ফন্ট সাইজ:
থিম:
আফসানায়ে জ্বিনান

২৭তম পর্ব

লেখক: মীরা রায়াদ

#আফসানায়ে_জ্বিনান

#মীরা_রায়াদ

পর্ব-২৭

[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]

হাজার হাজার জ্বিনদের সামনে বিশাল আলিশান রাজ দরবারের সুসজ্জিত আসনে বসে আছে আমালিয়া। তার ঠিক ডান পাশে মেহমেত দাম্ভিকতার সাথে বসে। মুখে তার ভারী গম্ভীর্যতার উপস্থিতি। আমালিয়ার মুখের অবস্থা যদিও বিপরীত। তার চোখমুখ কুঁচকে রয়েছে। যার দুটি কারণ রয়েছে। এক সামনে উপস্থিত জ্বিনেরা। যারা বড়বড় চোখ করে আমালিয়াকে দেখছে। যেন জীবনে কখনো মেয়ে দেখেনি। আর দ্বিতীয় ও প্রধান কারণ তার শরীরে জড়ানো এই অদ্ভুত পোশাকটি। আমালিয়ার মেজাজ খুব খারাপ। ভাবতেই অবাক লাগছে তাকে সত্যিই এই পোশাক পরতে হয়েছে। রাগে, দুঃখে কান্না পাচ্ছে ওর। সে কিছুতেই এই পোশাক পড়তে চায়নি, কিন্তু মেহমেত তাকে এক প্রকার ভয় দেখিয়ে বাধ্য করেছে। তখন মেহমেত তাকে একটি নরম হালকা পোশাক এনে দিয়ে ছিল। তাই আমালিয়া কথা না বাড়িয়ে গোসল সেরে সেই পোশাক পরে খেয়ে নিয়ে ছিল। সকল কিছু মেনে নিতে কষ্ট হলেও আমালিয়া চুপচাপই রয়ে ছিল। নিজের ভাগ্য মেনে নিয়ে ছিল কিন্তু তার ধৈর্য বেশি সময় তার সাথ দেয়নি। কিছু সময় পর যখন মেহমেত তাকে জানলো ওই পোশাক পরে রাজ দরবারে উপস্থিত হতে হবে, তখনই সে বেঁকে বসলো। কিছুতেই এই পোশাক সে পরতে পারবে না। সে নিয়ে এক বড় ঝড় উঠে গিয়ে ছিল কক্ষের মাঝে। দুজনেই জেদ ধরে বসে রইলো। একজন পরিয়ে ছাড়বে, অন্যজন কিছুতেই পরবে না। টোটো টুকুর টুকুর চোখে সবটাই অবলোকন করলো। কিন্তু কিছু বলার সাহস পেলো না। সেই যুদ্ধে বরাবরের মতো মেহমেতের জয় হয়। আমালিয়া যখন কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না তখন মেহমেত তাকে মেলিসার কথা বলে ভয় দেখায়। ব্যাস, তাতেই কাজ হয়ে যায়। সুরসুর করে আমালিয়া রাজি হয়ে গিয়ে ছিল তখন। পোশাক পরার পর থেকে আমালিয়ার মুখটি ভোঁতা হয়ে আছে। অথচ মেহমেতের মুখে লেগে ছিল বিশ্ব জয়ের হাসি। তার চোখমুখ দীপ্তমান। এ যেন সামান্য এক জয় নয়! এ এক নতুন সূচনা। গুরুগম্ভীর পরিবেশেও মেহমেতের মনের মাঝে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আমালিয়া বোঝে মেহমেতের চেহারার এই উজ্জ্বলতা শুধুমাত্র তাকে হারানোর খুশিতে। যার কারণে তার আরো বেশি অসহ্য লাগছে এই লোককে। কল্পণাতেও ভাবেনি মেহমেত এতটা বিরক্তিকর হবে কখনো।

-হুজুর।

জায়াদ্রার কথায় মেহমেতের ধ্যান ভাঙলো। মেহমেত দৃষ্টি সামনে দিয়ে দেখলো, উচ্চপদস্থ জ্বিনেরা সম্মুখে বসে রয়েছে। আর সাধারণ জ্বিনেরা কিছুটা দূরত্বে। সকলের মাঝে মেহমেত আরদার ও তার বাবাকেও দেখলো। এছাড়া অন্যান্য গোত্রের রাজা ও সম্মানিত বাক্তিরাও উপস্থিত রয়েছে এখানে। সকলে যে আঁটঘাট বেঁধে এসেছে বুঝতে কষ্ট হলো না। কিন্তু সকল কিছুর মাঝে মেহমেতের চক্ষুশূল হলো আরদারের দৃষ্টি। যা কিনা আমালিয়ার দিকে কাতর ভাবে তাকিয়ে রয়েছে। মুহূর্তে মেহমেতের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। সে আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার এসবে ধ্যান নেই। সে কতক্ষন তার পরনের পোশাক সামলাতে ব্যস্ত তো কতক্ষন মাথার দোপাট্টা সামলাতে ব্যস্ত। মনে মনে যে মেহমেতের বংশ উদ্ধার করে ফেলছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তাও মেহমেতের শান্তি যে আমালিয়ার ধ্যান অন্যদিকে নেই। মেহমেত আবারো আরদারের দিকে তাকালো। এবার আরদারও মেহমেতের দিকে তাকালো। দুজনের দৃষ্টি মিলিত হলে মেহমেত চোখের সাহায্যে আরদারকে শাসাতে ভুললো না। অতঃপর সকলের উদ্দেশ্যে ভারী কণ্ঠে বললো,

-দীর্ঘ ৫৭ টি বছর আমি রাজ্য ছেড়েছি, কিন্তু রাজ্যের কোনো বিষয় আমার দৃষ্টির আড়ালে ছিল না। কোথায় কি হয়েছে? কেন হয়েছে? এবং কে করেছে? সবটাই আমার কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। আজকে এই সভায় উপস্থিত সকলের কি উদ্দেশ্য সেটিও আমি জানি। কিন্তু লাভ নেই। আমার যা চাই আমি তা কেড়ে নিই। কারো যদি আমার বিপক্ষে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে থাকে তাহলে সে সরাসরি আমার সামনে এসে লড়াই করতে পারে।

এতটুকু বলে থেমে আবারো বললো,

-আমার অনুপস্থিতে খালিদ চাচা রাজ্যের জন্য যথেষ্ট করেছেন তবে তার আর কষ্ট করার দরকার নেই। আমার দায়িত্ব সামলানোর জন্য এবার আমি এসে গিয়েছি। চাচাজান আপনি বরং কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে নিজের রাজ্যে ফিরে যাবেন কেমন? অথিতি আপ্পায়নে বাদশাহে মেহমেত বিন্দুমাত্র কার্পণ্যতা করে না।

মেহমেত শেষ কথাটি তার ডান দিকে বসে থাকা খালিদকে উদ্দেশ্য করে বললো। খালিদ স্থির তাকিয়ে মেহমেতের দিকে। চোখে চোখে তাদের কি কথা হলো তা কেউ বুঝলো না। তবে মেহমেতের ঠোঁটের হাসি এবং খালিদের লাল চোখ বলে দিলো যুদ্ধের সূচনা হয়ে গিয়েছে। আমালিয়া খালিদের নাম শুনেই সতর্ক হয়ে গেলো। অতঃপর মেহমেতের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখেও নিলো এতো ঝামেলার নাটের গুরুকে। খালিদ মনের রাগ, হিংসা বুঝতে না দিয়ে উঠে এলো মেহমেতের কাছে। জায়াদ্রা সতর্ক হয়ে গেলো মুহূর্তেই। মেহমেতের মাঝে অবশ্য বিচলিত ভাব দেখা গেলো না। যেন সে সকল পরিস্থিতির জন্য পূর্ব হতেই প্রস্তুত। সকলে ভেবেই নিলো এবার হয়তো কোনো কিছু হবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। সকলকে অবাক করে দিয়ে খালিদ মেহমেতকে জড়িয়ে ধরে বললো,

-দীর্ঘদিন পর আপনাকে দেখতে পেয়ে আমার দুচোখ তৃপ্তি পেলো বাদশাহ, আমার স্নেহের মেহমেত।

মেহমেতও খালিদকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে খুব ধীরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে বললো,

-স্নেহের কি না তা না হয় পরে বোঝা যাবে চাচাজান। ধীরে ধীরে সকল কিছুই বোঝা যাবে। ততদিন আপনার স্নেহের থাকতে পারবো কি না সে কথা আমি দিতে পারছি না।

খালিদ মেহমেতকে ছেড়ে মুখোমুখি দাঁড়ালো। মুখে নেই তার হাসি, কেমন এক নীরবতা গ্রাস করেছে তাকে। মেহমেতের ঠোঁটের হাসি অবশ্য বিলীন হলো না। আমালিয়া এদের এই ভাব ঠিক নিতে পারলো না। তার দুরঙা চোখ দুটি মার্বেল আকৃতি ধারণ করেছে। এখনই খুলে পরবে এমন অবস্থা। তার জানা মতে, মেহমেত আর খালিদের মাঝে কখনোই বেশি ভাব ছিল না। তাহলে সে যা দেখছে সেগুলো কি? আমালিয়ার সেই অবাক চোখ দুটির দিকে হঠাৎ করে খালিদের নজর পরলো। তাকে দেখেই যেন খালিদের অন্ধকারাচ্ছন্ন মুখের দ্যুতি খেলে গেলো। উত্তেজনায় মুখ হতে বেরিয়ে এলো,

-মারিয়াম কন্যা!

আমালিয়া সেই কথায় অধিক অবাক হলো। কিছু জানতে চাওয়ার পূর্বে মেহমেত তার এবং খালিদের মাঝে দাঁড়িয়ে আমালিয়াকে নিজের আড়ালে নিয়ে গেলো। মেহমেত খালিদের চোখে চোখ রেখে বললো,

-সে আমার স্ত্রী। আপনাদের সকলের মহারানী। দৃষ্টি সংযত করুন চাচাজান। নয়তো ওই চোখ দিয়ে এই সুন্দর দুনিয়া দেখার তৌফিক আর থাকবে না।

খালিদ কি বুঝলো সে নিজেই জানে। তবে মেহমেতের এই কথার পর তার দৃষ্টি মাটির দিকে নেমে গেলো। যদিও মেহমেত স্পষ্ট দেখলো রাগে খালিদের মুষ্টিবদ্ধ দুহাতখানি শক্ত হয়ে যেতে। মেহমেত দেরি করলো না, আমালিয়ার ডান হাত নিজের বাম হাতের মুঠোয় খুব অধিকার নিয়ে ধরে তাকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে গর্বের সাথে বললো,

-আমার স্ত্রী, ইনসান আয়মান ও সিলা গোত্রের পূর্ব রানী মারিয়ানের কন্যা আমালিয়া। আপনাদের মহারানীকে সন্মান প্রদর্শন করুন।

তার গর্জিত কণ্ঠ দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পরলো। আমালিয়া অবাক হয়ে মেহমেতের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহমেতের কঠিন মুখ আজ স্পষ্ট, দৃঢ়। আমালিয়াকে অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে দিয়ে তার সামনে দাঁড়ানো হাজার হাজার জ্বিন এমন কি স্বয়ং মেহমেত নিজেও তার মুখমুখী দাঁড়িয়ে চোখ নিচে রেখে বুকে হাত দিয়ে তাকে সন্মান জানালো। কি হচ্ছে বুঝতে পারলো না বেচারি। এতদিনের ধকলের পর মেহমেতের এরূপ সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়ে পরলো মেহমেতের বুকে।

—-----------

-কি ব্যাপার টোটো? তুমি এখানে?

টোটো চুপিসারে আমালিয়ার কাছে গিয়ে মাত্রই বসেছিল। ইদানিং মেহমেতের যে কি হয়েছে বুঝতে পারছে না। আমালিয়ার কাছেই যেতে দেয় না। এসব কি আবারো কোনো ফাঁদ নাকি মেহমেত সত্যিই মন থেকে করছে বোঝা বড় দায়। তার আমালিয়ার জন্য বড্ডো চিন্তা হয় না। মেহমেত কি চায়, সে কি করবে কাউকে জানতে দিচ্ছে না। এ কোন মেহমেত টোটো নিজেও জানে না। টোটো আমতা আমতা করে সরে গেলো আমালিয়ার পাশ হতে। তখন আমালিয়া জ্ঞান হারানোর কারণে সভা সেখানেই সমাপ্ত হয়। মেহমেত দেরি না করে তখনি আমালিয়াকে তার কামরায় নিয়ে আসে এবং রাজ্যের সব থেকে ভালো কবিরাজকে দিয়ে পরীক্ষা করায়। তিনি আমালিয়াকে দেখে বলে ছিল,

-মহারানী সদ্য তার শক্তি পাওয়ায় শরীর ভীষণ দুর্বল। তাকে কিছুটা সময় দিলে ঠিক হয়ে যাবে।

এরপর থেকে মেহমেত আমালিয়ার কাছেই বসে ছিল। এক ধ্যানে কি এমন দেখছিলো জানা নেই তবে আমালিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল নির্নিমেষ। দীর্ঘ সময় পর কিছু মুহূর্তের জন্য মেহমেত বাইরে গিয়েছিল। আমালিয়ার সুরক্ষার জন্য আরো কিছু পাহারাদারের ব্যবস্থা করেছে। সেখান থেকে এসেই মেহমেত টোটোকে আমালিয়ার পাশে দেখতে পেয়ে উক্ত কথাটি বললো। টোটো মুখ লুকিয়ে নিজস্ব আকার ভঙ্গিতে বললো,

-লিয়াকে দেখতে এসেছিলাম।

মেহমেত এগিয়ে আমালিয়ার কাছেই এসে ছিল। কিন্তু টোটোর মুখে লিয়া নামটি শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে পরলো। অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

-সে তোমার মহারানী। এরপর তার নাম যেন তোমার মুখে না শুনি টোটো। আর তাকে নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে চলবে ওনার থেকে।

মেহমেত গিয়ে আমালিয়ার মাথার কাছে বসলো। আমালিয়া গভীর নিদ্রায়। কবিরাজ বলেছে সে আপাদত লম্বা একটি ঘুম দিবে। এই ঘুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে উঠবে না। মেহমেত খুব যন্ত করে আমালিয়ার স্বর্ণ কেশগুলো হাতের মাঝে নিলো। হঠাৎ করে তার আমালিয়ার কাছাকাছি থাকতে বেশ লাগছে। মন উৎফুল্ল লাগছে।

-আপনি এমন কেন করছেন বাদশাহে মেহমেত? আবার কি তার মন ভাঙার ইচ্ছা আছে?

মেহমেত টোটোর প্রশ্নটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে বললো,

-সে সিরেন্থা এনে দিতে রাজি টোটো।

টোটো চমকে উঠলো, থমকে গেলো একদম। আমালিয়া রাজি? কিভাবে সম্ভব? তার মানে এটাই কি আমালিয়ার জীবনের সমাপ্তি? সে ব্যস্ত হয়ে মেহমেতের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,

-রাজি মানে? কিভাবে সম্ভব?

মেহমেতের দৃষ্টি তখনও আমালিয়াতে নিবদ্ধ। মেয়েটা এতো বেশি সুন্দর কেন? দেখলে দেখতেই ইচ্ছা করে শুধু।

-নারীর মন বোঝার মতো আধ্যাতিক ক্ষমতা আমার এখনো হয়ে ওঠেনি টোটো। তবে আমি চেষ্টা করছি।

-মানে?

-বুঝলে টোটো আমি হয়তো নিজের ফাঁদে নিজেই ফেঁসে গিয়েছি।

মেহমেত গভীর ভাবে আমালিয়াকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে কথাগুলো বললো। টোটো তার কথার আগামাথা কিছুই পেলো না। মেহমেত তাকে বোঝার সময়ও দিলো না।

-টোটো চাচাজানকে নজরে রাখবে। প্রতিটি মুহূর্তে সে কি করে, কোথায় যায়, সব কিছু আমাকে জানাবে।

-খালিদ?

-হুম। আর আমালিয়ার সেই অনুসারীকে এখানে আনার ব্যবস্থা করো দ্রুত। আমালিয়ার সুরক্ষার প্রয়োজন।

-কিছু কি হয়েছে?

-কিছু হয়নি, তবে হতে কতক্ষন? তাকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাই না।

মেহমেত তার কথায় দৃঢ়। টোটো অবাক হয়ে জানতে চাইলো,

-কি করতে চাচ্ছেন আপনি?

মেহমেত উত্তর দিলো না, তবে তার ঠোঁটে অমায়িক এক হাসি ফুঁটে উঠলো নির্দ্বিধায়। বেশকিছু সময় টোটো উত্তরের অপেক্ষায় থাকলেও মেহমেত আর একটি কথাও বললো না। টোটো বিরক্ত হয়ে আর না পেরে চলে গেলো। সে মেহমেতের কাজে সত্যিই খুব বিরক্ত। মেহমেতের মতিগতি কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আমালিয়ার সাথে যে কি করতে চায় সে টোটো জানে না। তবে টোটো মনে প্রাণে চায় মেহমেত আমালিয়ার সাথে ভালো থাকুক, সুখী থাকুক ওরা এক সাথে।

টোটো বেরিয়ে যাওয়ার দিকে মেহমেত তাকিয়ে রইলো। তার মাথায় এখন অনেক কিছু চলছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না কিভাবে কি করবে। তবে আমালিয়াকে এতো দ্রুত জ্বিন রাজ্যে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি। কিন্তু না এনেও তো উপায় ছিল না। মেয়েটা যা শুরু করে ছিল! মেহমেত আমালিয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

-এতো বোকামি করলে চলে? পাগল করে ছাড়বেন তো দেখছি।

-কে পাগল হলো?

মেহমেত কথাটি ধীরে বললেও আরদার শুনতে পেলো কিভাবে যেন। নিজের কামরায় আরদারের উপস্থিতি মেজাজ বিগড়ে দিলো মেহমেতের। অনুমতি ব্যতীত তার কামরায় প্রবেশ করার সাহস কিভাবে পেলো এই ছেলে? মেহমেত তবুও শান্ত রইলো। উঠে দাঁড়িয়ে আমালিয়াকে আঁড়াল করে দাঁড়িয়ে পরলো।

-বাদশাহের কামরায় প্রবেশের পূর্বে অনুমতি নিতে হয় এই ভদ্রতা জ্ঞানটুকুও বুঝি ভুলে বসেছে সিলা গোত্রের রাজা?

আরদার দেখলো মেহমেত কি নিপুন ভাবে আমালিয়াকে আড়াল করে ফেললো তার দৃষ্টি থেকে। কি অদ্ভুত ছেলেমানুষী কর্মকাণ্ড।

-পূর্বে কখনো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয়নি তো।

-বর্তমান আর অতীতকে মিলিয়ে ভুল করবেন না আরদার। পূর্বে আমার কক্ষে আমার সাথে আমার স্ত্রী থাকতো না, কিন্তু এখন আমার জীবনে একজন নারী রয়েছে।

-স্ত্রী? সেই স্ত্রী যাকে ব্যবহার করে নিজের কার্য হাসিল করতে চাচ্ছেন? তা তার জন্য হঠাৎ এতো দরদ কেন আপনার বাদশাহ?

-তা আপনার না জানলেও চলবে। কি কারণে এসেছেন তা বলে বিদায় হন।

-আমালিয়াকে দেখতে...

মেহমেত তাকে সম্পূর্ণ কথাটি শেষ করতে দিলো না। রেগে গেলো খুব। গম্ভীর গলায় শাসিয়ে বললো,

-বারবার বলেছি তাকে নাম ধরে না ডাকতে। সে আপনার ভাবি হয় আরদার।

-ভাবি? জোর করে বিয়ে করে নিলেই ভাবি হয়ে যায় না বাদশাহে মেহমেত। তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক ছিল। আপনি তাকে বোকা বানিয়ে বিয়ে করেছেন। সে স্বজ্ঞানে নয়তো কখনো আপনাকে বিয়ে করতো না। তাকে আমি ভালোবাসি, সে আমারই হবে দেখে নিবেন।

আরদার মেহমেতকে আমালিয়ার এতটা নিকটে দেখে সহ্য করতে পারলো না। রাগের বশবর্তী হয়ে কি কি বলেছে বেচারা নিজেও জানে না। সাথে জানলো না ঘুমন্ত সিংহকে সে জাগিয়ে দিয়েছে। এরপরের সময়টা কি হতে চলেছে তার জীবনে সেই ধারণা কি তার আছে? হয়তো আছে, হয়তো নেই। তবে মেহমেতের মাথায় আগুন ধরে গিয়েছে তা আরদার নিজের সামনে ভাঙা টেবিলটাকে দেখেই বুঝেছে। যেটি মাত্র তার উদ্দেশ্যে মেহমেত ছুড়ে মেরেছে। যদি না সঠিক সময়ে আরদার সরে দাঁড়াতো তাহলে এতক্ষনে টেবিলটি তার মাথায় ভাঙতো। আরদার হতবম্ভের ন্যায় তাকিয়ে থাকলেও মেহমেতের ঠোঁটে তখন মুগ্ধ করা হাসি। এমন ভয়ানক কাজ করেও যে কেউ এভাবে হাসতে পারে তা মেহমেতকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেতো না।

-ভাবছেন বেঁচে গিয়েছেন? ভুল। এরপর তাকে নিয়ে আর একবার এরূপ কিছু বললে জানে মেরে দিতেও ভুল হবে না আমার। বেরিয়ে যান আমার কামরা থেকে। আপনাকে আর কখনো যেন আমার স্ত্রী কিংবা আমার রাজ্যের আশেপাশেও না দেখি।

-যাকে বারবার স্ত্রী সম্মোদন করছেন সে কি আপনাকে স্বামী রূপে চায়?

মেহমেত এপর্যায়ে চুপ করে গেলো। সত্যিই তো আমালিয়ার মনে তাকে নিয়ে অনুভূতি কি?

-সে আপনাকে চায় না। তাকে আপনি ঠকিয়েছেন। তাকে আপনি শুধু ব্যবহার করতে চেয়েছেন। আপনার জন্য সে একটি সুন্দর, সুস্থ জীবন পাচ্ছে না।

সত্য, তিক্ত হয়। যা সহ্য করার ক্ষমতা সকলের নেই। মেহমেতও নিতে পারলো না। বর্বরতার চরম রূপ দেখিয়ে আরদারকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কক্ষের বাইরে বের করে দিয়ে মুখের ওপর বিশাল দরজাটি বন্ধ করে দিলো। দরজার দুপাশে দুই পুরুষ একটি নারীকে নিয়ে লড়াইয়ে মেতেছে। মেহমেত হঠাৎ অনুভব করলো তার শরীর জ্বলছে। তার কিছু ভালো লাগছে না। অসহ্য লাগছে তার। আমালিয়া কি সত্যিই তাকে চায় না? আচ্ছা না চাইলো, তাতে তার কি বা আসে যাবে? কিছুই না। কিন্তু মন মানলো না। সে মুহূর্তে অস্থির হয়ে উঠলো। আরদারের বলা প্রতিটি কথা তার শরীরে কাটার মতো বিঁধতে রইলো। মেহমেত ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো আমালিয়ার দিকে। তাকে কষ্টে রেখে এই মেয়ে পায় কি? সব দোষ ওর। তার সুন্দর জীবনটা বিষিয়ে তুলেছে। কিন্তু তবুও এখন মেহমেত ওকে কিছু বলতে পারে না। কি যে হলো তা? মন চায় সারাক্ষন আমালিয়াকে দেখতে। ওর পাশে বসে থাকতে। এতো মিষ্টি দেখতে মেয়েটা! উফফ, সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। ভালো লাগছে না কিছু। আর সইতে না পেরে আমালিয়ার পাশে শুয়ে খুব সমর্পণে জায়গা করে নিয়ে কাছ থেকে দেখতে লাগলো মেয়েটিকে। প্রথমে একটু দূরত্বে এরপর ধীরে ধীরে আমালিয়ার সংস্পর্শে এসে থামলো সে। এবার শান্তি লাগছে। শান্তিতে মেহমেতের দুচোখে ঘুম নেমে এলো। মেহমেত আরো কিছুটা কাছে গেলো এবং খুব যত্ন করে আমালিয়াকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো। ঘুমন্ত আমালিয়া দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আবারো সেই চিরচেনা স্থানটিকে ফিরে পেয়ে আরাম করে ঘুমালো। মেহমেত আমালিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও চোখ বন্ধ করলো। সে কি এসব ভেবে ছিল? চেয়েছিলো কি এমন কিছু? তার মনে পরে সেদিনের কথা, যখন সে তিনদিন পরও আমালিয়ার কোনো খোঁজ পায়নি। সেই কষ্ট, সেই না বলা ব্যাথা মেয়েটা কি দেখে ছিল? সেই অনুভূতি যা আজ পর্যন্ত কখনো মেহমেত কারো জন্য অনুভব করেনি, তাও কি জানতে চেয়েছিলো? চায়নি, বরং তাকে কষ্ট দিয়ে দশদিন তার থেকে লুকিয়ে ছিল। এই দশদিন সে কেমন ছিল, কি অবস্থায় ছিল আমালিয়া জানতে চায়নি। তার একটু খোঁজ নেয়নি। নরম-সরম বউটি তার মুহূর্তে যেন বদলে গেলো একদম। এর পিছনে যে রয়েছে তার সাথে সে অবশ্যই দেখা করবে। তাকে এর ফল ঠিক ভোগ করতে হবে।

—-------------------

-সমস্যা কি আপনার?

-কি সমস্যা হবে?

আমালিয়া বড্ডো বেশি বিরক্ত। তার চোখমুখের হাল বেহাল। সে পারে না মেহমেতকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে। এখানে আসার পর থেকে অদ্ভুত আচরণ করছে লোকটা। যা আমালিয়াকে খুব বিরক্ত করছে। আগে নাহয় সে জানতো না সত্যিটা কিন্তু এখন এসব নাটকের মানে কি? এই যে ভোর সকালে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে মেহমেতের বাহুর মাঝে পেয়ে আমালিয়া ভীষণ অবাক হলো তার কি? সে না হয় গেলো তারপর থেকে এই লোক প্রতিটি কদমে তার আগে-পিছে ঘুরঘুর করেই যাচ্ছে। যখন তখন এই সেই বাহানায় ছুঁয়ে দিচ্ছে এর কি মানে? প্রশ্ন করলে উত্তরের পরিবর্তে উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। ভীষণ বিরক্তিকর। মেহমেত মাসুম চেহারা নিয়ে আমালিয়ার ঠিক পাশে বসে। হাতে তার এক থালা ফল। যা সে সেই কখন থেকে আমালিয়াকে খেতে বসছে কিন্তু আমালিয়া ছুঁয়েও দেখছে না। আগে হলে মেহমেত রেগে যেত, আমালিয়াকে ভয় দিতো, হিংস্র হয়ে উঠতো কিন্তু এখন? সে এসব কিছুই করছে না। বরং ধৈর্য নিয়ে বসে আছে। এসবই আমালিয়াকে আরো বেশি পোড়াচ্ছে। আমালিয়া জানে আবারও মেহমেত তার সাথে খেলছে। সে তার ফাঁদে পা দিলে আবারো কষ্ট পাবে। কিন্তু মেহমেত এমন করছে কেন? সে তো মেহমেতের কথায় রাজি হয়েছে।

-কি চাচ্ছেন আপনি মেহমেত? কেন করছেন এসব? বলেছি তো আপনার সব কথা শুনবো। আপনার সেই তলোয়ার লাগবে তো? চলুন আজই গিয়ে নিয়ে আসি।

আমালিয়া অতিষ্ট হয়ে উঠে দাঁড়ালো। সে সত্যিই এর শেষ চায়। মেহেমতের মাঝে ভাবাবেগ দেখা গেলো না। সে খুব যত্ন করে আমালিয়ার হাত ধরে আবারো বসিয়ে দিয়ে থালা থেকে এক টুকরো ফল উঠিয়ে আমালিয়ার মুখের সামনে ধরে বললো,

-তার জন্যই আপনার এতো যত্ন নিচ্ছি। আমার কাজ করতে হলে আগে আপনাকে নিজের শরীরের যত্ন নিতে হবে। বেশি করে খেয়ে শক্তি অর্জন করতে হবে। নয়তো বাদশাহে মেহমেতের সাথে পারবেন কিভাবে?

আমালিয়ার চোখের কোণে পানি জমে এলো। সে আবারো ভুল করেছে। সে আবারো আশা করেছে। ভেবেছিলো এবার হয়তো মেহমেত তাকে মন থেকে চেয়ে এভাবে যত্ন নিচ্ছে কিন্তু সে ভুল। মেহমেত তাকে চায় না। তাকে শুধু প্রয়োজনে ব্যবহার করছে। মেহমেত জোর করে আমালিয়ার মুখে ফলের টুকরোটি ঢুকিয়ে দিলো। মুখে ফল নিয়ে আমালিয়া চোখের জল ছেড়ে দিলো অবলীলায়। মেহমেত ওর বাচ্চামোতে হাসলো। অন্য হাতের সাহায্যে অমালিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,

-বোকা মেয়ে কাঁদে না।

আমালিয়া আর পারলো না নিজেকে ধরে রাখতে। হার-জিতের এই লড়াইয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছে সে। ঝরঝরিয়ে কেঁদে বললো,

-আমি মা-বাবার কাছে যেতে চাই। আপনি দয়া করে আমাকে সেই স্থানে নিয়ে চলুন যেখানে আপনার তলোয়ার রয়েছে। আমি আর পারছি না এসব নিতে। দয়া করে এই খেলা বন্ধ করুন।

আমালিয়ার কষ্টে ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে মেহমেত শক্ত হয়ে বসে রইলো। সে আর একটি কথাও বললো না। নীরবে আমালিয়ার কান্না দেখে গেলো।

চলবে____

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন