#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-২৬
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
-ঠিক বলেছেন। বউ আমার সত্যিই বড় পাষাণী। স্বামীকে ফেলে দশদিন দূরে রইলো। ভাবা যায়!
আমালিয়ার শরীর মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেলো। সে চেনে এই কণ্ঠের মালিককে। ভয়ে তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুললো। আজলান বলেছিলো এই জায়গার খোঁজ কেউ পাবে না, তাহলে মেহমেত কিভাবে পৌঁছালো? আমালিয়ার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে, নিশ্বাস ভারী হয়ে গিয়েছে। মেহমেতের সামনে যাওয়ার কথা থাকলেও এতদ্রুত সব কিছুর সম্মুখীন তাকে হতে হবে আশা করেনি সে।
-বউজান।
আমালিয়া চোখ বন্ধ করে নিলো। আবারো সেই মোহনীয় ডাক। যা উপেকক্ষা করার সাধ্য আমালিয়ার কোনোকালে ছিল না।
-তাকাবেন না আমার দিকে? দেখবেন না আপনার মেহমেত কে?
আমালিয়া পিছু ফিরে চাইলো। মেহমেত হাসি মুখে তাকিয়ে তার দিকে। তার মুখটি হাসিহাসি থাকলেও চোখ দুটি যে রাগে ফেটে যাচ্ছে তা বুঝতে আমালিয়ার বিশেষ কষ্ট হলো না। আমালিয়ার মাঝে অবশ্য তেমন ভাবাবেগ দেখা গেলো না। সে স্থির তাকিয়ে মেহমেতের চোখের দিকে। সত্যি বলতে সে বাইরে থেকে যতটা শক্ত দেখাচ্ছে ভিতরে ভিতরে ঠিক ততটাই ভয়ে আছে। তার নিজেকে নিয়ে ভয় নেই। ভয় শুধু তার কাছে রেখে যাওয়া আমানতকে নিয়ে। মেহমেত যদি মেলিসার কোনো ক্ষতি করে দেয়, তাহলে সে কিভাবে মেলিসাকে রক্ষা করবে? মনে মন চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলেও আমালিয়া বুঝতে দিল না। এটি তার একার যুদ্ধ, তাকে একাই লড়তে হবে। মেহমেতের সাথে শক্তিতে সে পারবে না কিন্তু কৌশলে তো চাইলেই সে হারাতে পারে। মেহমেতের মুখোমুখি হলেও আমালিয়া বাক্য বিনিময় করলো না। এমনকি নূন্যতম সৌজন্যবোধ টুকুও দেখলো না। যা মেহমেতের মনে অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে যথেষ্ট। রাগ তার ভিতরটা ঝলসে দিলেও কাউকে তা বুঝতে দিলো না। বরং আমালিয়ার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বললো,
-কেমন আছেন বউজান? আমাকে মনে আছে নাকি ভুলে গিয়েছেন?
মেহমেতের কোথায় হেয়ালি। আমালিয়ার চোখেমুখে বিরক্তের ছাপ ফুটে উঠেছে। এদের এই কান্ড মেলিসা কিছুই বুঝতে পারলো না। সে বোকার মতো হা করে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে। এমন সুদর্শন পুরুষ সে তার বাবাকে ছাড়া দ্বিতীয়টি দেখেনি।
-কি চাই আপনার এখানে?
দীর্ঘ দশদিন পর দেখা অথচ ভালো-খারাপ জানতে না চেয়ে সরাসরি কি চায় জানতে চাইলো আমালিয়া। নূন্যতম ভদ্রতাটুকুও জানে না মেয়েটা। মেহমেত এই মেয়ের কাজে অতিষ্ট প্রায়।
-এতদিন পর স্বামীর সাথে দেখা, কেমন আছি জানতে না চেয়ে কি চাই জানতে চাচ্ছেন? এটা ঠিক নয় বউজান।
স্বামী-বউ! মেলিসার মাথা ধরে গেলো যেন। আমালিয়ার বিয়ে হয়েছে? কই তাকে তো কিছু বললো না। সে বড় বড় চোখ করে একবার আমালিয়াকে দেখছে তো একবার মেহমেতকে দেখছে। মিগিকে দেখা গেলো ভীত চেহারায় আমালিয়ার পিছনে লুকাতে। তার দৃষ্টি মেহমেত ও তার পাশের টোটোর দিকে। টোটো অবশ্য আমালিয়াকে দেখে খুশি হলেও আমালিয়ার সাথে থাকা মিগিকে দেখে একদম খুশি হলো না। তার বুঝতে সমস্যা হলো না আমালিয়ার তার জ্বিনি শক্তি পেয়েছে। যার ফলস্বরূপ, তার পাশে মিগিকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে। মেহমেতের দৃষ্টি এতো সময় আমালিয়ার ওপর থাকলেও আবার তার দৃষ্টি মিগি এবং মেলিসার ওপর পরলো। ওদের দেখতেই মেহমেতের কপালে ভাঁজ উদয় হলো। এখানে কি হচ্ছে না জানলেও কিছুটা বুঝতে পারছে। মেহমেত আমালিয়ার আরো কাছে এগিয়ে গেলো। একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমালিয়ার চোখে চোখ রাখলো। লক্ষ্য করলো আমালিয়ার শারীরিক পরিবর্তনগুলো। চেনা সেই চোখ দুটো ছাড়া আমালিয়া আর পূর্বের আমালিয়া যে নেই তা সে বেশ বুঝতে পারলো। তার চোখমুখ কুঁচকে গেলো যখন দেখতে পেলো আমালিয়ার লাল চুলগুলো সোনালী রঙা। সে তার মুখের আকৃতি বিকৃত রেখেই হাত বাড়িয়ে ধরলো আমালিয়ার কাঁধ গলিয়ে নামা চুলগুলো। হাতের মুঠোয় নিয়েই তার মেজাজ খারাপ হলো। দৃষ্টিতে আগুন মিশিয়ে আমালিয়ার সুন্দর দুটি চোখকে আজ সম্পূর্ণ এড়িয়ে ভারী গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,
-কি করেছেন এসব? কি করে হলো?
-তা আপনার না জানলেও চলবে।
আমালিয়ার কণ্ঠস্বর অন্যদিনের থেকে আজ ভিন্ন। সে মেহমেতের চোখে চোখ রেখে আজ কথা বলছে। শান্ত অথচ ওই দৃঢ় দৃষ্টি মেহমেতকেও নড়বড়ে করতে যথেষ্ট। কিন্তু মেহমেত তা বুঝতে দিলো না আমালিয়াকে। তার একদম ভালো লাগলো আমালিয়ার এমন রূপ। মন চাইলো ভেঙে গুড়িয়ে দিতে মেয়েটিকে, কিন্তু সে ধৈর্য ধরলো। যে কোনো কাজ আস্তে ধীরে করতে হয় হয় বলে তার বিশ্বাস।
-আপনি জানেন আমার সাথে এভাবে কেউ কথা বললে তার মাথাটাই অক্ষত থাকতো না। শুধু আপনি বলেই এখনো নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
মেহমেতের রাগের পরিমান আমালিয়া ঠিকই অনুমান করলো। একবার মেলিসার দিকে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটিকে। জড়োসড়ো হয়ে আছে মেয়েটা। আমালিয়া চাইলো না ওর জন্য মেলিসার কোনো ক্ষতি হোক। তাই সে নিজেকে শান্ত করে বললো,
-কেন এসেছেন এখানে?
-আপনি জানেন না কেন?
আমালিয়া জানে। মেহমেত কেন এবং কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে সে জানে। তবুও কথা ঘুরানোর জন্য বললো,
-আমরা এই ব্যাপারে পরে কথা বলবো। আপনারা এখন আসতে পারেন।
কথাটি বলে আমালিয়া মেলিসার হাত ধরে পিছু হটতে নিলে মেহমেতের লোকেরা তাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ধরলো। আমালিয়ার এবার রাগ হলো খুব।
-এসব কি হচ্ছে মেহমেত। বললাম তো পরে কথা বলব। মেলিসার সামনে নয়।
মেহমেত হাসলো একটু। বুঝলো আমালিয়া তার সাথে থাকা মেয়েটিকে নিয়ে ভীত। আগ্রহ জাগলো এই মেয়ের ব্যাপারে। বুঝলো আমালিয়াকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে এই মেয়েই হবে তার একমাত্র হাতিয়ার।
-দারুন তো। আমার বউ আমার থেকে অন্য কারো প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে? কে তিনি যাকে নিয়ে আপনার এতো চিন্তা? বিশেষ কেউ বুঝি?
আমালিয়া দ্রুত মেলিসাকে নিজের আড়ালে দাঁড় করিয়ে তার ঢাল হয়ে দাঁড়ালো। ভয়ে বুকের কম্পন বেড়ে যাওয়ার সাথে কণ্ঠও কেঁপে উঠলো।
-ওনার থেকে দূরে থাকুন মেহমেত। আপনার যা কথা আমার সাথে বলুন।
মেহমেত অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথা কাত করে তাকালো আমালিয়ার দিকে। সেই মুহূর্তে আমালিয়া বুঝতে পারলো মেহমেত আটঘাট বেঁধেই এসেছে। সুতরাং তাকে এবার মেহমেতের বিপক্ষে লড়তেই হবে।
-যতক্ষণ আপনি ভালো মেয়ে হয়ে থাকবেন ততক্ষন আমিও আপনি ছাড়া অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিবো না। চলুন এবার যাওয়া যাক?
-কোথায়?
-আপনার স্বামীর যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে।
মেহমেত আমালিয়ার হাত ধরার জন্য হাত বাড়ালে আমালিয়া পিছে সরে যায়।
-অসম্ভব। যখন আমার মনে হবে যেতে হবে ঠিক তখনই আমি যাবো।
আমালিয়া না বলা যেন মেহমেতের অহংকারে ফেলা এক দাগ। প্রতিটি মুহূর্তে তার রাগ বেড়েই চলেছে।
-জেদ করবেন না আমালিয়া। চলুন আমার সাথে।
-নাহ।
আমালিয়া তার জেদে স্থির। মেহমেত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।
-এরপর যা হবে তার জন্য আপনি দায়ী।
অতঃপর মেহমেত তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলো মেলিসাকে ধরে নিয়ে যেতে। আমালিয়া জানতো এমনটাই হবে। ভয় করলেও এদের সাথে লড়াই করতে সে প্রস্তুত।
-মিগি, মেলিসাকে নিয়ে বাড়িতে যাও। আমি না বলা পর্যন্ত কেউ বাইরে বের হবে না।
মিগিকে বলতে যতক্ষণ লাগলো, সে তৎক্ষণাৎ মেলিসাকে নিয়ে ছুটলো উল্টো পথে। আমালিয়া ঠিক তাদের ঢাল হয়ে দাঁড়ালো মেহমেতের মুখোমুখি। হাওয়ার গতি উগ্র। আমালিয়ার চুল সেই হাওয়ার তালে জ্বলে উঠলো নিজের রূপ দেখিয়ে। ওর সুন্দর চোখ দুটি আজ অন্যরকম লাগলো মেহমেতের কাছে। এ যেন এক নতুন আমালিয়া, যার রূপের তারিফ করে শেষ করা যাবে না। অতুলনীয় এই সৌন্দর্যের কারণ তবে আমালিয়ার জ্বিনি শক্তি? প্রতি পলকে আমালিয়ার মাঝে পরিবর্তন অনুভব করতে পারলো মেহমেত। আমালিয়ার দৃষ্টি, ওর চুল ওর মুখের তেজ সব যেন জানান দিচ্ছে তাকে আরো বেশি মেহনত করতে হবে এবার। এই আমালিয়াকে হারানো সহজ হবে না। তবে অসম্ভব কিছুও নয় যে। তার সৈন্যদের সম্মুখে আমালিয়া বেশিক্ষন টিকতে পারবে বলেই ধারণা তার। তবু সে জানতে চায় তার বউ তাকে হারানোর জন্য ঠিক কতটা তৈরী। ঠোঁটের আগায় হাসি নিয়ে মেহমেত আয়েশ করে সরে দাঁড়ালো। তার এক ইশারায় শত শত জ্বিন আমালিয়ার দিকে ছুটে গেলো। প্রথমে ভয় পেলেও হঠাৎ আমালিয়ার কি হলো সে নিজেও বুঝলো না। মনের মাঝে এক অসম্ভব শক্তি অনুভব করলো। তার সাথে তাল মিলিয়ে ওর চুলগুলোও অস্বাভাবিক হারে বাড়তে রইলো। জ্বলতে থাকা লম্বা চুলগুলো বড্ডো মোহনীয় দেখতে লাগলো। সকলে ভড়কে লক্ষচ্যুত হলো। মেহমেতও অনেকটা হকচকিয়ে উঠলো আমালিয়ার এমন রূপে। সে যতটা সাধারণ আমালিয়াকে ভেবেছিলো ততটা সাধারণ আমালিয়া নয়। মেহমেত দেখলো তার সামনে আমালিয়া হঠাৎ হাওয়ায় ভাসতে লাগলো। ওর চুলগুলো অবাধ্যের ন্যায় চারিদিকে উড়ে বেড়াল। সকলে যখন আমালিয়াকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময়ে কোথা থেকে এক প্যান্থার এক লাফে আমালিয়ার সামনে এসে হাজির হয়ে আমালিয়াকে আগলে দাঁড়ালো। মেহমেত এবার শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়িয়ে পড়লো। বুঝতে কষ্ট হলো না সবটা পূর্ব পরিকল্পিত। বিশাল দেহি কালো কুঁচকুঁচে প্যান্থারটি সকলের উদ্দেশ্যে গর্জে উঠলো। এরপর মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লো সকলের ওপর। আমালিয়া মেহমেতের দিকে তাকিয়ে অমায়িক হাসি দিলো। অন্য সময় হলে হয়তো সেই হাসিতে মেহমেত কয়েকবার হোঁচট খেত কিন্তু এখন তার মনে হলো আমালিয়া তাকে পরিহাস করছে। আমালিয়া মাটিতে পা দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্যান্থারটিকে দেখতে রইলো। এটি আজলানের অনুসারী। যেমন আমালিয়ার জন্য মিগিকে দেয়া হয়েছে ঠিক তেমনই আজলানকে প্যান্থার নামের এই চিতাকে দেয়া হয়েছে। আজলান পারেনি একা আমালিয়া ও মেলিসাকে রেখে যেতে। সে খুব ভালো করে জানতো মেহমেত আমালিয়াকে ঠিক খুঁজে বের করবে। তাইতো যাওয়ার পূর্বে প্যান্থারকে ওদের সুরক্ষার জন্য রেখে গিয়েছে। প্রথম দফায় প্যান্থারকে দেখে আমালিয়া ভীষণ ভয় পেয়ে ছিল। এমন এক প্রাণী কারো অনুসারী হতে পারে বলে তার জানা ছিল না। মেহমেত অমন ভয়ংকর মানুষ হওয়ার পরও তাকে টোটোর মতো এক সাহন্ত বাচ্চা দেয়া হয়েছে, তাহলে আজলানের জন্য এমন ভয়ানক জীব কেন আমালিয়া বুঝতে পারেনি। অবুজ রমণী যখন আজলানকে প্রশ্ন করলো তখন আজলান তাকে বলে ছিল,
-যা দেখতে মাসুম হয় তা পরবর্তীতে ভয়ানক রূপ নেয়। কখনো কারো ওপরটা দেখে বিচার করবে না আমালিয়া।
আজলান কেন সেই কথা বলে ছিল তা আমালিয়া তখন তা বুঝলেও এখন চোখের সামনে দেখে বুঝতে পারলো। তার চোখে আতঙ্ক। সুন্দর চোখ দুটি থেকে গড়িয়ে পড়লো অশ্রু। প্যান্থার তার থেকে কয়েক হাত দূরে মাটিতে শুয়ে গোঙাচ্ছে। অবিশ্বাস্য চোখে মুখে হাত দিয়ে আমালিয়া দু পা পিছিয়ে গেলো। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো অস্পষ্ট স্বরে ব্যাথাতুর শব্দ,
-টোটো!
টোটো থেমে গেলো। তার শারীরিক আকৃতি বৃহৎ, চোখে হিংস্রতা। যার পুরোটাই প্যান্থারের ওপর দিয়ে গিয়েছে। আমালিয়ার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না টোটো অভাবে প্যান্থারকে ঘায়েল করেছে। তার পানে টোটোর সেই মাসুম রূপ শুধুমাত্র একটি ভ্রম কেবল? মেহমেতের মতো সেও অন্ধকারে রেখে ছিল তাকে? এ জন্যই কি আজলান বলেছিলো তাকে লড়াইয়ের জন্য তৈরী হতে? কিন্তু সে কিভাবে লড়বে আপনজনের বিপক্ষে? আমালিয়া যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই বসে পড়লো মাটিতে। আশেপাশে বেশি কিছু জ্বিন আহত অবস্থায় পরে রয়েছে। টোটো কি করবে বুঝতে না পেরে মিইয়ে গেলো একদম। মেহমেত এগিয়ে বসলো আমালিয়ার সামনে। আমালিয়ার চুলগুলো ছড়িয়ে মুখের ওপর পরে ছিল অবলীলায়। ডানহাতের সাহায্যে খুব যত্ন করে চুলগুলো সরিয়ে দুহাতের আজলায় আমালিয়ার মায়াবী মুখখানি নিয়ে নিজের মুখের একদম কাছে এনে বললো,
-যত যাই করুন না কেন, আমার হাত থেকে আপনার রেহাই নেই বউজান। যত পালানোর চেষ্টা করবেন আমি ততবেশি হিংস্র হয়ে উঠবো।
আমালিয়া টলোমলো চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকালো মেহমেতের দিকে। দুফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বললো,
-কেন করছেন এমন আমার সাথে?
মেহমেত তাই সেই মন ভুলানো হাসি দিয়ে বললো,
-আপনি জানেন কেন করছি।
আমালিয়া এবার না পেরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
-এর থেকে আমাকে মেরে ফেলুন। আমার আর এসব ভালো লাগছে না। কতগুলো প্রাণের আহুতি যাবে আর আমার জন্য?
মেহমেত শান্ত দৃষ্টিতে আমালিয়ার সেই আহাজারি দেখলো। সময় নিয়ে খুব নিখুঁত ভাবে পরোক্ষ করলো। অতঃপর ধীরে খুব নরম ভাবে সকলকে চমকে দিয়ে আমালিয়ার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,
-আপনাকে আমি মারবো না আমালিয়া। আপনাকে বাঁচতে হবে, অনেক বছর বাঁচতে হবে। দশটা দিন আমাকে কষ্ট দেয়ার শাস্তি আপনাকে পেতে হবে।
টোটো হা করে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাকে আমালিয়ার চোখে নিচে নামিয়ে দিয়ে এখন নিজে মহান সাঁজছে? আমালিয়ার অবশ্য কোনো দিকে ধ্যান নেই। সে হয়তো বলতেও পারবে না তার সাথে কি হয়ে গেলো। মেহমেত আমালিয়াকে ছেড়ে আবারো যত্ন করে ওর চোখ মুছে দিয়ে বললো,
-ওর কিছু হবে না। কিছু সময়ের মাঝে সুস্থ হয়ে যাবে। আমি এখনো আমার ভয়ানক রূপের কিছুই দেখায়নি। সেই নারী সাধারণ ইনসান তাই না? আমি তার কোনো ক্ষতি করতে চাই না বউজান, আপনি শুধু আমার সাথে চলুন।
মেহমেতের কণ্ঠে আকুতি ছিল যা আমালিয়া বুঝতে পারলো না। একরাশ ঘৃনা নিয়ে সে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেও মেলিসার জন্য কিছু করতে পারলো না। প্যান্থারের মতো কাউকে যত টোটো এভাবে কাবু করতে পারে, তার মানে তাকে হারাতে মেহমেতের তেমন কসরত করার প্রয়োজনই পরবে না। সুতরাং সে না চাইলেও তাকে মেহমেতের সাথে যেতেই হবে। আপোষে না মানলে মেহমেত যদি মেলিসার কোনো ক্ষতি করে দেয়? না না, মেলিসার কিছু হলে সে আজলানকে কী উত্তর দিবে? এতদিনে জমে থাকা মেহমেতের প্রতি ভালোবাসার ভীত যেন এক লহমায় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। ভালোবাসার বদলে মনের মাঝে তৈরী হলো ঘৃণা।
—------------
জ্বিনরাজ্য,
আমালিয়া দাঁড়িয়ে আছে মেহমেতের শয়ন কক্ষের বিশাল খালি অংশে। এখন থেকে জ্বিনরাজ্যের অনেকটাই দেখতে পাওয়া যায়। দূরদূরান্ত পর্যন্ত আমালিয়ার চোখে যা পরে সবটাই সবুজে ঘেরা অরণ্য। সুরভিত ফুল ও পাখির কলরবে চারপাশ মুখরিত। সে এখন মারিদ রাজ্যে রয়েছে। এখানে সে এসেছে আজ পুরো একদিন হয়েছে। সেদিন সেখানে মিগির ভরসায় আমালিয়া মেলিসা ও প্যান্থারকে রেখে এসেছিলো। মেহমেত যদিও বলেছিলো কয়েকজন জ্বিনকে পাহারায় রেখে যাবে কিন্তু আমালিয়া তার ওপর ভরসা করেনি। ব্যাপারতা শিয়ালের কাছে মুরগি পাহারা দেয়ার মতো হয়ে যেত। মেহমেতও অবশ্য বিশেষ জোর করেনি আমালিয়াকে। তার আমালিয়া দরকার ছিল পেয়ে গিয়েছে, এরপর কার কি হলো না হলো সেটা তার দেখার বিষয় না। তবুও বউকে খুশি করতে যতটুকু দরকার ছিল করেছে। আমালিয়া দূর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে কামরার দিকে তাকালো। এখানে এই কামরায় মেহমেত নিজে আমালিয়াকে নিয়ে এসেছে। এই জায়গাটি ঠিক কোথায় আমালিয়ার জানা নেই। তবে এটি যে পৃথিবী নয় তা সে খুব ভালো ভাবে বুঝেছে। রাজ্যে প্রবেশ পর থেকেই দেখেছে এখানে উপস্থিত প্রত্যেকে কেমন জড়োসড়ো হয়ে ছিল ভয়ে। তারা কেন এত ভয় পাচ্ছিনা আমালিয়ার জানা নেই। তবে পৃথিবীর থেকে এখানে জীবন ব্যবস্থা অনেকটাই ভিন্ন। আমালিয়াকে এখানে কিছু রাজকীয় পোশাক দেয়া হলেও সে সেসব পরিধান করলো না। এমন কি এখানে আসার পর থেকে কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি। মেহমেতও তাকে কোনো কিছু নিয়ে জোর করেনি। টোটো অবশ্য দুবার আমালিয়ার কাছে এসেছিলো কিন্তু প্রতিবারই আমালিয়ার তাকে দেখে ভয় পেয়েছে। এমনকি এই প্রথমবার আমালিয়া টোটোর দিকে ঘৃণা ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল। এরপর থেকে আমালিয়া টোটোকে আর দেখতে পায়নি। সে একা এখানে এভাবেই দাড়িঁয়ে সেই থেকে। আমালিয়ার জন্য মেহমেত কিছু বিশ্বস্ত দাসীর ব্যবস্থা করে দিলেও আমালিয়া তাদের কোনো কাজেই ব্যবহার করলো না। এমনকি তার জন্য আনা খানা পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখেনি। সে এতটাই অতিষ্ট যে মনে মনে ভেবে নিলো মেহমেতকে সে সিরেন্থা এনে দিতে রাজি হবে। এতে অন্তত তার কাছের মানুষগুলো সুরক্ষিত তো থাকবে। সে শান্তির সাথে নিশ্বাস ত্যাগ তো করতে পারবে। বোকা মেয়ে বুঝলো কই তাকে বাচাঁনোর যুদ্ধ যে আজকের না। তাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে তার দুজন মা- বাবা নিজেদের জীবন ত্যাগ করেছে। এত সহজে হাল ছেড়ে সে যাবে কোথায়?
আমালিয়ার না খেয়ে থাকার বার্তা যখন মেহমেতের নিকট পৌছালো তখন সে রীতিমতো রেগে অস্থির। রাজ্যে ফেরার পর থেকে সে ব্যস্ত, ভীষন ব্যস্ত। এত বছর ধরে রাজ্য থেকে দূরে থাকায় সকলে তার বিপক্ষে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে চাচ্ছে। এত কিছুর মাঝে আবার আমালিয়ার এভাবে করা যেন আগুনে কেরোসিন ঢালার কাজ করেছে। মেজাজ তার অত্যাধিক খারাপ। রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। সকলে তার বিপক্ষে চলে গিয়েছে। এর পিছনে কে তা জানতে মেহমেতের দেরি নেই। আগে হলে প্রত্যেককে দেখে নিতো কিন্তু এখন হিসাব ভিন্ন। ঠান্ডা মাথায় বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে। কিন্তু সবার পূর্বে ওই অবাদ্ধ নারীকে নিয়ন্ত্রণে আন্তে হবে। ভাবা যায় তার একমাত্র বৌ নাকি তারই কলিজায় পাড়া দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রমণীকে আয়ত্তে না আনা পর্যন্ত শান্তি নেই তার। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মেহমেত ক্ষিপ্র হাতে কক্ষের বিশাল বড় রাজকীয় দরজাটি ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেললো। প্রকান্ড শব্দে কক্ষে থাকা দাসীরা চমকে উঠলো। অতঃপর মেহমেতকে দেখে ভীত মুখে সন্মান প্রদর্শন করলে মেহমেত সকলকে বেরিয়ে যেতে নির্দেশ দিতেই তারা সুরসুর করে বেরিয়ে গেলো। মেহমেতের দৃষ্টি তখনও কক্ষে থাকা কারুখচিত শত টেবিলে সাজিয়ে রাখা খাবারের ওপর। কেন যেন মেহমেতের ভীষণ রাগ হচ্ছে আজ। কান গরম হয়ে গিয়েছে। অথচ এই রাগের কারণ যে তার হুশই নেই যে সে কি করেছে। সে এক মনে এখনো বাহিরের দিয়ে তাকিয়ে। মেহমেত দৃষ্টি আমালিয়ার ওপর দিয়ে দেখলো কালো ফিনফিনে একটি সাদামাটা গাউন পরে আছে সে। এটি সম্ভবত কালো পরে ছিল। তার মানে সে এখনো আগের সেই পোশাকেই রয়েছে? কেন তার দেয়া পোশাক পড়লে কি এমন ক্ষতি হবে শুনি? এত দেমাগ কেন এই মেয়ের? যদিও ফর্সা শরীরে পোশাকটি দারুন লাগছে তবুও মেহমেতের সহ্য হলো না। মন চাইলো আমালিয়ার পোশাকটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে নিজ হাতে আমালিয়াকে তার আনা পোশাক পরিয়ে দিতে। কিন্তু সে তা পারবে না। এতে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। আমালিয়া আরো রেগে যাবে। ফোঁস করে নিশ্বাস নিলো মেহমেত। খুব ফাঁসা ফেঁসে গিয়েছে সে।
-বউজান।
-এখানে আপনি আমি ছাড়া কেউ নেই বাদশাহে মেহমেত। সুতরাং আপনাকে ছলের আশ্রয় নিতে হবে না। কারণ আমিও জানি আর আপনিও জানেন আপনি আমার থেকে কি চান।
আমালিয়া না তাকিয়েই সত্য অথচ বড্ড কঠিন কিছু কথা ছুঁড়ে দিলো মেহমেতের উদ্দেশ্যে। সত্য হলেও মেহমেত আজ মানতে পারলো না কথাগুলো। বড্ড তেঁতো লাগলো।
-খাবার খাচ্ছেন না কেন?
মেহমেত ওই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলো, কিন্তু আমালিয়া যেন আজ পণ করেছে এর শেষ দেখে ছাড়বে। সে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললো,
-আমি আপনার কথায় রাজি। সিরেন্থা আমি আপনাকে এনে দিবো।
সাবলীল স্বীকারোক্তি। মেহমেত চমকে উঠলো। গাঢ় নয়নে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো আমালিয়ার মনোভাব কিন্তু সে আজ ব্যর্থ হলো। আমালিয়া একদম বিচলিত নয়। তার চোখে আজ পানি নেই। মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। মেহমেতের বিশ্বাস হচ্ছে না আমালিয়া এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে।
-এই ব্যাপারটা না হয় পরে দেখা যাবে। আপাদত আপনি খাওয়া- দাওয়া করে পরিষ্কার হয়ে নিন। আর হ্যা অবোধই আমার দেয়া পোশাকই পড়বেন।
আমালিয়া মানতে পারলো না। এতো রীতিমত জুলুম তার ওপর। আমালিয়া কামরায় থাকা সুসজ্জিত পোশাকটির দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। ভারী লাল পোশাকটির জায়গায় জায়গায় হীরা, জহরতে ভরপুর। সে ওটা পরিধান করলে ওর মাঝেই চাপে পরে থাকবে। ভাবতেই তো তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
-অসম্ভব। দেখুন আমি আপনার সব কথা মেনে নিয়েছি। বলেছি তো আপনার সিরেন্থা এনে দিবো। তাহলে এভাবে শাস্তি দেয়ার মানে কি?
আমালিয়া এগিয়ে এলো মেহমেতের নিকট। তার কথা কাজে বিচলিত ভাব। শাস্তির কথা শুনে মেহমেত ভড়কে গেলো। অবাক হয়ে জানতে চাইলো,
-শাস্তি? কিসের শাস্তি?
আমালিয়া আঙ্গুল তাক করে পোশাকটি দেখিয়ে দিয়ে বললো,
-ওটা পড়ার থেকে বড় শাস্তি আর কিছুই হতে পারে না। আমাকে দেখুন আর পোশাকটি দেখুন। আমার থেকেও দ্বিগুন ভারী হবে ওটি।
আমালিয়ার চোখমুখে ভয়। সে কিছুতাই ওই পোশাক পড়তে রাজি না। একে তো ভারী তারপর তাকে পড়লে নিশ্চিত বোকা বোকা লাগবে। মেহমেত ওর কথার ধরণে শব্দ করে হেসে উঠলো। এত সুন্দর হাসি আমালিয়া এরপূর্বে কভু দেখেছে কি না তার জানা নেই। এমন হাসি যে কাউকে পাগল করতে বাধ্য। মেহমেত আজ নিজেকে লুকালো না। মন খুলে আমালিয়ার সামনে হাসলো আর আমালিয়া হা করে তাকিয়ে তা দেখলো। ভালোবাসা বুঝি এমনি হয়। ঘৃণা তো শুধু মুখের একটি বুলি মাত্র। কাউকে একবার ভালোবাসলে তাকে কি আর ঘৃণা করা যায়? যায় না। শত রাগ, অভিমান থাকলেও ঘৃণা করা সম্ভব না। আমালিয়াও পারবে না। আমালিয়া নিশ্চুপ হয়ে গেলো একদম। মেহমেত হাসি থামিয়ে বললো,
-আপনি ঠিক ভাবে না খেলে আপনার জন্য এর থেকেও ভয়ানক পোশাক নিয়ে আসবো।
এহেন কোথায় আমালিয়া আঁতকে উঠলো। না চাইতেও মুখ হতে ছিঁটকে এলো,
-নাহ।
আবারো মেহমেতের হাসির গুঞ্জন শোনা গেলো মহল জুড়ে।
চলবে____