ফন্ট সাইজ:
থিম:
পীর এ কামিল

৩০তম পর্ব

লেখক: উমেরা আহমেদ

সালার বলতে চেয়েছিল, “আল্লাহর দোহাই, এটা সত্যি নয়!” — কিন্তু কথা বের হলো না, শুধু তাকিয়ে রইল।

“আমি ডাক্তারকে কী বলব? যে সে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে অভ্যস্ত? যে সে জন্ম থেকেই সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করে?”

সালার কখনো সিকান্দার উসমানকে এত রাগান্বিত দেখেনি। মনে হলো, তারা সত্যিই তার ওপর বিরক্ত ও ক্লান্ত। তাইয়্যবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“প্রতিবছর নতুন নাটক, নতুন ঝামেলা। তোমাকে জন্ম দিয়ে আমরা কী পাপ করেছি?”

সিকান্দার উসমানের ধারণা ছিল, এটা আবারো কোনো নতুন অ্যাডভেঞ্চার। সালারের আঘাত ডাকাতির প্রমাণ হতে পারে না—বিশেষ করে যখন কোনো সাক্ষী নেই, আর এই ছেলেটি এর আগেও চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

সালার ‘নেকড়ে! নেকড়ে!’ বলে মিথ্যে চিৎকার করার গল্পটার কথা মনে করল। অনেক গল্পই সত্যি হয়।

তার অবিরাম মিথ্যাচার তাকে অন্যদের আস্থা থেকে বঞ্চিত করেছে। হয়তো সে সবই হারিয়েছে—মান-সম্মান, আত্মসম্মান, গর্ব, আস্থা—সে যেন সত্যিকার অর্থেই পতনের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে।

“অনেকদিন ধরে তুমি কোনো নতুন নাটক করনি, তাই ভেবেছ—আমার বাবা-মাকে কেন বঞ্চিত রাখি? অনেকদিন ধরে তারা অপমানিত বা বিব্রত হয়নি—এবার তাদের নতুন করে আঘাত দেওয়ার সময় এসেছে!”

“সিকান্দার, হয়তো সে সত্য বলছে। অন্তত গাড়িটার ব্যাপারটা পুলিশকে জানানো উচিত,” সালারের প্যাডে লেখা কথা পড়ে তাইয়্যবা বললেন।

“তুমি কি মনে করো সে সত্য বলছে? সে কখনো সত্য বলেছে? আমি তার এসব বাজে কথার একটাও বিশ্বাস করি না। তোমার এই ছেলে একদিন আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে, আর তুমি বলছ পুলিশকে যেতে! নিজেকে হাসির পাত্র বানাতে? সে নিশ্চয়ই গাড়িটার সঙ্গেও কিছু করেছে—হয়তো বিক্রি করে দিয়েছে বা কোথাও লুকিয়ে রেখেছে।”

এবার সে সত্যিই সালারকে গালাগালি করছিল—যা সালার কখনো শুনতে হয়নি। সিকান্দার তাকে কেবল বকতেন, কিন্তু তাতেও সালার প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া দেখাত। চার ভাইয়ের মধ্যে সে-ই একমাত্র ছিল যে সামান্য বকাও সহ্য করতে পারত না, তাই সিকান্দার সবসময় তাকে খুব সতর্ক হয়ে কথা বলতেন। কিন্তু আজ সালার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।

সে বুঝতে পারল তার বাবা কতটা হতাশ। জীবনে প্রথমবার, বিছানায় বসে সে তার বাবা–মায়ের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করল। তারা তাকে কী দেয়নি? কথা না বলতেই তার সব ইচ্ছে পূরণ করেছে। আর সে বিনিময়ে কী দিয়েছে? মানসিক কষ্ট, উদ্বেগ, দুঃখ? তার ভাই-বোনদের কেউই এমন সমস্যা তৈরি করেনি। শুধু সে-ই…

“একদিন, তোমার কারণে হয়তো আমাদের দু’জনকেই আত্মহত্যা করতে হবে।”

“তাহলেই তুমি নিজের সঙ্গে শান্তিতে থাকতে পারতে।”

গতরাতে, পাহাড়ের চূড়ায় বাঁধা অবস্থায়, জীবনে প্রথমবার সালারের বাবা–মাকে খুব মনে পড়েছিল। সে বুঝেছিল, তাদের ছাড়া সে কিছুই না—তাদের ছাড়া সে কোথায় যাবে, তার খোঁজ নিবে কে? জীবনে প্রথমবার, সিকান্দারের কথাগুলো তার অহংবোধে আঘাত করেনি। বাবা–মায়ের মধ্যে সিকান্দারের সঙ্গেই সে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিল, আর সবচেয়ে বেশি ঝগড়াও হতো তার সঙ্গেই।

“আমি তোমার মুখ আর দেখতে চাই না। আমি চাই তোমাকে আবার সেই জায়গায় ফেলে আসা হোক, যার সম্পর্কে তুমি মিথ্যে বলছ!”

“এবার থামো, সিকান্দার,” তাইয়্যবা আপত্তি জানালেন।

“আমি কেন থামব? সে কেন থামে না? আমাদের ওপর একটু দয়া করে কেন তার এসব কাণ্ড বন্ধ করে না? আমাদের জীবনকে নরকে পরিণত করার জন্যই কি তাকে পাঠানো হয়েছে?” আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন সিকান্দার।

“আর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ আসবে, যারা তাকে রাস্তা থেকে পেয়েছে, এবং তারা তার বিবৃতি নেবে। আর সে তাদের কাছে সেই বানানো গল্পই শুনাবে—যে সে তো একদম নির্দোষ, আর তাকে নাকি লুট করা হয়েছে! সত্যি বলতে, যদি ওকে সত্যিই লুট করে পাহাড় থেকে ফেলে দিত, তাহলে হয়তো আমার সমস্যাগুলো শেষ হয়ে যেত!”

এ কথা শুনে সালার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল—হাত জোড় করে, অবিরাম। সিকান্দার আর তাইয়্যবা হতবাক হয়ে গেলেন। জীবনে এই প্রথম তারা তাকে কাঁদতে দেখছেন—তা-ও আবার হাত জোড় করে মিনতির ভঙ্গিতে! সে কী চাইছে? কী বলতে চাইছে?

সিকান্দার উসমান একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাইয়্যবা বিছানায় বসে তাকে বুকে টেনে নিলেন এবং বুক চাপড়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আর সালার, একদম ছোট্ট শিশুর মতো, তার সঙ্গে লেগে রইল।

বিছানার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে সিকান্দারের হঠাৎ মনে হলো—হয়তো এইবার ছেলেটি সত্যিই মিথ্যে বলছে না…হয়তো সত্যিই তার সাথে কিছু ঘটেছে। তাইয়্যবার বুকে মুখ গুঁজে সে শিশুর মতো কাঁদছে…তাইয়্যবা নিজেও চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। ছোট-বড় কোনো বিষয়েই সে কখনো কান্না করত না—তাহলে আজ এমন কী ঘটেছে, যার কারণে তার কান্না থামছেই না?

সেখানে দাঁড়িয়ে সিকান্দারের মন পাল্টে গেল।

“যদি সত্যিই ওকে সারারাত ওভাবে বেঁধে রাখা হয়ে থাকে…?”

গতরাতটা তিনি জেগে ছিলেন, সালারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আর রাগে জ্বলছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন সালার আবার গাড়ি নিয়ে লাহোর কিংবা অন্য কোথাও ঘুরতে গেছে। তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু ছেলের স্বভাব তিনি জানতেন—তাই উদ্বেগের চেয়ে রাগই বেশি ছিল। ভোর তিনটার দিকে তিনি শুতে গেলেন, যখন পুলিশ তাকে ফোন করে খবর দেয়।

সিকান্দার ছুটে হাসপাতালে যান এবং সালারকে খুব গুরুতর অবস্থায় পান। কিন্তু তবুও তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে ছেলেটি কোনো ঘটনার শিকার। কারণ তিনি জানতেন, সালার মাঝে মধ্যেই নিজেকে আঘাত দিত। যে ছেলে নিজের কবজি কাটতে পারে, মোটরবাইককে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন