“তুমি হঠাৎ কোথায় চলে গেলে?” — সাদ চিৎকার করে বলল, কারণ সালার কোনো কথা না বলেই ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।
“আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি,” সাদ রাগে বলল। সে দরজা বন্ধ করে সালারের পেছনে এল।
“আমি কোথাও যাইনি,” সালার জ্যাকেট খুলতে খুলতেই বলল।
“তুমি জানো আমি কতক্ষণ তোমাকে খুঁজেছি? কোথায় কোথায় ফোন করেছি জানো? আমি ভীষণ চিন্তায় ছিলাম—প্রায় পুলিশ ডাকতে যাচ্ছিলাম… নামাজের মাঝপথে তুমি হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলে?”
“বললাম তো—কোথাও না,” সালার জগার খুলতে খুলতে বলল।
“তাহলে এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে?”
সাদ সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
“ঐ তো, মসজিদের পিছনের ফুটপাথে।”
“কি? এতক্ষণ বরফের মধ্যে সেখানে বসে ছিলে?” সাদ বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
“হ্যাঁ।”
“তুমি সম্পূর্ণ বোধশূন্য হয়ে গেছ!” — সাদ বিরক্ত হয়ে বলল।
সালার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। “হ্যাঁ—সত্যিই বোধশূন্য,” সে সম্মতি জানাল।
সাদ জিজ্ঞেস করল সালার কিছু খেয়েছে কিনা; সালার বলল সে ক্ষুধার্ত নয়। সে শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইল। সাদ এসে তার পাশে বসলো।
“সমস্যা কী? আমাকে বলতে পারবে?”
সালার গলা ঘুরিয়ে সাদের দিকে তাকাল। “কিছু না; কোনো সমস্যা নেই,” সে নিষ্প্রাণ স্বরে বলল।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গেছো। ওখানে ফোন করছিলাম বারবার, কিন্তু কেউ ধরল না,” সাদ বিরক্ত হয়ে বলছিল; কিন্তু সালার ছাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল।
“আমার ভুল হয়েছে তোমাকে নামাজে নিয়ে আসতে বলে। পরেরবার আমার সাথে আসার দরকার নেই।”
সাদ খুব রাগী হয়ে উঠল। সে নিজের কাজ শেষ করে নাইট ল্যাম্প বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর, ঠিক যখন ঘুমিয়ে পড়ছিল, তখন সে শুনল সালার ডাকছে।
“কি ব্যাপার?” — সাদ তাকাল তার দিকে।
“সিরাত-এ-মুস্তাকীম কী?”
এই সহজ প্রশ্নে সাদ থমকে গেল। সে ঘুরে তাকাল—সালার তার বাম পাশে সোজা হয়ে শুয়ে আছে।
“সিরাত-এ-মুস্তাকীম… মানে সোজা পথ।”
“জানি, কিন্তু সোজা পথ কী?” — আরেক প্রশ্ন।
“সোজা পথ মানে ভালো পথ।”
“ভালো কি?” — স্বর তখনও নিষ্প্রাণ।
“ভালো মানে ভালো কাজ।”
“ভালো কাজ কী?”
“যে কাজগুলো অন্যের উপকার করে… যেমন কাউকে সাহায্য করা, কারো উপকার করা—এসবই ভালো কাজ। আর প্রতিটি ভালো কাজই হলো ‘ভালো’।’’
“কয়েক ঘণ্টা আগে আমি ফুটপাথে এক পতিতাকে পঞ্চাশ ডলার দিয়েছি, যদিও সে মাত্র ত্রিশ চাইছিল। তাহলে কি এটা ভালো কাজ হলো? ভালোত্ব?”
সাদের মনে হলো সে যেন সালারের মুখে ঘুষি বসিয়ে দেয়। একেবারে অদ্ভুত লোক!
“চুপ করে ঘুমাও, আমাকে ঘুমাতে দাও!” — সে কম্বলটা টেনে নিল।
“মানে এটা ভালো কাজ না?”
সালার বিস্মিত হল সাদের রাগ দেখে।
“আমি তো বললাম! চুপ করো আর ঘুমাও!” — সাদ চিৎকার করল।
“এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে? খুব সাধারণ একটা প্রশ্নই করেছি,” সালার শান্ত গলায় বলল।
সাদ রেগে গেল। সে ল্যাম্প জ্বালিয়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়ল।
“তোকে আমি কীভাবে বুঝাই ‘সিরাত-এ-মুস্তাকীম’ মানে কী? তুই কি পাগল? নাকি অজ্ঞ? নাকি মুসলমানই না? তুই কী… কিছুই না? তোকে এগুলো জানা উচিত! কিন্তু যে লোক নামাজের অর্ধেকেও থাকতে পারে না—সে আবার এসব কী বুঝবে!”
“আমি অর্ধেক নামাজে চলে এসেছি কারণ তুমি বলো এটা শান্তি দেয়। কিন্তু আমি তো কোনো শান্তি পাইনি—তাই চলে এসেছি,” সালারের অত্যন্ত শান্ত স্বর সাদকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলল।
“তুই শান্তি পাইনি কারণ মসজিদ তোকে ডাকে না। তোর শান্তি সিনেমা হল, থিয়েটার, বার আর নাইট ক্লাবে। মসজিদ তোর জায়গা না—মসজিদে গিয়ে কিভাবে শান্তি পাস? আর তুই চাস আমি তোকে সোজা পথ বোঝাই!”
সালার তাকিয়ে রইল স্থির চোখে।
“যে লোক নামাজ থেকে পালিয়ে যায়, মদ খায়, ব্যভিচারে জড়ায়—সে মানুষ কখনো ‘সিরাত-এ-মুস্তাকীম’ বুঝতে পারবে না, না সেই পথে চলতে পারবে,” সাদ বলল।
“মানে যারা মদ খায় আর ব্যভিচার করে কিন্তু নামাজ থেকে পালায় না—তারা কি ‘সিরাত-এ-মুস্তাকীম’ বোঝে? আর তারা কি সোজা পথে?”
সাদ থমকে গেল। সে জানত—সালার কাকে ইঙ্গিত করছে।
সালার তার চোখ সাদের দিকে স্থির রাখল।
“তুই এসব বুঝবি না, সালার,” কিছুক্ষণ পর সাদ বলল।
আরেকটা পরিচিত কণ্ঠস্বর যেন সালারের কানে বাজল। সে একটু চমকে গেল।
“হ্যাঁ, আমিও বুঝি না। লাইটটা বন্ধ করো, ঘুম পাচ্ছে,” সালার বলল। আর কোনো কথা না বলে সে ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।
সালারকে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে সাদ সকালে তার অ্যাপার্টমেন্টে আসে। সালার ঘুমঘুম চোখে দরজা খুলে।
সাদ: “আমি জানতাম তুমি এখানেই থাকবে। তুমি ইচ্ছা করে অ্যানসারিং মেশিন অন রেখেছো। আমার বাসা থেকে কেন পালিয়ে এলে?”
সালার: “পালিয়ে যাইনি। তুমি ঘুমাচ্ছিলে, তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি।”
সে চোখ ঘষছিল।
সাদ: “কখন বের হলে?”
সালার: “হয়তো ৪টা বা ৫টার দিকে।”
সাদ: “এটা কি বের হওয়ার সময়? তুমি এমন করে চুপচাপ বের হলে কেন?”
সালার জবাব না দিয়ে সোফায় গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে।
সাদ: “হয়তো আমার কথায় তুমি কষ্ট পেয়েছো। তাই ক্ষমা চাইতে এসেছি।”
সালার: “তুমি কী এমন বলেছো?”
সাদ: “গতরাতের বিরক্তিতে যা বলেছি।”
সালার: “না, এমন কিছু না। এত ছোট কথায় আমি কষ্ট পাই না। ক্ষমা চাইতে আসার মতো কিছু বলোনি।”
সাদ: “তাহলে হঠাৎ করে চলে গেলে কেন?”
সালার: “মনে খুব ডিপ্রেসড লাগছিল, তাই ফিরে এলাম। ঘুমাতে চেয়েছিলাম, তাই অ্যানসারিং মেশিন অন রেখেছিলাম।”
সাদ: “তারপরও, তোমাকে ওইভাবে বলা ঠিক হয়নি। সকাল থেকেই আফসোস লাগছে।”
সালার: “আচ্ছা ঠিক আছে।”
সাদ: “সালার, তোমার এ ক'দিন কী সমস্যা? তুমি খুব অদ্ভুত আচরণ করছো।”
সালার: “কিছু না।”
সাদ: “না, কিছু একটা আছে। তুমি চুপচাপ হয়ে গেছো, তুচ্ছ ব্যাপারে রেগে যাচ্ছো। ইবাদ বলছিল তুমি বিশ্ববিদ্যালয়েও যাচ্ছো না। আর সবচেয়ে বড় কথা—তুমি ধর্মের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছো।”
এই কথায় সালারের মুখ ভার হয়ে যায়।
সালার: “ধর্মে আগ্রহী? ভুল বলছো। আমি ধর্মে আগ্রহী হচ্ছি না… মানসিক শান্তি খুঁজছি। খুব ডিপ্রেসড লাগছে। জীবনে কখনো এত খারাপ লাগেনি। এ ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেতেই তোমার সাথে মসজিদে গিয়েছিলাম।”
সাদ: “তুমি ডিপ্রেসড কেন?”
সালার: “আমি যদি জানতাম, তাহলে ডিপ্রেসড হতাম না—কিছু না কিছু করতাম।”
সাদ: “তবুও, কোনো না কোনো কারণ তো থাকে। মানুষ হুট করে এভাবে হতাশ হয় না।”
সাদ ঠিকই বলেছিল, কিন্তু সালার ভেবেছিল—কারণ বললে সাদ হয়তো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। তাই সত্যিটা লুকিয়ে যায়।
সালার: “আমি জানি না অন্যদের কী হয়, কিন্তু আমার কাছে কোনো কারণ ছাড়াই এমন হয়।”
সাদ: “অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খেয়ে দেখো।”
সালার: “অনেক খেয়েছি—কোনো কাজ হয় না।”
সাদ: “তাহলে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাও।”
সালার: “কখনোই না! ডাক্তার দেখাতে দেখতেই আমি বিরক্ত। আর না।”
সাদের চোখে অবাকভাব ফুটে ওঠে। তারপর কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে—
সাদ: “আগে কেন গিয়েছিলে?”
সালার: “অনেক কারণ ছিল… এখন এসব বলার দরকার নেই।”
সালার ছাদে তাকিয়ে শুয়ে থাকে।
সাদ: “তাহলে নিয়মিত নামাজ পড়ো।”
সালার: “চেষ্টা করেছি… কিন্তু কোনো শান্তি পাইনি। নামাজে কী পড়ছি বুঝতাম না, কেন পড়ছি… তাও বুঝতাম না।”
সাদ: “তাহলে চেষ্টা করো বিষয়গুলো বুঝতে…”
সালার: (কথা কেটে দেয়) “আচ্ছা থাক, আবার কাল রাতের সোজা পথের আলোচনা শুরু করো না। তাতে তুমি আবার রেগে যাবে।”
সাদ: “না, রাগ করব না।”
সালার: “যখন আমি জানিই না ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ কী, তখন নামাজ কীভাবে পড়ব?”
সাদ: “নামাজ শুরু করো, নিজেই বুঝে যাবে।”
সালার: “কীভাবে?”
সাদ: “তুমি ভুল কাজগুলো থেকে দূরে থাকবে, ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যাবে।”
সালার: “কিন্তু আমি তো কোনো ভুল কাজ করি না। আর ভালো কাজ করারও কোনো বিশেষ ইচ্ছে নেই। আমার জীবন তো একেবারে স্বাভাবিক।”
সাদ: “তুমি বুঝতেও পারো না কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, যতক্ষণ না…”
সালার: (আবার বাধা দেয়) “ঠিক বা ভুল নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি শুধু মানসিকভাবে অসস্থিতে আছি—এটা আমার কাজের সাথে সম্পর্কিত না।”
সাদ: “তুমি অনেক কিছু করো, যেগুলো মানুষের মন অশান্ত করে তোলে।”
সালার: “যেমন?”
সাদ: “তুমি শূকরের মাংস খাও।”
সালার: “আরে ধুর! শূকর খাওয়ার সাথে এর কী সম্পর্ক?”
সে উঠে সাদের পাশে বসে।
“বলতো—তুমি তো নিয়মিত নামাজ পড়ো… এতে তোমার জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?”
সালার: “নামাজ তোমার জীবনে কী পরিবর্তন এনেছে?”
সাদ: “আমি অশান্ত নই।”
সালার: “তোমার নিজের যুক্তি অনুযায়ী তোমার তো অশান্ত হওয়ার কথা—কারণ তুমি-ও অনেক ভুল কাজ করো।”
সাদ: “কোন ভুল কাজ? উদাহরণ দাও।”
সালার: (শান্তভাবে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর বলে)
“নামাজ পড়লেই জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আসে—আমি এটা বিশ্বাস করি না। ভালো কাজ বা ভালো চরিত্র শুধু নামাজের কারণে আসে না।”
সাদ: “তাই আমি বারবার বলি—ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানো। ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান নিলে তোমার ভুল ধারণা দূর হবে, তোমার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে।”
সালার: “আমার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল নয়। আমি ধর্মীয় মানুষের চেয়ে বেশি মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, প্রতারক আর দ্বিচারী আর কাউকে দেখি নাই। আশা করি তুমি রাগ করবে না—কিন্তু এটাই সত্যি। আমি তিনজন ‘মহা ধার্মিক’ মানুষকে দেখেছি—নামাজ, রোজা, হুজুরি চেহারা, ধার্মিকতার বুলি—সবাই বাহিরে ধর্ম টানাটানি করে; কিন্তু ভেতরে তারা পুরো উল্টো।”
সালার: “প্রথমজন একজন মেয়ে। খুব পর্দানশীল, ধার্মিক সাজার ভান, নৈতিকতার বুলি… কিন্তু একদিকে এক ছেলের সঙ্গে প্রেম, অন্যদিকে আরেকজনের সঙ্গে বাগদান। সে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গেল, আর যখন প্রয়োজন পড়ল, তখন এমন একজনের সাহায্য নিল যাকে সে ঘৃণা করত—একটুও সংকোচ ছাড়াই। এই হলো ‘মিস ধার্মিকতার’ আসল রূপ!”
তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।
সালার: “দ্বিতীয়জন একজন দাড়িওয়ালা, খুব ধর্মীয় চেহারার লোক। যে মেয়ে তার কাছে কান্নাকাটি করে সাহায্য চেয়েছিল, তার জন্য আঙুল তুলেও সাহায্য করেনি। সে যার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করছিল, তাকেও বিয়ে করেনি। পরে এখানে আমেরিকায় তার সঙ্গে দেখা—তার ঈমানের সঙ্গে তার দাড়িও উধাও।”
এরপর সালার জোরে হাসে।
সালার: “তৃতীয়জন তুমি। শূকরের মাংস না খাও—এই একটিমাত্র হারাম কাজ তুমি এড়িয়ে চল। বাকি সবকিছু ঠিকঠাক! মিথ্যা বলা, মদ খাওয়া, অবৈধ সম্পর্ক, ক্লাবে ঘোরা, পরনিন্দা, মানুষের মজা করা—সবই আছে। আর তুমি নাকি খুব ধার্মিক! একটু দাড়ি রেখেছো, আর সুযোগ পেলেই মানুষকে ধর্ম বুঝাও—এই আয়াত, সেই হাদিস… এই হাদিস, সেই আয়াত… শুনলে মাথা ধরে যায়।”
সালার:
“তোমার আচরণ দেখলে আমি মুগ্ধ তো দূরের কথা—আমার আর তোমার মাঝে তেমন পার্থক্যই দেখি না। পার্থক্য শুধু এই যে—তুমি দাড়ি আর ধর্মের লেকচার নিয়ে এসব করো, আর আমি এগুলো করি দাড়ি-টাড়ি ছাড়া, ধর্মীয় মুখোশ ছাড়া।”
সালার:
“নামাজ তোমার জীবনে কী মহা-বিপ্লব এনে দিয়েছে? এটা ছাড়া যে তুমি মনে করো তুমি যেন জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতের যাত্রী আর আমরা বাকিরা শুধু নরকে যাওয়ার জন্যই আছি! যদি তোমার কথা আর কাজের এই অদ্ভুত অসামঞ্জস্য না দেখতাম, আমি কখনোই এসব কথা তোমাকে বলতাম না।
আর একটা অনুরোধ—মানুষকে ধর্মের দিকে ডাকো না। কারণ আমার মনে হয় তুমি নিজেও ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছু জানো না।”
সালার কথা শেষ করতেই সাদ পুরোপুরি স্তব্ধ, যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে।
কিছুক্ষণ পর সাদ বলল,
“হ্যাঁ, আমি ভুল করি। মানুষ ভুল করেই। আর আল্লাহ বান্দাদের মাফ করেন। আমি কখনো বলিনি যে আমি নিখুঁত মুসলিম বা অবশ্যই জান্নাতে যাব। কিন্তু যদি কিছু ভালো করি, আর অন্যকে ভালো দিকে ডাকি, আমি সেটা আমার জন্য ইবাদতের মতো ভাবি।”
সালার:
“সাদ, অন্যের দায় নিজের ওপর নিও না। আগে নিজেকে ঠিক করো। নিজেকে না বদলে মানুষকে বদলানোর চেষ্টা করলে লোক তোমাকে ভণ্ড বলবে।
আর আল্লাহর ক্ষমার কথা—যদি তিনি তোমাকে ক্ষমা করতে পারেন, তাহলে আমাদেরও করতে পারবেন।
তুমি যদি ভেবে থাকো যে আমাদেরকে ইসলাম বোঝালে তোমার পাপ কমে যাবে আর তুমি আল্লাহর কাছাকাছি হবে—তাহলে সেটা ভুল ধারণা। প্রথমে নিজের হিসাবটা ঠিক করো, নিজের দিকে তাকাও। আমাদের যেমন আছি তেমন থাকতে দাও।”
সালারের কথাগুলো ছিল কঠিন, কিন্তু সে নিজের মনের কথাই অকপটে বলে দিল।
তার কথা শেষ হলে সাদ উঠে চলে গেল।
সেদিনের পর থেকে সাদ আর কখনো সালারের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করেনি।
---
রেস্টুরেন্টের দৃশ্য
অনেকদিন পর সেই সপ্তাহান্তে সালার রাতে বাইরে খেতে গেল।
ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে গেলে সালার জানালার বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে রইল। ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে বসে তার মনে হলো যেন সে আবার ফুটপাতে বসে আছে।
হঠাৎ পিছন থেকে এক নারীর কান্নার শব্দ পেল। ফিরে তাকিয়ে দেখল—তার পেছনের টেবিলে এক তরুণী আর এক ছেলে বসে আছে। মেয়েটি টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছে, মৃদুস্বরে কাঁদছে। ছেলেটি তার হাত টেপাটেপি করে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে হয়তো।
রেস্টুরেন্ট ছোট, টেবিলগুলোও খুব কাছাকাছি—চাইলেই কথোপকথন শুনতে পারত। কিন্তু সে শোনার আগ্রহ দেখাল না; মুখ ফিরিয়ে নিল।
তার ভেতরে বিরক্তির ঢেউ উঠল—এ ধরনের প্রকাশ্য আবেগ প্রদর্শন তাকে অপছন্দ। শান্ত সন্ধ্যার আশায় সে এখানে এসেছিল, কিন্তু এই দৃশ্য তার মুড খারাপ করে দিল।
পেছনের দম্পতি রাশিয়ান, তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলছিল।
সালার আবার জানালার বাইরে তাকাল, কিন্তু এক কান তাদের চাপা কান্না আর কথা শোনার দিকেই ছিল।
একসময় সে আবার ওদের দিকে ফিরল—এবার মেয়েটির সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ডের সেই চোখাচোখি যেন অন্তহীন—মেয়েটির ফুলে থাকা চোখ, দুঃখে ভরা মুখ…
মেয়েটির কান্নাভেজা চোখ হঠাৎ করে সালারের মনে ফিরিয়ে আনল আরেক জোড়া চোখকে—ইমামা হাশিমের চোখ, যেগুলোও কান্নায় লাল হয়ে ছিল।
ওয়েটার খাবার এনে সামনে রাখল। সালার কয়েক চুমুক পানি খেল এবং স্মৃতিগুলো থেকে নিজেকে সরানোর চেষ্টা করল। সে গভীর নিঃশ্বাস নিল, আর ওয়েটার কৌতূহলী চোখে তাকাল—সালার জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকার ভান করছিল।
“আজকের দিনটা কত সুন্দর। আমি এখানে এসেছি একটু সময় ভালো কাটাতে, ভালো খাবার খেতে। তারপর সিনেমায় যাব।
আমাকে ওই মেয়ের কথা ভাবা বন্ধ করতে হবে—সে ছিল পুরোই পাগল, আজে-বাজে কথা বলত। তার জন্য আমার কোনো আফসোস থাকার কথা না। কোথায় গেছে, কেন গেছে—আমার জানারই বা কী দরকার? ও-ই সব করে গেছে।
আমি তো শুধু তার সঙ্গে খেলা করছিলাম—সে যদি যোগাযোগ করত, আমি তখনই তাকে তালাক দিয়ে দিতাম।”
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতে করতে তার অন্তরের দুঃখ আবার মাথা তুলে দাঁড়াল।
পেছনের টেবিলের মেয়েটির কান্না এখন তার চিন্তায় ছুরি চালানোর মতো লাগছিল।
“আমি আমার টেবিল পরিবর্তন করতে চাই,” সে রূঢ়ভাবে ওয়েটারকে বলল।
“কেন, স্যার?” ওয়েটার অবাক।
“অথবা ওদের টেবিলটা বদলে দিন।” সে পেছনের দম্পতির দিকে ইশারা করল।
ওয়েটার পুরো ব্যাপারটা বোঝেনি হয়তো, কিন্তু তাকে রেস্টুরেন্টের এক কোণের টেবিলে নিয়ে গেল।
এখন আর মেয়েটির কান্না শোনা যায় না, এটা স্বস্তিদায়ক ছিল। কিন্তু এবার মেয়েটি প্রায় সরাসরি তার মুখোমুখি বসে।
খাবারের প্রথম লোকমাটি মুখে তোলার সময় আবার মেয়েটিকে দেখল।
হঠাৎ করে খাবার কেমন নির্জীব, নিরস্বাদ মনে হলো। খাবারের দোষ নয়—রেস্টুরেন্ট তো খাবারের জন্যই বিখ্যাত—এটা তার নিজের মনের অবস্থাই।
"মানুষ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর জন্য কত কম শোকর করে।
এই খাবারের স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতাটাও তো এক বিশাল নিয়ামত।
আমরা কত সুন্দর খাবার উপভোগ করতে পারি—এটা কতো বড় সৌভাগ্য।
অনেকেই তো এ থেকেও বঞ্চিত…"
ইমামার সেই কথাগুলো আবার তার মাথায় প্রতিধ্বনিত হল—এবং এবার সবকিছুর সীমা ছাড়াল।
একেবারে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো সালার।
সে চামচটা জোরে থালায় আছাড় মেরে দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
“চুপ! চুপ করো!”
পুরো রেস্টুরেন্ট নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“তুই হারামজাদি! তুই বদমাইশ! চুপ করো!”
তার মুখ একেবারে রক্তাক্ত লাল হয়ে আছে।
“কেন তুমি আমার মাথা থেকে বের হও না? কেন? কেন?”
সে দুই কপাল চেপে ধরল।
“তোকে আবার যদি কোথাও দেখি—মারব! খুন করে ফেলব!”
তারপর সে এক গ্লাস পানি খেল। ধীরে ধীরে রেস্টুরেন্ট, মানুষ—সবকিছু যেন আবার স্পষ্ট হতে লাগল।
ওয়েটার দুশ্চিন্তায় এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, আপনি ঠিক আছেন তো?”
সালার কোনো উত্তর দিল না। ওয়ালেট বের করে কিছু ডলার টেবিলে ছুঁড়ে রাখল এবং—
ওয়ালেট টেবিলে রেখে সালার রেস্টুরেন্ট ছাড়ল।
কিন্তু এটা ইমামা ছিল না—এটা একটা দুষ্ট আত্মা, যা তাকে যেখানেই যেত, ততক্ষণ পিছুটান করত। কখনও তার মুখ বা কণ্ঠ, আর যদি তা না হয়, তবে তার আফসোস। যখন সে ইমামার কোনো এক জিনিস ভুলে যেতে চেয়েছিল, তখন আরেকটি বিষয় মনে পড়ত। কখনও কখনও সে এতটা উত্তেজিত এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত যে, যদি সে সরাসরি তার সামনে এসে দাঁড়াত, তবে হয়তো সে তাকে গলায় চেপে ধরে অথবা গুলি করত। সে তার সবকিছুকে ঘৃণা করত।
যে কয়েক ঘণ্টা রাতভর তাকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা তার পুরো জীবনকে ছায়াপথের মতো ঢেকে দিয়েছিল।
……………………………………………………
“কিন্তু তুমি কেন আসছ?” সালার বিরক্তি ঝরল যখন সে তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল, যিনি কিছুদিন পর নিউ হেভেনে আসার খবর জানাতে ফোন করেছিলেন।
যদি সালারের জীবন নিয়মিত গতিপথে চলত, তাহলে সে এই খবরকে স্বাগত জানাত। কিন্তু সে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, আর কামরানের আগমন এই সময়ে তাকে বিরক্ত করল। সে তার বিরক্তি লুকাতে পারল না।
“‘কেন আসছি’ মানে কি? নিশ্চয়ই তোমাকে দেখতে! আর কী!” কামরান কিছুটা অবাক হয়ে সালারের কণ্ঠের টোন শুনল। “আর পাপাও আমাকে বলেছিল তোমাকে খুঁজে দেখার জন্য।”
সালার কণ্ঠ চেপে ধরে শুনল।
“এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে তুলে নেবে। আমি আগে থেকে ফ্লাইটের বিস্তারিত জানাব।”
কিছু সাধারণ কথোপকথনের পর, তারা ফোন কেটে দিল।
চার দিন পর সালার কামরানকে এয়ারপোর্টে দেখল। কামরান সালার অবস্থা দেখে হতবাক।
“তুমি কি অসুস্থ ছিলে?” কামরান জিজ্ঞেস করল।
“না—আমি ভালো আছি।” সালার হাসির চেষ্টা করল।
“তুমি তেমন দেখছো না।” কামরানের উদ্বেগ বেড়ে গেল।
সালার আগে কথা বলার সময় মানুষকে চোখে চোখ রাখত। এখন সে লজ্জা বোধ করে দৃষ্টিচ্যুত হচ্ছিল। কামরান চালনার সময় লক্ষ্য করল—সালার আগে তিনি খুবই তাড়াহুড়ো করতেন, যার কারণে যাত্রীদের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এখন সে খুব সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছিল।
কামরান মনে করল, এটা তার ভাইয়ের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন; তবে এটা একমাত্র ইতিবাচক পরিবর্তন—বাকি পরিবর্তনগুলো তাকে আরও উদ্বিগ্ন করছিল।
“পড়াশোনার কী অবস্থা?”
“ভালো চলছে।”
সারা সফরে কামরান এই ধরনের উত্তরই পেল।
যখন তারা সালারের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাল, কামরান হতবাক হয়ে গেল যখন সালারকে ভিতরে অনুসরণ করল।
“এটা কি তোমার অ্যাপার্টমেন্ট, সালার? আল্লাহর জন্য!”
সালার আগে খুবই সুগঠিত থাকত, সবকিছু সঠিক স্থানে রাখত। কিন্তু এই নিয়মিত অবস্থা এখন কোথাও দেখা যায় না। সবকিছু এলোমেলো—তার জামা-কাপড়, জুতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বই, সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনগুলো…
সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল; রান্নাঘর এলোমেলো অবস্থায়, আর বাথরুম তার চেয়ে আরও খারাপ অবস্থায়। কামরান অ্যাপার্টমেন্ট ঘুরে দেখছিল, যা সে দেখল, তা দেখে চমকিত হয়ে গেল।
“কতোদিন হয়ে গেল তুমি এই জায়গা পরিষ্কার করো নি?”
“আমি এখনই করি,” সালার ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর দিল।
“তুমি তো এমন জীবনযাপনের জন্য অভ্যস্ত ছিলে না—এখন কী হলো?” কামরান বেশ উদ্বিগ্ন। তার চোখ পড়ল একটি অ্যাশট্রে-তে, যা সিগারেটের টুকরোতে পূর্ণ। সে সেটি তুলে নিল এবং এর মধ্যে থাকা জিনিসগুলো গন্ধ করল। সালার তার ভাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলল, কিন্তু কিছু বলল না। কামরান গর্জে অ্যাশট্রে-টি আবার রাখল এবং সালারের দিকে ফিরে তাকাল।
“সালার, এইবার তুমি ঠিক কী করছ? সব কিছু খুলে বল—সমস্যা কী? কী হচ্ছে? তুমি কি কোনো মাদক নিচ্ছ?”
“না, আমি কিছু নিচ্ছি না।” তার উত্তর কামরানকে রেগে দিল, এবং সে সালারের কাঁধ ধরল এবং বাথরুমের আয়নার সামনে টেনে আনল।
“নিজেকে দেখ—তুমি মাদকাসক্তের মতো দেখাচ্ছো এবং আচরণও করছ। চোখ তুলে দেখ, সালার, তোমার মুখ দেখ!” কামরান কলার টানছিল। আয়নার প্রতিফলন না দেখেও সালার বুঝল সে কেমন দেখাচ্ছে।
অন্ধকার চোখের নিচের দাগ, মুখের ফোঁড়া, শুষ্ক ও চিপচিপে ঠোঁট—সবার সাথে তার চুল-দাড়ি না কাটার ফলাফল, যা ছিল অতিরিক্ত কফি এবং সিগারেটের কারণে। ত্বকের ব্রণজনিত সমস্যার কারণে সে দাড়ি কেটে না।
রেগে গিয়ে, সে কামরানের ধাক্কা থেকে নিজেকে মুক্ত করল এবং আয়নার দিকে না তাকিয়ে পালানোর চেষ্টা করল।
“তুমি একেবারেই ঘৃণ্য দেখাচ্ছো, অভিশপ্ত!”
“অভিশপ্ত”—কামরান প্রায়ই এই শব্দটি ব্যবহার করতেন, কিন্তু সালার কখনও এতটা তীব্রভাবে অনুভব করেনি যতটা এখন। সে ক্রুদ্ধ।
“হ্যাঁ—ঘৃণ্য এবং অভিশপ্ত: আর কী হলো?” সে কামরানের সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াল। “আমি যখন বলছি যে আমি মাদক নিচ্ছি না, তোমার আমার ওপর বিশ্বাস করা উচিত।”
“বিশ্বাস করব? হুম!” কামরানের কণ্ঠে বিদ্রূপ ঝরছিল। দাঁত চেপে ধরে, সালার কিছু না বলে ঘর সজ্জা ঠিক করতে থাকল।
“তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে যাচ্ছ?” সালার মনে সতর্কবার্তা শুনতে পেল।
“হ্যাঁ, যাচ্ছ।”
কামরান সন্তুষ্ট হল না।
“আমার সঙ্গে হাসপাতাল চল—আমি চাই তুমি সম্পূর্ণ চেকআপ করাও।”
“যদি এ জন্য এসেছ, তবে ফিরে যাওই ভালো। আমি কোনো কিন্ডারগার্টেনের শিশু নই—আমি নিজেই নিজের খেয়াল রাখতে পারি।”
কামরান কোনো উত্তর দিল না। সে সালারের সঙ্গে মিলে জিনিসগুলো সজ্জা করতে লাগল। সালার স্বস্তি বোধ করল; সে ভাবল এই আর্জি শেষ হয়ে গেল—কিন্তু সে ভুল করেছিল। কামরান নিউ হেভেনে থাকার সময় আরও বৃদ্ধি করল…
এক সপ্তাহ কাটল। এই সময়ে, সালার নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকল। অন্যদিকে, কামরান সালারের বন্ধু এবং তার প্রফেসরদের সঙ্গে দেখা করল। সালারের বন্ধুদের কাছ থেকে সে জানল, সালার সেমিস্টারে ফেল করেছে—এটা কামরানের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
সালারের কাছ থেকে যেকোনো কিছু আশা করা যেত, কিন্তু এত খারাপভাবে ফেল করা, যখন পর্যন্ত সে বিশ্ববিদ্যালয়ে রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে থাকত—এটি কামরানের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।
এইবার কামরান সালারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করল না। পরিবর্তে, সে পাকিস্তানে তার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলল এবং পরিস্থিতি জানাল। আবারও, জোড়া দিয়ে বললে বলি—সালারের কারণে সিকন্দর উসমানের ধরণা লঙ্ঘিত হলো—সালার তার পুরনো রেকর্ড ধরে রেখেছিল। কয়েক বছর পরপর, সে তার বাবাকে নতুন ধরনের সমস্যা উপস্থাপন করত। হাশিম মুবিন এবং ইমামা সংক্রান্ত ঘটনা তখন পুরনো হয়ে গিয়েছিল।
“এখন এই ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলো না,” কামরান পরামর্শ দিল। “বিশ্ববিদ্যালয় ছুটিতে যাবে, তাই তাকে পাকিস্তান বাড়ি ডেকে পাঠাও। তারপর মম্মি তাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসুক এবং তার পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকুক।”
সিকন্দর কামরানের পরামর্শ মানল। ছুটির শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে, সে নিউ হেভেনে পৌঁছাল। সালারের দৃশ্য দেখে সিকন্দারের মুখে কেঁপে উঠল, কিন্তু সে বিরোধ করল না। শুধু সালারকে ছুটির জন্য বাড়ি যেতে বলল। সালার পড়াশোনা ও ক্লাস নিয়ে অজুহাত করল, কিন্তু সিকন্দর তা উপেক্ষা করে তার ফ্লাইটের জন্য টিকিট বুক করল। অনিচ্ছায়, সালার পাকিস্তান ফিরে এল।
---
সন্ধ্যা একটার সময় তারা পাকিস্তানে পৌঁছল। সিকন্দর এবং তাইবা নিজেদের কক্ষে চলে গেল; সালার তার নিজের কক্ষে গেল। প্রায় দেড় বছর পরে সে তার ঘর দেখছিল—সবকিছু আগের মতোই। সে আলো বন্ধ করল এবং শুয়ে পড়ল। ফ্লাইটে সে একটু ঘুমিয়েছিল, তাই এখন ঘুম পাচ্ছিল না। সম্ভবত সময়ের পার্থক্যও এর কারণ।
“দেখতে হবে, আমি ধীরে ধীরে নিদ্রাহীন হয়ে যাচ্ছি,” সে অন্ধকার ঘরে শুয়ে বলল। কিছুক্ষণ উল্টোদিকি ঘুরে পরে সে বসল; তারপর জানালার দিকে গেল এবং পর্দা খুলল। প্রশস্ত লনের ওপারেই হাশিম মুবিনের বাড়ি। সালার এই বাড়ির দিকে আগে কখনো মনোযোগ দেনি, কিন্তু এবার সে প্রথম তলার আলো দেখে পুরো বিল্ডিংটা খুঁটিয়ে দেখল। স্মৃতিগুলো হঠাৎ ভেসে এলো—সে পর্দা বন্ধ করল।
পরের দিন সে নাসিরাকে জিজ্ঞেস করল, “ওয়াসিমের পরিবার ইমামাকে খুঁজে পেয়েছিল?”
নাসিরা তাকে সন্দিহান চেহারা দেখালো।
“না, জী, কোনো চিহ্ন নেই। তারা সবখানেই দেখেছে, কিন্তু কোনো চিহ্ন মেলেনি। এখনো তারা তোমার ওপর সন্দেহ করে, জানো? সালমা বিবি তোমার অভিশাপ দেয়।”