ট্যুর অপারেটরকে ফোন করে স্কিইং ট্রিপটি বাতিল করতে হয়েছিল তাকে। সে ঠিক করেছিল সোমবার সকালে রওনা দেবে এবং সান্দ্রাকে আরেকবার রাজি করানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু যখন সে পরিকল্পনা বাতিল করল, তখন সে না সান্দ্রাকে ফোন করল, না অন্য কোনো বন্ধুকে।
সালার দুপুরে হালকা স্যান্ডউইচ আর এক কাপ কফি খেয়েছিল; তারপর একটা ট্রাঙ্কুইলাইজার খেয়ে ঘুমাতে গেল। পরের দিন সকাল এগারোটায় ঘুম ভাঙল; মাথা ব্যথা প্রচণ্ড। নিজের কপাল আর শরীর ছুঁয়ে দেখল—জ্বরে গা ভাঙা অবস্থা।
“ওহ, আরে ধুর!”—সে বিরক্ত হলো। টানা দুই দিন অসুস্থ থাকার পর, আরো দুই দিন একইভাবে কাটানোর কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না—কিন্তু পরিস্থিতি দেখে সে বুঝল এভাবেই কাটাতে হবে সম্ভবত।
নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে বিছানা থেকে নামল সে, মুখ হাত না ধুয়েই রান্নাঘরে গেল কফি বানাতে। তারপর ফোনের আন্সার সার্ভিসে মিসড কল আর রেকর্ডেড মেসেজ চেক করতে লাগল। সাদ-এর কয়েকটি কল ছিল—সাদ পাকিস্তান যাওয়ার আগে সালারের সাথে কথা বলতে চেয়েছিল এবং সালার কোনো খবর না দিয়ে উধাও হওয়ায় বেশ বিরক্তও হয়েছিল।
সান্দ্রার কলও ছিল—সে ভেবেছিল সালার তার সঙ্গে দেখা না করেই স্কিইং-এ চলে গেছে। সিকান্দার আর কামরানও ফোন করেছিল—তাদেরও ধারণা ছিল সালার কিছু না বলেই রওনা দিয়েছে। আরও কিছু বন্ধু ও ক্লাসমেটও কল করেছিল—যারা ছুটিতে বাড়ি ফিরছিল। সবাই সালারকে ব্যাক কল করতে বলেছিল—এবং সে হয়তো করত, যদি এত অসুস্থ না থাকত। সাদ, সিকান্দার আর কামরানকে পাকিস্তানে ফোন করতে পারত, কিন্তু সে মোটেই সে মুডে ছিল না।
সালার কফির সাথে দুই টুকরো পাউরুটি খেল; তারপর ওষুধ খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল। তার ধারণা ছিল সন্ধ্যার মধ্যে একটু রেস্ট হয়ে জ্বর কমে যাবে।
কিন্তু তার অনুমান পুরো ভুল প্রমাণিত হলো। সন্ধ্যায় ওষুধের ঘুম থেকে উঠে সে দেখল তার শরীর আগের থেকেও বেশি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মুখ-জিভ শুকিয়ে কাঠ, গলা শুকিয়ে ভীষণ ব্যথা, মাথা এবং পুরো শরীরই ব্যথায় অবশ। সম্ভবত এই ব্যথাই তাকে ঘুম থেকে তুলেছিল।
সে উপুড় হয়ে শুয়ে কপাল চেপে ধরেছিল—বুড়ো আঙুল দিয়ে কপালের পাশে মালিশ করে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শেষ পর্যন্ত সব ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ শুয়ে রইল, মুখটা বালিশে গুঁজে। কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল টেরই পেল না—ব্যথা সহ্য করতে করতেই ঘুম নেমে এসেছিল।
আবার ঘুম ভাঙল যখন, তখন পুরো ঘর অন্ধকারে ঢাকা। রাত হয়ে গেছে এবং শুধু তার ঘর নয়—পুরো অ্যাপার্টমেন্ট অন্ধকার। তার অবস্থা আরও খারাপ। বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু শরীরে একটুও শক্তি নেই—হাল ছেড়ে আবার শুয়ে পড়ল। আবারও বুঝল, সে ঘুম আর অচেতনতার মাঝামাঝি কোনো অবস্থায় ডুবে যাচ্ছে।
সে নিজের গোঙানির শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু থামাতে পারছিল না। সেন্ট্রাল হিটিং থাকা সত্ত্বেও শরীর কাঁপছিল অনবরত—কম্বল তাকে গরম রাখতে পারছিল না, আর উষ্ণ কাপড় পরার মতো শক্তিও ছিল না। আবারও বুক আর পেটে তীব্র ব্যথা ছুরির মতো কেটে গেল।
সালারের যন্ত্রণাময় আর্তনাদ আরও বাড়তে লাগল, তীব্র বমিভাব তাকে গ্রাস করল। সে উঠে বাথরুমে যেতে চাইল, কিন্তু নড়ার মতো শক্তি ছিল না। বহু কষ্টে উঠে বসতে পারল, কিন্তু বিছানা থেকে নামার আগেই প্রচণ্ডভাবে বমি করে ফেলল—গত কয়েক ঘণ্টায় যা খেয়েছিল সব বেরিয়ে এলো। আধা-জ্ঞান অবস্থাতেও সে বুঝতে পারছিল জামা আর কম্বল নোংরা হয়ে গেছে, কিন্তু শরীর প্রায় অবশ—গোঙাতে গোঙাতে অস্পষ্ট কথায় বিড়বিড় করছিল।
এ অবস্থাটা কতক্ষণ চলেছিল সে জানে না, কিন্তু মনে আছে—একসময় তার মনে হলো সে মারা যাচ্ছে। জীবনে প্রথমবার মৃত্যুর চিন্তা তাকে ভয় পাইয়ে দিল। সে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইল, ফোন পর্যন্ত পৌঁছাতে চাইল, কিন্তু শরীর নড়ছিল না—জ্বর তার শরীরকে বিছানায় আটকে রেখেছিল।
অবশেষে গভীর রাতে তার জ্বর কিছুটা নেমে গেল, এবং সে প্রায় অচেতন অবস্থার ঘোর থেকে বের হয়ে এলো। চোখ খুলতেই দেখল ঘর এখনো অন্ধকার—শরীর আর জ্বলছে না, কাঁপুনিও থেমেছে, তবে মাথা আর শরীরের ব্যথা হাল্কা হয়ে থাকলেও এখনো আছে। কিছুক্ষণ সে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল; তারপর হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালাল। দীর্ঘ অন্ধকারের পর হঠাৎ আলো তার চোখে লাগল—চোখ বন্ধ করতে বাধ্য হলো। আঙুল দিয়ে চোখের পাতায় ছুঁয়ে দেখল—চোখ ফুলে গেছে আর ব্যথা করছে। কষ্ট করে চোখ খুলে চারপাশ তাকাতে লাগল, কী হয়েছিল মনে করার চেষ্টা করল। ছোট ছোট স্মৃতিখণ্ড ফিরে এলো।
নিজের অবস্থা দেখে সালার ঘৃণা অনুভব করল। বিছানায় বসে সে শার্টের বোতাম খুলে ফেলল এবং ছুঁড়ে দিল। টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে চাদর আর কম্বল বিছানা থেকে সরিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। তারপর টলতে টলতে বাথরুমে গেল। আয়নায় নিজেকে দেখে সে চমকে উঠল—চোখ বসে গেছে, চারপাশে গাঢ় কালো দাগ, মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। কেউ দেখলে মনে করত সে বহুদিন ধরে অসুস্থ।
“মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় আমার দাড়ি এত বড় হলো?”—সে নিজের গালে হাত বুলিয়ে ভাবল।
“ফুড পয়জনিংয়ের সময় হাসপাতালে থাকলেও আমার অবস্থা এত খারাপ দেখায়নি, যতটা এখন এই এক দিনের জ্বরে হয়েছে,”—সে অবিশ্বাস নিয়ে আয়নায় নিজের চেহারা দেখল। উষ্ণ পানি দিয়ে টব ভরল এবং তাতে নেমে গেল। সে অবাক হচ্ছিল—জ্বর থাকা সত্ত্বেও কেন সে সঙ্গে সঙ্গেই নোংরা কাপড় বদলালো না; বরং ওভাবেই পড়ে রইল।
গোসল সেরে সে রান্নাঘরে গেল—তীব্র ক্ষিধে পেয়েছিল। নিজের জন্য কিছু নুডলস বানাল। “আগামীকাল ডাক্তার দেখাতে হবে—পুরো চেকআপ করাবো,” খেতে খেতে ভাবল সে। গোসলের পর শরীর হালকা লাগছিল, কিন্তু ভিতরটা পুরো শক্তিহীন, ক্লান্ত।
খেতে খেতে টিভি অন করেছিল। উপযুক্ত কিছু খুঁজতে খুঁজতে চ্যানেল পাল্টাচ্ছিল। একটি টক শো চলছিল। সালার খাওয়া থামাল—চামচ মাঝ আকাশে ধরে রেখে টিভির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তারপর রিমোট তুলে আবার চ্যানেল পাল্টাতে লাগল। এবার প্রতিটি চ্যানেলের অনুষ্ঠান মনোযোগ দিয়ে দেখছিল—তার মুখে বিভ্রান্তি বাড়ছিল।
“এটা কী হচ্ছে?”
তার মনে পড়ল—শুক্রবার রাতে সে অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল, এরপর হাসপাতালে নেওয়া হয়। শনিবার পুরো দিন সেখানে কাটে, আর রবিবার সে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসে। রবিবার দুপুরে ঘুমোতে যাওয়ার পর পরের দিন সকালে এগারোটায় ঘুম ভাঙে; সেদিন রাতে জ্বর এসেছিল—যা অনুমান অনুযায়ী মঙ্গলবার পর্যন্ত চলার কথা। তাহলে এখন মঙ্গলবার রাত হওয়ার কথা। কিন্তু টিভি বলছে অন্য কথা—এটা শনিবার রাত, আর পরের দিন রবিবার।
সালার লিভিং রুমের টেবিলে রাখা ঘড়ির দিকে তাকাল—তার মুখ হাঁ হয়ে গেল বিস্ময়ে। নুডলসের বাটি নামিয়ে রেখে ঘড়ির তারিখ দেখল—চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“মানে কি আমি পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ ছিলাম? পাঁচ দিন পুরোপুরি জ্ঞানশূন্য ছিলাম? এটা কীভাবে সম্ভব? কীভাবে হয়?” সে বিড়বিড় করল। “পাঁচ দিন তো অনেক সময়—আমি বুঝতেই পারলাম না সময় কেটে গেল কীভাবে? আমি কীভাবে এভাবে পাঁচ দিন পড়ে রইলাম?”
সে টলতে টলতে ফোনের দিকে গেল—আন্সারিং সার্ভিস চেক করল—কোনো কল নেই।
“পাপা একবারও ফোন করেনি… সাদও না… কী হয়েছে তাদের? আমাকে কেউ কি একবারও মিস করল না?” কোনো মেসেজ নেই দেখে সে হতবাক। অনেকক্ষণ ফোনের পাশে চুপচাপ বসে রইল।
“কীভাবে পাপার একবারও মাথায় আসেনি আমি কোথায়? আমার কোনো বন্ধুও ভাবল না? তারা সবাই আমাকে এভাবে ফেলে দিল কীভাবে?” প্রথমবার সে বুঝল—এ চিন্তা তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে; এটা দুর্বলতার জন্য নয়—তাহলে কী কারণে এমন হলো? সে সোফায় বসে নুডলস শেষ করার চেষ্টা করল, কিন্তু আর ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল নরম রাবার চিবুচ্ছে—আর খেতে পারল না।
এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা তাকে ঘিরে ধরল—সে কি সত্যিই পাঁচ দিন একাই পড়ে ছিল? আর কেউ—এমনকি সেও—টের পেল না কী হয়েছিল তার সাথে?
সে আবার বাথরুমে গেল। গোসলের পর তার মুখ এত ক্লান্ত দেখাচ্ছিল না, কিন্তু চোখের নিচের কালো দাগ আর অতিরিক্ত গজানো দাড়ি—
কালো দাগ আর বাড়তে থাকা দাড়ি–গোঁফ এখনো রয়ে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল সে, চোখের নিচের দাগগুলো আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল—যেন বিশ্বাস করতে পারছে না যা দেখছে। হঠাৎ, তার এই অগোছালো দাড়িওয়ালা মুখ তাকে বিরক্ত করতে লাগল। শেভিং কিট বের করে শেভ করার প্রস্তুতি নিল। তখনই সে বুঝল তার হাত এখনো কাঁপছে—এবং পরপর তিন জায়গায় ব্লেড মুখে কেটে গেল। সে মুখ ধুয়ে নিল, তোয়ালে দিয়ে মুছল এবং পাতলা রক্তরেখা থামানোর চেষ্টা করল। শূন্য দৃষ্টিতে নিজের চেহারাই দেখছিল।
কাটটা আবারও রক্ত ছড়াতে লাগল—গাঢ় রঙের রক্তের ফোঁটা বেরিয়ে এলো, আর সে চোখ না পিটপিটিয়ে দেখল ফোঁটাগুলো তার গাল বেয়ে নামছে।
“আনন্দের পরের ধাপ কী?”
“ব্যথা।” ঠান্ডা, নিচু স্বরের উত্তর। সালার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“ব্যথার পর কী থাকে?”
“শূন্যতা।” প্রতিটি শব্দই তার মনে জেগে উঠল।
“শূন্যতা,” সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল। এই নড়াচড়ায় রক্তের ফোঁটাগুলো আরও নিচে গড়িয়ে পড়ল।
“আর শূন্যতার পরে কী আসে?”
“জাহান্নাম।” হঠাৎই সালারের বমি পেয়ে গেল; সে সিঙ্কের উপর ঝুঁকে পড়ল। কয়েক মিনিট আগে খাওয়া খাবার আবার বেরিয়ে এলো। সে কল ছেড়ে দিল যাতে নোংরা ধুয়ে যায়। এরপর তার মনে পড়ল সে তাকে আর কী প্রশ্ন করেছিল এবং মেয়েটি কী উত্তর দিয়েছিল।
“এই মুহূর্তে তুমি কিছুই বুঝতে পারবে না—আর পারবেও না। সময় আসবে, যখন সব পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং তুমি সব বুঝতে পারবে। জীবনে এমন এক সময় আসে যখন কোনো রহস্য আর থাকে না—সব স্পষ্ট হয়ে যায়। আমি এখন সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি,” সে বলেছিল, “কিন্তু সেই অবস্থা তোমার ওপর কখনো ভবিষ্যতে আসবে। তখন দেখো, বিষয়গুলো তোমাকে বিস্মিত করে কি না।”
সালারের আবারও বমি পেয়ে গেল। তার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
“জীবনে এমন এক সময় আসে যখন সব সম্পর্ক থেমে যায়—যখন কেবল আমরাই থাকি এবং আল্লাহ। তখন না থাকে বাবা-মা, না ভাই-বোন, না কোনো বন্ধু। তখন আমরা বুঝতে পারি—আমাদের পায়ের নিচে কোনো জমিন নেই, মাথার ওপর কোনো আকাশ নেই—শুধুই আল্লাহ আছেন, যিনি আমাদের ধরে রেখেছেন এই শূন্যতার মধ্যে। তখন আমরা নিজের মূল্য বুঝতে পারি—যা এক মুঠো বালির দানার চেয়েও বেশি নয়, কিংবা কোনো গাছের পাতার মতো। আমরা বুঝি—আমাদের অস্তিত্ব কেবল আমাদের সত্তায় সীমাবদ্ধ। আমাদের মৃত্যু পৃথিবীর কিছুই পরিবর্তন করে না, না কোনো ঘটনার ধারাবাহিকতা।”
সালার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা অনুভব করল। মুখ বেয়ে নামা পানি জিহ্বায় লাগতেই সে আবার বমি করল।
তার চিন্তাগুলো এগিয়ে চলল। “তখন আমরা বুঝতে পারি—আমরা কত তুচ্ছ।”
সে চেষ্টা করছিল মাথা থেকে সেই কণ্ঠস্বর সরিয়ে ফেলতে। ভাবছিল—এখন কেন সে মেয়েটির কথা মনে করছে।
সে মুখে পানি ছিটিয়ে মুছে নিল, আফটারশেভের বোতল খুলে গালের কাটা জায়গাগুলোতে লাগাল। প্রথমবারের মতো সে যন্ত্রণা টের পেল।
বাথরুম থেকে বের হয়ে সে বুঝল—তার হাত এখনো কাঁপছে।
“আমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে,” সে মুষ্টি বদ্ধ করল। “আমার সাহায্য দরকার। পুরো চেকআপ করাতে হবে।”
এই বন্য আতঙ্কের অনুভূতি সে আগে কখনো জানেনি। তার শ্বাসরোধ হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল কেউ ধীরে ধীরে তার প্রাণটা চেপে ধরছে।
“এটা কি সম্ভব যে আমার আপনজনেরা আমাকে ভুলে যাবে… এভাবে ভুলে যাবে…”
আলমারি থেকে পরিষ্কার কাপড় বের করে পরতে শুরু করল। সে দ্রুত ডাক্তার কাছে যেতে চেয়েছিল। হঠাৎই অ্যাপার্টমেন্টটা তার কাছে ভয়ার্ত মনে হতে লাগল।
সেদিন রাতে, বাসায় ফিরে সে প্রায় পুরো রাত জেগে ছিল। সে এক অদ্ভুত অবস্থায় ছিল—সে মানতেই পারছিল না যে তাকে ভুলে যাওয়া হয়েছে। তার বাবা–মা সবসময় খুব যত্ন করে তাকে দেখাশোনা করতেন। তার স্বভাব ও চরিত্র বিবেচনায় নিয়ে সিকান্দার উসমান আর তায়্যেবা তাকে খুব সাবধানে সামলাতেন। তারা সবসময় তার জন্য উদ্বিগ্ন থাকতেন, অথচ এখন সে অনুভব করছিল—গত কয়েকদিন ধরে সে যেন সবার জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে—তার বাবা–মা, ভাই–বোন, বন্ধুবান্ধব… কারো কাছেই নেই। যদি সে এই অসুস্থতার মধ্যে অ্যাপার্টমেন্টে মারা যেত, হয়তো কেউ টেরও পেত না। হয়তো লাশে পচন ধরার পর জানতে পারত—এই আবহাওয়ায় তাও কতক্ষণ লাগে?
সেই রাতেই সে প্রতি এক ঘণ্টা পরপর ফোনের আন্সারিং সার্ভিস চেক করছিল। অবিশ্বাসে ডুবে থাকা অবস্থায়, পরের পুরো সপ্তাহ সে কারো ফোনের অপেক্ষা করল, কিন্তু কেউই ফোন করল না।
“তারা কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছে?”
সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল। পুরো এক সপ্তাহ বোকামির মতো অপেক্ষা করার পর, অবশেষে সে নিজেই তাদের ফোন করল।
সে তাদের বলতে চাইছিল কি হয়েছে তার সাথে, সে কি ভয়ংকর সময় পেরিয়েছে।
সে নিজের কষ্টগুলো ভাগ করে নিতে চাইছিল। কিন্তু প্রথমবার তার মনে হলো—কেউই সত্যিই তার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। সবারই নিজের নিজের ব্যস্ততার কথা আছে।
সিকান্দার আর তায়্যেবা তাকে জানাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ায় তাদের ছুটির মজার অভিজ্ঞতা আর কতটা তারা উপভোগ করছে। সালার তাদের কথা শুনছিল অন্যমনস্ক হয়ে।
“তুমি কি তোমার ছুটি ভালো কাটাচ্ছো?” দীর্ঘ আলাপচারিতার শেষে তায়্যেবা জিজ্ঞেস করল।
“আমি? হ্যাঁ, খুব…” এই তিনটি শব্দই সে কোনোরকমে বলতে পারল। সে নিজেই জানত না কী বলবে তায়্যেবাকে, কতটা বলবে।
যে–ই হোক, যাকে–ই সে ফোন করছিল, প্রথমবারের মতো সে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছিল—