ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

১০ম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-১০

[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

মেহমেত বর্তমানে আমালিয়ার সেই আয়নার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। আয়নার মাঝে কম হলেও কয়েক লক্ষ আয়না পথ রয়েছে, যা শুধুমাত্র বিভ্রান্ত করার জন্য বানানো। এই এতোগুলো পথের মাঝে শুধু একটি মাত্র সঠিক পথ দ্বারা আয়না রাজ্যে পৌঁছানো সম্ভব। মেহমেত জানে সেই পথ কোনটি। এখানে অদৃশ্য অনেক পথের দিশা রয়েছে কিন্তু যে পথ দিয়ে আয়না রাজ্যে যাওয়া যায় একমাত্র সেই পথে কোনো শব্দ হয় না। অর্থাৎ কাঁচে কাঁচে ঘর্ষণের ফলে যে শব্দ হয় সেই শব্দ হয় না। মেহমেত খুব মনোযোগ দিয়ে শুনল। অতঃপর নিজের শক্তি প্রয়োগ করে হওয়ার বেগে ছুট লাগালো। কিছু পথ অতিক্রম করার পর মেহমেত হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরলো। ভাবুক হয়ে বলল,

- সিলা গোত্রের রাজার এতো অবনতি? শেষ পর্যন্ত আমার পিছু নিতে হচ্ছে?

তার কথার বিপরীতে কোনো উত্তর এলো না। মেহমেত এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

- বেরিয়ে আসুন আরদার।

আড়াল হতে আরদার বেড়িয়ে মেহমেতের মুখোমুখি এসে দাড়ালো। আজ কতগুলো বছর পর আরদার এই মুখ দেখলো? কি অদ্ভুত তাই না! এক সময় যে মুখ সে রোজ দেখতো সেই মুখ সে চাইলেও এখন দেখতে পায় না। তার পরিবর্তে আজ তারা মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো দাড়িয়ে। মেহমেতের ঠোঁটের হাসি অবশ্য এক বিন্দুও নড়লো না।

- পিছু নিচ্ছেন কেন?

- কি অদ্ভুত বাদশাহে জ্বিন, এতো বছর পর আমাদের দেখা অথচ কেমন আছি জিজ্ঞেস করবেন না?

মেহমেত নিজের হাসি আরো বাড়িয়ে বলল,

- আপনি যে ভালো নেই তা আপনার মুখের অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

- পরিহাস করছেন?

- আপনার কি মনে হয়?

এরপর মেহমেত মুখের ভঙ্গি কিছুটা গম্ভীর করে বলল,

- এরপর পিছু নিবেন না আরদার। সেটা আপনার জন্য ভালো হবে না। যেভাবে এসেছিলেন সেভাবে চলে যান।

- আমি আমালিয়ার কাছে যেতে চাই।

মেহমেত মুখভঙ্গির পরিবর্তন না করে বলল,

- এটা জেদ করার সময় নয়। যদি আপনার তার পর্যন্ত পৌঁছানো খুব বেশি দরকার হয়ে থাকে তাহলে নিজে চেষ্টা করুন। আমার পিছু নিয়ে আপনি তার পর্যন্ত কখনোই পৌঁছাতে পারবেন না।

মেহমেত আরদারকে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালে আরদার দৃষ্টি অনবরত সোজা রেখে বলল,

- তার কোনো ক্ষতি করবেন না বাদশাহ।

তারা দুজনে বিপরিত মুখী হয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। মেহমেত সামান্য হেসে বলল,

- আপনি জানেন জ্বিন বাদশাহ কতটা স্বার্থপর। সে শুধু নিজের কথাই ভাবে। আমার কাজে বাঁধা না হয়ে আমালিয়ার ওপর কে কালো যাদু করেছে তাকে খুঁজে বের করুন। আপনি আপনার কাজ করে যান আর আমি আমারটা।

মেহমেত এরপর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পূর্বের তুলনায় আরো দ্রুত ছুটে চলে গেলো। আরদার হেরে যাওয়া সৈনিকের মতো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো শুধু।

_____________

আমালিয়া ভীষণ আতংকিত হয়ে গুটিশুটি মেরে আরো কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে বসল। জ্বীন! আশ্মী জ্বিন বলেও কিছু হয়? কিন্তু এদের তার কাছে কি কাজ থাকতে পারে? আমালিয়া আতংকিত চোখে এদিক-সেদিক তাকিয়ে পালানোর পথ খুঁজলো, কিন্তু নাহ আশেপাশে কোনো পথ নেই। পুরোটাই কাঁচ দ্বারা আবৃত। হাওয়া প্রবেশেরও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

- কি চাই আপনার আমার কাছে? কেন নিয়ে এসেছেন আমাকে? আমাকে যেতে দিন দয়া করে। দাদি হয়তো খুব চিন্তা করছে আমাকে না পেয়ে।

আমালিয়ার শেষের কথায় আশ্মী রাজা স্ব-শব্দে হেসে উঠলো। তার বিকট শব্দের হাসিতে আমালিয়ার কান ধরে গেলো প্রায়। কাঁচের দেয়ালে সেই হাসি বারে বারে গিয়ে ফিরে আসছিলো।

- ওহো আমালিয়া তুমি কতটা বোকা! কিছুই জানো না দেখছি। কেউ তোমার জন্য চিন্তিত নয় আমালিয়া। তারা যদি চিন্তিত হয় তা শুধু নিজেদের স্বার্থের জন্য।

আমালিয়া বুঝতে পারলো না কি বললো তার সামনে দাঁড়ানো সুদর্শন যুবকটি। সে অবাক হয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,

- মানে?

আশ্মী রাজা ধীরে আমালিয়ার কাছে এগিয়ে এসে কোমর বাঁকিয়ে কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়ালো।

- যাদের তুমি এতকাল আপন ভেবে এসেছো তারা কেউ তোমার আপন না আমালিয়া।

আমালিয়া অবিশ্বাস্য চোখে চাইলো। নিজের অজান্তেই তার মুখ হতে নির্গত হলো,

- মিথ্যা। আপনি মিথ্যা বলছেন সব।

- আমি মিথ্যা বলছি না আমালিয়া। তুমি ইউসুফ-ইলারার আপন মেয়ে না। এমন কি তোমার দাদিও তোমার আপন কেউ না। বরং তাদের জন্যই তোমার আপন মা-বাবা আজ জীবিত নেই।

- অসম্ভব! দাদি এমন করতেই পারে না। আপনি আর একটাও বাঁজে কথা বলবেন না। আমার মা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গিয়েছে। আমি দেখেছি সব।

আমালিয়া উত্তেজিত হয়ে পরেছে। সে কিছুতেই এসব মেনে নিতে পারছে না। ঘেমে অস্থির হয়ে থাকা আমালিয়াকে দেখে আশ্মি রাজা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

- তোমার মা তোমাকে বাঁচাতে গিয়েই মারা গিয়েছ আমালিয়া কিন্তু সে ইলারা না, সে মারিয়াম। তোমার দাদি তোমাকে সব মিথ্যা বলেছে সব।

আমালিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

- মারিয়াম?

- হ্যাঁ মারিয়াম। তোমার জন্মদাত্রী। তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার মা-বাবা দুজন নিজেদের জীবন কুরবান করে গিয়েছে আমালিয়া। আর জানো কে তোমার মাকে মেরেছে?

আমালিয়া প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে। তার মন বলছে এই লোকের কথা না শুনতে কিন্তু তার চিন্তা-ভাবনা তাকে সায় দিচ্ছে না। জানার আরো কৌতূহল তাকে আশ্মি রাজার ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করলো।

- আরদারের বাবা। মানে তোমার মামা। সম্পত্তির লোভে তিনি এতটাই অন্ধ ছিল যে নিজের বোনকে খুন করতে তার একটুও হাত কাপেনি। মজার বিষয় কি জানো আমালিয়া? তোমার দাদি সব জেনেও তোমাকে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তাদের যে তোমার সম্পত্তি চাই। আচ্ছা আমালিয়া তোমার মনে কখনো প্রশ্ন জাগেনি, যে কেন ইউসুফ তোমাকে ভালোবাসে না?

জেগেছিল। বহুবার জেগেছে। কিন্তু আমালিয়া কখনো এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি।

- ইউসুফ নিজের সন্তানের জায়গাতে তোমাকে কেন বসাবে বলো? অন্যের সন্তানকে কয়জনই বা নিজের সন্তানের মতো ভালবাসে?

আমালিয়া অস্বাভাবিক ভাবে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল,

- মিথ্যা, সব মিথ্যা।

- সব সত্যি আমালিয়া। ওরা কেউ তোমার আপন নয়। ওরা কেউ তোমার ভালো চায় না। সবাই তোমাকে ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থের জন্য। কিন্তু আমি তোমার ভালো চাই আমালিয়া। ( বলতে বলতে সে আরো কিছুটা আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল) দেখো আমাকে আমালিয়া, দেখো তোমার চারপাশ। এই সব কিছু তোমার জন্য। তুমি এখানে সুরক্ষিত। কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না এখানে। তুমি আমি একই রকম আমালিয়া। আমরা দুজন নিজেদের শক্তি...

আমালিয়া বাকি কথা শোনার আগেই ঘুমের কোলে ঢলে পরলো। আশ্মী রাজা অবাক হয়ে আমালিয়াকে ডেকে উঠলো,

- আমালিয়া, আমালিয়া।

- তিনি আপাদত ঘুমের রাজ্যে রয়েছে আশ্মী রাজা। ডেকে লাভ নেই।

পিছন থেকে কথা গুলো বলে উঠলো মেহমেত। আশ্মী রাজা তার দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে দিকে তাকিয়ে অনেকটাই হকচকিয়ে উঠলো। তার চোখগুলো পূর্বের তুলনায় সামান্য বড় হয়েছে। হয়তো কিছুটা ভয়ও পেয়েছে কিন্তু বুঝতে দিলো না। মেহমেত দরুন এক হাসি দিয়ে বলল,

- ধন্যবাদ আমার কাজ অনেকটা সহজ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এর বেশি ওনার এখন জানার দরকার নেই আশ্মী রাজা।

- বাদশাহে মেহমেত!

- আরে আপনি দেখছি আমাকে চিনতে পেরেছেন! কি সৌভাগ্য আমার।

আশ্মী রাজা বুঝলো মেহমেত তার সাথে হেঁয়ালি করছে, তাই নিজের মুখভঙ্গি গম্ভীর করে বলল,

- কখন এসেছেন?

- যখন থেকে আপনি ওনাকে( চোখের ইশারায় ঘুমন্ত আমালিয়াকে দেখিয়ে) সত্য-মিথ্যা বানিয়ে বলছিলেন তখন।

বলেই সে আবারও তার সেই মুগ্ধ করা হাসিটি দিলো।

- কি চাই আপনার বাদশাহে মেহমেত।

- কি চাই তা তো সকলের জানা আশ্মী রাজা। আমার যে জিনিসের পিছনে আপনারা পরে আছেন আমার সেটি চাই।

মেহমেতের কন্ঠে ছিল এক অদ্ভুত জেদ, কিছু পাওয়ার স্পৃহা। যা আশ্মী জ্বিনকে ভড়কে দিতে যথেষ্ট ছিল। আশ্মী রাজা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,

- সেটি আপনার নয় বাদশাহে মেহমেত।

কথাটি শোনার সাথে সাথে মেহমেতের সুন্দর গাঢ় বাদামী চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলে উঠল। ভয়ঙ্কর মুখশ্রী নিয়ে সে এগিয়ে আশ্মী রাজার গলা চেপে বলল,

- ওটা আমার। শুধুমাত্র আমার। আমার জিনিস আমার থেকে কেড়ে নেয়া হয়ে ছিল। ৫৭ বছর ধরে আমি সেই যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। শুধু একবার আমি তাকে ফিরে পাই, কাউকে ছাড়বো না।

মেহমেত তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বসেছে। আশ্মী রাজার গলা জ্বলছে। ব্যাথায় মুখশ্রী নীল বর্ণ ধারণ করেছে তবুও সে হেসে উঠলো।

- আপনার এই রূপ তার সামনে খুব দ্রুত চলে আসবে বাদশাহে মেহমেত। তখন কি করবেন? আপনি যা চাইছেন তা আর কখনো আপনার হবে না বাদশাহে মেহমেত। সেই জিনিসের পিছনে কত হাজার জ্বিন, শয়তান আর মানুষ লেগে আছে জানেন নিশ্চয়ই?

- তার মাঝে আপনিও একজন তাই না আশ্মী রাজা?

- হা হা হা। ঠিক ধরেছেন বাদশাহে মেহমেত। ওমন একটা জিনিস হাত ছাড়া করা বোকামি হবে না?

- কিন্তু আফসোস সে পর্যন্ত যেতে হলে আপনাদের আমাকে হারাতে হবে।

- অসম্ভব প্রায়, কিন্তু চেষ্টা করে তো দেখতেই পারি তাই না?

মেহমেত মাথা কাত করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাতের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

- তাই বুঝি? আমার সাথে লড়বেন? জ্বিনের বাদশাহের সাথে?

আশ্মী রাজা ব্যাথা নিয়ে খুব কষ্টে বলল,

- সুযোগ আসলে অবশ্যই আপনার বিপরীতে লড়ব। আপনার পদমর্যাদা ও আপনার প্রতিটা জিনিস আমার ভীষন প্রিয় বাদশাহে মেহমেত। কিন্তু এখনকার জন্য বিদায়।

বলতে বলতে সে উধাও হয়ে গেলো। মেহমেত ভীষণ রাগে গজগজ করতে করতে শূন্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাড়িয়ে রইলো চোখ বন্ধ করে। আশ্মী জ্বিন ছল-কপটতায় পারদর্শী। এরা নিজের সৌন্দর্য ও মিষ্টি বুলি দিয়ে যে কাউকে নিজের বশে নিয়ে নেয়। মেহমেত জানে আশ্মী রাজা কতটা খারাপ আর ভয়ংকর। একবার যখন আমালিয়ার ওপর তার নজর পরেছে তখন সে আমালিয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা আবারও করবে। আমালিয়াকে এই মুহূর্তে একা ছাড়া বিপদজ্জনক। মেহমেত দৃষ্টি ফিরিয়ে আমালিয়ার দিকে তাকালো। এই মুহূর্তে কি করা উচিৎ তার বুঝে আসছে না। আমালিয়াকে সে ছুঁতে পারবে না আবার এখানে রাখতেও পারবে না। সে হেঁটে আমালিয়ার পাশে গিয়ে ঝুঁকে বলল,

- আপনি আমাকে বড্ড বেশি জ্বালাতন করছেন আমালিয়া।

কথাটি বলে মেহমেত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় কিছু একটা করার সাথে সাথে আমালিয়া শূন্যে ভেসে উঠলো। মেহমেত তা দেখে পকেটে দুহাত গুঁজে সামনে হাঁটতে লাগলো। তার হাঁটার তালে আমালিয়াও শূন্যে ভেসে ভেসে তার পিছু যেতে লাগলো। মেহমেত ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলল,

- জানেন আমালিয়া সকলের ধারণা অভিশাপের কারণে আমি ক্ষমতা বিহীন অবস্থায় রয়েছি। কিন্তু তারা কি জানে যে, সেই অভিশাপ আমার থেকে শুধু আমার অর্ধেক ক্ষমতাই নিয়েছিল? বাকি অর্ধেক তো এখনো রয়ে গিয়েছে। জানে না। মূর্খের দল ভাবে আমি শক্তিবিহীন এক বাদশাহ। লুকিয়ে রয়েছি ভয়ে। হাহ, ওরা কি জানে, আমি লুকিয়ে থেকেও সব জানি? আপনাকে খুঁজে পেতে আমার কতটা মেহনত করতে হয়েছে তা না জেনেই তারা আপনার পিছনে লেগে গেলো কিভাবে আমালিয়া? এক আপনিই তো পারবেন আমাকে আমার গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। আপনাকে আমি এতো সহজে ওদের হাতে কিভাবে তুলে দিই বলুন?

মেহমেত নিজের মতো কথাগুলো বলতে বলতে আমালিয়াকে নিয়ে এগিয়ে চলল।

___________

- জ্বিন মাতা কোনো খোঁজ পেলেন?

- জ্বি না রাজা আরদার।

- তাকে আমাদের দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে জ্বিন মাতা। নয়তো সে আবারও আমালিয়ার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে।

- আমি চেষ্টা করছি রাজা আরদার। ( এরপর কিছুটা থেমে বলল) সে কিছু বলেছে?

- সে এখন আর আমাদের কেউ না জ্বিন মাতা। আমাদের অযথা আবেগ-অনুভূতির দাম তার কাছে নেই।

আরদার গম্ভীর মুখে জানালার পানে তাকিয়ে নির্নিমেষ কথাগুলো বলল। ক্রমশ সব আরো বেশি জটিল হয়ে উঠছে। তারা বর্তমানে আমালিয়ার কক্ষে রয়েছে। মেহমেত হয়তো এতক্ষণে আমালিয়াকে সুরক্ষিত অবস্থায় আশ্মী রাজার নিকট হতে ছাড়িয়ে নিয়েছে। এখন শুধু তাদের ফিরে আসার অপেক্ষা।

- সে লিয়াকে নিয়ে এখানেই ফিরবে তো?

- বলা যাচ্ছে না। তবে আশা রাখা যায়।

কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে মেহমেত আমালিয়াকে নিয়ে ফিরল না। আরদার অস্থির হয়ে খুঁজলো কিন্তু তাদের টিকিটাও খুঁজে পেলো না। মনে মনে হতাশ হলেও সে প্রকাশ করতে পরলো না। শুধু অপেক্ষা করল সঠিক সময়ের।

___________

মেহমেত দাঁড়িয়ে আছে তার কামরার জানালার পাশে। এখান থেকে ঝর্না স্পষ্ট দেখা যায়। তাছাড়া তার জানালার পাশে একটি বড় গাছ রয়েছে। সেই কাছে দুটি পাখি বাসা বানিয়ে থাকে। দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগে। মেহমেত দৃষ্টি পিছনে ঘুরিয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আমালিয়াকে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। বোকা আরদার ভেবেছে সে আমালিয়াকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে? মেহমেত মাথা নিচু করে হাসলো। এত কিছু করেছে কি আমালিয়াকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য? এখনো তো অনেক কাজ বাকি। মেহমেত পুনরায় দৃষ্টি জানালার পাশের সেই পাখির বাসায় রেখে হাতের দুই আঙ্গুলের সাহায্যে তুড়ি বাজালো। সাথে সাথে গাছের পাখি দুটি মানুষের অবয়ব নিয়ে মেহমেতের সামনে হাজির হয়ে বলল,

- হুকুম করুন হুজুর।

- আমি ব্যতিত অন্য কেউ যেন এই কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে। সেই দায়িত্ব তোমাদের।

- জ্বি হুজুর।

এরা মূলত মেহমেতের পাহারার কাজে নিয়োজিত অত্যন্ত শক্তিশালী জ্বিন। দেখে মনে হবে নিতান্তই সাধারণ পাখি তবে এদের কাজ অন্য দশটি জ্বিনের থেকে ভিন্ন। শান্ত এই জ্বিন মেহমেতের একটি ইশারায় হিংস্র রূপ ধারণ করতে সময় নেয় না।

মেহমেত আরো একবার আমালিয়াকে দেখে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তার এখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আশ্মী রাজার কথাগুলো সত্যি করতে তাকে কিছু ছলের সাহায্য নিতে হবে। তাছাড়া যে আমালিয়াকে বান মেরেছে তারও তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে তাই না!

____________

মাটির নিচে একটি পাতালঘর। চারিপাশ স্যাঁতস্যাঁতে দুর্গন্ধময়। অন্ধকার সেই পাতালঘরে থেকে থেকে মশালের আলো দেখা যাচ্ছে। সেই ভয়ানক অন্ধকারাচ্ছন্ন পাতালঘরে কারো মন্ত্র পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। মেহমেত এগিয়ে দেখলো একটি চক্রের মাঝে বসা এক নারী। চুলে তার জটলা পাকানো। শরীরে জড়ানো পোশাকে অনেকটাই উম্মুক্ত। উচ্চতায় অনেকটাই ছোট সেই নারীর সামনে নানান রকমের বিকৃত আকৃতির মূর্তি। সে সমানে তার সামনে রাখা অগ্নিকুণ্ডে কিছু ছুঁড়ে মেরে বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে। মেহমেত নিজের স্বভাবসুলভ বেশভূষা ছেড়ে এবার তার বাদশাহ রূপে ফিরে এলো। পরণে তাঁর সাদা আলখাল্লা আর নূরানী চেহারার আলোয় পাতালঘর মুহূর্তে আলোকিত হয়ে উঠল। মেহমেত এগিয়ে শয়তানের মূর্তিটিকে পা দিয়ে ফেলে দিয়ে বলল,

- এসব শয়তানের পূজা করে লাভ নেই। সে এখন সুরক্ষিত রয়েছে।

নারীটি এবার তার বন্ধ চোখ ধপ করে খুলে ফেললো। সামনে মেহমেতকে দেখে তার চোখেমুখে রাগের আভাস ফুটে উঠল মুহূর্তে। এতোগুলো বছরের মেহনত এই জ্বিনের জন্য ভঙ্গ হলো ভাবলেই তার রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। সে বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে মেহমেতের পায়ের কাছে মূর্তিটি পড়ে থাকতে দেখে রাগে ফেঁটে পরে চেঁচিয়ে বলল,

- আমার প্রভু আমার প্রভু।

মেহমেত এক আঙুল ঠোঁটের ওপর রেখে বলল,

- সুসসসসসস। আস্তে কথা বলবে।

- এতো বড় সাহস আমার প্রভুর মূর্তিকে ফেলে দিয়েছিস।

মেহমেত একবার মূর্তিটিকে দেখে নিয়ে আবার রাগে গজগজ করতে থাকা নারীটির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি নিয়ে এক পা মূর্তিটির ওপর রেখে বলল,

- আমার জিনিসে হাত দেয়ার সাহস হলো কিভাবে?

- ওহহো তাহলে জ্বিনের বাদশাহ জেনে ফেলেছে?

নারীটি কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলল কথাটি। মেহমেত ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বলল,

- না জানার তো কিছু নেই। এমনটা কি প্রথম হয়েছে? তাছাড়া তোমার মতো শয়তান ভক্ত তো দ্বিতীয়টি নেই। বারবার তুমি তার ক্ষতি করার চেষ্টা করে গিয়েছ।

- বেশ করেছি বেশ করেছি। আরো করবো। ওকে আমি শেষ করে দিবো। ওর জন্য আমার মেয়ে.. আমার মেয়ে আজ আমার সাথে নেই।

নারীটি ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাগুলো বলল। মেহমেত দেখলো নারীরূপী দয়া-মায়াহীন এক পিচাশকে।

- আমালিয়ার জন্য নয় তোমার লাভের জন্য তোমার মেয়ে আজ নেই। ভুলে গেলে নাকি ভুলে যাওয়ার নাটক করছো?

এরপর মেহমেত অনেকটা নিকটে এসে বলল,

- ইলারা ঠিক যতটা ভালো ছিল তুমি ঠিক ততটাই জঘণ্য। ইলারা তোমার থেকে আমালিয়াকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়েছিল। তুমি মেরেছ তোমার মেয়েকে। এখানে আমালিয়ার কোনো দোষ নেই।

নারীটি এবার ভয়ংকর হাসি দিয়ে বলল,

- এটাও জেনে ফেলেছিস? হ্যাঁ আমার জন্য মরেছে। আমি মেরেছি আমি। এই এই হাতে মেরেছি ওকে। বেশ করেছি। যে যে আমার পথের কাটা হবে সবাইকে শেষ করে দিবো। বারবার বলছিলাম আমার রাস্তা থেকে সরে যেতে কথা শোনেনি। ভালো সাজার এতো ইচ্ছা ছিল যে অন্যের মেয়ের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিলো। আমালিয়ার রুহ আমার চাই ই চাই। ওর রুহ শয়তানের নামে উৎসর্গ করে আমি হবো এই জামানার সব থেকে শক্তিশালী।

মেহমেত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে খুবই আফসোসের সাথে বলল,

- মানছি আমি স্বার্থপর কিন্তু তোমার মতো জঘন্য না। নিজের মেয়েকেও ছাড় দিলে না। সুতরাং তোমারও বেঁচে থাকা কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাটি বলে মেহমেত হাতের ইশারায় তার তৈরিকৃত চুলের কাটাটি ছুঁড়ে মারল নারীটির দিকে। মুহূর্তে নারীটির শরীরে আগুন জ্বলে উঠল এবং তার সাথে ভেসে এলো আর্তচিৎকার। মেহমেত পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে দেখল। তৃপ্তিতে তার মন ভরে উঠছে বারেবারে। যতক্ষন নারীটি ছাইয়ে পরিণত না হলো মেহমেত ততক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর পরে থাকা ছাই হতে কাটাটি তুলে নিতে নিতে ধীরে বলল,

- তাকে আমি ছাড়া কেউ কষ্ট দিবে ভাবলেই রাগে শরীর জ্বলে যায়। সেখানে তাকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে জেনেও আমি চুপ থাকি কিভাবে? বারেবারে আমি নিজের ধৈর্য্য দেখে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। তোমার অন্তিম সময় এসে গিয়ে ছিল বলে পাপ বেশি করে ফেলেছ। তবে আশা করিনি তোমার মৃত্যু আমার হাতেই হবে। ইলারা হয়তো আবার একটু খুশি হবে।

#চলবে____

( হয়তো খাপছাড়া হয়েছে। তাড়াহুড়োর মাঝে যা পেরেছি দিয়েছি। আর হ্যাঁ, আমালিয়াকে কেউ ভালবাসে না। বুঝেছো?)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন