#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৩৯
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
মেহমেতের বলা কথাটি শুনে আরদার প্রতিক্রিয়া করার ভাষা খুঁজে পেল না। তার মাথায় যেন বজ্রাঘাত ঘটেছে। এসব কি শুনছে সে? তার মানে এতদিন সে যা জনতো সব ভুল? একের পর এক প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে লাগলো তার। প্রতিবারের মতো এবার সে নিজেকে দমালো না। মেহমেতের সম্মুখে একে একে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে লাগলো।
-মানে? জ্বিনমাতা না হলে কে ছিল সে? আর আপনিই বা এত কিছু কিভাবে জানলেন? তাছাড়া জ্বিনমাতা নিজে আমাকে বলেছিল সিরেন্থা উদ্ধারের জন্য একজন পবিত্র রুহের হাইব্রিড সন্তানকে প্রয়োজন। আপনি নিজেও তো তার পিছনে সিরেন্থার জন্যই পরে ছিলেন তাই না?
আরদার হড়বড় করে বলে থামল। তার হাত পা অসম্ভব কাপছে। মন বলছে আজ এমন কিছু জানতে পারবে যার কারণে তার দুনিয়া উল্টে যাবে। অপরাধবোধের বোঝা তাকে কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিবে। তার সব থেকে প্রিয় জিনিসটি হয়তো আজ হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু সে এমনটি চায় না। কখনো চায় না। সব মিথ্যা হোক, সব স্বপ্ন হোক। মেহমেত স্বীকার করে নিক সে নিজের স্বার্থের জন্য আমালিয়ার পিছু নিয়ে ছিল। শুধু একবার, একবার সবটা স্বীকার করে নিক।
-হুম।
মেহমেতের ছোট উত্তর। আরদার হাফ ছেড়ে বাঁচলো। শরীরের অসম্ভব কাঁপুনি মুহূর্তে শিথিল হয়ে এলো। কিন্তু তা খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। কারণ মেহমেত এরপর যা বলতে লাগলো তা আরদারের নিকট বড্ড ভারী ঠেকলো।
-দাদি তোমাকে যা বলেছিলো সব সত্যি আরদার। আমি তখন শয়তানের বশে ছিলাম। দীর্ঘ ১৩টি বছর আমি সেই অভিশপ্ত জীবন কাটিয়েছি, তড়পেছি। হিংস্র জানোয়ারের মতো সকলের ক্ষতি করতে চেয়েছি। প্রতিশোধের নেশায় কে আপন কে পর ভুলে বসে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমার ধ্যান-জ্ঞান শুধুই সিরেন্থা ছিল। ভেবেছিলাম শক্তি, ক্ষমতার জোর অনেক বেশি। কিন্তু আমি তখনো জানতাম না সিরেন্থার থেকেও বড় শক্তি রয়েছে। রাজ্য ছেড়ে যখন দিশেহারা পথিকের মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতাম তখন আমার দাদাজানের সাথে পরিচয় হয়।
মেহমেত এতটুকু বলে থামল। আরদার দাদাজান কথাটির মানে বুঝলো না। মেহমেতের দাদাজান, সেতো মারা গিয়েছিল। তবে? তার চোখে অবাকতা। মনের প্রশ্ন এবার সে করতে পারল না। গলাটি কে যেন চেপে ধরে আছে। ভীষণ ব্যাথা হচ্ছে। ঢোক গিলে অপেক্ষা করল পরবর্তী কথা শোনার। মেহমেত ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে আজলানকে দেখিয়ে বলল,
-ইনি দাদার সৎ ভাই। সে নিজেও একজন হাইব্রিড সন্তান।
একের পর এক বোমা ফাটছে। আরদার হতভম্ব মুখ করে একবার মেহমেতকে দেখছে তো আবার আজলানকে দেখছে। তার চোখগুলো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সৎ ভাই আবার হাইব্রিড সন্তানও? তাহলে সকলে আমালিয়ার পিছনে কেন পরে আছে? মেহমেত হয়তো আরদারের মনের কথাটি বুঝতে পারল, তাই তো বলল,
-তার ব্যাপারে পূর্বে কারো ধারণা ছিল না। কেউ জানতো না তার কথা। এখনো খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি তার কথা জানে। তাছাড়া সে আর আমালিয়া এক নয়। আমালিয়া তার থেকেও বেশি শক্তিশালী এবং ভয়ানক। আমালিয়ার শক্তি খারাপ হাতে পরলে দুনিয়া ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। আপনার নিশ্চয়ই আশ্মিরাজের কথা স্মরণে রয়েছে?
আরদার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো, তার মনে আছে। মেহমেত বলেছিল সে পালিয়েছে। এরপর কি হলো তা আর জানা হলো না তার।
-সে পালায়নি। আমি মিথ্যা বলেছিলাম আপনাকে। সেদিন নিভালয়ে আমালিয়া প্রথমবারের মতো তার অগ্নি শক্তির প্রয়োগ করে, তাও নিজের অজান্তে, নিজেকে রক্ষা করতে। আর সেই শক্তি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সম্পূর্ণ নিভালয়ের সাথে আশ্মিরাজও নিঃশেষ হয়ে যায়।
-লিভালয়? সে নিভালয়ে অবস্থানরত অবস্থায় নিজের শক্তি ব্যবহার করেছে?
মেহমেত মাথা নাড়ালো। আরদারের এবার মাথা ঘুরে উঠলো। নিভালয় কোনো সাধারণ স্থান না। নিভালয় ধ্বংস করা অসম্ভব প্রায়। আর কেউ করলেও নিভালয় নিজের শক্তি দিয়ে আবারও পূর্বের রূপে ফিরে আসে। তাছাড়া বড় বড় শক্তিশালী আদি জ্বিনেরাও আজ পর্যন্ত সেই স্থানে নিজেদের শক্তি ব্যবহার করতে পারেনি। এতটাই পবিত্র সেই স্থান। তাহলে আমালিয়া কিভাবে! কিভাবে সম্ভব এসব?
-কিভাবে সম্ভব?
আরদার ভীষণ অবাক। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এসব কিছু সত্যি। আমালিয়া সাধারণ একটি মানুষ, একজন হাইব্রিড সন্তান মাত্র। সে এত শক্তির অধিকারী কিভাবে হবে? কই সে তো কখনো তার মাঝে অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করলো না। যে মেয়ে সামান্য নিজেকে সুরক্ষা দিতে পারে না সে কিভাবে আশ্মিরাজের মতো শক্তিশালী জ্বিনকে মারতে পারে। আবার নিভালয়ও? না না মেহমেতের কোনো ভুল হচ্ছে নিশ্চয়ই।
-আপনি ভুল ভাবছেন হয়তো…
-সে আমার সামনে এমনটি করেছে আরদার। নিভালয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এতটাই বিধ্বংসী অবস্থা হয়েছে যে নিভালয় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে।
আরদার পাথর হয়ে বসে রইলো। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এসব। আমালিয়া, আমালিয়া এমন নয়। সে তো এক স্নিগ্ধতার প্রতীক। ও কিভাবে নিভালয়ের মতো স্থানের ক্ষতি করতে পারে? আরদারকে ভাবুক হতে দেখে এবার আজলান গলা পরিষ্কার করে বলল,
-আমালিয়ার শক্তি সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই রাজা আরদার। সে বড় বিধ্বংসী নারী। তার শক্তি শুভ থেকে অশুভ বেশি। তার পবিত্রতা ভয়ানক। তার মন যত বেশি পবিত্র তার শক্তি ততো বেশি কুলষিত। এটাই তার ভবিতব্য। তাকে আয়ত্তে আনতে না পারলে সে সব শেষ করে দিবে। মেহমেত শুরু থেকেই তাকে সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। তার ওপর শয়তানদের ভয়ানক খারাপ দৃষ্টি রয়েছে। আমরা প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সকল অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে এসেছি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আমালিয়াকে তার শক্তির সাথে পরিচয় করানো। কারণ এই শক্তি নিজে আমালিয়াকে খারাপ পথে টেনে নিয়ে যাবে। তাই তো একের পর এক বিপদের মুখে তাকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। যেন নিজেকে রক্ষা করার জন্য হলেও সে নিজের শক্তি জাগ্রত করে। যখন কোনো কিছুতেই তাদের কার্য হাসিল হলো না তখন আমার মেয়ে মেলিসাকে ব্যবহার করলো। সফলও হলো। আমালিয়া মেলিসার মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে তাই করলো যা ওরা চেয়েছিল। তার জন্মের পূর্ব থেকেই তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গিয়ে ছিল। সেদিন চামলিমেহমশিনের জঙ্গলে কোনো এক শয়তান নারী ছদ্মবেশে রানী মারিয়ামকে সাহায্য করে। আমালিয়ার জন্মের পর তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু, বিচক্ষণ রানী মারিয়াম সময় থাকতে বুঝতে পারে সেসব। তিনি নিজ অংশকে রক্ষা করতে সেই অবস্থায় ওই শয়তানের সাথে লড়াই করে। কিন্তু দুর্বলতার জন্য সে বেশিক্ষণ আত্মরক্ষা করতে পারে না। প্রাণ দিয়ে বসে শয়তানের হাতে। আমি আর মেহমেত যখন সেখানে পৌঁছাই তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায়। রানী মারিয়াম তখন নিজ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে ছিলেন মাটিতে। আমরা সেই নারীকে বন্দি করে ছিলাম কিন্তু বন্দি হওয়ার পর পরই সে নিজের জীবন নিজে কেড়ে ন্যায়।
আজলান থেমে গেলো। তার গলা শুকিয়ে এসেছে। অতীত বড় ভয়ানক ছিল তাদের সকলের জন্য। এসব মেহমেত আমালিয়ার সামনে কখনো আনতে চায়নি। চায়নি মেয়েটাকে আর কষ্ট দিতে।
মেহমেত নিজের দুহাত সামনে এনে আরদারকে দেখিয়ে নিস্তেজ গলায় বলল,
-এতটুকু ছিল। একদম ছোট। কি শান্ত! আমার বড় বড় দুটি হাতের মাঝে এতটুকুনি একটা শরীর। কি উজ্জ্বলতা তার। সম্পূর্ণ শরীর অস্বাভাবিক রকম গরম ছিল। আমার হাত পুড়ে যাচ্ছিল তারও তাকে ছাড়িনি। বুকের সাথে আগলে নিয়ে ছিলাম। কি অপার এক মায়া সেদিন আমাকে গ্রাস করে নিল জানি না। দুই রঙ্গা মনি দিয়ে বড় বড় করে তাকিয়ে দেখছিল। আজও আমি সেই দিন ভুলতে পারিনি। সেই যে মায়ায় পারলাম আজ পর্যন্ত রেহায় পেলাম না।
বলেই মেহমেত হাসলো। যেন সে সবটা বর্তমানে উপলব্ধি করতে পারছে। সেই মুহূর্তের পর থেকে সে আমালিয়াতে আসক্ত হয়ে পড়ল। যে উদ্দেশ্যে সে আমালিয়াকে খুঁজে বের করেছিল সেই উদ্দেশ্য আর কখনো সফল হয়নি। হতে দেয়নি মেহমেত। কিভাবে পারবে? আমালিয়া যে তার নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে গিয়েছিল। কত কাঠখড় পুড়িয়ে, ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে আমালিয়াকে নিজের সাথে বেঁধে নিল তা একমাত্র মেহমেত অনুভব করতে পারে। ভীষণ পোড়ায় ওই নারী, ভীষণ। মেহমেত কাউকে বলতে পারে না, কাউকে না।
মেহমেতের কথা শুনে আরদার ব্যাথাতুর হাসলো। ভালোবাসা কি অদ্ভুত না? সে ভাবতো মেহমেতের থেকে আমালিয়াকে সে বেশি ভালোবাসে অথচ সত্যি সম্পূর্ণ উল্টো। সে কখনো মেহমেতের মতো করে ভালবাসতে পারবে না। প্রিয়সীকে নিজের করে নেয়ার জন্য ২০টি বছর অপেক্ষা করেছে। নিজেকে সকলের কাছে খারাপ প্রমাণ করেছে, শুধুমাত্র আমালিয়াকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। ৫৭টি বছর রাজ্য ছেড়ে থেকেছে আমালিয়ার কথা ভেবে। এতকিছু কি সে কখনো করতে পারত? আরদার খুব দ্রুত তার উত্তর পেয়ে গেলো। পারত না। সে মেহমেতের মতো ধৈর্য ধরে থাকতে পারতো না। এই বিষয়টিই আরদারকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। সে বুঝে ফেলল, আমালিয়াকে সে চিরজীবনের মতো হারিয়ে ফেলেছে। না না, আমালিয়া তার কখনোই ছিল না। সে শুরু থেকেই মেহমেতের ছিল। বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি লুকিয়ে আরদার প্রশ্ন ছুড়লো,
-তারপর?
-তারপর? আমরা দুটি পুরুষ চাইলেও আমালিয়াকে নিজেদের কাছে রাখতে পারতাম না। কারণ সে তখন সদ্য জন্ম নেয়া দুধের শিশু ছিল। মায়ের ভালোবাসা, যত্নের দরকার ছিল। তাছাড়া তখন আমার পিছনে পড়ে থাকা শত্রুর অভাব ছিল না। তাই আমালিয়াকে একটি নিরাপদ আশ্রয় দিতে চেয়েছিলাম। দাদি চামলিহেমশিনে রয়েছে আমি পূর্ব হতে অবগত ছিলাম। সুতরাং বেশি একটা কসরত করতে হয়নি। দাদির ওপর সামান্য যাদুবিদ্যার প্রয়োগ করে তাকে বুঝালাম সে আমালিয়াকে বাঁচিয়েছে। এবং এই সেই নারী যাকে আমার দরকার। ব্যাস, এরপরের বাকি কাজ স্বয়ং দাদি নিজেই করেছিল। আমরা শুধু অদৃশ্য ভাবে আমালিয়াকে সুরক্ষা দিয়ে গিয়েছি আড়ালে।
মেহমেত এবার বড় করে নিঃশ্বাস নিলো। তার আজ বড় হালকা লাগছে। এতগুলো বছর নিজের মাঝে লুকায়িত ব্যাথা বলতে পেরে বড্ড শান্তি লাগছে। আরদার কি বলবে বুঝতে পারল না। সে একদম শান্ত হয়ে বসে রইলো। মাঝে মাঝে আমাদের চোখের সামনে সবকিছু থাকার পরও আমরা অন্ধ হয়ে থাকি। বুঝতে পারি না। তাদের কথার মাঝে আড়াল থেকে সরে দাড়ালো আমালিয়া। সে জঙ্গলের দুর্গম পথ ধরে খালি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পাশে ভারী লোমশ দেহের টোটো। আমালিয়ার পরনে সাদা রঙের পোশাক। দূর থেকে তাকে সৌন্দর্যের মূর্তি লাগছে। সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্মি তেসরা ভাবে আমালিয়ার মুখে এসে পড়ছে। সে এক ঐশ্বরিক দৃশ্য। যা না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমালিয়া শুরু থেকেই আড়ালে লুকিয়ে ছিল অদৃশ্য ভাবে। এই এক মাসে সে তার শক্তি খুব ভালোভাবে ব্যবহার করা শিখে গিয়েছে। বিশেষ বিশেষ কিছু শক্তি তার মাঝে আছে যা আসলেই ভয়ানক। সে অগ্নিকন্যা। এটিই তার সেই শক্তি যা শয়তানেরা অপব্যবহার করতে চায়। আমালিয়া জানে সকল কিছু। মৃত্যুর পূর্বে সুলেমান তার সাথে একটি সওদা করেছিল। সে বলেছিল আমালিয়ার ব্যাপারে সে সব বলে দিবে তার বিনিময়ে আমালিয়ার তাকে ছেড়ে দিতে হবে। আমালিয়া রাজি হয়েছিল তার কথায়। এরপরই সুলেমান তার জন্ম থেকে শুরু করে সবটাই বলেছিল। এমনকি আমালিয়া এটিও জানে কে এই সকল কিছুর পিছনে রয়েছে। আমালিয়া নিজের কথা রেখেছিল। ছেড়ে দিয়ে ছিল সুলমানকে। সারা জীবনের মতো ছেড়ে দিয়ে ছিল। মৃত্যু দিয়ে মুক্তি দিয়ে ছিল। এতে সে একটুও কষ্ট পায়নি, বরং তৃপ্তি পেয়ে ছিল। আমালিয়া চোখ নামিয়ে তার সাথে চলতে থাকা টোটোর দিকে তাকিয়ে হাসলো। কি স্নিগ্ধ সেই হাসি! মায়ামায়া চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। টোটোর ভীষণ ভালো লাগে আমালিয়াকে এভাবে দেখতে। আমালিয়া হাসলে তাকে ভীষণ সুন্দর লাগে। চোখ জুড়ানো সুন্দর। তার মনে হয় এই মেয়েটিকে মহান আল্লাহ তায়ালা ভীষণ যত্ন নিয়ে গড়েছে। নয়তো কেউ এত নিখুঁত কি করে হয়?
-কি দেখছ টোটো?
-আপনার কষ্ট হচ্ছে মহারানী?
আমালিয়া মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। তার একটুও কষ্ট হচ্ছে না। বরং ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে। এযাবৎ কাল সে ভেবে এসেছে কেউ তাকে ভালবাসে না, অথচ তাকে ভালবেসে কতজন কত ত্যাগ দিয়ে গেল। এই যে সে বেঁচে আছে, নিঃশ্বাস নিচ্ছে এ সকল কিছু করো না কারো ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া। শুরুটা করেছিল তার বাবা, এরপর মা, এভাবে একে একে ইলারা, দাদি, মেলিসা, আজলান, আর সব থেকে বেশি করেছে মেহমেত। বুকের মাঝে এক সমুদ্র অনুভূতি নিয়ে বছরের পর বছর নিঃশ্চুপ থেকে অপেক্ষা করে গিয়েছে।
-তোমার আমার প্রতি রাগ হয় না টোটো?
রাগ? তাও আমালিয়ার ওপর? সম্ভব কি? টোটো বুঝলো না আমালিয়া হঠাৎ এই কথা কেন বলল।
-রাগ কেন হবে মহারানী?
-সব তো শুনলে। শুরু থেকে মেহমেতকে কি ভীষণ জ্বালিয়েছি। তুমি তো মেহমেতকে ভীষণ ভালোবাসো। তোমার আমার ওপর রাগ হওয়া উচিত।
-আপনার ওপর রাগ হওয়ার সাধ্য আমার নেই মহারানী। আমি তার থেকেও আপনাকে বেশি ভালোবাসি।
আমালিয়া ওর কথায় শব্দ করে হাসলো। তার হাসির রিনিঝিনি শব্দ চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আদর করে টোটোর শরীরে হাত বুলিয়ে বলল,
-জানি টোটো। নয়তো মেহমেতের অবাধ্য হয়ে আমার হয়ে লুকিয়ে কাজ করতে না। যেখানে মিগিও তার কথায় ওঠে-বসে সেখানে তুমি আমার হয়ে কাজ করছ। মেহমেত জানতে পারলে তোমাকে আগের বারের থেকেও ভয়ানক শাস্তি দিবে।
টোটো ঢোক গিললো। সে জানে মেহমেত জানলে তার খবর আছে কিন্তু তবুও সে আমালিয়ার জন্য বারবার মেহমেতের অবাধ্য হতে রাজি আছে। এই যেমন মাত্র মিগিকে বোকা বানিয়ে আমালিয়াকে নিয়ে এসেছে। এর জন্য যে কি অপেক্ষা করছে তার জানা নেই। তারা চলতে চলতে অনেকটা পথ এগিয়ে এলো। আমালিয়ার এখন শরীর খারাপ লাগছে। তার পেটে থাকা সন্তান খুব দ্রুততার সাথে নিজের বিকাশ ঘটাচ্ছে। যার দরুন আজকাল সে বড্ড কাহিল থাকে। বাম হাত পেটে চেপে ডাম হাত পাশের একটি গাছের সাথে রেখে আমালিয়া জোরে কয়েকটি নিঃশ্বাস নিলো। তার এই অবস্থা দেখে টোটো ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইলো,
-আপনি ঠিক আছেন মহারানী?
-একটু দুর্বল লাগছে টোটো। চিন্তা করো না। আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই। আর হাঁটতে পারব না। চলো জাদুর মাধ্যমে যাওয়া যাক।
টোটো বাধ্য দূতের মতো আমালিয়া আদেশ পালন করলো। তারা চোখের পলকে আমালিয়ার জন্য বরাদ্দকৃত কামরায় এসে হাজির হলো। আমালিয়ার কিছু ভালো লাগছে না। বড্ড হাঁসফাঁস লাগছে।
-টোটো আমি কিছু সময় একা থাকতে চাই।
টোটো মেনে নিল। নীরবে আমালিয়াকে একা ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। আমালিয়া বিছানার একপাশে হেলান দিয়ে বসে পেটে হাত রেখে বলল,
-ভীষণ জ্বালাতন করছেন আপনি। মাকে এভাবে কষ্ট দিতে নেই।
অতঃপর চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলো পূর্বের কথা। সেদিন নিভালয়ে ওই ঘটনার পর আমালিয়া খটকা লাগে। কিন্তু সে মেহমেতকে অত্যধিক বিশ্বাস করত বলে মেহমেতের কথা মেনে নেয়। কিন্তু এরপরও সে অস্থির থাকতো। প্রায় সময় তার শরীর সাধারণ তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যেত। এটি তখন হতো যখন আমালিয়া খুব বেশি রেগে যেতো বা অস্থির হতো। এছাড়া সে সব সময়ের মতো স্বাভাবিকই থাকতো। ধীরে ধীরে আমালিয়া বুঝতে পারে নিজের মাঝের পরিবর্তন গুলো স্বাভাবিক নয়। তাছাড়া মেহমেতের তার প্রতি অতিরিক্ত যত্ন, এত এত পাহারাদার, এই সকল কিছু তাকে বারবার ভাবনায় ফেলে দেয়। সে কিছুতেই আশ্মিরাজের ব্যাপারটি ভুলতে পারছিল না। এই সবকিছুর অবসান হয় এক মাস পূর্বে মেলিসার মৃত্যুর দিন। আমালিয়া সেদিন তার সম্পূর্ণ শক্তির সাথে পরিচিত হয়। দুঃখ, কষ্টে জর্জরিত আমালিয়া বুঝতে পেরেছিল সে এক ধ্বংস। চারিপাশের অবস্থা দেখে তার নিজের প্রতি ঘৃণা হতে লাগলো। মারিদ রাজ্যে এসেই সে সর্বপ্রথম নিজের শক্তির ব্যাপারে জানতে উঠে পরে লাগলো। অতঃপর জানতে পারল সে অগ্নিকন্যা। আগুন তার শক্তি। সে ধ্বংস। কোটিতে একজন জ্বিন এমন শক্তি পেয়ে থাকে। আর যে পায় তার পরিণতি ভয়াবহ হয়। দুর্ভাগ্যবশত এই শক্তির অধিকারী এখন আমালিয়া নিজে। যদিও সে অগ্নি শক্তি ব্যবহারে এখন পুরোপুরি অপারগ। কারণ তার গর্ভে থাকা সন্তান সেই শক্তি নিজের মাঝে গ্রাস করে নিচ্ছে। তাই সে এখন কারোরই কাজে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। যদিও সে অগ্নিশক্তি ছাড়া অন্যান্য জাদু ব্যবহার করতে সক্ষম কিন্তু এতে শরীরের ওপর ব্যাপক চাপ পরে যায়। তাই বলা চলে সে এখন একজন সাধারণ মানুষ বই কিছু না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমালিয়া সংকিত। কি হবে যখন মেহমেত জানতে পারবে সে যাকে এত বেশি বিশ্বাস করে সেই তার পিঠ পিছে ছুরি চালিয়েছে?
চলবে____
[ ছোট হয়ে গেলো না? কি যে হাবিজাবি লিখি আজ কাল! আমার আরদার বড্ড ভালো ছেলে। সে একজন গো-বেচারা ছেকাখোর। আমালিয়ার ক্ষতি সে করতেই পারে না। সুতরাং তাকে আর ভিলেন বলবে না।]