#আফসানায়ে_জ্বিনান
#মীরা_রায়াদ
পর্ব-৪০
[কপি করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। উপন্যাসটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। উপন্যাসটি ভালো লাগলে রিভিউ দিবেন এবং শেয়ার করে অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ করবেন। সকলে রেসপন্স করবেন।]
সেদিনের পর কেটে গেছে আরও কিছুদিন। এর মাঝে মেহমেত একবারও আমালিয়ার সাথে দেখা করতে পারেনি। চেষ্টা কম করেনি কিন্তু জেদি আমালিয়া কোনো সুযোগ রাখেনি। মেহমেতের সব কেমন অগোছালো হয়ে গিয়েছে। তার জীবনের সাথে রাজ্যেও ধস নেমেছে। কোথা থেকে কি হচ্ছে বুঝতে পারছে না। হুটহাট এক এক সময় কোনো রূপ সতর্কতা ছাড়া হামলার শিকার হচ্ছে। চারিদিকে বিশৃঙ্খলার দরুন মেহমেত হাপিয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজ্যের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ, অশান্তি তো রয়েছেই। মনের সাথে মস্তিষ্কও কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এরই মাঝে সে সংবাদ পেল সিলা রাজ্যের শেহজাদি মারিদ রাজ্যের সাথে সকল সুসম্পর্ক ভঙ্গ করেছে। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সব আরো লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। মেহমেত বুঝতে পারছে না আমালিয়ার মাথায় কি চলছে। কেন এসব করছে সে? তার অপরাধ কি খুব বড় ছিল?
-হুজুর।
জায়াদ্রা বিনম্র ভাবে ডাকলো। তার অবস্থান কামরার দরজার কাছে। দৃষ্টি নিচে। মেহমেত দুহাতে মুখ চেপে বসে ছিল। সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। জায়াদ্রার ডাকে সে চোখ তুলে তাকালেও আগের মতো একই ভঙ্গিতে বসে রয়েছে। মুখ ফুটে কিছু বলল না, কিন্তু দৃষ্টিতে প্রশ্ন স্পষ্ট। জায়াদ্রা অবশ্য এতকিছু দেখলো না। সে মেহমেতের একটি হুকুমের অপেক্ষায়। মেহমেত ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। এসব কিছু ভালো লাগছে না। মেয়েটা তার এমন অভ্যাস করে দিয়ে গিয়েছে যে, তাকে ছাড়া এখন সব শূন্য লাগে।
-বলো জায়াদ্রা।
-হুজুর সভা তৈরি। ধীরে ধীরে সকল রাজ্যের রাজারা সেখানে পদার্পণ করছেন।
মেহমেত ভালোই চমকালো। আজ সভা ছিল? ওহ হ্যাঁ, ছিল তো। মেহমেতকে অগ্রিম জানানো হয়েছিল। এমনকি তার অনুমতিও নেয়া হয়েছিল। অথচ সে ভুলে বসেছে। আজ সকল জ্বিন গোত্রের রাজাদের সাথে বৈঠক রয়েছে। ইদানিং কালে যা হচ্ছে, এমন যদি চলতে থাকে তাহলে সামনে ভীষণ বিপদ। তাছাড়া আজলান ও তার মনে হয় সেই সময় এসে গিয়েছে যার প্রস্তুতি তারা দীর্ঘ একটা সময় ধরে করছে।
সকল রাজারা এলেও আজ আমালিয়া আসবে না। আরদার তাকে পূর্বেই জানিয়েছে এ কথা। আমালিয়া শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে কাটিয়ে দিয়েছে। তার পরিবর্তে আজ আরদার সভায় উপস্থিত থাকবে। একদিক থেকে ভালই হলো। সে নিজেও চায় না এতোগুলো পুরুষ তার স্ত্রীকে দেখুক।
-রাজ পোশাক তৈরির হুকুম দাও জায়াদ্রা।
-জ্বি হুজুর।
জায়াদ্রা দ্রুত পায়ে ছুটলো মেহমেতের হুকুম পালন করতে। মেহমেত সেদিকে দীর্ঘসময় তাকিয়ে রইলো। কি এত দেখলো তা যেন এক রহস্য। অতঃপর তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটি দীর্ঘশ্বাস।
________
সিলা রাজ্যে আসার পর আমালিয়াকে খুব একটা তার কামরা ছেড়ে কোথাও যেতে দেখা যায় না। সর্বক্ষণ সে কামরাতেই অবস্থান করে। আরদারের মনে হয় আমালিয়া যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। মুখে নিজের অধিকার বুঝে নিয়ে রাজ্যের ভার নিলেও কাজে তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। উল্টো এখনো সবকিছু আরদারকেই সামলাতে হচ্ছে। যেকোনো সিদ্ধান্ত এখনো আরদারের অনুমতিতেই হয়। আমালিয়া নামে মাত্র এই গোত্রের রানী। তাছাড়া তার মাঝে রাজ্য সামলানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা লক্ষ্য করা যায় না। আজকাল আমালিয়ার হাবভাব আরদারের কাছে সন্দেহজনক লাগে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আরদার পা বাড়ালো আমালিয়ার কামরার দিকে। প্রথম যেদিন আমালিয়া এখানে এলো, আরদার সরাসরি তাকে নিয়ে মারিয়ামের কামরায় এসেছিল। সেদিন মেয়েটা প্রতিটি জিনিস ছুঁয়ে কি ভীষণ কাঁদলো! আরদারের তখন ভারী মায়া হয়েছিল আমালিয়ার জন্য। সেই থেকে আমালিয়া আজও ওই কামরায় অবস্থান করছে। রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাকে নতুন এবং রাজকীয় কামরায় অবস্থানের পরামর্শ দিলেও সে কারো কথা শোনেনি। আরদার অবশ্য জানতো এমন কিছুই হবে। তাই সে আমালিয়াকে কিছু বলেনি। বরং নীরবে সমর্থন করে গিয়েছে। তাছাড়া আরদার আমালিয়াকে কোনো বিষয় নিয়ে আর জোর করতে চায় না। আমালিয়া যেখানে, যেভাবে থাকতে ভালবাসে সেভাবেই না হয় ভালো থাকুক। আরদার দূর থেকে তার জন্য দোয়া করে যাবে। কথাটি ভেবেই আরদার ফোস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে এসে দাঁড়ালো আমালিয়ার কামরার দরজার সামনে। সেখানে বেশ কয়েকজন দেহরক্ষী পাহারারত অবস্থায় দিনরাত দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দেখে সকলে চোখ নামিয়ে পেটে একহাত রেখে সম্মান জানালো। আরদার কিছু বলল না, বরং ধীরে দরজায় টোকা দিয়ে অপেক্ষা করলো। কিছু মুহূর্ত পর ভিতর থেকে চিকন রিনরিনে সম্মোহনী গলা ভেসে এলো।
-আসুন।
আরদার ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে দরজা ঠেলে ভিতরে পা রাখলো। আমালিয়া পালঙ্কে আধ শোয়া হয়ে বসে আছে। তার বুক পর্যন্ত একটি চাদর দিয়ে ঢাকা। বেশ অনেকদিন থেকে সে অসুস্থ। কি হয়েছে আরদার জানতে চাইলে, প্রতিবার একই উত্তর আসে তার থেকে,
-সামান্য দুর্বলতা।
আরদার অনেকবার কবিরাজকে ডাকতে চেয়েছে। কিন্তু আমালিয়ার এক কথা, ওসবের প্রয়োজন নেই। এই কথা মেহমেত জানতে পারলে সর্বপ্রথম তাকে এসে ধরবে। হয়তো বলে বসবে,
-আমার বউটার কিছুদিনের জন্য খেয়ালও রাখতে পারোনি তোমরা?
অথচ তাকে কে বুঝাবে তার বউ তার মতোই ঘাড় তেড়া। সে নিজেই তো বউকে সামলে রাখতে পারে না, উল্টো আমালিয়ার কাছে নাকানি-চুবানি খায় প্রতিবার। সেখানে আরদার তো অনেক দূরের ব্যাপার।
আমালিয়া আরদারকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। ভোরের প্রথম আলোর মতো নরম, স্নিগ্ধ সেই হাসি। কি মোলায়েম! মাথার কাছের একটি জানালা দিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। যার দরুন আমালিয়ার স্বর্নিল চুলগুলো খুব ধীরে দোল খাচ্ছে একে অন্যের সাথে। সেই দৃশ্য অপার্থিব ঠেকলো আরদারের কাছে। তার মনে হয় আমালিয়াকে পূর্বের লাল চুলের থেকে এই স্বর্ণ কোমল রঙের চুলে বেশি মানায়। আচ্ছা, সে যেভাবে আমালিয়াকে দেখে মেহমেতও কি সেভাবে দেখে? তার মতো খুঁটে খুঁটে আমালিয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করে? এই অপরূপ মায়াবতী তার নয় ভাবলে তার কলিজা ছিঁড়ে যায়।
-আরদার।
আমালিয়ার নরম ডাক। আরদার মুগ্ধ চোখে তাকালো। তার সাথে এখন আমালিয়ার সম্পর্কটা সহজ হয়েছে। পূর্বের ন্যায় আমালিয়া তাকে ভয় পায় না। দেখলে বিরক্ত হয় না। বরং মিষ্টি করে হাসে, দু/তিনটে কথা বলে। এতটুকুই আরদারের জন্য যথেষ্ট। ভালোবাসার মানুষটি সুখে আছে, তার সাথে সুন্দর করে কথা বলছে, আর কি চাই জীবনে?
-শরীর কি বেশি খারাপ তোমার?
-উহু। এখন ঠিক আছি।
-একবার কবিরাজকে দেখালে ভালো হতো না?
-আমি ঠিক আছি আরদার। চিন্তা করার কিছু নেই। আপনি তো তৈরি দেখছি। এখনি বের হবেন?
-হ্যাঁ। বিদায় নিতে এলাম।
আমালিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
-আচ্ছা।
আরদার এবার শান্তভাবে বুঝিয়ে বলব,
-মিগিকে সাথে রাখব সর্বদা। আমি যতক্ষন না ফিরছি কামরা ছেড়ে বাইরে যাবে না। কেউ ডাকলেও না। কাউকে ঢুকতেও দিবে না। সর্বদা চোখ–কান খোলা রাখবে কেমন?
আরদার তাকে নিয়ে চিন্তিত। দীর্ঘ কয়েক প্রহরের জন্য সে রাজ্য ছেড়ে যাচ্ছে। সভায় কত সময় লাগবে তা আরদার জানে না। বিগত দিনে ঘটে যাওয়া একের পর এক হামলা আর সেদিন মেহমেতের বলা কথার পর আমালিয়াকে একা রেখে যেতে ভীষণ ভয় পাচ্ছে সে। আমালিয়া ওর কথা শুনে মিটিমিটি আসছে। তা দেখে আরদারের কপালে ভাঁজ পড়ল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-কি?
আমালিয়া এবার শব্দ করে হেসে দিয়ে বলল,
-আপনি একদম ওনার মতো করে বলছেন আরদার।
হাসতে হাসতে আমালিয়া কি বলেছে তা হয়তো সে নিজেও জানে না। আরদার নরম ভাবে তাকালো। বলল,
-মেহমেতের মতো?
সাথে সাথে আমালিয়ার হাসি বন্ধ হয়ে গেল। হাস্যোজ্জ্বল মুখটি আঁধারে ডেকে গেল। চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিজেকে লুকাতে চাইলো। তা দেখে আরদার ব্যাথাতুর হেসে বলল,
-তাকে ছাড়া থাকতে পারছো না, তবুও কেন এই দূরত্ব?
আমালিয়া উত্তর দিলো না। তার বলার মতো কিছু নেই যে। আরদার এগিয়ে এলো কয়েক পা। আমালিয়ার দিকে একরাশ আবেগ নিয়ে বলল,
-কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ আমালিয়া?
আমালিয়া চমকে উঠলো। অবাক চোখে আরদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
-মানে?
আরদার আবারো হাসলো। ঠোঁটের কোণে হাসি থাকলেও আমালিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারল ওই হাসির পিছনে লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত ব্যাথা পরিমাণ। আরদার ঘুরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। যেতে যেতে বলল,
-তুমি সকলের থেকে নিজেকে লুকাতে পারলেও আমার থেকে পারবে না আমালিয়া। কি হবে না ভেবে সুখী থাকার চেষ্টা করো। সকলে তোমার মতো ভাগ্যবান হয় না। ভালোবাসা সকলের রিজিকে থাকে না। তাই দূরত্ব না বাড়িয়ে যা পাচ্ছো লুটে নাও।
আরদারের কথার প্রেক্ষিতে ভেসে এলো আমালিয়ার অদ্ভুত এক প্রশ্ন।
-আমাকে এতো ভালো কেন বাসলেন আরদার?
আরদার প্রায় দরজার কাছে চলে গিয়ে ছিল। সে জানে এখানে আসার পিছনে আমালিয়ার নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। শুরুতে না বুঝলেও মেহমেত যখন সবটা তাকে বলল তখন থেকে তার এমনটা মনে হয়। আর এখন তো সে পুরোপুরি নিশ্চিত। আমালিয়ার হঠাৎ করা প্রশ্ন আরদারকে থেমে যেতে বাধ্য করলো। জমে গেল সেই জায়গায়। আমালিয়া পূর্বে কখনো এসব বিষয়ে তার সাথে কথা বলেনি। আরদারের গলা কাঁপছে। বুকের মাঝে অসম্ভব পীড়া হচ্ছে। আমালিয়ার দিকে তাকালো না সে। তার এই করুন অবস্থা সে আমালিয়াকে দেখাতে চায় না। চায় না আমালিয়ার মনে একটুও অপরাধবোধ জন্ম নিক। কয়েকটি ঢোক গিলে ধরা গলায় বলল,
-ভালোবাসা কি এত ভেবে হয়? ভালোবাসা তো শুধু হয়ে যায়। যদি পরিকল্পনা করে করা যেত তাহলে অবশ্যই আমি তোমাকে ভালবাসতাম না আমালিয়া। কখনোই বাসতাম না।
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে সে বড়বড় পায়ে হারিয়ে গেল। নাহ, বলা যায় পালিয়ে গেলো আমালিয়ার সামনে থেকে। আমালিয়া না দেখলেও বুঝতে পারল আরদার কাঁদছিল। আমালিয়ার ভীষণ খারাপ লাগলো। সে এই কিছুদিন আরদারকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। ছেলেটাকে সে যতটা খারাপ ভাবতো, সে ততটা খারাপ নয়। বরং ভিষন ভালো, যত্নবান। আর সত্যি হলো আরদার আমালিয়াকে অসম্ভব ভালবাসে। কিন্তু আফসোস, আমালিয়া আরদারকে কখনোই ভালবাসতে পারেনি। সে ভালোবেসেছে মেহমেতকে। প্রচণ্ড ভালোবেসেছে। আমালিয়া কেমন মিইয়ে যাওয়া গলায় আরদারের যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলল,
-ভালোবাসা এত পোড়ায় কেন বলতে পারেন আরদার? আপনি আপনার প্রাপ্য ভালোবাসা না পেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন, আর আমি পেয়ে কষ্ট পাচ্ছি। এমন কেন হয়?
_________
-জ্বিনে বাদশাহ মেহমেত দরবারে প্রবেশ করছে।
একজন প্রহরী হাতে থাকা ছোট শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে ভারী গলায় কথাটি বলল। এখানে আরদারসহ আরো অনেক গোত্রের রাজারা রয়েছে। সকলের জন্য বিশেষ কারুকাজের আলিশান আসনের ব্যবস্থাও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আরাম–আয়েশের হরেকরকম ব্যবস্থা। এতক্ষন ধরে সকলে নিজেদের মাঝে গুজুরফুসুর করছিল, কিন্তু মেহমেতের আগমনের সংবাদে সকলের মাঝে নিরবতা বিরাজ করলো। মেহমেত প্রবেশ করলো রাজকীয় পোশাকে বাদশাহের মতো। তার চলন, দাম্ভিকতা কিছু কিছু জ্বিনদের হিংসা করতে বাধ্য করলো। কেউ কেউ মুগ্ধতা নিয়ে তাকালো, কেউ আবার চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিকর চাহনি নিয়ে তাকালো। মেহমেত সেসব কিছুই আমলে নিলো না। বর্তমান পরিস্থিতি যা তাতে জ্বিনদের মাঝে বিবাদের দেখা দিয়েছে। দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। মেহমেত বুঝতে পারে এখানে উপস্থিত রাজাদের মাঝে অনেকেই শয়তানদের সাথে হাত মিলিয়েছে। তবুও মেহমেত এবার থামবে না। সে ঠিক করেছে, নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঠিক করে নেয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ জ্বিন জাতির সুরক্ষা সুনিশ্চিত করবে। এবার আর কোনরূপ হেলাফেলা নয়। যা করার সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করে আগাতে হবে। তার পূর্বে আমালিয়াকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে হবে। ওর সুরক্ষা সব থেকে বেশি জরুরি। মেহমেত গিয়ে বসলো নিজের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে। দৃষ্টি ফিরিয়ে বামপাশে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এখানে আমালিয়ার স্থান। তার ঠিক বামপাশে। অথচ স্থানটি এখন শূন্য, ঠিক তার জীবনের মতো।
-জ্বিনে বাদশাহ, আপনাকে স্বাগতম।
মেহমেত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে সামনে দিলো। সকলে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সন্মান জানাচ্ছে। মেহমেত মাথা নাড়িয়ে সকলকে বসতে নির্দেশ দিয়ে বলল,
-আপনাদের সকলকে আমার রাজ্যে স্বাগতম। যাত্রাপথে কোনো সমস্যা হয়নি তো?
-না না বাদশাহ। আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি।
-বেশ তবে আলোচনা শুরু করি? আপনারা সকলেই কমবেশি জানেন এই সভার উদ্দেশ্য। বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপারেও অবগত। শয়তানদের উৎপাত দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এই বিষয়ে আপনাদের কি মতামত?
ইফরিত গোত্রের রাজা মেহমেতের কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলে উঠলো,
-বাদশাহ সমস্যা শুধু শয়তানদের উৎপাত সৃষ্টি করাতে সীমাবদ্ধ নেই। এর থেকেও বড় সমস্যা আমরা একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছি। নিজেদের মাঝে একতা নেই। বিভিন্ন গোত্র একে অপরের রাজ্যে পরপর অনেকবার হামলা করে নিজেদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে।
-হুম সে ব্যাপারে আমি অবগত। কিন্তু আমার প্রশ্ন এর কারণ কি?
-তাদের ভাষ্যমতে, তারা কেউই নাকি শুরু করেনি। তারা শুধু একে অন্যকে দোষ দিয়ে যাচ্ছে। এক পক্ষ বলছে ওরা করেছে, অন্য পক্ষ বলছে ওরা করেছে। এই সমস্যা রীতিমত বেড়েই চলছে। আমার ধারণা কেউ ইচ্ছা করে আমাদের মাঝে সংঘাত সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।
এবার আরদার বলে উঠলো,
-জ্বি বাদশাহ আমি তার সাথে একমত। তবে আমার ধারণা এদের মাঝে কয়েকজন রয়েছে যারা শয়তানদের সাথে মিলিত হয়ে এই সমস্যা সৃষ্টি করে আমাদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
আরদারের বলা প্রতিটি কথা যে সত্য তা সেখানে উপস্থিত প্রতিটি রাজা জানে। কিন্তু তবুও কেউ কেউ মানতে নারাজ। এর মাঝে একজন বলে উঠল,
-তাই নাকি রাজা আরদার? তা শুনলাম আপনার রাজ্য নাকি মারিদ রাজ্যের সাথে সকল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এটা কি সত্য?
মুহূর্তে মহলে গুঞ্জনের সৃষ্টি শুরু হলো। মেহমেত স্থির সেই ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে যে এই কথাটি বলেছে। এই সংবাদ ভিতরের কয়েকজন ছাড়া কারো জানার কথা নয়। তার মানে শত্রু যে তাদের মাঝে কেউ মেহমেতের বুঝতে বাকি রইলো না। মনে মনে হেসে উঠলো মেহমেত। এবার হবে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর। দেখা যাক কার জয় হয়। এর মধ্যে অন্য একজন বলে উঠল,
-সেকি কথা? আমরা তো শুনলাম সিলা রাজ্যের বর্তমান রানী আমাদের বাদশাহের স্ত্রী। তবে এই অনাচারের কারণ?
ভিড়ের মধ্যে অন্য একজন বলে উঠল,
-যে নিজের বউকে সামলে রাখতে পারে না সে সম্পূর্ণ জ্বিন সত্তাকে কিভাবে নিরাপত্তা দেবে?
এমন কথা শুনে পুরো সভা জুড়ে সমালোচনার ঝড় বইলো। মেহমেতের চোখমুখ শক্ত। চোখজোড়া লাল হয়ে এসেছেন। আরদার চকিতে মেহমেতের দিকে তাকালো। বুঝলো যেকোনো সময় বিপদ তেড়ে আসবে। তাই কিছুটা চেঁচিয়ে বলল,
-থামুন আপনারা। কিছু না জেনে-বুঝে অযথা কথা রটাবেন না। আমাদের মাঝে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। মারিদ গোত্রের সাথে পূর্বে যেভাবে সিলা গোত্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, এখনো তেমন সম্পর্ক বহাল রয়েছে। আর তাছাড়া ভুলে যাবেন না আমরা সকলে জ্বিনে বাদশাহের সামনে বসে আছি। তার ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চয়ই সকলে ধারণা রয়েছে?
মুহূর্তে আবারো পরিবেশ শান্ত। সকলে মেহমেতের মুখভঙ্গি দেখে আতঙ্কিত। মেহমেত বড় কষ্ট করে নিজেকে সামলালো। কিন্তু মুখের ভাব পূর্বের ন্যায় নরম রইলো না। আমালিয়া সংশ্লিষ্ট কোনো কিছুই সে অন্য কারো থেকে শুনতে বা জানতে ইচ্ছুক না। কেন যেন তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় খুব।
-আমার স্ত্রী কি করছেন এবং কি করবেন সে সম্পর্কে আমার ধারণা রয়েছে। সে ব্যাপারে আপনাদের না ভাবলেও চলবে। তিনি আমার স্ত্রী। তার যা মন চায় সে করতে পারবে। এই বিষয়ে আপনাদের কারো থেকে আমি কিছু শুনতে ইচ্ছুক না। ভালো হবে নিজেদের নিয়ে, নিজেদের রাজ্য নিয়ে ভাবুন। বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। আজ যারা স্বার্থপরের ন্যায় নিজ সত্তার সাথে বেঈমানি করবেন, কাল তারাও বেঈমানির শিকার হবেন। ভুলে যাবেন না শয়তান কারো আপন হয় না। তাদের কাজই হলো ইনসান ও জ্বিনদের পথ ভ্রষ্ট করা। তাই আপনাদের সকলকে বলব আগাম বিপদের জন্য এখনি তৈরি হয়ে নিন। যারা আমার সাথে যুদ্ধে অংশীদার হবেন তাদের জ্বিনে বাদশাহের তরফ থেকে স্বাগতম। আর হ্যাঁ, পরবর্তীতে আমার স্ত্রীকে নিয়ে কিছু বলার পূর্বে নিজের জবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবেন। আজ ছেড়ে দিচ্ছি কাল নাও ছাড়তে পারি।
মেহমেত সেখানে আর দাঁড়ালো না। সকলকে স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেলো। সে যেতেই আবারো সেখানে গুঞ্জুন শুরু হলো। আরদার নিজেও দাঁড়ালো না, মেহমেতের পিছু নিল। যা মাথা গরম মেহমেতের! তার ওপর আমালিয়াকে নিয়ে সকলের সামনে বলায় এখনো যে চুপ রয়েছে এটাই বা কম কিসের।
-ভাই।
আরদারের ডাককে উপেক্ষা করে মেহমেত চলে গেলো নিজ কামরার। পরনের পোশাকটি টেনে হিঁচড়ে খুলে ছুঁড়ে ফেলল চকচকে মেঝেতে। উদোম শরীরে কক্ষের এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করতে লাগলো। আরদার মেহমেতের এরূপ উগ্রতা দেখে অবাক হলো। পূর্বে সে মেহমেতের অনেক বর্বরতা দেখেছে, যা সে শয়তানের বশে থাকা কালীন করেছে। কিন্তু আমালিয়া মেহমেতের জীবনে আসার পর কখনো এমন আচরণ করতে দেখেনি। উল্টো সর্বদা পরিপাটি, গম্ভীর মুখে নিজেকে ধরে রেখেছে।
-ভাই!
আরদার আজ অনেকগুলো বছর পর আবারো সেই একই অনুভূতি নিয়ে মেহমেতকে ভাই বলে ডাকছে। কিন্তু মেহমেতের হিতাহিত জ্ঞান কই? থাকলে হয়তো এতক্ষণে আরদারকে বুকে জড়িয়ে নিত।
-আমার ওনাকে চাই আরদার। এখনই চাই। আমি নিজেকে শান্ত করতে পারছি না। আমি তার সাথে কথা বলতে চাই।
মেহমেত বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলল। তাকে বড্ড অস্থির লাগলো। এই মুহূর্তে আমালিয়াকে না পেলে যেন সে মারা যাবে। আরদার কাছে এসে মেহমেতের উম্মুক্ত বাহুতে হাত রাখলো। তারা দুজন প্রায় সমান উচ্চতার, সুস্বাস্থ্যের বলিষ্ঠ দেহের উধিকারী। আরদার শরীরে হাত রাখতেই মেহমেত শান্ত হয়ে গেল। আরদারের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলল,
-আমাকে একটু তার সাথে দেখা করিয়ে দিবেন? দয়া করুন আমার ওপর। আমি আর এই মানসিক চাপ নিতে পারছি না। তাকে না দেখে থাকতে পারছি না আরদার। একটু কথা বলতে চাই তার সাথে। বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে চাই। আমার একটু শান্তি দরকার। তাকে একবার বলুন আমি আর এমন কিছু করব না যাতে সে রেগে যায়। একবার শুধু একটু কথা বলব।
আরদার বুকে পাথর রেখে মেহমেতের আর্তনাদ শুনল। সে এক অন্যরকম অনুভূতি; যা এক তরফা ভালবাসে যারা তারাই বুঝতে পারবে।
-শান্ত হন ভাই। আমি দেখছি কি করা যায়।
মেহমেত শান্ত হয়ে গেলো। সে জানে আরদার যখন একবার বলেছে তার মানে সে তা করেই ছাড়বে। অতঃপর মুহূর্তে তার দুঃখে ভেসে যাওয়া বিরহের রূপ বদলে কঠোর হয়ে গেলো। আরদারকে আদেশ দিয়ে বলল,
-আপনার সৈন্যদের আদেশ দিন, ওই লোককে নজরে রাখতে। আমার তাকে জীবিত চাই।
-আমার সৈন্য?
-হ্যাঁ।
-কিন্তু ভাই আপনার সৈন্যরা আমার সন্যদের থেকে বেশি পারদর্শী।
-জানি।
-তবে তাদের আদেশ দিলেই তো পারেন।
-সম্ভব না।
-কেন?
মেহমেত এবার কেমন করে যেন হাসলো। রহস্য করে বলল,
-শত্রু যখন ঘরের লোক হয় তখন যতই পারদর্শী সৈন্য থাকুক না কেন, দিন শেষে হেরে যেতে হয়।
আরদার ওর হেঁয়ালি বুঝলো না। অবাক হয়ে জানতে চাইলো,
-মানে?
-মানেটা না হয় পরে বলবো। আপাদত আপনাকে যা করতে বলা হয়েছে তাই করুন। আর হ্যাঁ এই ব্যাপারে কাউকে বলবেন না। কাউকে না মানে কাউকেই না। এমনকি টোটোকেও না। বুঝেছেন?
আরদার যদিও কিছুই বুঝতে পারেনি। কেন এত সতর্কতা, কার থেকে এই লুকোচুরি আরদার জানে না। তবুও সে মাথা নাড়ালো। যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে মেহমেত হঠাৎ ওকে জড়িয়ে ধরলো। দীর্ঘ ৫৭টি বছর পর দুই ভাই একে অন্যের বুকে এলো। সকল জড়তা ভেঙে আরদারও শক্ত করে মেহমেতকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ছেড়ে দিলো। মেহমেত ধরা গলায় বলল,
-ধন্যবাদ আরদার। আমার হয়ে আমালিয়ার খেয়াল রাখার জন্য, আমার পাশে থাকার জন্য, সত্যের পথে থাকার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আরদার মেহমেতকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আপনাকে খুব মনে পড়েছে ভাই। আপনি আমাকে একা ফেলে কিভাবে এতোগুলো বছর দূরে থাকলেন? একবার শুধু আমাকে বলতে পারতেন। আমি আপনাকে ভীষণ মনে করেছি।
আরদার বাচ্চাদের মতো কেঁদে ফেলল। মেহমেতের মনে হলো এইতো সেই ছোট আরদার, যে ব্যাথা পেলে মেহেমেতের কাছে কাঁদতে কাঁদতে আসতো। মেহমেত হালকা হেসে বলল,
-দুঃখিত। এমন ভুল আর হবে না।
দুই ভাইয়ের এই মিলন যদি আমালিয়া স্বচক্ষে দেখতে পেতো তাহলে সে কি পরিমান খুশিটাই না হতো তাই না। অথচ এই খুশির মুহূর্তে সে নেই। ইস, ভাগ্য আমাদের সাথে কি কি খেলটাই না খেলে মাঝে মাঝে।
চলবে___
[দেখতে দেখতে ৪০ পর্বে চলে এসেছি। দ্রুত আপনাদের অপেক্ষার পালা শেষ করে #আফসানায়ে_জ্বিনান সমাপ্ত হবে। ধন্যবাদ।]