ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

১৪তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-১৪

[📍কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

সুউচ্চ প্রাসাদের দক্ষিণ পার্শ্বের একটি মস্তবড় বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে আরদার। সে এখন জ্বিন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সিলা রাজ্যে রয়েছে। এবং এই প্রাসাদটি সিলা গোত্রের রাজার অর্থাৎ তার। হঠাৎ জরুরি তলবে তার পিতা সুলেমান তাকে সিলা রাজ্যে আসার জন্য আহবান করে ছিলেন। যার কারণে কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া তাকে এখানে আসতে হয়েছে। নয়তো সে কখনোই আমালিয়াকে একা ছেড়ে এই সময়ে আসতো না। সুলেমান বলে ছিল নিজ কামরায় অপেক্ষা করতে। সে কিছু সময়ের মাঝে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য আসবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করার পরও যখন সুলেমানকে ফিরতে দেখা গেলো না তখন আরদার ভয়ংকর রেগে গেলো। বুঝতে সমস্যা হলো না তার বাবা আবারও ছল-কপটতার সাহায্য নিয়েছেন। এই সময়ে এসব ছেলে মানুষীর কোনো মানেই হয় না। আরদার অপেক্ষা না করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট শব্দ করে দরজাটি খুলে উচ্চতায় লম্বা ও সুদর্শন এক পুরুষ প্রবেশ করলো। পুরুষটিকে দেখে তার বয়স বিবেচনা করা বড্ড কষ্টকর। তার মুখশ্রী আরদারের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। প্রথম দেখায় কোনভাবেই বোঝার উপায় নেই পুরুষটি আরদারের বাবা। বরং তাকে দেখে আরদারের বয়সীই মনে হলো। সে হাসি মুখে আরদারের নিকট এগিয়ে এসে আরদারকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে, আরদার পিছে সরে গেলো। সুলেমান ছেলের কাজে একটু অসন্তুষ্ট হলো বটে কিন্তু প্রকাশ করল না। বরং হাসি মুখে বলল,

- কেমন আছেন মহারাজ?

আরদার এসব ভনিতা করার অবস্থায় একদম নেই। সে সরাসরি সুলেমানকে প্রশ্ন করলো,

- কেন ডেকেছেন আমাকে?

- এতোগুলো দিন পর বাবার সাথে দেখা অথচ কেমন আছি প্রশ্ন না করে কেন ডেকেছি জানতে চাইছেন মহারাজ? আপনার আম্মি আর আমি কি আপনাকে এই শিক্ষা দিয়েছি?

আরদার সুলেমানের কথায় তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,

- আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন বাবা, বুঝ হওয়ার পর থেকে আমি আপনাদের কখনো আমার কাছে পায়নি। আপনারা আমাকে ত্যাগ করে ছিলেন। শুধুমাত্র আমি ছেলে ছিলাম বলে। আমাকে দিয়ে আপনারা এই বিশাল রাজ্যের ওপর রাজত্ব করতে পারবেন না বলে যে বয়সে বাচ্চারা তার বাবা মায়ের ভালোবাসা পায় আমি সেই বয়সে আমাদের থেকে অবজ্ঞা পেয়েছি। আর শিক্ষা? আপনারা শুধু শিখিয়েছেন কিভাবে আপনজনদের ঠকাতে হয়। ছলের সাহায্যে কিভাবে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে হয়।

- আরদার।

সুলেমান ভয়ংকর গর্জন দিয়ে উঠলো। পূর্বের আরদার হলে হয়তো ভয়ে এক কর্নারে সিঁটিয়ে থাকতো সে। কিন্তু এখন সে সেই ভীতু আরদার নেই। এখন তার মাথার ওপর অনেক দায়িত্ব। দুর্বলতা তাকে মানায় না।

- চেঁচাবেন না বাবা। ভুলে যাবেন না আপনি সিলা গোত্রের রাজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

সুলেমান হঠাৎ অট্ট হাসিতে ফেটে পরলো।

- রাজা? তুমিও ভুলে যেও না আরদার শুধুমাত্র আমার জন্য তুমি এই সিংহাসনের রাজা।

- ভুলে যাইনি বাবা। কিভাবে ভুলে যাই সেই কালো অতীত? কিভাবে ভুলে যাই এই সিংহাসনের লোভে কতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের বলি চড়েছে? কিভাবে ভুলে যাই ফুপুজানের সাথে আপনার করা প্রতারণার কথা? কিভাবে ভুলে যাই লাভের বশে আপনি নিজের মাকেও ছেড়ে দেন নিই।

সুলেমান ছেলের কথায় হাসলো। সে এগিয়ে আরদারের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,

- ওহহো আরদার, তুমি এখনো বোকাই রয়ে গেলে। আমি তোমার ফুপুজানের সাথে প্রতারনা করিনি। বরং আমি এই সৃষ্টিকে তার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি মাত্র।

- এসব কথা আপনি বরং অন্যদের বুঝান বাবা। আমি আর ছোট নেই। সবটা আমার চোখের সামনে হয়ে ছিল। সে আপনাকে বিশ্বাস করে ছিল। নিজের আপন বোনকে মারতে আপনার হাত কাঁপেনি বাবা কতটা নিকৃষ্ট আপনি। আপনি বড্ড স্বার্থপর বাবা। নিজ স্বার্থের জন্য যেমন আমাকে ছেড়ে ছিলেন, ফুপুজানকে মেরে ছিলেন, নিজের মাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরে ছিলেন, ঠিক একই ভাবে প্রয়োজনে আপনি আমাকে মারতেও দ্বিধা করবেন না।

- ঠিক বলেছো আরদার। তুমি তোমার বাবাকে একদম ঠিক চিনেছ। আমার পথের কাটা হলে আমি তোমাকে মারতেও দুবার ভাববো না। যেমন করে তোমার ফুপুজানকে মেরেছি ঠিক সেভাবে তোমাকেও মেরে ফেলবো আরদার। তাই আগে থেকে সতর্ক করছি, আমার পথ থেকে সরে যাও। আমালিয়াকে আমার হাতে তুলে দাও। তুমি আমার রক্ত আরদার, তোমাকে মারতে আমার ভালো লাগবে না। দেখো আরদার দেখো, আমালিয়া আমাদের হাতে এলে এই প্রাসাদ, এই রাজ্য, এই বিলাসিতা, ক্ষমতা এবং সেই তলোয়ার সব আমাদের হবে সব।

সুলেমানকে এখন ঠিক উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছে। লোভ-লালসায় তার চোখ চকচক করছে। আরদারের বড় ঘৃণা পেলো বাবা নামের লোকটির প্রতি। দুচোখের পাতায় ভেসে উঠলো সেই ছেলেবেলার কথা গুলো।

অন্যান্য জ্বিন গোত্রে পুরুষ জ্বিনদের মর্যাদা বেশি হলেও সিলা গোত্র নারী ভিত্তিক। সিলা গোত্রে নারীর কথাই শেষ কথা। এই গোত্রের প্রধানও নারীই হয়ে থাকে। বংশ পরম্পরা অনুযায়ী রানীর কন্যা সন্তান সিলা গোত্রের পরবর্তী রাণী হয়ে থাকে। আরদারের দাদি অর্থাৎ পূর্ব সিলা গোত্রের রাণীর প্রথম সন্তান সুলেমান ছিল। এবং তার পর তার একটি কন্যা সন্তান হয়। যার নাম রাণী বড্ড শখ করে মারিয়াম রেখে ছিলেন। সাধারণত প্রথম সন্তান রাজ্যের দায়িত্ব নিলেও যেহেতু সিলা গোত্রে নারী শক্তিই সব তাই সকলেরই জানা ছিল পরবর্তী রাণী মারিয়াম হবে। সুতরাং সুলেমানের থেকে মারিয়াম বাচ্চাকাল থেকেই অতিরিক্ত প্রাধান্যতা পেয়ে এসেছে। যা বাচ্চা সুলেমানের মনে একটু একটু করে হিংসার সৃষ্টি করে। কিন্তু চতুর সুলেমান তা কাউকে কখনো বুঝতে দেয়নি। সুলেমান বলতে গেলে এক প্রকার অকেজো ছিল। তার না ছিল ক্ষমতা না ছিল সন্মান। তাকে সকলে না দেখার মতো করে এড়িয়ে যেতো। হয়তো এটিই এই গোত্রের নিয়ম। সিলা গোত্রের জ্বিনরা সর্বদাই ছলে পারদর্শী। এরা নিজেদের রূপ, সৌন্দর্যের সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বেড়ায়। পুরুষ জ্বিনেরা নারী রূপ ধারণ করে পুরুষ মানুষদের বশে নিয়ে খারাপ কাজ করায়। এতে তারা আনন্দ পায়। যদিও সব সিলা জ্বিন খারাপ নয় তবে অধিকাংশ জ্বিনদের মাঝে এ স্বভাব বিদ্যমান। সুলেমানের মা যখন সিলা গোত্রের নারী ছিলেন তখন এই অনাচারের প্রবণতা কম ছিল। তিনি অত্যন্ত আল্লাহ্ ভক্ত জ্বিন ছিলেন। তার সময়কালে সিলা গোত্রের বহু খারাপ জ্বিন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতেও পারেননি তার নিজ পেটের একটি সন্তান জ্বিন রূপে শয়তানে পরিণত হচ্ছিল দিনে দিনে। ধীরে ধীরে সুলেমান ও মারিয়াম বড় হতে শুরু করে, তার সাথে সুলেমানের মনের হিংসাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। খুব অল্প বয়সে হঠাৎ একদিন সুলেমান এক সিলা জ্বিনকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। অত্যধিক সুন্দরী সেই জ্বিনের রূপের প্রশংসা যতো বেশিই করা হোক না কেন তা কমই পরবে। সুলেমানের মা অবশ্য বিশেষ আপত্তি করেননি সেই বিবাহে। কিন্তু মনে মন সে নারাজ ছিলেন সুলেমানের কাজে। ছেলের এই অবাধ্য আচরণে সে কষ্ট পেয়েছিল। আরদারের মা জুলেখা রূপে যেমন অনন্য ছিল ঠিক তেমনই খারাপ স্বভাবেও সে অনন্য ছিল। কুট বুদ্ধিতে পারদর্শী এক সিলা জ্বিন ছিল সে। বিয়ের কিছুদিনের মাঝেই সে তার ছল-কপটতার সাহায্যে রানীর মন জয় করে নিলেন। বৃদ্ধা রানী তখন প্রায় সময়ই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগত। হঠাৎ হঠাৎ সে শয্যাশায়ী হয়ে পরতেন। ছোট মারিয়াম তখন একা হাতে রাজ্য সামলাতে পারবে না বলে রানী নিজ পুত্রবধূকে কিছু সময়ের জন্য সেই দায়িত্ব পালন করতে বলেন। কিন্তু জুলেখার আগমনে ধীরে ধীরে রাজ্যে খারাপ কাজ বাড়তে লাগলো। যতদিনে রানীর কানে সেই সংবাদ পৌঁছায় ততদিনে জুলেখা সন্তানসম্ভবা। রানী চেয়েও আর কিছু বলতে পারলেন না। জুলেখা এবং সুলেমান ভাবলেন এবার হয়তো ক্ষমতা পাওয়া থেকে তাদের কেউ আটকাতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার ওপর কারো হাত নেই যে। ফলস্বরূপ, তাদের নিরাশ করে জন্ম নিলো আরদার। ছেলে সন্তান জন্ম দেয়ার অপমানে জুলেখা ছেলের মুখ অবদি দেখলো না। আর সুলেমান? ক্ষমতা হারানোর রাগে, কষ্টে ছেলেকে ত্যাগ করলো। সেই সময়ে দুধের সেই শিশুটিকে মারিয়াম মায়ের মমতা দিয়ে আগলে নিয়ে ছিল। মায়ের স্নেহ বাবার ভালোবাসা সবটাই একা মারিয়াম দিয়ে ছিল আরদারকে। অথচ তার আপন বাবা-মা তাকে ভালবাসা তো দূরের বিষয় , সময় সুযোগ পেলে তারা আরদারকে অপমান, অপদস্ত, মার, খারাপ ব্যবহার ছাড়া দিয়েছে টা কি? একটা বয়স পর্যন্ত আরদার তার ফুপুজানের কাছেই থেকেছে। কিন্তু এরপর মারিয়াম তাকে সুশিক্ষা ও আদর্শ জ্বিন হওয়ার জন্য মারিদ গোত্রের এক শক্তিশালী জ্বিনের নিকট পাঠিয়ে দেন। যার থেকে আরদার যুদ্ধের কৌশল ও একজন নিষ্ঠাবান জ্বিন হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করেছে। এর মাঝে আরদারের মারিয়ামের সাথে যোগাযোগে ছিল না। একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পর যখন সে পুনরায় সিলা রাজ্যে ফিরে আসে তখন তার সাথে সাথে অনেকের জীবনই বদলে গিয়ে ছিল। রাজ্যে ফিরে এসে মারিয়ামকে বন্দি অবস্থায় পেয়ে ছিল সে। তার থেকেও চমক পেয়ে ছিল যখন সে জেনে ছিল মারিয়াম সন্তান সম্ভবা। তার অভ্যন্তরে এক হাইব্রিড সন্তান রয়েছে। সেদিন সে প্রথমবার তার ফুপুজানের স্বামীর সাথে দেখা করেছিল। সেদিনই প্রথম এবং এদিনই শেষ। তার যাওয়ার পর মারিয়ামের জীবনে এক ইনসানের আগমন ঘটে ছিল। মারিয়াম তাকে ভীষণ ভালোবেসে ছিল। সে সেই ইনসানকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু রানী তা কিছুতেই মেনে নিতে নারাজ। মারিয়াম মায়ের পায়ে পরে বহু কেঁদে ছিল সেদিন কিন্তু রানীর মায়া হয়নি। জুলেখা মা-মেয়ের রাগ, অভিমানে আরো বেশি করে বিষ ঢেলে দিতো। যার ফলে রাণী তৎক্ষণাৎ মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মারিয়াম যখন সব জানতে পারে তখন সে দিশেহারা প্রায়। কিছুতেই সে ইব্রাহীমকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। কিন্তু ততক্ষনে সে রানীর কড়া নজরদারিতে বন্দি। জুলেখা ও সুলেমান তখন নতুন চাল চালল। মারিয়ামের নিকট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তাকে পালাতে সাহায্য করে। মেয়ের শোকে তখন রাণী পুরোপুরি মূর্ছা গেল। জুলেখা সেই সুযোগে তাকে একটু একটু করে বিষ দেয়া শুরু করলো। দীর্ঘ সময় ধরে মারিয়াম ইব্রাহীমের সাথে ইনসানদের সাথে পৃথিবীতে থাকার পর এক ভোরে সে জানতে পারল তার মা খুব অসুস্থ। সে মারিয়ামের সাথে দেখা করতে চান। মায়ের শারীরিক অবনতির কথা শুনে মারিয়াম অস্থির প্রায়। ততদিনে মারিয়াম আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বউকে ইব্রাহীম অত্যন্ত ভালবাসে। তারওপর বউয়ের সাথে তার বাচ্চাও রয়েছে এখন। একা সেখানে যেতে দিতে নারাজ সে। অগত্যা ইব্রাহীমকে সাথে নিয়ে মারিয়াম সিলা রাজ্যে পৌঁছালো। সেখানে পৌঁছে সে রীতিমত অবাক। চারিদিকে বিশৃঙ্খলা ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত সকলে। এই কি সেই রাজ্য যেখানে সে বড় হয়েছে? ইব্রাহীম সাথে থাকায় লজ্জায় মারিয়ামের চোখে পানি চলে এসেছিল সেদিন। মায়ের সাথে দেখা করে মারিয়াম জানতে পারল এসকল কাজ সুলেমান ও জুলেখার। এমনকি তাকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত করে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। যতদিনে সে এসব জেনেছে ততদিনে সব শেষ। রানী মারিয়ামের হাত ধরে ভীষণ কেঁদেছে, ক্ষমা চেয়েছে। তিনি চাচ্ছেন রাজ্যের ভার মারিয়ামের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে। এই সংবাদ সুলেমান ও জুলেখার কানে পৌঁছালে তারা হিংস্র হয়ে উঠল। কোনরূপ আগাম বার্তা ছাড়া তাদের বন্দি করা হলো। দীর্ঘ বারো দিন ইব্রাহীম ও মারিয়ামকে কালকুট্রিতে বন্দি করে অভুক্ত রাখা হলো। না সঠিক ভাবে খাবার দেয়া হতো তাদের আর না তারা সূর্যের আলো দেখতে পেতো। আরদার মূলত দাদির মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সিলা রাজ্যে এসে ছিল। সেখানে এসে আরদারের দাদির খুব নিকটস্থ এক দাসীর মাধ্যমে মারিয়ামের খবর সে পায়। সেখান থেকে নিজ উদ্যোগে সে মারিয়াম এবং ইব্রাহীমকে পালাতে সাহায্য করে। এছাড়া তার পক্ষে তখন আর কিছু করা সম্ভব ছিল না। কারণ তখন ক্ষমতা জুলেখা আর সুলেমানের হাতে ছিল। তাছাড়া আরদারের বয়সও তখন কম ছিল। কিন্তু এতো কিছু করেও সে তাদের রক্ষা করতে পারেনি। তার বাবা যখন জানতে পারল মারিয়াম পালিয়েছে তখন তাদের পিছনে কিছু খারাপ জ্বিন পাঠানো হয়। নিজ স্ত্রী-সন্তানকে বাঁচাতে সেদিন ইব্রাহীম নিজের জীবন উৎসর্গ করে ছিল। সেদিন মৃত্যুর আগমুহূর্তে ইব্রাহীম স্বীয় স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে শুধু বলেছিল।

- তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি মারিয়াম। তাকে তোমার কাছে আমানত হিসেবে রেখে যাচ্ছি। তাকে এবং নিজেকে হেফাজতে রেখো।

মারিয়াম সেদিন কেঁদেছিল। অমাবস্যার সেই রাতে মারিয়ামের কান্নায় আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠে ছিল। ভালোবাসা হারানোর কষ্টে স্বামীহারা এক জ্বিন কন্যার সেই কান্না প্রমাণ করে ছিল শুধু মানুষই ভালবাসতে পারে না, জ্বিনরাও পারে। যেমন মারিয়াম বেসে ছিল ইব্রাহীমকে। গোটা একটি রাজ্যের শেহজাদী একজন মানুষকে ভালোবেসে নিজের সব কিছু ছেড়ে ছিল শুধু ভালোবাসার মানুষটির সাথে সুখে কিছুদিন বাঁচার জন্য। অথচ পাষাণ দুনিয়া তার থেকে সেটাও ছিনিয়ে নিয়ে ছিল।

_____________

- স্বাগতম বেগম।

তারা বর্তমানে জঙ্গলে মেহমেতের সেই বাড়ির সামনে দাড়িয়ে। প্রথম দিনের মতো আজও মেহমেত তার বাড়ির দরজা খুলে আমালিয়াকে স্বাগতম জানালো। আমালিয়া আবারও এই বাড়িতে পা রাখলো। পার্থক্য শুধু আগে সে কেবল আমালিয়া ছিল আর এখন সে মেহমেতের বউ। বউ! মেহমেতের বউ! ইস্ কি অদ্ভুত এক অনুভূতি। আমালিয়ার পরণে তখনো সেই সাদা দোপাট্টাটি রয়েছে। যা এখন সম্পূর্ণ শরীরে জড়িয়ে নেই। বরং তা নাক থেকে মাথা হয়ে পিছনে পা ছড়িয়ে মাটি পরে আছে অবলীলায়। আমালিয়াকে এই সাধারণ সাঁজে অনন্য লাগছে। আমালিয়া তার অনুভূতিকে দমিয়ে পা বাড়ালো ঘরের ভিতর। মেহমেত আমালিয়াকে অনুসরণ করে আগালো পিছুপিছু। আমালিয়া যখন ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো, কোথা থেকে যেন টোটো ছুটে তার নিকট এগিয়ে এসে পায়ের সাথে তার শরীর মিলিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে জানান দিলো সে আমালিয়াকে বড্ড বেশি মনে করেছে। আমালিয়া মেঝেতে বসে টোটোকে আদর করে দিয়ে বলল,

- কেমন আছো টোটো?

টোটো তার ডানা নাড়িয়ে কি বলল আমালিয়া বুঝলো না। সে অসহায় দৃষ্টিতে মাথা ঘুরিয়ে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো মানে। মেহমেত দূর থেকে ওদের পুনর্মিলন দেখছিল। আমালিয়াকে ওভাবে তাকাতে দেখে এবার সে এগিয়ে এসে বসলো আমালিয়ার মতো করে। অতঃপর টোটোর শরীরের হাত বুলিয়ে বলল,

- সে আপনাকে খুব মনে করেছে। আমাকে বারবার আপনাকে নিয়ে আসার জন্য বলতো। (টোটোর দিকে তাকিয়ে) এবার খুশি তো? কথা দিয়ে ছিলাম এবার থেকে উনি আমাদের সাথে থাকবে। দেখুন নিয়ে এসেছি একেবারের জন্য আমাদের কাছে।

আমালিয়ার এখন মনে হচ্ছে সে একা নয়। এই দুনিয়াতে তার আপন বলতে কেউ রয়েছে। মেহমেত আর টোটো। তার একান্ত আপনজন। এই বাড়ি যা কিছু দিন পূর্বেও তার কাছে অপরিচিত ছিল আজ থেকে এটি তার ঠিকানা। তার একমাত্র ঠিকানা।

- চলুন আপনাকে আমাদের কামরা দেখিয়ে দিই।

- আমাদের?

আমালিয়ার প্রশ্ন শুনে মেহমেত হাসলো ঠোঁট বাঁকিয়ে। সে আমালিয়ার হাত ধরে টেনে উঠিয়ে পা বাড়ালো আমালিয়াকে সাথে নিয়ে,

- হ্যাঁ। আপনার আর আমার কামরা। আমাদের কামরা। যা আমার তা এখন থেকে আপনারও।

মেহমেত একটু থেমে পিছু ফিরে আমালিয়ার দিকে ঝুঁকে বলল,

- আর যা আপনার তা শুধুমাত্র আমার। শুধুই আমার।

আমালিয়া অবুঝ চোখে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহমেত কি বুঝিয়েছে তা সে বুঝতে না পারলেও মেহেমেতের কন্ঠে যে অধিকারবোধ ছিল তা তাকে অভিভূত করল। কোন এক নাম না জানা ভালোলাগায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এতো সুখ কেন জীবনে? এত ভালোলাগা কেন? এই অনুভূতির নাম কি? একেই কি বলে ভালোবাসা? তার মেহমেতের প্রতি যে অনুভূতি তা কি শুধুই ভালোলাগা নাকি ভালোবাসা? আচ্ছা, তার মতো কি মেহমেতেরও তার প্রতি এমন অনুভূতি অনুভব হয়? মেহমেত কি তাকে ভালোবাসে? নাকি শুধুমাত্র তাকে করুণা করে বিয়ে করলো? আমালিয়া আর ভাবতে চায় না, বুঝতে চায় না। কিছুই বুঝতে চায় না। সে এখন শুধু ভালো থাকতে চায়।

মেহমেত আমালিয়ার হাত ধরে তাকে সিড়ি দিয়ে উপরে নিয়ে গেল। টোটো তাদের চলে যেতে দেখে নিজেও তাদের পিছু নিয়ে ছুটলো। আমালিয়া আগেরবার যে কামরাতে ছিল ভেবেছিল ওটাই হয়তো মেহমেতের কামরা। কিন্তু মেহমেত তাকে এবার সেই কামরাতে নিয়ে গেল না। বরং সেই কামরার সামনে থেকে পেরিয়ে করিডোরের একদম শেষ মাথায় গিয়ে তার হাত ছাড়লো। টোটো ততক্ষণে আমালিয়ার পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মেহমেত আমালিয়ার হাত ছেড়ে একটি বড় কারুকাজ করা কাঠের দরজা খুলে দিল। কক্ষটি খোলার সাথে সাথে দমকা হাওয়া আমালিয়ার শরীর জুড়ে ধাক্কা দিল। একটি মোহময় সুঘ্রাণ আমালিয়া অনুভব করতে পারল। মেহমেত আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি এক হাসি দিয়ে বলল,

- আসুন।

মেহমেত কথাটি আমালিয়ার উদ্দেশ্যে বললেও আমালিয়া এক পাও নড়তে পারলো না। তার পরিবর্তে টোটো তার দুরন্ত শরীর নিয়ে ছুটে ভিতরে চলে গেল। আমালিয়া তখনো বড় বড় চোখ করে তাকিয়েই রইলো ঘরটির দিকে। সে কল্পনাও করেনি কোন মানুষের ঘর এমন হতে পারে। এত সুন্দর আর এত বড় ঘর আমালিয়া এর পূর্বে কখনো দেখেনি। বিলাসিতার একটি সংজ্ঞা থাকে, কিন্তু এই ঘরটি দেখে আমালিয়ার মনে হল বিলাসিতার সকল সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। মেহমেত আমালিয়াকে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই ওর হাত ধরে টেনে কামরার ভিতরে নিয়ে গেল। আমালিয়া অবাক হয়ে দেখল এই কক্ষটি পূর্বের কক্ষটির থেকেও অনেক অনেক বড়। কক্ষটির প্রতিটি কোনায় আভিজাত্যের ছোঁয়া দৃশ্যমান। ঠিক মাঝ বরাবর একটি বড় আকারের বিছানা তার পাশেই ছোট ছোট দুটি টেবিল। টেবিলের উপর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দুটি গাছ রাখা। বিছানার ডানপাশে একটি বড় বইয়ের তাক এবং তার পাশেই একটি ছোট টেবিল। বইয়ের তাকে অগণিত বইয়ের ছড়াছড়ি। আমালিয়া এর পূর্বে লাইব্রেরীতে ছাড়া এভাবে এত বই কখনো দেখেনি। আর টেবিলে কিছু বইয়ের সাথে একটি কফি মেকার।কক্ষের ডান পাশে একটি বড় বারান্দার মত রয়েছে। এবং বিছানার ঠিক সামনাসামনি একটি পোশাক রাখার আলমিরা এবং তার পাশ থেকে কিছুটা দূরে গোসলখানার দরজা। পরিপাটি সুন্দর কামরাটি যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য। আমালিয়া মেহমেতের হাত ছাড়িয়ে পা বাড়ালো বারান্দার দিকে। কক্ষ খোলার সাথে সাথে যে বাতাস সে অনুভব করেছিল তা এখান থেকে এসেছিল বুঝতে পারল সে। বারান্দাটি খোলা এবং প্রশস্ত। বারান্দার মেঝেতে নানান রকম নাম না জানা ফুলের গাছ। অবাক করা বিষয় সেই ফুলের গাছগুলোর উপরে রংবেরঙের ছোট ছোট প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। এত সুন্দর দৃশ্য দেখে খুশিতে আমালিয়ার চোখ চিক চিক করে উঠলো। সে হাত বাড়িয়ে ছুতে গেলেই প্রজাপতিগুলো এদিক সেদিক উড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো আমালিয়ার খিলখিলিয়ে হাসার শব্দ। টোটো আর মেহমেত বারান্দার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমালিয়ার ঠোঁটের কোন ে উঁকি দেয়া সেই এক চিলতে হাসি মুগ্ধ চোখে দেখে গেল। মেহমেত অবাক হয়ে দেখল সন্ধ্যায় যে মেয়েটি রাস্তার পাশে বসে কাঁদছিল রাত হতেই সেই মেয়েটি চাঁদের আলোর মতো হাসছে। খুব কাছে কোথাও ঝর্নার শব্দ শোনা গেল। তার মানে এই পক্ষ থেকেও ঝর্ণাটি দেখা যাবে? আমালিয়া কল্পনা করলো রোজ সকালে সে ঘুম থেকে উঠেই এই মনমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে পাবে। এমন জীবন কি সে কল্পনা করেছিল? আজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে কি সে জানতো আজই তার বিয়ে হবে তাও মেহমেতের সাথে?

- আমালিয়া।

সহসাই মেহমেত ডেকে উঠলো। আমালিয়া হাস্যজ্জল মুখে মেহমেতের দিকে ঘুরে তাকালো।

- এখানে ঠান্ডা বাতাস, ভিতরে আসুন।

- এখানে ভালো লাগছে।

আমালিয়ার কণ্ঠে বাচ্চামো সুর। তার চোখে মুখে দুঃখের ছিটে ফোঁটা আভাসও নেই। যা দেখে মেহমেত স্বস্তি নিঃশ্বাস ফেললো।

- ভিতরে আসুন আমালিয়া। আপনার সাথে কারো সাক্ষাৎ করানোর রয়েছে।

- আমার সাথে?

আমালিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো। এত রাতে কার সাথে সাক্ষাতের কথা বলছে মেহমেত?

- জ্বি।

আমালিয়া উঠে মেহমেতের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালে মেহমেত পূর্বের ন্যায় আমালিয়ার হাত শক্ত করে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আমালিয়া কোনো প্রশ্ন করল না বরং এক দৃষ্টিতে আঁকড়ে ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলো। অতঃপর পিছু ফিরে টোটোর দিকে ইশারা করে সাথে চলতে নির্দেশ দিল। টোটোও ভদ্র বাচ্চার মতো আমালিয়াকে অনুসরণ করল। আমালিয়া মেহমেতের সাথে নিচে এসে বসার ঘরে একটি লোককে দেখতে পেল। লোকটিকে আমালিয়া বিয়ের সময় মেহমেতের পাশেও দেখেছিলো। শুধু তাই নয়, তার যতটুকু মনে পরছে এই লোকটি হয়তো তাদের বিয়ের প্রধান সাক্ষী ছিল। মেহমেত কি এর সাথেই তাকে পরিচিত করাতে এনেছে? লোকটি কি বিশেষ কেউ? আমালিয়া যেতে যেতে লক্ষ্য করল উচ্চতায় লোকটি প্রায় মেহমেতের মতোই। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের লোকটির বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে আমালিয়ার মতে লোকটি হয়তো মেহমেতের বয়সী কিংবা তার থেকে বড় হতে পারে।

- আমালিয়া পরিচিত হন, আমার একমাত্র আপনজন, আমার বড় ভাইয়ের মতো বন্ধু জায়াদ্রার সাথে। তিনি বাল্যকাল হতে আমার সাথেই রয়েছে। কখনো যদি কোন বিপদে কিংবা কোন প্রয়োজনে আমাকে পাশে না পান তাহলে নিঃসংকোচে আপনি জায়াদ্রাকে ভরসা করতে পারেন। আমার কাছে বিশ্বাসের অপর নাম জায়াদ্রা। আপনিও তাকে বিশ্বাস করতে পারেন আমালিয়া।

আমালিয়া নিশ্চুপ ভাবে সবটা শুনে গেল, কিন্তু কিছু বলল না। জায়াদ্রা এগিয়ে এসে নিজে পেটের কাছে এক হাত রেখে কুর্নিশ করে বলল,

- সালাম নিবেন মহারানী।

চলবে______

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন