ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

১১তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-১১

[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

আমালিয়া চোখ মেলে নিজেকে অপরিচিত জায়গায় আবিষ্কার করলো। জায়গাটি অপরিচিত হলেও তার নাকে পরিচিত একটি সুবাস ধাক্কা খেলো। অচিরেই মুখ থেকে অস্পষ্ট স্বরে বেরিয়ে এলো,

- মেহমেত।

আমালিয়া উঠে বসে চারপাশ তাকিয়ে দেখলো। ঘরটি তার পরিচিত লাগছে না মোটেই, কিন্তু এই কালো কাঠ মেহমেতের বাড়িতেও ছিল। হঠাৎ আমালিয়ার পূর্বের কথা স্মরণে এলো। আশ্মী জ্বিন আর তার বলা কথাগুলো না চাইতেও আমালিয়ার মাথায় এখনো গেঁথে রয়েছে। যদি সব সত্যি হয় তাহলে আমালিয়া কি করবে? দাদি কি সত্যিই তার সাথে এমনটা করেছে? তার মা-বাবা কি অন্য কেউ? কিভাবে সত্যি জানবে সে? আমালিয়া দুহাত মুখে চেঁপে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কান্নার শব্দ খুব কম হলেও কান্নার তালে তালে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। জানালার কাছের পাখি দুটি একে অন্যের দিকে বারবার তাকিয়ে ভাবছে তাদের করণীয় কি? অনেক্ষন কাঁদার পর আমালিয়া অনুভব করলো নরম তুলতুলে কিছু একটা তার পায়ের কাছে বারবার ছুঁয়ে দিচ্ছে। আমালিয়া কান্না থামিয়ে কৌতূহলবশত পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে ছিটকে দূরে সরে যেতে নেয়। কিন্তু দূর্ভাগ্যবসত সে বিছানা থেকে সোজা নিচে পরে প্রচন্ড ব্যাথা পায়। বিছানাটা যে এত উঁচুতে ছিল আমালিয়া বুঝতে পারেনি। তারওপর কাঠের মেঝে ভালোই আঘাত পেয়েছে বেচারি। আমালিয়া নিজের এক হাত কোমরে রেখে বিছানার ওপর থেকে উঁকি মেরে তার দিকে তাকিয়ে থাকা অদ্ভুত জিনিসটির দিকে আতংকিত চোখে তাকালো। এটা আবার কেমন জিনিস? ভয়ে তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। হালকা আকাশি আর সাদা রঙের লোমশ গোল জিনিসটির দুটো ডানা রয়েছে কিন্তু কোনো মাথা নেই। কিছু সময় পরপর জীবটি নিজ স্বরে ধীরে ধীরে ডেকে উঠছে। আমালিয়াকে পরে যেতে দেখে জীবটি এবার বিছানার একদম কিনারায় এসে বাচ্চাদের মতো ঝুঁকে ডানা নাড়িয়ে ডেকে উঠলো। তা দেখে আমালিয়া আরো ভয় পেয়ে নিজের মাঝে গুটিয়ে গেলো। কিন্তু জীবটি থামলো না। সে সমানে তার শরীর নাড়াতে নাড়াতে গিয়ে পরলো আমালিয়ার ওপর। মুহূর্তে আমালিয়া পূর্বের তুলনায় আরো বিকট চিৎকার দিয়ে জীবটিকে নিজের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কেঁদে ফেললো। কয়েক দিন ধরে তার সাথে এসব কি হচ্ছে? কেন হচ্ছে? জীবটিকে ওভাবে ফেলে দেয়ায় হয়তো সে ব্যাথা পেয়েছে। তাই সে কিছুটা অভিমান নিয়ে আবারো আমালিয়ার কাছে আসতে নিলে আমালিয়া কাঁদতে কাঁদতে পিছিয়ে গেল।

- টোটো।

ভারী গম্ভীর গলার ডাকটি টোটো চিনতে পারলো। সে তার শরীর নাড়িয়ে পিছু ফিরে হেলে দুলে দরজায় দাঁড়ানো মেহমেতের কাছে গিয়ে খুবই আদুরে ভঙ্গিতে মেহমেতের পায়ের সাথে তার শরীর ঘষতে লাগলো। মেহমেত মেঝেতে হাটু গেড়ে টোটোর শরীরে হাত বুলিয়ে বলল,

- বলেছিলাম ওনাকে বিরক্ত না করতে, কথা শুনলে না। তুমি পঁচা হয়ে যাচ্ছ টোটো।

টোটো কি বুঝলো একমাত্র সেই জানে। সে শরীর নুইয়ে বারেবারে মেহমেতের কাছে ঘেঁষতে চাইলো। মেহমেত কিছু একটা বুঝতে পেরে হালকা হেসে প্রশ্ন করলো,

- তাকে ভালো লেগেছে?

টোটো অতি উৎসাহের সাথে তার ডানা নাড়িয়ে বুঝালো তার ভালো লেগেছে। আমালিয়া এতক্ষন অবাক চোখে এদের দেখে যাচ্ছিলো। এখন সে বুঝতে পারছে এই অদ্ভুত দেখতে জিনিসটি মেহমেতের পালিত। মেহমেত! তার সামনে মেহমেত দাঁড়িয়ে? তার মানে সে মেহমেতের বাড়িতে এখন? কিন্তু কিভাবে? সে তো আশ্মী রাজার কাছে ছিল। না কি সে সব স্বপ্ন ছিল? কিন্তু স্বপ্ন এত বাস্তব হয়?

মেহমেত টোটোকে ছেড়ে আমালিয়ার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে বললো,

- টোটোকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। উঠে আসুন।

আমালিয়া মেহমেতের বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে মেহমেতের কাছে রয়েছে। সে তো ভেবে ছিল মেহমেতের সাথে তার আর দেখা হবে না কখনো।

- কি হলো উঠুন।

মেহমেতের কথায় আমালিয়ার ধ্যান ভঙ্গ হলো। সে হাত বাড়িয়ে মেহমেতের উষ্ণ হাতটি আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে ভীষণ আস্থা নিয়ে। মেহমেত তাকে টেনে তুলতে গেলে আমালিয়ার মুখ থেকে 'আহ' শব্দটি উচ্চরিত হলো। মেহমেত হাত না ছেড়েই প্রশ্ন ছুড়লো,

- ব্যাথা পেয়েছেন?

- হুম।

মেহমেত আমালিয়াকে ধরে বিচার বসাতে বসাতে বলল,

- টোটো ভীষণ শান্ত প্রাণী। ওকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওর আমাকে পছন্দ হয়েছে বলেই আপনার কাছে গিয়েছিলো, নয়তো টোটো সাধারণত আমি ছাড়া কারো কাছে ঘেঁষে না। ভীষণ রুচিশীল প্রাণী ও।

আমালিয়া বিছানায় বসতে বসতে মেহমেতের কথাগুলো শুনছিলো কিন্তু তার দৃষ্টি তখনও টোটোর ওপর। ভয় করলেও এই প্রাণীটাকে নিয়ে তার খুব কৌতূহল হচ্ছে। সে পাহাড়ি এলাকায় অনেক জীব-জন্তুর সাথে থেকে বড় হয়েছে, কিন্তু এমন প্রাণী সে তার জীবনে প্রথম দেখলো। তও আবার মাথাবিহীন। কি ভয়ানক!

টোটো তখনও মেহমেতের পিছু থেকে মুখ লুকিয়ে আমালিয়াকে দেখে যাচ্ছে। আমালিয়া তা দেখে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। তার ডাকার সাথে সাথে টোটো তার ভারী গোল শরীরটা দুলিয়ে আমালিয়ার কোলে এসে পরলো। টোটো তার আয়তনের থেকে বড্ডো বেশি ভারী ও স্বাস্থ্যবান। আমালিয়ার যদিও একটু কষ্ট হলো টোটোকে নিতে, কারণ টোটো দেখতে আদুরে হলেও সে ভালই বড়।টোটো আমালিয়ার কোলে বসে তার শরীর দিয়ে বারবার আমালিয়ার শরীরে ঘষতে লাগলো। তার এই আদুরে স্বভাবের জন্য আমালিয়ার টোটোর সাথে মিলে যেতে সময় লাগলো না বেশি। আমালিয়া টোটোর শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

- আমি এখানে কিভাবে?

মেহমেত আমালিয়া আর টোটোর মিল-মোহব্বত দেখছিল। টোটো কোনো সাধারণ প্রাণী নয়। আর দশটা প্রাণীর তুলনায় এদের বুদ্ধি তুখোড় হয়। তারা খুব দ্রুত সামনের মানুষ অথবা জ্বিনের মনোভাব বুঝতে পারে। প্রতিটি উচ্চপদস্থ জ্বিনের একটি পালিত প্রাণী থাকে যা তাদের শক্তির সাথে জন্ম হতেই দেয়া হয়। টোটোও মেহমেতের সাথে তার জন্ম হতেই রয়েছে। মেহমেত যেমন টোটোকে ভালবাসে ঠিক তেমনই টোটোও মেহমেতকে ভীষণ ভালোবাসে। বহুবার এমন হয়েছে, টোটো নিজের কথা না ভেবে মেহমেতকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছে। টোটো শান্ত ও আদুরে প্রাণী। তার মাঝে খুব একটা হিংস্রতা দেখা যায়নি এখনো। তাকে দেখতে অদ্ভুত হলেও সে নিজের মতো একা থাকতে পছন্দ করে। মেহমেত বুঝতে পারে না তার সেই টোটো কিভাবে আমালিয়ার এতবড় ভক্ত হয়ে গেলো?

আমালিয়া তার প্রশ্নটি করে তখনো মেহমেতের দিকে তাকিয়ে। মেহমেত নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে বলল,

- ঝর্নার কাছে।

সাফসাফ মিথ্যা কথাটি বলে সে মুখায়োব এতো নিখুঁত ভাবে প্রদর্শন করলো যে তার সেই কথায় যে কেউ বিশ্বাস করতে বাধ্য। আমালিয়া যেন আকাশ থেকে পরলো তার কথা শুনে। ঝর্নার কাছে? সে ঝর্নার কাছে কিভাবে গেলো?

- কিন্তু আমি ঝর্নার কাছে কিভাবে পৌঁছালাম?

- তা একমাত্র আপনার জানার কথা। আপনি ঝর্নার কাছে কি করছিলেন? আমি প্রতিদিনের মতো হাঁটতে গিয়ে ছিলাম সেখানে। সেখানে গিয়ে আপনাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে এখানে নিয়ে আসি। একা আপনি ওখানে কেন গিয়ে ছিলেন? আমাকে বলতে পারতেন আমি নিয়ে যেতাম। বারণ করে ছিলাম একা আসতে। কত রকমের বিপদ ওৎ পেতে থাকে সেটা তো আমাদের জানা নেই তাই না!

মেহমেত নিখুঁত ভাবে মিঠাগুলো সাঁজিয়ে বলল। আমালিয়াও সেসব শুনে গভীর চিন্তায় হারিয়ে গেলো। সে ঝর্নার কাছে কিভাবে পৌঁছালো জানে না। কিন্তু আশ্মী জ্বিনের থেকে যে বেঁচে ফিরেছে এই অনেক। আচ্ছা মেহমেতকে কি সেই কথা বলবে একবার? কিন্তু যদি বিশ্বাস না করে? বিশ্বাস করার মতো কথাও না। তারই তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে আয়নার মাঝে চলে গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে। আমালিয়া মেহমেতের দিকে শান্ত ভাবে তাকালো। তার চোখ, নাক, ঠোঁট সব কেমন আপন আপন লাগছে। আশ্মী জ্বিনের সামনে সে কি ভীষণ ভয়ে ছিল অথচ এখন তার একদম ভয় করছে না। উল্টো মনে হচ্ছে সে এখানে সুরক্ষিত। মেহমেত আমালিয়াকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এক ভ্রু উঁচিয়ে ইশারা করলো। আমালিয়া অনেক ভেবে প্রশ্ন করলো,

- আপনি জ্বিনে বিশ্বাস করেন?

মেহমেত এই প্রশ্নের কোনরূপ প্রক্রিয়া দেখলো না। খুবই শান্ত ভাবে আমালিয়াকে পর্যবেক্ষন করে নিল নীরবে। আমালিয়া কিছুটা নড়েচড়ে বসলো। তার কোলে ইতোমধ্যে টোটো ঘুমিয়ে পরেছে। মেহমেত তা দেখে টোটোকে সরাতে চাইলে আমালিয়া বলল,

- থাক সমস্যা হচ্ছে না। বললেন না তো জ্বিনে বিশ্বাস করেন?

- অবিশ্বাস করার মতো কিছু তো নেই। কুরআন শরীফে মানুষ ও জ্বিন নিয়ে স্পষ্ট লেখা রয়েছে।

আমালিয়া মাথা দুলিয়ে জানালার পানে তাকালো। সেখানে দুটি পাখি নীরবে নিজেদের মতো ঘর বানাতে ব্যস্ত। হয়তো ডিম পাড়ার সময় এসেছে।

- বেশ কিছুদিন ধরে আমার সাথে খুব অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আপনাকে বললে কি আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন?

- আপনি আমাকে বিশ্বাস করে থাকলে বলতে পারেন। আমি আপনাকে নিরাশা করব না।

আমালিয়া দৃষ্টি টোটোর ওপর রেখে টোটোর ঘন লোমযুক্ত শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তাকে বড্ড উদাসীন লাগছে। হয়তো নিজেই এখনও নিশ্চিত নয়। নয়তো কি বলবে বুঝতে পারছে না। আমালিয়া দীর্ঘ সময় নিজের সাথে বোঝাপড়া করলো। মেহমেত তাকে সেই সময়ও দিলো। সে না জানতে জোর করলো আর নাই বা তাড়া দিলো। অতঃপর আমালিয়া একে একে ক্বারীন জ্বিন ও আশ্মী জ্বিনের ব্যাপারে সবটা মেহমেতকে জানিয়ে দিলো। মেহমেত গভীর মনোযোগের সাথে তার প্রতিটা কথা শুনল।

- আমি এখনো বুঝতে পারছি না সত্যিই এমন হয়েছে নাকি এই সব আমার ভ্রম।

- দেখুন আমালিয়া আল্লাহর সৃষ্ট এই দুনিয়ায় অসম্ভব বলে কিছুই নেই। জ্বিন রয়েছে। আর তারা প্রতিনিয়ত মানুষকে বিভিন্ন ভাবে ক্ষতি করার চেষ্টাও করে। সকলে যে করে এমন নয়। মানুষের মাঝে ভালো-খারাপ যেমন রয়েছে জ্বিনদের মাঝেও রয়েছে। তবে ক্বারীন জ্বিন অধিকাংশ সময় খারাপ হয়ে থাকে। এদের কাজই মানুষকে খারাপ পথে ধাবিত করা। আর আশ্মী জ্বিনরাও যে খুব ভালো হয় এমনটা বলতে পারব না। এই দুই গোত্রের জ্বিন স্বার্থ ছাড়া কিছু করে না। তবে আশ্মী জ্বিন আপনাকে যা বলছে আমার মনে হয় তা মিথ্যা বলেনি।

আমালিয়া এতো সময় মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনলেও শেষের কথায় তার মন খারাপ হয়ে গেলো। মেহমেত বুঝলো যদিও কিন্তু পাত্তা দিল না। আমালিয়াকে যতো দ্রুত এই ব্যাপারটা বিশ্বাস করাতে পারবে ততই তার লাভ।

- দাদি এমন কখনো করতে পরে না মেহমেত।

মেহমেত তার এই কথায় ভীষণ তাচ্ছিল্য করে বলল,

- দুনিয়ার কতটুকু দেখেছেন আপনি? এখানে স্বার্থ ছাড়া কেউ এক পাও নড়ে না। আপনি বড্ড বেশি ভোলা আমালিয়া।

হঠাৎ আমালিয়া খুব অন্যরকম ভাবে বলল,

- তার মানে কি আপনার আমাকে এখানে নিয়ে আসার পিছনেও কোনো স্বার্থ রয়েছে?

মেহমেত মেয়েটার চিন্তা-ভাবনায় মুগ্ধ। তার মতে ইনসান বড্ড বোকা হয় কিন্তু এই মেয়ে তার ধারণা বদলে দিচ্ছে। যদিও আমালিয়া সাধারণ কোনো ইনসান নয়। তবুও না চাইতেও কেন যেন মেহমেত এই মেয়ের দিকে ঝুঁকে পরছে। মেহমেত নির্মল এক হাসি দিয়ে বলল,

- হতেই পারে।

আমালিয়া নির্লিপ্ত চোখে মেহমেতকে দেখে গেলো নির্লজ্জের মতো।

- বাড়ি যাবেন না?

বাড়ি! আমালিয়া ছোট একটি নিশ্বাস নিলো। তার এখানে শান্তি শান্তি লাগছে। একদম যেতে ইচ্ছা করছে না। অতঃপর মেহমেতকে চমকে দিয়ে সে টোটোকে নিয়ে আয়েশ করে শুয়ে পরলো।

- ঘুম পেয়েছে মেহমেত। ঘুমাতে দিন। একদম বিরক্ত করবেন না।

মেহমেত আমালিয়ার কাজে অবাক। কিছুদিন আগেও দূরে দূরে থাকা মেয়েটা আজ তাকে এভাবে বলছে? হলো কি এর? যদিও সে ভীষন চমকে গিয়েছে কিন্তু বুঝতে দিলো না। উল্টো একটি চাদর এনে খুব যত্ন করে আমালিয়া ও টোটোর শরীরে জড়িয়ে দিলো। আমালিয়া ততক্ষনে আবারও ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। মেহমেত তার শানিত দৃষ্টি জানালার পাশের পাখিদের ওপর একবার নিক্ষেপ করে খুব ধীরে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

__________

আরদার ও হাদিজাহ এসেছে পাতালঘরে। চারিপাশ এতো নোংরা যে আরদারের জন্য হেঁটে যাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

- জ্বিন মাতা আপনি নিশ্চিত এখানেই পাবো তাকে?

- জ্বি রাজা আরদার। সেই ভয়ানক মানবী এখানেই রয়েছে।

হাদিজাহ হাতে মশাল নিয়ে এগিয়ে গেলো আরো ভিতরে। তার জানা মতে ইলারার জন্মদাত্রী মার এখানেই থাকার কথা। তারা আরো কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সামনে এক অগ্নিকুণ্ড ও কয়েকটি মূর্তি পরে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করলো। আরদার এগিয়ে এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারিপাশ দেখে হাদিজাহর পানে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,

- উনি মৃত!

হাদিজাহ ছাইগুলোর কাছে এসে বলল,

- সে আমাদের আগে এখানে এসেছে। অর্থাৎ তার জানা ছিল। কিন্তু ইচ্ছা করে আমাদের বিভ্রান্ত করেছেন।

আরদার রাগে লাল হয়ে গেলো মুহূর্তে।

- শয়তানদের মতো তাহলে ছল-কপটতাও করছে এখন!

হাদিজাহ ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলল,

- আমাদের দ্রুত আমালিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে রাজা আরদার।

আরদার মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে চলে গেল। কিন্তু হাদিজাহ সেখান থেকে একটুও নড়লো না। দাঁড়িয়ে রইলো ছাইয়ের কাছে। আমালিয়াকে নিয়ে যখন ইলারার কাছে এসেছিলো তিনি, তখন আমালিয়া দুদিনের ছোট্ট দুধের শিশু। মায়ের ভালোবাসা আর উত্তাপের জন্য দিশেহারা হয়ে সে কাঁদত। ইলারা তখন সদ্য সন্তান হারিয়েছে। ছোট্ট আমালিয়াকে দেখে তাই নিজের মাতৃত্বকে বেঁধে রাখতে পারেনি। কিন্তু ইউসুফ কিছুতেই আমালিয়াকে মেনে নিতে চাইলো না। ইলারা তখন আবারও ভেঙে পরলো। শেষে ইউসুফ ইলারার জন্য আমালিয়াকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এক সন্তান হারানো মা আর এক মা হারা বাচ্চা তখন একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শেখে। হাদিজাহ আমালিয়াকে ইলারার কাছে সুরক্ষিত রেখে চলে যান দূরে। যেন কেউ আমালিয়াকে খুঁজে না পায়। যদিও পায়নি কিন্তু মানুষের মাঝেও যে শয়তান থাকে। তাঁদের হাত থেকে আমালিয়াকে বাঁচানো কষ্টকর হয়ে উঠল। হাদিজাহ প্রায় সময়ই আমালিয়ার সাথে দেখা করে যেতো। একা একা চুপিচুপি। আমালিয়ার যখন ৫ বছর বয়স সেই দিন তার জীবনে কাল হয়ে এলো বিছমি। শয়তান পূজারী অত্যন্ত জঘন্য সেই মানবী প্রথম দিনই আমালিয়ার মাঝের শক্তি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ইলারা তখনো জানতো না তার মা একজন শয়তান পূজারী। বিছমি নানা ভাবে এরপর আমালিয়াকে নিজের সাথে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ততদিনে হাদিজাহ ইলারাকে সত্যি বলে দেয়। শুরুতে ইলারা কিছুতেই নিজ মায়ের সম্পর্কে এসব মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু একদিন যখন নিজের চোখে দেখলো বিছমি আমালিয়ার চুল, কাপড়, নখ এসব নিয়ে কিছু একটা করছে ঠিক সেদিন থেকে সে তার মাকে তাদের বাড়িতে প্রবেশ করতে বারণ করে দেয়। এতে বিছমি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে কিন্তু সেই মুহূর্তে নিশ্চুপ হয়ে চলে যায়। এর প্রায় দুবছর বিছমির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। ইলারা ভেবে নেয় হয়তো সে আর আমালিয়ার কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তার মা আবারও আসে এবং সেবার সব ধ্বংস করে দিয়ে যায়। তিনি ইলারাকে তার রাস্তা থেকে সরে যেতে বলে ছিলেন। আমালিয়াকে ভালই ভালই তার হাতে তুলে দিতে বলে ছিলেন কিন্তু ইলারা দেয়নি। সেদিন ইলারা সামান্য মানুষ হয়ে হাজারটি শয়তানের বিপক্ষে নিজের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য লড়ে গিয়ে ছিল। জন্ম না দিয়েও যে মা হওয়া যায় তা ইলারা দেখিয়ে দিয়েছিল সেদিন। বিছমি অত্যধিক রাগে নিজের মেয়েকে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তবুও ইলারা আমালিয়াকে নিজের বুক থেকে আলাদা করেনি। হাদিজাহ যখন পৌঁছায় তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। ইলারা আগুনে ঝলসে গিয়ে ছিল। এবং সেই পুড়ে যাওয়া ইলারার থেকে কিছুটা দূরে আমালিয়াকে অজ্ঞান অবস্থায় পরে থাকতে পাওয়া যায়। তখন আমালিয়ার বুকের ওপর একটি কুরআন শরীফ রাখা ছিল। যার জন্য শয়তানরা কিছুতেই আমালিয়ার কাছে আসতে পারেনি। হাদিজাহ বুঝতে পেরেছিল আমালিয়াকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা ইলারা করে গিয়েছে, কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হয়নি।। ইউসুফ বাড়ি ছিল না তখন। যখন সে ফিরল ইলারা তখন ছাইয়ে পরিণত হয়ে গিয়ে ছিল। স্ত্রী শোক সে কিছুতেই কাটাতে পারেনি। আমালিয়াকে সে শুরু থেকেই সহ্য করতে পারত না তার জন্ম পরিচয়ের কারণে। আবার তার জন্যই ইলারার মৃত্যু না চাইতেই ইউসুফকে হিংস্র করে তুলল। সে আমালিয়া শয়তানদের হাতে তুলে দিবে বলে পণ করলে হাদিজাহ রাতারাতি আমালিয়াকে নিয়ে পালিয়ে আসে। সকলে আমালিয়াকে স্বার্থের জন্য ব্যবহার করলেও ইলারা কখনোই আমালিয়াকে ব্যবহার করেনি। কিন্তু বেচারি সেই মাকে বেশিদিন কাছে পেলো না। কতটাই না দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে সে!

- তুমি এক মা হয়ে নিজের সন্তানকে স্বার্থের জন্য মেরেছ আর ইলারা মা না হয়েও সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন দিয়েছে। তোমার গর্ভ থেকে রত্ন বেরিয়েছিল কিন্তু আফসোস তুমি সেই রত্নের যোগ্য ছিলে না বিছমি।

#চলবে___

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন