ফন্ট সাইজ:
থিম:
পীর এ কামিল

৩৭তম পর্ব

লেখক: উমেরা আহমেদ

তাদের রাস্তার মাঝখান থেকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল। ভারী ট্রাফিকের মধ্যে হঠাৎ ব্রেক কষলেও ভাগ্য ভালো যে পেছন থেকে কোনো গাড়ি এসে ধাক্কা দেয়নি।

সালার সিটে দুমড়ে বসে পড়েছিল, দু’হাতে চোয়াল চেপে ধরে। সম্বিত ফিরে পেয়ে আকিফ গাড়িটা পাশের একটি নিরিবিলি বাই-লেনে ঢুকিয়ে থামাল। ততক্ষণে সালার সোজা হয়ে বসেছে, এক হাত দিয়ে মুখ আর থুতনি ঢেকে সামনে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে যে তীব্র রাগ বিস্ফোরিত হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই শান্ত।

আকিফ তার দিকে ফিরে তাকাল।

— “তোমার সমস্যা কী? তুমি হঠাৎ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে কেন? আমি কী করেছি?”

কথা বলতে বলতে সে ড্যাশবোর্ডে রাখা টিস্যুর বাক্সটা সালারের দিকে এগিয়ে দিল—সালারের শার্টে কয়েক ফোঁটা রক্ত সে লক্ষ্য করেছিল।

সালার দু-একটা টিস্যু বের করে ঠোঁটের কাটা জায়গাটা পরিষ্কার করতে লাগল।

— “ভয়ংকর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত…” আকিফ বলল।

হাত মুছতে মুছতে সালারের আবার কানের দুলগুলোর কথা মনে পড়ল। সে পায়ের কাছে খুঁজতে শুরু করল।

— “গাড়িটা ফুটপাথে উঠে যেতে পারত…” আকিফের কথা থেমে গেল। সে সালারের দিকে তাকাল।

— “তুমি কী খুঁজছ?”

— “ওই কানের দুলগুলো,” সংক্ষেপে উত্তর দিল সালার।

আকিফ সত্যিই বিরক্ত হয়ে উঠল।

— “সমস্যাটা কী, সালার? সে আমার গার্লফ্রেন্ড। কানের দুলগুলো তার, আর সেটা আমার বা তার ব্যাপার—তোমার নয়।”

নিজের বোকামিটা তখন সালারের চোখে পড়ল। সে সোজা হয়ে বসে টিস্যুগুলো ছুড়ে ফেলল এবং বাইরে তাকাল। তার দম আটকে আসছিল। আকিফ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

— “তুমি আর সানোবর…” সাবধানে কথা শুরু করল আকিফ। সে নিশ্চিত ছিল না তার আগের কথার কোন অংশ সালারকে এতটা ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল, তাই আর কিছু বলতে চাইছিল না যা তাকে আবার উসকে দেবে।

— “আমি দুঃখিত,” আকিফ থামলে সালার বলল।

— “ঠিক আছে, ঠিক আছে,” কিছুটা স্বস্তি পেল আকিফ। “তুমি আর সানোবর…” সে আবার থেমে গেল।

— “তুমি বলেছিলে, তার নাম ইমামা,” আকিফের দিকে তাকাল সালার। তার চোখের দৃষ্টি আকিফকে ভীত করে তুলল—সেটা মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। ভয়, অসহায়ত্ব, আতঙ্ক—নানান অনুভূতি একসাথে ফুটে উঠছিল তার চোখে।

— “হ্যাঁ, শুরুতে নিজের কথা বলতে গিয়ে সে একবার বলেছিল… তখন।”

— “তুমি কি ওকে একটু বর্ণনা করতে পারবে?” ক্ষীণ এক আশা নিয়ে সালার জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ, অবশ্যই,” কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বলল আকিফ। “খুব সুন্দর, লম্বা, ফর্সা…”

কীভাবে এগোবে বুঝতে পারছিল না সে।

— “তার চোখ কালো, আর চুল আগে কালো ছিল… এখন রং করে। আর কী বলব?”

সে ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠছিল।

অস্থির হয়ে উঠছিল সে।

সালার চোখ বন্ধ করে মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল ক্রমেই। বাইরে তাকিয়ে সে অস্পষ্ট স্বরে বলল,

— “তার নাম কি ইমামা হাশিম?”

…………………………

— “আমি জানি না। সে আমাকে তার বাবার নাম বলেনি, আমিও জিজ্ঞেস করিনি,” আকিফ উত্তর দিল।

— “সে ইমামা হাশিম,” বিড়বিড় করে বলল সালার। তার মুখটা মেঘে ঢেকে গেল।

— “সবকিছু আমার কারণেই হয়েছে—এর জন্য আমি দায়ী।”

— “তুমি কিসের জন্য দায়ী?” কৌতূহলী হয়ে উঠল আকিফ।

সালার উইন্ডস্ক্রিনের ওপার দিয়ে নীরবে সামনে তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিট পর আকিফের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল,

— “আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই। এখনই।”

কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আকিফ। তারপর ড্যাশবোর্ড থেকে মোবাইলটা তুলে কল করতে লাগল। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

— “ওর মোবাইল বন্ধ। ও বাড়িতে আছে কি না তাও জানি না, কারণ অন্ধকার হয়ে আসছে আর সে…”

আকিফ কথা থামিয়ে ইগনিশন চালু করল।

— “তবু আমি তোমাকে ওর বাড়ি নিয়ে যেতে চাই।”

আধঘণ্টা পরে তারা দু’জন ডিফেন্স এলাকার একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে পৌঁছানো পর্যন্ত তারা কেউ কোনো কথা বলেনি। সালারকে লিফট দেওয়ার মুহূর্তটাকে এখন আকিফ মনে মনে অভিশাপ দিচ্ছিল। কয়েকবার হর্ন দেওয়ার পর একজন লোক বেরিয়ে এল। সে ছিল চৌকিদার।

— “সানোবর কি বাড়িতে আছে?” তাড়াহুড়ো করে জিজ্ঞেস করল আকিফ।

— “না, বিবি সাহিবা বাড়িতে নেই।”

— “সে কোথায়?”

— “জানি না।”

আকিফ সালারের দিকে তাকাল। তারপর গাড়ির দরজা খুলে বলল,

— “এখানে অপেক্ষা করো। আমি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসছি।”

লোকটার সঙ্গে আকিফ ভেতরে ঢুকল।

দশ মিনিট পর সে ফিরে এল।

— “তুমি কি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাও?” গাড়িতে উঠেই সে জিজ্ঞেস করল।

— “আমাকে ওর সঙ্গে দেখা করতেই হবে।”

আকিফ আবার ইগনিশন চালু করল।

আবার তারা নীরবে চলতে লাগল। রাত প্রায় ন’টা বাজতে চলেছে যখন তারা রেড লাইট এরিয়ায় পৌঁছাল। জায়গাটা সালারের কাছে নতুন ছিল না; নতুন ছিল শুধু সেই তীব্র যন্ত্রণা, যা সে এখন অনুভব করছিল।

— “আজ সে এখানেই আছে। এখান থেকে কিছু মেয়েকে কোনো একটা অনুষ্ঠানের জন্য বুক করা হয়েছে, সে তাদের সঙ্গেই যাচ্ছে,” গাড়ি থেকে নামতে নামতে আতিফ ব্যাখ্যা করল।

— “তুমিও নামতে পারো, কারণ আমাদের অনেকটা ভেতরে যেতে হবে। আমি গাড়ি নিয়ে আর…”

— “আমি সানোবরকে এখানে এনে তোমার সঙ্গে দেখা করাবো!”

সালার গাড়ি থেকে নামল।

আকিফের সঙ্গে সে আবার সেই গলিগুলো ধরে হাঁটতে শুরু করল। আগেরবার সে যখন এমন জায়গায় এসেছিল, সেই স্মৃতিটা তার খুব স্পষ্ট মনে ছিল। কিছুই বদলায়নি—একই গোপন পদ্ধতিতে এখনো মানুষের শরীর বেচাকেনা হচ্ছে।

প্রথমবার এখানে আসার কথাটাও তার খুব ভালো মনে আছে। তখন তার বয়স ছিল আঠারো—আর তারপর সে বহুবার এখানে এসেছে। কখনো নাচ দেখার জন্য, কখনো কোনো নামকরা অভিনেত্রীর পারফরম্যান্স দেখতে, কখনো এই গলিগুলোর দরজা, জানালা বা ছাদের বারান্দা থেকে উঁকি দেওয়া বা ঝুলে থাকা আধা-নগ্ন মেয়েদের দেখতে।

(এই গলিগুলো দিয়ে হাঁটার সময় তার ভেতরে এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি কাজ করত। এখানে সে যে কাউকে—চেহারা বা বয়স নির্বিশেষে—কয়েক ঘণ্টার জন্য কিনতে পারত। তার মানিব্যাগে থাকা নোটগুলো প্রদর্শিত যে কোনো মেয়ের ওপর তাকে পূর্ণ অধিকার দিত। এটাকে আর কী বলা যায়—নিজেকে পৃথিবীর শীর্ষে মনে হওয়া, যেন গোটা দুনিয়াই তার মুঠোয়? সে নিজেকে ভীষণ উচ্ছ্বসিত অনুভব করত।)

আর কখনো কখনো সে এখানে আসত এই নারীদের সঙ্গে রাত কাটাতে—যাদের সে ঘৃণা করত; যে নারীরা কয়েক টাকার জন্য নিজেদের শরীর বিক্রি করত। ঘৃণা ছাড়া তাদের জন্য তার আর কী অনুভূতিই বা থাকতে পারে? তবু ঘৃণা করলেও সে তাদের কিনত, কারণ তার সেই সামর্থ্য ছিল। এমনকি আঠারো-উনিশ বছরের যুবক বয়সেও সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত—এখানে এমন কোনো নারী নেই, যার সঙ্গে তার সামাজিক সম্পর্ক হতে পারে, রক্তের সম্পর্ক হতে পারে, বা যার প্রেমে সে পড়তে পারে।

তার মা ও বোন ছিলেন অভিজাত শ্রেণির মানুষ। তার স্ত্রীও সেই একই অভিজাত পটভূমি থেকেই আসবে, তার মেয়েও।

কিন্তু রেড লাইট এরিয়ার নারীরা……তারা যেন এই কাজের জন্যই জন্মেছে—সে এমনটাই বিশ্বাস করত। উঁচু করে ধরা গলা, উঁচু চিবুক আর কপালে তোলা ভ্রু নিয়ে সে তাদের প্রতি নিজের ঘৃণার কোনো সীমা খুঁজে পেত না।

আর এখন… ভাগ্য তার সঙ্গে কী খেলাই না খেলেছে! যে নারী একসময় সাত পর্দার আড়ালে ছিল, যাকে অন্য কোনো পুরুষের স্পর্শ কল্পনাও করতে পারত না সে—আজ সেই নারীই এই বাজারে নিক্ষিপ্ত। কয়েক পা সামনে হেঁটে যাচ্ছে তারই খদ্দের, আর সালার সিকান্দার মুখ খুলতে পারছে না, গলা তুলতে পারছে না, প্রতিবাদও করতে পারছে না।

সে কাকে কী বলবে? সে কি আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করতে পারে—কেন এমন হলো তার সঙ্গে? সে কী অপরাধ করেছিল?

সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার শরীরের কাঁপুনি সে কীভাবে থামাবে? এই রাস্তাগুলোয় যে পুরুষ আসে, সে কি বুক ঠুকে বলতে পারে—তার পরিবারের কোনো নারী কোনোদিন এই বাজারে আসবে না? নিজেকে আরেকজন পুরুষের কাছে বিক্রি করবে না?

তার মা, বোন, স্ত্রী, মেয়ে, নাতনি—বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কেউই কি এখানে এসে দাঁড়াবে না?

সালার সিকান্দার বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইমামা হাশিম ছিল তার স্ত্রী—তার সঙ্গে তার বৈধ বিয়ে হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন উচ্চবিত্ত নারী, যার সঙ্গে এই জায়গার কোনো সম্পর্কই থাকতে পারে না। সালার সিকান্দার আবার নিজেকে মার্গাল্লা পাহাড়ের অন্ধকারে সেই গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় অনুভব করল। সে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছিল।

— “সাহেব! আমার সঙ্গে চলুন। সব বয়সের মেয়ে আছে আমার কাছে। এখানকার সেরা মেয়েরা—দামও খুব বেশি না,” একজন লোক তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।

— “আমি এই উদ্দেশ্যে এখানে আসিনি,” লোকটার দিকে না তাকিয়েই নিচু স্বরে বলল সালার।

— “মদ বা নেশা চাই? যা চাইবেন, সব জোগাড় করে দিতে পারি।”

আকিফ হঠাৎ থেমে গিয়ে কঠোর স্বরে লোকটাকে ধমক দিল,

— “একবার আপনাকে বলা হয়েছে, আমাদের কিছুই চাই না। তাহলে আমাদের পেছনে লেগে আছেন কেন?”

লোকটা থেমে গেল। সালার চুপচাপ এগিয়ে চলল। তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। কবে, কেন, আর কীভাবে ইমামা হাশিম এখানে এসে পৌঁছাল? অতীতটা তার সামনে সিনেমার পর্দার মতো খুলে যেতে লাগল।

— “প্লিজ, একবার… মাত্র একবার ওর কাছে যান। আমার সম্পর্কে সবকিছু ওকে বলুন, আর ওকে আমাকে বিয়ে করতে বলুন। আমি তার কাছ থেকে কিছুই চাই না, শুধু তার নামটাই চাই। আপনি যদি নবীজির (সা.) নামে অনুরোধ করেন, সে কখনোই না করবে না। সে নবীজিকে (সা.) ভীষণ ভালোবাসে,”

কয়েক বছর আগে ফোনে তার সেই মিনতির কণ্ঠ সে শুনেছিল—আর সে তখন বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে চিপস খাচ্ছিল।

— “আচ্ছা, ইমামার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কী?” কৌতূহলী হয়েছিল জালাল।

— “ইমামা… ইমামা আর আমি খুব ঘনিষ্ঠ, অনেক দিনের বন্ধু।”

জালাল আনসার ভ্রু কুঁচকেছিল। সালার অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস অনুভব করেছিল। জালাল তার আর ইমামার সম্পর্ক নিয়ে কী ভাবছে, সেটা সে খুব ভালোই বুঝতে পারছিল।

— “ওকে পরিষ্কার বলে দিন, আমি ওকে বিয়ে করব না।”

জালাল আনসারের এই বার্তাটা যখন ইমামার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল, তখন তার মুখটা কেমন হয়েছিল—সেটা দেখতে সে ভীষণ চেয়েছিল। ফোনে সে ইমামাকে জালালের জবাব জানিয়েছিল, আর তখন সে চুইংগাম দিয়ে বুদবুদ ফাটাচ্ছিল।

— “আপনি তো আমার জন্য এত কিছু করেছেন, আরেকটা উপকার করুন। আমাকে তালাক দিন,”

পরে ফোনে কাঁদতে কাঁদতে সে অনুনয় করেছিল।

— “ওহ না! তোমার জন্য উপকার করতে করতে আমি ক্লান্ত। আর কিছু করছি না। আর এই উপকার? এটা অসম্ভব,” সে জবাব দিয়েছিল।

— “তালাক চাইলে কোর্টে গিয়ে নাও, কিন্তু আমি তোমাকে তালাক দেব না।”

সালারের গলা দমবন্ধ হয়ে আসছিল।

— “হ্যাঁ, আমি এসবই করেছিলাম। কিন্তু জালাল আনসার সম্পর্কে তার যে ভুল ধারণা ছিল, আমি সেটা ভেঙে দিয়েছিলাম। আমি তাকে সবকিছু বলেছিলাম; কিছুই গোপন রাখিনি। এটা শুধু একটা ঠাট্টা ছিল, এক ধরনের প্র্যাঙ্ক। ইমামার সঙ্গে এমনটা হোক, আমি চাইনি,”

নিজের বিবেকের সামনে সে যেন আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করছিল।

— “এটা সত্যি যে তাকে তালাক না দিয়ে আমি তার ওপর অন্যায় করেছি, কিন্তু… কিন্তু… কিন্তু আমি কখনোই চাইনি সে এখানে এসে ফাঁদে পড়ুক। আমি…”

— “…করেছিলাম… আমি ওকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে মানা করেছিলাম। মজা করে হলেও আমি তাকে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আমি ওকে এখানে নিয়ে আসিনি। এসবের জন্য আমাকে কেউ দায়ী করতে পারে না।”

সে এলোমেলোভাবে নিজের কাজের ব্যাখ্যা দিচ্ছিল। তার মাথা যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল। সে থেমে কপালের দু’পাশে হাত বুলাতে লাগল—তার পরিচিত সেই তীব্র মাইগ্রেনের আরেকটা আক্রমণ শুরু হওয়ার আভাস সে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ব্যথা কমে এল। চোখ খুলে সে দেখল—একটা আঁকাবাঁকা গলি। এটা ছিল একটা অন্ধ গলি—অন্তত তার আর ইমামা হাশিমের জন্য। সে এগিয়ে গেল।

আকিফ একটি বহুতল বাড়ির সামনে থেমে সালারের দিকে ফিরে তাকাল।

— “এই বাড়িটাই।”

সালারের মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। হিসাব-নিকাশের শেষটা আর কত দূরে?

— “আমাদের একেবারে ওপরের তলায় যেতে হবে। সানোবর ওখানেই থাকবে।”

এই কথা বলে আকিফ অন্ধকার আর সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। প্রথম ধাপেই সালার হোঁচট খেল। আকিফ ঘুরে তাকিয়ে থেমে গেল।

— “সাবধানে ওঠো, সিঁড়ির অবস্থা ভালো না। তাছাড়া, ওরা একটা বাল্ব লাগানোর কষ্টও করে না।”

সালার নিজেকে সামলে নিয়ে দেয়াল ধরে ধরে পরের ধাপে পা রাখল। সিঁড়িটা ছিল পেঁচানো আর এতটাই সরু যে একসঙ্গে একজনের বেশি ওঠা সম্ভব নয়। সিমেন্টও অনেক জায়গায় ভেঙে গেছে। বুট পরে থাকলেও সে সিঁড়ির নড়বড়ে অবস্থা টের পাচ্ছিল। যে দেয়ালে সে ভর দিচ্ছিল, সেখানকার সিমেন্টও খসে পড়েছিল।

অন্ধ মানুষের মতো দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে সালার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

প্রথম তলার একটি খোলা দরজা দিয়ে আসা আলোয় সে কিছুটা দেখতে পেল। সেখানে আকিফ ছিল না। নিশ্চয়ই সে দরজা পেরিয়ে সামনে চলে গেছে। সালার ক্ষণিক থামল, তারপর সেও ভেতরে ঢুকল।

এখন সে দাঁড়িয়ে আছে একটি বারান্দায়। এক পাশে অনেকগুলো ঘরের দরজা, আর অন্য পাশে নিচের গলিটা দেখা যায়। করিডোরের মতো সেই বারান্দাটা একেবারে ফাঁকা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখল—সব ঘরের দরজাই বন্ধ। আকিফ কোথায় গেল, সে বুঝতে পারল না।

ভীষণ সাবধানে সে সামনে এগোতে লাগল, যেন জায়গাটা ভূতের বাসা। তার মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে কোনো দরজা খুলে যাবে আর হঠাৎ করেই ইমামা হাশিম তার সামনে এসে দাঁড়াবে।

— “হে আল্লাহ! কীভাবে… কীভাবে আমি ওর মুখোমুখি হব এখানে?”

তার বুক ধক করে উঠল।

বন্ধ দরজাগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সে হাঁটছিল, ঠিক তখনই বারান্দার একেবারে শেষ মাথার একটি দরজা থেকে আকিফ বেরিয়ে এল।

— “তুমি কোথায় ছিলে?” দূর থেকে জোরে ডাকল সে। “এদিকে এসো।”

সালার তাড়াতাড়ি এগোল, কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর ঠিক আগে সে এক মুহূর্ত থেমে গেল। নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছিল। সে চোখ বন্ধ করল, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো মুঠো করল, আর ঘরে ঢুকল।

ভেতরে ঢুকে সে দেখল—আকিফ একটি চেয়ারে বসে আছে…

একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিল সে, যে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল।

— “এটা ইমামা নয়!” সালার চিৎকার করে উঠল।

— “অবশ্যই এটা ইমামা নয়—সে ভেতরে আছে। এসো।”

কথা বলতে বলতে আকিফ উঠে দাঁড়িয়ে আরেকটা ঘরের দরজা খুলল। টলমল পায়ে সালার তার পিছু নিল। আকিফ আরেকটা ঘর পেরিয়ে গিয়ে আরও একটি ঘরের দরজা খুলে ঢুকে পড়ল।

— “হ্যালো, সানোবর!” দূর থেকে আকিফের ডাক সালারের কানে এল। তার হৃদয় যেন গলায় উঠে এল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—সে এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাবে…এই মুহূর্তেই…অন্ধের মতো…পিছনে না তাকিয়ে…এই বাড়ি থেকে…এই এলাকা থেকে…এই শহর থেকে…এই দেশ থেকে…আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। পাশে থাকা দরজাটার দিকে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।

— “ভেতরে এসো, সালার,” আকিফ ডাকল।

সে মুখ ঘোরাল—একজন মেয়ের সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত ছিল আকিফ। সালার জোরে ঢোক গিলল; তার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে সামনে এগোল। সালারের পায়ের শব্দ শুনে আকিফ সরে দাঁড়াল। দরজার মুখে এসে দাঁড়াল সালার। ঘরের একেবারে শেষ প্রান্তে সে দাঁড়িয়ে ছিল।

— “এটাই সানোবর,” আকিফ তাকে পরিচয় করিয়ে দিল।

সালার চোখ ফেরাতে পারছিল না। সেও স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

— “ইমামা?”

সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে, স্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল।

— “হ্যাঁ, ইমামাই,” আকিফ নিশ্চিত করল।

সালার মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আকিফ হতবাক।

— “কী হয়েছে? কী হয়েছে?”

মাথা চেপে ধরে সালার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। সে ছিল প্রথম পুরুষ, যে একজন পতিতার সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল। আকিফ হাঁটু গেড়ে বসে, সিজদারত সালারের কাঁধ ঝাঁকাতে লাগল—যে শিশুর মতো কেঁদে চলেছে।

— “পানি… পানি আনব?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল সানোবর।

দ্রুত সে খাটের পাশে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি এনে সালারের পাশে বসে পড়ল।

— “সালার সাহেব! একটু পানি খান।”

হঠাৎ যেন শরীরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল—সালার ঝটকা দিয়ে সোজা হয়ে বসে পড়ল। তার মুখটা অশ্রুতে ভেজা। একটি কথাও না বলে সে জিন্সের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল এবং তার ভেতরের নোটগুলো একে একে মেয়েটার সামনে রাখতে লাগল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার মানিব্যাগ খালি হয়ে গেল—শুধু ক্রেডিট কার্ডটা পড়ে রইল।

তারপর একটি কথাও না বলে সে উঠে দাঁড়াল এবং দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। হতভম্ব আকিফ তার পিছু নিল।

— “সালার! সালার! কী হয়েছে? কী ঘটেছে? তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

সে কাঁধ ধরে থামাতে চাইলে সালার উন্মাদের মতো নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।

— “আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছোঁবে না; শুধু যেতে দাও!”

উন্মত্তভাবে কাঁদতে কাঁদতে সে চিৎকার করছিল।

— “তুমি তো ইমামার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে,” তাকে মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করল আকিফ।

— “সে ইমামা নয়, সে ইমামা হাশিম নয়!”

— “ঠিক আছে, কিন্তু তোমাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে।”

— “আমি যাব, আমি নিজেই যাব। তোমার দরকার নেই।”

সে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। আকিফ অস্পষ্টভাবে কিছু একটা বলল। সে খুব বিচলিত ছিল। নোটের স্তূপটার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা সানোবরের দিকে সে ফিরে তাকাল।

---

সিঁড়িগুলো তখনো অন্ধকারই ছিল, কিন্তু তার মানসিক অবস্থায় তার দেয়ালের ভর বা আলো—কোনোটারই দরকার ছিল না। অন্ধের মতো সে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ছুটে নামল এবং ভয়ানকভাবে পড়ে গেল। সিঁড়িগুলো যদি সোজা হতো, তবে সে একেবারে নিচ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ত; কিন্তু পেঁচানো সিঁড়িগুলো তার পতন কিছুটা থামিয়ে দিল। সে আবার অন্ধকারেই উঠে দাঁড়াল। হাঁটু আর গোড়ালির ব্যথা উপেক্ষা করে সে আবার সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামার চেষ্টা করল।

কয়েক মিনিট নামার পর, তার এক লাফ তাকে মাটিতে এনে ফেলল। এবার দেয়ালে মাথাও আঘাত পেল। কোনো হাড় না ভাঙায় সে ভাগ্যবান ছিল। যদি তখনও অনেকগুলো সিঁড়ি বাকি থাকত, তবে হয়তো সে আবারও দৌড়ে নামার চেষ্টা করত, কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়েই সে নিচের সিঁড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল। সামনে সে স্ট্রিটলাইটের আলো দেখতে পেল।

সে সিঁড়ি থেকে নেমে এল, কিন্তু আর এগোতে পারল না। তবু কয়েক পা এগিয়ে বাড়ির বাইরের নিচু দেয়ালের ওপর বসে পড়ল। তার বমি বমি লাগছিল। মাথা চেপে ধরে সে অনুভব করল—বমি অনিবার্যভাবে উঠে আসছে, আর সে ঝুঁকে পড়ল। অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁদতে কাঁদতে সে বারবার বমি করতে লাগল।

রাস্তায় চলাচলকারীদের কাছে এটা নতুন কিছু ছিল না। এখানে যারা বেশি মদ খেয়েছে বা অতিরিক্ত নেশা করেছে, তাদের এমন অবস্থাই দেখা যায়। শুধু তার পোশাক আর চেহারাই তাকে কিছুটা সম্মানজনক করে তুলছিল, আর তার চোখের জল আর বিলাপ—হয়তো ওপরের কোনো প্রেমিকার প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ধরা হচ্ছিল। এখানে তথাকথিত ভদ্রলোকদের হৃদয়ভাঙা কান্না খুব সাধারণ দৃশ্য। পতিতালয় সবার জন্য সহনীয় জায়গা নয়। পথচারীরা হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। কেউই তার কাছে আসেনি। এই বাজারে অন্যের খোঁজ নেওয়ার কোনো রীতি নেই।

আকিফ নিচে নামেনি। নামলে হয়তো একটু থামত। ইমামা হাশিম সেখানে ছিল না। সানোবর ইমামা হাশিম নয়। কী বিশাল এক বোঝা তার বুক থেকে নেমে গেছে, কী ভয়ংকর যন্ত্রণা থেকে সে রক্ষা পেয়েছে। বেদনার মধ্য দিয়ে নয়, বরং বেদনার উপলব্ধির মধ্য দিয়েই তার কাছে সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে। তাকে সেখানে না পাওয়াই তাকে এই অবস্থায় এনে ফেলেছিল।

সে যদি সত্যিই তাকে সেখানে দেখত—তবে কী হতো? সে আল্লাহকে ভয় পাচ্ছিল, ভীষণ ভয়। তিনি সর্বশক্তিমান—তিনি কী করতে পারেন না? তিনি কত দয়ালু—কোন কোন নিয়ামত তিনি আমাদের থেকে ফিরিয়ে রাখেন? তিনি জানেন, মানুষকে কীভাবে মানুষ হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

কখনো শাস্তির মাধ্যমে, কখনো অনুগ্রহের মাধ্যমে—তিনি জানেন মানুষকে কীভাবে তার মানবসীমার মধ্যেই বেঁধে রাখতে হয়।

সালার জীবনের এই অন্ধকার অধ্যায়টি নিয়ে আগে কখনোই এতটা অনুতপ্ত, এতটা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়নি। রাস্তার ধারে বসে মাথা চেপে ধরে সে বিলাপ করছিল—

— “কেন? কেন… কেন আমি এখানে এসেছিলাম? কেন আমি এই নারীদের কিনেছিলাম…? কেন আমি পাপের বোধে জাগতে পারিনি?”

আর এখন… এখন, যখন আমি এসব ছেড়ে এসেছি, তখন কেন… কেন এখন এই যন্ত্রণা? কেন আমি এখন এটা অনুভব করছি? আমি জানি, আমার সব কাজের হিসাব আমাকে দিতেই হবে… কিন্তু হে আল্লাহ! দয়া করে আমাকে এখানে জবাবদিহির মুখে ফেলো না… এভাবে নয়। যে নারীকে আমি ভালোবাসি, তাকে এই বাজারে ফিরিয়ে দিও না।

সে কান্না থামাল—আর ঠিক তখনই উপলব্ধিটা তার ওপর নেমে এল; কোথায়, কীভাবে—সবকিছু সেখানেই স্পষ্ট হয়ে গেল।

— “ভালোবাসা?”

অবিশ্বাস নিয়ে পথচারীদের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করল।

— “আমি কি… আমি কি ওকে ভালোবাসি?”

সে কেঁপে উঠল।

— “আমি কি এই কষ্টটা অনুভব করছি শুধু এজন্যই…? এটা কি অনুশোচনা, নাকি অন্য কিছু?”

সে নিজেই নিজের সঙ্গে তর্ক করছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে আর কখনো এখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।

— “তাহলে এটা অনুশোচনা নয়, এটা ভালোবাসা—যেটার পেছনে আমি ছুটছি।”

সে প্রায় প্রাণহীন অনুভব করছিল।

— “ইমামা কি আমার হৃদয়ে একটা কাঁটা ছিল, নাকি একটা মোহ?”

তার গাল বেয়ে তখনো অশ্রু ঝরছিল।

— “আর এই বাজারে তাকে খুঁজতে গিয়ে আমার পা কেঁপে উঠেছিল, কারণ হৃদয়ের গভীরে আমি তাকে খুব উঁচু আসনে বসিয়ে রেখেছিলাম—এত উঁচুতে যে আমি নিজেই তাকে খুঁজে পাইনি। চেকমেট!”

১৫০+ আইকিউধারী মানুষটিকে যেন উপুড় করে মাটিতে আছড়ে ফেলা হয়েছিল। সে আবার অপ্রতিরোধ্যভাবে কেঁদে উঠল। কোন ক্ষতটা আবার খুলে গেছে? কোন ব্যথাটা তাকে দমবন্ধ করে দিচ্ছে? তার বিবেক তাকে কী দিল, আর কী কেড়ে নিল?

সে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল—হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে। নিজের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পথচারীদের দৃষ্টিকে সে পাত্তা দিল না। নিজের অস্তিত্বকেই সে কখনো এতটা ঘৃণা করেনি, যতটা সে তখন করছিল।

রেড লাইট এরিয়াটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। এতটাই অন্ধকার যে সে সেটাকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। সেটা আবার ফিরে এসে তার জীবনে নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে। বহু বছর আগে সেখানে কাটানো রাতগুলো অশুভ ছায়ার মতো তাকে গ্রাস করছিল; সে সেগুলো থেকে পালাতে পারছিল না। আর যে ভয় এখন তাকে ঘিরে ধরেছে……

— “যদি… যদি সত্যিই ইমামা এই বাজারে এসে পড়ে…? সানোবর ইমামা হাশিম নয়, কিন্তু অন্য কেউ….”

তার মাথার ভেতর ব্যথার ঢেউ উঠল। মাইগ্রেন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিল। সে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে, রাস্তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না। মাথা ফেটে যাওয়ার মতো ব্যথা হচ্ছিল, আর সে কোথাও বসে পড়ল। চারপাশের আলো আর হর্নের শব্দ…

ট্রাফিকের কোলাহল তার মাথার ব্যথা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল, আর তারপর তার মন যেন নেমে গিয়েছিল এক অন্ধকার অতলে।

……………………

কেউ হালকা করে হেসে উঠল, তারপর কিছু বলল… আরেকটা কণ্ঠ তার জবাব দিল। ধীরে ধীরে—খুব ধীরে—সালার সিকান্দার আবার সম্বিত ফিরে পাচ্ছিল। সে ভীষণ ক্লান্ত ছিল, কিন্তু কণ্ঠস্বর চিনতে পারছিল। খুব আস্তে সে চোখ খুলল। আশ্চর্য হলো না। তার থাকার কথা এখানেই—কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের বিছানায়, খুব নরম আর আরামদায়ক এক বিছানায়।

কিছুটা দূরে ফুরকান নিচু স্বরে একজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছিল। সালার গভীরভাবে শ্বাস নিল। কথা বলতে বলতে ফুরকান আর অন্য ডাক্তার দু’জনেই তার দিকে ঘুরে তাকাল, তারপর তার কাছে এগিয়ে এল।

সালার আবার চোখ বন্ধ করল। চোখ খোলা রাখতে তার কষ্ট হচ্ছিল। ফুরকান এসে তার বুকে হালকা করে চাপড় দিল।

— “এখন কেমন লাগছে, সালার?”

সালার চোখ খুলল। হাসার কোনো চেষ্টা করল না। কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— “ভালো…,” সে উত্তর দিল।

অন্য ডাক্তার তার নাড়ি পরীক্ষা করছিল।

সালার আবার চোখ বন্ধ করল। ফুরকান আর ডাক্তার আবার কথা বলতে লাগল। এ সবকিছুর প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না; আসলে সেই মুহূর্তে কোনো কিছুর প্রতিই তার আগ্রহ ছিল না। বাকি সবকিছু যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে—তার অপরাধবোধ, অনুশোচনা, আকিফ, সানোবর… ইমামা… রেড লাইট এরিয়া—সবই একই আছে। তার ইচ্ছে হচ্ছিল, আরও কিছুক্ষণ যদি সে জ্ঞান ফিরে না পেত।

— “তাহলে, সালার সাহেব, আমরা কি একটু বিস্তারিতভাবে কথা বলব?”

ফুরকানের কণ্ঠ শুনে সে চোখ খুলল। ফুরকান বিছানার পাশে রাখা একটা স্টুলে বসে ছিল। অন্য ডাক্তার ঘর ছেড়ে চলে গেছে।

সালার পা দুটো কাছে টানার চেষ্টা করল। ব্যথায় তার মুখ থেকে একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এল। তার গোড়ালি আর হাঁটু ভীষণ ব্যথা করছিল। পা দুটো কম্বলে ঢাকা ছিল, সে দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু বুঝতে পারছিল—তার হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। তার নিজের পোশাক নয়, গায়ে হাসপাতালের পোশাক।

— “কী হয়েছিল?”

পা সোজা করতে করতে কাতর স্বরে বলল সালার।

— “আপনার গোড়ালিতে মচকেছে, দুই হাঁটু আর পেশিতে আঘাত লেগেছে—ফুলে গেছে, তবে ভাগ্য ভালো কোনো হাড় ভাঙেনি। হাত আর কনুইতেও আঘাত আছে, কিন্তু সেখানেও কোনো ফ্র্যাকচার নেই। মাথার পেছনে বাম পাশে ছোট একটা কাটা আছে, কিছুটা রক্তও বেরিয়েছে, তবে সিটি স্ক্যান অনুযায়ী গুরুতর কোনো আঘাত নেই। বুকে ঘষা লেগে হালকা আঁচড় আছে। আর আপনি কীভাবে আঘাত পেলেন—সেই ব্যাপারে বললে…”

— “সেটা তো শুধু আপনিই বলতে পারেন,” দক্ষ ডাক্তারের মতো স্বরে বলল ফুরকান।

সালার নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

— “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম মাইগ্রেনের আক্রমণটা এতটাই তীব্র ছিল যে আপনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা করার পর বুঝলাম, ব্যাপারটা তা নয়। কেউ কি আপনাকে আক্রমণ করেছিল?”

উদ্বিগ্ন হয়ে সে প্রশ্ন করল।

সালার গভীর শ্বাস নিল এবং না-সূচকভাবে মাথা নেড়ে দিল।

— “আপনি আমার কাছে কীভাবে পৌঁছালেন? বা বরং, আমি এখানে এলাম কীভাবে?”

— “আমি আপনার মোবাইলে ফোন করছিলাম, কিন্তু আপনার বদলে অন্য একজন ফোন ধরেছিল। সে আপনার সঙ্গে ফুটপাথে ছিল। ভালো মানুষ—আপনাকে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছিল। সে আপনার অবস্থা আমাকে জানালে আমি তাকে কাছের একটা হাসপাতালে ট্যাক্সিতে করে আপনাকে নিয়ে যেতে বলি। সে তাই করেছিল। পরে আমি সেখানে গিয়ে আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি।”

— “এখন কয়টা বাজে?”

— “সকাল প্রায় ছয়টা। গতরাতে সামীর আপনাকে ব্যথানাশক দিয়েছিল, তাই এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলেন।”

কথা বলতে বলতে ফুরকান বুঝতে পারল—সে যা বলছে, সালার তাতে মোটেও আগ্রহী নয়। সালারের চোখে এক ধরনের শীতল উদাসীনতা ছিল, যেন সে নিজের কথা নয়, কোনো তৃতীয় ব্যক্তির গল্প শুনছে।

— “আবার আমাকে কিছু দিন…”

ফুরকান কথা থামিয়েছে বুঝে সালার বলল। সে চোখ বন্ধ করল, তারপর স্মরণ করার চেষ্টা করে থেমে গেল।

— “হ্যাঁ, আমাকে কোনো ট্রাঙ্কুইলাইজার দিন। আমি অনেকক্ষণ ঘুমোতে চাই।”

— “অবশ্যই, আপনার ঘুম দরকার। কিন্তু কী হয়েছিল, সেটা আমাকে বলুন।”

— “কিছুই না,” প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সালার।

— “আপনি যেমনটা আন্দাজ করেছিলেন—মাইগ্রেন। আর ফুটপাথে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছি।”

ফুরকান গভীর মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকাল।

— “কিছু খেয়ে নিন…”

সালার তাকে থামিয়ে দিল।

— “না… আমি… আমি ক্ষুধার্ত নই। আমাকে… কোনো ট্যাবলেট দিন, কোনো ইনজেকশন দিন—যা খুশি। আমি খুব ক্লান্ত।”

— “ইসলামাবাদে আপনার লোকজনকে…”

সে বাক্য শেষ করতে দিল না সালার।

— “না, তাদের জানাবেন না। আমি বিশ্রাম নিলে নিজেই ইসলামাবাদ চলে যাব।”

— “এই অবস্থায়?”

— “আপনি তো বললেন আমি ঠিক আছি।”

— “ঠিক আছেন, কিন্তু খুব ভালো অবস্থায় নন। কয়েক দিন এখানে লাহোরেই বিশ্রাম নিন। তারপর যেতে পারবেন।”

— “ঠিক আছে; কিন্তু বাবা-মাকে জানাবেন না।”

ফুরকান কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে তার দিকে তাকাল।

— “আর কিছু?” সে ভ্রু কুঁচকাল।

— “ট্রাঙ্কুইলাইজার……”

ভাবনামগ্ন হয়ে ফুরকান তার দিকে তাকাল।

— “আমি কি আপনার সঙ্গে থেকে যাব…?”

— “থেকে কী লাভ? আমি একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ব। আপনি যান। আমি যখন দরকার হবে তখন আপনাকে ফোন করব…”

— “ঘুম থেকে উঠলে আমাকে ফোন করো।”

সে হাতটা চোখের ওপর দিয়ে রাখল। তার তিক্ত স্বভাব এবং শীতল আচরণ ফুরকানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিল। সালারের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক।

— “আমি সামীর সঙ্গে কথা বলব, কিন্তু যদি তুমি ট্রাঙ্কুইলাইজার চাও, আগে কিছু খেতে হবে,” ফুরকান কঠোর স্বরে বলল, উঠে দাঁড়াতে গিয়ে। সালার হাত এখনও চোখের ওপর রাখা ছিল।

যখন সে জাগল, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ঘরটি খালি। আর কেউ ছিল না। শারীরিকভাবে সে সকাল থেকে অনেক বেশি ক্লান্ত অনুভব করছিল। সে কম্বল পা থেকে সরিয়ে ফেলল এবং বাম গোড়ালি ও হাঁটুর তীব্র ব্যথা উপেক্ষা করে পা তুলে বসল। তার অদ্ভুতভাবে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, যেন কেউ তার বুক চেপে ধরেছে।

ছাদ দেখেই সে চিন্তায় পড়ল।

---

হোটেলে ফিরে এসে সে নিজের জিনিসপত্র প্যাক করছিল, তখন ফুরকান দরজায় কড়া কড়া করে ঠকাঠক করল। সালার দরজা খুলল। ফুরকান দেখে সে অবাক হলো। সে ভাবেনি ফুরকান এত তাড়াতাড়ি তার খোঁজে আসবে।

— “তুমি খুব অদ্ভুত মানুষ, সালার…,” ফুরকান সরাসরি তাকে ডাঁটতে শুরু করল।

— “কেউকে কিছু না বলে, তুমি সামীর ক্লিনিক থেকে ফিসফিস করে বেরিয়ে গেলে। আমি তো চিন্তিত হয়ে গিয়েছিলাম, আর তার ওপরে মোবাইলটা অফ রেখেছ!”

সালার কিছু বলল না। সে লঙ্গড়ে পা হাঁটিয়ে ব্যাগের কাছে গেল, যেখানে সে জিনিসপত্র প্যাক করছিল।

— “তুমি যাচ্ছ?” ফুরকান ব্যাগ দেখে বিস্ময়ে বলল।

— “হ্যাঁ…!” সালার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।

— “কোথায়…?”

সালার ব্যাগ জিপ করল এবং বিছানায় বসল।

— “ইসলামাবাদ?” ফুরকান এসে তার সামনে সোফায় বসল।

— “না,” সালার তাকিয়ে উত্তর দিল।

— “তাহলে…?”

— “আমি করাচিতে যাচ্ছি।”

— “কেন?” ফুরকান বিস্ময়ে প্রশ্ন করল।

— “আমার একটা ফ্লাইট আছে।”

— “প্যারিসের জন্য?”

— “হ্যাঁ…!”

— “তোমার ফ্লাইট চার দিনের পর, এত তাড়াতাড়ি গিয়ে কী করবে?” ফুরকান তাকিয়ে দেখছিল। সামীর ঠিকই পড়েছিলেন তাকে। তার অভিব্যক্তি সত্যিই অদ্ভুত, অস্বাভাবিক।

— “আমার সেখানে কাজ আছে।”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন