ফন্ট সাইজ:
থিম:
চলো নিরালায়

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: তেজরিন উম্মীদ

#চলো_নিরালায়

#তেজরিন_উম্মীদ

৬...

(রিচেক দি নি, কি লিখছি জানি না। ভুল থাকতে পারে লাইন টু লাইন।)

লোহার সিঁড়ির জং ধরা প্রতিটি ধাপে পা ফেলতেই মেহনাজের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনো এক অন্তহীন অতল গহ্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির এক কোণে অযত্নে পড়ে থাকা সেই পুরনো লোহার জং ধরা সিঁড়িটা আজ এক বিষাদময় থিয়েটারের মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেহনাজ নিজেই একমাত্র মূক অভিনয়শিল্পী। ছাদের ওপর সেই ছোট্ট চিলেকোঠা—যেখানে তার পৃথিবী, তার উমাইজা অপেক্ষা করছে।

মেহনাজ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সেই লোহার রেলিং ঘেঁষে। এক পা এগোনোর সাহস তার নিঃশেষ হয়ে গেছে। ওপরের ওই আধো-অন্ধকার ঘরটাতে তার অবুঝ মেয়েটা হয়তো জানলার গ্রিল ধরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, মা ফিরলেই তার ক্ষুধার্ত পেটে অন্ন জুটবে। কিন্তু মেহনাজের দুই হাত আজ শূন্য, পকেট রিক্ত। কী নিয়ে দাঁড়াবে সে ওই উজ্জ্বল দুটো চোখের সামনে? তার তখন কেমন অনুভূতি হবে? যখন উমাইজা তার আঁচল ধরে টানবে? পৃথিবীর সমস্ত বাতাস যেন মেহনাজের ফুসফুসে এসে আটকে যাচ্ছিল, এক অসহ্য ভারী পাথর চেপে বসেছে তার বুকের ওপর। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই শূন্যতা নিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেয়ে এই সিঁড়িতেই পাথর হয়ে জমে যাওয়া সহজ।

মেহনাজ দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে ফুস করে বাতাস ছাড়ল, যেন ভেতরের হাহাকারটুকু বের করে দিতে চাইল। নিজের ভেতরে সমস্তটুকু সাহস সঞ্চয় করে সে লক খুলে ভেতরে পা রাখল।

বিছানায় উমাইজা একা একা খেলছিল। ছোট্ট মেয়েটা বড় শান্ত, বড় লক্ষ্মী। অন্য বাচ্চাদের মতো সে কখনো বায়না ধরে না, অযথা কান্নাকাটি করে মাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে না। মায়ের অভাব আর টানাটানির সংসার যেন এই কচি বয়সেই তাকে এক অদ্ভুত পরিণতবোধ উপহার দিয়েছে।

মেহনাজ ঘরে ঢুকতেই তার ছোট্ট পাখিছানাটা খিলখিলিয়ে হেসে দৌড়ে এল। দুই হাতে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে মুখ তুলে তাকাল সে। ওই এক চিলতে হাসিতে মেহনাজের কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল। উমাইজাকে কোলে তুলে নেওয়ার মতো শক্তি বা মানসিক জোর—কোনোটাই আজ অবশিষ্ট নেই মেহনাজের। সে আলতো করে উমাইজাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বোরখা খুলতে শুরু করল। ছোট্ট উমাইজা মায়ের থমথমে মুখ দেখে থমকে গেল। সে বুঝতে পারল, তার আম্মির মন আজ ভালো নেই। তাই কোনো কথা না বাড়িয়ে সে গুটিগুটি পায়ে আবার বিছানায় গিয়ে বসল।

মেহনাজ যখন দেয়ালে বোরখাটা ঝোলাচ্ছিল, তখনই পেছন থেকে উমাইজার ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ ভেসে এল—"আম্মি, কুদা নাগছে। তুমি আচকে দুদু আনোনি? আতকে কি খিচুলি রাধবে?"

মুহূর্তেই মেহনাজের সারা শরীর জমে বরফ হয়ে গেল। রগ দিয়ে বয়ে যাওয়া রক্ত যেন হিমশীতল স্রোতে পরিণত হলো। সে ধীরে ধীরে ঘুরে মেয়ের দিকে তাকাল, কিন্তু কথা বলার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি খুঁজে পেল না। একটা বাচ্চার ক্ষুধার্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কোনো শব্দ অভিধানে থাকে না। মেহনাজের মনে হলো, এই মুহূর্তে সে দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় নারী। এতটাই রিক্ত যে, নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে একমুঠো অন্ন দেওয়ার সামর্থ্যও তার নেই।

বাকরুদ্ধ মেহনাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। নিজেকে সামলাতে সে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ঠান্ডা পানির ঝাপটায় নিজের ভেতরের দহন নেভানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। ওযু করে বের হয়ে সে সোজা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। সে জানে, উমাইজা আবার প্রশ্ন করবে। সেই প্রশ্নের চাবুক থেকে বাঁচতে সে এখন স্রষ্টার দরবারে সিজদাহকেই একমাত্র ঢাল হিসেবে বেছে নিল। উমাইজা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল তার মায়ের দিকে, যে মা আজ ক্ষুধার অন্ন নয়, বরং বুকফাটা হাহাকার নিয়ে জায়নামাজে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।

মেহনাজের জগত এখন এক জায়নামাজে সীমাবদ্ধ। যোহরের আযান হওয়ার পর থেকেই তার ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে ছিল। এখন সিজদায় লুটিয়ে পড়তেই সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। প্রতিটি সিজদা সে লম্বা করতে লাগল। কপাল সিজদাবনত হতেই মনে হলো, আর তোলার প্রয়োজন নেই। এই জায়নামাজেই যদি আজ জীবন শেষ হয়ে যায়, তবে হয়তো মেয়ের ক্ষুধার্ত চোখের অবুঝ চাহনি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

মেহনাজ জানে, হাদিসে এসেছে—"বান্দা যখন সিজদারত থাকে, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে" (সহীহ মুসলিম)। সে আল্লাহর কাছে কোনো অভিযোগ করল না। শুধু অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, "ইয়া রাব্বুল আলামীন, তুমি তো জানো আমি কতটা রিক্ত। আমার কাছে না থাকলেও তোমার ভাণ্ডারে তো কোনো অভাব নেই। আমার এই অবুঝ সন্তানটির দায়িত্ব তো তোমারই। তুমি ওকে ফিরিয়ে দিও না।" চোখের অশ্রু ফোঁটায় জায়নামাজের নীল রঙটা গাঢ় হয়ে ভিজে যাচ্ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন,যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ প্রশস্ত করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।(সূরা আত-তালাক: ২-৩)। এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই মেহনাজ আজ নিজের সমস্ত শূন্যতা ঢেলে দিল।

নামাজ শেষ করে মেহনাজ উঠে দাঁড়াল। জায়নামাজটা ভাঁজ করার সময় সে আড়চোখে উমাইজাকে দেখল। মেয়েটা আজ নামাযে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল না, বরং এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। উমাইজা প্রতিদিন মেহনাজের সাথে আধো আধো বোল ফুটিয়ে নামায পড়ার চেষ্টা করে, আজ সে ব্যতিক্রম। মেহনাজ বুঝতে পারল, সে নিজেই মেয়েকে এড়িয়ে চলছে। হয়তো এই রুক্ষতা আর অবজ্ঞা শিশুটির মনে দাগ কেটেছে।

বিছানার চাদরটা হঠাৎ বড্ড ময়লা মনে হলো মেহনাজের। এই অস্থিরতা কাটাতে সে কাজে মন দিতে চাইল। বিছানার দিকে এগোতেই উমাইজা মাথা তুলে তাকাল। এক বুক আশা নিয়ে ভাবল, হয়তো আম্মি এখন আদর করবে। মেহনাজ শুধু শুকনো গলায় বলল,"নামো বিছানা থেকে, চাদর পাল্টাব।"

এই ছোট্ট রুক্ষ কথাটুকু উমাইজার কচি মনে তীরের মতো বিধল। সে কোনো কথা না বলে, বাধ্য মেয়ের মতো বিছানা থেকে নেমে গেল। ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ভেতরে যেন আগুনের হলকা ছুটছে, কিন্তু মায়ের ওই পাথুরে চাহনি দেখে সে আর খাওয়ার কথা বলার সাহস পেল না। মেহনাজের একবার মনে হলো নিচে গিয়ে মা বা ভাবির কাছে একু খাবার চেয়ে আনবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, যারা প্রতিনিয়ত তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, তাদের কাছে হাত পাতার চেয়ে অভুক্ত মরে যাওয়াও ভালো।

চাদরটা টান দিতেই তোষকের কোণে একটা সাদা কাগজের মতো কিছু নজরে এল। মেহনাজ ভ্রু কুঁচকে ওটা টেনে বের করল। হাতে নিতেই তার হার্টবিট যেন মিস হয়ে গেল। এক হাজার টাকার দুটো কড়কড়ে নোট! মেহনাজের হাত কাঁপতে লাগল। এ কী দেখছে সে? এটা কি স্বপ্ন? মেহনাজের ছোটখাটো জিনিস রেখে ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। হয়তো আগের কোনো জমানো টাকা সে বিপদের জন্য রেখে এখানে ভুলে গিয়েছিল। আজ যখন তার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, ঠিক তখনই দয়াময় আল্লাহ তার সেই পুরনো সঞ্চয় সামনে এনে দিলেন। খুশির এক তীব্র জোয়ার মেহনাজের সারা শরীরে বয়ে গেল। তার চোখে আবার জল এল, তবে এবারের জল ছিল অঝোর কৃতজ্ঞতার।

মেহনাজ দ্রুত বোরখাটা গায়ে জড়িয়ে উমাইজাকে কোলে তুলে নিল। পাগলের মতো মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলল, "চল মা, আমরা এখনই খাবার নিয়ে আসি।"

প্রথমে সে বাজারের মোড় থেকে একটি ছোট গ্যাসের সিলিন্ডার রিফিল করে নিল। চাল, ডাল আর উমাইজার জন্য এক প্যাকেট দুধ কিনে প্রায় উড়তে উড়তে বাসায় ফিরলই।ঈদের মতো আনন্দ হচ্ছে মেহনাজ এর।এ অনুভূতি বলে প্রকাশ করার নয়।

রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির সুঘ্রাণ যখন ভেসে আসতে লাগল, উমাইজা দরজায় দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল।

মেহনাজ নিজে আগে উমাইজাকে লোকমা তুলে মুখে দিতে লাগল। তৃপ্তির সাথে মেয়ের খাওয়া দেখে মেহনাজের মনে হলো, সাত রাজার ধন আজ তার হাতের মুঠোয়। খাওয়া শেষে সে পরম মমতায় উমাইজাকে জড়িয়ে ধরল। মনে মনে বার বার বলতে লাগল, "আলহামদুলিল্লাহ"। সত্যিই, আল্লাহ তার বান্দাকে কখনও নিরাশ করেন না।

---

রাকিব মারওয়াত তখন তার শখের ছাদবাগানে বিকালের স্নিগ্ধ আলোয় গাছের পরিচর্যা করছিলেন। বিশাল এই ছাদ জুড়ে নানা প্রজাতির ফলদ আর বনজ গাছের সমারোহ—সবই তার নিজের হাতে লাগানো, নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখা। পাইপ দিয়ে গাছের গোড়ায় পানি ঢালতে ঢালতে তিনি আড়চোখে পেছনে তাকালেন। সেখানে তার গুণধর পুত্র রুশম দাঁড়িয়ে আছে, যার চোখে তখনো রাজ্যের ঘুম আর বিরক্তি মাখামাখি।

রুশমের জীবন দর্শন বরাবরই আলাদা। তার কাছে 'চাকরি' মানেই ছিল অন্যের গোলামি, শেকল পরা জীবন। অথচ আজ সকালে সে নিজেই সেই শেকলে পা দিয়েছে। সারা সকাল অফিসের ঝক্কি সামলে এসে এক চিলতে ভাত-ঘুম দিতে চেয়েছিল সে, কিন্তু বাবার জরুরি তলবে সেই সুখ আর হলো না। হাই তুলতে তুলতে বিরক্ত হয়ে রুশম বলেই ফেলল,

"আব্বু! অযথা আমাকে ঘুম থেকে তুলে আনলে কেন? দিব্যি ঘুমাচ্ছিলাম... ধ্যাত!"

রাকিব সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে একটা ক্যাকটাসের টবে পানি দিলেন। এরপর কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি প্রসঙ্গে এলেন, "শুনলাম চাকরি নিয়েছ?"

রুশম বুঝতে পারল, খবরটা চাউর হতে সময় নেয়নি। সে সরাসরি উত্তর দিল, "হুম, নিয়েছি তো।"

রাকিব মারওয়াত এবার পাইপটা একপাশে রেখে ছেলের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। বিকেলের রোদে তার চশমার কাঁচ চিকচিক করে উঠল।

"তোমার মা, আমার প্রিয় বেগম তো তোমার নামে বিস্তর নালিশ করেছেন। তার মতে তুমি নাকি সস্তা দরে নিজেকে বিক্রি করছ, মেধা নষ্ট করছ। আমি অবশ্য বেগমের মতো তোমাকে বলব না যে চাকরি ছেড়ে দাও। তুমি তোমার পছন্দের কিছু করছ, আমি বরং সেটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করি। নিজের যোগ্যতায় কিছু একটা শুরু করেছ, এটাই বড় কথা।"

বাবার কথায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও রুশম জানে, আসল তীরটা এখনো ছোড়া হয়নি। রাকিব সাহেব এক পা এগিয়ে এসে রহস্যময় হাসলেন, "তবে একটা খটকা লাগছে। যে ছেলে দিনরাত চিল চিৎকার করত যে চাকরি মানে অন্যের দাসত্ব, সেই ছেলে আজ নিজে গিয়ে দাসখত লিখল কেন? কী এমন ঘটল যে তোমার আদর্শ রাতারাতি বদলে গেল?"

রুশম এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, "ইচ্ছে হলো, তাই।"

রাকিব মারওয়াতের অভিজ্ঞ চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। তিনি ছেলের কাঁধে হাত রেখে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, "ইচ্ছেটা কেন হলো রুশম? তোমার মতো জেদি ছেলের সিদ্ধান্ত পাল্টানো কোনো ছোটখাটো বিষয় হতে পারে না, আমি সেটা বুঝি। পাহাড় নড়লেও তোমার মত নড়ত না সহজে। তবে এখন কেন? কিসের টানে এই বদলে যাওয়া?"

রুশম কিছুক্ষণ বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে নজর সরিয়ে নিল। ভেতরের অস্থিরতাটুকু গোপন করে নিস্পৃহ গলায় বলল, "এমনি!"।

রাকিব সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। তিনি জানেন, রুশম যখন মুখ খুলবে না ঠিক করেছে, তখন জোর করে লাভ নেই। তিনি মুচকি হেসে আবার গাছের দিকে মনোযোগ দিলেন। "ঠিক আছে! আসতে

পারো।"

রুশম একটু বাঁকা হেসে বলল, "তোমার জিজ্ঞাসা শেষ? আর প্রশ্ন নেই?"

রাকিব সাহেব পাইপ দিয়ে একটি মানিপ্ল্যান্টের গোড়ায় পানি দিচ্ছিলেন। ছেলের দিকে না তাকিয়েই শীতল কণ্ঠে বললেন, "তোমাকে প্রশ্ন করে আমি আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করার প্রয়োজন বোধ করছি না। তুমি যাহা খুশি করো, আমার কিছু যায় আসে না।"

রুশম ভ্রু কুঁচকে তাকাল, "নিজের ছেলেকে নিয়ে এমন বলছ?"

এবার রাকিব মারওয়াত সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চোখে চোখে রেখে বললেন, "কারণ তুমি একটা অকর্মার ঢেঁকি! নিজের ছেলে বলেই বলছি, তোমার ওপর আমার এতটুকু বিশ্বাস আছে যে তুমি এই চাকরিটা বেশিদিন করবে না।"

রুশম হাসল। বলল, "বদদোয়া দিচ্ছ?"

"না, তোমার বাস্তবতার কথা বলছি," রাকিব সাহেবের কণ্ঠে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। "তুমি জীবনে অনেক হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়েছ, এবং সেগুলোতে বেশিদিন টিকতে পারোনি। প্রতিবারই মাঝপথে তোমার সিদ্ধান্ত বদলে গিয়েছে। তাই বলছি—তোমার দ্বারা হয়তো ভালো কিছু করা সম্ভব, কিন্তু তোমার এখন যে খামখেয়ালি মনোভাব, তাতে তোমার দ্বারা এখন কিছু সম্ভব, তা অসম্ভব।"

--

তন্মনার মেজাজ তখন আসমান ছুঁয়েছে। এমনিতে চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ, তার ওপর লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা। লিফট বন্ধ থাকায় সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তার জান কয়লা হয়ে যাচ্ছে। স্কুলের সাদা ড্রেসটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, কপাল বেয়ে নোনা জলের ধারা নামছে টুপটুপ করে। নিজের মনেই সে বিদ্যুৎ অফিসের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছে। তন্মনা আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো শান্তশিষ্ট বা পরিপাটি নয়; বরং সে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। অগোছালো স্বভাব আর তুঙ্গে থাকা মেজাজই তার পরিচয়। ধাপধাপ করে ভারী পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে তার বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে।

ঠিক চারতলার মোড়ে আসতেই অঘটনটা ঘটল। সিঁড়ি ওঠার সময় কারোর সাথে সজোরে ধাক্কা খেল সে। নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে পড়ল কয়েক ধাপ নিচে। কোমরে এক তীব্র মোচড় দিয়ে ওঠা ব্যথায় সে চিৎকার করে উঠল, "আম্মা গো!"

ব্যথার রেশ কাটতে না কাটতেই তার মনে রাগের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কার এত বড় সাহস যে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়? দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ নয়নে সামনে তাকাতেই তন্মনার চোখ স্থির হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘকায় যুবক। পরনে কুচকুচে কালো হাফপ্যান্ট আর একটি ঢিলেঢালা কালো টি-শার্ট। গায়ের রঙ দুধে-আলতা নয়, বরং তামাটে আভার এক পৌরুষদীপ্ত উজ্জ্বলতা। উষ্কখুষ্ক একমাথা ঘন কালো চুল কপালে এসে পড়েছে, আর কাঁধে ঝোলানো একটি হলদেটে রঙের গিটার। ছেলেটির চেহারায় এক ধরণের উদাসীন আভিজাত্য থাকলেও চোখ দুটো যেন অনেক গভীর কিছু বলছে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মেয়েটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে কাতরাচ্ছে, অথচ ছেলেটির মধ্যে কোনো বিকার নেই। সে কোনো কথা না বলে, সাহায্য করতে এগিয়ে না এসে স্থির দৃষ্টিতে তন্মনার দিকে তাকিয়ে আছে—যেন সে রক্তমাংসের কোনো মানুষ নয়, বরং সিঁড়িতে পড়ে থাকা কোনো জড় পদার্থ দেখছে। ছেলেটির এই নির্বিকার ভঙ্গি তন্মনার রাগের বারুদে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দিল।

ব্যথা সয়ে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল তন্মনা,"এই! চোখে দেখেন না আপনি? কানা নাকি? দেখে চলতে পারেন না? চোখ কি আলমারিতে তুলে রেখেছেন নাকি অন্য কোথাও বন্ধক দিয়েছেন?"

তন্মনার কণ্ঠের তীব্রতায় সিঁড়ির দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। সে আরও এক কদম এগিয়ে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল, "রাস্তার মাঝখানে এভাবে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মানুষের সাথে ধাক্কা খেয়ে ভূত সেজে তাকিয়ে আছেন, সরি বলার শিক্ষাটুকুও কি পাননি?"

ছেলেটি তবুও পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে কোনো নড়াচড়া নেই, চোখের পলকও যেন পড়ছে না। এই নিরবতা তন্মনাকে আরও খ্যাপিয়ে তুলল। সে গলার স্বর আরও এক পর্দা চড়িয়ে বলল,

"এই যে মিস্টার গিটারিস্ট! উত্তর দিচ্ছেন না কেন? সমস্যা কী আপনার? কানে শোনেন না নাকি কথা বলতেও পারেন না? এমন ভাব করছেন যেন আমি বাতাসের সাথে কথা বলছি!"

তন্মনার চিৎকারে সিঁড়িঘর ফেটে পড়ার উপক্রম, কিন্তু সেই রহস্যময় যুবকের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। সে যেন এক জ্যান্ত পাথর, যার কানে তন্মনার কোনো কথাই পৌঁছাচ্ছে না। তন্মনা তার কোমরের ব্যথা ভুলে গিয়ে এবার দুই হাত কোমরে দিয়ে রণমূর্তি ধারণ করল।

"আজব লোক তো! কথার উত্তর দেন না কিল্লিগা? সমস্যা কী আপনার? এখান দিয়ে যে আমি উঠছিলাম দেখতে পাননি আপনি? হ্যাঁ? আমার সাথে ধাক্কা লেগে যে আমি পড়ে গেলাম, আমি ব্যথা পেলাম, এর দায় কার? আপনার জন্য আমার কোমর যদি ভেঙে যেত! এখন আমার যদি বিয়ে না হয়, তবে এর ভার কে নেবে? আপনি?"

তন্মনা একনাগাড়ে বলে চলল।কিন্তু ছেলেটি আবারও নিশ্চুপ। তার সেই ভাবলেশহীন চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তন্মনা এবার ক্ষিপ্ত হয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেল।

"আরে আজব ক্যারেক্টার তো আপনার! এতক্ষণ ধরে কথা বলতেছি, কানে ঢুকতেছে না আপনার? কানে কি তুলা দিয়ে রেখেছেন? যতসব ফালতু লোক..."

তন্মনার কথা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটি এক পলক তার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে রাগ নেই, বিরক্তি নেই, এমনকি কোনো অনুশোচনাও নেই। সে যেন তন্মনাকে পাশ কাটিয়ে বাতাসের মতো নিচে নামতে শুরু করল। কোনো উত্তর না দিয়ে, একটা 'সরি' পর্যন্ত না বলে অবলীলায় তাকে ইগনোর করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে চলে গেল সে।

তন্মনা হা করে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তাকে কেউ এভাবে অগ্রাহ্য করতে পারে, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে স্তম্ভিত হয়ে ছেলেটির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

"কী অভদ্র লোক! একে তো নিজের দোষে ধাক্কা মারল, আমি ব্যথা পেলাম, তারপর না দিল কোনো উত্তর, না চাইল মাফ! অসভ্য একটা। কী আজব! কোত্থেকে যে আসে এসব অদ্ভুত কিসিমের আপদ!"

তন্মনা রাগে গজগজ করতে করতে আবার সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করল। কোমরের ব্যথাটা যেন অপমানের জ্বালায় আরও বেড়ে গেছে।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন