#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-১৫
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
- সালাম নিবেন মহারানী।
এত বড় একটি মানুষকে নিজের সামনে ঝুঁকে থাকতে দেখে আমালিয়া চমকে মুখে হাত দিয়ে পিছিয়ে গেল। সে এতটাই হতভম্ব হল যে কিছু বলার ভাষা খুজে পেল না। আমালিয়া নিজেকে ধাতস্থ করে তড়িঘড়ি করে বলল,
- আপনি দয়া করে ঝুঁকে থাকবেন না। আমি আপনার অনেক ছোট হই। উঠুন নয়তো আমি ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি।
আমালিয়া বলার পরও জায়াদ্রা উঠলো না। বরং তাকে সম্মান জানাতে সেভাবেই ঝুঁকে রইলো। আমালিয়া এবার অসহায় ভাবে মেহমেতে দিকে চাইল। মেহমেত হেসে জায়াদ্রাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
- উঠে দাঁড়াও জায়াদ্রা।
তার বলার সাথে সাথে জায়াদ্রা মাথা তুলে দাঁড়ালো। আমালিয়া তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
- আমি কোন মহারানী নই। আপনি আমাকে আমালিয়া নামে ডাকতে পারেন। কিন্তু আমি আপনাকে কি নামে ডাকবো?
এক আঙুল থুতনিতে রেখে ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করল আমালিয়া। সামান্য কারণে তার চিন্তিত চেহারা বড্ড মজাদার লাগলো মেহমেত ও জায়াদ্রা কাছে। তাইতো না চাইতে ও হেসে ফেললো তারা। তাদের হাসতে দেখে আমালিয়া চোখ সরু করে চাইলো।
- আপনারা হাসছেন কেন?
- দুঃখিত বেগম সাহেবা। আপনি চাইলে জায়াদ্রাকে যে কোনো নামে ডাকতে পারেন।
- যে কোনো নাম?
- জ্বি।
- আপনি তাকে জায়াদ্রা বলে ডাকেন?
- জ্বি।
- তবে আমিও তাকে জায়াদ্রা বলে ডাকতে চাই।
তার কথায় মেহমেত মাথা নুইয়ে হাসলো। জায়াদ্রা বিনীত ভাবে বললো,
- আপনার যা ইচ্ছা মহারানী।
- উহ জায়াদ্রা, আপনাকে বললাম তো আমাকে মহারানী বলে না ডাকতে।
আমালিয়া ভীষণ বিরক্ত হয়ে কথাটি বললো। এ পর্যায়ে মেহমেত ভীষণ ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
- আপনি এখন আমার স্ত্রী। সুতরাং আমি রাজা হই আর না হই আপনি আমার সাম্রাজ্যের একমাত্র মহারানী। তাই সকলে আপনাকে সম্মান দিয়ে এই নামেই ডাকবে। এই বিষয়ে কোন তর্ক চাই না।
- আচ্ছা।
আমালিয়া বুঝতে পারছে মেহমেত এই বিষয়ে তার কথা শুনবে না, তাই কথা না বাড়ানোই ভালো হবে।
- জায়াদ্রা আজ রাতের খাবার তুমি তৈরী করবে।
- জ্বি হুজুর।
আমালিয়া তাদের কথার বিপরীতে খুব নম্রভাবে বললো,
- আমি করি আজ?
- কি?
মেহমেত কৌতহল নিয়ে জানতে চাইলো। আমালিয়া মিনমিন করে বললো,
- রান্না।
- কোনো দরকার নেই।
- কিন্তু কেন?
আমালিয়া করুন কণ্ঠে জানতে চাইলো। মেহমেত জায়াদ্রাকে নির্দেশনা দিয়ে আমালিয়ার হাত ধরে পুনরায় উপরে যেতে যেতে বললো,
- সময় হলে এসব করতে পারবেন এখন কোনো দরকার নেই।
- কিন্তু মেহমেত…
- কোনো কিন্তু নয়। টোটো।
মেহমেত একহাতে আমালিয়ার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিতে নিতে পিছু না ফিরেই টোটোকে শাসিয়ে উঠলো। টোটো তাদের পিছু নিলেও সে জাদুর মাধ্যমে হাওয়ায় উড়ে উড়ে যাচ্ছিলো। যা আমালিয়া দেখে ফেললে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবে। তাদের এই বাড়িতে প্রায় সকল কিছুই জাদুর মাধ্যমে হয়ে থাকে। এমনকি মেহমেত যে জায়াদ্রাকে খাবার তৈরী করতে বললো সেটিও জাদুর মাধ্যমে করা হবে। কিন্তু এই সকল কিছু আমালিয়ার দৃষ্টির আড়ালে করার নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। আমালিয়ার সম্মুখে তারা সাধারণ মানুষের মতো জীবন-যাপন করে থাকবে। কিন্তু টোটোটা একদম কথা শুনতে চায় না। আমালিয়া সেসবের কিছুই খেয়াল করেনি। সে তো মেহমেতের সাথে হাটতে হাটতে কথা বলছিলো, তাই তার টোটোর দিকে খেয়াল ছিল না। কিন্তু মেহমেতের টোটোকে ডেকে ওঠায় সে পিছু ফিরে তাকায়। ততক্ষনে টোটো জমিনে নেমে এসেছে। আমালিয়ার তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে মেহমেতকে উদ্দেশ্য করে বললো,
- কি হয়েছে?
মেহমেত সিঁড়ির কাছটায় দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে টোটোর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
- একদম দুষ্টামি করবে না টোটো। তাহলে কিন্তু তোমাকে পাঠিয়ে দিবো।
- কোথায়?
টোটো মেহমেতের কথায় তখন ভদ্র রূপ ধারণ করেছে। তাকে দেখলে মনেই হবে না সে কি পরিমান ভয়ানক। মেহমেত আমালিয়ার প্রশ্নে হেসে আবারো চলতে চলতে বললো,
- কোথাও না। ওকে ভয় দিচ্ছি নাহলে সে বড্ডো বেশি দুষ্টামি করে।
- ও।
রাতের খাবার তৈরী কিছু সময়ের মাঝেই হয়ে যায় বলে মেহমেত আবারো আমালিয়াকে নিয়ে নিচে চলে আসে। খাবার দেখে আমালিয়া বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। এত রীতিমতো রাজকীয় আয়োজন। এত এত খাবার কে খাবে? সে অবাক হয়ে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
- এত কিছু?
মেহমেত আমালিয়ার হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিয়ে বললো,
- সব কিছু আপনার জন্য।
- আমার জন্য? কিন্তু এত কিছু কেন? কে খাবে এসব?
মেহমেত হালকা শব্দ করে হেসে নিজে আমালিয়ার পাশে বসে বললো,
- আপনি যা পারেন খাবেন বাকিটার জন্য চিন্তা করতে হবে না।
- কিন্তু মেহমেত অপচয় হবে।
- হবে না আমালিয়া। আপনি নিশ্চিন্তে খেতে পারেন। যা বাকি থাকবে তা আমি খেয়ে নিব।
- এত খাবার আপনি একা খেতে পারবেন?
আমালিয়া অবাক হয়ে জানতে চাইলো। সে একবার সাজানো খাবার গুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবলো এখানে কম হলেও ১০-১২ জন মানুষের খাবার রয়েছে। মেহমেত কি তার সাথে মজা করছে? হয়তো মজাই করছে, না হলে একটা মানুষ কিভাবে এতগুলো খাবার খেতে পারে! এতো অসম্ভব প্রায়। মেহমেত তার সাথে হেয়ালি করে বলল,
- দেখা যাক।
অতঃপর মেহমেত একটি খাবারের পেয়ালা আমালিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
- এই খাবারটা বিশেষ করে আপনার জন্য বানানো হয়েছে। খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে?
আমালিয়ার পেয়ালাটি হাতে নিতে নিতে লক্ষ্য করলো জায়াদ্রা তাদের থেকে কিছুটা দূরে দুহাত সামনে বেঁধে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমালিয়া তাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
- জায়াদ্রা আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? এখানে এসে বসুন। সকলে এক সাথে খাবো।
জায়াদ্রা মাথা তুলে মেহমেতের দিকে তাকালো। মেহমেত আমালিয়ার দিকে একের পর এক খাবার এগিয়ে দিতে দিতে বললো,
- কি হলো জায়াদ্রা? তোমাদের মহারানী কিছু বলছে তোমায়।
জায়াদ্রা বিনয়ের সাথে উত্তর দিলো,
- জ্বি হুজুর।
জায়াদ্রা মেহমেতের পাশে তার থেকে দূরত্ব নিয়ে বসলো। আমালিয়া খুশি মনে তার দিকে একের পর এক খাবার এগিয়ে দিয়ে নিজেও খাওয়ায় মন দিলো।
- আচ্ছা টোটোকে তো দেখতে পাচ্ছি না। ও কোথায়? সে কি খাবে না?
মেহমেত আপন মনে খেতে খেতে বললো,
- টোটো এসব খায় না।
আমালিয়া খাওয়া থামিয়ে নিজের খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো,
- এসব খায় না? তাহলে কি খায়?
- ও যা খায় তা আপনি সময় হলে দেখতে পাবেন। এখন খাবারে মনোযোগ দিন। খাওয়ার সময় কথা বলা আমি পছন্দ করি না।
- দুঃখিত।
রাতের খাওয়া শেষে আমালিয়া মেহমেতের সেই কামরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। যেটি এখন থেকে তার এবং মেহমেতের কামরা। সে আজ থেকে এখানে মেহমেতের সাথে থাকবে, এই সত্যিটা তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। সবকিছু কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। আমালিয়া দুরুদুরু বুকে কামরার মাঝে প্রবেশ করে প্রতিটি জিনিস নিজ হাতে স্পর্শ করল। এই সব কিছু এখন তার একান্ত আপন। কেউ তাকে এখন থেকে মিথ্যে আশা দেখাবে না, ব্যবহার করবে না, ঠকাতে পারবে না। কারণ তার সাথে এখন মেহমেত রয়েছে, তার স্বামী রয়েছে। তার একান্ত আপনজন, যে কখনোই তাকে আর ঠকতে দিবে না।
-বেগম সাহেবা।
আমালিয়া পিছে ফিরে দেখল মেহমেত দরজার কাছে দাড়িয়ে তাকে দেখছে। হঠাৎ আমালিয়ার ভীষণ লজ্জা লাগলো। মেহমেতের সাথে এক কামরায় থাকতে হবে ভেবেই কেমন যেন অনুভূতি হল। মেহমেত তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমালিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তার সেই তাকানোতে আমালিয়া আরো বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। সে মেহমেতের দিকে তাকালো না, বরং এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করে বললো,
- টোটো কোথায়? তাকে তো আর দেখলাম না।
মেহমেত এবার দরজা ছেড়ে আমালিয়ার নিকট এগিয়ে এলো। আমালিয়া তার এগিয়ে আসা না দেখেও অনুভব করতে পারলো। যার ফলস্বরূপ, মেহমেতের এগিয়ে আসার সাথে সাথে আমালিয়া নিজেও পিছিয়ে গেলো। কিন্তু মেহমেত তবুও থামলো না, বরং কেমন অন্যরকম গলায় আমালিয়ার দিকে মাতাল চোখে তাকিয়ে বললো,
- আজ টোটো আমাদের মাঝে আসবে না। তাকে নিয়ে না ভেবে আপনি বরং নিজেকে নিয়ে ভাবুন।
বোকা আমালিয়া বুঝলো না মেহমেতের জটিল কথার মানে। সে বোকা বোকা চোখে মেহমেতের চোখে চোখ রেখে জানতে চাইলো,
- মানে?
মেহমেত আমালিয়ার দিকে আরো দুকদম এগিয়ে প্রায় ছুঁইছুঁই হয়েও আমালিয়াকে না ছুঁয়ে বললো,
- আপনি জানেন, আপনি ভয়ংকর সুন্দরী?
আমালিয়া এতক্ষন মেহমেতের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেও আবার সে দৃষ্টি নামিয়ে লাজুক হাসলো। সে জানে সে সুন্দরী। এরপূর্বে তাকে অনেকেই সে কথা বলেছে, কিন্তু তার সেই সৌন্দর্য সর্বদা তার ভিন্ন দুচোখের রহস্যের আড়ালে ভাটা পরে যেতো। যার কারণে সে ভুলেই গিয়েছিলো তার সেই ঐশ্বরিক রূপ, লাবণ্যের কথা। কিন্তু আজ হঠাৎ মেহমেতের মুখে এই কথাটি সত্যিই তাকে ভারী লজ্জা দিলো। লজ্জায় তার ফর্সা গালগুলো হালকা গোলাপি বর্ণ ধারণ করলো। মেহমেত তখন আমালিয়ার খুব কাছে। মেহমেতের নিশ্বাস আমালিয়া খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারছিলো, সেই সাথে মেহমেতের শরীরের সেই অদ্ভুত পাগল করা সুগন্ধও। যা আমালিয়াকে প্রতি মুহূর্তে পাগল করে দিচ্ছে। আমালিয়া চোখ বন্ধ করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো নিঃশ্বাস আটকে। মেহমেত তার অবস্থা দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। অতঃপর সে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে খুব সাবধানে নরম ভাবে আমালিয়ার বাম গালের লালাভ অংশ ছুঁয়ে দিলো। মেহমেত বড় আশ্চর্যের ন্যায় অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
- আপনার গাল হঠাৎ লাল হয়ে গিয়েছে কেন?
আমালিয়া মেহমেতের কথায় আরো বেশি লজ্জা পেয়ে চোখমুখ খিঁচিয়ে বললো,
- চুপ করুন বোকা পুরুষ।
- আশ্চর্য।
মেহমেতের কণ্ঠে একরাশ অবাকতা স্পষ্ট। এই মেয়ের গাল এভাবে লাল হলো কেন, সে তো এটাই জানতে চেয়েছে। এতে দোষের কি হলো? আমালিয়া তখনও তার দুহাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে লজ্জায় চোখমুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর মেহমেত আমালিয়ার গালে তার হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করে অবাক দৃষ্টিতে আমালিয়াকে দেখে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন অপলক আমালিয়াকে দেখে মেহমেত বললো,
- আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন?
আমালিয়া আর না পেরে মেহমেতকে দুহাতের সাহায্যে ঠেলে তার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে কিছুটা চেঁচিয়ে বললো,
- চুপ করুন আপনি।
আকস্মিক ঠেলে দেয়ায় মেহমেত শুরুতে ভড়কে গেলেও, যখন বুঝলো আমালিয়া লজ্জা পাচ্ছে তখন শরীর দুলিয়ে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে অতিষ্ট হয়ে আমালিয়া রেগে তার নাক ফুলিয়ে চোখ সরু করে তাকালো মেহমেতের দিকে। মেহমেত ভীষণ আনন্দ পেলো আমালিয়ার কাণ্ডে। সে এগিয়ে দুহাতের মাঝে আমালিয়াকে এই প্রথম গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরলো। তার হাতের মাঝে বেচারি আমালিয়া থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো। মেহমেত বুঝেও আমালিয়াকে ছাড়লো না। বরং খুব আদুরে ভঙ্গিতে আমালিয়াকে একহাতে জড়িয়ে রেখে অন্যহাতের সাহায্যে আমালিয়ার মাথায় বিলি কেটে বললো,
- আচ্ছা আর রাগ করতে হবে না।
আমালিয়া বলতে চাইলো অনেক কিছু কিন্তু লজ্জায়, সংকোচে সে কিছুই বলতে পারলো না। সে ওভাবেই মেহমেতের বাহুডোরে পরে রইলো দীর্ঘ সময়। এবং মেহমেত ও তাকে মানিয়ে নেয়ার সময় দিলো।
- আচ্ছা মেহমেত, আপনার কি ভয় করে না আমাকে?
আমালিয়া মেহমেতের বুকে মাথা রাখা অবস্থায় খুব ধীরে প্রশ্নটি করলো। তার প্রশ্নে মেহমেতের কপালে সুক্ষ ভাঁজের সৃষ্টি হলো। মেহমেত আমালিয়াকে বুক থেকে সরিয়ে তার দুহাত আমালিয়ার দুবাহুতে রেখে জানতে চাইলো,
- মানে?
- আমার এই দুচোখ আপনাকে ভয় দেয় না?
আমালিয়া মেহমেতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে জানার স্পৃহা, কিছু না বলা কষ্ট স্পষ্ট। মেহমেত তার দৃষ্টি প্রখর করে তাকালো আমালিয়ার চোখের দিকে। অতঃপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল আমালিয়ার চোখের চারিপাশে ধীরে ছুঁইয়ে দিয়ে বললো,
- এত সুন্দর চোখ দেখে ভয় পাবো কেন? আপনি নিজেও জানেন না আপনি কি আমালিয়া। আপনি কতটা ভয়ানক সুন্দর আপনি জানেন না। আমার চোখ দিয়ে দেখুন নিজেকে তাহলে বুঝতে পারবেন। তাছাড়া এই চোখ দুটি আল্লাহর তরফ থেকে উপহার আপনার জন্য। এখন হয়তো আপনি আফসোস করছেন কিন্তু একদিন আপনার এই চোখ দুটির জন্য নিজেকে আপনি অনন্য মনে করবেন। আপনার এই চোখ দুটি আমার খুব প্রিয় বেগম সাহেবা। বিশেষ ভাবে এই গাঢ় বাদামি চোখটি। কেন জানেন?
আমালিয়া মাথা দুদিকে নাড়িয়ে না বুঝালো। মেহমেত আমালিয়ার খুব কাছে গিয়ে কণ্ঠ নামিয়ে আমালিয়ার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে বললো,
- দেখুন আমার চোখে। আপনার ওই চোখটি ঠিক আমার চোখ দুটির মতো আমালিয়া।
আমালিয়া অবাক হয়ে দেখলো আসলেই মেহমেতের দুটি চোখ আমালিয়ার গাঢ় বাদামি চোখটির মতো। একদম একইরকম দেখতে। সে আগে কেন কখনো লক্ষ্য করেনি?
- ঘুমাতে চলুন বেগম সাহেবা।
মেহমেত আমালিয়াকে ছেড়ে নিজেদের মাঝে দূরত্ব রেখে কথাটি বললো। অতঃপর আমালিয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে সে আমালিয়ার হাত ধরে টেনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও দূরত্ব রেখে শুয়ে পরলো। আমালিয়া হাসফাস করে কিছুটা সরে গেলো মেহমেতের কাছ থেকে। মেহমেত তা দেখে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দেখলো আমালিয়ার হাবভাব। বেশ কিছুক্ষন আমালিয়ার দূরে থাকা সহ্য করে আর না পেরে তাই নিজে থেকেই বললো,
- বুকে আসুন দ্রুত।
আমালিয়া তার কথায় মাথাটা মেহমেতের বিপরীতে আলতো কাত করে মুখ লুকিয়ে হেসে খুব ধীরে বললো,
- নির্লজ্জ।
যদিও সে কথাটি ধীরে বলেছে কিন্তু তবুও মেহমেত শুনতে পেলো। মেহমেত আর অপেক্ষা করলো না। আমালিয়ার হাত টেনে নিজের বুকে ফেলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
- হ্যা আমি নির্লজ্জ। এখন ভালো মেয়ের মতো ঘুমান নয়তো আরো নির্লজ্জ হয়ে দেখাবো।
আমালিয়া কথা বাড়ালো না। তার এত বেশি সুখ সুখ লাগলো যে খুশিতে তার চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু নির্গত হলো। হঠাৎ করে এই স্থানটি তার সব থেকে নিরাপদ মনে হচ্ছে আজ। আমালিয়া নিজের চোখ বন্ধ করে চুপটি করে সেভাবেই পরে রইলো মেহমেতের বুকে। আশ্চর্জনক ভাবে মেহমেতের সাথে বিয়ে হওয়ার পর মেয়েটা একবারও তার পরিবার, তার দাদির কথা মনে করেনি। বোকা মেয়েটা কি একবারও ভেবে দেখেছে কেন তার এই পরিবর্তন? সেকি আদোও নিজের মাঝে আছে? নাকি কারো বশে রয়েছে?
—------------------------
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও আমালিয়াকে ফিরতে না দেখে হাদিজাহ চিন্তায় অস্থির হয়ে পরলো। সে ভেবে ছিল কিছু সময়ের মাঝে আমালিয়া ফিরে আসবে কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমান করে আমালিয়া এখনো ফিরে আসেনি। এদিকে আরদারেরও কোনো খোঁজ নেই। হাদিজাহ একা কি করবে বুঝতে পারছে না। বহু বছর তার জ্বিন রাজ্যের কারো সাথে সংযোগ নেই। কারো কাছ থেকে যে সহায়তা নিবে তারও উপায় নেই। তাছাড়া আলিসার সাথেও সে সংযোগ করতে পারছে না। মেয়েটা যে কোথায় রয়েছে? আরদার যাওয়ার পূর্বে বলেছিলো আলিসাকে যে কোনো সময় সহায়তার জন্য পাওয়া যাবে কিন্তু মেয়েটাকে সময় মতো পাওয়া গেলে তো? বাড়িতে সে এবং এভা ছাড়া কেউ নেই। বাচ্চা মেয়েটিকে একা রেখে কোথাও যাওয়ার সাহস সে করতে পারছে না। আমালিয়া এত রাত পর্যন্ত কোথায় রয়েছে তও সে ধারণা করতে পারছে না। চিন্তায় সে অস্থির। তার ভয় করছে। কোনো অঘটনের অভ্যাস হৃদয়কে ব্যাকুল করে দিচ্ছে। আমালিয়ার জন্য চিন্তা হচ্ছে। যদি সে জ্বিন বাদশাহের হাতে পরে তাহলে? হাদিজাহ দ্রুত নিজ কামরায় গিয়ে দরজা বন্ধ করে আসন পেতে বসলো। এখন তার ধ্যানে বসতে হবে। আরদারের সাথে যত দ্রুত সম্ভব যোগাযোগ করতে হবে। এমন বিপদের মুখে আমালিয়াকে সে কিভাবে ছেড়ে দিতে পারলো? এত বছর সুরক্ষায় রেখে শেষ মুহূর্তে এভাবে বোকামি সে কিভাবে করতে পারলো? হাদিজাহ বার করেক মনোযোগ দিয়ে আরদারকে উদ্দেশ্য করে ধ্যান লাগানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। বহু বছর সে জ্বিনদের মতো জীবন অতিবাহিত করেনি। সে একজন সাধারণ মানুষের মতো নিজের জীবন কাটিয়েছে, যার ফলস্বরূপ, আজ সে ব্যর্থ। কিন্তু তাকে ব্যর্থ হলে যে চলবে না। আমালিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে। নয়তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর হাদিজাহ আরদারের সাথে সংযোগ করতে সফল হলো। আরদার তখন তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ তার কানে হাদিজাহের কিছু কথা অস্পষ্ট ভাবে ভেসে এলো।
- রাজা আরদার আমালিয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি যেখানেই থাকুন না কেন দ্রুত পৃথিবীতে আসুন।
এতটুকু বলার পর হাদিজাহ আর যোগাযোগ করতে পারলো না আরদারের সাথে। অসহায় হাদিজাহ বিমূঢ় হয়ে বসে রইলো সেখানে। কিন্তু আরদার যতটুকু শুনেছে তাতেই তার কপালে কয়েকটি ভাঁজ পরে গিয়েছে। আমালিয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? সে নেই আর এরা এতজন মিলেও মেয়েটাকে কয়েক ঘন্টা দেখে রাখতে পারছে না? আরদার আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সেখান থেকে যেতে নিলে সুলেমান তাকে বাধা দিলো।
- কোথায় যাচ্ছ আরদার? আমার কথা শেষ হয়নি এখনো।
আরদার ঘুরে সুলেমানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বললো,
- আপনার এসব কথা শোনার মতো সময় আমার কাছে নেই বাবা। বয়স হচ্ছে আল্লাহর পথে ফিরে আসুন। অর্থ, সম্পদ সাথে করে কবরে নিতে পারবেন না। পূর্বে যা করেছেন তার জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর আমাকে অযথাই বারবার এখানে আসতে বাধ্য করবেন না। এসব অযৌক্তিক কাজ ছাড়াও আমার অনেক প্রয়োজনীয় কাজ থাকে।
কথাগুলো বলে সে এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হওয়ার বেগে ছুঁটে চললো। আমালিয়ার জন্য তার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। কি হয়েছে সেখানে তা না জানা পর্যন্ত স্বস্থির নিশ্বাস নেয়া সম্ভব নয়। হাদিজাহ তার কামরায় যেখানে যেভাবে মেঝেতে বসে ছিলেন সেখানেই বসে ছিল। হঠাৎ তার কামরায় কুন্ডলি পাকিয়ে আরদার এসে উপস্থিত হলো। হাদিজাহ কারো উপস্থিতি অনুভব করে মাথা তুলে তাকিয়ে আরদারকে দেখে অসহায় চোখে চাইল। আরদার বড়বড় কদমে হাদিজাহের দিকে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,
- জ্বিন মাতা আমালিয়ার কি হয়েছে?
হাদিজাহ মিইয়ে যাওয়া গলায় ধীরে ধীরে আরদারের অনুপস্থিতিতে পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা একে একে বলতে লাগলো। সব শুনে আরদার কি বলবে তার ভাষা পেলো না। তাদের এত দিনের পরিশ্রম এক নিমিষে শেষ হয়ে গেলো। যে সত্য বিশ বছর ধরে আমালিয়ার থেকে লুকানো হলো আজ সেই সত্য শেষ মুহূর্তে এসে আমালিয়ার সামনে চলে এলো! আরদার হতবম্ভের মতো দাঁড়িয়ে রইলো কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়া। হঠাৎ তার আমালিয়ার কথা স্মরণে এলো। সে অবাক অথচ ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলো,
- আমালিয়া?
হাদিজাহ নিরাশ কণ্ঠে বললো,
- সেই ঘটনার পর আমালিয়ার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
- কিহ! আর আপনি তার খোঁজ না করে চুপ করে বসে ছিলেন? জ্বিন মাতা আপনি আমালিয়ার প্রতি আরো একটু যত্নশীল কেন হলেন না?
আরদার প্রচন্ড ভাবে হতাশ। সাথে আমালিয়ার জন্য তার বড্ডো চিন্তাও হলো। মেহমেত জানে আমালিয়া কোথায়, কোন পরিস্থিতিতে রয়েছে? তার মতো ওমন চতুর, স্বার্থপর প্রকৃতির জ্বিন এই সুযোগ কি হাত ছাড়া করবে? কখনো না। যদি আমালিয়া তার কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তখন কি হবে? চিন্তায় আরদার অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। আজ তার বড্ডো বেশি নিজের ওপর ঘৃণা হচ্ছে। কেন সে সেদিন আমালিয়ার খোঁজে সেখানে গিয়ে ছিল? যদি আজ আমালিয়া এখানে না আসতো তাহলে সে এত বিপদেও পড়তো না। হঠাৎ আরদার হম্বিতম্বি করে মেঝেতে আসন পেতে বসে আলিসাকে আহবান করার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে বারে বারে ব্যর্থ হলো। আরদার দীর্ঘক্ষণ দৃষ্টি শূন্যে রেখে তাকিয়ে রইলো। কিছু একটা যে ঠিক নেই তা সে বুঝতে পারছে। হাদিজাহ পাশেই দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে ছিল নীরবে। সে নিজেও অপরাধবোধে ভুগছে। আরদার তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
- আলিসা কোথায়?
হাদিজাহ বিনয়ের সাথে উত্তর দিলো,
- তার সাথে বহুবার যোগাযোগ করতে চেয়েছি, কিন্তু তাকে কোথাও পাইনি। আমালিয়া যখন চলে গেলো আমি ভেবে ছিলাম আলিসা তার সাথে রয়েছে চিন্তার কিছু নেই। এই জন্যই আমি তখন বিশেষ গুরুত্ব দিই নিই। কিন্তু যখন রাত হয়ে গেলো তখনও আমালিয়া ফিরে এলো, না তখন আলিসার সাথে সংযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে আপনার সাথে যোগাযোগ করি।
- আলিসার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না?
আরদারের কপালে চিন্তার রেখা।
- জ্বি না রাজা আরদার।
আরদার নিশ্চুপ বসে রইলো। তার আর বুঝতে বাকি নেই কি হয়েছে বা হতে পারে। এত কষ্ট, এত ত্যাগ একটা ভুলের কারণে বৃথা যাবে? হঠাৎ করে আরদার ভেঙে পরলো। ফুপুজানকে দেয়া কথা সে রাখতে পারেনি। আমালিয়াকে সে রক্ষা করতে পারেনি। কি হবে এই ভুলের পরিণতি?
—-----------------------------
বদ্ধ আধাঁর কামরার মাঝে একটি নারী কণ্ঠ ধীরে অস্পষ্ট ভাবে ভেসে আসছে। তার কণ্ঠস্বর বলে দিচ্ছে দীর্ঘক্ষণ চেঁচানোর জন্য তার কণ্ঠ ভেঙে মিইয়ে গিয়েছে। আলো, আঁধারিতে তার কন্ঠের থেকে শিকলের ঝনঝন শব্দই বেশি শোনা যাচ্ছে।
- পানি, পানি।
নারীটি পানি চাইলেও তাকে পানি দেয়ার মতো সেখানে যে কেউ নেই। তৃষ্ণায়, কষ্টে নারীটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো। তার কান্নার মাঝে হঠাৎ বদ্ধ কামরার দরজাটি হা করে খুলে এক চিলতে আলো এসে পরলো নারীটির ওপর। দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারের মাঝে থাকায় হঠাৎ আলো চোখে পড়ায় সোনার শিকল দিয়ে বাধা হাত দুটির একটি হাত নিজ থেকেই চোখ ঢেকে নিলো। অতঃপর আস্তে আস্তে হাত সরিয়ে দেখতে পেলো সেই দরজা দিয়ে কেউ প্রবেশ করছে। নারীটি তাকিয়ে দেখতে রইলো ব্যক্তিটির আগমন। তার আগমনের সাথে সাথে ঘরময় আলো ভোরে উঠলো যেন। নারীটি ব্যাক্তিটির পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো পায়ে কোন গোড়ালি নেই। অর্থাৎ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি সাধারণ কেউ নয়, বরং সে একজন জ্বিন! নারীটি এবার অবাক হয়ে ব্যাক্তিটির মুখের দিকে তাকালে ধীরে ধীরে একটি নারী অবয়ব স্পষ্ট হলো তার সামনে। মুখটি দেখে সে অবাক হয়ে আওড়ালো,
- আমালিয়া?
আমালিয়া চমৎকার মিষ্টি এক হাসি দিয়ে বললো,
- কেমন আছো আলিসা? এখানে বেশি কষ্ট হয়নি তো?
চলবে—-
(এখন থেকে আসল কাহিনী শুরু হবে। সুতরাং সকলে সিট্ বেল্ট বেঁধে বসুন। এই উপন্যাসে কেউ বিশ্বাসের যোগ্য না। আমি নিজেও জানি না কে আসলে শিকার আর কে শিকারী। চরিত্রগুলো কেমন যেন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলছে। আচ্ছা আগামী প্রতিটি পর্বে ধামাকা আসবে। অনেক অনেক রহস্যের খোলাসা হবে। লেট করে দেয়ার জন্য দুঃখিত।)