিজের আমলনামায় কতটা গুনাহ জমা করছেন?"

রুশমের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সে জবাব দিল, "ঠিক এ কারণেই তো বলছি, চলুন নিকাহ করে ফেলি! তাহলে আর গুনাহর ভয় থাকবে না, সবটুকুই সওয়াব হবে।"

মেহনাজ কোনো প্রতিউত্তর করল না। সে জানে, কথার পিঠে কথা বাড়ালে এই ধড়িবাজ ছেলেটি আরও পেয়ে বসবে। মৌনতাকেই সে শ্রেষ্ঠ অস্ত্র হিসেবে বেছে নিল।

খানিক বাদে রুশম একটু ঝুকে এসে মোলায়েম সুরে আবার বলল, "আমি জানতাম পরিরা সাত আসমানের ওপরে থাকে। কিন্ত আপনি এই জমিনে কি করছেন মাস্টারনী?"

রুশমের উপস্থিতিতে মেহনাজের মেজাজ চট করে তপ্ত হয়ে ওঠে। তার সামনে বসে থাকা এই জলজ্যান্ত মানুষটার ফালতু কথাগুলো সহ্য করা মেহনাজের জন্য রীতিমতো পরীক্ষা। রুশমের সাথে কথা বলার সময় তার গলার সুরে আগ্নেয়গিরির তেজ খেলা করে। সুরমা আঁকা বাদামি চোখের সেই ঘন পাপড়ির আড়ালে লুকানো থাকে একরাশ ক্রোধ।

মেহনাজ দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে জবাব দিল, “কারণ আমি ডাইনি।”

রুশম বরাবরই সরাসরি মেহনাজ এর চোখে চোখ কথা বলে।এবং এটা সে তীব্র অধিকার বোধ নিয়ে করে।অন্যদিকে কোনো পরপুরুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকানো মেহনাজের স্বভাবে নেই, এটা তার কাছে প্রচণ্ড অস্বস্তিকর।তাইতো দৃষ্টি অন্যদিকে।

রুশম মৃদু হেসে বলল, “বাহ্, মিস মেহনাজও দেখছি মজা করতে পারেন!”

মেহনাজ কোনো উত্তর দিল না। নীরবতা ভাঙতে রুশম আবার বলে উঠল, “জানেন, আমার বুকের বাঁ পাশে খুব যন্ত্রণা হয়! জিজ্ঞেস করুন তো কেন?”

মেহনাজ পাথরের মতো নিথর বসে রইল। রুশম নাছোড়বান্দা, “আরে জিজ্ঞেসই করুন না একবার!”

“কেন?” মেহনাজের কণ্ঠে চূড়ান্ত অনীহা।

রুশম নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, “কারণ ওখানে আপনার বসতি!”

মেহনাজ এবার এক পলক তাকিয়েই তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “এই তো, ভালো বুঝেছেন! আমি যে আপনার জন্য ক্ষতিকর, সেটা বুঝতে পারার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”

রুশম ভেবেছিল তার এই ফিল্মি ডায়ালগে কাজ হবে, কিন্তু উল্টো নিজেই নিজের জালে ফেঁসে গেল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গলা খাঁকারি দিল। তারপর হাল না ছেড়ে গেয়ে ওঠার সুরে আবোলতাবোল ছড়া কেটে বসল,

❝পেট ভরা গোস্ত, বুকে বড় কষ্ট,

আপনার প্রেমে পড়ে আমার মাথা

পুরাই নষ্ট!❞

মেহনাজের মুখাবয়বে বিরক্তির গাঢ় মেঘ ছেয়ে গেল। রুশম এই স্কুলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার অর্থহীন প্রলাপগুলো মেহনাজকে মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র বলে চড়া গলায় কিছু বলাও দায়,কে কোত্থেকে শুনে কি মনে করে বসবে এর জন্য।সে দাঁতে দাঁত চেপে পাথরের মতো নিরুত্তর বসে রইল।

রুশম দমবার পাত্র নয়। সে এবার নতুন এক চটুল ছন্দ ধরল,“আচ্ছা, আরেকটি শুনুন—

❞বাংলায় বলে তরমুজ,

ইংলিশে বলে ম্যালন;

কবে যে হবে আমাদের মিলন?❞

বলেই সে মেহনাজের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসল। মেহনাজ এবার বিরক্তি চেপে তিলমাত্র না হেসে শুকনো গলায় বলল, “ওহ, কী সস্তা জোক! লোক হাসানোর এতই শখ থাকলে কমেডি শো করতে পারেন, স্কুলে কেন?”

কথাটা বলেই মেহনাজ সময় কাটাতে বাচ্চাদের ক্লাস টেস্টের প্রশ্নপত্র তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রুশমও দমে না গিয়ে ডেস্কের ওপর দুহাত রেখে থুতনি ঠেকিয়ে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল মেহনাজের দিকে। মেহনাজের ওই সুরমা মাখা চোখ দুটো তাকে মারাত্মক টানে। এই গভীর চোখ দুটোই সব সর্বনাশের কারণ। এই চোখ দুটোই তার সব অনিয়মের মূল, তার সকল মন নষ্টের কারণ। মেহনাজের সুরমা দেওয়া কালো চোখের গহীনে এমন এক অতল মায়া আছে, যা রুশমকে বারবার তার সহজাত গাম্ভীর্য ভুলিয়ে এক অদ্ভুত বাউন্ডুলেপনায় বাধ্য করে। সেই চোখের একেকটি পলক যেন রুশমের হৃদপিণ্ডে নতুন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়।

হঠাৎ রুশম মেহনাজের ওই গভীর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে গুণগুণ করে গেয়ে উঠল—

“তোমার চোখে আকাশ আমার,

চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা...ভেতর থেকে বলছে

হৃদয়, তুমি আমার প্রিয়তমা।”

মেহনাজ আর স্থির থাকতে পারল না। রাগে আর তার শরীর রী রী করে উঠল। ইচ্ছে ছিল কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দেওয়ার, কিন্তু পারছে না পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়, তাই সে গজগজ করতে করতে হনহনিয়ে স্টাফ রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

রুশম চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে দুই হাত মাথার নিচে রাখল। মেহনাজের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আপনমনেই বিড়বিড় করল—“আপনার চোখের মায়ায় ডুবে আমি যে অপরাধ করেছি, সেই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ আমাদের যাবজ্জীবন একসাথে থাকার কারাদণ্ড হোক মাস্টারনী!”

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন